কলিনের খামার থেকে ক্রেস্টলাইন শহর বেশ কিছুটা দূরে। বিকেল নাগাদ শহরে পৌঁছল জুলিয়াস। আস্তাবলে ঘোড়া রাখতে গিয়ে ক্লান্ত জুলিয়াস। আড়ষ্টভাবে নেমে দাঁড়াল।
ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ফিলিক্স গ্রেস ওকে চিনতে পেরেই অবাক হয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, আরে! জুলিয়াস না? আমরা ভেবেছিলাম…
কি ভেবেছিলে?
হাসল ফিলিক্স। না, ও কিছু না। আমরা শুনেছিলাম ডেনভারে একটা গোলমালে জড়িয়ে পড়েছ তুমি। নিশ্চয়ই ভুল খবর। যাক, তুমি ফিরে এসেছ দেখে খুশি হয়েছি।
আজ সকালেও জারভিস ডেনভারে গোলমালের কথা কি যেন উল্লেখ করেছিল। পেপিও একই কথা তুলেছিল। এসব গুজব কে ছড়িয়েছে? ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা দরকার।
আমার ঘোড়ার ভালমত যত্ন কোরো, ফিলিক্স। দানা খাইয়ে শরীরটা ডলে দিয়ো।
ঘোড়াটা কখন দরকার তোমার?
জানি না, তবে তাড়া নেই। বিশ্রাম দরকার ওর।
সত্যি তুমি ফিরে আসায় খুব খুশি হয়েছি আমি, আবার বলল সে।
ফিলিক্সের বয়স হয়েছে। প্রায় অথর্ব হয়ে পড়েছে। অত্যধিক মদ খায় বলে কেউ ওর কথায় গুরুত্ব দেয় না। পার্কে তার কোন দাম নেই, তবু ওর আন্তরিকতায় নিজেকে আর অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছে না জুলিয়াসের। কেউ ওর কথায় নির্ভর করে না। পার্কে তার কোন দাম নেই, তবু ওর কথায় নিজেকে আর অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছে না জুলিয়াসের।
কিন্তু কতক্ষণ সে এইরকম ভাল বোধ করবে কে তা জানে? জনমত খুব সাংঘাতিক জিনিস। যখন তার বাসায় থাকা একান্ত প্রয়োজন, তখনই সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল। সেই সময় কিছু একটা গুজব ছড়িয়েছে এখানে তার নামে। তার ওপর আজই বাবা যে, তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন সেই খবরটাও জানাজানি হয়ে যাবে। অনেকের কাছেই খবরটা খুব রসাল হবে।
এখন থেকে তো রকিং এইচ খামার তুমিই চালাবে, কি বলো?
বিরক্তি বোধ করছে জুলিয়াস। মাত্র ফিরেছি আমি, এখনও কি করব না করব কিছু ঠিক করিনি, জবাব দিল সে।
উঠান পার হয়ে রাস্তায় চলে এল জুলিয়াস। সেলুনের সামনে কয়েকটা ঘোড়া বাঁধা রয়েছে। বস্টন স্টোরের বারান্দায় দু’জন লোক দাঁড়িয়ে। তিনটে বাচ্চা ছেলে নাপিতের দোকানের সামনে মার্বেল খেলছে। শেরিফের অফিসের সামনে একটা বড় কুকুর বসে আছে-অর্থাৎ শেরিফ অফিস ঘরেই আছে।
ডাক্তারের সাথে দেখা করে তার কাছ থেকেই বাবার সঠিক অবস্থাটা জেনে। নিতে হবে। শেভ সেরে খাওয়া-থাকার একটা জায়গাও খুঁজে নিতে হবে তাকে। থাকার জায়গা নিয়েই বেশি চিন্তা। ক্রেস্টলাইনে কোন আবাসিক হোটেল নেই। মাঝেমধ্যে কেউ বেশি মদ খেয়ে ফেললে তাকে সেলুনেই থাকার জায়গা করে দেয় মালিক অ্যালেন কারভার। ডাক্তার নাথান অ্যাশওয়ার্থের বাসায় অতিরিক্ত কামরা আছে, তবে সেগুলো তার রুগীদের জন্যেই রাখা থাকে। মিসেস ল্যাঙলী দু’এক সময় ঘর ভাড়া দেয়, কিন্তু বুড়ি এত বেশি কথা বলে যে ওখানে থাকলে দু’দিনেই মাথা খারাপ হয়ে যাবে তার।
প্রথমে শেভ করবে বলে এগোল জুলিয়াস। শেরিফের অফিস পার হবার সময় পিছন থেকে ডাক শুনে দাঁড়াল সে। ঘুরে দেখল দরজায় ডিগবি নোবলকে দেখা যাচ্ছে।
জানালা দিয়ে তোমাকে দেখলাম, ডিগবি বলল, তাড়া আছে নাকি তোমার?
