বেনন যখন টেলিগ্রাফারের বাঙ্কে মহা আরামে ঘুমাচ্ছে, বিষ তেতো চেহারা করে ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের পিছু পিছু টেইল হল্টের স্টেশনে ট্রেন থেকে নামল ব্যাগলে। ভেবেছিল ট্রেনে হামলা হবে, সবাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার একটা সুযোগ আসবে; কিন্তু তেমনটি হয়নি, মাইলের পর মাইল ঠায় বসে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে সে। তার ওপর আছে ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের অত্যাচার। ছেড়া সারাটা পথ জ্ঞান দান করে হাড় কালি করে ছেড়েছে ওর। টেইল হল্টে পা দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছল ব্যাগলে, সেদ্ধ পুরানো বুট জুতো চিবালে যতটুকু স্বাদ পাওয়া যাবে ততটুকু আইনের বিচারও নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে নেই।
তাই বলে দায়িত্ব পালনে কোন কার্পণ্য নেই ওর। হ্যাটারকে ট্রেন থেকে নামানোর ব্যাপারে সাহায্য করতে চাইলেও পারল না। অনেক বেশি লোক আগেই উপস্থিত হয়ে গেছে, ভাউবয়েসের নির্দেশে হ্যাটারকে তারাই নামাল; বয়ে নিয়ে চলল ট্রাভেলার্স রেস্ট-এ। আকারে সবার ছোট হওয়ায় কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে অপমানিত চেহারায় সরে যেতে হলো ওকে।
ট্রাভেলার্স রেস্টেপৌঁছে জানা গেল ডাক্তার হেলেনা থেকে এখনও এসে পৌঁছায়নি। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল ভাউবয়েস। ধমকের পর ধমক দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল সবাইকে। টেলিগ্রাফার তার ঝাড়ি খেয়ে হেলেনার লাইন গরম করে তুলল। জানা গেল রওয়ানা হয়েছে ডাক্তার। হ্যাটার ভাউবয়েসের কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস; অক্কা পেলেই বেমক্কা বিপদে পড়ে যাবে সে। হ্যাটারের র্যাঞ্চ মর্টগেজ করা নেই যে সে মরলে ব্যাংকের সঙ্গে কাগজ-পত্র পাকা করে লাইন পাতা যাবে। আর লোকটা কোন উইল করেছে কিনা কে জানে! না করে থাকলে কোর্ট তার উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করতে যতদিন লাগাবে অত সময় অপেক্ষা করা অসম্ভব। অতএব কোন ঝুঁকি নিতে ভাউবয়েস রাজি নয়।
নাস্তা সেরে হোটেলের লাউঞ্জে ফিরে ব্যাগলে দেখল এসে গেছে ডাক্তার।
বেশ বেশ, তা কে অসুস্থ হয়েছে বলে আমাকে এত জরুরী তলব? পাশে দাঁড়ানো ব্যাগলেকে না দেখার ভান করে ভাউবয়েসকে জিজ্ঞেস করল ডাক্তার। ঘাড় বাঁকা লোক, প্রথম দর্শনেই বুঝে গেল ব্যাগলে।
আসুন, ডক্টর হকিন্স।
অষুধের গন্ধমাখা ছোটখাট আকৃতির ডাক্তারকে পথ দেখিয়ে দোতলায় নিয়ে এলো ভাউবয়েস। দীর্ঘ সময় নিয়ে রোগীকে দেখল ডাক্তার। মহিলারা উদগ্রীব হয়ে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। খাটের পাশে ফ্র্যাঙ্ক; চেহারা উৎসুক; ভাবছে ডাক্তারকে কোন উপদেশ দেয়া যায় কিনা। অবশেষে মুখ তুলে তাকাল ডাক্তার। দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে ছাদের দিকে চেয়ে বলল, নতুন ক্ষতটা গুরুতর কিছু না। আমাকে কৌতূহলী করে তুলছে পুরানোটা। দুটোই বুলেটের, তবে পুরানোটাই আসল। আমার ধারণা করোটি ডাবিয়ে দেয়া ওই ক্ষতটা মগজের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ভাউবয়েসের দিকে তাকাল সে। রোগী কখনও অস্বাভাবিক আচরণ করে? ধরুন এটা ওটা ভুলে যায় বা আর কিছু?
