থমথমে নীরবতা। কেউ জানে না কোথায় খুঁজতে হবে। কথাটা যেন প্রচণ্ড আঘাত করে স্তব্ধ করে দিয়েছে সবাইকে। সবার মনেই এক প্রশ্নঃ কোথায় আছে রিড আর জ্যাক?
এতো সহজে কজা হয়ে গেল দুজনে? মুসা মুখ খুললো। নিশ্চয় এয়ারফীল্ডে বিশ্বাসঘাতক রয়েছে, চোরগুলোকে সাহায্য করেছে যে।
থাকতে পারে, কলিউড বললেন। খুব ধীরেসুস্থে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে এই কাজ করেছে। নিশ্চয় নতুন ধরনের কিছু ছিলো প্লেনের ভেতর, যেগুলোর নকশার জন্যেই প্লেন চুরি করেছিলো বিদেশী ওই পাইলটেরা। পালিয়ে তো প্রায় গিয়েই ছিলো। ওদের কপাল খারাপ, পড়লো ঝড়ের মুখে।
ওরা ভেবেছিলো, জিনা বললো, ঝড়র সময় চুরি করাটাই ভালো। আন্দাজ ঠিকই করেছিলো। তখন ওদেরকে পেন চুরি করতে বাধা দিতে আসেনি কেউ। গার্ডেরা নিশ্চয় গিয়ে সবাই ঘরে ঢুকে বসেছিলো।
আমার অবাক লাগছে, কিশোর বললো, এতো কিছু ঘটে গেল ডাউসন আল ডরির নাকের ডগা দিয়ে, অথচ ওরা কিছুই জানলো না?
প্রজাপতি ছাড়া ওদের মাথায় আর কিছু নেই, বিরক্ত গলায় বললো জনি। পুলিশ সহজে ছাড়বে না ওদেরকে। এতো বেকুব যে মানুষ হয়, না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।
এখন কথা হলো, কুটি করলো কিশোর, আমরা কি করতে পারি? এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে তো ইচ্ছে করছে না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কলিউডের দিকে তাকালো সে।
তোমরা আর কি করবে? তিনি বললেন। পুলিশের কাছে খবর এসেছে, দুজন লোক খুব দ্রুত একটা ভ্যান চালিয়ে চলে গেছে। ওদের গতিবিধি সন্দেহজনক ঠেকেছে দুচারজন পথচারীর কাছে। গাড়ির নম্বরও টুকে নিয়েছে ওরা। হতে পারে চোরদুটোই। ওদেরকে যদি পুলিশ ধরে ফেলে, জ্যাক আর রিড কোথায় আছে জানা যাবে। আর তো কোনো উপায় দেখি না।
হতাশায় গুঙিয়ে উঠলো কেউ কেউ। কিছুই করার নেই ওদের। এখানে মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে থাকা আদিম প্রকৃতিতে কোথায় খুঁজবে দুজন বন্দি মানুষকে? খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়েও কঠিন কাজ, প্রায় অসম্ভব।
এখানে বসে বসে ভাবলে তো আর সমস্যার সমাধান হবে না, উঠলেন মিস্টার কলিউড। আমি কাজে যাই। তোর মা কোথায়, জনি?
বাজার করতে গেছে, ঘড়ির দিকে তাকালো জনি। ডিনারের আগেই ফিরবে।
ল্যারিটাও কি ওর সঙ্গে গেল নাকি? ওর কোনো সাড়াশব্দই নেই। বাচ্চাটাকেও নিশ্চয় নিয়ে গেছে?
ও-কি ওটাকে ছাড়া নড়ে নাকি?
হুঁ! বেরিয়ে গেলেন কলিউড।
তিন গোয়েন্দা আর জিনার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে পড়লো জনির, আরে, ভুলেই গিয়েছিলাম! তোমাদের নিশ্চয় খাবারে টান পড়েছে?