না, তাড়া কিসের? জবাব দিল জুলিয়াস।
তাহলে ভিতরে এসো, একটু আলাপ করা যাক। মাথা ঝাঁকিয়ে ওর প্রস্তাবে রাজি হলেও মনে মনে বিরক্তই হলো জুলিয়াস। কেন যেন লোকটাকে মোটেই সহ্য করতে পারে না সে।
ডিগবির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। শক্ত ভারি দেহ-কিন্তু মেদ নেই তার শরীরে। কালো চুল, ঘন ভুরু এবং সরু করে ছাঁটা গোঁফ আছে পাতলা ঠোঁটের ওপরে। সহজে হাসে না সে-অন্তত জুলিয়াসের সামনে তো নয়ই।
অফিস ঘরে ঢুকল ওরা। বোর্ডে কয়েকজন আসামীর ছবি ঝুলানো।
শুনেছি বাইরে ছিলে তুমি, বলল শেরিফ। কোথায়?
আর একটু আলাপ হলে ওখানেই শেষ হয়ে যেত। প্রশ্ন শুনেই রাগে রক্ত চড়ে গেছিল জুলিয়াসের মাথায়-সে কি করে আর কোথায় যায় এসব তার নিজস্ব ব্যাপার! রাগ সামলে সে জবাব দিল, একটু বাইরে বেড়িয়ে এলাম।
তোমার ডেনভারে যাওয়ার ব্যাপারে কি যেন শুনলাম।
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল জুলিয়াস। মানুষ গুজব নিয়ে কি রকম মাথা ঘামায়! হঠাৎ হেসে উঠে সে বলল, হ্যাঁ, ডেনভারেও গিয়েছিলাম আমি।
শুনলাম তোমাকে নিয়ে কিছু গোলমাল বেধেছিল ওখানে?
হ্যাঁ, ছয়জন মানুষ খুন করেছি, দুটো ব্যাঙ্ক-না, দুটো না, তিনটে ব্যাঙ্ক ডাকাতিও করেছি!
উত্তরটা শেরিফের কাছে মজার কথা বলে মনে হলো না। একটু চড়া সুরেই সে বলল, বাজে কথা রেখে কি ঘটেছিল তাই বলো।
ডেনভারে টেলিগ্রাম করেই জেনে নিয়ো।
তাই হয়তো করব।
খুশি তোমার, আর কিছু?
হ্যাঁ, কোন কারণে দরকার হলে তোমাকে কোথায় পাব? একটু আগে জারভিসের কাছে শুনলাম তুমি আর রকিং এইচে থাকছ না।
অবাক হলো জুলিয়াস। খবরটা ছড়িয়ে দিতে মোটেও দেরি করেনি ওয়া।
এখন তাহলে কি করবে বলে ভাবছ? আবার প্রশ্ন করল ডিগবি। অনিশ্চিতভাবে হাত নেড়ে সে বলল, এখনও ঠিক করিনি কিছু।
জারভিস বলল পার্ক ছেড়ে নাকি চলে যাচ্ছি তুমি?
বললাম তো, ঠিক নেই।
এদিকে কোন চাকরি নেই, থেকে কি করবে?
