প্রায় চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর সঙ্গীদের নিয়ে হুন চেননিকে। বাঁক ঘুরে লেকের পাড়ে পৌছাতে দেখল রানা। ইতিমধ্যে বুড়ো শিশুকে স্টেশনের ছাদে তুলে দিয়েছে ও, সেখানে তার কাজ কোন। শব্দ না করে শুয়ে থাকা।

কাছাকাছি আসতে দেখা গেল প্রচণ্ড রেগে আছে চেননি। রক্ত। ভরা স্বচ্ছ বেলুনের মত লাগছে তার লাল মুখটাকে। লোহার সিঁড়ি। বেয়ে প্লাটফর্মে ওঠার সময় তার নিঃশ্বাস ফেলার ফেস-ফেঁস আওয়াজ শুনতে পেল রানা। তিনজনের কেউই কথা বলছে না।

প্লাটফর্মে উঠেই ছদ্মবেশী রানার দিকে কটমট করে তাকাল চেননি। এই, ছোকরা! এদিকে আয়। তোর বুড়ো বাপ কোথায় গেল, ঘণ্টা তিনেক আগে যে ডিউটি দিচ্ছিল?

কনফুসিয়াসের বইটা বন্ধ করে টুল ছেড়ে দাঁড়াল রানা, দুপা এগিয়ে এসে মান্ডারিন ভাষায় বলল, তার শেষ, আমার শুরু।

তুই এখানে কখন থেকে ডিউটি দিচ্ছিস?

তা ঘণ্টা দুয়েক তো হবেই।

কেবল কার থেকে এই মেয়েটাকে নামতে দেখেছিস? দালিয়ার ফটোটা রানার সামনে ধরল চেননি।

মাথা নাড়ল রানা। কোন প্যাসেঞ্জারই তো নেই, খালি কার আসা-যাওয়া করছে।

সঙ্গীদের দিকে ফিরল চেননি। এখন তা হলে আমি কী বুঝব? রাগে হিসহিস করে উঠল সে। পাওচেন বলেছিল মেয়েটার কাছে মাইক্রোফিল্ম থাকবে, সেটা নিয়ে দোআনচিতে আসবে সে মাসুদ রানার সঙ্গে দেখা করতে, ঠিক?

জী, ঠিক! ঘন ঘন মাথা নোয়াল তার সঙ্গীরা।

মাসুদ রানাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পাওয়া যাবে-এই তথ্যই তো বিরাট দামী একটা পণ্য। সেই পণ্য মোটা টাকায় বেচলাম, তাকে খতম করার চুক্তি করেও ভালো কামালাম। কিন্তু মেয়েটা তো এলই না, তার সঙ্গে দেখা করতে রানাও আসেনি। কেন?

পাওচেন আমাদেরকে ভুল তথ্য দিয়েছে, হুজুর, সঙ্গীদের একজন বলল। তার মতলব মনে হয় ভালো ছিল না।

হাত দুটো মুঠো পাকাল হুন চেননি। পাওচেনের শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাদের লোককে বলছে, মেয়েটা ওখানে নেই, নেই মাইক্রোফিল্মটাও। এর মানে কী?

মেয়েটা তার দেওরকে বোকা বানিয়েছে, হুজুর, সঙ্গীদের অপরজন বলল। এখানকার কথা বলে মাসুদ রানার সঙ্গে অন্য কোথাও দেখা করেছে সে।

পাওচেনকে মারতে গেল আমাদের লোক, দেখা গেল আগেই গুলি খেয়ে মরে ভূত হয়ে আছে সে। কার এত দয়া যে আমাদের কাজটা করে দিল?

জবাব দেওয়ার আগে প্রতিবারই মাথা নুইয়ে সম্মান জানাচ্ছে সঙ্গীরা। তারা মুখ খুলছে পালা করে। আমাদের কাজ করে। দেয়নি, নিজের স্বার্থ হাসিল করেছে। আমাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী,। হুজুর।

আরেকজন বলল, একটু খোঁজ নিতে হবে ওই সময়টায় মিন ভাইরা কে কোথায় ছিল।

ঘাড় ফিরিয়ে রানার দিকে তাকাল হুন চেননি। এই ব্যাটা। উজবুক। আমরা যতক্ষণ এখানে আছি, তুই কালা, ঠিক আছে?

জী, আপনি যা বলেন। ঘন ঘন মাথা নোয়াল রানা। মাতৃভাষায় বিড়বিড় করল, কতক্ষণই বা আছিস!

কী বললি? হঠাৎ বাঘের মত গর্জে উঠল চেননি। বিড়বিড় করে কী বলিস, অ্যাঁ?

