দম ফুরিয়ে এসেছে কিশোরের। মৃত্যু অবধারিত। ছটফট করছে না আর মুক্তি পাওয়ার জন্যে। লাভ নেই। ভাবছে, মরতে কি খুব কষ্ট হবে? কততক্ষণ লাগবে প্রাণ বেরোতে?
হালকা একটা ছোঁয়া লাগলো শরীরে। চমকে উঠলো সে। হাত চেপে ধরলো নরম আরেকটা হাত। না না হাত আসবে কোথা থেকে? হাতের মত কিছু। হয়ত অকটোপাসের গুড়। এসে গেছে তাহলে খুন করার জন্যে! ভাল। সরে গেল চাপটা, পেটের কাছে। হাত বুলিয়ে যেন বোঝার চেষ্টা করছে কোনখান থেকে খাওয়া শুরু করবে। খুঁজে পেলো কোমরে পেঁচানো দড়িটা, যেটার সঙ্গে লোহার পাইপ বাঁধা রয়েছে। তারপর তাকে অবাক করে দিয়ে যেন পোচাতে শুরু করলো দড়িতে।
ফুসফুসের বাতাস প্রায় শেষ। আর কয়েক সেকেন্ড টিকবে বলে মনে হয় না। দড়িটা কাটা হয়ে গেল। তার হাতের বাঁধনে পোচ মারা শুরু হলো এবার। অলৌকিক কান্ডই হোক আর যা-ই হোক, কার কাজ বুঝতে পারলো সে। মানুষ। ছুরি দিয়ে প্রথমে পাইপের দড়ি কেটেছে, এখন হাতেরটা কাটছে। পায়েরও কেটে দেয়া হলো। ওঠার কথা আর বলতে হলো না কিশোরকে।
ওপরে ভেসে হাঁ করে বাতাস টানতে লাগলো কিশোর। চোখের কোণ দিয়ে অন্ধকারেও দেখতে পেলো আরেকটা মাথা ভেসে উঠেছে তার পাশে। কে? জিজ্ঞেস করলো সে।
ফিসফিস করে জবাব এলো, আমি, সাগরের হাসি।
তুমি! যাওনি?
চল, ডাঙায় চল। কারনেস দেখে ফেলবে।
তীরে এসে উঠলো দুজনে। চলে এলো নারকেল গাছের আড়ালে।
তুমি এলে কোত্থেকে? জানার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে কিশোর।
আমি যাইইনি। এখানেই ছিলাম।
কোথায়? কিশোর অবাক।
কারনেসের জাহাজে। পালের নিচে লুকিয়ে ছিলাম।
আনমনে মাথা নাড়লো কিশোর। এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না এভাবে মুক্তি পেয়ে যাবে।
ঝিনুক কোথায় তাহলে?
রাটুনায় চলে গেছে।
কিন্তু জাহাজে গেলে কি করে তুমি? উঠলে কখন?
তুমি ধরা পড়তেই ডুব দিয়ে সরে এলো ঝিনুক। আমাকে বললো। সাঁতরে গিয়ে লুকিয়ে জাহাজে উঠলাম, দেখতে লাগলাম তোমাকে নিয়ে কি করে ওরা। ওরা ঘুমাতে যাওয়ার পরেও জাহাজ থেকে নামলাম না। রাতে নৌকা নিয়ে চলে গেল ঝিনুক। আমাকে থাকতে বলে গেল। তোমাকে সাহায্য করার জন্যে।
ভাগ্যিস থেকেছিলে! নইলে এতক্ষণে শেষ হয়ে যেতাম!
হেসে উঠলো সাগরের হাসি। জানালো, ঝিনুক লোক নিয়ে ফিরে আসবে। অশান্ত সাগরকে বলে অনেক যোদ্ধা নিয়ে আসবে, বলে গেছে। এবার আর ছাড়বে কারনেসকে। অনেক জ্বালান জ্বালিয়েছে সে।
ও চলেই গেছে, না? অন্ধকার সাগরের দিকে তাকালো কিশোর। জাহাজটা চোখে পড়লো না।
হ্যা। ঝিনুক এসে ওকে খুঁজে বের করবে।
কারনেসের জাহাজে রয়েছে ওরা? চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো ওমর। মুশকিল হয়ে গেল।
হ্যাঁ, মাথা নাড়লো মুসা। জাহাজ থেকে কিশোর আর সাগরের হাসিকে উদ্ধার করা কঠিনই। কারনেস মেরেই ফেলে কিনা ওদেরকে কে জানে!