চাকরি একটা সব সময়েই পাওয়া যাবে।
তুমি পাবে না। যাদের রেকর্ড খারাপ তাদের চাকরি নেই এখানে।
রাগ চাপতে জানালার দিকে ফিরল জুলিয়াস। শেরিফকে ভালমত দু’কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু ঝামেলা করে লাভ নেই। ব্রায়েন চাইল্ডের কথা মনে পড়ল–তার সাথে শহরে দেখা করবে বলছিল লোকটা। এখন হাজতে ঢুকে কাজ নেই। কিছু একটা তাকে বলতে চেয়েছিল ব্রায়েন। হয়তো এমন কিছুই নয়, আবার তা গুরুত্বপূর্ণ কথাও হতে পারে। ব্রায়েনই তাদের বাসার সবচেয়ে পুরোনো আর বিশ্বাসী মানুষ। বাবার খুব কাছের লোক সে। কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ওর সাথে জুলিয়াসের কথা হওয়া দরকার।
আজ পর্যন্ত পার্কে কোনদিন কোন ঝামেলা হয়নি, গম্ভীর স্বরে বলল ডিগবি। এখন হোক, তা আমি চাই না।
তোমার কথার মানে?
সবাই জানে পিতা ইচ্ছা করলে কুসন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে ত্যাজ্য করতে পারে। তোমার যদি ভ্রান্ত ধারণা থাকে যে রকিং এইচ খামারে এখনও তোমার অধিকার আছে তবে তা এই মুহূর্তেই ত্যাগ করো। ঝামেলা বাধাতে যেয়ো না।
চারদিকে একবার চেয়ে দেখে কাষ্ঠ হাসি হাসল জুলিয়াস। আমার তো মনে হচ্ছে তুমি ঝামেলাই চাইছ, শেরিফ?
তোমাকে জানিয়ে দিলাম কোন রকম পাগলামি-ছাগলামি বরদাস্ত করব না আমি, বুঝেছ?
আর কিছু?
না, আপাতত যা বললাম সেটা মনে রাখলেই চলবে।
শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল জুলিয়াস। একটা প্রিং ওয়্যাগন শহরে এসে ঢুকল। ড্রাইভ করছে বোকো, পাশে তার স্ত্রী হেলেন। শহরের পশ্চিমে ওদের খামার। বোকো দম্পতির সাথে জুলিয়াসের বেশ ভাল খাতির। অনেকবারই তাদের র্যাঞ্চে দাওয়াত খেয়েছে সে। হেলেন দেখতে এখনও সুশ্রী, খুব ভাল রাধুনী বলেও পার্কে নাম আছে তার। ওদের দেখেই হাত নাড়ল জুলিয়াস, উৎফুল্লভাবে উত্তরে বোকোও কি যেন বলল। কিন্তু, হেলেন ওকে দেখেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। নিচু স্বরে স্বামীকে কিছু বলতেই সে রেগে উঠে বকুনি দিল। কিন্তু হেলেন অটল-জুলিয়াসের দিকে আর মুখ ফিরাল না সে। এসবের মানে কি? হেলেনের কাছে সব কিছুই খুব ভাল, নয়তো খুব খারাপ-মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। মনে হচ্ছে জুলিয়াস ডেনভারে কি করেছে সেই সম্বন্ধেই কোন কিছু শুনেছে সে। গুজবটা সত্যিই তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।
এগিয়ে নাপিতের দোকানে ঢুকে পড়ল জুলিয়াস। চুল ছাটা আর দাড়ি শেভ করার ফাঁকে পার্কের যতসব ঘরোয়া খবর শোনাল রকি। বিভিন্ন খদ্দেরের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করে সেগুলো আবার অন্যদের শোনায় সে। বোকোর র্যাঞ্চে কবে আগুন লেগেছিল, নডির লোক দরকার, ওর খামারের দু’জন লোক কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে, ফ্রেডের ছেলেমেয়েদের সবার হাম হয়েছে, এইসব খবর থেকে শুরু করে মিসেস বেলের আবার বাচ্চা হবে, এই খবরও পেয়ে গেল জুলিয়াস।
রকিং এইচের খবর তো তোমাকে দেয়াই হয়নি, জুলিয়াসের মুখে ব্রাশ দিয়ে সাবান ঘষতে ঘষতে বকবক করেই চলল রকি।
বল, যোগান দিল জুলিয়াস।
তোমাকে যে বের করে দেয়া হয়েছে এটা আমাদের কাছে নতুন খবর কিছু নয়। তুমি বাইরে যাওয়ার পর থেকেই জারভিস বুক ফুলিয়ে শহরে ঘুরে বেড়ায় যেন সে-ই সর্বেসর্বা। আসলে পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে মেডক। ওকে সাহায্য করছে হোয়েল কিড় আর হিউ হার্পার-দু’জনেই নামকরা বন্দুকবাজ।
জারভিসের আর কি খবর?