ভয় পাবার ভান করে দ্রুত মাথা নাড়ল রানা। না, তেমন কিছু। বলছিলাম, কেবল কার আসছে।

কতক্ষণ হলো গেছে? সুর একটু নরম করে জানতে চাইল চেননি।

আধ ঘণ্টার ওপর।

তা হলে আর বেশি দেরি নেই। সঙ্গীদের দিকে ফিরল চেননি, আগের প্রসঙ্গের রেশ টেনে বলল, ঘাঁটিতে একটা ফোন করে জিজ্ঞেস করলেই তো পারো কোথায় আছে ওরা দুভাই।

এতক্ষণে কেবল কারটাকে আসতে দেখছে রানা। পাঁচসাতশো গজ পরপর একটা করে টাওয়ার আছে, ঝুলন্ত কেবলকে টান-টান করে রাখাই ওগুলোর আসল কাজ। এই মুহূর্তে পাঁচশো গজ দূরের সর্বশেষ টাওয়ারটা পার হচ্ছে কেবল্ কার।

সোনালি রঙের একটা মোবাইল বেরিয়ে এল চেননির এক এক শিষ্যর হাতে। বোতাম টিপে সেটটা কানে তুলল সে।

কন্ট্রোল প্যানেলের পিছনে এসে দাঁড়াল রানা। ভালো করে দেখে নিয়ে একটা বোতাম টিপল। কার-এর গতি ধীরে ধীরে কমে আসছে। বরাবরের মত খালি দেখা যাচ্ছে ওটাকে।

চারদিকে কোথাও কোন মানুষজন নেই। দূরের বাকি দুটো স্টেশন এই মুহূর্তে খালি। সময়টা আদর্শ। পরিস্থিতি অনুকূল।

দোআনচি থেকে মুলাই বলছি, মোবাইল ফোনে কথা বলছে লোকটা। মিস্টার চৌ মিনকে দে, কথা আছে…কী বললি?…দু ভাই সেই ভোর বেলা বেরিয়ে গেছে, তারপর আর ফেরেনি? শোনো, হুজুরের সঙ্গে কথা বল… হাতের ফোন চেননির দিকে বাড়িয়ে ধরল সে।

সেটটা নিয়ে প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে প্রচণ্ড এক আছাড় মারল চেননি। ভেঙে দুটুকরো হয়ে গেল সেটা। সবকটাকে জবাই করব আজ আমি! কুত্তার বাচ্চাগুলো বিনা পাহারায় তাদেরকে ছাড়ল কীভাবে?

হ্যাঁ, জবাই করাই উচিত! একযোগে বলে উঠল সঙ্গীরা, তারপর বিগ ব্রাদারের পিছু নিয়ে উঠে পড়ল কেবল কারে।

সঙ্গে সঙ্গে একটা লিভার টেনে রিভার্স গিয়ার দিল রানা। প্রকাণ্ড লোহার খাঁচা, অর্থাৎ কারটা হেলেদুলে আবার ফিরতি পথে রওনা হয়ে গেল।

পঞ্চাশ গজ এগোল কার। এখনই নীচের পাথুরে জমিন থেকে চল্লিশ ফুট উপরে ওটা। জমিন মানে প্রায় খাড়া একটা ঢাল। অপেক্ষায় থাকল রানা, কখন কারটা দুশো গজ দূরে পৌঁছাবে।

বুড়ো শিশুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে রানা, কন্ট্রোল প্যানেলে এমন কিছু সুইচ আছে যেগুলো অন করলে এদিক থেকে কেবল-এর প্যাঁচ ঠিকই খুলবে, খুলবেও অসম্ভব দ্রুতবেগে, কিন্তু টাওয়ারের ওদিকে যাবে না, আটকে থাকবে।

কেবল আটকে থাকলে কী ঘটবে তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না।

দুশো গজ দূরের কারটাকে এখন অনেক ছোট লাগছে। লোকগুলোর শুধু মাথা দেখতে পাচ্ছে রানা। কোনটা কার মাথা স্পষ্ট করে বোঝাও যাচ্ছে না। জমিন থেকে এখন কারটা এখন। কম করেও দেড়শো ফুট উপরে।

দ্রুত কয়েকটা সুইচে চাপ দিল রানা।

প্রথমে গতি হারিয়ে স্থির হয়ে গেল ঝুলন্ত কার। রানার পিছনে বিশ ফুট লম্বা ব্যারেল বিদ্যুৎবেগে ঘুরতে শুরু করেছে, প্রতি সেকেন্ডে বেরিয়ে যাচ্ছে পাঁচ ফুট করে কেবল।

