উকণ্ঠিত হয়ে কিশোরের অপেক্ষা করছে টনি, রবিন আর মুসা। উত্তেজনাটা এতই ভারি লাগছে, ওদের মনে হচ্ছে গাঁইতি দিয়েও ছিদ্র করা যাবে না। বকবক করছিল টনি আর রবিন সময় কাটানোর জন্যে, এখন সেটাও বন্ধ। ভাবছে, কতক্ষণ আর ডজকে ওভাবে রাখতে পারবে? বাঁধন খোলার জন্যে মোড়া-মুড়ি করছে আর চেঁচাচ্ছে লোকটা।
ঘড়ি দেখল মুসা। দুই ঘণ্টা হয়ে গেল! আর কত? সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় চলে এল, দেখার জন্যে, কিশোর আসছে কিনা।
চিৎকার থামিয়ে চুপ হয়ে গেল ডজ। যেন বুঝে গেছে, এসব করে কোন লাভ হবে না। যে ভাবে বাঁধা হয়েছে, তাতে শোয়ার চেয়ে বসে থাকাটা সহজ এবং আরামের মনে হলো বুঝি তার কাছে।
টনি, অনুনয় করল ডজ, আমাকে এক গেলাস পানি দেবে? গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ঢোক গিলতে পারছি না।
পরস্পরের দিকে তাকাল রবিন আর টনি।
মাথা ঝাঁকাল রবিন।
দিচ্ছি, টনি বলল। উঠে গিয়ে মাটির জগটা নিয়ে এল ডজের কাছে।
রবিন যেখানে বসেছে সেখান থেকে ভালমত দেখতে পেল না এরপর যা ঘটল। ডজের মুখের কাছে টনিকে জগটা তুলতে দেখল সে। পরমুহূর্তেই মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল জগ। টনির গলার পাশে ছুরি চেপে ধরেছে ডজ।
বাঁধন খুলে ফেলেছে ডজ। দড়ির কাটা টুকরো ঝুলছে কব্জি আর গোড়ালি থেকে।
গাধার দল! হা হা করে বুনো হাসি হাসল ডজ। আমাকে ধরার পর সার্চ করা উচিত ছিল। করোনি। বুটের ভেতর ছুরিটা রয়ে গেছে দেখনি।
আরেকটু বাড়াল ছুরির চাপ। নড়লেই গলার প্রধান রক্তবাহী শিরা জুগুলার ভেইন কেটে দেয়ার হুমকি দিল।
রবিন, কর্কশ গলায় ডাকল ডজ। টনির রাইফেলটা নিয়ে এসো। জলদি করো।
খামোকা হুমকি দিচ্ছে না লোকটা। কথা না শুনলে ঠিকই কেটে দেবে টনির শিরা। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে রাইফেলটা। তুলে নিয়ে ডজের দিকে এগোল রবিন।
রাখ ওখানেই, ডজ বলল। আর এগোনোর দরকার নেই।
ডজের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু রয়েছে, বরফের মত জমে গেল যেন রবিনের রক্ত। টনিকে খুন করার একটা ছুতো খুজছে কেবল র্যাঞ্চার। রাইফেলটা হাত থেকে ছেড়ে দিল রবিন।
টনির গলায় ছুরি চেপে রেখেই হাত বাড়িয়ে রাইফেলটা তুলে নিল ডজ। লাফিয়ে উঠে পিছিয়ে গেল এক পা। ছুরিটা কোমরের বেল্টে গুঁজে রাখল। সেফটি ক্যাচ অফ করে দিয়ে বোল্ড টানল রাইফেলের। কঠিন গলায় আদেশ দিল, যাও, সরো এবার। দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত তুলে দাঁড়াও।
কিশোরকে দেখলাম না। তবে অদ্ভুত কিছু একটা…
বলতে বলতে গুহায় ঢুকল মুসা। মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে দেখল দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত তুলে দাঁড়িয়েছে রবিন।
হচ্ছেটা কি… এবারেও কথা শেষ করতে পারল না মুসা। চোখ পড়ল ডজের ওপর। ওর হাতে রাইফেল। তাক করে রেখেছে মেঝেতে বসা টনির দিকে। মুসার দিকে ঘুরল নলটা। বাহ, এসে গেছ। যাও, তুমিও যাও দেয়ালের কাছে। টনিকে ধমক দিল, এই, তুমি বসে রইলে কেন?
