প্রথম কয়েক মাইল রকিং এইচের পথ ধরেই গেল জুলিয়াস। তারপর সবার। অলক্ষ্যে র‍্যাঞ্চে পৌঁছবার জন্যে রাস্তা ছেড়ে অন্য পথ ধরল। যে কেউ ওর। ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখে দেখে সহজেই ওকে অনুসরণ করতে পারবে। কিন্তু সে বিষয়ে চিন্তিত নয় জুলিয়াস। ওর এখন একমাত্র চিন্তা মেডকের আগে তাকে র‍্যাঞ্চে পৌঁছতে হবে। লোকটা বুদ্ধিমান, জুলিয়াস কোথায় যাচ্ছে তা আন্দাজ করা ওর পক্ষে কঠিন হবে না।

বেয়ার ট্র্যাপ ক্রীক ঘুরে খামার বাড়ির পিছন দিকে উপস্থিত হলো জুলিয়াস। র‍্যাঞ্চটা খালি খালি দেখাচ্ছে-মাড়ি ছাড়া মেডকের বাকি সব লোকজনকে শহরে দেখে এসেছে সে। নিশ্চয়ই বাড়ি পাহারা দেয়ার জন্যেই রেখে যাওয়া হয়েছে ওকে। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে কারণ যে কোন সময়ে শেরিফ সহ কিংবা তাকে ছাড়াই মেডক এসে হাজির হবে এখন।

লঘু পায়ে দৌড়ে এক ছুটে বাড়ির কাছে চলে এল জুলিয়াস। বাড়িটার সামনের দিকের কোনায় এসে উঁকি দিল সে। কেউ নেই। তার মনে পড়ল, গতবার মাডি বাড়ির ভিতরেই ছিল। সম্ভবত এখনও তাই আছে। পিছনের দরজায় গিয়ে দেখল ওটা ভিতর থেকে বন্ধ। আবারও জানালা দিয়েই ঢুকতে হবে তাকে। কপাল ভাল ওর, পেপির ঘরের জানালাটা খোলা রয়েছে। জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকল জুলিয়াস। বিছানার ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে পেপি, দেয়ালের দিকে ফিরানো ওর মুখ।

চট করে দরজাটা বন্ধ করে এল জুলিয়াস। বিছানার কাছে ফিরে এসে ঝুঁকে পেপির কানে-কানে ফিসফিস করে বলল, কোন শব্দ কোরো না, পেপি, এখনি তোমার বাঁধন কেটে দিচ্ছি আমি।

মুখ ফিরিয়ে জুলিয়াসের দিকে চাইল পেপি। করুণ দেখাচ্ছে ওর চেহারা। গালে চোখের পানি শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে। উদ্ভ্রান্ত শূন্য চাহনি। ভয় আর বিষাদ যেন গ্রাস করেছে ওকে।

ছুরি বের করে পেপির বাঁধন কেটে দিল জুলিয়াস। ওরা মেরে ফেলেছে ওকে, হঠাৎ বলে উঠল পেপি।

কাকে? এডকে?

কাঁপা গলায় সে বলল, এডকে ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। ওকে নিয়ে যাবার একটু পরেই গুলির আওয়াজ শুনলাম। ফিরে এসে বলল এড ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই নিয়ে হাসাহাসি করছিল ওরা। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল পেপি!

যুক্তির সাথে মিলছে না কথাগুলো। এই অবস্থায় এডকে মেরে ফেললে ওরা পেপির সম্পত্তি কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবে? মেডকের পুরো প্ল্যানের চাবিকাঠিই তো এড?

চুপ করে এখানেই অপেক্ষা করো তুমি, মাডির একটা ব্যবস্থা করে তোমাকে নিতে ফিরে আসব আমি।

দরজায় কান পেতে কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনে বারান্দায় বেরিয়ে এল জুলিয়াস। ঘরে খুব নিচু স্বরে কথা বলেছে ওরা, মাডি নিশ্চয়ই শুনতে পায়নি। পিছন ফিরে বাবার ঘরের খোলা দরজাটা দেখল জুলিয়াস। বাবার সাথে দেখা করা দরকার ওর-কিন্তু এখন সময় নেই। মাড়িকে কাবু করাই এখন তার প্রধান কাজ। পিস্তল বের করে পা টিপে টিপে বৈঠকখানার দিকে এগোল সে।