করে, বলল ডেইজি।
অস্ত্রপচার করতে হবে। ভ্রূ উঁচিয়ে ডেইজির অনুমতি চাইল ডাক্তার হকিন্স।
করুন, ডাক্তার। বাবা বাঁচবে তো?
বাঁচা-মরা খোদার হাতে, তার আমি কি জানি? নার্সটা নাস্তা খেয়ে এলেই খুলি কাটব আমি। মাছি তাড়ানোর মত করে হাতের ঝাপ্টা মেরে দরজা দেখাল ডাক্তার। বেরোন এখন সবাই এ-ঘর থেকে।
ডেইজির কাঁধে আলতো করে হাত রাখল ব্র্যান্ডন। ধরে ধরে নিয়ে এলো বাইরে। ডাক্তারের কথায় ভয় পেয়ে গেছে মেয়েটা। শক্ত করে ধরে রেখেছে এঞ্জিনিয়ারের হাত।
সবাই যে যার কাজে একেক দিকে চলে যেতেই নিজেকে তলাহীন বালতির মত অকেজো মনে হলো ব্যাগলের। রাস্তায় বেরিয়ে এলো ও। স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানল এন্ড অভ স্টীলের ট্রেন ছাড়তে এক ঘণ্টা দেরি আছে। খানিক উদ্দেশ্যহীন এদিক ওদিক ঘোরার পর বাবার কথা মনে এলো ওর। আর বাবার কথা মনে আসতেই মনে পড়ল মদ্যপানের কথা। মদে চুবে থাকা সেই মানুষটার স্মৃতির প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা জানাতে হলেও অন্তত দু’ঢোক গিলে ফেলা উচিত।
কিন্তু অনেক কাজ পড়ে আছে। এন্ড অভ স্টীলে যেতে হবে। বেননের সাহায্য লাগতে পারে। তাছাড়া এখানে ওর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে; শহরে এসে হ্যাটারের কোন ক্ষতি করার সাহস ওয়াঙের চেলারা পাবে না। কোথায় যেন যাবে বলেছিল বেনন? টিলার গোড়ায় খনি… টিলার গোড়ায় খনি… সোবার সুয়েড! হ্যাঁ, এই তো মনে পড়েছে। কী বিদঘুটে নাম! কেন ডংকি ডাচম্যান বা হাংরি হাঙ্গেরিয়ান নাম রাখলেই বা ঠেকাচ্ছিল কে!
বিরক্তির চরমে পৌঁছে একটা সেলুনে ঢুকে পড়ল ব্যাগলে। বার কাউন্টারে পেট ঠেকাতেই কাঁদো কাঁদো চেহারার এক মুহ্যমান ছোঁকরা এসে জিজ্ঞেস করল, কি চাও, মিস্টার?
কড়া কিছু থাকলে দাও।
অন্যমনস্ক ব্যাগলে খেয়াল করল না কাউন্টারে রাখা একটা জগ থেকে আস্ত এক গ্লাস ঘোলা তরল তার সামনে রেখেছে বারকীপ। গ্লাসটা মুখে তুলে চুমুক দিল ও। পরমুহূর্তে শিউরে উঠল আতঙ্কে। চোখ জোড়া কপালে উঠে গেল; থুহ থুহ্ করে মুখ থেকে ফেলে দিল পানীয়টুকু। বিষ ছাড়া এতখানি বাজে স্বাদ আর কিছুর হতে পারে বলে ব্যাগলের ধারণা ছিল না। চোখ পাকিয়ে তাকাল ও তরুণের দিকে। এটা কী হলো, আঁ?
