দ্রুত বাড়ছে পানি।

গুহার দেয়ালে জন্মে থাকা জলজ আগাছা আঁকড়ে ধরে আছে ওরা। ঝাঁপাঝাঁপি করছে পানি দেয়ালে দেয়ালে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাইছে ওদেরকে তাক থেকে। আর বেশি বাকি নেই, ছাতে গিয়ে ঠেকবে পানি। এত দেরি করছে কেন বিড়বিড় করল মুসা। কাঁপছে ঠাণ্ডায়, ভয়ে। তার মনে হচ্ছে, এক যুগ আগে গড়িয়ে পড়েছিল ছোট পাথরটা। চমকে উঠেছিল ওরা। খানিক পরেই ডাক শোনা গিয়েছিল। কিশোরের। বিপদে আছে, জানিয়েছে মুসা। তার মানে সাহায্য আসবেই। কিন্তু আর কত দেরি?

অপেক্ষা ছাড়া করার আর কিছুই নেই। কাজেই অপেক্ষা করতে লাগল ওরা। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বেলে দেখে নিচ্ছে, ছাতে পানি ঠেকতে আর কত বাকি ব্যাটারিও ফুরিয়ে এসেছে। আলোর উজ্জ্বলতা নেই। তবু, অন্ধকারে স্নান ওই আভাটুকুই সাহায্য করছে অনেক।

শোন! হঠাৎ বলল পাপালো। মোহর পেয়েছি, এটা ফাঁস করব না আমরা।

কেন?? জানতে চাইল রবিন। এখানে কি করতে এসেছি, বলতে হবে না?

বলব ড়ুবে ড়ুবে সাঁতার কাটছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়ে গেল গর্তটা! বুঝলাম সুড়ঙ্গ। ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে ঢুকে পড়লাম, বলল পাপালো। মোহর পেয়েছি বললে ফিরে এসে আবার খোঁজার সুযোগ হারাবা।

হারালে হারাব, বলল রবিন। এখানে দ্বিতীয়বার আর ঢুকতে চাই না। আমি। মোহরের বস্তা পড়ে থাকলেও না। যার খুশি এসে নিয়ে যাক।

আমারও একই কথা, সায় দিয়ে বলল মুসা। পাপালোকে বলল, এত ভাবছ কেন? যা মোহর ছিল, সব তুলে নিয়েছি আমরা। আর নেই। জোয়ারের সময় কোনভাবে এসে পড়েছিল হয়ত। ভেবো না, সিন্দুকফিন্দুক নেই এখানে।

তা হয়ত নেই, কিন্তু বালির তলায় আরও মোহর থাকতে পারে, বোঝানোর চেষ্টা করল পাপালো। এটাই আমার শেষ সুযোগ। আরেকটা নৌকা কিনতে হবে, বাপকে বাঁচাতে হবে। কটা মোহর পেয়েছি? চল্লিশ? পঞ্চাশ? তিন ভাগের এক ভাগ কাটা হবে? নৌকাই তো কিনতে পারব না।

ঠিক আছে, পাপালোর কথা মেনে নিল রবিন। আপাতত ব্যাপারটা ফাঁস করব না আমরা। আরেকবার খুঁজে দেখার সুযোগ…

মুসা আমান আর আসছে না। এই গুহায়া বাধা দিয়ে বলল গোয়েন্দা সহকারী। তুমি আসতে চাইলে আসতে পার, পাপু। কোথায় মোহর পেয়েছি কাউকে না বললেই তো হল।

মোহর পেয়েছি, এই কথাটাও গোপন রাখতে চাই এখন, থলেতে আঙুলের চাপ শক্ত হল পাপালোর। একবার কেন, আরও দশবার আসতেও ভয় পাব না। আমি। কপাল খারাপ তাই বিপদে পড়ে গেছি। কে ভাবতে পেরেছিল, সুড়ঙ্গমুখে এসে নৌকা আটকাবে? এমন ঘটনা সব সময় ঘটে না।