হাতের বামপাশের দরজাটা পার হয়ে এগোবার সময়ে পিছন থেকে পায়ের। শব্দ কানে এল ওর। পেপি ওকে অনুসরণ করছে মনে করে ফিরে চাইল জুলিয়াস। ভুল! মাডি আসছিল তার পিছনে পিস্তল ওঠারার সময় পেল না জুলিয়াস; তার আগেই মাডি পিস্তলের ব্যারেল দিয়ে আঘাত করল ওর মাথায়। চারদিক আঁধার হয়ে এল-জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল জুলিয়াস। বিফল হয়েছে সে।

জ্ঞান ফিরে জুলিয়াস দেখল গোলাঘরে শুয়ে আছে সে। তার হাত-পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা। এখনও দিনের আলো রয়েছে-তারমানে বেশিক্ষণ অজ্ঞান ছিল না সে। কিন্তু তাতে কোন লাভ নেই, এখান থেকে ছাড়া পার্বার আর কোন সম্ভাবনাই তার নেই।

যন্ত্রণায় মাথাটা দপদপ করছে। পেটের ভিতরটা গুলাচ্ছে-গা বমি-বমি লাগছে। নিজের বোকামির জন্যে নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছে। সে মনে করেছিল তার পিছন দিক থেকে পেপিই আসছে। কিন্তু এমন কঠিন অবস্থায় মানুষের একটা ভুলই যথেষ্ট। এখন তাকে অসহায়ভাবে মেডক ফিরে আসা পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে। তারপর মেডক যে কি করবে তা ভাবতেই জুলিয়াসের গা শিউরে উঠছে। একটু কাত হয়ে পাশ ফিরে অন্যদিকে চাইল সে। গোলাঘরে সে একা নয়, এডও রয়েছে! মরেনি সে। ঘরের একটা খুঁটির সাথে বাধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এড।

জুলিয়াস ডাকল ওকে, এড…কতক্ষণে তোমার জ্ঞান ফিরবে তাই ভাবছিলাম, জবাব দিল সে। তুমি ধরা পড়লে কিভাবে?

তোমাকে আর পেপিকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিতে এসেছিলাম…কিন্তু পারলাম না। মাডির হাতে ধরা পড়ে গেলাম।

আমাদেরও শহরে যাওয়া আর হয়নি। আমারই আগে থেকে সাবধান হওয়া উচিত ছিল-মেডক ব্যাপারটা আঁচ করে আমাদের বন্দী করেছে।

পেপিকে সে জানিয়েছে তোমাকে মেরে ফেলা হয়েছে।

স্বাভাবিক। ওর মনোবল ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করছে মেডক। আজ রাতে আমাকে আবার পুনর্জীবিত করা হবে-মেডক আশা করছে ততক্ষণে পেপি আমাদের জীবন বাঁচাবার জন্যে যে-কোন কিছু সই করতে রাজি হবে।

কি সই করবে ও?

আগামী দিনের তারিখে একটা চুক্তি সই করিয়ে আমাদের মেরে ফেলা হবে। পরে সেই চুক্তিপত্র মেডকের নামে পোস্ট করে পাঠানো হবে দূরের কোন শহর থেকে সবাইকে বলা হবে আমরা বেড়াতে গেছি-চিঠি পাওয়ার পরে জানানো হবে যে আমরা আর ফিরব না, তাই সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে চাই। তারপরে বিক্রির চুক্তিপত্র দেখানো হবে সবাইকে।

এখন তুমি কি করবে বলে ঠিক করেছ?

কি আর করতে পারি আমি? লড়ার চেষ্টা করতে পারি-কিন্তু কি লাভ হবে তাতে? হাত বাঁধা অবস্থায় থাকতে থাকতে এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কেউ বাঁধন কেটে হাতে পিস্তল ধরিয়ে দিলেও অসাড় হাতে গুলি ছুঁড়তে পারব না আমি। হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠেছে এডের চেহারায়।

দেখি কি করা যায়, অনিশ্চিতভাবে বলল জুলিয়াস।

পেপির কি অবস্থা?