এটাই… লেমোনেড। ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বারকীপ। অন্যকিছু আমরা বেচছি না। মিস্টার ভাউবয়েস ওই জালেম বুড়ির কথায় আমাদের বারণ করে দিয়েছেন। কথা না শুনলে রেল রোডের কেউ আসবে না। ব্যবসা বন্ধ করে না খেয়ে মরতে হবে।
মিস অ্যানা হ্যাটারের চেহারাটা মনে পড়ে গেল ব্যাগলের। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কে জানত একজন মহিলার মন এত পাষাণের মত কঠিন হতে পারে!
একটু… কয়েক ফোঁটাও কি নেই? শেষ চেষ্টা করল ব্যাগলে। মনে আশা, ওর কাকুতি শুনে যদি বারকীপের দয়া হয়, গোপন কোন কুঠুরি থেকে যদি বের করে আনে একটা হুইস্কির বোতল।
হতাশ হতে হলো ওকে। মাথা নাড়ল যুবক। নেই। ছায়া ঘনাল ব্যাগলের মুখে।
তবে একটা উপায় আছে, দয়া হলো বারকীপের। সাপের কামড়।
আছে? কোথায়? সাপটা কোথায়? খুশিতে দু’চোখ চকচক করে উঠল ব্যাগলের।
আমার এখানে না। খোঁজ নিলেই পেয়ে যাবে। শুনলাম কয়েকজন মিলে একটা র্যাটল স্নেক ধরে এনেছে। গতকাল নাকি ওটার কামড় খাওয়ার জন্যে আধমাইল লম্বা লাইন হয়েছিল। লাইনে দাঁড়ালে তুমিও সুযোগ পেয়ে যাবে।
না… থাক্। মাথা নাড়ল ব্যাগলে। কপালের যে হাল তাতে সাপের কামড় খাওয়ার সৌভাগ্য ওর হবে না এ-ব্যাপারে ও নিশ্চিত। ওর পালা আসার আগেই কামড় দিতে দিতে সাপটা এত বেশি পরিশ্রান্ত হয়ে যাবে যে বেচারা আর মাথাই তুলতে পারবে না।
আধখালি গ্লাসটা ভরে দিল তরুণ উপদেষ্টা। সান্তনা দিয়ে বলল, আরেকবার চেষ্টা করে দেখো। অতটা খারাপ কিন্তু না। প্রথমবার ওরকম লাগে। নাক টিপে এক ঢোকে খেয়ে দেখো ঠিকই সহ্য করতে পারবে।
তুমি খেয়ে দেখো মরতে চাইলে। রাগের চোটে পয়সা দেয়ার কথা ভুলেই গেল ব্যাগলে। দুপদাপ পা ফেলে বেরিয়ে এলো সেলুন থেকে।
হোটেলে ফিরতেই করিডরে দেখা হয়ে গেল ওর পিচ্চি ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে।
আপনার মুখটা শুকনো শুকনো লাগছে কেন, মিস্টার ব্যাগলে?
এমনি।
বলুন না।
বললাম তো, এমনি।
আমি হয়তো কোন সাহায্যে আসতেও পারি। স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে অন্য পথ ধরল ফ্র্যাঙ্ক নোয়াক।
এই প্রথম মনোযোগ দিয়ে ছেলেটাকে দেখল ব্যাগলে। হতে পারে নোয়াক ছোঁড়াটা বদমাশের ওস্তাদ; হতে পারে পাহাড়ীকাঁকড়া বিছের চেয়েও জঘন্য রকমের বাজে; কিন্তু মগজ আছে একথাটা স্বীকার করতেই হবে। ছোঁড়াটাকে ভজিয়ে ভাজিয়ে দলে টানতে পারলে বলা যায় না উদ্দেশ্য হাসিল হয়েও যেতে পারে। জোর করে মুখে হাসি টেনে আনল ব্যাগলে। বড় বড় দাঁতগুলো দেখানো শেষ করে বলল, দারুণ একটা বিপদে পড়ে গেছি ফ্র্যাঙ্ক। তুমি কি জানো কোথায় গেলে আমি একটু… ইয়ে পাব?