কি করা যায়, বল তো? ওমরের দিকে তাকালো ডজ। নৌকা নিয়ে গিয়ে জাহাজটাকে ধরা যাবে না।
বিমানটা নিয়ে যেতে হবে।
কি করে? মেরামত করতেই তো অনেক সময় লেগে যাবে। ততোক্ষণে অনেক দূরে চলে যাবে কারনেস।
উড়তে পারবো না, কিন্তু ট্যাক্সিইং করে যেতে অসুবিধে কোথায়? পাতার দঙ্গল থেকে ওটাকে বের করে নিয়ে গিয়ে খোলা পানিতে ফেলতে পারলেই তো হয়ে গেল।
তাই তো। এটা তো ভেবে দেখিনি।
অভয় পেয়ে বেরিয়ে এসেছে গাঁয়ের লোকে। যুদ্ধে যাওয়ার আর দরকার নেই, ওদেরকে বোঝাল ওমর। অশান্ত সাগরকে অনুরোধ করলো, কিছু লোক দিতে, যাতে নৌকা নিয়ে গিয়ে বিমানটাকে সরিয়ে আনতে পারে। ওটার চারপাশের জঞ্জাল সাফ করে দিতে পারলেই হলো, এর বেশি আর কিছু করা লাগবে না।
খুশি হয়েই লোক দিলো অশান্ত সাগর। ওদেরকে নিয়ে রওনা হলো আবার ডজ, ওমর আর মুসা। তবে অবশ্যই খাওয়া-দাওয়ার আর খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর। তাদের সঙ্গে চললো ঝিনুক।
বনের ভেতর দিয়ে গেল না আর। অত্যন্ত দুর্গম পথ, বললো অশান্ত সাগর। পারতপক্ষে ওই বনে কেউ ঢুকতে চায় না, একথাও জানালো। সৈকতে চলে এলো দলটা। সাথে এসেছে তিরিশজন অদিবাসী, সবাই যুদ্ধের সাজে সেজেছে। ঝিনুকের সঙ্গে লড়াই করতে যেতে চেয়েছিলো। যেতে পারলো না বলে কিছুটা নিরাশ হয়েছে যেন।
কয়েকটা ক্যানুতে চড়লো সবাই। যুদ্ধে যেতে পারেনি তাতে কি হয়েছে, আরেকটা বিশেষ কাজ তো করতে যাচ্ছে। সেটাকে লড়াইয়ের সামিল ধরে নিলো বোধহয় যোদ্ধারা, দাঁড় বাইতে বাইতে বিচিত্র ভাষায় সুর করে যুদ্ধের গান গাইতে গাইতে চললো।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিমানের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। পাতার দঙ্গল যতই পুরু হোক, এতগুলো মানুষের কাছে টিকতে পারলো না বেশিক্ষণ। পরিষ্কার করে ফেলা হলো আশপাশের অনেকখানি জায়গা। তারপর বিমানের সঙ্গে দড়ি বেঁধে তিনটে ক্যানু টেনে সরিয়ে আনলো ওটাকে পরিষ্কার পানিতে।
রাত হয়ে গেল কাজ সারতে সারতে। পুরোপুরি অন্ধকার। কিন্তু ভোরের অপেক্ষায় আর থাকতে চায় না ওমর। তখুনি রওনা দেবে ডজ আইল্যান্ডে। তার পরিকল্পনার কথা খুলে বললো সে। বড় একটা শক্ত ক্যানু বাঁধা হলো বিমানের পেছনে। দশজন আদিবাসীকে উঠতে বলা হলো তাতে। ঝিনুক ও আরও চারজন আদিবাসী সহ মুসা আর ডজকে নিয়ে বিমানে উঠলো ওমর। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রওনা হলো খোলা সাগরের দিকে। টেনে নিয়ে চললো ক্যানুটাকে।