হ্যাঁ, মাথা নাড়লো কিশোর। জনির মনের এই অবস্থা, এ-সময়ে তার কাছে খাবার চাইতে লজ্জাই লাগছে তার। ভাগ্যিস পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলো, নইলে এখন আরও খারাপ লাগতো।
রবিন, তুমি আমার সাথে এসো, জনি বললো। যা যা লাগে, নিয়ে নাও।
রান্নাঘরের দিকে চলে গেল দুজনে।
খানিক পরে খাবারের ঝুড়ি নিয়ে ফিরে এলো।
জনি, কিশোর বললো, সকালটা আজ তোমার সাথেই থাকি আমরা, কি বলো? তোমার কাজে সাহায্য করবে।
তাহলে তো খুব ভালোই হয়, উজ্জ্বল হলো জনির মুখ। কাজে সাহায্যের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন তার বন্ধুদের সঙ্গ। বাবাকে কথা দিয়েছিলাম আজ মুরগীর ঘরগুলো পরিষ্কার করবো। তোমরাও হাত লাগালে ডিনারের আগেই সেরে ফেলতে পারবো।
ঠিক আছে, চলো। তোমার কাজ শেষ হয়ে গেলে আমাদের সাথে বেরোতে পারবে। বিকেলে কোথাও একসাথে ঘুরতে যেতে পারবো আমরা।
মুরগীর খোয়াড়ের কাছে শুয়ে থাকতে দেখা গেল ডবিকে। সোজা তার দিকে এগিয়ে গেল রাফিয়ান। সাথী পেয়ে গিয়ে খেলা জুড়ে দিলো দুটোতে।
সারাটা সকাল কঠোর পরিশ্রম করলো ছেলেরা। জিনা ওদেরকে খোঁয়াড় পরিষ্কারের কাজে সাহায্য করতে পারলো না, ওর এসব নোংরা লাগে। সে গিয়ে জনিদের বাগানে ফুল দেখলো। কিছু গাছের মরা পাতা বাছলো। বেড়ে ওঠা পাতা কাঁচি দিয়ে হেঁটে দিলো। ফুল গাছের পরিচর্যা করতে খুব ভালো লাগে তার।
ওদের কাজও শেষ হয়েছে, এই সময় গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ কানে এলো।
নিশ্চয় আন্টি আসছেন, কিশোর বললো। চলো, দেখি।
হাত ধুয়ে ছেলেরা এসে দেখলো, ইতিমধ্যেই যা বলার স্ত্রীকে বলে ফেলছেন মিস্টার কলিউড। শুনে জনির মা-ও উদ্বিগ্ন হলেন। বের করতে না পারলে মরবে তো! পায়ের আওয়াজ শুনে মুখ তুললেন। ও, তোমরা। আমি ভাবলাম ল্যারি।
ল্যারি? ভুরু কোঁচকালো জনি। গাড়িতেই বসিয়ে এসেছিলে নাকি?
গাড়িতে? অবাক হলেন মিসেস কলিউড। তাকে পাব কোথায় বসানোর জন্যে? আমার সঙ্গে যায়নি তো। বাড়িতেই আছে।
কই, বাড়িতে তো নেই। আমরা তো ডাবলাম তোমার সাথে গেছে।
বলিস কি! ভয় দেখা দিলো মায়ের চোখে। আমি তো ভেবেছি তোর কাছে। আছে!
আর আমরা ভেবেছি তোমার সাথে গেছে। গলা কাঁপছে জনির।
জনি, পুকুর! প্রায় কেঁদে ফেললেন মা। জলদি গিয়ে দেখ পানিতে পড়লো কিনা! ল্যারি, ল্যারি, বাপ আমার, কোথায় গেলি…! বলতে বলতে মা-ই ছুটে বেরোলেন ঘর থেকে।
মিস্টার কলিউড বললেন তিন গোয়েন্দাকে, তোমরা পাহাড়ের দিকে চলে যাও। হয়তো ভেড়ার বাচ্চাটা ছুটে গিয়েছিলো। ওটাকে খুঁজতে গিয়ে পথ হারিয়ে থাকতে পারে।
<