তিন মাস পর।
চেরেমেতেইভো এয়ারপোর্ট। মস্কো।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের যাত্রীবাহী বিএসি-ওয়ান ওয়ান ওয়ানএর আরোহীরা টারমাক ধরে এগোল। মেঘলা আকাশ, ঝড়ো বাতাস বইছে। লৌহযবনিকার অভ্যন্তরে কিসের যেন ভয়ভয় রহস্য। এক লাইনে এগোচ্ছে আরোহীরা, সবার পিছু পিছু আসছে। অস্থির প্রকৃতির এক যুবক। বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাবে, তাই এক হাতে চেপে রেখেছে হ্যাট। অপর হাতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ লেখা একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ। তার চেহারা বা পোশাক-আশাকে তেমন কোন বৈশিষ্ট্য নেই, সব মিলিয়ে অতি সাধারণ একজন মানুষ। চোখে খুব মোটা ফ্রেমের চশমা। চিকন গোঁফ। ঠাণ্ডা বাতাস লেগে লাল হয়ে উঠেছে নাক। পরনে কালো টপকোট আর কালো ট্রাউজার, পায়ের জুতো জোড়াও কালো। মাঝে মাঝেই জিভের ডগা দিয়ে নিচের ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিচ্ছে, আড়চোখে ঘন ঘন তাকাচ্ছে ডানে-বাঁয়ে। নার্ভাস, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যেন
চুরি করতে এসে ধরা পড়ার ভয়ে তটস্থ।
কে.জি.বি. তার ফটো তুলবে। চেরেমেতেইভো মস্কোর প্রধান। এয়ারপোর্ট, ফরেন ফ্লাইটের প্রত্যেক আরোহীর ফটো তোলা হয়। এখানে। টেলিফটো লেন্সের সাহায্যে দূর থেকে করা হয় কাজটা, আরোহীরা কেউ টেরও পায় না। কখন তোলা হবে ফটো, নাকি। এরই মধ্যে তোলা হয়ে গেছে, বলতে পারবে না যুবক, তবু টারমাকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মাথা নিচু করে রাখল সে, ভাবটা যেন ধুলো থেকে চোখ বাঁচাবার চেষ্টা করছে।
ডিজএমবারকেশন লাউঞ্জের আকস্মিক উত্তাপ একটা ধাক্কার মত লাগল। কোটের কলার আর হ্যাট নামিয়ে চুল ব্রাশ করার। একটা ঝোক চাপল তার। কপাল থেকে চুলগুলো সরাল সে, হ্যাটটা একটু সরে যাওয়ায় সিঁথির কাছে একগোছা সাদা চুল বেরিয়ে পড়ল-এ থেকে বোঝা যায় নিজের চেহারা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না যুবক। ঠিক এই মুহূর্তে আবার তার ফটো তোলা। হলো। চঞ্চল চোখে আরেকবার নিজের চারদিকে তাকাল সে। তারপর কাস্টমস ডেস্কের দিকে এগোল। যে-কোন আন্তর্জাতিক। টার্মিনালে যা দেখা যায়, চারদিকে মানুষের অনর্গল স্রোত। উজ্জ্বল লাল-হলুদ আর কালো সিল্ক ঝলমল করে উঠল চোখের। সামনে, দশ সদস্যের আফ্রিকান এক ডেলিগেশন তার আগে আগে লাইন দিয়ে এগোচ্ছে। এশিয়ান, ইউরোপিয়ান, ওরিয়েন্টাল-কত বিচিত্র চেহারার মানুষ। জনস্রোতের একটা অংশ হয়ে গেল সে। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের এই পরিচিত পরিবেশ একটু যেন সুস্থির হতে সাহায্য করল তাকে। যদিও চেহারায় ক্লান্তির ভাব থেকেই গেল।
জানে, কাস্টমস অফিশিয়ালদের পিছনে যারা দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা সবাই সিকিউরিটির লোক-নির্ঘাত কে.জি.বি.। ডিটেকটরের। দুই স্ক্রীনের মাঝখানে হাতের ব্যাগটা রাখল সে, কনভেয়ার বেল্টের সাথে তার অন্যান্য লাগেজও চলে এল। এক চুল নড়ল না সে, এরপর কি হবে জানা আছে। কাস্টমস্ অফিসারদের পিছন থেকে একজন লোক, চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব, এগিয়ে এসে বেল্ট থেকে সুটকেস দুটো হ্যাঁচকা টান দিয়ে তুলে নিল। এই হ্যাঁচকা টান, এর কোন দরকার ছিল না। মনে মনে শঙ্কিত হলো যুবক।
কে.জি.বি. এজেন্টের দিকে দ্বিতীয়বার আর তাকালই না সে। চেয়ে আছে কাস্টমস অফিসারের দিকে। কিন্তু না দেখেও বুঝতে পারছে, কে.জি.বি-র লোক দুজন অত্যন্ত ব্যস্ততা ও উত্তেজনার সাথে তল্লাশী চালাচ্ছে তার সুটকেসে। এলোমেলো করা হচ্ছে। কাপড়চোপড়, অযত্নের সাথে হাতড়ে কি যেন খুঁজছে তারা।
কাস্টমস্ অফিসার তার কাগজ পত্র চেক করল। কাউন্টারের শেষ মাথায় রয়েছে কন্ট্রোলার, এবার তার কাছে চলে গেল ওগুলো। ওদিকে সুটকেস হাতড়ানো আরও দ্রুতগতিতে চলছে, কে.জি.বি. এজেন্টদের চেহারা থেকে নির্লিপ্ত ভাব অদৃশ্য হয়েছে, এখন সেখানে রাগ আর বিস্ময়-কেউ যেন মস্ত একটা ঠক দিয়েছে তাদের।
অফিসার জানতে চাইল, মি. লিরয় পামার? মস্কোয় আপনার কি কাজ?
খুক করে কাশি দিল যুবক, বলল, আমার কাগজেই তো রয়েছে, আমি গোল্ডেন প্লাস্টিক কোম্পানীর এক্সপোর্ট এজেন্ট। হেড অফিস, গার্ডেন সিটি…।
হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি, বলল কাস্টমস অফিসার। আহাম্মক বনে গিয়ে বিড়বিড় করছে কে.জি.বি. এজেন্টদের একজন, ঘন ঘন তার দিকে তাকাল অফিসার। আপনি…দেখতে পাচ্ছি, গত দুবছরে, আপনি বেশ কয়েকবার সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছেন, মি. পামার?
হ্যাঁ, একটু ক্ষোভের সাথে বলল যুবক। কিন্তু কোনবারই এই ঝামেলায় পড়তে হয়নি আমাকে। সন্ত্রস্ত নয়, বিস্মিত দেখাল। তাকে।
সেজন্যে আমি দুঃখিত, মি. পামার, বলল অফিসার। কে.জি.বি. এজেন্ট দুজন নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, কিছুই শুনতে পেল না যুবক। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের আর সব আরোহীরা ইতোমধ্যে গেট পেরিয়েছে, প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে তারা। এখানে শুধু একা আটকা পড়েছে যুবক।
আমার কাগজ-পত্র সব ঠিক আছে, বলল সে। লন্ডনে সোভিয়েত দূতাবাসের ট্রেড অ্যাটাশে নিজে ওগুলোয় সই করেছেন। ক্ষীণ একটু অস্বস্তি ধরা পড়ল তার কণ্ঠস্বরে, যেন এই ঠাট্টার কোন অর্থ বুঝতে পারছে না সে। এর কোন মানে হয়? কাপড়-চোপড় এভাবে তছনছ করার? জানতে পারি, কি খুঁজছেন ওঁরা?
একজন কে.জি.বি. এজেন্ট এগিয়ে এল। লালচে চুল কপাল থেকে সরিয়ে তার দিকে সরাসরি তাকাল যুবক, হাসি হাসি করল। মুখের চেহারা। বিশালদেহী রাশিয়ান সে, চ্যাপ্টা মঙ্গোল অবয়ব, শরীরের প্রতিটি অংশ থেকে ক্ষমতা আর শক্তি ঠিকরে বেরুচ্ছে যেন। অফিসারের কাছ থেকে পাসপোর্ট আর ভিসা চেয়ে নিয়ে। পরীক্ষা করল সে। তারপর চোখ তুলে যুবকের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল। জানতে চাইল, কেন? মস্কোয় আবার আপনার। আসার দরকার পড়ল কেন, মি.-পামার?
পামার, হা। আমি একজন ব্যবসায়ী-এক্সপোর্টার।
কে.জি.বি. এজেন্টের ঠোঁট বেঁকে গেল, যেন নিঃশব্দে ব্যঙ্গ করছে? সোভিয়েত ইউনিয়নে কি এক্সপোর্ট করতে চান আপনি?
প্লাস্টিক গুডস-খেলনা, কাপপিরিচ, এইসব।
যে-সব আবর্জনা আপনি বিক্রি করেন, তার নমুনা কোথায়?
আবর্জনা! দেখুন…
আপনি ইংরেজ, মি. পামার? কিন্তু আপনার কথার সুর…ওটা ইংলিশ নয়। কেন?
আমার জন্ম জ্যামাইকায়…
আপনাকে দেখে তো মনে হয় না আপনি একজন জ্যামাইকান।
যতটা সম্ভব ইংরেজ সাজতে চেষ্টা করি আমি, বলল যুবক। বিদেশে ব্যবসা করতে তাতে সুবিধে হয়।
বুঝলাম না।
আপনারা আমার লাগেজ সার্চ করছেন কেন?