হাল ছেড়ে দিয়েছে-ওর কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশাও করা যায় না।

ওরা কোন রকম নির্যাতন করেনি?

না।

যাক, তবু কিছুটা বক্ষা। ওরা যদি…’ কথা শেষ না করেই কান খাড়া করে মনোযোগ দিয়ে কি যেন শুনল সে। তারপর আবার বলল, আর সময় নেই, ওরা এসে গেছে।

শব্দ জুলিয়াসের কানেও গেছে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। কয়জন এল তা ঠিক বোঝা গেল না। উঠানে কথা বলার শব্দ হওয়ার অল্প পরেই গোলাঘরে ঢুকল মেডক। ওর পিছনে একে একে হিউ, হোয়েল, ফক্সি, হোরেস আর মাডি ঘরে ঢুকল। জারভিসও রয়েছে ওদের সাথে।

খুশিতে পেঁতো হাসি হেসে মাডি বলল, ওকে আমি শেষ করতে পারতাম, কিন্তু তোমার জন্যে জিইয়ে রেখেছি-ভাল বকশিশ পাব তো?

সে দেখা যাবে, বলে এগিয়ে এল মেডক। ওর চোখ দুটো খুশিতে চকচক করছে। শহরে শেরিফের অফিসের সামনে ওর ভিত্তিতে নাড়া পড়েছিল। কিন্তু এখন ওর চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জারভিসের দেখা পাওয়ার পর থেকেই পরিবর্তন এসেছে ওর মধ্যে।

নিজেই এসে ধরা দিয়েছ? মুখের ভাবে খুশি চাপতে পারছে না মেডক। ভালই হয়েছে, আমাদের ঝামেলা অনেক কমিয়ে দিয়েছ।

আমাকে দিয়ে কিছু করাতে পারবে না তুমি, জবাব দিল জুলিয়াস।

কিন্তু আমাদের সাহায্য তুমি ঠিকই করবে। এক ঢিলে দুই পাখি মারব আমি। বুড়োটা মর-মর অবস্থায় টিকে রয়েছে অনেকদিন-লোকজন জানবে তুমি তার ঘরে ঢুকে হট্টগোল বাধিয়েছিলে। ওই ঘরেই বুড়োর লাশের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাবে তোমার মৃতদেহ।

আড়ষ্ট হয়ে গেল জারভিস। হতবুদ্ধি দেখাচ্ছে ওকে। এতদিন সে এটাকে একটা খেলা হিসাবেই নিয়েছিল। কচি বয়সে বড় কর্তা সেজে ওর ভালই লাগছিল। কিন্তু তার পরিণতি যে এইরকম দাঁড়াবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সে। বিস্মিত কণ্ঠে আপত্তি জানাল জারভিস, আবোল-তাবোল এসব কি বকছ, মেডক? আমার মনে হয়…

ওকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে ধমকে উঠল মেডক। চুপ করো! তোমার কি মনে হয় তা কেউ জানতে চায়নি। বড়দের কথার মধ্যে কথা বোলো না। তুমি-যাও, বাইরে গিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে এসো।

রূঢ় আঘাতে কল্পনার রাজ্য থেকে মাটিতে নেমে এল জারভিস। এখন সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে তার ভাই ভালর জন্যেই তাকে সাবধান করেছিল, বোঝাতে চেয়েছিল-কিন্তু সে-ই জুলিয়াসকে ভুল বুঝে ওর কোন কথাই শোনেনি। এখন আর সময় নেই। মেডকের এতজন লোকের বিরুদ্ধে সে একা কি করতে পারবে? নাহ, সব শেষ হয়ে গেল তার বোঝার ভুলে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে-জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল জারভিস। গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না ওর। স্পষ্ট বুঝতে পারছে বিরোধিতা করতে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু।

তোমাকে যা বলা হচ্ছে তাই করো, জারভিস, জুলিয়াসই ওর একটা সুরাহা করে দিল।

কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল জারভিস। অস্পষ্ট কণ্ঠে সে বলল, আমাকে তাহলে বাড়িতে ঢুকতে হবে-এই ধার করা বুট নিয়ে কোথাও যাওয়া যায় না।

