ফাঁড়ির দক্ষিণে পাহাড়ঘেরা একটুকরো ঘেসো জমি আছে। সেখানে ঘোড়াগুলোকে চরিয়ে আনতে হবে। ওয়্যাগনের সাপ্লাই আসেনি। পশুখাদ্যের মজুদ কমে গেছে। বিপজ্জনক হলেও, ঘোড়াগুলোকে মাঠে নিয়ে যেতে হবে খাওয়াতে।

গেটের কাছে একা দাঁড়িয়ে ছিল ইয়াসীন।

কী ভাবছ? পাশে এসে দাঁড়াল ম্যাকহার্ডি।

লেফটেন্যান্ট সাইমনের কথা জানাল তাকে ইয়াসীন। ফাউলার আর তার নীরব সঙ্গী পাওয়ার সম্পর্কে বলল। সোনার নদীটার কথা শুনেছ নাকি তুমি? প্রশ্ন করল ও

‘কে না শুনেছে?’ বলল ম্যাকহার্ডি। তোমার চেয়েও পুরোনো আমি এখানে। এতদিনে অনেক কিছু শুনেছি। সোনার নদী, লোহার কপাটওয়ালা গুপ্তধনের গুহা, হারানো হীরার খনি, দক্ষিণের মরুভূমিতে আটকে পড়া জাহাজ…আরও কত কী! সে সব খুঁজতে এসে প্রতিবছর প্রচুর লোক প্রাণ হারায় এ অঞ্চলে। অথচ কোনও দিন শুনলাম না কেউ কিছু খুঁজে পেয়েছে।

ফাউলার হয়তো পেয়ে যেতে পারে কিছু।

লোকটাকে চিনি আমি। নেভাডার ওদিকে ফোর্ট চার্চিলে দেখেছি কয়েকবার। ভার্জিনিয়া সিটিতে নামকরা এক বন্দুকবাজ মারা পড়েছে ওর হাতে। বিতর্কিত ছিল গান ডুয়েলটা। কিন্তু তা নিয়ে ঘাটাঘাটি করেনি কেউ। খারাপ লোকজনের সাথে ওঠা বসা আছে ওর।

উপত্যকার ওপাশের পর্বতশ্রেণী দেখছে ইয়াসীন। বারবার চোখ চলে যায় ওদিকে। পড়ন্ত বিকেলে লুকোচুরি খেলছে ওটার শিখরে শিখরে। ওখানে চলে যাব আমি-মনে ইচ্ছে জাগল ওর।

কিন্তু তাতে কি জীবনের সব সমস্যা মিটবে? ইচ্ছে হলেই কি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায়? স্বেচ্ছায় কি অস্বীকার করা যায় বেলিন্দার চোখের ওই স্বপ্ন!

মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত হয়তো এড়িয়ে যেতে পারবে না ও। বেঁধে রাখতেও কি পারবে? সে সামর্থ্য কি আছে ওর? এটা তো ভারতবর্ষ নয়। এখানে নামগোত্রহীন একজন সাধারণ সৈনিক সে। রণক্লান্ত একজন মানুষ যার অধিকাংশ সাধগুলোই সাধ্যহীন। বেলিন্দাকে দেবার মত কী আছে তার? সে-ও কি খুঁজতে বেরোবে সোনার নদীটা!

খুঁজে বের করা দরকার লেফটেন্যান্ট সাইমনকে। ক্যাম্পকেডিতে তার ফিরে যাবার সম্ভাবনা কম। হয়তো ইন্ডিয়ানদের আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তার দল এই মরুভূমির কোথাও। নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুণে চলেছে তৃষ্ণার্ত মানুষগুলো।

কফির গন্ধ পেল ও। সাঁঝ নামছে। মেঘহীন আকাশে দু’একটা তারা। ম্যাকহার্ডি পাশে নেই। ওধারে বেড়ার কোলে আগুন জ্বালানো হয়েছে। কফি বানাচ্ছেন মার্থা খালা।

তাঁর কাছ থেকে ঝলসানো মাংস আর কফি নিল ও। এককোনায় অন্ধকারে রাখা স্টেজ কোচ। তার পাদানিতে গিয়ে বসল।

আগুনটা দেখতে দেখতে কফিতে চুমুক দিল ইয়াসীন। অন্ধকার রাতে আগুনের দিকে চেয়ে থাকতে চমৎকার লাগে। তবে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। আলো থেকে আঁধারে তাকালে কিছুই দেখা যায় না তখন।

পাহাড়ের দিকে তাকাল ও। ওখানে আছে ইন্ডিয়ানরা। হয়তো ওরাও তাকিয়ে আছে এই আগুনটার দিকে!

