খুব ভোরে জেকবের ঘুম ভেঙে গেল। বেশ চাঙ্গা বোধ করছে সে এখন। হোপি ইন্ডিয়ান ওষুধে খুব ভাল কাজ হয়েছে। শুয়ে শুয়েই পা-টা নাড়াতে চেষ্টা করল-আশ্চর্য! ব্যথা প্রায় নেই বললেই চলে। ডালিয়াকে না জাগিয়ে সন্তর্পণে কম্বলের নীচ থেকে বেরিয়ে এল সে।

শেষ একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে আজ। তৈরি হতে হবে ওকে। কিন্তু তার আগে গতরাতে ঘুমাবার পূর্ব মুহূর্তে যে সম্ভাবনার কথা তার মনে উঁকি দিয়েছিল সেটা চেক করে দেখতে হবে।

গুহার ভিতরে একটু খেয়াল করতেই যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেল। অবাক চোখে সে লক্ষ করল বাইরের চিহ্নগুলো মুছে গেলেও গুহার ভিতরে কয়েকটা নাল লাগানো ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

তবে কী…?

হ্যাঁ, ঠিক তাই। বেশি খুঁজতে হলো না। গুহার এক কোণায় পাথরের আড়ালে রাখা রয়েছে হারানো ওয়্যাগনের সোনা। চারটে মাঝারি আকারের বাক্সে রয়েছে সোনার বার, আর নয়টা বড় থলেতে স্বর্ণমুদ্রা আর কিছু অত্যন্ত দামী হীরার অলঙ্কার।

যে ঘোড়াগুলোর পিঠে চাপিয়ে সোনা আনা হয় বুড়ো ঘোড়াটা নিশ্চয়ই তাদেরই একটা। জায়গাটা আগে থেকেই ওর চেনা ছিল বলে বৃষ্টিতে আশ্রয় নিতে সোজা এখানে চলে এসেছে।

কিন্তু সোনার পিছনে আর মিছে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তার বিশ্বাস মানুষের জীবনে সোনা কেবল অনর্থই ডেকে আনে।

ডালিয়ার দিকে চাইল সে। বেচারী নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। অনেক ধকল গেছে মেয়েটার উপর দিয়ে, তবু মুখে বিন্দুমাত্র অসন্তোষের ছাপ নেই। ঘুমন্ত অবস্থায় ওর মুখটা আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু আজ শেষ পর্যন্ত ওর ভাগ্যে কী আছে কে জানে!

বাইরে বেরিয়ে গেল জেকব। দিনের আলোয় আশেপাশের জায়গাটা খুব ভাল করে চিনে নিতে হবে তাকে। এতগুলো লোকের সঙ্গে একা লড়ে জিততে হলে যুদ্ধক্ষেত্রের সুবিধা-অসুবিধাগুলো তার জানা থাকতেই হবে।

আধঘণ্টা পরে আবার গুহায় ফিরে এল সে। ডালিয়া এখনও ঘুমোচ্ছে। ওর মাথার কাছে বসল জেকব। ঘুমের মধ্যেও যেন টের পেয়েই চোখ খুলল ডালিয়া। ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসল সে।

যে-কোন সময়ে এসে হাজির হতে পারে ওরা। ডালিয়াকে যা বলার তা সময় থাকতে এখনই বলে ফেলা দরকার। শোনো লিয়া, আজ ওদের সাথে শেষ বোঝাপড়া হবে আমার। ফলাফল কী হবে কিছুই বলা যায় না। আজ যা-ই ঘটুক না কেন, এটা জেনো, তোমাকে সত্যিই ভালবাসি আমি।

আমিও! বলে উঠল ডালিয়া। ওর চোখ দুটো ছলছল করছে।

হাত বাড়িয়ে ওর গাল দুটো আদর করে একটু টিপে দিল জেকব। জানো, হারানো ওয়্যাগনের সোনা এই গুহার মধ্যেই আছে। তুমি সোনা খুঁজতে চেয়েছিলে-ওগুলো সব আমি তোমাকে দিলাম।