কে.জি.বি. এজেন্টকে মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় দেখাল, এধরনের কোন প্রশ্ন আশা করেনি সে। সেটা জানার আপনার কোন দরকার নেই, রাগের সাথে বলল সে। মনে রাখবেন, সোভিয়েত ইউনিয়নে আপনি একজন ভিজিটর। ছো দিয়ে সুটকেস থেকে একটা ট্রানজিস্টর রেডিও তুলে নিল সে, যুবকের নাকের সামনে তুলে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দোলাল দুবার, কর্কশ সুরে জানতে চাইল, এটা কেন? মস্কোয় বসে আপনার দেশের উদ্ভট প্রোগ্রাম এটায় তো শোনা যাবে না!
আহত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল যুবক।
হঠাৎ রেডিওর পিছনের ঢাকনিটা খুলে ফেলল এজেন্ট।
পকেটে ঢোকানো যুবকের হাত দুটো শক্ত মুঠো হয়ে গেল।
রেডিওর ভেতরটা পরীক্ষা করে দেখল এজেন্ট। হতাশ দেখাল তাকে। রেডিও আর পাসপোর্ট কাউন্টারের ওপর রাখল সে, স্পষ্ট হুমকির সুরে বলল, ঠিক আছে!
চোয়াল উঁচু হয়ে উঠল যুবকের। কাউন্টার থেকে পাসপোর্ট তুলে নিয়ে কোটের ব্রেস্ট পকেটে রাখল, রেডিওটা ঢুকল সাইড পকেটে। অপর এজেন্ট তার সুটকেস দুটো বন্ধ করল, কাউন্টার থেকে ফেলে দিল তার পায়ের কাছে। একটা সুটকেসের তালা খুলে গেল, ছিটকে বেরিয়ে এল কয়েক জোড়া শার্ট আর মোজা। হাঁটু মুড়ে বসে ওগুলো আবার সুটকেসে ভরল যুবক। এজেন্ট দুজন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। সুটকেস বন্ধ করে সিধে হলো যুবক, লম্বা চুল নেমে এসে দৃষ্টিপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটা ঠিক জায়গায় বসাল সে। সুটকেস দুটো দুই হাতে নিয়ে, ব্যাগটা বগলে, ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তাকে অপমান করা হয়েছে, সেজন্যে সে ক্ষুন্ন-অন্তত। চেহারায় সে-ভাবটুকুই ফুটে আছে। এই অভিনেতা আসলে মাসুদ রানা।
কাউন্টারের পিছনে, দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন লোক। এ-ও কে.জি.বি, কিন্তু ওদের দুজনের চেয়ে বড় পদের। অফিসার। যুবক যতক্ষণ কাউন্টারের সামনে ছিল, মুহূর্তের জন্যেও তার ওপর থেকে চোখ সরায়নি সে। যুবক পিছন ফিরতেই তিনজন জড়ো হয়ে উত্তেজিতভাবে ফিসফাস শুরু করল।
রানা জানে, ওরা নিশ্চই সেকেন্ড চীফ ডাইরেক্টরেট পার্সোনেল-সম্ভবত ফার্স্ট সেকশন, সেভেনথ ডিপার্টমেন্ট। অ্যামেরিকান, ব্রিটিশ আর ক্যানাডিয়ান ট্যুরিস্টদের ওপর কড়া নজর রাখাই ওদের কাজ।
প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এল রানা। হাতের সুটকেস আর বগলের ব্যাগ ফুটপাথে নামিয়ে রাখল। লাইন থেকে বেরিয়ে এসে ওর সামনে থামল কালো একটা ট্যাক্সি। মস্কোভা হোটেল, বলল ও।
মাথা ঝাঁকাল ড্রাইভার। বাতাসে উড়ে যাবার ভয়ে হ্যাটে হাত চাপা দিয়ে রেখেছে রানা, তাড়াতাড়ি উঠে বসল ট্যাক্সিতে। লক্ষ। করল গাড়িতে লাগেজ তুলতে অযথা বেশি সময় নিচ্ছে ড্রাইভার। আপনমনে হাসল ও।
হ্যাট খুলে ট্যাক্সির এক কোণে হেলান দিয়ে বসল রানা। ভিউ মিররে তাকিয়ে দেখল, সেই প্রকাণ্ডদেহী কে.জি.বি. এজেন্ট কালো একটা সিডান-এ চড়ছে। ট্যাক্সি ছেড়ে দিল ড্রাইভার। পিছু নিল সিডান।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে মটরওয়েতে চলে এল ট্যাক্সি। এই মটরওয়ে দক্ষিণ-পুব দিক ধরে এগিয়ে মস্কোর মাঝখানে লেনিনগ্রাদ এভিনিউ-এ মিশেছে। একবারও পিছন ফিরে তাকাল না রানা। জানে, কালো সিডান আসছে পিছু পিছু।
খানিকটা স্বস্তি বোধ করছে রানা। লিরয় পামার তার প্রথম পরীক্ষায় উতরে গেছে। ঘামছে ও, কারণ ট্যাক্সির ভেতর হিটার রয়েছে। অপরাধী, অস্থির একজন লোকের অভিনয় করতে হয়েছে ওকে-কিন্তু মনে মনে স্বীকার করল, কিছুটা সত্যি নার্ভাস হয়ে পড়েছিল ও। ওর জন্যে ওটা একটা পরীক্ষা ছিল, ফেল মারলে সব ভেস্তে যেত। কে.জি.বি. এজেন্ট আর কাস্টমস অফিসাররা আগে থেকেই যাকে ভাল করে চেনে, তার ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছে ওকে। কোথাও একটু অমিল দেখলেই ট্র্যাক করে ধরত। শুধু পামারের পোশাক, চশমা, চুল আর গোঁফ নয়, তার হাত-পা আর মুখ নাড়ার ভঙ্গি, উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে হয়েছে ওকে। কটুগন্ধী আফটারশেভ লোশন মাখতে হয়েছে, কারণ পামার মাখে। দুদিন দাঁত না মেজে অপরিষ্কার রাখতে হয়েছে, কারণ পামার তার দাঁত মাজে না। চেহারায় চাপা একটা অস্থিরতা দেখাতে হয়েছে, পামারও তাই দেখিয়ে থাকে।
লিরয় পামার হিসেবে মস্কোয় আসার কথা পিটি ডাভের। ডাভ এখন রানা এজেন্সীর লন্ডন শাখার ছেলেদের হাতে। ওরা। তাকে জামাই আদরে রাখবে, কিন্তু চারদেয়ালের ভেতর থেকে। বাইরে যেতে দেবে না একবারও, যতদিন না রাশিয়া থেকে বেরিয়ে যায় রানা।
পিটি ডাভ যাতে নির্বিঘ্নে রাশিয়ায় ঢুকতে পারে তার জন্যে। জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স চমৎকার একটা পরিকল্পনা করেছিল। তাদের এই পরিকল্পনার বয়স প্রায় দুবছর। দুবছর ধরে বার। কয়েক রাশিয়ায় আসা-যাওয়া করে একটা কাভার তৈরি করছিল পামার, যে কাভার ব্যবহার করার কথা পিটির। পিটির সাথে পামারের দৈহিক গড়নের অমিল প্রায় নেই বললেই চলে। এব্যাপারে পিটির সাথে রানারও কোন অমিল সহজে চোখে পড়ার নয়।
লিরয় পামার একজন স্মাগলার। অদূর ভবিষ্যতে ড্রাগস্মাগলিঙের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে সে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কে.জি.বি. অফিসারদের মনে এই সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়া হয় বছরখানেক আগে। সেই থেকে পামারের ওপর সতর্ক নজর রাখা হয়-তবে এবারের মত এত প্রকাশ্যে তাকে বিরক্ত করা হয়নি। কখনও। কে জানে, রানা ভাবল, জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স হয়তো কৌশলে কে.জি.বি-কে জানিয়ে দিয়েছিল, পামারের সুটকেসে কিছু পাওয়া যাবে। গবেট লোকটা যেভাবে ওর সুটকেস দুটো হাতড়াল, দেখে মনে হলো কিছু পাওয়া যাবে এ যেন সে জানত।
কিন্তু পায়নি। আর পায়নি বলেই তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে।
মিলছে না, ভাবল রানা। পিটি ডাভ নিরাপদে মস্কোভা হোটেলে পৌঁছুবে, এটাই চাইবে জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স। কে.জি.বি. এজেন্ট তাকে অনুসরণ করবে, এটা তারা চাইতে পারে না। তাহলে? পামারের সুটকেসে কিছু পাওয়া যাবে, এই খবর কোত্থেকে পেল কে.জি.বি.?