ইন্ডিয়ানদের প্রতি কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ঘৃণা নেই ইয়াসীনের। তারা নিজেদের মত বাঁচে। হয়তো উন্নত নয় তাদের জীবনযাত্রা, তবে তা ভাবায় না ওকে। সে ধরনের ভাবনা সভ্য সমাজের সাজানো ড্রইংরূমেই মানায়। এখানে তার অবকাশ নেই। চোয়ালে ঘাম শুকানো লবণ আর খোঁচা খোঁচা দুশ্চিন্তার দাড়ি নিয়ে এখানে এখন শক্ৰবেষ্টিত আঁধার রাতের বিপদ। পরের মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচব কি বাঁচব না-সেটাই এখানে ভাবনা।

বেড়ার ওপাশে সন্দেহজনক শব্দের অপেক্ষায় রাতের অনেকটা কাটল। শুতে যাচ্ছে সবাই। ম্যাকহার্ডি এসে দাঁড়াল। আমরা গত কদিন একনাগাড়ে পাহারা দিয়ে ভীষণ ক্লান্ত। তোমার লোক থাকুক পাহারায়, বলল সে।

ঠিক আছে, যাও। তাকে ঘুমোতে পাঠাল ইয়াসীন। নিজেও উঠল। টমাসকে ডেকে দাঁড় করাল পাহারায়। তারপর পাহারা দেবে পাওয়ার, ফাউলারের সেই সঙ্গী। সবশেষে ও নিজে পাহারায় থাকবে।

অন্যান্য দিনের মত ভাঙাভাঙা ঘুম হলো তার। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে হঠাৎ আশঙ্কায় জেগে ওঠা, আবার কিছু ঘুম। অনেকদিন ধরে যোদ্ধার জীবন কাটাচ্ছে ও। অনেকদিন ধরে ঘুমোচ্ছে এভাবে। একঘুমে রাত কাবার করা সেই শৈশবের দেশ অনেকদিন হলো ছেড়ে এসেছে।

রাতের শেষ প্রহরের পাহারায় ওকে সঙ্গ দিতে এল মোকাটো। দেখা না গেলেও আশেপাশে ইন্ডিয়ানরা আছে ইয়াসীনের সাথে এ ব্যাপারে সে একমত।

সূর্য উঠলে রাইফেল আর পিস্তল পরিষ্কার করতে বসল ইয়াসীন। ঘণ্টাখানেক পর বেলিন্দা এল কফি নিয়ে। কালরাতে ভাল ঘুমিয়েছি, মন্তব্য করল।

প্রয়োজন না হলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে না কেউ।

প্রয়োজন হতে আর কতদিন দেরি?

কার প্রয়োজন, আমার?

আবার স্বপ্ন ফিরে আসছে মেয়েটার চোখে। এবার সোনার নদীর কথা শুধায় ও। ফাউলার বলছিল, এদিকে কোথাও একটা সোনার নদী আছে। তুমি নাকি তার সন্ধান জানো?

কাকে বলছিল?