উঠে বসে জেকবের মাথাটা দু’হাতে নিজের বুকে চেপে ধরল ডালিয়া। না, সোনা আমি চাই না, জে। পৃথিবীর সব সোনার বদলে আমি শুধু তোমাকে চাই।

দূরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা গেল। চোখ বুজে আরও কয়েক সেকেন্ড শক্ত করে জেকবকে বুকে আঁকড়ে ধরে রেখে ওকে ছেড়ে দিল ডালিয়া।

ঢালের মাথায় তিনজন ঘোড়ওয়ারকে দেখা যাচ্ছে।

তিনজন? তবে কি লী-র সঙ্গীরাও যোগ দিয়েছে নিকোলাসের সাথে? বাকি লোকগুলো কোথায়?

তুমি এখানেই থাকো লিয়া, গোলাগুলির মধ্যে বেরিয়ে পোড়ো না। এগিয়ে গেল জেকব। ওরাও নীচে নামছে। তিনশো গজের ব্যবধান। প্রায় সমতল জায়গাটায় এসে ঘোড়া থেকে নামল ওরা। আরও এগিয়ে যাচ্ছে জেকব।

তৃতীয় লোকটাকে এবার চিনতে পারল সে। কেলভিন। ওর আসল পরিচয়ও এখন আর অজানা নেই তার। এই সতেরোজনের দল থেকে এই লোকটাই মরমন কুয়ার কাছে এসে অদৃশ্য হয়েছিল। সোনার উপর প্রথম থেকেই চোখ ছিল তার, কিন্তু ঘুমের মধ্যে খুন হয়ে যাবার ভয়েই আগে থেকে সরে গিয়েছিল সে।

ওদের থেকে মাত্র পনেরো গজ দূরে এসে থামল জেকব। জেনেশুনেই এই ঝুঁকি নিয়েছে সে। দূর থেকে রাইফেল দিয়ে একবারে একজনের বেশি লোককে ঘায়েল করা যাবে না-বাকি দুজন পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়বে। তখন আর এই বদ্ধ জায়গা থেকে বেরুবার কোন উপায় থাকবে না। কিন্তু সামনাসামনি ওর দুই পিস্তল দিয়ে দুজনকে ঘায়েল করতে পারলে বাকি থাকবে একজন-একজনকে চালাকি করে ফাঁদে ফেলা তার পক্ষে খুব একটা কঠিন হবে না।

নিকোলাসই প্রথম মুখ খুলল। মরণের ডাক এসেছে তোমার, তাই স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মুখে এগিয়ে এসেছ!

ওর কথার কোন জবাব না দিয়ে কেলভিনের উদ্দেশে বলল জেকব, তুমি সারাটা জীবন বৃথাই সোনার পিছনে ঘুরে কাটালে।

ওকথা বলছ কেন? আমি জানি এই মেসার ওপরই কোথাও আছে ওগুলো।

আমি জানি কোথায়-কিন্তু মন্টিও কি তোমাকে চিনতে পারেনি?

চট করে মন্টির দিকে ফিরে চাইল কেলভিন।

নিঃসন্দেহ হলে জেকব। তোমার গালের কাটা দাগগুলোর জন্যে হয়তো ও চিনতে পারেনি তোমাকে। মরমন কুয়ার কাছ থেকে তুমিই অদৃশ্য হয়েছিলে।

শটগান হাতে কেলভিনের দিকে ঘুরেই পরপর দু’টো গুলি করে খালি বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মন্টি।

গুলির শব্দে চকিত হলে পিস্তল বের করল নিকোলাস। কিন্তু তার আগেই জেকবের গুলিতে নিকোলাস আর মন্টি এক সাথে ধরাশায়ী হলো।

ঘোড়ার খুরের শব্দ পেল জেকব। আরও দু’জন অশ্বারোহীকে দেখা গেল ঢালের মাথায়। দ্রুত নেমে আসছে লী আর কীথ। দুজনেরই রাইফেল তৈরি।

শান্তভাবে পিস্তল খাপে ভরে রাখল জেকব। কীথ কাভার করে আছে ওকে। নীচে নামল লী

বন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছি আমি-তৈরি হও, বলল সে।

ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছে সে তো বলেছি তোমাদের-এরপরেও কেন মিছে ঝামেলা করছ?