কেবল বেরুচ্ছে, কিন্তু টাওয়ারের ওপারে যেতে পারছে না।

তারপর দেখা গেল সরাসরি নীচে খসে পড়ছে ভারী কারটা। নির্জন পাহাড়ী এলাকা বলেই বোধহয়, অত দূর থেকেও লোকগুলোর আতঙ্কিত চিৎকার অস্পষ্টভাবে শুনতে পেল রানা।

প্রায় যেন চোখের পলকে ঘটে গেল ব্যাপারটা। নীচের পাথুরে জমিনে পড়ে একবার মাত্র একটু লাফিয়ে উঠল বিশ ফুটী কার, তারপর স্থির হয়ে গেল।

হুন চেননি আর তার শিষ্যরা ছিটকে কারের বাইরে পড়েছে। প্রচণ্ড ঝুঁকিতে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার কথা। তিনটে কাপড়ের তৈরি নিপ্রাণ পুতুলের মত শুয়ে রয়েছে তারা, এতটুকু নড়াচড়া করছে না।

আবার সুইচে চাপ দিতে টান পড়ল কেব-এ, কারটাকে উপরে তুলে আনছে রানা।

দালিয়াকে নিয়ে তাইপিনবু থেকে ট্রেনে চড়ে নানকুতে ফিরছে রানা। ব্যাগে ওর নিজের কাপড়চোপড় ছিল, ছদ্মবেশ খুলে আবার সে-সব পরে নিয়েছে ও। ওদের কমপার্টমেন্টটা প্রায় খালিই বলা যায়, এই সুযোগে দালিয়াকে রানা জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ, এবার বলো, ব্যাপারটা আসলে কী নিয়ে?

দ্রুত সবকিছু বদলে যাচ্ছে, ফলে যতই কষ্ট হোক আর কান্না পাক, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল বজায় রেখে নিজেকেও মানিয়ে নিতে হচ্ছে দালিয়ার। ভাই, স্বামী আর দেওরকে হারাবার পর তার আর আপনজন বলতে কেউ রইল না। তবে রানা তাকে সান্ত্বনা দেবার পাশাপাশি মনটাকেও শক্ত করতে পরামর্শ দিয়েছে, বলেছে তা না হলে দেশের জন্য তুমি যে ঝুঁকি নিয়েছ আর ত্যাগ স্বীকার করেছ তার সবই বৃথা হয়ে যাবে।

পাশের সিট থেকে রানার দিকে আরেকটু ঝুঁকল দালিয়া, তারপর শুরু করল। 

ব্যাপারটা বছর কয়েক আগে মার্কিন দূতাবাসে শুরু হয়। সংক্ষেপে এটা হলো, চিনকে ধ্বংস করার আমেরিকান ষড়যন্ত্র।

তখনই একটু খটকা মত লেগেছিল দালিয়ার, কারণ ডাটা অ্যান্ড ইনফরমেশন সেকশনের হেড হওয়া সত্ত্বেও কমপিউটারের কিছু ফাইলে ঢুকতে পারছিল না সে অ্যাকসেস কোড জানা না থাকায়। প্রায় বছরখানেক চেষ্টা করার পর অ্যাকসেস কোড সংগ্রহ করতে পারলেও কোন লাভ হয়নি, কারণ ততদিনে গোপন সমস্ত ফাইল ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি দালিয়া চিনের শিরদাঁড়া ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, চিনারা যাতে কোনদিন সুপারপাওয়ার হবার স্বপ্ন দেখতে না পারে।

সিআইএ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড আর সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রতি হপ্তায় গোপনে মিটিং করে প্ল্যানটা তৈরি করেছে, তাদেরকে সহায়তা করে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স।

সেই প্ল্যান একটা কমপিউটার ফাইলে বন্দি করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওয়াশিংটনে, হোয়াইট হাউস আর পেন্টাগনের অনুমোদন পাবার জন্য। পেন্টাগনের সমর্থন পেতে। সমস্যা হয়নি, কিন্তু নির্বাচনের বছর বলে হোয়াইট হাউস। ব্যাপারটাকে বেশ কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখেছিল। তারপর অবশ্য, দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে, হোয়াইট হাউসের টপ বস সবুজ সংকেত দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউস থেকে বেইজিঙের মার্কিন দূতাবাসে ফাইলটা ফেরত পাঠাবার সময় যথারীতি সিকিউরিটি কোড ব্যবহার করা হয়েছিল। ফাইলটা দালিয়ার কমপিউটারেও চলে আসে। আর। অ্যাকসেস কোড জানা থাকায় সেটা ওপেন করতে কোন সমস্যা হয়নি তার।