মস্কোয় পা দেয়ার পর কি হবে না হবে, তার প্রায় কিছুই জানানো হয়নি পিটি ডাভকে। কাজেই রানাও কিছু জানে না। কে। জানে, ভাবল ও, হয়তো জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স চেয়েছে পিটির পেছনে কে.জি.বি. লাগুক। এর পেছনে তাদের হয়তো অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে।
অস্বস্তি আর সেইসাথে খানিকটা অসহায় বোধ করল রানা। নিরাপত্তার জন্যে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা না জানা, এরচেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু নেই। কিন্তু করার কিছু নেইও, জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্সের হাতের পুতুল সে, যেমন নাচাবে তেমনি নাচতে হবে ওকে। নিরাপত্তার আয়োজন আর পরিকল্পনায় ওরা যদি কোন ভুল করে থাকে, সেটা সংশোধনের কোন সুযোগ পাবে না ও।
দুতরফের চোখে ধরা পড়ার ভয় রয়েছে ওর। কে.জি.বি-কে
সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, বিলিয়ারস্ক থেকে মিগ-৩১ চুরি করার জন্যে একজন ইসরায়েলি পাইলট রাশিয়ায় ঢুকবে। এই পাইলটকে ধরার জন্যে কে.জি.বি. চেষ্টার কোন ত্রুটি করবে না। আরেক পক্ষ হলো, সি.আই.এ. আর জেড. ই-র মিলিত স্পাই রিঙ। ও যে পিটি ডাভ নয় তা যদি ওরা বুঝতে পারে, স্রেফ খুন হয়ে যাবে ও। ভরসা এইটুকু যে স্পাই রিঙের রাশিয়ান ইহুদি বা সি.আই.এ. এজেন্টরা কেউ কোনদিন পিটি ডাভকে দেখেনি। তবে পিটি ডাভের চেহারার বর্ণনা, অভ্যেস, চরিত্র, স্বভাব, আচরণ ইত্যাদি সম্পর্কে সব জানিয়ে সাবধান করা আছে তাদেরকে। কাজেই, বিপদ যে কোন দিক থেকে আসবে বলা কঠিন।
ট্যাক্সি ছুটছে, ডান দিকে খিমকি রিজারভয়ার। দ্রুতগতি কালো মেঘের নিচে বিপুল জলরাশি, দেখে মনে হলো অমঙ্গলের হিম-শীতল ছায়া। খানিক পরই সাজানো গোছানো শহুরে পরিবেশের ভেতর ঢুকে পড়ল ওরা। জানালা দিয়ে বাঁ দিকে তাকাল রানা, ডায়নামো স্টেডিয়ামকে পাশ কাটাল ট্যাক্সি।
পিটি ডাভ একজন পাইলট, স্মরণ করল রানা, স্পাই নয়। সি.আই.এ. হেডকোয়ার্টারে মিগ-২৫ চালাবার ট্রেনিং পেয়েছে সে, এসপিওনাজ সম্পর্কেও কিছু কিছু জ্ঞানদান করা হয়েছে তাকে, কিন্তু একজন স্পাইয়ের নির্লিপ্ত, ঠাণ্ডা ভাব তার মধ্যে আনা যায়নি। এ-সব তথ্য তেল আবিব থেকে চুরি করা ফাইলে পেয়েছে রানা। পিটির দুর্বলতা সম্পর্কে তাতে বিশদ লেখা। আছে। ও জানে পিটির দুর্বলতাগুলো ওর আচরণেও প্রকাশ পাওয়া চাই। তা না হলে বিপদে পড়বে ও।
মেজর জেনারেলের কথা মনে পড়ল ওর। ওকে এই যমের। বাড়ি পাঠাবার ব্যাপারে তাঁর দ্বিধাদ্বন্দ্ব আঁচ করতে পেরেছিল ও। আলোচনার মাঝখানে, এক সময়, ওর নিজের মনেও ক্ষীণ একটু সংশয় দেখা দিয়েছিল-এ কি সম্ভব? খোদ রাশিয়া থেকে ওদের একটা সাত রাজার ধন চুরি করে নিয়ে বেরিয়ে আসা?
আরও মনে হয়েছিল, বুড়ো কি আমাকে জেনেশুনে মরতে পাঠাচ্ছে?
কিন্তু তারপর সমস্ত সংশয় আর দ্বিধা কোথায় ভেসে গেল, রোমাঞ্চের হাতছানি পাগল করে তুলল ওকে। খাঁচায় ঢুকে হিংস্র। বাঘকে খুঁচিয়ে উত্তেজিত করে তুলতে হবে, কেড়ে আনতে হবে। তার আহার। এত বড় চ্যালেঞ্জ খুব কমই এসেছে তার জীবনে।
এয়ারকিং। মিকোয়ান মিগ-৩১। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিমান। চুরি করে নিয়ে যাবে ও বাংলাদেশে।
রানার গায়ে কাঁটা দিল।
দযেরঝিনস্কি স্ট্রীট। কে.জি.বি. হেডকোয়ার্টার।
কর্নেল সাসকিন তার অফিসে পায়চারি করছে। এম ডিপার্টমেন্টের হেড সে, মিকোয়ান প্রজেক্টের সিকিউরিটি চীফ। পাঁচ বছর আগে এই দায়িত্ব নেয়ার সময় তার মাথায় ছিল ঘন। কালো ঝাকড়া চুল, এখন সেখানে মস্ত এক টাক পড়েছে, চুল যা আছে বেশিরভাগ সাদা। তার বয়স বিয়াল্লিশ, ছয় ফিটের মত লম্বা, চওড়া হাড়, কোথাও এক ছটাক মেদ জমেনি। অত্যন্ত খুঁতখুঁতে লোক, কিন্তু শান্ত প্রকৃতির। কৌশলী আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী বলে সুনাম আছে ডিপার্টমেন্টে।
পায়চারি করছে কর্নেল, আর ভাবছে। মিগ-৩১-এর টেস্টফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এসেছে। একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে সন্দেহ জাগছে মনে। তার সিদ্ধান্তগুলো কি সঠিক ছিল?
বিলিয়ারস্কে ফুটো আছে, অনেক দিন থেকেই জানে সে। কোইভিসতু, করনিচয় আর ইসরাফিলভ, এরা বেঈমান, ঘরের শত্রু বিভীষণ। মুদি মোলায়েভ সম্পর্কেও জানে সে। এই লোকটাই তথ্য আনা-নেয়া করে। এত লম্বা সময় ধরে এই মিগ ৩১ তৈরি হচ্ছে, কে.জি.বি-র চোখে ওদের ধরা না পড়ে উপায় ছিল না।
কিন্তু ওদের ব্যাপারে সে বা তার ডিপার্টমেন্ট কিছুই করেনি। শুধু সিকিউরিটি সিস্টেম আরও জোরদার করা হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে কড়াকড়ির মাত্রা-যাতে তথ্য পাচার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, পালানো হয়ে ওঠে অসম্ভব, আর যাতে গোপন আলোচনার সুযোগ না থাকে।
এটা এক ধরনের জুয়া খেলা, প্রথম থেকেই জানত কর্নেল সাসকিন কোইভিসতু, করনিচয় আর ইসরাফিলভ মিকোয়ান প্রজেক্টের তিন অমূল্য রত্ন, এদেরকে সরাবার পরামর্শ দিতে সাহস হয়নি তার। তার পরামর্শ গ্রহণ করা হত বলেও মনে হয় না। আরও একটা ভয় ছিল, ওদেরকে সরিয়ে দিলে জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স বা সি.আই.এ. মিকোয়ান প্রজেক্টের অন্য আরেক দল লোককে স্পাই হিসাবে কাজে লাগাবে। এদেরকে তবু তো চেনে, তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু জানারও হয়তো সুযোগ হবে না তার। অচেনা শত্রুর চেয়ে চেনা শত্রু ভাল, তখন অন্তত তাই মনে হয়েছিল। তার সহকারী, মেজর রোমানভও তার এই ধারণা সমর্থন করে।
কিন্তু এখন সন্দেহ হচ্ছে, সিদ্ধান্তটা কি ভুল ছিল? শত্রু পুষে রাখা কি ঠিক হয়েছে?
ব্যর্থতার মূল্য তাদের সবাইকে দিতে হবে, টেকো মাথায় হাত। বুলাতে বুলাতে ভাবল কর্নেল। সেটা যে কি রকম মূল্য, ভাবতেও বুক কাঁপে। মর্যাদা তো খোয়াতেই হবে, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার সবার পেটে লাথি পড়বে, সেই সাথে প্রাণটাও হারাতে হতে পারে। কে.জি.বি-তে ব্যর্থতার কোন ক্ষমা নেই।
তথ্য যাই পাচার হয়ে থাকুক, মিগ-৩১-এর মার্কিন সংস্করণ তৈরির জন্যে যথেষ্ট তথ্য সি.আই.এ.পায়নি।-কথাটা ভেবে একটু। সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করল কর্নেল। কিন্তু তারপরই ভাবল, যদি কোন বিপদ ঘটে, তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, জেনেশুনে একদল স্পাইকে কেন তুমি প্রজেক্টের মধ্যে থেকে কাজ করবার সুযোগ দিলে?
এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারবে না সে। দিলেও সেটা। গ্রাহ্য হবে না।
কে.জি.বি. চীফ উলরিখ বিয়েগলেভ প্রায় বছর দুয়েক আগে। তাকে বলেছিলেন, তার কাছে খবর আছে, জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স। আর সি.আই.এ. নাকি বিলিয়ারস্ক থেকে একটা মিগ-৩১ চুরি করার প্ল্যান করছে। কথাটা শুনে প্রাণ খুলে হেসেছিল সে। তার হাসিতে যোগ দিয়েছিলেন চীফও। তারপর বলেছিলেন, এটা একটা ভুয়া খবর সন্দেহ নেই, তবে বিলিয়ারস্কে স্যাবোটাজের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
খবরটা সত্যিই কি ভুয়া ছিল? গুরুত্ব না দিয়ে কি বোকামি করা হয়েছে? স্যাবোটাজ যদি সম্ভব হয়, চুরি করা সম্ভব হবে না কেন? আর বেশি সময় নেই, সিকিউরিটি আরও কড়া করতে হবে। শেষ মুহূর্তে কোন রকম ঝুঁকি নেয়া চলে না।
ঝনঝন শব্দে টেলিফোন বেজে উঠল। নিজের ডেস্কের দিকে এগোল কর্নেল সাসকিন।
চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে, আর বসের দিকে তাকিয়ে আছে। মেজর রোমানভ। শক্ত-সমর্থ শরীর, বুকের ছাতি বিয়াল্লিশ ইঞ্চি, বলার চেয়ে শোনাতেই তার আগ্রহ বেশি, ফলে কর্মকর্তাদের প্রিয়পাত্র হতে পেরেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ভুরু কুঁচকে আছে তার, ভাবছে, কর্নেলকে তো এত অস্থির দেখাবার কথা নয়!
