বৃহস্পতিবার ইস্কুল ছুটি হলো। বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। সূত্র খুঁজতে রওনা হলো গোয়েন্দারা।

বৃষ্টিতে ভিজে কাহিল হয়ে আছে রাস্তার অবস্থা। সাইকেল চালানোই মুশকিল। কাঁচা রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে হাউনি রয়েছে, হঠাৎ বৃষ্টি এলে বা অন্য কোনো অসুবিধেয় পড়লে পথচারীদের মাথা গোঁজার জন্যে। ওরকম একটা ছাউনিতে সাইকেল রেখে পায়ে হেঁটে এগোলো ওরা। সাথে করে ব্যাগ নিয়ে এসেছে রবিন। তাতে কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আর টর্চ আছে। ব্যাগটা সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে খুলে বেল্টে ঝুলিয়ে নিলো। বাঁধের দিকে পথ ধরলো ওরা, ওদিক দিয়েই যাবে কনডর ক্যাসলে।

আরিব্বাবা, কতো পানি! চলতে চলতে বললো মুসা। আরও বৃষ্টি হলে আর হাঁটার দরকার নেই, সাঁতরেই ফিরতে পারবো।

কনডর ক্যাসলের কাছাকাছি পৌঁছে দেখলো পানিতে টইটম্বুর হয়ে আছে অ্যারোইও। ওটা ঘুরে এসে টিবিটার ওপর দিয়ে চড়তে হবে শৈলশিরায়।

টিবির নরম গা থেকে অনেক ঝোপঝাড় খসে পড়েছে বেশি খাড়া হলে চড়াই যেতো না, ঢালু বলে রক্ষা।

তারপরেও চড়তে অনেক অসুবিধে হলো। যাই হোক, কোনোমতে এসে উঠলো কনডর ক্যাসলের চুড়ায়। ওপর থেকে আজ অন্য দৃশ্য দেখতে পেলো রবিন আর মুসা, সেদিনকার সঙ্গে অনেক পার্থক্য। শুধু সেন্টার গেট দিয়েই বাঁধের পানি উপচে পড়ছে না আজ, পুরো বাঁধটাই যেন ভাসিয়ে নেয়ার মতলব করেছে, ওপর থেকে মনে হচ্ছে একটা বড়সড় জলপ্রপাত। বাঁধের নিচে পাক খেয়ে খেয়ে বয়ে যাচ্ছে পানি, প্রচুর ফেনা, কাউন্টি রোডের পাশের নালা আর খানাখন্দ ভরে দিয়ে বয়ে চলেছে সাগরের দিকে।

কিশোর এই দৃশ্য দেখতে আসেনি। সেদিকে তাকালো বটে, তবে তার মন অন্য চিন্তায় ব্যস্ত। বিড়বিড় করে বললো, কোথায় একজন মানুষ দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকতে পারে?

এখানে তো নিশ্চয়ই নয়, বললো মুসা। গুহা তো দূরের কথা, একটা ফাটলও নেই।

আশেপাশে কোথায় গুহা আছে, পিনটু? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

কি জানি, মাথা চুলকালো পিনটু। আমি বলতে পারবো না। পর্বতের ওদিকে অবশ্য আছে,

না, অতোদূরে নয়, মাথা নেড়ে বললো কিশোর। কাছাকাছি।

বাঁধের ভেতরটা হয়তো ফাঁপা, মুসা বললো।

আরে নাহ,মানতে পারলো না রবিন।

গোপন কোনো খাদ-টাদ থাকতে পারে, বললো কিশোর। যেখানে তাঁবু বা ঝুপড়ি তুলে থাকা যায়। বাইরে থেকে কারো চোখে পড়বে না।

ওরকম কিছুই নেই এখানে, কিশোর, পিনটু বললো। এদিকের সমস্ত পাহাড় আমি চিনি।

শ্রমিকদের বাড়িঘরের কি অবস্থা? রবিন জিজ্ঞেস করলো। নিশ্চয় অনেক কাজের মানুষ ছিলো ডন পিউটোর?

