কাঁকর বিছানো অসমতল পথে ঝাঁকুনি খেতে খেতে ছুটে চলেছে ইয়ার্ডের ছোট ট্রাক। চালাচ্ছে বোরিস। পাশে বসে পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দুই গোয়েন্দা।
মাত্র কয়েক মিনিট আগে উঠে বসেছে। এতক্ষণ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল মেঝেতে। ইয়ার্ডের দশ মাইল দূরে চলে এসেছে গাড়ি। এতদূরে নিশ্চয় আর কেউ নেই তাদের ওপর চোখ রাখার জন্যে।
কেউ পিছু নেয়নি আমাদের, এক সময় বলল বোরিস। কিন্তু ও-কি? ওটা শহর না ভূতের গী। আমাদের ব্যাভারিয়ায় ওরকম অনেক শহর আছে… ভূতের গল্প আরু করল সে।
এমনিতেই চলেছে গোরস্থানে। এসব ভূতের গল্প এখন মোটেই ভাল লাগছে না মুসার।
মেরিটা ভ্যালিতে পৌঁছতে এক ঘন্টা লাগল। ঠিকই বলেছে বোরিস, এটাকে শহর বলা চলে না। বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো ফেলে এল পেছনে। ছাল চামড়া ওঠা, পুরানো বেকার স্ট্রীট ধরে এগিয়ে চলল। দুই ধারে একটা বাড়িও চোখে পড়ল না। পথের শেষ মাথায় পাথরের ছড়ানো দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে পাথরের শত শত কুশ আর স্মৃতিস্তম্ভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মেরিটা ভ্যালির গোরস্থান।
হাত তুলে দেখাল মুসা। দেয়ালের এক জায়গায় ফাঁক, মানে দেয়াল নেই ওখানে। কাঠের একটা পুরানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে।
২২২বিবেকার স্ট্রীট।
এখানেই থামব? জিজ্ঞেস করল মুসা।
মাথা নাড়ল কিশোর। বোরিস, ডানে যান। পরের রাস্তাটায়।
হোকে, যাচ্ছি।
মস্ত কবরস্থান, অনেক পুরানো। দেয়ালের কোণের দিকে আসার পর চোখে পড়ল প্রাচীন গির্জার ধ্বংসাবশেষ, পাথর আর কাঁচা ইটে তৈরি। নির্জন, পরিত্যক্ত।
মোড় নিল বোরিস। এগোল আরও শ-খানেক গজ। কবরস্থান পেছনে ফেলে চলে এল ইউক্যালিপটাস গাছের বেশ বড়সড় একটা ঝাড়ের কাছে। পথের ওপর মাথা নুইয়ে আছে ডালপালা, বয়েসের ভারে বাঁকা হয়ে গেছে যেন কোমর। পাতার ঝঝাল তৈলাক্ত গন্ধ ভারি করে তুলছে বাতাস।
গাছের নিচে রাখুন, বোরিসকে বলল কিশোর।
নামল দুই গোয়েন্দা।
আমাদের দেরি হবে, বলল কিশোর, আপনি এখানে থাকুন।
হোকে। রেডিও অন করে দিয়ে একটা খবরের কাগজ টেনে নিল বোরিস।
এবার কি? জিজ্ঞেস করল মুসা।
নীরবে একটা ফাঁকা মাঠ দেখাল কিশোর, কোণাকুণি গিয়ে মিশেছে গোরস্থানের দেয়ালের সঙ্গে। কেউ না দেখে ফেলে আবার। ভেতরে কেউ থাকতেও পারে।
নিঃশব্দে দেয়াল টপকাল দুজনে।
নেই কেউ, বলল মুসা, তবে থাকলে ভাল হত। বড় বেশি নির্জন। ভয় লাগছে।
জবাব দিল না কিশোর। অনেক দিনের অব্যবহৃত একটা পথ ধরে এগিয়ে চলল। দু-ধারে অসংখ্য ছোটবড় স্মৃতিস্তম্ভ আর ক্রুশ, কোনটা আস্ত কোনটা ভাঙা, কোনটা হেলে রয়েছে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে।
পথ চিনে রাখো, মুসা, অন্ধকার হলেও যেন ফিরে যাওয়া যায়। তুমিই পারবে, আমাকে দিয়ে হবে না।…এহহে, যাহ, টর্চ আনতে ভুলে গেছি।
মরেছি! অন্ধকারে? কুকুরছানার মত কেউ করে উঠল মুসা। দরকার কি এতক্ষণ থাকার? হালকা এক ঝলক ধোঁয়ার মত কিছু উড়ে গেল ওদের সামনে দিয়ে। আরে? আবার কুয়াশা।
পশ্চিমে তাকাল কিশোর, প্রশান্ত মহাসাগরের অসীম বিস্তার যেন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিকই আন্দাজ করেছে মুসা। পানির ওপরে চাপ চাপ ধোঁয়ার মেঘ ভাসছে, বাতাসে দুলে ধীরে ধীরে সরে আসছে এদিকেই।
