কী ব্যাপার, রানা, দেখে মনে হচ্ছে বড় একটা ঝাঁকি খেয়েছ? হাসল লোবু, তার সাদা চোখটা বিস্ফারিত আর অপলক। হাতের ম্যাগনাম রানার বুক বরাবর তাক করা, আঙুলটা ট্রিগার গার্ডে শক্তভাবে সেঁটে আছে।
হ্যাঁ, একটু তো অবাক হয়েইছি। রানাও সপ্রতিভ একটা ভঙ্গি করে হাসল, তারপর এক পা সরে দাঁড়াল-চোখে যাতে রোদ না লাগে।
নবুয়াং লোবু সঙ্গে সঙ্গে নড়ে উঠল। তার তর্জনী ট্রিগার গার্ড থেকে সরে ট্রিগারকে পেঁচিয়ে ধরল। ওটায় আর এক চুল চাপ পড়লেই মাসুদ রানার ইহজীবন বলে কিছু থাকবে না। এ কাজ আর কোরো না, রানা, পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল সে, দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে। আমি খুব নার্ভাস হয়ে পড়ি। আর আমি নার্ভাস হলে জঘন্য সব কাণ্ড ঘটে যায়।
কথা বলছে না, রানার চোখ স্থির হয়ে আছে অস্ত্রটার উপর।
রূপ আর যৌবনের একটা লোভনীয় প্যাকেজ মেয়েটা, তাই না? হেসে উঠল লোবু। সময়টা তুমি বেশ এনজয় করেছ, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
নন্দিনী কোথায়?
মিস অপরূপা? নিঃসঙ্গ চোখটা সরু করল লোবু, মানাহা সমাধির দিকে একবার তাকাল। সে খুব ভালো জায়গায় আছে, সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে তুমি যদি আবার তাকে দেখতে চাও, রানা, ফিল্মটা আমার হাতে তুলে দিতে হবে। ব্যাপারটা এরকমই জলবৎ তরলং।
তা হলে এই বেজন্মাটাই, ভাবল রানা, সেই হংকং থেকে ওর স্নায়ুর উপর কামড় বসাচ্ছে। অবিশ্বাস্যই বলতে হবে যে চতুর্থ ব্যক্তি একজন বার্মিজ।
কী হলো, ধমকে উঠল লবুয়াং লোবু। ফিল্মটা দাও, রানা।
মাইক্রোফিল্মটা হাতে পাবার জন্য এত বেশি উতলা হয়ে উঠেছে লোকটা, রানার পিস্তলটার কথা মনেই নেই-হোলস্টার থেকে বেরিয়ে আছে অর্ধেকটা।
হাত দুটো শরীরের দুপাশে ঝুলিয়ে রেখেছে রানা, অপেক্ষায় আছে কখন তার চোখ বা মন ঘুরে যায়।
ফিল্মটা আমার সঙ্গে নেই, বলল ও, ঠাণ্ডা আর নিরাসক্ত দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল।
তুমি মিথ্যেকথা বলছ।
না, এটাই সত্যি। গেস্ট হাউসে রেখে এসেছি। বুঝতেই পারছ, নিরাপদ জায়গায় লুকানো আছে। ঠিক নন্দিনীর মত।
তুমি অযথা দেরি করছ, বলল লোবু। আমি যদি সার্চ করতে। গেস্ট হাউসে যাই, এখানে তোমাকে মেরে রেখে যাব।
আমি তোমাকে ফিল্মটা দিলাম, তারপর? নন্দিনীর কী হবে? জিজ্ঞেস করল রানা, চিন্তা করার জন্য সময় পেতে চাইছে ও।
তোমাকে তো বললামই, মিস অপরূপা এখনও বেঁচে আছে। আবার তুমি তাকে দেখতে পাবে, আশ্বাস দিচ্ছি।
কিন্তু আমাকে প্রথমে জানতে হবে মিন ভাই আর তাদের ম্যানেজারের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে সে।
লোবু কিছু বলল না, এমনকী তার কোন প্রতিক্রিয়াও হলো না।
তুমি তা হলে ফিল্মটা চাও? হাল ছেড়ে দেওয়ার সুরে জানতে চাইল রানা।
তুমি অযথা সময় নষ্ট করছ, রানা, জবাব দিল লোবু, কোথায় সেটা বলবে, নাকি প্রথমে পেটে একটা গুলি করে ইন্টারোগেট শুরু করব?