মাত্র আজ সকালেই বিলিয়ারস্কের কে.জি.বি. ইউনিটের কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছে কর্নেল সাসকিন। আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের ওপর নজর রাখার জন্যে লোকসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় গোণার বাইরে বিলিয়ারস্কে কেউ ঢোকেনি। ছোট্ট শহরটা থেকে বেরিয়েছে শুধু মুদি ব্যাটা, মোলায়েভ। মস্কো থেকে বিলিয়ারস্কে তার ভ্যান পৌঁছুনোর সাথে সাথে সার্চ করা হয়েছে। কর্নেল নির্দেশ দিয়েছে, শহরে ঢোকা মাত্র প্রতিটি গাড়ি সার্চ করতে হবে। আর সিকিউরিটি ফেন্স পেরিয়ে ফ্যাক্টরিতে যে লাট সাহেবই ঢুকতে চাক, প্রত্যেকের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হবে, পরিচিত হলেও পরীক্ষা করতে হবে তার কাগজ-পত্র, সার্চ করতে হবে শরীর আর কাপড়-চোপড়। কুকুরের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যাতে পেরিমিটার ফেন্সের চারদিক আরও ঘন ঘন পেট্রল দিতে পারে। হ্যাঙ্গারে সশস্ত্র গার্ডের সংখ্যাও বাড়িয়ে তিনগুণ করা হয়েছে।
আজ রাতেই কে.জি.বি. হেলিকপ্টারে চড়ে বিলিয়ারস্কে যাচ্ছে রোমানভ, বর্তমান অফিসারের কাছ থেকে সিকিউরিটি ফোর্সের দায়িত্ব বুঝে নেবে সে। বিলিয়ারস্ককে নিচ্ছিদ্র করে তুলতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে তার। কর্নেল সাসকিন ঠিক করেছে, ফার্স্ট সেক্রেটারি আর তাঁর দলের সাথে নয়, টেস্ট-ফ্লাইটের চব্বিশ ঘণ্টা আগে বিলিয়ারস্কে পৌঁছুবে সে। চীফ উলরিখ বিয়েগলেভ সম্ভবত ফার্স্ট সেক্রেটারির সাথে ওখানে পৌঁছুবেন। টেস্ট-ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকতে আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের সব কজনকে গ্রেফতার করবে তারা। ফার্স্ট সেক্রেটারি পৌঁছুনোর আগেই ওদেরকে ইন্টারোগেট করা শুরু হয়ে যাবে। সন্দেহ নেই, সব দেখে পুলকিত হবেন ফাস্ট সেক্রেটারি। আর গর্বিত হাসি। দেখা যাবে চীফ উলরিখ বিয়েগলেভের মুখে। কর্নেলের সাথে পরামর্শ করে রোমানভ ঠিক করেছে, কোইভিসতু, করনিচয়, ইসরাফিলভ, মোলায়েভ আর তার স্ত্রীকে একই সময়ে গ্রেফতার করা হবে, যেখানেই তারা থাকুক না কেন। ওদের মিথ্যে নিরাপত্তাবোধ মুহূর্তে উবে যাবে কপূরের মত। কে.জি.বি-র নারকীয় নিষ্ঠুরতা কাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পাবে বাছাধনরা।
ক্রেডলে রিসিভার নামিয়ে রেখে তার দ্বিতীয় সহকারী মেজর বাস্কির দিকে তাকাল কর্নেল। মেজর বাস্কির মস্ত একটা গুণ, কর্মকর্তাদের মেজাজ বুঝে কথা বলতে পারে সে। অনুকরণে তার। জুড়ি মেলা ভার-বস্ হাসলে সে-ও হাসে, বস্ উদ্বিগ্ন হলে সে-ও গম্ভীর হয়, কর্তার ধমক খেলে সে-ও অধস্তনদের ধমকায়। একহারা গড়ন, চোখ দুটো সদা সতর্ক। বিলিয়ারস্কে অ্যাসিস্ট্যান্ট কে.জি.বি. সিকিউরিটি চীফ সে। প্লেনে করে আজই মস্কোয়। এসেছে, কর্নেল সাসকিনকে একটা রিপোর্ট দেয়ার জন্যে। তার মৌখিক রিপোর্ট পেয়ে খুশি হয়েছে কর্নেল, কিন্তু আরও বেশি খুশি হয়েছে মিখাইল রাভিকের লিখিত রিপোর্ট পড়ে। রাভিক। মিকোয়ান প্রজেক্টের চীফ সিকিউরিটি অফিসার।
মিকোয়ান প্রজেক্টের সিকিউরিটি ব্যবস্থা যেমন সুচারু তেমনি কড়া। শুধু পরীক্ষিত কৌশলগুলোই কাজে লাগানো হয়েছে, কারও। উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত কোন চমকপ্রদ আইডিয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার কোন ঝুঁকি নেয়া হয়নি। ঘর-বাড়ি বানিয়ে দেয়া হয়েছে, সপরিবারে একদল কে.জি.বি. অফিসার প্রকাশ্যে বসবাস করছে ওখানে, তাদের অধীনে রয়েছে সেকেন্ড ডাইরেক্টরি থেকে বাছাই করা স্কোয়াড। সহায়তাকারী দল হিসেবে রয়েছে বেশ কিছু জি.আর.ইউ, সোভিয়েত মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সদস্য। তারা এয়ারস্ট্রিপ আর শহরে গার্ড ও পেট্রল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তৃতীয় আরও একটা দল রয়েছে, এরা কে.জি.বি-র আনঅফিশিয়াল সদস্য। সাদা পোশাকে ইনফরমার আর সিভিলিয়ান স্পাই হিসেবে রিসার্চ আর ডেভেলপমেন্ট টীমের সবচেয়ে কাছে থেকে দায়িত্ব পালন করছে ওরা। তিনটে দলই আসলে চারজন লোকের ওপর নজর রাখছে। এই চারজন সম্পর্কে সব তাদের মুখস্থ।
খুক করে কাশল কর্নেল সাসকিন, অর্থাৎ সহকারীদের মনোযোগ দাবি করছে সে। প্রায় একই ভঙ্গিতে যে যার চেয়ারে নড়েচড়ে বসল মেজর রোমানভ আর মেজর বাস্কি।
শেষ মুহূর্তে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাই না, বলল কর্নেল। চীফ এই নিয়ে দুবার ফোন করলেন, তিনিও খুব উদ্বেগের মধ্যে আছেন। ভাবছি, ফিফথ চীফ ডাইরেক্টরেট থেকে স্পেশাল একটা ডিটাচমেন্ট ডেকে নেব কিনা। তোমরা কি বলো? ওদের সিকিউরিটি সাপোর্ট ইউনিটকে যদি ডাকি, কেমন হয়?
বিলিয়ারস্কে সশরীরে থেকে দায়িত্ব পালন করে মেজর বাস্কি, প্রস্তাবটা অপমানকর লাগল তার কাছে। বসের মেজাজ বুঝে কথা বলতে অভ্যস্ত হলেও, এই মুহূর্তে তার ব্যতিক্রম ঘটল। সে বলল, তার কোন দরকার আছে বলে আমি মনে করি না, কমরেড কর্নেল।
দরকার নেই! বিস্মিত দেখাল কর্নেল সাসকিনকে। তুমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারো, ওখানে কোন বিপদ হবে না?
চুপ করে থাকল মেজর বাস্কি। কিন্তু কর্নেল তার দিকে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েই থাকল। অগত্যা ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে হলো বাস্কিকে। বলল, না, গ্যারান্টি দিতে পারি না।
কেউ তোমাকে তা দিতে বলছেও না, আশ্বস্ত করল কর্নেল। অধস্তনকে সহজেই নত করা গেছে, সন্তুষ্টির ক্ষীণ হাসি দেখা গেল। তার ঠোঁটে।
কতজন লোক, কর্নেল?
শখানেক। গোপনে, অবশ্যই। তবে একশোর কম নয়। ওদের যদি কোন প্ল্যান থাকে, এত লোক দেখে ভয়েই হয়তো। তাতে হাত দেবে না ওরা।
কর্নেলের মেজাজ বুঝে নিয়েছে মেজর বাস্কি, অভিযোগের সুরে বলল সে, মেজর রাভিক তো বিশ্বাসই করে না ওদের কোন প্ল্যান আছে।
হুম। হয়তো নেই। কিন্তু আমাদের ধরে নিতে হবে টেস্টফ্লাইট স্যাবোটাজ করা হবে-মিসাইল বা কামানে কারসাজি থাকতে পারে, মাঝ-আকাশে বিস্ফোরিত হতে পারে প্লেন। পরিণতি সম্পর্কে তোমাদের বলার দরকার করে না। মিগ-৩১এর প্রোডাকশন পিছিয়ে যাবে, আদৌ প্রোডাকশনে যাওয়া হবে। কিনা তাও নতুন করে বিবেচনা করা হতে পারে। আমাদের কি হবে, সেটা নাই বা ভাবলাম।
মেজর রোমানভ একটা চুরুট ধরাল। কোন ভাব নেই। চেহারায়। শুধু শুনে যাচ্ছে সে, কিছু জিজ্ঞেস না করলে মুখ খুলবে না।
টেলিফোনে পলিটিক্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসের সাথে কথা বলো, নির্দেশ দিল কর্নেল। ওদের যারা বিলিয়ারস্কে কাজ করছে। তাদের মধ্যে থেকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত কয়েকজনকে বাছাই করো-ফ্যাক্টরি কমপ্লেক্সের ভেতর ডিউটি দেবে তারা, বেঈমানগুলোর কাছাকাছি থাকবে। তোমার অধীনে কাজ করবে। ওরা, বাস্কি। বাস্কি মাথা ঝাঁকাল। প্রত্যেকের কাছে অস্ত্র থাকবে, কমিউনিকেটর থাকবে। এবার বলো, টেস্ট-ফ্লাইটের আগে, প্লেনে যখন অস্ত্র তোলা হবে, কোথায় থাকবে তিন বেঈমান?
