আড়তে কোথাও বাতি দেখা গেল না। শুধু তারার আলোয় আবছা মত চকচক করছে পাথরগুলো। গর্তের নিচে কালো অন্ধকার।
সাইকেল দুটো ডিনো আগে দেখল। এখানেই রেখে গিয়েছিলাম ওদের। ওরা এখানেই কোথাও আছে। নইলে সাইকেল থাকত না।
টর্চের আলোয় পাহাড়ের কাটা ধাপগুলোকে মনে হল যেন কোন দানবের সিঁড়ি। গর্তের পানিতে প্রতিফলিত হল আলো। কালো ময়লা পানির দিকে তাকিয়ে প্রফেসর বললেন, পিছলে পড়েনি তো? কণ্ঠ কেঁপে উঠল তার। তাহলে…।
থাক থাক, আর বলবেন না, ভয় পেয়েছে এড।
সিঁড়িগুলো ভালমত দেখছে কিশোর, চকের চিহ্ন খুঁজছে। কার্ডে চিহ্ন না থাকলেও তিন গোয়েন্দার নতুন চিহ্ন নির্ধারিত হয়েছে তারকা। পাওয়া গেল না।
টর্চ আর লণ্ঠন নিয়ে আশেপাশে অনেক জায়গায় খোঁজা হল। কোন চিহ্ন নেই, যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে দুই গোয়েন্দা। শুধু পাথরের সিঁড়ি, গর্তের পুরানো দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জন্মে থাকা প্রায় বিকলাঙ্গ উদ্ভিদ, আর অসংখ্য পাথর—ছোট-বড়-মাঝারি, নানা রকমের, নানা আকারের।
অন্ধকারে হুটোপুটি করছে ছোট ছোট জীব। দুটো সাপ দেখল ওরা, এক পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আরেক পাথরের তলায় গিয়ে লুকাল। কয়োট ডাকল দূরে। নিশাচর বড় পাখি ডানায় ভারি শব্দ তুলে উড়ে যাচ্ছে গাছ থেকে গাছে। খাবারের সন্ধানে ছায়ার মত নিঃশব্দে মাথার ওপর চক্কর মারছে দুর্দান্ত শিকারী হুতোয় পেঁচা।
রবিন আর মুসার কোন সাড়াশব্দ নেই।
আড়তের প্রায় পুরো সীমানাটাই ঘুরে এসেছে ওরা, এই সময় শোনা গেল আওয়াজ।
শুনছ! ফিসফিসিয়ে বলল বোরিস।
কাছেই হচ্ছে শব্দটা, ধাতব।
দেখা যায় কিছু? এড জিজ্ঞেস করল।
না, বললেন প্রফেসর।
আবার হল শব্দ, কাঠের সঙ্গে কাঠের ঘষা, তারপর কাঠের সঙ্গে ধাতব কিছুর।
ওই যে! নিচু কণ্ঠে বলল কিশোর। একটা ছাউনি না? মনে হয় ওখান থেকেই আসছে।
ছাউনিতে শব্দ হচ্ছে। খটখট ঝনঝন করে উঠল কি যেন, ছুট দিল কেউ। টর্চ জ্বালল ডিনো। পাতলা একটা মূর্তিকে ছুটে যেতে দেখা গেল ছাউনির কাছে পার্ক করা ছোট একটা গাড়ির দিকে।
নোবল! চেঁচিয়ে উঠলেন প্রফেসর। ধর, ধর ব্যাটাকে!
আরে, পালিয়ে যাচ্ছে তো, ধর না, গর্জে উঠল ডিনো।
এই নোবল, দাঁড়াও। থাম! প্রফেসর বললেন।
থামল না সে। পৌঁছে গেছে সবুজ ফোক্সওয়াগেনের কাছে। গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। ওটার কাছে কেউ যাওয়ার আগেই শাঁ করে বেরিয়ে গেল কাঁচা রাস্তা ধরে।
আবার পালাল! তিক্তকণ্ঠে বললেন প্রফেসর। শয়তান কোথাকার! নোবলের ব্যাপারে মাথাব্যথা নেই কিশোরের। রবিন আর মুসা কোথায়? ওদের কি করল সে?
ঢোক গিলল এড। নীরব হয়ে রইল অন্যেরা। অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করছে কিশোর। গলা চড়িয়ে ডাকল, রবিইন! মুসাআ!
পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল তার ডাক। কেঁপে কেঁপে সেই শব্দের রেশ মিলানোর আগেই এল জবাব, কিশোওর! আমরা এখানে-এ-এ!