মাথা নাড়ল রানা। না, আমি চাই না সেরকম কিছু ঘটুক। এমন একটা সুন্দর দিনে রক্তপাত ভালো দেখাবে না।
লোবু হাসল না বা ভুরু কেঁাচকাল না। তার হাতের অস্ত্র একচুল কাঁপছে না। ট্রিগার পেঁচানো আঙুলটা একটু নড়লেই রানার মধ্যভাগে একটা গর্ত তৈরি হবে। চিন্তাটা মোটেও স্বস্তিকর নয়।
ফিল্মটা পেলে তুমি আমাকে জানাবে নন্দিনী কোথায় আছে? ওয়াদা?
ওয়াদা।
অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল রানা। উপায় কী, তুমি যখন আমাকে পিস্তলের মুখে পেয়ে গেছ। সামনে ঝুঁকে বাম জুতোর দিকে হাত বাড়াল ও। গোড়ালিটা ফাঁপা, জানিয়ে রাখল, অকারণে যাতে নার্ভাস না হয়। ভান করছে জুতোটা খুলতে খুব ঝামেলা হচ্ছে। ওর দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে লোবু। তার মুখ থমথম করছে, কী ভাবছে বোঝা যাচ্ছে না।
জুতোটা শেষ পর্যন্ত খুলল না রানা। হঠাৎ এক মুঠো ধুলো তুলে নিয়ে লোকটার চোখে ছুঁড়ে মারল। মুহূর্তের জন্য অন্ধ, তবে। ট্রিগার টানতে ইতস্তত করল না সে। গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। সামনে এগিয়ে ধাক্কা দেওয়ার জন্য হাত ছুঁড়ল রানা, লোবু যাতে। ভারসাম্য হারায়। কিন্তু পাহাড়ী ছাগলের মত চঞ্চল সে, ঝট করে সরে গেছে বাড়ানো হাতে শুধু বাতাস অনুভব করল রানা। আবার। গুলি হবে, ধরে নিয়ে গুলির সম্ভাব্য পথ থেকে সরে এল ও, তারপর ডাইভ দিয়ে পড়ল জিপটার আরেক দিকে।
দ্বিতীয় গুলি হলো। রানার কাছ থেকে আধ হাত দূরে খানিকটা ধুলো উড়ল। ক্রল করে গাড়ির তলায় চলে এল ও।
ওখান থেকে লোবুর পা দেখতে পাচ্ছে রানা। কাল তাকে রানা খালি পায়ে দেখলেও এখন জুতো পরে আছে। পুরানো লেদার শ্য। আর ঢোলা ট্রাউজার দ্রুত পিছু হটল। হোলস্টার থেকে ওয়ালথারটা টেনে নিল রানা, খানিক আগে লোবু ওকে নিরস্ত্র না করায় ভাগ্যের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু পিস্তলের সাইট যখন টার্গেটের। লেভেলে নিয়ে এল, দেখল জুতো আর ঢোলা ট্রাউজার ওর দৃষ্টি। পথে নেই।
জিপের নীচে শরীরটা ঘোরাল রানা। পরিত্যক্ত সমাধি সৌধের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে, একটা সিংহের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে। লোবু, ওখান থেকে হাত লম্বা করে সাবধানে গুলি করল আরেকটা। রানা বুঝল, নিজের গাড়ির টায়ার ফাটাতে চায় না লোকটা-তা হলে হেঁটে ফিরতে হবে।
পিছিয়ে এল রানা। গায়ে রোদ নিয়ে সিধে হলো। কাছাকাছি ফেন্ডারের পিছনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল, জিপটা যথেষ্ট আড়াল দিচ্ছে।