চাঁদ উঠলো। নারকেল কুঞ্জের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কিশোর আর সাগরের হাসি। দ্বীপের সেদিকটায় চললো যেখানে থেকে সাগরের অনেকদূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। কয়েক পা এগিয়েই থমকে দাঁড়ালো। ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো কিশোরের বুক। লেগুন থেকে সাগরে বেরোনোর মুখটার কাছে রয়েছে স্কুনারটা। যায়নি। থেমে আছে। ওদের কাছ থেকে বড়জোর একশো গজ দূরে।
ঝপ করে বড় একটা পাথরের আড়ালে বসে পড়লো সাগরের হাসি। কারনেস ফিরে এসেছে! ফিসফিস করে বললো সে।
কিশোরও বসলো তার পাশে। স্তব্ধ হয়ে গেছে। এটা আশা করেনি। একটা চিৎকার উঠলো জাহাজে। যতই লুকাক, চোখে পড়ে গেছে ওরা।
লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো সাগরের হাসি। দৌড় দাও! যত জোরে পার! চিৎকার করে বললো কিশোর। বলেই ছুটলো।
পেছনে গর্জে উঠলো একটা রাইফেল। কাছেই একটা প্রবালের চলটা তুলে দিয়ে বিইইং করে সাগরের দিকে উড়ে গেল বুলেট। ফিরেও তাকালো না কিশোর। আবার গুলি হলো। কয়েক গজ দূরে আরেকটা প্রবালের চলটা তুললো বুলেট। চাঁদের আলোয় ছুটন্ত নিশানার গায়ে গুলি লাগানো সহজ নয়।
কয়েকটা নারকেল গাছের আড়ালে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো দুজনে। তাকালো জাহাজটার দিকে। নোঙর তুলে ফেলেছে ওটা। প্রণালী দিয়ে লেগুনে ঢুকেছে।
কিছু দূর এগিয়ে লেগুনের শান্ত পানিতে এসে আবার থামলো জাহাজ। লংবোট নামাতে ব্যস্ত হলো নাবিকেরা। চেঁচিয়ে আদেশ দিচ্ছে কারনেস। ভীষণ রেগে গেছে সে। এবার ধরতে পারলে গুলি করে মারবে, কোন সন্দেহ নেই।
কি করা যায়? ভাবতে শুরু করলো কিশোর। নৌকা নিয়ে দ্বীপে পৌঁছতে দেরি হবে না লোকগুলোর। ধরে ফেলবেই। তবে যতক্ষণ দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সকাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারলে, আর ওদের কপাল ভাল হলে ওমর ভাই এসেও যেতে পারে। কিংবা লোকজন নিয়ে ঝিনুক। দ্বীপের সরু অংশটায় রয়েছে ওরা। চওড়া দিকটায় যাবে বললো সাগরের হাসিকে। ছুটলো। ওদিকে উঁচুনিচু অনেক টিলাটক্কর রয়েছে। লুকানোর জায়গা মিলতে পারে।
গাছের আড়ালে আড়ালে ছুটছে দুজনে। যাতে গুলি করতে না পারে কারনেস। ঝড়ে নানারকম জঞ্জাল এনে ফেলেছে বালিতে। নারকেল পাতা, শ্যাওলা, ঝিনুকের খোসা। সেসবের জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছে দৌড়ান। কিন্তু কোন কিছুই ঠেকাতে পারলো না ওদেরকে। চলে এলো দ্বীপের চওড়া দিকটায়। বেশ উঁচু একটা টিলা রয়েছে ওখানে। ঢালের গায়ে মিশে থেকে আস্তে মুখ বাড়িয়ে তাকালো কিশোর। দেখলো, পৌঁছে গেছে লংবোট। টেনে সৈকতে তুলছে নাবিকেরা। রাইফেল বগলে চেপে দাঁড়িয়ে রয়েছে কারনেস।
চলেই তো গিয়েছিল, বিড়বিড় করে বললো কিশোর। আবার ফিরে এলো কেন ব্যাটা?