এখানকার এক সৈনিককে। লুইস নাম।

হু, লুইসকে চিনি আমি। ক্যাম্পকেডিতে ছিল অনেকদিন।

বেলা বাড়ছে। ফাউলার বেড়ার ধারে ঘুরছে অস্থির ভাবে। টমাস আর রস কাজে ব্যস্ত। বালির গামলাটায় পানি জমতে সময় লাগে। তাই এক এক করে ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়াচ্ছে ওরা।

মার্থা খালা সকালে বের হননি। বেলিন্দার সাথে তাঁর কাছে গেল ইয়াসীন। কিছুক্ষণ পর ম্যাকহার্ডি এসে ঢুকল কেবিনে! শুরু হলো আড্ডা।

ঘুম আসছে ইয়াসীনের। এক পাশে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়ল সে। ওদিকে ম্যাকহার্ডি গপ্পো ছাড়ছে। আইরিশরা খুব আড্ডাবাজ হয়। বিশেষ করে সে আড্ডায় যদি ম্যাকহার্ডির মত বলিয়ে আর বেলিন্দার মত শ্রোতা আইরিশ থাকে।

ভিনদেশের গল্প বলছে ম্যাকহার্ডি।

সেখানে ছিলাম আমি। ওর সাথে পরিচয় হয় দিল্লীতে। তার অনেক আগে থেকে ওদের দেশটা চেনা আমার। বাংলায়, একটা বিদ্রোহ দমনে যেতে হয়েছিল আমাদের সেনাদলকে।

ওদের অঞ্চলটার নাম চিটাগাং। সেখানকার নবাব ছিলেন ওর বাবা। যদি দেশে থাকত তবে ইয়াসীনও এতদিনে নামের আগে যোগ করতে পারত খেতাবটা। কিন্তু নামসর্বস্ব খেতাবের মোহ ধরে রাখতে পারেনি ওকে।

চিটাগাং-এর মত সুন্দর জায়গা জীবনে খুব কম দেখেছি আমি। পাহাড় যে অত সবুজ হতে পারে জানতাম না আমি। ঠিক তার পরেই সাগরের শুরু। দিগন্তের আকাশ অবধি বিছিয়ে আছে জলের সেই নীল কার্পেট। বোঝাই ওয়্যাগনের বহরের মত তার উপর দিয়ে অবিরল গড়িয়ে আসে সজল শীতল হাওয়া! প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ওখানকার মানুষ হয়ে ও যে কীভাবে এই নরকে পড়ে আছে-ভেবে পাই না।

দিল্লীতে একই ব্যাটালিয়নে ছিলাম আমরা। সবেমাত্র ঘর পালিয়ে সেনাবাহিনীতে এসে জুটেছে ছোড়া। মাঝে মাঝে পেগুলে যায়। বাড়ির জন্য মন কেমন করে-ফিরে যেতে চায়। একদিন কোয়ার্টারে ধরে এনে আয়ারল্যান্ডের গল্প শুনিয়ে দিলাম। আমরা আইরিশরাও যে দায় ঠেকে ইংলিশদের চাকর খাটছি বুঝিয়ে দিলাম। ব্যস, রয়ে গেল ও।

ততদিনে জেনারেলের সুনজরে পড়েছে। হীরা চিনতে ভুল করে না পাকা জহুরি। ইংল্যান্ডের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে কোর্স করার সুযোগ করে দিলেন ওকে জেনারেল মিল্টন। ওদিকে কোস-এ যাবার কয়েকদিন আগে হঠাৎ আমাদের ক্যান্টনমেন্টে এসে হাজির হলেন ওর বাবা। নবাব ইব্রাহিম বেগ! এক্কায় জোড়া ইয়া বড় আরবী ঘোড়াটার মত দুলকি চাল তাঁর। পরনে ঘোড়াটার চেয়েও সাদা ইন্ডিয়ান ড্রেস। হাতে স্যান্ডালউডের স্টিক! অনেক সাধাসাধি করেও ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে পারলেন না তিনি। ছোড়া বরাবরই একটু গোঁয়ার টাইপের। বাপের মুখের উপর বলে দিল-বৃটিশ শাসিত দেশের ওই খেতাবী নবাবীতে ফিরবে না সে। তা ছাড়া অজানাকে জানার নেশা তখন ওকে ভালমত পেয়ে বসেছে।

শেষে চোখ মুছতে মুছতে ফিরতে হলো সেই বাঘা লোককে। আর ওই বোম্বেটেটা কিনা বোম্বেতে গিয়ে জাহাজে চাপল!