বুড়ো সিংহের পাশ থেকে আবার গর্জে উঠল ম্যাগনাম। জিপের মরচে ধরা হুড়ে বিকট আওয়াজ করল বুলেটটা।
ম্যাগনামের ফ্ল্যাশ দেখামাত্র ট্রিগার টেনে দিয়েছে রানাও। প্রাজ্ঞ সিংহ একটা কান হারাল। চমকে উঠে মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গেল ওর প্রতিপক্ষ, পরক্ষণে আরেকটা গুলি।
কিন্তু ইতিমধ্যে মাথা নিচু করে ছুটতে শুরু করেছে রানা, লোবু টার্গেট প্র্যাকটিসে উন্নতি করার আগেই মূর্তিটার কাছে পৌঁছাতে চায়।
ম্যাগনাম পলকের জন্য একবার ঝিক্ করে উঠল, পরক্ষণে শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ। দ্বিতীয় সিংহের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে রানা, তবে তার বুলেট ক্ষতি যা করার করে ফেলেছে। ব্যথাটা আগুনে পোড়ার মত। ওর কাঁধের মাংসে খাজ কেটেছে বুলেট। নিশ্চয়ই শার্ট ছিড়ে বেরিয়ে গেছে। টার্গেট প্র্যাকটিসে লোকটা আরও ভালো করতে পারে, এই ভয়ে বসে পড়েছে রানা, হেঁড়া আর ধুলো মাখা ব্লেজারটা খুলে ফেলছে।
শার্টের আস্তিন রক্তে ভিজে জবজব করছে। টেনে খানিকটা ছিড়ে ফেলতে ম্যাগনামের তৈরি গভীর ক্ষতটা দেখতে পেল। ভাগ্যটা নেহাতই ভালো যে শুধু বাইরের দিকের পেশিতে ক্ষতি হয়েছে। তবে এরই মধ্যে অবশ হয়ে এসেছে হাতটা। আর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পারলে লবুয়াং লোবুকে ধরা বা নন্দিনীকে সাহায্য করা সম্ভব হবে না।
ছেঁড়া আস্তিন দিয়ে ক্ষতটা আঁটো করে বেঁধে ফেলল রানা। রক্ত পড়া বন্ধ হলো।
সমাধির ভিতরে গা ঢাকা দিয়েছে লোবু। ছায়া ঢাকা প্রবেশপথে চোখ বুলাচ্ছে রানা। ম্যাগনাম বা নষ্ট চোখটা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কাজেই রানার সামনে আর কোন বিকল্প পথ। খোলা নেই—সে নন্দিনীর কাছে পৌছানোর আগেই তাকে ধরতে হবে ওর। আর যদি এরই মধ্যে নন্দিনীর কাছে পৌঁছে গিয়ে থাকে। লোবু? সেক্ষেত্রে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে হবে ওকে, তা না হলে। ঘাড়ে একটা হত্যা আর লাশের দায় চাপবে।
চিন্তাটা সুখকর নয়।
সমাধিতে ঢুকতে হলে আড়াল থেকে বেরুতে হবে রানাকে। প্রবেশ পথের আড়ালে কোথাও লোকটা যদি লুকিয়ে থাকে, দ্বিতীয়। গুলিটা নির্ঘাত বুকে বা মাথায় খাবে ও।
পায়ের কাছ থেকে মুঠো আকৃতির একটা পাথর তুলে সমাধির দিকে ছুঁড়ল রানা। জমিনে পড়ে ভোতা আওয়াজ তুলল পাথরটা। চমকে উঠে সেদিকে কেউ গুলি করল না। রানা সিদ্ধান্ত নিল,। সমাধির ভিতর ঢুকবে। যতই ঝুঁকি থাক, অন্তত চেষ্টা করে দেখতে হবে নন্দিনীকে বাঁচানো যায় কিনা।