জোসেফ আর কিশোর কতখানি কি করছে, কে জানে! গুঙিয়ে উঠল মুসা। কোস্ট গার্ডকে খবর দিতে গিয়ে থাকলেই সেরেছে। ফিরে এসে আর পাবে না আমাদেরকে।

নৌকাটা সরাতে শক্তি দরকারম বলল রবিন। ভেঙে ফেলতে হবে, কিংবা শাবল দিয়ে চাড় মেরে বের করে নিতে হবে।

অনেক সময় লেগে যাবে তাতে, ঢেউয়ের ধাক্কায় কাত হয়ে গেল মুসা। আগাছা আঁকড়ে ধরে সামলে নিল। তাক থেকেই ফেলে দেবে। দেখছি… হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কমসে কম দুঘণ্টা তো লাগবেই। ততক্ষণে আমরা শেষ।

কিশোর জেনেছে আমরা এখানে আছি, নিরাশ হচ্ছে না রবিন। কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবেই ও। ঠিক বের করে নিয়ে যাবে। আমাদের, দেখা।

সেই প্রার্থনাই কর, নিচু গলায় বলল পাপালো।

***

মুসার কাছ থেকে সাড়া পাবার পর মাত্র পনেরো মিনিট পেরিয়েছে।

তীর থেকে শখানেক ফুট দূরে ভাসছে এখন মোটর বোট। ইঞ্জিন নিউট্রাল। হাল ধরেছে কিশোর। জোসেফ ডুবুরির পোশাক পরছে।

পাগলামির সীমা থাকা উচিত। আপনমনেই বিড়বিড় করল। জোসেফ। ওয়েট বেল্ট আটল কোমরে। বোটের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। ফিরে চাইল। এখানেই থাক। পরিস্থিতি দেখে আসি আমি। কোস্ট গার্ডকে খবর দেয়ার সময় আছে কিনা কে জানে! ফেস মাস্ক টেনে দিল সে। একটা আন্ডারওয়াটার টর্চ হাতে নিয়ে নেমে গেল পানিতে।

বড় একা একা লাগছে কিশোরের। দক্ষিণে অনেক দূরে এক সারি নৌকা, মাছ ধরা শেষ করে ফিরে চলেছে ফিশিংপোর্টে। এদিকে কেউ আসবে না। গুহায় আটকা পড়ে মরতে বসেছে তিন বন্ধু। ওদেরকে কি উদ্ধার করতে পারবে শেষ পর্যন্ত? মুসা যা বলল, সুড়ঙ্গমুখে বেশ শক্ত করেই আটকেছে। ভাঙা নৌকা।

অতি ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে যেন সময়। কিশোরের মনে হল এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল, জোসেফ গেছে মাত্র পাঁচ মিনিট আগে। আরও পাঁচ মিনিট পরে ভেসে উঠল। জোসেফের মাস্কে ঢাকা মুখ। দ্রুত উঠে এল সে বোটে। মাস্ক সরাল মুখ থেকে। চেহারা ফ্যাকাসে, উদ্বিগ্ন।

সাংঘাতিক শক্ত হয়ে আটকেছে। বলল জোসেফ। কোথাও ধরে যে টান দেব, সে জায়গাই নেই। কোস্ট গার্ডকেই খবর দিতে হবে। শাবল কিংবা ক্রো-বার ছাড়া হবে না।

জোসেফের মুখের দিকে চেয়ে আছে কিশোর। তাতে তো অনেক সময় লাগবো কমপক্ষে দুঘণ্টা!

আস্তে মাথা ঝাঁকাল জোসেফ। তা-তো লাগবেই। কিন্তু আর কি করার আছে? বড় কোন গর্ত নেই টিলার। থাকলে ও পথে দড়ি নামিয়ে দিয়ে টেনে তোলা যেত।

জোসেফের কথা কানে ঢুকছে কিনা কিশোরের, বোঝা গেল না। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে সে।

মিস্টার গ্র্যাহামা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। নৌকাটাকে টেনে বের করে আনলেই হয়।

টেনে বের করবা ভুরু কুঁচকে গেল জোসেফের। কি করে?