ওর কথা শুনে হেসে উঠল মেডক। জারভিসকে নিয়ে আসলে কোন ভয়ই নেই তার। মেডকের কথা মতই সে উঠবে বসবে। লঘু কণ্ঠেই সে বলল, ঠিক আছে, তুমি জামাকাপড় ছেড়ে বাবু সেজেই না হয় বাইরে যেয়ো। হোয়েল, ওই দু’জনের পায়ের বাঁধন কেটে ওদের বাড়িতে নিয়ে এসো-পেপির সাথে কথা বলার সময় হয়েছে।

জুলিয়াসের পায়ের বাঁধন কেটে দিয়ে ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল হোরেস। এডের বাধন কাটছে হোয়েল। জারভিস অন্যদের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল।

শেষটা সুখের হলো না, তিক্তভাবে মন্তব্য করল এড।

ঠিক মত দাঁড়াতেও পারছে না সে। হোয়েল ওকে ধরে সাহায্য করল। সেই সাথে সাবধান করল, কোন রকম চালাকির চেষ্টা কোরো না, এড। দরকার হলে পিস্তল ব্যবহার করব আমি।

গোলাঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো ওরা। উঠানের মাঝখানে পৌঁছে দেখল সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হঠাৎ থমকে দাড়িয়েছে জারভিস।

অবিশ্বাস ভরা চোখে দরজার দিকে চেয়ে রয়েছে সে।

ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল জুলিয়াস। অন্যেরাও দাঁড়িয়ে গেছে। দরজায় একজনের আবির্ভাব ঘটল-সেবাস্টিন দত্ত! তার দু’হাতে দুটো পিস্তল দেখা যাচ্ছে। ক্ষীণকায় আর দুর্বল দেখাচ্ছে তাকে, কিন্তু পিস্তল দিয়ে উঠানের সবাইকে কাভার করে আছেন তিনি। গমগমে গলায় কথা বলে উঠলেন সেবাস্টিন, গলার স্বরে দুর্বলতার চিহ্নমাত্র নেই। কি হচ্ছে এখানে? আমার ছেলেকে কে বেঁধেছে?

কথাকয়টা জুলিয়াসের কানে অমৃতের মত শোনাল। বাবা তাহলে সত্যি সত্যি রাগ করেননি তার ওপর। এডের কথাই ঠিক, তার জীবন রক্ষা করার জন্যেই বাধ্য হয়ে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

সেবাস্টিন দত্তের পিছন পিছন পেপি বেরিয়ে এল। ওর হাতেও পিস্তল। হঠাৎ এডের দিকে চোখ পড়তেই তার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সব ভুলে এডের দিকে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই সেবাস্টিন দত্ত নিচু গলায় তাকে কি যেন বললেন। থেমে দাড়িয়ে সে আবার সতর্কভাবে উঠানের লোকগুলোর ওপর নজর রাখল।

আশপাশের সবাইকে একবার আড়চোখে দেখে নিল জুলিয়াস। আড়ষ্ট হয়ে আছে সবাই। প্রায় সবারই হাত রয়েছে নিজের পিস্তলের ব্যাটের ওপর-কিন্তু কেউ সাহস করে পিস্তল বের করছে না। সবাই চাইছে আর কেউ ঝুঁকি নিয়ে কাজটা করুক।

মেডক তার লোকজনকে নিচু গলায় নির্দেশ দিল, সতর্ক থাকো। বুড়োর শরীর দুর্বল, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

সেবাস্টিন দুর্বল হলেও তাকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আড়চোখে জারভিসের দিকে চেয়ে ধমকে উঠলেন তিনি, হাঁ করে চেয়ে কি দেখছ। জলদি তোমার ভাই আর এডের বাঁধন কেটে দাও। তাড়াতাড়ি করো।

দিচ্ছি, বাবা, উৎসাহের সাথে জবাব দিল জারভিস। ওর গলা শুনে মনে হচ্ছে এই আদেশে খুশিই হয়েছে সে। জুলিয়াসের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে ছুরি দিয়ে হাতের দড়িটা কাটতে শুরু করল জারভিস। ছুরিটা ভোঁতা, কাটতে সময় লাগছে অনেক।

মেডক! কঠিন গলায় আদেশ করলেন সেবাস্টিন দত্ত। সামনে এগিয়ে এসো।

গভীর একটা শ্বাস নিয়ে এক পা এগিয়েই আবার থেমে দাঁড়াল মেডক।

আরও কাছে! গর্জে উঠলেন সেবাস্টিন। নাকি ওখানে দাড়িয়েই মরতে চাও তুমি?