কেউ কিছু জানতে পারার আগেই গোটা প্ল্যানটা পড়ে ফেলল। দালিয়া। পড়ার সময়, কী পড়ছে বুঝতে পেরে, মাথাটা তার ঘুরতে শুরু করল। মার্কিনিদের চাকরি করে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে মাতৃভূমির এত বড় সর্বনাশ তো হতে দিতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিল, প্রমাণ সহ সরকারকে ব্যাপারটা জানাবে।

বুদ্ধি করে প্ল্যানটার প্রিন্ট আউট বের করল দালিয়া, তারপর এক সুযোগে ওই প্রিন্ট আউট থেকে তৈরি করল মাইক্রোফিল্ম। প্রিন্ট আউট বা সিডির চেয়ে মাইক্রোফিল্ম সরানো অনেক সহজ।

মাইক্রোফিল্মটা দালিয়া কারও মনে এতটুকু সন্দেহ না জাগিয়ে মার্কিন দূতাবাস থেকে সরাতে পারল ঠিকই, কিন্তু তারপরই দেখা দিল মহা সংকট।

পরদিনই মার্কিন দূতাবাসের একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার একটা ঘরে একটানা দুঘণ্টা বসিয়ে রেখে জেরা করল দালিয়াকে। হোয়াইট হাউস থেকে আসা টপ সিক্রেট ফাইলটা সে দেখেছে। কিনা? ওটা আটশো পাতার একটা ফাইল, প্রিন্টার মেশিনের ইন্ডিকেটর-এ দেখা যাচ্ছে ওই আটশো পাতাই প্রিন্ট করা হয়েছে, সেগুলো কোথায়?

অজ্ঞতার অভিনয় করে কোন রকমে সেদিন দূতাবাস থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে দালিয়া ভেবেছিল, এ যাত্রায় বোধহয় বেঁচে গেল। কিন্তু মার্কিনিদের চিনতে তখনও বাকি ছিল ওর। ফ্ল্যাটে ফেরার পথে একবার নয়, দুবার মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয় তাকে। দুবারই ভাগ্যগুণে রক্ষা পায় সে।

সেদিনই নিজেদের ফ্ল্যাট ছেড়ে ভাইয়ের সদ্য কেনা ফ্ল্যাটে আত্মগোপন করল দালিয়া। ভাইয়ের এই নতুন ঠিকানা কেউ জানত না বলে কয়েকটা দিন কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু নিজেদের ঠিকানায় দালিয়ার স্বামী মার্কিন দূতাবাসের লোকজন আর বিগ ব্রাদারদের হুমকি শুনতে শুনতে অসুস্থ হয়ে পড়ল। এমনকী সরকারের লোকজন আসছে, গোপনে মোটা টাকা সাধছে তাকে।

দালিয়া বা তাঁর ভাইয়ের কোন ধারণা ছিল না মার্কিনিরা কোটি ডলার খরচ করে বেইজিঙে হাজার হাজার বেঈমান তৈরি করে রেখেছে। প্রথম ধাক্কাটা এল ওদের এক আত্মীয়র কাছ থেকে।

লোকটাকে সৎ, নীতিবান আর দৃঢ়চেতা বলে চিনত ওরা; কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা সে, চাকরি করে চাইনিজ সিক্রেট সার্ভিসে। তার কাছে বুদ্ধি চাইতে গেল ওরা, মাইক্রোফিল্মটা কীভাবে সরকারের বিশ্বস্ত কোন কর্মকর্তার হাতে তুলে দেওয়া যায়।

লোকটার হাবভাব ওদের মোটেও ভালো লাগল না। কথাটা শুনে উত্তেজনা চেপে রাখতে পারল না সে। ফিসফিস করে বলল, আমিই তো সরকারের একজন বিশ্বস্ত অফিসার, জিনিসটা তোমরা আমার কাছে রেখে যাও, আমি খুব যত্ন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেব।

ওটা তো সঙ্গে নেই, নিয়ে আসতে হবে, বলে পালিয়ে আসতে চাইল ওরা।

বেশ, এখনই গিয়ে নিয়ে আসবে। তবে আরেকটু বসো। চানাস্তা আসছে, খেয়ে যাও, বলে অন্দরমহলে চলে গেল লোকটা। পরে দালিয়া বুঝতে পারে, লোকটা হুন চেননিকে ফোন করতে গিয়েছিল।

চা খেয়ে বাইরে বেরুল ওরা, সিদ্ধান্ত নিল, মাইক্রোফিল্মটা এই লোককে দেওয়া উচিত হবে না। তারা টেরও পেল না যে হুন। চেননির লোকজন তাদের পিছু নিয়েছে।