যদি তুমি নিজেকে বাঁচাবার জন্যে মিথ্যে বলে থাকো? পরপারে বন্ধুর কাছে আমি কী জবাব দেব?

এই কারণে তুমি নিজের জীবন বিপন্ন করবে? দেখেছ ওদের কী অবস্থা হয়েছে? মৃতদেহগুলো দেখাল জেকব।

তোমার কথার কোনরকম কোন প্রমাণ থাকলে তোমাকেও বন্ধু বলে মেনে নিতে আপত্তি ছিল না আমার-তোমার সাহস আছে স্বীকার করি। কিন্তু আমি নিরুপায়

ডেরিকের বন্ধু-ভাগ্য দেখে হিংসা হচ্ছে আমার। সে যদি তোমার মত সরল হত তবে আজ এই পরিস্থিতি দাঁড়াত না।

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই-তৈরি হও!

তোমাকে অযথা হত্যা করতে চাই না, লী। আমি সত্যি কথাই বলেছি। বিশ্বাস করো।

বাজে কথা রাখো। প্রমাণ যখন নেই, তোমার কোন কথাই মানি না আমি। আর বলব না, এবার তৈরি থেকো।

মেসার উপরে এই সময়ে একসাথে অনেকগুলো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া গেল। লী-র দিকে চেয়ে আছে জেকব। মেসার ধারটাতে ছয়টা ঘোড়া এসে দাড়িয়েছে। একটা ঘোড়া দ্রুত ছুটে নীচের দিকে এগিয়ে আসছে।

থামো, লী! চিৎকার করে বলল ইউজিন। প্রমাণ পাওয়া গেছে!

কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। পিস্তল বের করে ফেলেছে লী। দেখল জেকব তখনও তেমনি দাঁড়িয়ে। কোথা থেকে কী হয়ে গেল ঠিক বুঝতে পারল না লী। ভোজবাজির মত পিস্তল চলে এল জেকবের হাতে, পিস্তলের মুখে ধোয়া। প্রচণ্ড বাকি লেগেছে লী-র ডান হাতে। হাত ধরে বসে পড়ল সে। পিস্তলটা ছিটকে পড়ে গেছে মাটিতে।

ঘোড়া ছুটিয়ে এসে ওর পাশে নামল ইউজিন। প্রমাণ পাওয়া গেছে লী! ডেরিককে পিস্তল লুকাতে দেখেছে ফ্রেড। ওর মুখেই শোনো।

বিস্ফারিত চোখে বোকার মত ইউজিনের দিকে চাইল লী। বিশ্বাসই করতে পারছে না সে এখনও বেঁচে আছে। যেভাবে দ্রুত পিস্তল বের করে গুলি করেছে জেকব তাতে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, ইচ্ছা করলেই গুলিটা পিস্তলে না লাগিয়ে অনায়াসে ওর হৃৎপিণ্ড ফুটো করে দিতে পারত শক্ত-পাল্লা।

হাত বাড়িয়ে জেকবের দিকে এগিয়ে গেল ইউজিন। ওর সঙ্গীরা নীচে নেমে লী-র পশে দাঁড়াল।

জেকব, আমার নাম ইউজিন। তোমাকে আমরা ভুল বুঝে এত হয়রানি করিয়েছি বলে আমি খুব দুঃখিত।

ফ্রেডের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনল লী। তারপর, এগিয়ে এল, সব আমার দোষ! আমিই সবাইকে উস্কে তোমার পিছনে লাগিয়েছিলাম। আসল ঘটনা জানলাম এখন। পারলে আমাকে ক্ষমা কোরো।