বোম্বেটে মানে? কৌতূহলী প্রশ্ন মার্থা খালার।

মানে ওই ইয়ে আর কী। পণ্ডিতদের ভারতে আদর করে বোম্বেটে বলে। মুখ ফসকে বেরোনো অপবাদটা ঢাকতে গিয়ে অবলীলায় তার অপব্যাখ্যা দিল ম্যাকহার্ডি।

নিজস্ব ঘুমরীতিতে হঠাৎ জেগে উঠে ম্যাকহার্ডির উদ্ভট ব্যাখ্যাটা শুনল ইয়াসীন। গপ্পো বটে! আবার ঘুম এল তার।

পণ্ডিত মানে তো শিক্ষক, তাই না? এ শব্দটা ধরতে পেরে আনন্দে হাসল বেলিন্দা। ছেলেবেলায় বাবার সাথে ইন্ডিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি।

ওটা প্রচলিত অর্থ, বলল ম্যাকহার্ডি। আসলে পণ্ডিত মানে জ্ঞানী। নিজেদের ইতিহাস আর ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রচুর জানে ও। আর জানে যুদ্ধবিদ্যা। অন্য আর্মিতে অফিসার ছিল ও।

অন্য আর্মি? গল্পে জমে যাওয়া বেলিন্দার প্রশ্ন। মার্থা খালা উঠে বাইরে গেলেন।

মানেটা আমি আজও জানি না, মিস ব্রাউন। ও ইংল্যান্ড চলে যাবার বেশ পরের ঘটনা সেটা। সুলায়মানী পাহাড়ে বিদ্রোহীদের সাথে লড়ছিলাম আমরা। দোস্ত মোহম্মদের বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুলেটের চেয়ে ব্লেড বেশি প্রিয় ছিল তাদের। একদিন রাতে নাঙ্গা তলোয়ার হাতে আমাদের ছাউনিতে হামলা করল ওরা।

ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠতেই দেখি মশালের আলোয় ঝিকিয়ে ওঠা তলোয়ার। মৃত্যু অবধারিত জেনে চোখ বন্ধ করে ছিলাম। কিন্তু মরলাম না। চেয়ে দেখি তরবারি উঁচিয়ে থমকে আছে একজন লোক। তারপর ঘুরে চলে গেল অন্যদিকে।

কিন্তু এক নজরেই চিনতে পেরেছিলাম ওকে। মাথায় পাগড়ি, বুকে অফিসারের ব্যাজ। দিল্লীর সেই ইয়াসীন বেগ!

তার কিছুদিন পরে আমাদের প্রচণ্ড আক্রমণে অনেকের সাথে মারা পড়ে দোস্ত মোহম্মদ। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার বাহিনী। অনেকে বন্দী হয়। অথচ ইয়াসীনকে ধরা যায়নি।

যুদ্ধ শেষে বৃটিশ সেনাবাহিনী ছেড়ে দিই আমি। আয়ারল্যান্ড ফিরে যাই। সেখানেও ইংলিশদের দৌরাত্ম। তাই এখানে চলে আসি, এবং আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি।

এখানে এসে ইয়াসীনকে জিজ্ঞাসা করেননি কীভাবে আফগানিস্তান গেল ও? আমি তো সাংহাইতে দেখেছিলাম ওকে! অবাক হয়ে বলল বেলিন্দা।

করেছিলাম। কিন্তু উত্তর দেয়নি।

আবার ঘুম ভেঙে গেল ইয়াসীনের। ও উঠে বসতেই চুপ মেরে গেল ম্যাকহার্ডি।

কী ব্যাপার ম্যাকহার্ডি, থেমে গেলে যে? গপ্পের স্টক ফুরাল নাকি তোমার?

জানো, কার গল্প বলছিল সার্জেন্ট? প্রশ্ন করল বেলিন্দা।

কার? সপ্রশ্ন ইয়াসীন।

বোম্বেটে একজন লোকের। হাসতে হাসতে বলল বেলিন্দা।

হেসে উঠল ম্যাকহার্ডি। হাসছে ইয়াসীন। একই কথায় ভিন্ন কারণে হাসছে ওরা।

<

Super User