জুয়া খেলায় খুব মত্ত।
হারে?
গত সপ্তাহেই দু’হাজার ডলারের বেশি হেরেছে। সেবাস্টিন দত্তের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দ্রুত নামিয়ে আনছে সে।
আর আমার কথা? আমার কথা কি শুনেছ তুমি?
আমি ধরেই নিয়েছি ওটা গুজব।
হাসল জুলিয়াস। ভাল কথা, কিন্তু গুজবটা কি?
ওরা বলে ডেনভারে কাকে যেন খুন করেছ তুমি।
ব্যস, এইটুকু?
না, মেয়ে-ঘটিত একটা ব্যাপার আছে। মেয়েটির স্বামী নাকি তোমাকে তার ঘরে হাতেনাতে ধরেছিল।
কথাটা কে ছড়িয়েছে?
ঠিক কোথা থেকে বা কার কাছে থেকে ছড়িয়েছে বলা মুশকিল। যতদূর মনে পড়ে আমি প্রথম শুনি রকিং এইচেরই কর্মচারী চাকের মুখে। অ্যালেন কারভার শুনেছে হোয়েল কিডের কাছে। কে যেন বলছিল ডেনভারের একটা কাগজেও বেরিয়েছে এই খবর।
গুজবটাকে এখনই গলা টিপে মারতে না পারলে জুলিয়াসকে এর জের অনেক বছর পর্যন্ত টানতে হবে। কিছু একটা করা দরকার-রকিকেই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল সে।
রকি, ওই খবরের কাগজটা বা আমি ডেনভারে কাউকে গুলি করেছি এর কোন প্রমাণ যদি কেউ দেখাতে পারে, তাকে আমি এক হাজার ডলার পুরস্কার দেব-কথাটা একটু ছড়িয়ে দিতে পারবে? হাজার ডলার দেয়ার মত টাকা ব্যাঙ্কে জমা আছে আমার নামে।
বুদ্ধিটা ভাল, এতে কাজ হবে বলেই মনে হয়-ঠিক আছে, কথাটা আমি ছড়িয়ে দেব, প্রতিশ্রুতি দিল রকি।
রকির ওখান থেকে বেরিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকল জুলিয়াস। আইডা, বেইলি, আর তার মেয়ে লোলা, দু’জনে মিলে রেস্টুরেন্টটা চালায়। রাতের ডিনার খাবার সময় এখনও হয়নি। তাকে দেখেই লোলা জানাল অল্পক্ষণের মধ্যেই খাবার তৈরি হয়ে যাবে। রান্নাঘর থেকে ওকে এক কাপ কফি এনে দিয়ে একটু গল্প করার জন্যে জুলিয়াসের টেবিলেই বসল সে।
ছিমছাম লম্বা গড়ন লোলার। সোনালী চুল, নীল চোখ। ওর ধারণা মুখের তিল দুটো তার সৌন্দর্যহানি ঘটিয়েছে। কিন্তু জুলিয়াসের মনে হয় ওতেই আরও সুন্দর দেখায় তাকে। সবাই খুব পছন্দ করে লোলাকে। পার্কের অনেক যোগ্য পুরুষই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কেন যে মেয়েটা আজও বিয়েতে রাজি হয়নি বুঝতে পারে না জুলিয়াস।
সামনাসামনি বসে টেবিলের ওপর ঝুঁকে নিজের দুই তালুতে মুখ রেখে জুলিয়াসের দিকে কৌতূহলী চোখে চেয়ে দেখছে লোলা।
কি হলো, অমন করে চেয়ে কি দেখছ? জিজ্ঞেস করল জুলিয়াস।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোলা। কেমন ছিল ডেনভারের সেই মেয়েটা? খুব সুন্দর?