নোট বুকে চোখ বুলাল মেজর বাস্কি। ওরা তিনজনই হ্যাঙ্গারের ভেতর থাকবে, কমরেড কর্নেল।
বাকি চুলগুলোও দেখছি সাদা হয়ে যাবে! হ্যাঙ্গারের ভেতর ওদের থাকা মানে বিপদের সম্ভাবনা তিনগুণ বাড়ল। খুলে বলো, মেজর।
কোইভিসতু উইপনস সিস্টেমের দায়িত্বে রয়েছে, কমরেড কর্নেল…
সে কি রাতেও এয়ারক্রাফটে কাজ করবে, টেক অফ না করা পর্যন্ত?
জ্বী, কমরেড কর্নেল।
তার কাজ আর কাউকে দিয়ে হয় না? হয় যে না তা কর্নেলও জানে।
জ্বী না।
বেশ। আর সবাই?
করনিচয় আর ইসরাফিলভ, দুজনেই নাকি মেকানিক্স হিসেবে দুর্লভ প্রতিভা, বলল মেজর বাস্কি। ফুয়েলিং সিস্টেমে, মিসাইল আর অন্যান্য অস্ত্র লোডিঙে ওরা বিশেষজ্ঞ। রিয়ারওয়ার্ড ডিফেন্স পড-এও ওদের কাজ আছে। এতদিন ওরাই সব দেখাশোনা করেছে, ওদের কাজ আর কাউকে দিয়ে করানো যাবে না।
হুঁ। নজর রাখার ব্যাপারটা?
একেবারে কাছ থেকে নজর রাখা হবে। আমাদের ইনফরমাররা সারারাত ছায়া হয়ে লেগে থাকবে ওদের সাথে।
কিন্তু স্যাবোটাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে কিনা বুঝতে পারবে কি? সে টেকনিক্যাল জ্ঞান তাদের আছে?
আছে, কমরেড কর্নেল।
গুড। এ-ব্যাপারে তোমার কথায় আস্থা রাখতে পারি। আর মোলায়েভ?
মুদি ব্যাটা আর তার বউ নিজেদের বাড়িতেই থাকবে…
বুঝলাম, মেজর বাস্কিকে বাধা দিল কর্নেল সাসকিন। ব্যাপারটা তাহলে এই রকম দাঁড়াল। আমাদের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স বিলিয়ারস্কের চারদিকে একটা বৃত্ত তৈরি করবে, সেটা টপকে ভেতরে ঢোকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সিকিউরিটি। সাপোর্ট ইউনিট কাল পৌঁছুবে ওখানে। পেরিমিটার ফেন্সের কাছে গার্ডদের, হ্যাঙ্গারে ইনফরমারদের, ফ্যাক্টরিতে এজেন্টদের আর শহরে পেট্রল পার্টিদের সাহায্য করবে ওরা। তিন বেঈমানকে চোখে চোখে রাখা হবে, বিশেষ করে কোইভিসতুকে। কিছু কি বাদ দিলাম, রোমানভ?
আমার নোটবুকে সব লেখা আছে, কমরেড কর্নেল, মুখ। খুলল রোমানভ।
চেয়ারে হেলান দিল কর্নেল, হাত দুটো পরস্পরের সাথে। বাধল মাথার পিছনে। আরও সতর্কতার জন্যে, আমার মনে হয়, মস্কোয় রশির অপর প্রান্তটাও মুঠোয় নেয়া দরকার। না, আজ রাতে নয়। আটচল্লিশ ঘণ্টা আগেই যদি ওরা গায়েব হয়ে যায়, ফ্লেমিং ব্যাপারটা জেনে ফেলতে পারে, বিলিয়ারস্কের তিন বেঈমানকে সাবধান করে দেবে সে। না! কাল হলেই চলবে, তাতে করে ওরা যা জানে সব আদায় করতে অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা। সময় পাব আমরা। এদিকটা তুমি দেখবে, রোমানভ।
দেখব, কমরেড কর্নেল। ওরা কাভার হিসেবে যে ওয়্যারহাউসটা ব্যবহার করছে, ওটার ওপর নজর রাখার জন্যে আজ রাতেই লোক পাঠাব। আপনি হুকুম করলেই ভেতরে ঢুকবে ওরা।
গুড। কাল বিলিয়ারস্কে যাবার আগে ওদের আমি দেখতে চাই। ওয়্যারহাউসের ওপর নজর রাখার জন্যে নিজেদের লোককে পাঠিয়ো না। সেভেনথ ডাইরেক্টরেটকে বলো, ওরা লোক দিয়ে সাহায্য করবে। সময় হলে আমি বলব, তখন আমাদের লোক ওদের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবে। তাই হবে, কমরেড কর্নেল।
মস্কোভা হোটেলের ঠিক উল্টোদিকে একটা পার্কিং এরিয়া, কালো সিডান থামল সেখানে।
পোর্টিকো পেরিয়ে হোটেল ফয়েই-এ ঢুকল রানা, অন্যমনস্কতার ভান করে কালো সিডানের ওপর চোখ বুলাল। সিডানের লোক দুজন ওর পিছু নিয়ে হোটেলে ঢোকেনি। আরোহী লোকটা এরইমধ্যে একটা খবরের কাগজ মেলে ধরেছে, আর সিগারেট ধরিয়েছে ড্রাইভার। ওদের এই আচরণ সতর্ক করে তুলল রানাকে, রিসেপশন ডেস্কের গায়ে ঠেস দিয়ে ফয়েই-এর চারদিকে তাকাল ও। ওর জন্যে যে লোকটা অপেক্ষা করছে, সাত সেকেন্ডের মধ্যে তাকে চিনে ফেলল রানা। চেরেমেতেইভো এয়ারপোর্ট থেকে নিশ্চই ওর ফটো দুযেরঝিনস্কি স্ট্রীটে ওয়্যারপ্রিন্টের মাধ্যমে ট্রান্সমিট করা হয়েছে, একটা কপি নিয়ে এই লোক সোজা চলে এসেছে এখানে। কে.জি.বি-র দক্ষতা সম্পর্কে জানে ও, তাই আশ্চর্য হলো না। সামান্য একজন ক্রিমিনাল হিসেবে ওকে সন্দেহ করা হচ্ছে, অথচ চোখের আড়াল না করার জন্যে কি বিপুল আয়োজন! মনে মনে ভাবল, যদি আসল পরিচয়টা টের পায় রে…!