তখন সন্ধ্যা রাত। হামলা হলো গভীর রাতে। দলবল নিয়ে। হুন চেননি নিজে নক করল দরজায়। পুলিশ বলে পরিচয় দেওয়ায়। দালিয়ার ভাই দরজা খুলে দিল। হুন চেননি তাকে নিজের পরিচয় জানিয়ে সরাসরি প্রস্তাব দিল, এক লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে। ফাইলটা কিনতে চায় সে।

জবাবে দালিয়ার ভাই বলল, আমরা কারও হুমকির মুখে নতি স্বীকার করব না। যা পারো করে নিয়ো, আমরা ওটা বেচব না।

ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ওদের সব কথাই নিজের কামরা থেকে শুনতে পাচ্ছিল দালিয়া। গুলির আওয়াজ আর ভাইয়ের গোঙানি শুনে শিউরে উঠল সে। হুন চেননির এক সঙ্গীকে বলতে শুনল, এক গুলিতেই খতম করে দিয়েছেন, বস্।

জবাবে হুন চেননি বলল, এবার দরজা ভেঙে তোরা সবাই ধর্ষণ কর মেয়েটাকে। দেখি ফাইলটা না দেয় কী করে।

এ-কথা শুনে জানালার গ্রিল খুলে পালায় দালিয়া। দোতলা থেকে পানির পাইপ বেয়ে নীচে নামে, তারপর একটা গলি থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসে নানকুতে। ওখানে তার দেওর পাওচেনের শ্বশুরবাড়ি। পালাবার সময় শুধু মাইক্রোফিল্ম আর মোবাইল ফোনটা সঙ্গে নেয় সে।

ঠিক কী আছে ফাইলটায়? মূল প্রসঙ্গে ফিরে এল রানা।

দালিয়া জানাল, আটশো পাতার বিশদ বিবরণ সহ জটিল একটা প্ল্যান, এককথায় বলা সম্ভব নয় কী আছে।

প্রথম দুবছর তিন হাজার গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ, স্থাপনা আর প্রতিষ্ঠানের সচিত্র প্রতিবেদন সংগ্রহ আর বিশ্লেষণ করা হয়।

এগুলোর মধ্যে চারটে অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার, বত্রিশটা এয়ারপোর্ট, রকেট আর ফাইটার প্লেন সহ নয়টা সমরাস্ত্র তৈরির কারখানা, একশো বাহাত্তরটা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রজেক্ট, পাঁচটা সমুদ্রবন্দর, আশিটা গ্যাসফিল্ড, সাতাশটা তেলকূপ, একুশটা ক্যান্টনমেন্ট আলাদা একটা তালিকায় জায়গা পায়, সেটার শিরোনাম দেওয়া হয়: টপ প্রায়োরিটি-ওয়ান।

এই তালিকার প্রতিটি জায়গায় একই দিন একই সময়ে দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক পার্টি নামে নতুন একটা রাজনৈতিক দলের সদস্যরা হামলা চালাবে।

বলা হবে, নতুন এই রাজনৈতিক দল গোপনে প্রচারণা চালিয়ে আর জনহিতকর নানা কাজ করে সাধারণ চিনাদের মন জয় করে নিয়েছিল, তারাই একটা গণ-অভুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে।

এরপর টপ প্রায়োরিটি-টু।

এটা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী কর্মকর্তা আর মন্ত্রী পরিষদের তালিকা। ওই একই দিনে তাদেরকে হত্যা করা হবে।

পরবর্তী তালিকার শিরোনাম: ভিআইপি।

এতে আছে দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক পার্টি-র প্রথম সারির। নেতা আর পৃষ্ঠপোষকদের নাম।

এরপর শুরু হয় এনজিও থেকে ঋণ আর চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পাঁচ লাখ স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহের কাজ। স্বেচ্ছাসেবক মানে কমিউনিজম আর সরকার বিরোধী লোকজন, মৌলবাদী জঙ্গি, চোর-বদমাশ, ভবঘুরে, পাতি গুণ্ডা আর বিশ্বাসঘাতকদের দল।

সিদ্ধান্ত হয়, গণ-অভুত্থানে নেতৃত্ব দেবে ত্রিশ হাজার মার্সেনারি, তাদের নির্দেশেই পাঁচ লাখ স্বেচ্ছাসেবক গোটা চিনে একযোগে স্যাবটাজ শুরু করবে।

ট্রেন কমপার্টমেন্টের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে রানা বলল, তুমি আসলে ওদের একটা তাজা অ্যাটম বোমা চুরি করেছ। এখনও যে বেঁচে আছ সেটাই তো আশ্চর্য।

বেঁচে থেকে আর কী লাভ হলো, বলুন? আসল জিনিসটাই তো হারিয়ে ফেলেছি…

হারিয়ে ওটা যাবে কোথায়, দালিয়া? দৃঢ়কণ্ঠে আশ্বাস দিল রানা, চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের কোন অভাব নেই। আমি যখন।

ওটার পিছু নিয়েছি, তুমি নিশ্চিত থাকো ঠিকই খুঁজে বের করব। চিন আমাদের বন্ধু, কাজেই ষড়যন্ত্রের কথাটা সরকারকে জানানো আমাদের একটা দায়িত্ব।

কিন্তু যদি পানও, আপনি ওটা কার হাতে তুলে দেবেন? কী করে বুঝবেন সেই লোক বেঈমান নয়?