ইয়ে? কোতুহলী হয়ে উঠল ফ্র্যাঙ্ক।
ওই…ইয়ে। অত সহজে বলতে রাজি নয় ব্যাগলে। ওতে কথার গুরুত্ব কমে যাবে। ছোড়ার কাছে দায়িত্বটা আর বিরাট বলে মনে হবে না।
ওই ইয়ে? কাজে দিচ্ছে ব্যাগলের বুদ্ধি।
ইয়ে…মদ।
মদ! দু’চোখ বিস্ফারিত করে ব্যাগলেকে দেখল ফ্র্যাঙ্ক।
পিঠে গুলির একটা ক্ষত আছে; ব্যথাটা কমাতে কাজে দেয় খুব।
কিন্তু, মিস্টার ব্যাগলে, জিনিসটা তো খুবই ক্ষতিকর!
আমি জানি। চেহারাটা করুণ করে তুলল ব্যাগলে। কী করব বলো, ডাক্তারের আদেশ।
নিচের ঠোঁট উল্টে কিছুক্ষণ চিন্তা করল ফ্র্যাঙ্ক নোয়াক। তারপর আনমনে বলল, শহরে ও-জিনিস বিক্রি হয় না।
আমিও তাই শুনেছি। সেলুনের ঘটনাটা চেপে গেল ব্যাগলে।
একটাই মাত্র উপায় দেখতে পাচ্ছি আমি, মিস্টার ব্যাগলে!
পাচ্ছ? উপায় দেখতে পাচ্ছ? এবার উদগ্রীব হওয়ার পালা ব্যাগলের।
বাবার সিগার। একেকটার দাম এক ডলার। রামে চোবানো। দুপুরে খাবারের পর ওগুলোর একটা খায় বাবা। গান ধরে আরামকেদারায় বসে। তারপর ঘুমিয়েও পড়ে। ভ্রূ উঁচিয়ে ব্যাগলের দিকে তাকাল ফ্র্যাঙ্ক। ওরকম একটা সিগার হলে চলবে আপনার, মিস্টার ব্যাগলে?
একেকটার দাম এক ডলার! ওই দামে আমি চল্লিশটা কিনি। চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী!
আসুন তাহলে। সাবধান, বাবা যাতে না জানে।
তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো জানবে না।
ওকে করিডরে দাড় করিয়ে ঘরের ভেতর রেখে ঢুকে গেল ফ্র্যাঙ্ক। ফিরল একটা সিগার বক্স হাতে। ব্যাগলেকে দিয়ে বলল, নিন, দেখুন চেষ্টা করে।
জীবনে কোনদিন ধোয়া গিলে মদের নেশা করেনি ব্যাগলে। ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল ও। কৃতজ্ঞতা বোধে ছেয়ে গেল অন্তর। এখন নিজের ভুল বুঝতে পারছে, আসলে যতটা ভেবেছিল অতটা খারাপ নয় দেখা যাচ্ছে ছেলেটা। ঠোঁটে বন্ধুত্বের হাসি নিয়ে বাক্সটা খুলল ব্যাগলে। ওর গলা চিরে বেরিয়ে এলো হাহাকার। কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল দু’চোখ। আর একটু জোরে লাফ দিলে ছাদে মাথা ঠুকে যেত। বাক্সটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে তিড়িং তিড়িং লাফাতে লাগল ব্যাগলে। প্রাণপণে চেঁচিয়ে চলল, মারো! মারো!! কাউকে কামড়ানোর আগেই জুতো চাপা দাও ওটাকে!