লোকটার কোলের ওপর খোলা একটা প্রাভদা, কিন্তু চোখ দুটো ঘুমে ঢুলু ঢুলু! কারও ওপর নজর রাখার জন্যে এটা একটা ভাল কৌশল-ঘুমের ভান করা। ফয়েই-এর মাঝামাঝি জায়গায় অনেকগুলো উঁচু আসনের একটায় বসে আছে সে, ওভারকোটটা ফেলে রেখেছে সোফার হাতায়। রানা হোটেল থেকে বেরুলে এই লোক পিছু নেবে। ততক্ষণে হয়তো বাইরের গাড়ি আর এজেন্টদেরও পালাবদল ঘটবে।
কামরাটা বারোতলায়। পোর্টারকে বিদায় করে দিয়ে চশমা খুলল রানা। হ্যাটটা নামিয়ে ছুঁড়ে দিল বিছানার ওপর। মাথার চুল হাত দিয়ে এলোমেলো করল। খুলে ফেলল টাই। ছোট একটা সুইট, লম্বা জানালার সামনে দাঁড়ালে ধূলি-ঝড় আর রেড স্কয়ার দেখা যাবে। সুটকেস খুলে স্লিপার বের করল। কামরার এক কোণে একটা ড্রিঙ্কস ট্রলি, সেটা থেকে স্কচের একটা বোতল আর গ্লাস নিয়ে চলে এল সোফায়। আড়াই কি তিন পেগ হুইস্কি খেলো। ও। নিচু তেপয়ে পা তুলে ঢিল করে দিল পেশীগুলো।
পিটি ডাভ একজন ভীতু লোক। কাজেই সন্ত্রস্ত হয়ে আছে, এই ভাব দেখাতে হবে ওকে। ভয় নয়, অস্বস্তি বোধ করছে রানা। ওকে নিয়ে কি করা হবে, কিছুই ও জানে না। জানে না পিটি ডাভের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় জেড.ই. আর সি.আই.এ. কোন ভুল করে বসে আছে কিনা।
এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কামরার চারদিকে চোখ বুলাল রানা। মস্কোভা বিলাসবহুল হোটেল, সেন্ট্রালি-হিটেড। ফরেন ডেলিগেশনগুলো বেশিরভাগ এখানেই ওঠে। আড়িপাতা যন্ত্র আছে কিনা খুঁজতে নিষেধ করা আছে। দুমুখো আয়নার উল্টোদিক থেকে কেউ ওর ওপর নজর। রাখছে কিনা জানার কোন উপায় নেই।
নিজের অজান্তেই বিশাল আয়নার দিকে চোখ চলে গেল, তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুজল ও। অনুভূতিটা অস্বস্তি কর-সরাসরি কেউ ওর দিকে তাকিয়ে আছে ভাবতে বড় বিশ্রী লাগে।
ঘুরেফিরে বারবার সোভিয়েত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবতে চাইছে ও। এয়ারকিং নিয়ে যতক্ষণ আকাশে থাকবে ও, ওর সাথে সোভিয়েত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করবে। সি.আই.এ. হেডকোয়ার্টারে মাত্র তিনমাসের ট্রেনিং পেয়েছে ও। মিগ-২৫ (এয়ারউলফ) চালাতে শিখেছে। ওকে একা ট্রেনিং নিতে দেখলে সি.আই.এ. সন্দেহ করবে, তাই ছয়টা দেশের ছয়জন পাইলটকে ট্রেনিং দেয়া হয়। অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটনই সব ব্যবস্থা করে দেন। সি.আই.এ-কে জানানো হয়, বন্ধু কয়েকটা দেশের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এই প্রোগ্রামের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সি.আই.এ-র ওই এয়ারস্ট্রিপে মিগ-৩১ অর্থাৎ এয়ারকিঙেরও একটা ডামি তৈরি করা হয়। কোইভিসতুর পাঠানো ফটো আর বর্ণনার সাহায্যে তৈরি হয় ডামিটা। পিটি ডাভের ট্রেনিং শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই, তাই ডামির ওপর সি.আই.এ-র বিশেষ নজর ছিল না। এই সুযোগটাও পুরোপুরি নিয়েছে রানা। এয়ারকিঙে যখন চড়বে ও, সে-ভাগ্য যদি কখনও হয়, কন্ট্রোল-প্যানেল ওর কাছে অপরিচিত লাগবে না।
ঠাণ্ডা মাথায়, যুক্তি দিয়ে ভাবতে গেলে মানুষের অনেক কাজই অঘাতি বা পাগলামি বলে মনে হয়। বিলিয়ারস্ক থেকে এয়ারকিং নিয়ে আকাশে ওঠার পর পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ যেদিকেই যাক রানা, রাশিয়ান সীমান্ত পেরোতে হলে হাজার মাইলের ওপর পাড়ি দিতে হবে ওকে। এই এক হাজার মাইল ধরে ওর পিছনে লেগে থাকবে গোটা সোভিয়েত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
মাথাটা হঠাৎ ঘুরে উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ। গ্লাসে খানিকটা হুইস্কি ঢেলে এক চুমুকে গিলে ফেলল ও। মাথা ঠাণ্ডা করে কিছুই চিন্তা করতে পারছে না। উঠে দাঁড়িয়ে চলে এল জানালার
সামনে। সব ভুলে থাকতে চায়।
বারোতলা থেকে নিচে, রেড স্কয়ারে তাকাল। সার সার পার্ক করা কয়েকশো গাড়ি। হাজার হাজার মানুষ। বৃষ্টির দেখা নেই, আকাশ ভরা মেঘ, বিরতিহীন ধূলিঝড়-শেষ বিকেলেই সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। হিস্টরী মিউজিয়মের ওপর দিয়ে অনেকক্ষণ ক্রেমলিনের দিকে তাকিয়ে থাকল ও। লেনিনের সমাধিও দেখা গেল, ব্রোঞ্জ-এর দরজার সামনে খুদে আকৃতির গার্ডরা পায়চারি করছে। স্কয়ারের শেষ মাথায় বিশাল সেন্ট ব্যাসিলস ক্যাথেড্রাল।
সব ভুলে থাকতে চাইলেও তা সম্ভব না। আর খানিক পরই মস্কোভা নদীর কিনারায় তিনজন লোকের সাথে দেখা করতে হবে ওকে। এদের কাউকেই ও চেনে না, পরিচয়ও জানা নেই। শুধু জানে জ্বাসনোখোলমস্কি ব্রিজে যেতে হবে ওকে, ওখানে তিনজন। লোক ওর জন্যে অপেক্ষা করবে। ডিনার সেরে তারপর হোটেল থেকে বেরুতে হবে ওকে। বাইরে বেরিয়ে ভাব দেখাতে হবে সে যেন একজন ট্যুরিস্ট, শহর দেখতে বেরিয়েছে, যে বা যারাই তার। পিছু নিক। শুধু একটা ব্যাপারে ওর কোন ভুল হলে চলবে না, নির্দিষ্ট জায়গায় ঠিক সাড়ে দশটায় পৌঁছুতে হবে ওকে। হ্যাট আর কোট সাথে নিতে হবে…না, শুধু সাথে নিলে চলবে না, পরে থাকতে হবে ওগুলো। ট্রানজিস্টর রেডিওটাও সাথে থাকবে। এথেকেই বোঝা যায়, হোটেলে আর ফিরে আসছে না ও। অর্থাৎ ক্সাসনোখোলমস্কি ব্রিজ থেকেই বিলিয়ারস্কের দিকে ওর যাত্রা হবে। শুরু।
দশটা বাজার কয়েক মিনিট বাকি থাকতে মস্কোভা হোটেলের বার থেকে লিরয় পামার বেরিয়ে এল। তার আগে, হোটেলের ডাইনিং হলে ডিনার সেরেছে ও। ডিনার খাওয়ার সময় তার ওপর নজর ছিল কে.জি.বি-র। ডাইনিং হলের এক কোণে একা একটা টেবিল আগে থেকেই দখল করে বসেছিল লোকটা। তেমন লম্বা না, তবে মোটাসোটা। ডিনার সেরে বার-এ এল সে, লোকটাও পিছু নিয়ে ঢুকল। লুকোচুরি নেই, প্রকাশ্যে তার ওপর নজর রাখছে, টেবিলে ভদকার গ্লাস। ডিনার খাওয়ার জন্যে নিচে নামার সাথে সাথে কে.জি.বি এজেন্টরা সার্চ করার জন্যে তার কামরায় ঢুকবে, ধরে নিয়েছিল রানা। সুযোগ পেলে ওর বডি সার্চ করতেও ছাড়বে না। ডিনারের সময় ওভারকোটটা খুলে রাখতে হয়েছে, কিন্তু এমন জায়গায় রেখেছিল বসার জায়গা থেকে দেখতে পাচ্ছিল পরিষ্কার। ওটার ধারেকাছেও যায়নি কেউ। ছোট্ট রেডিওটা ওভারকোটের পকেটেই রেখেছে ও।
ডিনারের সময় শহরের ম্যাপ আর একটা গাইড বুকে চোখ বুলিয়ে নিয়েছে রানা। কোলের ওপর ফেলে ভাজ খুলেছিল ম্যাপের, মোটাসোটা লোকটা দেখতে পায়নি। বার-এ ঘণ্টাখানেক ছিল, ওখানে বসেও আরেকবার দেখে নিয়েছে ম্যাপ আর গাইড বুক। বার থেকে বেরুল ও, সাথে সাথে টিকটিকিও পিছু নিল।
হোটেলের পোর্টিকো থেকে ধাপ বেয়ে রেড স্কয়ারে নামল রানা। ফয়েই-এ দাঁড়িয়ে গ্যাস লাইটার জ্বেলে একটা সিগারেট ধরাল লোকটা। সঙ্কেতটা দেখল না রানা, কিন্তু রাস্তার উল্টোদিকে পার্ক করা বিরাট একটা গাড়ি থেকে কালো একটা মূর্তিকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেল। কালো সিডানটাকে কোথাও দেখা গেল না। রাস্তার ওপরে মাত্র একজন লোক। ধাপ বেয়ে নেমে আসছে মোটু।
দুজন।
গাড়িটার হেডলাইট জ্বলল, চিরে দিল কালো অন্ধকার। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে আরও উজ্জ্বল হলো জোড়া আলো। একটু ভয় পেল রানা, হোটেল ছেড়ে যাচ্ছে দেখে ওকে গ্রেফতার করা হবে না তো!
কয়েক গজ এগিয়ে ইচ্ছে করেই থামল রানা। এদিক ওদিক তাকাল, যেন কোন দিকে যাবে ঠিক করতে চাইছে। ঝড়ো। হাওয়ায় হ্যাটটা বার বার উড়ে যেতে চায়, দাড়িয়ে থেকে সেটাকে। ভাল করে বসাল মাথায়। ওভারকোটের কলার তুলে ঘাড় ঢাকল। কিন্তু না, ওর কাছাকাছি এল না কেউ।
মানেঝনায়া স্কয়ার থেকে রেড স্কয়ার প্রপারে বেরিয়ে এসে। বাঁহাতি পেভমেন্টটা বেছে নিল রানা। জি.ইউ.এম-এর সামনেটা ওর চলার পথেই পড়বে। স্কয়ারে প্রচুর লোকজন, লেনিনের সমাধি দেখার জন্যে এত রাতেও কিছু লোক লাইন দিয়ে। এগোচ্ছে। হাতে সময় নেই, তা না হলে সত্যিই শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ত ও। রাস্তার দুধারেই ঝলমলে দোকান-পাট, কাচ-ঘেরা জানালার সামনে খদ্দেরদের ভিড়। রাশিয়ানরা নির্লিপ্ত আর ঠাণ্ডা, নিয়নের সাদা আলোয় আরও বেশি নিশ্রুভ আর নিস্তেজ দেখাল ওদের। ক্যুনিজম কি ওদেরকে বড়। বেশি বাস্তববাদী করে তুলেছে, কেড়ে নিয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণচাঞ্চল্য? কে জানে!