অপরূপ! ডবল সুন্দরী-দুটো মাথা ছিল ওর!
তাই বুঝি পালিয়ে এলে? ওই মেয়েটার জায়গায় আমি হলে কিন্তু কিছুতেই তোমাকে যেতে দিতাম না। ওই গল্পের একটা অক্ষরও বিশ্বাস করিনি আমি। কি করব, কপাল খারাপ, তুমি জিনা গেইলের প্রেমে বিভোর, নইলে কবেই তোমাকে সোনার শিকলে বেঁধে ফেলতাম।
জুলিয়াস হেসে বলল, আমার চেয়ে অনেক ভাল ভাল পাত্র তোমার পথ চেয়ে বসে আছে জানি। কবে মনস্থির করবে বলো তো?
বিয়ে কি করতেই হবে?
সবাই তো করে।
মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল লোলা। জেরিকে তোমার কেমন মনে হয়?
বোকোর খামারে কাজ করে জেরি। সচ্চরিত্র, কম কথা বলে, কিন্তু কাজের লোক।
ভাল লোককেই বেছে নিয়েছ-ঝুলে পড়ো।
ওকে বিয়ে করব বলিনি আমি-ওর সম্পর্কে তোমার মত জানতে চেয়েছিলাম।
ভাবছ তাহলে?
হয়তো-এমনও হতে পারে ভাবতে ভাবতেই বুড়ি হয়ে যাব। তোমার কি মনে হয় আদর্শ আইবুড়ি হওয়াই লেখা আছে আমার কপালে?
কক্ষনো না!
রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাকে লোলাকে উঠতে হলো। আরাম করে গা এলিয়ে বসল জুলিয়াস। লোলার মনের ভাব জেনে খুশি হয়েছে সে। জেরি লোকটার কোন মিথ্যা আড়ম্বর নেই। কাজ করে টাকা জমাচ্ছে সে। সন্দেহ নেই ভবিষ্যতে একদিন জায়গা-জমি কিনে নিজেই খামার করবে ও।
লোলা ওর খাবার নিয়ে এল। জুলিয়াসের খাওয়ার মাঝেই কয়েকজন লোক ঢুকল রেস্টুরেন্টে। ওদের মধ্যে নডি কোলম্যান সোজা এগিয়ে এসে জুলিয়াসের টেবিলেই বসল। সরল লোক। কোন রকম ভণিতা না করেই সে জিজ্ঞেস করল, শুনলাম তুমি নাকি রকিং এইচ ছেড়ে চলে এসেছ?
আত্মসম্মান বাঁচিয়ে বললে ওভাবেও বলা যায়।
কথাটা তাহলে সত্যি?
দুঃখজনকে হলেও সত্যি।
তুমি আমার খামারে চলে এসো না কেন? তোমার কাজের যোগ্য পারিশ্রমিক দেব আমি। কাজের লোক খুব দরকার আমার। চাও তো একটা চুক্তিতে আসতে পারি আমরা।
বেঁটে, স্বাস্থ্যবান আর পরিশ্রমী লোক নডি কোলম্যান। তিন ছেলে-মেয়ের সাপ সে। ওর স্ত্রীর সাথেও জুলিয়াসের আলাপ আছে-মহিলাকে তার বেশ ভালই লাগে। নডির হয়ে কাজ করতে আপত্তি নেই ওর। কিন্তু কথা হচ্ছে পার্কেই থাকবে কিনা সেটা এখনও ঠিক করেনি সে।
নডি, তোমাকে কি জবাব দেব বুঝতে পারছি না, ধীরে ধীরে বলল জুলিয়াস। সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে, ভেবে দেখার জন্য কিছু সময় দরকার আমার।
ঠিক আছে, কাজ করতে করতেই চিন্তা কোরো তুমি-আপাতত দৈনিক হিসেবে নাও? পরে চিন্তা করে দেখো কি করবে।
ঘোড়াটাকে বিশ্রাম দিচ্ছি, তাই আজ রাতে আর যেতে পারছি না।
কেন পারবে না? সহজে ছাড়ার পাত্র নয় নডি। ফিলিক্সের কাছ থেকে। অন্য একটা ঘোড়া নিয়ে নাও, তোমারটা পরে এক সময়ে ফেরত নিয়ে নিয়ো।
বোকো আর হেলেন এসে ঢুকল। জুলিয়াসদের কাছেই একটা টেবিলে বসল ওরা। বোকো জুলিয়াসের সাথে কথা বললেও হেলেন মুখ ঘুরিয়েই থাকল।