এরকম হয় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়। কোন আভাস না দিয়েই হঠাৎ করে কুয়াশা জমতে শুরু করে সাগরের ওপর, ধেয়ে আসে উপকূলে, দিনের বেলায়ও তখন কয়েক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না।
দিল বোধহয় সর্বনাশ করে, কিশোরের কণ্ঠে শঙ্কার ছায়া, মুখ গম্ভীর।
অন্ধকারের চেয়েও খারাপ। এসে পড়ার আগেই যদি ছবিটা খুঁজে পেতাম।…ওই যে, রাস্তাটা।
লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে চলল কিশোর। দুটো বড় স্মৃতিস্তম্ভের মাঝ দিয়ে এসে থামল অনেকগুলো পথের একটা সঙ্গমস্থলে। পথের শাখাপ্রশাখা এখান থেকে বেরিয়ে আলের মত ছড়িয়ে গেছে বিশাল গোরস্থানের ভেতরে ভেতরে। জায়গাটা ২২২ বি লেখা সাইনবোর্ডের কাছেই।
এবার? অস্বস্তি লাগছে মুসার।
পকেট থেকে নোট লেখা কাগজ বের করল কিশোর। টু টু টু বি বেকার স্ট্রীটে এলাম। চার নম্বর মেসেজ বলছে, একশো কদম পশ্চিমে যাও। গেটের মুখ উত্তর দিকে…তাহলে, এই যে, এদিকে…
কি?
একশো কদম মানে একশো গজ, বিড়বিড় করল কিশোর। জন সিলভারের কথা মোতাবেক এখান থেকে একশো গজ পশ্চিমে যেতে হবে আমাদের। মুসা, শুরু করো। তোমার পা লম্বা, বড়দের সমান হবে।
এক…দুই…তিন করে গুণে গুণে পা ফেলতে শুরু করল মুসা। তার পেছনে রইল কিশোর।
এক জায়গায় চল্লিশ ফুট দূরের দেয়ালের সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে চলে গেছে একটা পথ, ওটা ধরেই এগোচ্ছে এখন।
একশো গুণে থামল মুসা। এবার?
পাঁচ নম্বর বলছে, ইউ নো মাই মেথডস, ওয়াটসন। থ্রি সেভেনস লীড টু থারটিন।
মাথা লিখেছে, রাগ করে বলল মুসা।
চিন্তিত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিশোর। হঠাৎ বলল, মুসা, তোমার কদম কি পুরো এক গজ?
কি জানি। মেপে তে দেখিনি।
তাহলে মেপে দেখা যাক। পকেট থেকে একটা প্লাসটিকের টুকরো বের করল কিশোর, একটা তিন বছরের পকেট ক্যালেণ্ডার। এক ধারে চার ইঞ্চি লম্বা স্কেল রয়েছে। মুসার ছড়ানো কদম মেপে দেখল। হুমম। তিরিশ ইঞ্চি। একশো কদমে কম হয়েছে পঞ্চাশ ফুট। হাঁটো। আরও বিশ কদম।
একেবারে পেছনের দেয়ালের কাছে চলে এল ওরা। কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত পাথর বা কোন কিছু নেই।
দেখো, হাত তুলে উল্টোদিকে খানিক দূরের তিনটে পাথরের ফলক দেখাল মুসা। পাশাপাশি তিনটে কবরের মাথার কাছে গাথা। তিনটে ফলকে তিনটে নাম হিউগো সেভার্ন, পিটার সেভার্ন, মরিস সেভার্ন। ১৮৮৮ সালের একটা তারিখ লেখা রয়েছে নিচে, একই দিনে তিনজনে পীতজুরে মারা গেছে।
সেভার্ন। চেঁচিয়ে উঠল মুসা, সেদিনই ধরেছিলাম। রবিন উড়িয়ে দিল ইংরেজদের কথার টনি বলে। খ্রি সেভার্নস লীড টু থারটিন।
হ্যাঁ, সেভার্নরা রয়েছে এখানে। কিন্তু তেরোর কাছে নিয়ে যাবে কিভাবে? দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল কিশোর।
পাথরগুলো রয়েছে এক সারিতে, বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে মুসার, এক লাইন। লাইনটা ধরে ডানে-বাঁয়ে যে কোন একদিকে হাঁটি।…ইয়াল্লা, কিশোর, জলদি, করো। কুয়াশা এসে পড়ছে।
পাক খেয়ে খেয়ে এগিয়ে আসছে হালকা কুয়াশা, এটা সামনের স্তর, ঘিরে ধরল দুই গোয়েন্দাকে। হাহাকার করে গেল বাতাস, যেন অশরীরী কোন প্রেতের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। শিউরে উঠল মুসা। ককিয়ে বলল, কিশোর, জলদি করো, প্লীজ!