আর এক পা এগিয়ে এসেই কথা শুরু করল মেডক। বোঝাই যাচ্ছে, ইচ্ছা করে দেরি করিয়ে সেবাস্টিনের দুর্বলতার সুযোগ নিতে চায় সে। আপনি ভুল করছেন, সেবাস্টিন। ধৈর্য ধরে এক মিনিট

অনেক শুনেছি আমি। আমার কামরায় এসে তুমি যা যা বলেছ সবই মনে আছে আমার। তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি, মনে আছে?

সবার থেকে কয়েক পা আগে নিশ্চল অবস্থায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে মেডক। ওর হাত এখনও পিস্তলের বাটের ওপরই রয়েছে। জুলিয়াস বুঝতে পারছে মুহূর্তে পিস্তল বের করে গুলি করবে মেডক। এখনও জারভিস তার হাতে বাধা দড়িটা কাটছে।

কেউ বাধা দিতে এসো না, চিৎকার করে বললেন সেবাস্টিন। মেডক, এটা শুধু তোমার আর আমার ব্যাপার-তৈরি হও।

নিমেষে পিস্তল বের করে আনল মেডক, কিন্তু সে গুলি করার আগেই সেবাস্টিনের গুলি তার ডান হাতের কজি ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে গেল। আবার গুলি করলেন সেবাস্টিন। এবারের গুলিটা মেডকের বাম হাতে লাগল। পরের গুলি দু’টো লাগল তার দুই পায়ে। মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় কাটা মুরগীর মত ছটফট করছে মেডক।

কেমন লাগছে এখন? সেবাস্টিনের কথায় এতদিনের জমানো আক্রোশ ফুটে উঠেছে। বুড়ো মিয়া-না? আমার র‍্যাঞ্চ নেবে? আরও লোকজন নিয়ে এসো-তবু পারবে না।

আবার গুলি করলেন সেবাস্টিন। মেডকের কাতরানি থেমে গেল। ওর দেহটাও জন্মের মত স্থির হয়ে গেল।

বাঁধন মুক্ত হয়েছে জুলিয়াস, কিন্তু হাত দুটো এখনও পিছন দিকেই ধরে রেখেছে ও। জারভিস এডের বাঁধন কাটার কথা ভুলে গিয়ে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রয়েছে মেডকের মৃতদেহের দিকে। আড়চোখে কে কোথায় আছে দেখে নিল জুলিয়াস। মেডক মারা পড়লেও ওরা বিপদমুক্ত হয়নি এখনও। মেডকের লোকেরা সৰাই ভয়ঙ্কর আর সশস্ত্র।

হিউ, হোয়েল আর এড রয়েছে জুলিয়াসের, বামে। ডানদিকে ফক্সি, হোরেস আর মাডি। জারভিস এখনও তার পিছনেই দাড়িয়ে। অল্প-অল্প করে সরে ডানদিকে ফক্সির কাছে পৌঁছা’নোর চেষ্টা করল জুলিয়াস। ফক্সির পিস্তলটা ওর বাম দিকে ঝুলছে-বাঁ-হাতি লোক সে। কিন্তু ওর পিস্তলটা ছিনিয়ে নিয়েও হিউ আর হোয়েল, দু’জনকে একসাথে ঘায়েল করা জুলিয়াসের পক্ষে অসম্ভব।

তাছাড়া ডানদিকের তিন জন তো থাকছেই।

এডের সাথে জুলিয়াসের চোখাচোখি হলো। সামান্য মাথা ঝাঁকাল এড। জুলিয়াস বুঝে নিল এডও একই কথা ভাবছে। দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেবাস্টিন। হাতে পিস্তল দু’টো দৃঢ়ভাবে ধরা থাকলেও কঠিন অসুখের পর এত উত্তেজনায় কাহিল হয়ে পড়েছেন। পেপিকে তিনি কি যেন বললেন। পেপি একটু এগিয়ে এসে বলল, সবাই পিস্তল ফেলে দাও। এক্ষুণি! ওর গলাটা খুব চড়া শোনাল।