ছিলো। কিন্তু সব কাউন্টি রোডের ধারে, ভালো জায়গায়। একটাও এখন নেই।

পিনটু, জিজ্ঞাসু চোখে পিনটুর দিকে তাকালো মুসা, কাঁচা রাস্তাটা এক জায়গায় দুভাগ হয়ে গেছে দেখেছি। একটা তো এসেছে বাঁধের দিকে, আরেকটা কোথায় গেছে?

পর্বতের ভেতর দিয়ে ঢুকে আবার বেরিয়ে গিয়ে উঠেছে কাউন্টি রোডে, সিনর হেরিয়ানোর এলাকায়।

অ্যারোইওর ওপাশে দূরে একটা পথ দেখিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো মুসা, ওই পথটার সাথে কোনো যোগাযোগ আছে ওটার?

পথ? ভুরু কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো কিশোর, মুসা যা দেখেছে দেখার জন্যে।

হ্যাঁ, হাত তুললো পিনটু, ওই ওটার কথা বলছো তো? আছে। কাঁচা রাস্তা থেকে বেরিয়ে পাহাড় ঘুরে গেছে।

সবাই দেখেছে পথটা এখন। খুব সরু একটা পায়েচলা পথ, চ্যাপারালের ঝোপের ভেতর দিয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের গোড়ায় ওকে জঙ্গলে।

ছাউনি! হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো পিনটু। ভুলেই গিয়েছিলাম! পুরানো একটা ঝুপড়ি আছে। অনেক আগে এক বুড়ো বানিয়েছিলো, থাকতো ওখানে। তক্তা আর টিন দিয়ে। অনেক দিন যাই না।

ডন পিউটোর আমলে ছিলো ওটা? কিশোর জিজ্ঞেস করলো।

ছিলো। ভাইয়ার মুখে শুনেছি, আগে নাকি ওখানটায় একটা অ্যাডাব রুম ছিলো।

লুকানো, অব্যবহৃত, আর যাওয়ার পথটা শুধু কনডর ক্যাসল থেকেই দেখা যায়! উত্তেজিত হয়ে উঠেছে গোয়েন্দাপ্রধান। বোধহয় ওটাই জায়গা!

তাড়াহুড়ো করে আবার নামতে শুরু করলো ওরা। টিবির ঢালে পিছলে পড়া ঠেকাতে পারলো না একজনও, কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল জুতো, প্যান্টে লেগে গেল কাদা। বাঁধ পার হয়ে যেতে হবে। উপচে পড়া পানির দিকে শঙ্কিত চোখে তাকালো কিশোর। ভেঙে-টেঙে পড়বে না তো পানির চাপে?

সব সময়ই ওরকম পানি হয়, পিনটু জানালো। পড়ে তো না। টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

তাহলে চলো,মুসাও ভয় পাচ্ছে এতো পানি দেখে।

নিরাপদেই এসে পায়েচলা সরু পথটায় উঠলো ওরা। পথের দুই পাশে চ্যাপারাল জন্মেছে ঘন হয়ে, মাঝে মাঝে খাটো ওক। এদিকটায় মানুষজন আসে না, কোনো কাজও হয় না, ফলে ইচ্ছেমতো বাড়তে পেরেছে ঝোপঝাড়। একটা পাথুরে পাহাড়ের কাঁধ পেরিয়ে পথটা গিয়ে ঢুকেছে দুটো মাঝারি আকারের পাহাড়ের মধ্যে, গিরিপথ হয়ে গেছে। মেঘলা এই ধূসর দিনে পথটা ছায়াঢাকা, প্রায় অন্ধকারই বলা চলে।

ওই যে, হাত তুলে দেখালো পিনটু।

অনেক গাছপালা আর উঁচু উঁচু ঝোপের মধ্যে, পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে থাকা একটা বড় পাথরের নিচে আড়াল হয়ে আছে ঝুপড়িটা। ওটা যে আছে একথা জানা না থাকলে সহজে কারো চোখে পড়বে না। একচালা টিনের ছাউনি। মরচে পড়ে লাল হয়ে গেছে চাল। কাঠের বেড়া, তক্তার মাঝে বড় বড় ফাঁক। দরজায় ঠেলা দিলো পিনটু। খুলে মাটিতে পড়ে ধুলো ওড়ালো কপাটটা। ওপরের চ্যাপ্টা পাথরটার জন্যে বৃষ্টি পড়ে চালার ওপর। ভেতরটা খটখটে শুকনো।