ক্ষণিকের জন্যে স্থির হয়ে গেল সবাই।
আবার শোনা গেল একই কথা, কিশোর। আমরা এখানে এ-এ!
আরে দেখ, প্রফেসর বললেন। ছাউনিতে আলো।
হঠাৎ জ্বলেছে আলোটা। দরজা আর একটা জানালার আবছা কাঠামো চোখে পড়ছে। দৌড় দিল কিশোর। পেছনে অন্যেরা। দরজার কাছে এসে তালা ধরে ঝাঁকি দিল। ভেতর থেকে মুসা বলল, ডানপাশে চলে যাও। একটা জানালায় তালা নেই দেখবে।
জানালার কাছে ছুটে গেল ডিনো। বার খুলে, বোর্ড সরাল। খড়খড়ি তুলে উঁকি দিল দুই গোয়েন্দা।
খাইছে! হাসিমুখে বলল মুসা। ভেবেছিলাম আজ রাতে বেরোতে পারব।
লোকের সাড়া পেয়ে আলো নিভিয়ে দিয়েছিলাম, রবিন বলল। ভেবেছি, শত্রু। শত্রুই। দরজার তালা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেছে, পারেনি। শেষে এই জানালাটা খুঁজে বের করেছে। বার খোলার আগেই বোধহয় তোমরা এসে গেলে।
নোবল শয়তানটা এসেছিল, তপ্তকণ্ঠে বললেন প্রফেসর।
ও নিশ্চয় আটকায়নি তোমাদের, ডিনো বলল। কতদূর কি হয়েছে দেখতে এসেছিল বোধহয়, আমাদের দেখে পালিয়েছে।
যাকগে। বেরিয়ে এস, বোরিস বলল।
মাথা নাড়ল রবিন। আপনারা ভেতরে আসুন। একটা সূত্র পাওয়া গেছে।
উত্তেজিত হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল এড। তারপর কিশোর। একে একে অন্যেরাও ঢুকল। বিশাল শরীর নিয়ে ছোট জানালা দিয়ে ঢুকতে বেশ অসুবিধে হল বোরিসের।
ডেস্কের ওপর রাখা ফাইলটা দেখাল রবিন।
স্পেশাল অর্ডার নম্বর একশো তেতাল্লিশ, জোরে জোরে পড়ল কিশোর। বি. ডাইয়ের জন্যে লাগবে : দশটা স্কয়ার-কাট মনুমেন্ট স্টোনস। এ্যানিটের। দেখতে একই রকম হওয়া চাই সবগুলো। মুখ তুলল গোয়েন্দাপ্রধান। মনুমেন্ট স্টোনস?
এত বড় পাথর দিয়ে কি করেছিল বাওরাড ডাই? মুসা বলল। স্মৃতিসৌধ বানিয়েছে?
নীরবে মাথা নাড়ল শুধু কিশোর, কি বোঝাতে চাইল বোঝা গেল না।
ফ্যান্টম লেকে কোন স্মৃতিসৌধ নেই, ডিনো বলল।
কাছাকাছি অন্য কোথাও আছে? জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর।
কোন শহরে গিয়ে বানায়নি তো? এড বলল।
না, ধীরে ধীরে বলল কিশোর। আমি শিওর, নোরিয়ার চমক ফ্যান্টম লেকেই অপেক্ষা করছে। জার্নালের লেখার আর কোন মানে হতে পারে না।
নোরিয়ার চমক বানানোর জন্যে প্রতিবারেই বাড়ি ফিরে এসেছেন বাওরাড।
কিন্তু সেটা লুকাল কিভাবে? প্রফেসর বললেন। এমনই বুদ্ধি করে লুকিয়েছে, এত বছরেও কারও চোখে পড়ল না।
তাকালেই হয়ত দেখি, রবিন বলল। সেজন্যেই চোখে পড়ে না। চোখের সামনে যে জিনিস থাকে, সেটাই সহজে চোখে পড়ে না।
চোখে পড়ার দরকার নেই, হঠাৎ বলে উঠল মুসা। জাহান্নামে যাক গুপ্তধন। আগে খাওয়া দরকার। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
হেসে উঠল সবাই। ছিন্ন হল টান টান উত্তেজনা, হালকা হয়ে গেল পরিবেশ।
চল, আমাদের ওখানেই খাবে, আমন্ত্রণ জানাল এড। ফোন করে বাড়িতে জানিয়ে দিয়ো।
উত্তম প্রস্তাব, হেসে বললেন প্রফেসর। আমার মত বুড়োকে খাওয়াতেও নিশ্চয় মুখ কালো করবেন না মিসেস ডাই।
<