মোটর বোটের সাহায্যে, বলল কিশোর। খুব শক্তিশালী ইঞ্জিন এই বোটটার। নোঙরের দড়িও অনেক লম্বা। নোঙরের একটা আকশি নৌকায় গেঁথে…

কিশোর, তুমি একটা জিনিয়াস! চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ। ঠিক বলেছ! এখুনি যাচ্ছি। আমি!

দ্রুত হাত চালাল জোসেফ। ক্যাপস্ট্যান থেকে খুলে আনল দড়িসহ নোঙর। দড়ির অন্য মাথা বাঁধল বোটের পেছনের একটা রিঙবোল্টে। পানিতে ছুড়ে ফেলে দিল নোঙর।

আমি যাচ্ছি। দড়ি ধরে তিনবার টানব। ফাস্ট-গিয়ারে দিয়ে আস্তে আস্তে জোর বাড়াবে। নৌকাটা সুড়ঙ্গমুখ থেকে খসে এলে বুঝতেই পারবে। থেমে যাবে তখন। গুহায় ঢুকে ওদেরকে বের করে আনব আমি। …আর হ্যাঁ, টানতে টানতে হঠাৎ যদি সামনে লাফ দিয়ে ছুটতে শুরু করে বোট, বুঝবে, নৌকা থেকে নোঙর খসে গেছে। এখানে নিয়ে আসবে। আবার বোট। আমার ওঠার অপেক্ষা করবে। ঠিক আছে?

মাথা ঝোঁকাল কিশোর।

নেমে গোল জোসেফ।

আবার অপেক্ষার পালা। দড়ি ধরে বসে রইল কিশোর। দুরুদুরু করছে বুকের ভেতর। একবার টান পড়ল দড়িতে। নোঙর গাঁথছে হয়ত জোসেফ। এক মিনিট কাটল.. দুই মিনিট… হঠাৎ টান পড়ল দড়িতে। জোরে জোরে, তিন বার।

লাফ দিয়ে উঠে এল কিশোর। ড্রাইভিং সিটে বসেই গিয়ার দিল। ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল বোট। তারপর থেমে গেল। হঠাৎ করেই। টান টান হয়ে গেছে দড়ি।

এক্সিলেটরে চাপ বাড়াচ্ছে কিশোর। হুইলে হাতের আঙুল চেপে বসেছে। নোঙর বাঁধা দড়ির মতই টান টান হয়ে গেছে তার স্নায়ু। গর্জন বাড়ছে শক্তিশালী ইঞ্জিনের।

প্রথম কয়েক মুহূর্ত কিছুই ঘটল না। তারপর সামনে বাড়তে লাগল। বোট, ধীরে, অতি ধীরে। এক ইঞ্চি দুইঞ্চি করে। বিশাল মরা তিমিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে যেন টাগবোট। হঠাৎ সামনে লাফ দিল বোট। সেরেছে—ভাবল কিশোর। গেছে হয়ত ছুটে। কিন্তু না, যতখানি জোরে ছোটা উচিত তত জোরে এগোচ্ছে না তো বোটা তারমানে নৌকাটা আটকে আছে নোঙরে। ওটাকে টেনে নিয়ে চলেছে বোট। বিশ ফুট… পঞ্চাশ ফুট… একশো ফুট দূরে গিয়ে ইঞ্জিন নিউট্রাল করে দিল কিশোর। প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে দাঁড়াল বোটটা।

সিট থেকে উঠে পেছনে চলে এল কিশোর। কোমরের বেল্ট থেকে ছুরি খুলে নিয়ে কেটে নিল দড়ি। ফিরে এসে বসল। আবার ড্রাইভিং সিটে।

আবার আগের জায়গায় বোট ফিরিয়ে নিয়ে এল কিশোর। অপেক্ষা করতে লাগল। এক মিনিট… দুই মিনিট… ভুসস করে বোটের পাশেই ভেসে উঠল একটা মাথা। জোরে শব্দ করে শ্বাস নিল পাপালো হারকুস। বোটের গা ঘেঁষে এল। থলেটা ছুড়ে দিল ভেতরে। চেঁচিয়ে বলল, জলদি লুকাও ওটা! ভেতরে মোহর কারও কাছে ফাঁস করা চলবে না এখন।