তারপর হঠাৎ ব্যাগলের কানে এলো ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের খিকখিক হাসি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে গেল ওর। সেই খুলে যাওয়া চোখে সত্যি ধরা পড়ে গেল। মেঝেতে ওটা জ্যান্ত কোন বিষাক্ত সাপ নয়। কাপড়ের তৈরি। ভেতরে তুলো বা আর কিছু দিয়ে ফোলানো হয়েছে। পাকা হাতের কাজ। দেখে বোঝার উপায় নেই আসল নয়।-তারওপর বাক্সেও কারিগরী আছে। খুললেই কিলবিল করে ছিটকে ওঠে সবুজ সাপ। ভয় পেয়েছে বলে লজ্জার বদলে রাগ অনুভব করল ব্যাগলে। সেই রাগ গিয়ে পড়ল ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের ওপর। তেড়ে গেল ব্যাগলে।
আগেরবার ধরা পড়েছিল মনে আছে; এবার আর আগের ভুল করল না; তৈরি হয়েই ছিল, ব্যাগলেকে নড়তে দেখেই পাই পাই করে ছুটল ফ্র্যাঙ্ক। পেছনে ব্যাগলে। বন্য সিংহের মত গর্জন ছাড়ছে।
প্রায় ধরেই ফেলেছে, এমন সময় সাহায্যের আশায় তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল ছেলেটা।
দরজা খুলে বেরিয়ে এলো ভাউবয়েস সি, ভাউবয়েস নোয়াক। সেই সুযোগে দরজা খোলা পেয়ে বাবাকে পাশ কাটিয়ে সুড়ৎ করে ভেতরে, ব্যাগলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল ফ্র্যাঙ্ক।
ব্যাগলে আঙুল নাচিয়ে কিছু বলতে যেতেই হাত উঁচিয়ে বাধা দিল ভাউবয়েস। ছিহ্ মিস্টার ব্যাগলে! আপনার জানা উচিত পাশের ঘরে মুমূর্ষ হ্যাটারের ওপর অস্ত্রপচার করছে ডাক্তার। কী শুরু করেছেন আপনি!
ওই…ওই ছেলেটা, রাগের চোটে তোতলাল ব্যাগলে। ও আমার গায়ে সাপ ছুঁড়ে দিয়েছে!
দুঃখিত চেহারায় মাথা ওপর-নিচ দোলালেন ভাউবয়েস। তাই করেছে ও? জিনিসটা বানানোর পর আমার ওপরই প্রথম পরীক্ষা করে সে। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই কঠোর হয়ে গেল গোলগাল মুখটা। আমি ওর হয়ে দুঃখ প্রকাশ করছি, মিস্টার ব্যাগলে! এবার কণ্ঠে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ফুটে উঠল। আসন্ন আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল দু’চোখ। আপনি ইচ্ছে করলে ওকে… বিশ্বাস করুন বুকটা ফেটে যাবে আমার…কিন্তু আমি অসহায়…খুবই অন্যায় করেছে ও আপনার সঙ্গে।
বাবা! তীরে এসে তরী ডোবার আশঙ্কায় মরিয়া হয়ে উঠল ফ্র্যাঙ্ক। তুমি ভুলে যেয়ো না আমিই হেলেনায় গিয়ে তোমাদের জন্যে কুলি নিয়ে এসেছি। তুমি যদি মার খাওয়াও মাকে বলে দেব আমি। শিকাগোতে চিঠি লিখে হেড অফিসকে জানিয়ে দেব এতবড় সাহায্য করার পরও আমার সঙ্গে কি ব্যবহার করা হয়েছে।
অসহায় চোখে নীরব আকুতি আর আক্ষেপ নিয়ে তাকাল ভাউবয়েস। একজন বিবাহিত অত্যাচারিত মানুষ হিসেবে লোকটার দুঃখটা বুঝতে পারল ব্যাগলে।
কথাটা সত্যি, বলল ভাউবয়েস, তবে আমাদের অনেক ক্ষতিও হয়েছে, টেলিগ্রাফ করে তুমি আমাদের এক সপ্তাহের সিডিউল এলোমেলো করে দিয়েছ। হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে ব্যাগলের দিকে তাকাল সে। মিস্টার ব্যাগলে, আমি আবারও ওর হয়ে ক্ষমা চাইছি। ও চিঠি লিখলে সত্যি আমরা বিপদে পড়ে যাব। নিজের প্রশংসা করে বিরাট এক চিঠি লিখেছে ফ্র্যাঙ্ক হেড অফিসে। এই মুহূর্তে আমি দু’চোখে অন্ধকার দেখছি, বিশ্বাস করুন।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। সাপটা খেয়াল করে ভাল মত দেখল ব্যাগলে। দিনের আলোয় ধরা পড়ে যাবে যে নকল, নাহলে বারটেন্ডারকে দেখিয়ে বলা যেত সাপের কামড় খেতে পেরেছে। সে। আর এখানে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, শেষ বারের মত কড়া চোখে ফ্র্যাঙ্ক নোয়ককে দেখে নিয়ে হোটেল, ছেড়ে বেরিয়ে এলো ব্যাগলে।
ট্রেন ছাড়তে আরও দশ মিনিট, তবুও স্টেশনে এসে ট্রেনে চেপে বসল ও। নিজের দুঃখে এতই মশগুল যে টের পেল না পেছনের সীটে হ্যারি হুলাহান বসে আছে।
ব্যাগলেকে দেখে লোকটা ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করল, সিগার, মিস্টার ব্যাগলে?