রবিন জানাল মুসাকে, ওর বুটের ভেতর ছুরি ছিল। সেটা দিয়ে…
চুপ! ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল ডজ। মুসা আর টনিকে আবার যেতে বলল দেয়ালের কাছে।
এতই রাগ লাগছে মুসার, একটা মুহূর্তের জন্যে ভাবল, রাইফেলের পরোয়া না করে ছুটে যাবে কিনা। আবছা অন্ধকারে ছুটন্ত একটা নিশানাকে মিস করতেও পারে ডজ। পরক্ষণেই বাতিল করে দিল ভাবনাটা। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল দেয়ালের কাছে। তার পাশে এসে দাঁড়াল টনি।
এবার কি করব? ফিসফিস করে বলল মুসা।
কিশোর না আসাতক এভাবেই থাক, ফিসফিস করেই জবাব দিল রবিন।
শুনে ফেলল ডজ। হ্যাঁ, থাক ওভাবেই। একদম নড়বে না। খিকখিক করে হাসল সে। নড়েচড়ে দেখতে পারো অবশ্য। তিনজনের খুলিতে তিনটে গুলি ঢোকাতে পারলে খুশিই হব এখন আমি। ঝামেলা শেষ। রাইফেলের বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। চুপ হয়ে গেল ওরা।
এখন যা বলি, শোনো, ডজ বলল আবার। যদি বাঁচতে চাও। টনি, তোমাকে প্রশ্ন করব। ঠিকঠিক জবাব দেবে। নইলে গুলি খাবে তোমার বন্ধুরা।
চুপ করে আছে টনি।
তোমার বাবা কোথায়?
দ্বিধা করছে টনি।
এদিকে ফের।
আদেশ হলো কর্কশ কণ্ঠে।
ঘুরল টনি। দেখল, ডজের আঙুল চেপে বসছে ট্রিগারে।
পর্বতের ওপাশের গায়ে গেছে, জবাব দিল টনি।
কখন ফিরবে?
মিথ্যেটা বেরিয়ে গিয়েছিল মুখ থেকে, শেষ মুহূর্তে সামলে নিল টনি। ডজ যদি বুঝে ফেলে মিছে কথা বলছে সে, রবিন আর মুসার বিপদ হয়ে যাবে।
আরও দুদিন লাগবে।
পঞ্চো ভিলার গুহাঁটা পেয়েছ?
পেয়েছি।
ওটাই যে সেই গুহা কি করে বুঝলে?
ভিলার সৈন্যদের একজনের কঙ্কাল পেয়েছি ওখানে।
হুঁ। এক কাজ করো। দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেল তোমার বন্ধুদের। আমাকে যেমন বাধা হয়েছিল, তেমন করে।
গুহার একধার থেকে গিয়ে দড়ি বের করে আনল টনি।
মুসা, আদেশ দিল ডজ, হাঁটু গেড়ে বসো। হাত আন পিঠের ওপর।
নড়ল না মুসা। গটমট করে তার কাছে এসে দাঁড়াল ডজ। রাইফেলের নল ঠেকাল ঘাড়ে। ঠান্ডা ইস্পাতের স্পর্শে শিউরে উঠল মুসা। ঢোক গিলল।
জলদি করো!
বিড়বিড় করে নিজেকেই একটা গাল দিল মুসা, অসতর্ক হয়েছিল বলে। হাঁটু গেড়ে বসে পিঠের ওপর হাত নিয়ে এল।
ঢিল করে বাঁধল প্রথমে টনি। কিন্তু ফাঁকিটা ধরে ফেলল ডজ। শক্ত করে বাঁধার জন্যে ধমক লাগাল ওকে।
রবিনকেও বাঁধা হলো।
ডজ বলল, এবার কিছু প্রশ্নের জবাব জানা দরকার আমার। বাধাই তো আছি, রবিন বলল। আর জবাব দিয়ে কি হবে?