একটা মাত্র, কাঁচা মেঝে। গারে খুটি ভর রেখেছে চালার। বিদ্যুৎ নেই, জানালা নেই, কোনো আসবাব নেই, শুধু এককোণে পড়ে রয়েছে মরচে পড়া একটা স্টোভ, একসময় ঘর গরম করার কাজে ব্যবহার হতো।

দুতিনটে বছর লুকিয়ে থাকা যাবে এখানে সহজেই, মুসা মন্তব্য করলো। তবে আমি দুই দিন থাকতেও রাজি না।

খুন করার জন্যে যদি সৈন্যরা তেড়ে আসতো, সেকেণ্ড, কিশোর বললো, আর তোমার সাথে থাকতো একটা দামী তলোয়ার, তাহলে তুমিও থাকতে পারতে। তবে জায়গাটা বাজে।

একেবারেই বাজে, বললো রবিন। আর কোনো জায়গাই তো নেই তলোয়ার লুকানোর।

হ্যাঁ, একমত হয়ে মাথা দোলালো পিনটু। মেঝেতে? মাটির দিকে আঙুল তুললো মুসা। পুঁতে রাখেননি তো ডন?

মাথা নাড়লো কিশোর। না। পুঁতলে মাটি খোঁড়ার আলামত বোঝা যেতোই তখন, সৈন্যদের চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা ছিলো। ওই ঝুঁকি নিশ্চয় নেননি ডন… পুরানো স্টোভটার দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো সে। একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপর রয়েছে ওটার পায়াগুলো, পাইপটা চালা ভেদ করে উঠে গেছে। স্টোভটা সরানো যায় না?

চেষ্টা করে দেখা যাক,মুসা বললো।

জোরে ঠেলা দিয়ে দেখলো সে। ভারি জিনিস, তবে নড়লো। নিচের পাথরের সাথে লাগানো নয় পায়াগুলো।

পাইপটা খুলতে পারো নাকি দেখো তো, কিশোর বললো। চেষ্টা করে দেখলো মুসা। খাইছে! মরচে। নড়েও না।

নড়বে কি করে? আঠারোশো ছেচল্লিশ থেকেই আছে হয়তো ওই অবস্থায়। পারলে ভেঙে ফেলে।

রবিনের ব্যাগে যন্ত্রপাতি রয়েছে। ওগুলোর সাহায্যে গোড়া থেকে পাইপটা ভেঙে ফেললো মুসা। তারপর চারজনে মিলে পাথরের ওপর থেকে ভারি স্টোভটা সরিয়ে আনলো ওর। হাঁটু গেড়ে বসে পাথরটা সরানোর চেষ্টা করলো মুসা।

কিছুক্ষণ ঠেলাঠেলি করে জোরে হাউফ করে উঠে বললো, বেজায় ভারি। একলা পারছি না।

দেয়াল থেকে একটা তক্তা খুলে নেয়া হলো। বেশ শক্ত কাঠ। পাথরের নিচে ছোট একটা গর্ত করলো মুসা। সেটাতে ঢুকিয়ে দিলো কাঠের এক মাথা। ওটাকে লিভার হিসেবে ব্যবহার করে, আর অন্য তিনজনের সহায়তায় অবশেষে নড়াতে পারলো জগদ্দল পাথরটাকে। বেরিয়ে পড়লো একটা গর্ত। গর্তের ভেতরে উঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো পিনটু, কি যেন দেখা যাচ্ছে!

ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে বের করে আনলো একটুকরো দড়ি, একটা কাগজ-বয়েসের ভারে হলুদ, আর গোল করে পাকানো একটুকরো ক্যানভাস-বাইরের দিকটায় আলকাতরা মাখানো।

কাগজটার দিকে তাকিয়ে পিনটু বললো, স্প্যানিশে লেখা। এই, আমেরিকান আর্মির একটা ঘোষণাপত্র এটা, তারিখ আঠারোশো ছেচল্লিশের নয় সেপ্টেম্বর। কিছু একটা আইন জারি করা হয়েছিলো।

ক্যানভাসটার ভেতর কি? হাত বাড়িয়ে ওটা নিলো কিশোর। সাইজ তো তলোয়ারের সমানই। ভেতরে আছে নাকি? মোড়কটা খুলে ফেললো সে।

দূর, কিছু তো নেই। বড়ই নিরাশ হলো মুসা।

পিনটু, গর্তে আর কিছু আছে?

রবিন এগিয়ে গেল টর্চ হাতে। গর্তের ভেতর ফেললো। পিনটু হাত ঢুকিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে লাগলো। না, নেই…না না, আছে! ছোট পাথরের মতো…

পাথরটা বের করে আনলো সে। সাধারণ পাথরের মতোই দেখতে। তবে মাটি লেগেও ওরকম হয়ে থাকতে পারে ভেবে প্যান্টের কাপড়ে ঘষে পরিষ্কার করতে লাগলো। ঠিকই ভেবেছে। বেরিয়ে পড়লো ঘন সবুজ উজ্জ্বল রং।

এটা…,রবিন ওরু করলো, শেষ করলো কিশোর, পান্না! নিশ্চয়ই তলোয়ারটা লুকানো ছিলো এখানে প্রথমে এখানেই লুকিয়েছিলেন ডন। পালিয়ে আসার পর সরিয়ে ফেলেছিলেন অন্য জায়গায়। নিশ্চয় তার তখন মনে হয়েছিলো এটা নিরাপদ জায়গা নয়।

ঠিকই ভেবেছেন, রবিন বললো। সহজেই তো ব্বে করে ফেললাম আমরা।

তাহলে নিজেও এখানে লুকাননি, পিনটু বললো, এটাও ঠিক।

হ্যাঁ, একমত হলো কিশোর। পেছনে তাড়া করে আসছিলো ডগলাসেরা। সময় বিশেষ পাননি। তলোয়ারটা ব্বে করে নিয়ে গিয়েই তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলেছিলেন কোথাও, নিজেও লুকিয়ে পড়েছিলেন।

এই কিশোর,হঠাৎ বলে উঠলো মুসা, কিসের আওয়াজ?

কান পাতলো সবাই। বাইরে থেকে আসছে, বেশ জোরালো, ভূমিধস নামার সময় যেমন হয়, অনেকটা এরকম।

বৃষ্টি, রবিন বললো। সব জায়গায় পড়ছে, শুধু ঝুপড়িটার ওপর ছাড়া। বেশ মজা তো।

না, বৃষ্টি না, অন্য শব্দ, মুসা বললো আবার। শুনছো?

মাথা নাড়লো কিশোর। রবিনও শুনতে পায়নি। তবে পিনটু শুনলো। কথা! ফিসফিস করে বললো সে।

ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ঘন ঝোপে লুকিয়ে পড়লো ওরা। একটু পরেই দেখলো গিরিপথ ধরে আসছে সেই তিনজন কাউবয়। ভারি বৃষ্টির মধ্যেও হালকা ভাবে ভেসে আসছে ওদের কথা।

এদিকেই আসতে দেখেছি, শুডু। চারজনকেই। এগোও।

ঝুপড়িটার পাশ দিয়ে চলে গেল লোকগুলো, দেখতে পেলো না ওটা। অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে।

উঠে দাঁড়ালো কিশোর। চলো ভাগি। এসে পড়ার আগেই। আবার কনডর ক্যাসলে যাবো।

লোকগুলো যে ঘাপটি মেরেছিলো, বুঝতে পারেনি ছেলেরা। ওরা বেরোতেই পেছনে চিৎকার করে উঠলো গুডু, ধরো! ধরো!

খিঁচে দৌড় মারার কথা বলে দিতে হলো না চারজনের একজনকেও।

<

Super User