ছুটল রানা। ফাঁকা জায়গাটা দ্রুত পেরিয়ে আসছে, কিন্তু কোন গুলি হচ্ছে না। প্রবেশ পথে পৌছাচ্ছে, এই সময় ওর অনেক উপর থেকে ভেসে এল বিস্ফোরণের শব্দটা, দালানটার ভিতর দিক। থেকে। সৌধের সামনের দিকটায় অসংখ্য ঝুল-বারান্দা আর পোর্টিকো আছে, সেগুলোর যে-কোন একটায় থাকতে পারে লোবু।
মানাহা সমাধির ভিতরে ঢোকার পথ হলো সরু কয়েকটা প্যাসেজ। কিছুদূর পরপর দেয়ালের গায়ে তাক আছে, সে-সব তাকে বসে আছে বুদ্ধমূর্তি। এরকম একটা মাটির তৈরি বুদ্ধমূর্তিতে সম্প্রতি রঙ চড়ানো হয়েছে-ঠোঁট জোড়া টকটকে লাল, কয়লার মত কালো চোখ। মূর্তিটা লক্ষ করছে ওকে, যেন দেখতে চায় কোন্ প্যাসেজ ধরে এগোবে ও।
ডান দিকের একটা প্যাসেজ ধরে ভিতরে ঢুকল রানা, হাতে। বাগিয়ে ধরা পিস্তল। দেয়াল ঘেঁষে সাবধানে এগোচ্ছে। নয়শো বছরের পুরানো মনুমেন্টে লুকাবার জায়গার কোন অভাব নেই। কিন্তু ঘোলা চোখ নিয়ে লোবুকে কোথাও থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে না।
একটা পাথুরে সিঁড়ির গোড়ায় এসে পৌছাল রানা। ধাপ বেয়ে সমাধির দ্বিতীয় স্তরে উঠছে। ওগুলো একেকটা একেক রকম। কিছু ধাপ ঢালু, কিছু খাড়া, কোনটা আবার পায়ের চাপে নড়ে উঠল। উপর দিকে তাকাতে মাকড়সার জাল দেখতে পেল রানা, একপাশে সরানো।
এই সিঁড়ি বেয়ে কেউ একজন উপরে উঠেছে। আরও সাবধান হয়ে গেল রানা। ওর কোন ধারণা নেই সিঁড়িটার মাথায় ওঠার পর কী দেখতে পাবে।
সূর্যটা হঠাৎ করে দৃষ্টিপথে চলে এল। মানাহার পাশে জানালার মত আংশিক বৃত্তাকার একটা ফাঁক। এখন রানা ধাপের উপর ধুলোর কার্পেটে পরিষ্কার পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছে, উঠে গেছে উপর দিকে। সাবধানে, প্রতিবার একটা করে ধাপ বেয়ে উঠছে রানা।
তারপর নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করে দিল লোবু। এবার রানা প্রতিবার দুটো করে ধাপ টপকাচ্ছে। ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনি তুলছে। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে ঝট করে মাথাটা নিচু করে নিল ও। ট্রাউজারের ঢোলা একটা পায়া এক পলকের জন্য দেখতে পেয়েছে।
এখন রানা জানে নন্দিনীর কাছে পৌছায়নি লোবু, কাজেই ধুলোয় ভরা করিডর ধরে তার পিছু নিয়ে ছুটল এবার। সামনে একটা বাঁক। ঘোরার সময় সাবধান হলো রানা, তবে কিছুই ঘটল না। তারপর সামনে পড়ল আরও এক প্রস্থ পড়ো পড়ো সিঁড়ি।
মানাহা সমাধির তৃতীয় স্তরে উঠে এল রানা। এখান থেকে অসংখ্য ঝুল-বারান্দায় যাওয়া যায়। ও যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ছয় ইঞ্চি সামনে বিস্ফোরিত হলো ধুলো। ভেঙে গুঁড়ো হওয়া পাথরের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