ফেউ দুজন কি করছে দেখার কোন চেষ্টাই করল না রানা। জানে, ওরা তাকে হারাবে না। বলা হয়েছে, কেউ যদি পিছু নেয়, খসাবার দরকার নেই। কাজেই তারা যাতে ওকে না হারায়, তার ব্যবস্থা করা দরকার। হাঁটার গতি আরও শ্লথ করল রানা। দোকানগুলোর ফ্যাশন প্রদর্শনীতে কিছু সময় কাটাল। দুমিনিটের জন্যে জি.ইউ.এম-এ ঢুকল, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এটা।
রেড স্কয়ার থেকে বেরিয়ে এল রানা। আস্তে-ধীরে হাঁটছে, যেন কোন তাড়া নেই। দূরে ক্রেমলিনের আকাশছোঁয়া টাওয়ার। দেখা গেল। মস্কোভা নদীর কাছে পৌঁছুবার আগেই ঠাণ্ডায় হি হি। করতে শুরু করল ও। মস্কোভোরেতস্কি ব্রিজে উঠে মাথা নিচু করে। রাখল, বাতাসের চাপে যাতে খুলির সাথে সেঁটে থাকে হ্যাট। খুলে ওটা হাতে নেয়া চলবে না-ও কোথায়, হ্যাট দেখে জানতে পারছে টিকটিকিরা। হাত দুটো ওর কজি পর্যন্ত ওভারকোটের পকেটে ঢোকানো।
রোড ব্রিজের কিনারায় চলে এল রানা। প্যারাপেটের ওপর দিয়ে ঝুঁকে নিচে তাকাল। কালচে পানিতে স্ট্রীট ল্যাম্পের আলো পড়েছে, অনবরত ছোবল দিয়ে নদীর গা ফেনায় সাদা করে তুলছে বাতাস।
রানার পিছন দিকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে পড়ল। অল্প কয়েকজন লোক ব্রিজে, হয় বাতাসের ধাক্কায় নয়তো টানে। এগোচ্ছে। সচল ছায়াদের মধ্যে থেকে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে পড়লে নজর কাড়বেই।
ঘুরে দাঁড়াল রানা, প্যারাপেটের দিকে পিছন ফিরল। কলারটা ঘাড়ের ওপর ভাল করে বসিয়ে নেয়ার ফাঁকে ব্রিজের ওপর রাস্তাটুকু জরিপ করল। গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়েছে, হেডলাইট নেভানো,
ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হলো না। স্ট্রীট ল্যাম্প থেকে যতটা দূরে সম্ভব পার্ক করা হয়েছে ওটাকে। রাস্তার উল্টো দিকে, রানার দিকে পিছন ফিরে একজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে, ঝুঁকে পড়ে নদী দেখছে সে।
আবার হাঁটা ধরল রানা। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও। ভাবল, একটা অস্ত্র থাকলে কি ভাল হত, নাকি বিপদ বাড়ত তাতে? মন খুঁত খুঁত করার একটাই কারণ, ক্সাসনোখোলমস্কি ব্রিজে পৌঁছুবার পর কি ঘটবে ও জানে না।
মস্কোভা নদীর পাশ ঘেঁষে এগিয়েছে ড্রেনেজ ক্যানেল। সেটা পেরিয়ে ওযারকোভস্কায়া কোয়েতে উঠে এল রানা। তারপর পাথুরে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে বাঁধের ওপর নেমে এল। বাঁধ ধরে হাঁটছে, পিছনে পায়ের আওয়াজ পেল। শান্ত, দৃঢ় পদক্ষেপ, সিড়ি বেয়ে নেমে আসছে।
গাড়ি আর তার আরোহীর কথা ভাবল রানা। সংখ্যায় ওরা কজন জানার জন্যে এখন আর ফিরে যেতে পারে না ও। তিনজন। আছে বলে জানে, চারজন হওয়াও বিচিত্র নয়। আর গাড়িটা নিশ্চই ও্যারকোভস্কায়া কোয়ের ওপর দিয়ে আসবে, আবার কখন। রাস্তায় উঠবে ও সেই অপেক্ষায় থাকবে ড্রাইভার।
উসতিনস্কি ব্রিজ পেরিয়ে এসে হাতঘড়ি দেখল রানা। দশটা বিশ। পরের ব্রিজটাই ক্লাসনোখোলমস্কি, পৌঁছুতে দশ মিনিটের বেশি লাগবে না ওর। ওখানেই ওর সাথে দেখা হবে…কাদের?
ব্রিজের ঘন কালো ছায়ায় ভৌতিক একটা নিস্তব্ধতা। সাদোভিশিস্কায়া বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ও, এক-আধটা দম্পতি ছাড়া গোটা বা খালি। একটা তরুণ দম্পতি বা হয়তো। প্রেমিক-প্রেমিকা, বাঁধের ও-পাশ ঘেঁষে এদিকেই এগিয়ে আসছে। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আছে দুজন, থেমে থেমে পা ফেলছে, একজন আরেকজনের গালে গাল, ঠোঁট, কপাল ঘষছে-আর কোনদিকে কোন খেয়াল নেই তাদের। দৃশ্যটা চোখে পড়ার পর অন্তত পাঁচ সেকেন্ড বিপদের কথা ভুলে থাকল রানা। ওর মনে। হলো প্রেমের চেহারা সবখানে এক, কোথাও বদলায় না।
এগোল রানা। তরুণ-তরুণীকে পাশ কাটাবার সময় ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ওদের, মেয়েটার কানে ফিসফিস করছে ছেলেটা, চোখ বুজে হাসছে মেয়ে। রানার অস্তিত্ব সম্পর্কে ওরা কেউ বোধহয় কিছু জানতেই পারল না। অত্যন্ত সাবধানে এগোচ্ছে। রানা, প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে। পিছনে পায়ের আওয়াজ এখনও। পাচ্ছে ও, বাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাকর আর নুড়ি পাথরের। ওপর জুতো ঘষে এগিয়ে আসছে লোকটা। তরুণ-তরুণীর পায়ের আওয়াজ একটু পরই মিলিয়ে গেল। তারপরই আরও একজোড়া পায়ের শব্দ পেল রানা। তিন জোড়া পা। দ্রুত এগিয়ে আসছে।
ইচ্ছে হলো দৌড় দেয়। মনে হলো ওরা বোধহয় ব্রিজে উঠতে দেবে না ওকে। এখন যদি ওকে গ্রেফতার করা হয়, লোকগুলোর সাথে দেখা হবে না ওর।
ওই সামনে ব্রিজে ওঠার সিঁড়ি। শান্ত ভাবেই ধাপগুলো টপকে ক্সাসনোখোলমস্কি ব্রিজে উঠে এল ও। ক্যানেল পেরিয়ে মস্কোভার সরু বাধে নামার জন্যে আবার এক প্রস্থ সিঁড়ির ধাপ ভাঙল। নদীর এটা দক্ষিণ দিক। ওপারে কোটেলনিচেস্কায়া কোয়ে, সার সার আলো জ্বলছে। মাঝখানে কালো নদীতে সাদা ফেনা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পর পিছনে কোন আওয়াজ নেই। কিন্তু ওপরের ব্রিজ থেকে ইঞ্জিনের ভোতা আওয়াজ পেল ও। আবার হাতঘড়ি দেখল। দশটা ত্রিশ।
খুব সাবধানে পা ফেলে আসছে ওরা। রানা এখানে দাঁড়িয়ে পড়ায় কিছু একটা ঘটবে বলে সন্দেহ করেছে হয়তো। দুজোড়া পায়ের আওয়াজ সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। এক জোড়া দাঁড়িয়ে পড়ল।
ব্রিজের নিচে অন্ধকার, সেদিকে তাকাল রানা। ছায়া থেকে কোন মূর্তি বেরিয়ে এল না। পিছন ফিরল ও, বাঁধ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল আবার।
কেউ যদি না আসে? হোটেলে ফিরে যাবে আবার? কিন্তু হোটেলে যদি কেউ ওর সাথে যোগাযোগ না করে? একাই বিলিয়ারস্কের দিকে রওনা হয়ে যাবে ও? প্রশ্নই ওঠে না।
কে.জি.বি. দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে, প্রজেক্ট এরিয়ায় ঢোকা যাবে না। তার আগেই, শহরে ঢোকা মাত্র অ্যারেস্ট হয়ে যাবে ও, কিংবা গুলি খেয়ে খুন হয়ে যাবে।
গোরোভস্কায়া কোয়ে থেকে আরেক প্রস্থ সিঁড়ি নেমে এসেছে। বাধের ওপর। কাছাকাছি চলে এসেছে রানা, এই সময় সিঁড়ির গোড়া থেকে তিনটে ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসে ওর দিকে এগোল। কারা ওরা? কে.জি.বি. নয় তো? দাঁড়িয়ে পড়বে কিনা ভাবছে রানা, ওদের একজন ইংরেজিতে জানতে চাইল, মি. পামার?
হ্যাঁ।
তিনজন লোক ঘিরে ফেলল রানাকে, ওর মুখের ওপর চোখ ধাধানো আলো পড়ল টর্চের। ইংলিশ কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল, হ্যাঁ, ইনিই।
রানা ভাবল, এর মানে কি পিটি ডাভ হিসেবে মেনে নিল আমাকে? উতরে গেলাম আমি?
তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে যে লম্বা, বয়সে তরুণ, চৌকো মুখ, সোনালি চুল, সে-ই কথাবার্তা শুরু করল। ওরা কজন আপনার পিছু নিয়েছে? ইংরেজিতে বলল, তবে উচ্চারণ-ভঙ্গি রাশিয়ান।
রুশ ভাষায় উত্তর দিল রানা, একটু ঝালিয়ে নিতে চাইছে। পায়ে হেঁটে, সম্ভবত তিনজন। আর একটা গাড়ি। সেটা এখন। ব্রিজের ওপর।
গুড, রাশিয়ান লোকটা বলল। প্রথম লোকটাকে লক্ষ করছে। রানা। এ একজন ইংরেজ, সম্ভবত ব্রিটিশ এমব্যাসির সিকিউরিটি
স্টাফ। জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স আর সি.আই.এ.কে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসও সাহায্য করছে, সে আভাস ও আগেই পেয়েছে। অন্তত একটা প্রমাণও পেয়েছে ও। স্মাগলার লিরয় পামার একজন। ব্রিটিশ। পিটির কাভার তৈরি করার জন্যে ব্রিটিশদের কাছ থেকেই। পামারকে ধার করেছে ইসরায়েলিরা। কিন্তু এই লোকটার কাজ কি এখানে? এ-ই কি ওকে বিলিয়ারস্কে নিয়ে যাবে? একজন ইংরেজ? অসম্ভব! তাহলে?
রানা লক্ষ করল, ওর মতই বয়স হবে লোকটার। একই গড়ন, একই চোখের রঙ, দৈর্ঘ্য-প্রস্থেও কোন অমিল নেই। এমনকি দুজনে একই পোশাক পরে আছে। কেন যেন গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল রানার। মন বলছে, ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, যেন উৎসাহ দিতে চাইল ওকে। উত্তরে জোর করে রানাও হাসল একটু।
কি করছে ওরা, জসেস্কু? রানার ওপর চোখ রেখে ইংরেজ লোকটা জিজ্ঞেস করল।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল একজন, সে এখন গাড়ির কাছে ফিরে যাচ্ছে। মোটা লোকটা ইতস্তত করছে, ভেবে পাচ্ছে না কি করবে-কারণ এখানে আমরা চারজন রয়েছি। রাশিয়ান জসেস্কু হেসে উঠল। ব্যাটা ভয় পেয়েছে।
তারমানে আরও লোকজন আসবে ওদের। চলো, মি. পামারকে নিয়ে কেটে পড়া যাক।
চারজন ওরা দাঁড়িয়ে আছে গায়ে গা ঠেকিয়ে, ছোট্ট একটা বৃত্ত রচনা করে। যে-কোন পরিস্থিতির জন্যে তৈরি হয়ে আছে। রানা। হঠাৎ পালাতে হতে পারে। ঠেকাতে হতে পারে আকস্মিক হামলা। ইংরেজ লোকটা ওর ডান দিকে, দুজনের ওভারকোট একই রঙ আর কাপড়ের, পরস্পরের সাথে চেপে রয়েছে। রাশিয়ান ইহুদি জসেস্কু তার কালো ওভারকোটের ভেতর থেকে। মোটা একটা কাঠের ভারী মুগুর বের করল।
এত থাকতে মুগুর! শরীরের পেশী লোহা হয়ে গেল রানার।
ইংরেজ লোকটার নাম ন্যাট ফরহ্যান্স। গত দুবছর ধরে বার কয়েক রাশিয়ায় আসার সময় যে পাসপোর্টটা ব্যবহার করেছে সে তাতে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে লিরয় পামার। এই শেষবার রাশিয়ায় ঢুকেছে সে, এবার ব্যবহার করেছে আরেক নামে অন্য একটা পাসপোর্ট। প্রথমে অবিশ্বাস আর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ন্যাট ফরহ্যান্স। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল কপাল থেকে। সোনালি চুল জসেস্কু কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল রানাকে, একই সাথে আবার ফরহ্যান্সের কপালে ঘা মারল মুগুরের।
ওদের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ফরহ্যান্স। ভোতা গোঙানির আওয়াজ বেরুচ্ছে গলা থেকে। তার মাথার কাছে বসে। পড়ল জসেস্কু, ঘন ঘন মুগুর তুলল আর ফরহ্যান্সের মুখের ওপর নামাল। থ্যাচ থ্যাচ করে শব্দ হতে লাগল।
ঘেমে গেছে রানা। বুঝতে পারছে, ইংরেজের চেহারা বিগড়ে দিচ্ছে জসেস্কু, কেউ যাতে চিনতে না পারে।
হুইসেলের আওয়াজ। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কে.জি.বি. এজেন্ট তার সঙ্গী-সাথীদের সাহায্য চাইছে।
আপনার কাগজ-পত্র-জলদি! চাপা গলায় দ্রুত বলল জসেস্কু। লাশের দিকে ঝুঁকে রয়েছে সে। দেরি করলে সবাই মারা পড়ব!
ব্রেস্ট পকেট থেকে জসেস্কুর হাতে তিনটে কাগজ ধরিয়ে দিল রানা। পাসপোর্ট, মুভমেন্ট ভিসা, সোভিয়েত দূতাবাস থেকে দেয়া আইডেনটিফিকেশন। এখনও একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে রানা। জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স, ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস আর সি.আই.এ-র এই আকস্মিক নিষ্ঠুরতা ওকে হতভম্ব করে দিয়েছে। লোকটাকে দিয়ে দুবছর ধরে নিজেদের একটা কাজ করিয়ে নিয়েছে ওরা, দুবছর আগে কাজে লাগাবার সময়ই ওকে এভাবে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। লোকটা কে, কি তার পরিচয়, কিছুই জানে না ও। হয়তো মৃত্যুদণ্ড পাবার মত কোন অপরাধ করেছিল, তবু লোকটার জন্যে দুঃখ বোধ করল রানা। বেচারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টের পায়নি এভাবে তাকে মেরে ফেলা হবে।
সম্মোহিতের মত ওদের কাজ দেখছে রানা। ওর কাগজ-পত্র। সব লাশের ওভারকোটের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। তৃতীয় লোকটা ছো দিয়ে রানার মাথা থেকে তুলে নিল হ্যাটটা। জসেস্কু লাশের ওভারকোটের পকেট থেকে আগেই পাসপোর্ট ভিসা ইত্যাদি বের করে নিয়েছে। ওরা দুজন ধরাধরি করে লাশটাকে। বাঁধের কিনারায় নিয়ে এল। শূন্যে তোলা হলো মৃতদেহ, তারপর কয়েকবার দোলা দিয়ে ছুঁড়ে দেয়া হলো পানিতে। বাঁধের কিনারা থেকে কয়েক গজ দূরে ঝপাৎ করে পড়ল সেটা। সাথে সাথে ডুবে গেল, কিন্তু একটু পর ভেসে উঠল আবার, ওভারকোটটা বেটপভাবে ফুলে আছে, স্রোতের টানে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে।
জলদি! রানার কনুই ধরে হ্যাঁচকা টান দিল জসেস্কু। আমাদের সাথে আসুন। পাভোলেতস মেট্রো স্টেশনে যেতে হবে।
এক সাথে কয়েকটা হুইসেলের আওয়াজ শোনা গেল। মোটা কে.জি.বি. এজেন্ট ওদের কাছ থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে। ঘাড় ফিরিয়ে একবার নদীর দিকে তাকাল রানা, তারপর ছুটল। জসেস্কু আর অপর লোকটা ওকে ফেলে পনেরো বিশ গজ এগিয়ে গেছে এরইমধ্যে।
ওদের পিছু নিয়ে এক প্রস্থ সিঁড়ি ভাঙল রানা, উঠে এল গোরোভস্কায়া কোয়েতে। পিছনে হুইসেলের আওয়াজ দ্রুত কাছে চলে আসছে। বার বার ঘাড় ফিরিয়ে ওকে দেখে নিচ্ছে জসেস্কু, আধো অন্ধকারে সাদা ঝলকের মত তার দাঁত দেখতে পাচ্ছে রানা। ঘন ঘন তাগাদা দিচ্ছে লোকটা, আরও জোরে ছুটুন, আরও জোরে!
লাশটা বাঁধের ওপর তুলতে গলদঘর্ম হয়ে উঠল ওরা চারজন। ওদের বয়স কম, কিন্তু চারজনই মোটাসোটা। এইটুকু পরিশ্রমে রীতিমত হাঁপাতে লাগল সবাই। সবচেয়ে মোটা লোকটাই ওদের লীডার, সে-ই লাশের পকেট থেকে কাগজ-পত্র বের করল। টর্চের আলোয় সেগুলোর ওপর অনেকক্ষণ ধরে চোখ বুলাল সে, তারপর আলো ফেলল লাশের মুখে। হুম, বলল সে। এব্যাপারে সেন্টারকে আমি আগেই সাবধান করে দিয়েছিলাম। তার গলার সুরে অসন্তুষ্টির ভাব। চেরেমেতেইভোয় ওর কাছে। কোন ড্রাগস পাওয়া যায়নি। যে-কোন কারণেই হোক, চাহিদা। মেটাতে পারেনি সে। তাই ওরা তাকে খুন করেছে, লুদভিক। বন্ধুদের হাতেই খুন হয়েছে স্মাগলার পামার।
<