নডির খাবার নিয়ে এল লোলা। কয়েক মিনিট পরেই আবার ওদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল সে।
একটা খবর শুনলাম, জুলিয়াস, শান্ত গলায় বলল লোলা। তোমাদের খামার থেকে একজন লোক এসেছিল, সে বলল রকিং এইচে পিস্তল পরিষ্কার করার সময়ে দুর্ঘটনায় ব্রায়েন মারা গেছে।
একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল জুলিয়াসের শিরদাঁড়া বেয়ে। চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠে আবার ধপ করে বসে পড়ল সে। ব্রায়েন মারা গেছে? পিস্তল পরিষ্কার করতে গিয়ে দুর্ঘটনা? বিশ্বাস হচ্ছে না তার। শিথিল ভাবে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল সে।
খুবই দুঃখের কথা, বলে উঠল নডি। চমৎকার লোক ছিল ব্রায়েন। খুব সাবধানীও ছিল। কি করে এমন ঘটল?
কোন জবাব দিল না জুলিয়াস। তার বলে উঠতে ইচ্ছে করছে এটা কখনোই দুর্ঘটনা হতে পারে না-এটা খুন! কিন্তু প্রমাণ কই? গোলাগুলি নাড়াচাড়ায় এসব হতেই পারে। ঘটনাকে ওভাবে সাজানোও হয়ে থাকতে পারে। যাই হোক, ব্রায়েন আর তার সাথে শহরে দেখা করতে আসছে না। ওর যাই বলার থেকে থাকুক সেটা না বলাই রয়ে গেল।
তোমার সাথে পরে বাইরে দেখা হবে, নডি, উঠে দাঁড়াল জুলিয়াস। কিছু বোঝাপড়া আছে তার।
রকিং এইচের কয়েকটা ঘোড়া বাঁধা রয়েছে সেলুনের সামনে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল জুলিয়াস। ব্রায়েন কিভাবে মারা গেছে তা প্রত্যক্ষদশীর কাছ থেকে শুনতে চায় সে।
ডজনখানেক লোক সার বেঁধে বারের সামনে দাড়িয়ে। কয়েকজনকে আজ সকালে নাস্তার টেবিলে দেখেছে সে। জারভিস বা মেডককে ওদের মাঝে দেখা গেল না। ওদের মধ্যে এডমন্ড ফিনলেকে দেখে তাকে ডাকল জুলিয়াস। এড, একমিনিট একটু এদিকে শুনে যাও।
ঘুরে দাঁড়াল এড। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে স্বাভাবিক গলায় সে বলল, আরে, জুলিয়াস যে! এসো, এক গ্লাস মদ নিচ্ছি, খাও।
সে আর এক সময় হবে। চলো, একটু বাইরে এসো-কথা আছে।
ওর কথায় সম্মতি জানিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল এড। বাঁকা-দেহ বন্দুকবাজ হিউ হার্পার আর দৈত্যের মত মাডিও রয়েছে বারে। এডের পিছন পিছন রকিং এইচের লোকজনও সবাই এগোল-দরকার পড়লে এডের কাছাকাছিই থাকতে চায় ওরা।
জুলিয়াসের কাছে এসে মাথা নাড়তে নাড়তে এড বলল, আসলে তুমি একটা মস্ত গোয়ার লোক। খুব বোকামি করছ তুমি।
কি করব, স্বভাব তো আর বদলানো যাবে না?
বাইরে বেরিয়ে রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে বাড়ির কোনা পেরিয়ে দাঁড়াল ওরা। সেলুনের দরজার বাইরে হিউ হার্পার, মাড়ি আর রকিং এইচের অন্যান্য লোকজন এসে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার ওপারে ডিগবি নোবলও তার অফিস থেকে বেরুল।
অন্য কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে জুলিয়াস বলল, এড, ব্রায়েনের কি হয়েছিল?