আঁতকে উঠে পিছিয়ে সিঁড়িতে ফিরে আসতে হলো রানাকে, চোখ দুটো হন্যে হয়ে খুঁজছে লোবুকে। হয়তো ঝুল-বারান্দার। একটা থেকে আরেকটায় যাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ওকে ঘিরে ঘুরছে সে, ভাবছে পিঠে একটা মাত্র গুলি করে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেবে ওকে।
সেটা যাতে না ঘটে, অকস্মাৎ আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ছুটল রানা, প্রায় উড়ে চলে এল সবচেয়ে কাছের একটা টেরেসে।
এখানে রোদ আছে, পাথুরে রেইলিং-এর পর বহুদূর পর্যন্ত। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ আর ধানখেত। আরও দূরে চকচক করছে। রূপালি ফিতের মত ইরাবতী।
ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে লোবুকে খুঁজল রানা। ঝুল-বারান্দাটা খালি। বাতাস সমস্ত ধুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে, কাজেই ছাপ দেখে। দিক নির্দেশনা পাবার কোন উপায় নেই।
লোবু! ডাকল রানা। এসো একটা রফা করি। আমি শুধু মেয়েটাকে চাই। নন্দিনী কোথায় আছে বলো, ফিল্মটা আমি। তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।
লোবুর আওয়াজ ভেসে এল ওর পিছন দিক থেকে, কিন্তু ঝট করে ফিরতে সেদিকে কাউকে দেখা গেল না। তুমি মিথ্যেকথা বলছ, মাসুদ রানা!
তুমি শুধু বলো নন্দিনী কোথায় আছে, ফিল্মটা সত্যি দিয়ে দেব, আবার বলল রানা। এখনও তাকে দেখতে পাচ্ছে না ও, তাই বোকার মত গুলি খাওয়ার জন্য টেরেসের মাঝখানে যেতে রাজি নয়।
জবাবে লোবু কিছু বলছে না।
বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডটা ঘনঘন লাফাচ্ছে। শোনা যায় কি যায় না, বহুদূর থেকে ঘণ্টা আর ঢোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। টকটকে লাল লেজ নিয়ে একটা পাখি এসে বসল টেরেসের রেইলিঙে; লেজটা এমন ভাবে নাড়ছে, যেন তাস শাফল করছে। তারপর আবার উড়ে গেল, বাতাস কেটে আরেকটা বুলেট রওনা হতেই। তৈরি ছিল রানা, মাজল ফ্ল্যাশ দেখামাত্র ওয়ালথারের ট্রিগার টেনে দিল।
ভারী ম্যাগনামটাকে টার্গেট করেছিল রানা। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে ওর এই বিস্ময়কর ক্ষিপ্রতা, বিদ্যুৎ-গতি রিফ্লেক্স আর নির্ভুল লক্ষ্যভেদের প্রশংসা করবে এমন কেউ ধারেকাছে নেই।
লোবুর হাত থেকে ছিটকে শূন্যে উঠল ম্যাগনাম, বাতাসে ঘূর্ণি নাচ নাচছে। একের পর এক পাথুরে দেয়ালের গায়ে বাড়ি খেল। এগিয়ে এসে লোবুর বুক লক্ষ্য করে পিস্তল ধরল রানা। তার ডান হাতের আঙুল বেয়ে টপ-টপ করে রক্ত ঝরছে প্যাসেজের মেঝেতে।
নন্দিনি কোথায়? জিজ্ঞেস করলো রানা।
যদি না বলি?