তোমার আসলে ঘরপোড়া গরুর অবস্থা হয়েছে, হালকা সুরে বলল রানা, তারপর জানতে চাইল, তুমি কী করে বুঝলে আমি বেঈমান নই?

ও, আচ্ছা, সরকারী পদে পরীক্ষিত বন্ধু আছে আপনার…

অপারেশনটা কবে শুরু হবে জানো? জিজ্ঞেস করল রানা। দালিয়ার কথায় ওর বন্ধু, চিনা সিক্রেট সার্ভিসের চিফ লিউ ফুঁ চুঙএর মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। কোন টাইমটেবিল আছে?

জী, মাসুদ ভাই, আছে, বলল দালিয়া। নতুন বছরের প্রথম হপ্তায়।

এক মুহূর্ত চিন্তা করল রানা। তোমাকে আমি আপাতত বেইজিঙে, আমাদের একটা সেফহাউসে রাখব, যতদিন না বিপদটা কেটে যায়, ঠিক আছে?

মাথা ঝাঁকাল দালিয়া। সেই মঠে, ঊননব্বই সালে যেটায় ছিলাম?

না, এটা আরেকটা। তবে বেইজিঙে ফেরার আগে তুমি আমাকে তোমার দেওর পাওচেনের কাছে নিয়ে যাচ্ছ।

আপনি না বললেন পাওচেন মারা গেছে?

তার লাশটাই দেখতে যাব আমি, বলল রানা। বলা যায় না, ওখানে হয়তো কোন ক্লু পরে আছে।

.

বাড়িটার সদর দরজা খোলা পেল ওরা।

সামনের বসার ঘরে ফার্নিচার বলতে তেমন কিছু নেই, পুরানো এক সেট সোফা আর একটা নিচু টেবিল। টেবিলের উপর চাবি সহ একটা তালা পড়ে আছে।

বিপদ হতে পারে এটা পাওচেন জানত, সেজন্যই শ্বশুরবাড়ির সব লোকজনকে আগেই সরিয়ে দেয় সে। পাহাড়ের ঢালে নিঃসঙ্গ। একটা বাড়ি, খেয়াল করার কেউ নেই কে গেল বা কে এল। লাশটা ভিতর দিকের একটা ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। চিৎ করা লাশ, ছোরাটা এখনও বাম বুকে হাতল পর্যন্ত গাঁথা।

বিছানার উপর একটা খোলা সুটকেস দেখল রানা, ভিতরের। জিনিস-পত্র খাটে ছড়িয়ে রয়েছে।

কামরাটা বেশি বড় নয়, ঘুরে ঘুরে দেখছে রানা। কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না, কারণ হুন চেননির লোকজন ছাড়াও অনেকের পা পড়েছে এখানে। আধঘণ্টা পর হাল ছেড়ে দিল রানা। নাহ্, এখানে কোন ক্লু নেই, কিংবা থাকলেও ওর চোখে ধরা পড়ছে না।

ওর জন্য পাশের ঘরে অপেক্ষা করছিল দালিয়া। তাকে নিয়ে। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল রানা। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ও। এক সেকেন্ড কী যেন ভাবল, তারপর ঘুরে আবার বাড়িটার ভিতর ঢুকল।

সঙ্গে সঙ্গেই আবার বেরিয়ে এল রানা, হাতে চাবি সহ সদর দরজার তালাটা রয়েছে। তালা যখন রয়েছেই, বাড়িটাকে খালি। ফেলে রেখে যাই কেন, বলে দরজা বন্ধ করে তালাটা খোলার। জন্য কী হোলে চাবি ঢোকাল ও।

কিন্তু তালার ভিতর চাবি ঢুকছে না। ভালো করে তাকাতে কী হোলের ভিতর সাদা মত কিছু দেখতে পেল রানা, যেন মনে হলো। একটুকরো কাগজ গুঁজে রাখা হয়েছে। তোমার কাছে চুলের কাটা বা পিন হবে নাকি?