হাত ধরে আগে পাপালোকে বোটে উঠতে সাহায্য করল কিশোর। তারপর ভেজা থলেটা তুলে নিয়ে সিটে রেখে ওটার ওপরেই বসে পড়ল। লুকানোর এর চেয়ে ভাল জায়গা আর নেই বোটে।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল পাপালো, এই সময় ভেসে উঠল রবিন। পরীক্ষণেই মুসা। দুজনকে উঠতে সাহায্য করল কিশোর আর পাপালো।

যাক, উদ্ধার করলে শেষ পর্যন্ত! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। বাঁচার আশা ছিলই না!

জোসেফের ভাবভঙ্গিতে মনে হল, খুব রেগে গেছে, বলল রবিন।

সব শুনলে বাবাও খেপবে! কথার ধরনেই বোঝা গেল, ভয় পাচ্ছে মুসা। তবে যা-ই হোক, কিছু মোহর পেয়েছি। পাপু বলেনি?

থলেটার ওপরেই বসে আছি, বলল কিশোর। এখন মোহরের কথা থাক। পরে সব শুনিব।

কাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে, পিঠে বাঁধা গ্যাস ট্যাংক খুলতে খুলতে বলল রবিন। কিন্তু দোষ আমাদের নয়। পাপালোর নৌকাটাকে

চুপ! রবিনকে থামিয়ে দিল কিশোর। জোসেফ। সব জানানোর দরকার নেই ওকে। রেখেঢেকে বলবে।

বোটের পাশে ভেসে উঠেছে জোসেফ। এক হাতে দড়ির কাটা প্ৰান্ত। বাড়িয়ে দিল ওটা। ধরল কিশোর। বেঁধে দিল ক্যাপস্ট্যানের সঙ্গে। তাড়াতাড়ি এসে বসল। আবার সিটে।

বোটে উঠে এল জোসেফ। ধীরেসুস্থে খুলে নিল ফেস মাস্ক, ফ্লিপার, গ্যাস ট্যাংক।

নীরবে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। ওদের দিকে তাকাল জোসেফ। তারপর? খুব তো দেখালে!

আমরা… শুরু করেও থেমে গেল রবিন।

হাত তুলেছে জোসেফ। আর সাফাই গাইতে হবে না। যা করার করেছি। তবে তোমাদের ডাইভিং এখানেই শেষ। গোয়েন্দাগিরিও। মিস্টার আমানও তাই বললেন। শুরু থেকেই আমার মত ছিল না। বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে কাজ হবে না কিছুই। শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা!

নীরব রইল ছেলেরা।

পাপালোর দিকে ফিরল জোসেফ। তারপর? চোরের কি খবর? অনেক হারামীপনা করেছ, এবার জেল খাটগে।

জোসেফ কি বলছে, কিছুই বুঝতে পারল না ছেলেরা।

হাঁ করে আছ কেন? পাপালোর দিকে চেয়ে বলল জোসেফ। গতরাতে একটা ট্রেলারের জানালা ভাঙা হয়েছে। ছোট ফোকর। বড় মানুষ ঢুকতে পারবে না। ওই ফোকর দিয়ে, গোটা দুয়েক দামি লেন্স চুরি গেছে। কম করে হলেও হাজার ডলার দাম। ভুল করে একটা ছুরি ফেলে গেছে চোর। স্থির চোখে পাপালোর দিকে তাকিয়ে আছে সে। ছুরিটা কার, জােন? তোমার! আর জানালার ওই ফোকর দিয়ে তোমার পক্ষেই ঢোকা সম্ভব।

বোবা হয়ে গেছে যেন চার কিশোর। হাঁ করে চেয়ে আছে জোসেফের দিকে।

তোমার শয়তানী খতম, বলল জোসেফ। হোভারসনকে খবর দেয়া হয়েছে। ফিশিংপোর্টে ফিরে গিয়েই তার দেখা পাবে। কপালে তোমার অনেক দুঃখ আছে, পাপালো হারকুস, এই বলে দিলাম।

<

Super User