কথা আর না বাড়িয়ে দুপা এগোল রানা, হাত ধরে টেনে তাকে বের করে আনল প্যাসেজের ভিতর থেকে। রোদ লাগতে দেখা গেল মুখটা রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে আছে। এক চোখে ঘন ঘন পলক ফেলে রানাকে খুঁটিয়ে দেখছে, যেন বুঝতে চায় এরপর কী করবে ও। হঠাৎ তার দৃষ্টি ছুটে গেল এক পাশে-ফেলে আসা প্যাসেজটার দিকে।
মুহূর্তের জন্য রানাও সেদিকে একবার তাকাল। বুয়াং লোবু। ট্রেনিং পাওয়া এসপিওনাজ এজেন্ট, সুযোগ তৈরি করে হেলায় হারানোর জন্য নয়।
অকস্মাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল লোবুর শরীরে। প্রথমে ওয়ালথার। ধরা হাতের কবজিটা মুঠোয় নিয়ে প্রচণ্ড এক ঝাঁকি দিল নীচের। দিকে, ফলে বুকের বদলে পায়ের দিকে ঘুরে গেল মাজল। প্রায়। কোন বিরতি ছাড়াই ডান পায়ের ভাঁজ করা হাঁটু দিয়ে গুঁতো মারল রানার উরুসন্ধিতে।
গুঁতোটা এড়াবার জন্য লাফ দিল রানা, ফলে নিজে থেকে মুঠোটা শিথিল হয়ে যাওয়ায় ওয়ালথার খসে পড়ল পায়ের উপর। ওটা তোলার সময় বা সুযোগ কোনটাই এখন নেই রানার। ওকে। ছেড়ে দিয়ে উঁচু করা দুহাত কাজে লাগাচ্ছে লোবু-পাঞ্চ অ্যান্ড। ব্লক, পাঞ্চ অ্যান্ড ব্লক-ঘুসিগুলো প্রথমে তলপেটে ঢোকাবার চেষ্টা করছে, তারপর গলায়।
দুজনেই এখন আমরা সমান-নিরস্ত্র, বলল লাবু, শয়তানী। হাসি লেগে রয়েছে ঠোঁটে। পায়ের গোড়ালির উপর ভর দিয়ে হালকা ভঙ্গিতে ঘুরল সে, পা ছুঁড়ল কিডনিতে লাথি মারার জন্য।
এক পা সামনে এগিয়ে বাঁ হাত দিয়ে লাথিটা ঠেকাল রানা। তবে একটা লাথি মেরেই থামল না লোবু। ঝাঁকি খেয়ে পিছু হটল। সে, ডান পা দিয়ে সরাসরি সামনে আরেকটা লাথি চালাল।
সেটা রানা ঠেকাল দুহাত এক করে, একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে। তার জুতোর গোড়ালি ওর কবজিতে বাড়ি মারল, দাঁতে দাঁত ঘষে পিছিয়ে এল রানা। কাঁধের উপর কাপড়ের বাঁধনটা ঢিলে হয়ে গেছে, ক্ষতটা খুব ব্যথাও করছে এখন। বিপদের আসল চেহারা একটু পর দেখতে পাবে, আন্দাজ করতে পারছে ও। ডিফেন্সিভ বাদ দিয়ে অফেন্সিভে যেতে হবে ওকে, তা না হলে ডান হাতের মত বাঁ হাতটাও ব্যবহারের উপযোগী থাকবে না।
এক পায়ের গোড়ালিতে ভর দিল রানা, তারপর লাফ দিল সামনে। ওর ফ্লাইং কিক লোবুর চিবুকে বিস্ফোরণ ঘটাল। তার মাথা প্রচণ্ড বেগে ঝাঁকি খেল পিছন দিকে, সেই সঙ্গে পিছু হটল সে-দশ কি বারো কদম।
একটা ব্যাপার লক্ষ করেনি লোবু-ধীরে ধীরে রেইলিঙের কাছে সরে যাচ্ছে সে। এই রেইলিং টেরেসটাকে ঘিরে রেখেছে। মাথা ঝাঁকিয়ে আচ্ছন্ন ভাবটা দূর করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ, ঘুসি বাগিয়ে ছুটে এল রানা, ডান পা উঁচু হয়ে একটা ধনুকের আকৃতি তৈরি করছে। বিপদ টের পেয়ে অলস ভঙ্গিতে সরে যাবার চেষ্টা করল লোবু, কিন্তু কারাতের এই মার এড়ানোর কোন উপায় নেই তার।