চুপ করে রইলো সাগরের হাসি।
ঝড়ের গতিতে ভাবনা চলেছে কিশোরের মগজে। এই দ্বীপে বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকা অসম্ভব। জায়গাই নেই তেমন। নারকেল গাছে চড়ে বসে থাকতে পারে। বড়জোর রাতটা টিকতে পারবে তাতে। আলো ফুটলেই চোখে পড়ে যাবে। জ্যান্ত নামার আর সুযোগ পাবে না তখন। গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে গাছ থেকে। লুকানোর আরেকটা জায়গা হলো দ্বীপের নিচের গুহাঁটা। ওতে লুকালে হয়তো কয়েকদিন লুকিয়ে থাকতে পারবে, যদি নাবিকেরা ডুব দিয়ে খুঁজতে না আসে। ওখানে লুকানোর সব চেয়ে বড় বিপদ হল হাঙর। ঝড়ের সময় ঢুকেছিলো। এখনও লেগুনেই আছে, না বেরিয়ে গেছে? থাকলে ওদেরকে ধরলো না কেন? কয়েকবার তো লেগুনে নামতে হয়েছে ওদেরকে। থাকুক না থাকুক, ওখানেই গিয়ে লুকানোর সিদ্ধান্ত নিলো কিশোর। কারনেসের হাতে ধরা দিলেও মরতে হবে। তার চেয়ে গুহায় ঢোকার ঝুঁকিটাই নেয়া যাক। ভাগ্যে যদি থাকে হাঙরের পেটে যাওয়া, ঠেকাতে তো আর পারবে না।
কিন্তু এগোতে গিয়ে থমকে গেল সে। কি করে আন্দাজ করেছে কারনেস, কে জানে। কিংবা এমনিই হয়তো একজন লোককে পাহারায় রেখেছে ওদিকটায়, যেদিক দিয়ে গুহায় যেতে হয়। অন্যখান দিয়ে পানিতে নেমেও যাওয়া যায়। তবে যেদিক দিয়েই যাক, চাঁদের আলোয় কারনেসের লোকের চোখে পড়ে যাবেই ওরা।
কিশোরের মত একই ভাবনা চলেছে সাগরের হাসির মাথায়। বললো, নারকেল গাছে চড়তে হবে। তার পর সুযোগ বুঝে চলে যাব গুহায়। সকাল হতে দেরি আছে। অনেক সময় পাওয়া যাবে।
তা ঠিক। টিলার পাশ দিয়ে চলে এলো দুজনে একটা নারকেল কুঞ্জের ভেতরে। দুজনে দুটো গাছ বেছে নিয়ে চড়তে শুরু করলো।
কিশোরের অনেক আগেই উঠে গেল সাগরের হাসি। পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসলো। একেবারে মিশে গেছে। কিশোরও দেখতে পাচ্ছে না। ভালমত আলো না ফুটলে তাকে বের করতে পারবে না কারনেসের লোকেরা।
সাগরের হাসির মত একই ভাবে পাতার আড়ালে ঢুকলো কিশোর। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে এখন পুরো দ্বীপটা। খোঁজাখুঁজি করছে নাবিকেরা। রাইফেল হাতে পায়চারি করছে কারনেস।
ওদের গাছের নিচে চলে এলো একজন। ওপরের দিকে তাকাল। কিশোরের ভয় হতে লাগলো দেখে ফেলবে। পা বাড়াতে গিয়ে আচমকা চিৎকার করে উঠলো লোকটা। ধক করে উঠলো কিশোরের বুক। দেখে ফেললো? না। বসে পড়েছে লোকটা। পায়ের পাতা উল্টে দেখার চেষ্টা করছে। নিশ্চয় ভাঙা শামুকে পা কেটে গেছে।
খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে গেল লোকটা।
কি হলো? জিজ্ঞেস করলো কারনেস। চেঁচালে কেন?
পা কেটে ফেলেছি।
ওরা কোথায়?
দেখিনি।
হু। যাবেটা কোথায়? দিনের বেলা খুঁজে বের করবো।
একটা পাথরের ওপর গিয়ে বসলো কারনেস। রাইফেলটা কোলের ওপর রেখে সিগারেট ধরালো। খুঁজেই চলেছে তার লোকেরা।
ধীরে ধীরে মাথার ওপরে উঠল চাঁদ। চলতে শুরু করল পশ্চিমে। মলিন হয়ে আসছে জ্যোৎস্না। কিশোরের মনে হচ্ছে বড় বেশি দ্রুত যেন ডুবতে চলেছে চাঁদটা। কেটে যাচ্ছে রাত। অনেকবার বিপদে পড়েছে জীবনে। রাত যেন তাড়াতাড়ি কাটে সেই প্রার্থনা করেছে তখন। আজ করতে লাগলো, না কাটার জন্যে। কারণ রাত ফুরিয়ে গেলেই মরতে হবে।
<