বুড়োটার? দুর্ঘটনা।
কে দেখেছে?
টুপিটা একটু পিছন দিকে ঠেলে দিল এড। একটা কৌতূহলী ভাব প্রকাশ পাচ্ছে ওর মুখে। তুমি কি ভাবছ ওটা দুর্ঘটনা নাও হতে পারে?
ঠিক তা-ই ভাবছি আমি। ঘটনাটা কে দেখেছে?
যতদূর শুনেছি কেউই দেখেনি। ওর জন্য আবার এত দুশ্চিন্তা কে করতে যাবে বলো?
সন্ধানী দষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রয়েছে জুলিয়াস। রকিং এইচের আস্তাবলে ব্রায়েনকে ধরে ওঠাবার সময়ে ফিসফিস করে আমাকে শহরে দেখা করতে বলেছিল সে। তুমি শুনে থাকলে…
লোক চিনতে ভুল করেছ হে, স্বার্থের খাতিরে খুন করা আমার স্বভাব নয়। জাহান্নামে যাও তুমি?
বেশ রেগেছে এড। মুখটা লালচে দেখাচ্ছে। জুলিয়াসের মনে হলো সত্যি কথাই বলছে ও, হয়তো ব্রায়েনের মৃত্যুর সাথে ওর কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাই বলে দুর্ঘটনায় ব্রায়েন মারা গেছে এমন ভাবারও কারণ নেই।
মিছে নিজের ওপর ঝামেলা ডেকে আনছ, বলল এড়। চোখের সামনেই দখতে পাচ্ছি এর ফলাফল কি হবে। মেডক বলেছে ওটা দুর্ঘটনা, মেনে নাও। অন্য কিছু বলতে গেলেই সে তোমাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে ছাড়বে। তখন কোথায় থাকবে তোমার আত্মসম্মান?
ভাল লোকজনের সাথেই যোগ দিয়েছ। খোঁচা দিল জুলিয়াস।
সে মাথাব্যথা আমার।
লোকটা যে আসলে কেমন বুঝতে পারছে না জুলিয়াস। মেডক, হিউ, মাডি বা অন্যান্য রকিং এইচের লোকজনের সাথে ওর ঠিক খাপ খায় না। নাকি বুঝতে ভুল করছে সে? চলে যাবার জন্যে ঘুরল জুলিয়াস।
কোথায় যাচ্ছ এখন? জিজ্ঞেস করল এড।
একটা কাজ পেয়েছি, জবাব দিল সে। তোমাকে তো বলেছি, এড, পার্ক আমার খুব পছন্দ, আশপাশেই থাকব আমি-দেখা হবে।
কোনাকুনি রাস্তা পার হয়ে ডাক্তারের বাড়িতে গেল জুলিয়াস। নাথান অ্যাশওয়ার্থকে বাসাতেই পাওয়া গেল।
আশা করছিলাম তুমি আসবে, দরজা খুলেই সাদর আমন্ত্রণ জানালেন ডাক্তার। এসো, ভিতরে এসে বসো।
না, বসব না, বাবার সঠিক অবস্থা জানতে এসেছি আমি।
অসুস্থ। খুবই অসুস্থ তিনি।
মানে, বাঁচার আশা নেই?
এতদিন যে কিভাবে টিকে আছে সেটাই আশ্চর্যের বিষয়। যে-কোনদিন মারা যেতে পারেন। এই অসুখে কখন যে কি হয় বলা কঠিন। সপ্তাহে দু’দিন দেখতে যাই বটে, কিন্তু আসলে আমার করার কিছুই নেই।
হার্টের অসুখ?
হ্যাঁ, হার্টের কাছে একটা শিরায় রক্ত জমে সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। কেন এমন হয় জানি না-মানুষ এতে চট করে মারাও যেতে পারে, আবার মাঝেমধ্যে অনেকদিন বিছানায় ভুগেও মরে।
এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল জুলিয়াস। বাবাকে সে চেনে, দীর্ঘদিন বিছানায়। শুয়ে ভোগা সহ্য হবে না তার। তারচেয়ে তার তিনমাস আগেই মরে যাওয়া অনেক ভাল ছিল।
<