হেসে উঠল টনি আর মুসা।
চুপ! চেঁচিয়ে উঠল ডজ। রাইফেলের নল দিয়ে খোঁচা মারল রবিনের বুকে। রাগে জ্বলে উঠল রবিনের চোখ। কিছু বলল না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল।
কিশোর গেছে কোথায়? জানতে চাইল ডজ।
আমরাও তো সে কথাই জানতে চাইছি, মুসা বলল। বোধহয় পিজা-টিজা কিনতে গেছে।
বাজে কথা রাখ!
ডজের চেহারা দেখতে পাচ্ছে টনি। জবাব না পেলে অনর্থ ঘটাবে ওই লোক, বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না তার। সে তখন বলল, ইসাবেলের খোঁজে।
ইসাবেল কে?
আমরা জানি না। শুধু জানি, মহিলা মেকসিকান। তিন গোয়েন্দার কাছে যা যা শুনেছে, সেভাবে চেহারার বর্ণনা দিল। কয়েক দিন ধরে নাকি ওদেরকে অনুসরণ করে এসেছে। আজ সকালে তার বারোটাকে দেখেছি গুহার বাইরে। কাজেই শারির সাহায্যে ওটাকে নিয়ে গেছে কিশোর ইসাবেলকে খুঁজে বের করার জন্যে।
বন্দুক-টন্দুক আছে মহিলার কাছে?
দ্রুত ভাবছে টনি। আছে, সেটা বলা কি ঠিক হবে? ওরা তো নিশ্চিত নয়। বলল, আমরা জানি না।
বেশ। সতর্ক থাকতে হবে আরকি আমাকে। কালো চুলের বেনি। রাইফেলটা রবিনের দিক থেকে টনির দিকে ফেরাল ডজ। আমাকে ভিলার গুহায় নিয়ে চল। কোন চালাকির চেষ্টা করবে না। আমি তোমার পেছনেই থাকব।
গুহা থেকে বেরিয়ে গেল দুজনে। সুড়ঙ্গে ওদের জুতোর শব্দ শোনা গেল।
পদশব্দ মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধন খোলার চেষ্টা চালাল দুই গোয়েন্দা।
হাত খুলতে পারবে? জিজ্ঞেস করল মুসা।
হুডিনির মত জাদু জানলে পারতাম। তুমি?
একই অবস্থা। কিশোরটা যে কোথায় গেল!
চলে আসবে ঠিকমতই, দেখো। ওকে বোকা বানানো কঠিন। সব সময়ই একটা না একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে। ডজকে দেখে ফেললেই আন্দাজ করে ফেলবে কি ঘটেছে। তাছাড়া তার সঙ্গে রয়েছে শারি। আগে থেকেই হুঁশিয়ার করে দিতে পারবে কিশোরকে।
তা বটে।…আচ্ছা, একটা গন্ধ পাচ্ছ?
নাক কুঁচকে শ্বাস টানল রবিন। মনে হয় পচা ডিমের।
বাইরে অদ্ভুত কিছু ঘটছে, মুসা বলল। আমি যে তখন বাইরে গিয়েছিলাম, দেখি, কালো হয়ে গেছে সব কিছু। যেন রাত নামছে পর্বতে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত আকাশে। …হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, পচা ডিমের মতই গন্ধ।
আগেও কয়েকবার ধোঁয়া দেখেছি, মনে আছে? আচমকা চিৎকার করে বলল রবিন, পচা ডিম নয়, গন্ধক! আগ্নেয়গিরিতে থাকে! খোদা, একটা জ্যান্ত আগ্নেয়গিরির ওপরে বসে আছি আমরা!
কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে যেন মুসার চোখ। খাইছে! এই গুহায় থাকলে আমাদের তো কিছু হবে না! কিন্তু কিশোরের? সে তো রয়ে গেল বাইরে।
<