এক মুহূর্ত সবাই চুপ। হঠাৎ নিচু গলায় হোয়েল বলে উঠল, হিউ, তুমি বুড়োটাকে সামলাও। আমি…

কথা শেষ করার সুযোগ পেল না সে। হাত বাঁধা অবস্থাতেই ওর ওপর ডাইভ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এড। এক লাফে সামনে এগিয়ে ফক্সির পিস্তলটা তুলে নিল জুলিয়াস। পিস্তল হাতে ঘুরে দাঁড়াতেই একটা গুলির শব্দ হলো। এড ঠিক সময় মত ঝাপিয়ে পড়ায় গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে জুলিয়াসের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। পিছনে কেউ আর্তনাদ করে উঠল।

এড আর হোয়েল দু’জনেই ধরাশায়ী হয়েছে। হিউ চট করে একটু ঘুরে জুলিয়াসের দিকে ফিরল। গুলি করল জুলিয়াস-একটা, পরক্ষণেই আবার। গুলির ধাক্কায় প্রথমে একপা পিছিয়ে গেল হিউ, তারপরেই আধপাক ঘুরে মাটিতে পড়ল। ফক্সি দু’হাত শূন্যে তুলে চিৎকার করে বারবার জানাচ্ছে সে। আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু হোরেস হাল ছাড়েনি, সে বারান্দার ওপর সেবাস্টিন আর পেপিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। জুলিয়াসের অব্যর্থ গুলিতে হুমড়ি খেয়ে। পড়ে গেল সে। মাডিকে পেট ধরে দু’ভাঁজ হয়ে বসে পড়তে দেখল জুলিয়াস। মুহূর্তে এক হাঁটুর ওপর চট করে ঘুরেই সে দেখল গড়িয়ে এডের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পিস্তল তুলেছে হোয়েল। আর মাত্র দুটো গুলি আছে জুলিয়াসের পিস্তলে। হোয়েলকে লক্ষ্য করেই পিস্তলটা খালি করল সে। নিজের গুলি শেষ হতেই হোয়েলের পিস্তলটা ছিনিয়ে নিতে ওর দিকে ছুটে গেল জুলিয়াস। কিন্তু তার আর দরকার ছিল না-হঠাৎ করেই থেমে গেল যুদ্ধ।

মেডক আগেই মরেছে। হিউ, হোয়েল, হোরেস আর মাড়ি ধরাশায়ী। কেবল ফক্সি আত্মসমর্পণ করেছে। জারভিস পিস্তল হাতে সবাইকে কাভার করে দাঁড়িয়ে আছে। সে-ই গুলি করেছে মাডিকে।

বারান্দার দিকে চাইল জুলিয়াস। তার বাবা এখনও নিজের পায়েই খাদ্যে আছেন। দেয়ালের সাহায্য নিচ্ছেন না তিনি। এডের দিকে ছুটে যাচ্ছে পেপি।

উঠে বসতে বসতে এড বলল, দেখা যাচ্ছে পিস্তল চালানো ভালই শিখেছ তুমি।

জবাব দেয়ার দরকার বোধ করল না জুলিয়াস। সে জানে পিস্তলে তার হাত যত ভালই হোক না কেন, এড ওভাবে হোয়েলের ওপর ঝাপিয়ে না পড়লে আজ আর তার রক্ষা ছিল না।

এডের কাছে পৌঁছে হাটু গেড়ে বসে বাঁধন খুলতে খুলতে ওকে হাজারো প্রশ্ন করতে আরম্ভ করল পেপি। বারান্দা থেকে বজ্রগম্ভীর স্বরে সেবাস্টিন দত্ত, হাঁকলেন, বসে থেকো না, জুলিয়াস, জলদি উঠে এসব আবর্জনা সরাও উঠান থেকে।

চটপট উঠে দাঁড়াল জুলিয়াস। আমি সব ব্যবস্থা করছি, বাবা, তুমি ভিতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। অনেক ভাল বোধ করছে সে এখন। আবার সব যেন আগের মত হয়ে গেছে। বাবা যে এতদিন অসুস্থ ছিলেন তা মনেই হচ্ছে না।