আমি তো জানিই তোমরা ভুল করছ, তোমার ওপর রাগ থাকলে আমার গুলি অন্যখানে লাগত, জবাব দিল জেকব। ডালিয়া পিছন থেকে ছুটে এসে একহাতে ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর অন্য হাতে ধরা রয়েছে জেকবের দেওয়া রাইফেলটা।

নিকোলাস, কেলভিন আর মন্টি, তিনজনই মারা পড়েছে। এর মধ্যে কেলভিনের মৃত্যুটাই সবচেয়ে বীভৎস। কাছে থেকে শটগানের দু’দুটো গুলিতে ওর দেহটা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

সবাইকে গুহার ভিতরে ডেকে নিয়ে জেকব বলল, হারানো ওয়াগনের সোনার কথা তো তোমরা সবাই শুনেছ। দেখবে সেই সোনা?

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে সবাই। বাক্স আর থলেগুলো বের করে এনে মেঝের উপর রেখে একেএকে সব ক’টাই খুলল জেকব। এত সোনা ওরা একসাথে কেউ কোনদিন চোখেও দেখেনি।

সত্যিই ভাগ্যবান তুমি, জেকব, মন্তব্য করল কীথ।

হ্যাঁ, কেলভিন সারাজীবন হন্যে হয়ে খুঁজেও যা পায়নি, ভাগ্যক্রমে সেটাই আজ আমার হাতে। ডালিয়া এগিয়ে গিয়ে ওর কানে কানে কী যেন বলতে মাথা কেঁকিয়ে সায় দিয়ে সে আবার বলল, আমার স্ত্রী বা আমার, কারোই ধন-সম্পদের প্রতি লোভ নেই। তাই আমরা ফ্রীডমের সবাইকে আমাদের শুভেচ্ছা সহ এগুলো উপহার দিলাম।

কথাটার পুরোপুরি মর্ম বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় পার হয়ে গেল। সবাই বিস্ময়ে অভিভূত-কারও মুখে টু শব্দটি নেই।

সবার পক্ষ নিয়ে লী-ই প্রথম মুখ খুলল। বলল, জেকব, তোমাদের প্রবটা খুবই উদার আর মহৎ। সবার কথা আমি বলতে পারি না, তবে আমি নিজে কিছুই তোমার এই প্রস্তাব মানতে পারব না।

গিবনও যোগ দিল ওর সাথে। তোমার অনেক ক্ষতি আমরা করেছি, জেকব, কিন্তু আর না। আমাদের আর ছোট কোনো না তুমি।

ইউজিন বলে উঠল, আমারও তাই মত। কিন্তু জেকব দম্পতির মহত্ত্বকে ক্ষুণ্ণ করার ও কোন অধিকার আমাদের নেই। তা ছাড়া ওদের সোনার প্রতি লোভ না থাকলেও নতুন জীবন শুরু করতে হলে, একটা খামার, গরু-মহিষ-ঘোড়া, এসব কেনার জন্যেও সোনার যথেষ্ট দরকার আছে। সবদিক বিবেচনা করে আমি বলতে চাই যে নিজেদের জন্যে অন্তত অর্ধেক রেখে বাকিটা ফ্রীডমের লোকদের দান করলে ব্যাপারটা মানানসই হয়। তোমরা কে কী বলো?

ইউজিনের প্রস্তাবটাই মেনে নিল সবাই।

সব কিছুরই এমন সুন্দর মীমাংসা হয়ে গেল দেখে সব ভুলে আনন্দে জেকবকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করল লী। ব্যথায় ককিয়ে উঠল জেকব।

আবারও ভুল করেছে বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে ক্ষমা চাইল লী।

এই নিয়ে একই দিনে দু’বার হলো–গুণল ইউজিন। একটু মুচকি হেসে সে ভাবল: তবে কি শক্ত-পাল্লার পাল্লায় পড়ে ভাল হয়ে গেল লী?

<

Super User