বিষণ্ণ পরিবেশকে আরও বিষণ্ণ করে তুলছে বিচ্ছিরি কুয়াশা, কিন্তু কিশোরের ভাবান্তর নেই। গালে টোকা দিচ্ছে, তাকাচ্ছে আশেপাশে। হুঁ!, লাইনটা গিয়ে শেষ হয়েছে ওই পাথরটায়। চলো তো দেখি।
আরেকটা প্রস্তরফলক। এপাশে কিছুই লেখা নেই। ঘুরে ওপাশে আসতেই দেখতে পেল ওরা, লেখা রয়েছে :
চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে এখানে
তেরোজন অচেনা ভ্রমণকারী
ইণ্ডিয়ানরা খুন করেছে এদের সবাইকে।
জুন ১৭, ১৮৭৬
থারটিন! ফিসফিস করল মুসা, জোরে বলতে ভয় পাচ্ছে, যেন ঘুম ভেঙে যাবে তেরোজন হতভাগ্য মানুষের। তিন সেভার্ন নিয়ে এল তেরোর কাছে।
ছয় নম্বর বলছে, কিশোর বলল, লুক আনডার দা স্টোনস বিয়ণ্ড দা বোনস ফর দা বক্স দ্যাট হ্যাজ নো লকস।
কিন্তু কোন পাথরটা? এখানে তো পাথরে বোঝাই।
মেসেজ বলছে, বিয়ণ্ডা দা বোনস, বাঁকা চোখে কয়েকটা পাথরের দিকে তাকাল কিশোর। দূর, কুয়াশা এসেই পড়ল দেখি।…ওই যে, দেয়ালের ধারের ওই মনুমেন্টের কাছে, পাথর পড়ে আছে কতগুলো…কোনকালে পড়েছিল কে জানে, ঠিক করেনি আর।…আচ্ছা, তেরোজনের হাড়গোড়কে বোনস ধরে নিলে ওগুলোকেই স্টোনস বোঝায়, আশেপাশে আর যা আছে, একটা করে পাথর, সুপ নেই…।
কিশোরের কথা শেষ হওয়ার আগেই ছুটে গেল মুসা। দু-হাতে পাথর সরাতে শুরু করল। মুখ না তুলে বলল, কিশোর, হাত লাগাও। কুয়াশার আগেই শেষ করতে হবে।
কাজে এতই মগ্ন রয়েছে ওরা, পেছনে পদশব্দ শুনতে পেল না।
বাহ, খুব কাজের ছেলে, বলে উঠল কেউ।
কানের কাছে যেন বাজ পড়েছে, এত জোরে চমকে উঠল দুজনে।
ঘনায়মান কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে তিনটে মূর্তি, একজন শোঁপা, কোন সন্দেহ নেই, পাশের দুজনকেও চেনে, একজনের নাম জানে, টমাস, আরেকজনের জানে না।
তোমাদের কাজ শেষ, কাছে এসে হাসল শোঁপা। আর কষ্টের দরকার নেই। এবার আমরাই পারব। টমাস, ধরো ওদের।
মনে মনে, এক সঙ্গে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল দুই গোয়েন্দা। লাফিয়ে উঠে দুজন ছুটল দুদিকে। কিন্তু পারল না। ধরা পড়ে গেল।
টমাস, তুমি ধরে রাখো, আদেশ দিল শোঁপা। ডিংকি, পাথর সরাও।
মুসার হাত মুচড়ে ধরল টমাস, পিস্তল বের করে পিঠে ঠেকাল। কিশোরকে বলল, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। নাকি বন্ধুর পিঠ ফুটো করাতে চাও?
<