রানার পা তার কপালে লাগল। পিছন দিকে, অনেকটা দূরে ছিটকে গেল লোবু, পাকা রেইলিঙের গায়ে পড়ল, ঝুলে রয়েছে।
রানা এই মুহূর্তে নির্মম। সোলার প্লেক্সাসে লাথি খেয়ে পেট খামচে ধরল লোবু। একই জায়গায় আরেকটা লাথি পড়তে ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খেতে শুরু করল। পরের লাথিটা পাঁজরে। লোবু এবার টেরেসের মেঝেতে তার ব্রেকফাস্ট উগরে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে তার গলাটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে রানা।
কে তুমি? প্রচণ্ড রাগে হিসহিস করল রানা। কাদের পা চাটছ? রেইলিঙের সঙ্গে চেপে ধরে ঝাঁকাচ্ছে ঘন ঘন।
রানার চোখে চোখ রাখল লোবু, তার মুখের নীচের দিকটা বেগুনি হয়ে ফুলে উঠেছে। এই সময় তার হাঁটু এত দ্রুত আর এমন প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে উঁচু হলো, এড়াবার কোন উপায়ই ছিল না।
দ্বিতীয়বার লোবু টার্গেট মিস করেনি। রানার উরুসন্ধি যেন। বিস্ফোরিত হলো। নিজেকে সাহায্য করতে অক্ষম, লোবুর গলা ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এল রানা, ব্যথায় কুঁজো না হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে।
মনে হলো ফুসফুসে বাতাস বলে কিছু নেই। উরুসন্ধিতে আগুনটা নিভছে না। টেরেসটা চোখের সামনে বন বন করে। ঘুরছে। তার সঙ্গে রানাও পাক খেতে শুরু করল। ওয়ালথারটা। দেখতে পাচ্ছে ও, টেরেসের আরেক প্রান্তে পড়ে রয়েছে। সেদিকে। পা বাড়িয়েছে, শিরদাঁড়ার উপর কষে একটা লাথি মারল লোবু। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ও। তবে সময় নষ্ট করছে না, পাথুরে মেঝেতে ক্রল করে এগোচ্ছে।
কিন্তু ওয়ালথারটা এখনও অনেক দূরে।
রানার পিঠে চড়াও হলো লোবু। কবজিতে আঁকি খাইয়ে বগলের নীচে থেকে ছুরিটা অক্ষত হাতের তালুতে নিয়ে এল রানা। ক্ষুরের মত ধারাল ফলায় রোদ লাগল, লোবুর হতবিহ্বল ভাবটাও প্রতিফলিত হলো। শরীরটা মোচড় খাইয়ে চিৎ হচ্ছে রানা, এই। সময় ওর কবজি ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। ইতিমধ্যে ছুরিটা চালিয়ে দিয়েছে রানা। ফলার ডগাটা নষ্ট চোখের গভীরে সেঁধিয়ে গেল।
লোবুর গলা থেকে জান্তব একটা চিৎকার বেরিয়ে এল। নিজেকে রানার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে, ফলে। ছুরির ফলা চোখের ভিতর এমনভাবে আগুপিছু করছে, ওটার যেন। নিজের প্রাণ আছে। পিচ্ছিল আশ্রয় থেকে টান দিয়ে সেটাকে বের করে নিল রানা। তার মুখের একটা পাশ তাজা রক্তে ঢাকা পড়ে গেছে। অসহ্য ব্যথায় চেঁচাচ্ছে সে।
সারা শরীর থরথর করছে, সিধে হয়ে দাঁড়াল রানা, ছুরিটা এখনও হাতে। দুর্বল লাগছে শরীরটা, মাথাটা একটু ঘুরছে, দাঁড়িয়ে আছে কোন রকমে। এখনও পিছিয়ে যাচ্ছে লোবু, এক হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে নষ্ট চোখটা।