মাথা থেকে একটা ক্লিপ খুলে রানার হাতে ধরিয়ে দিল দালিয়া। সেটা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তালার ভিতর থেকে জিনিসটা বের করল রানা। ছোট্ট একটুকরো কাগজই। তাতে কিছু লেখা রয়েছে। হাতের লেখাটা চিনতে পারল ও।

চৌ মিন লিখেছে-আপনাকে যদি সত্যি চিনে থাকি, জানি তালাটাকে ব্যবহার করার কথা একমাত্র আপনার মাথাতেই জাগবে। প্রসঙ্গত, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেয়ে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু পাওচেনকে আমরা মারিনি। কোথায় দেখা হওয়ার কথা মনে আছে তো, বস্?

.

চিনা সিক্রেট সার্ভিস। হেডকোয়ার্টার বেইজিং।

নিজের চেম্বারে বন্দি বাঘের মত পায়চারি করছে চিফ লিউ ফুঁ চুঙ। এ অদ্ভুত এক পেশাগত বিড়ম্বনা শুরু হয়েছে-সব খবরই পাচ্ছে সে, তবে ঠিক সময়মত নয়। ফলে সমস্যার সমাধান বের করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আমেরিকানরা চিনের সর্বনাশ করার জন্য প্ল্যান তৈরি করছে। কয়েক বছর ধরে, অথচ সিক্রেট সাভির্স সে-সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। প্ল্যান সহ গোপন ফাইলটা মার্কিন দূতাবাস থেকে চুরি করেছে এক চিনা মেয়ে, চুরি করার পর সেটা সরকারের হাতে তুলে দেয়ার জন্য বিশ্বস্ত একজন লোক খুঁজছেএই খবরটাও সময় মত পায়নি তারা। খবর যখন এল, কেউ বলতে পারে না মেয়েটা বা ফাইলটা কোথায় আছে। শুধু জানা গেল, ওটার খোঁজে পাঁচ বিগ ব্রাদার, আমেরিকান দূতাবাস, সিআইএ, ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো সহ অন্য আরও বহু দেশের স্পাইরা আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়েছে।

স্বভাবতই চিনা সিক্রেট সার্ভিসেরও মাঠে নামার কথা। কিন্তু। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তারা নামেনি। কেন?

চোখে যখন অন্ধকার দেখছে ফুঁ চুঙ, এই সময় খবর এল। বিসিআই এজেন্ট মাসুদ রানাকে রাজধানীর কোন একটা হোটেলে। দেখা গেছে। প্রিয় বন্ধুর উপস্থিতিতে আশার আলোর দেখতে পেল সে, জানে চিনা সিক্রেট সার্ভিস কী কারণে মাঠে নামতে পারছে না। ব্যাখ্যা করে বললে সাহায্য করতে রাজি হবে রানা। কিন্তু এই খবরটাও অনেক দেরিতে পেয়েছে তারা।

তবে শেষ পর্যন্ত রানা এজেন্সির বেইজিং শাখার প্রধান বুন লি-র মাধ্যমে রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। গুরুতর বিপদে পড়েছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সঙ্গে দেখা কর, দোস্ত–এধরনের একটা মেসেজও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

সেই থেকে চলছে অপেক্ষার পালা। ফুঁ চুঙ আশা করছে যেকোন মুহূর্তে তার চেম্বারে পৌঁছে যাবে রানা।

রানা এল আরও প্রায় একঘণ্টা পর।

প্রাথমিক কুশলাদি বিনিময়ের পর ফুঁ চুঙ এভাবে শুরু করল, আগে শোন্ বিপদটা কী…।

ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে রানা। বলল, বিপদটা কী আমি জানি। কালো নকশাটা উদ্ধার করতে হবে, এই তো?

তুই তা হলে জানিস! কালো নকশা…হ্যাঁ, দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল ফুঁ চুঙ। সেজন্যেই বেইজিঙের কোথাও পাওয়া। যাচ্ছিল না তোকে?

হ্যাঁ। তোদের এই বিপদটার সঙ্গে ব্যক্তিগত একটা কারণে জড়িয়ে পড়েছি আমি।

সেটা কী ব্যাখ্যা করা যায়?

যায়, বলে ওর বেইজিঙে আসার পর থেকে কী ঘটেছে। সংক্ষেপে জানাল রানা।

তুই তো একাই দেখছি বিগ ব্রাদারদের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে। দিয়েছিস, দোস্ত! বলল ফুঁ চুঙ। ভালো কথা, তুই কি এ-ও জানিস যে ওই কালো নকশার খোঁজে মাঠে সবাই থাকলেও, আমরা নেই?

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল রানা। মানে?

আমরা উভয় সংকটে পড়ে গেছি, দোস্ত। প্রাইম মিনিস্টারের দফতর থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, আমেরিকা যদি চিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে থাকে সেটা কী জেনে নিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করো সেটা বানচাল করতে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা চলবে না।

এর মানে? কিছুই তো বুঝলাম না!