অনেক বিশ্রাম নিয়েছি আমি, জবাব দিলেন সেবাস্টিন। এই খামার ঠিকমত চালাতে হলে একজন শক্ত লোকের দরকার।

একঘণ্টা পর শেরিফের সাথে নডি, জনি আর বোকো সহ আরও দশ-বারোজন লোক ঘোড়ায় চেপে রকিং এইচে এসে হাজির হলো। মেডক, হিউ আর হোয়েল মারা গেছে, হোরেস আর মাড়ি আহত, কিন্তু প্রাণে বাঁচবে। ফক্সিকে হাতকড়া পরিয়ে দিল ডিগবি।

আমি ভাবতেও পারিনি তলে তলে এইরকম একটা কাণ্ড ঘটতে পারে, বিস্ময় প্রকাশ করল ডিগবি। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি আমি জুলিয়াসের বাবাকে সুস্থ দেখে। আমরা তো ভেবেছিলাম…

হ্যাঁ, বাবাই ডাক্তারকে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন যেন তিনি সত্যিকথা কাউকে না জানান, জবাব দিল পেপি। ডাক্তার নাথান অ্যাশওয়ার্থই প্রথম টের পান যে বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন, আর রাতে তিনি রোজ একটু একটু করে ব্যায়ামও করছেন শক্তি বাড়াবার জন্যে।

কিন্তু কাউকে দিয়ে আমাদের খবর দিলেই তো হত? প্রশ্ন করল নডি।

তাতে তথা অনেক নির্দোষ লোক মারা যেত, জবাব দিলেন স্বয়ং সেবাস্টিন দত্ত। তোমরা খবর পেলেই লোকজন নিয়ে সাহায্য করতে ছুটে আসতে-মেডক ছাড়ত না। তার চেয়ে এই ভাল হয়েছে। বিছানার তলায় পিস্তল আমি অনেকদিন থেকেই লুকিয়ে রেখেছিলাম। মেডককে যে-কোন সময়ই মারতে পারতাম-কিন্তু ওদের সবার সঙ্গে এক সাথে যুঝতে পারার মত শক্তি সঞ্চয় করার জন্যেই এতদিন অপেক্ষা করেছি আমি।

পেপির ওপর সবাইকে আপ্যায়ন করার ভার দিয়ে ঘোড়া নিয়ে শহরের পথে বেরিয়ে পড়ল জুলিয়াস। অনেকটা পথ যেতে হবে তাকে তার জন্য একজন অপেক্ষা করে আছে।

দরজায় টোকা দিতেই খুলে দিল লোলা। বেশ রাত হয়েছে, এতক্ষণ লোলা জেগে বসে থাকবে আশা করেনি সে। ওকে দেখে জুলিয়াসের মনটা খুশি হয়ে উঠল। একটু পাশে সরে দাঁড়িয়ে জুলিয়াসকে ভিতরে ঢোকার জায়গা করে দিল লোলা। উৎকণ্ঠায় আড়ষ্ট হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

যত জলদি সম্ভব চলে এলাম, বলল জুলিয়াস।

অপেক্ষায় থেকে থেকে আমার মনে হচ্ছিল যেন কত যুগ পার হয়ে গেল, নিচু অস্ফুট গলায় বলল: লোলা।

যাক, এখন আর চিন্তা মেই-এসে পড়েছি আমি। ওদিককার সব ঝামেলা চুকে গেল। কি হয়েছে শুনতে চাও?

এখন না, কেন এসেছ তুমি?

জুলিয়াসের মুখে দুষ্টুমির হাসি। জানো না? তোমার জন্যেই তো এলাম।

তাহলে আর অপেক্ষা কিসের?

এগিয়ে গেল জুলিয়াস। লোলাও এগিয়ে এসে মিলিত হলো ওর সাথে। নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলো ওরা।

শোবার ঘরের দরজা খুলে দৃশ্যটা কিছুক্ষণ সস্নেহ চোখে উপভোগ করল আইডা বেইলি। তারপর ওদের অজান্তেই একটু মুচকি হেসে আবার নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

<

Super User