চমকে সীটে সোজা হয়ে বসল ব্যাগলে। ঘাড় ফিরিয়ে কিছুক্ষণ ব্যাঙ্কারকে দেখল। তারপর লোকটার বাড়িয়ে ধরা সিগার কেসটা চোখে পড়তেই ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো ছোটখাট একটা গর্জন। হাতের ঝাঁপটায় বুঝিয়ে দিল চাই না তার সিগার।
একটু পরেই রওয়ানা হলো ট্রেন। উদাস দৃষ্টি মেলে বাইরে তাকাল ব্যাগলে জানালা দিয়ে। পিছিয়ে যাচ্ছে শহরটা, দূরে সরে যাচ্ছে ও ওই কালো অভিশাপ ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের কাছ থেকে। এগিয়ে আসছে উইটিগোর সাদা মেঘে ঢাকা পাহাড় চুড়ো। পাহাড়ের নিচের অংশে জমছে ঘন কালো মেঘ। বৃষ্টি হবে বোধহয়। গতবার বৃষ্টির সময় ডায়নোসর বেরিয়েছিল। বৃষ্টি হলে আজকেও বেরতে পারে। ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের দেয়া জ্ঞান মনে পড়ল ব্যাগলের। সাপ আর ডায়নোসর দুটোই সরীসৃপ। আচ্ছা, সাপের কামড়ে যদি মানুষের নেশা হয় তাহলে ডায়নোসর কামড়ালে হবে কেন? একবাটি দুধ নিয়ে যদি আদর করে ডাকা যায় “ডাইনী, ডাইনী” তাহলে একটা কামড় কি পেতে পারে না ও বিনিময়ে?
ক্যানিয়নের ওপর তৈরি করা সেই উঁচু ব্রিজটা পার হওয়ার সময় জানালা দিয়ে অতল কালো গহ্বরটা দেখল ব্যাগলে। ভাবল এখান থেকে ওই খাদের মধ্যে ফ্র্যাঙ্ক নোয়ককে ছেড়ে দিলে কেমন লাগবে ছোড়াটার। আরও ভাল হত যদি মিস অ্যানা হ্যাটারকেও সঙ্গে দিয়ে দেয়া যেত।
এক ধাক্কায় দু’জনকেই ফেলে দিল ব্যাগলে কল্পনায়। তারপর কল্পনার রাশ টেনে ধরে কামরার ভেতরে নজর বোলাল। হুলাহান ছাড়া পরিচিত কোন মুখ ওর চোখে পড়ল না। সীটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল ও।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এন্ড অভ স্টীলে পৌঁছে যাবে ট্রেন। জিমি নর্টনের কাছ থেকে একটা ঘোড়া ধার করবে ও। তারপর বেননের খোঁজে যাবে সেই টিলাটায়। আশা করা যায় বৃষ্টি না নামলে সন্ধের আগেই পৌঁছে যেতে পারবে ও সোবার সুয়েডে।
<