ফুঁ চুঙ তখন ব্যাখ্যা করল।

মার্কিন দূতাবাস থেকে চিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একটা ফাইল চুরি করেছে এক চিনা মেয়ে জিজিয়ানা দালিয়ান। ফলে, স্বভাবতই মার্কিনিরা ধরে নেবে চিন সরকারই এই কুকর্মটি করিয়েছে-গোয়েন্দা লাগিয়ে। হই-চই বাধিয়ে দেবে ওরা, প্রচার শুরু করবে দুনিয়াময়: কূটনৈতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করছে চিন।

গণচিন নিজের স্বার্থে বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছে। পাশ্চাত্য দুনিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে। তাই কর্তৃপক্ষ এমন কিছু করতে রাজি নন যাতে সেই সম্পর্কে চিড় ধরে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার জন্য জানা দরকার আসলে গোপন ফাইলটায় কী আছে।

আমরা নিজেরা জড়াব না, কারও সাহায্যে ওই ফাইলটা। পেতে চেষ্টা করব, সবশেষে বলল ফুঁ চুঙ। চোখে অন্ধকার দেখছিলাম, কারণ সাহায্য চাওয়া যায় এমন কাউকে খুঁজে। পাচ্ছিলাম না। তারপর হঠাৎ খবর পেলাম তুই বেইজিঙে। যাক, জানে পানি এল আমার। শুনছি মার্কেটে অনেক টাকার দান চলছে, ফাইলটা হাতে পেলে চিনও অনেক টাকা খরচ করতে রাজি আছে। দোস্ত, করবি তো সাহায্য?

দ্যাখ, ব্যাটা! রেগে গেল রানা। মেরে ছাতু করে দেব বলে দিচ্ছি! কোলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলের ডান্সফ্লোর থেকে তুলে এনে তুই যেবার আমাকে বাঁচিয়েছিলি, কত টাকা দিয়েছিলাম আমি তোকে তখন?

ভুল বুঝছিস, শালা! হাসল লিউ ফুঁ চুং। টাকাটা তোর জন্যে। যদি ওটা কিনতে হয় কারও কাছ থেকে-সেজন্যে বললাম। তোকে টাকা সাধব, কটা মাথা আমার ঘাড়ে?

ঠিক আছে, যা, মাফ করে দিলাম। আর সাহায্য করবার ব্যাপারে, তুই তো জানিস, অনুমতির একটা ব্যাপার আছে। আমাদের বুড়ো খোকার সায় পেলে দেখবি কেমন ঝাপিয়ে পড়ি।

স্বস্তির হাসি ফুটল ফুঁ চুঙের মুখে। রানার হাতে চাপ দিল। বলল, গোটা এসপিওনাজ জগতে এক আশ্চর্য কিংবদন্তি উনি। আর তোরাও যেমন পিতার মর্যাদা দিয়ে বুড়ো মানুষটাকে মাথায়। তুলে রেখেছিস…ঈর্ষা হয়। একটু চুপ করে থেকে আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে এল ফুঁ চুং, শুনছি, জিনিসটা নিলামে উঠতে যাচ্ছে, অনেক টাকা ডাক উঠবে। সেক্ষেত্রে তোর প্রস্তুত থাকার দরকার। আছে না? টান দিয়ে ডেস্কের একটা দেরাজ থেকে চেক বই বের করল ও। একটা চেক রেখে দে, দোস্ত, সঙ্গে। সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট। যত বড় অঙ্কেরই চেক হোক, অনার করা হবে।

ব্ল্যাঙ্ক চেক?

হ্যাঁ, ডিফেন্স মিনিস্টারের সই করা। স্বতঃস্ফূর্ত একটুকরো হাসি ফুটল ফুঁ চুঙের ঠোঁটে, তাতেই বোঝা গেল বন্ধুকে কতটা বিশ্বাস করে সে।

চেকটা নিয়ে পকেটে ভরল রানা। তবে একটা কথা, বলল ও। তোদের মাঠে একদম না থাকাটাও কেমন যেন দেখায়। মার্কিনিরা ভাববে তোরা মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলেছিস। মনে সন্দেহও জাগবে। তারচেয়ে এক কাজ কর-অন্তত কয়েকটা দিন থাক তোরা মাঠে, দিশেহারার মত ছোটাছুটি করে ঘুরপাক খা, ভাব দেখা: সূত্রের অভাবে এগোতে পারছিস না।গুড আইডিয়া। খুশি হয়ে রানার পরামর্শ মেনে নিল ফুঁ চুঙ।

<

Super User