নন্দিনী কোথায়? হাঁপাতে হাঁপতে জিজ্ঞেস করল রানা।
উত্তর না দিয়ে একটা হাত নিচু করল সে, রক্ত মাখা ট্রাউজারের পায়া তুলে কী যেন হাতড়াচ্ছে।
তারপর সিধে হয়ে রানার দিকে ছুটল সে, রোদ লাগায় এবার তার ছুরিটা ঝিক করে উঠল। কাস্তে দিয়ে বারবার ঘাস কাটার ভঙ্গি করছে বাতাসে।
একপাশে সরে তার পথ ছেড়ে দিল রানা, তারপর নিজের ছুরিটা ছুঁড়ে দিল। টেরেসের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে লোবুর পিঠে, শোল্ডার ব্লেডের মাঝখানে, ঘ্যাচ করে গেঁথে গেল সেটা। হোঁচট খেল সে, এক হাতে নিজের পিঠ খামচাচ্ছে-এখনও অপর হাতটা খালি করতে রাজি নয়।
এতটুকু ইতস্তত না করে তার পিছনে এসে দাঁড়াল রানা, ছুরির হাতল ধরে চাপ দিল-ফলাটা হাতল পর্যন্ত সেঁধিয়ে গেল।
রেইলিঙে পেট দিয়ে দাঁড়িয়েছে লোবু, দুহাতে ধরেও আছে। সেটা। হার মানতে রাজি না, পিছন দিকে পা ছুঁড়ে রানার নাগাল পাবার চেষ্টা করল সে।
তোমার সময় শেষ, হে, বলল রানা, টান দিয়ে বের করে নিল ছুরিটা। তারপর লোবুর একটা পা ধরে প্রথমে উঁচু করল, তারপর সামনের দিকে ঠেলে দিল।
এই ছিল, এই নেই।
রেইলিঙের উপর দিয়ে ঝুঁকে নীচে তাকাল রানা। ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে পড়ে রয়েছে লোবু। নড়ছে না।
রেইলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে দম নিল রানা। তারপর ক্ষতটা আরেকবার দেখে নিয়ে কাপড়ের ফালিটা ভালো করে বাঁধল। নতুন করে ওটা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে না।
এরপর এগিয়ে এসে ওয়ালথারটা তুলে হোলস্টারে ভরল। রানা। ছুরির ফলা আগেই মুছেছে, এবার সেটাকেও তার জায়গায়। গুঁজে রাখল।
লোবুর ম্যাগনাম, মনে পড়ল ওর।
প্যাসেজটার দিকে ঘুরে গেল রানা। এই প্যাসেজ ধরে সমাধি সৌধের আরও ভিতরে ঢোকা যায়। হাতে এখনও অনেক কাজ রয়েছে ওর। সবচেয়ে আগে নন্দিনীকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর পেগানে ফিরে যাবার আগে লোবুর লাশের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু ম্যাগনামটা ওখানে নেই। লোবুর হাত থেকে ছিটকে। কোথায় পড়েছিল, জানে রানা, নিজের চোখে দেখেছে, মনেও। আছে-অথচ নেই সেটা।
কী আশ্চর্য, জিনিসটা তো আর বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে। না!
প্যাসেজের মেঝেটা ভালো করে দেখছে রানা।
তারপর লোবুর .৩৫৭ ম্যাগনামটা পাওয়া গেল। তবে ধুলো। ভরা প্যাসেজের মেঝেতে নয়। রানা দেখল ওটা একটা হাতে ধরা। রয়েছে। হাতটার মালিক রূপ আর যৌবনের আধার একটি নারীদেহ। মুখ তুলে হাসতে চেষ্টা করল রানা।
সকালটা তোমার খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটল, মিস্টার মাসুদ রানা।
তুমি সেটাকে আরও বেশি ব্যস্ত করে তুলবে মনে হচ্ছে, নন্দিনী অপরূপা।
<