তুমি সোজা রলিন্সে যাবে, ব্যাগলের হাতে গরু বিক্রির কাগজটা দিয়ে বলল বেনন। ওখানে শেরিফের সঙ্গে দেখা করে তাকে সব খুলে বলবে। পুরো দলটাকে ধরতে কমপক্ষে বিশজনের পাসি লাগবে তার। প্রয়োজনে পিঙ্কারটন এজেন্সিতে টেলিগ্রাফ করে আমার ব্যাপারে সে খোঁজ নিতে পারে। কিন্তু দেরি যাতে না করে। রাসলার আর ইন্ডিয়ান এজেন্টকে হাতেনাতে ধরার এটা একটা বিরাট সুযোগ। কি বলেছি বুঝতে পেরেছ?
বিরস চেহারায় মাথা দোলাল ব্যাগলে। মজা সব একাই লুটে নেবে বেনন, এটা ওর পছন্দ হচ্ছে না, কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। এমনকি অনুযোগ করাও চলে না। জরুরী কাজে ওকে পাঠাচ্ছে বেনন। নিম-তেতো চেহারায় ঘোড়া ফিরিয়ে নিল ব্যাগলে, রলিন্সের দিকে ছুটতে শুরু করল ঘোড়াটা।
গুহার বাইরে অসংখ্য খুরের ছাপ। ঘাসগুলো দুমড়ে মুচড়ে গেছে। বাইরে এসে ছড়িয়ে পড়েছে গরু, সেই সঙ্গে চওড়া হয়েছে ট্র্যাক। তাড়া নেই বেননের, সময় নিয়ে কেগল আর ডিলনের ট্র্যাক খুঁজতে শুরু করল ও।
বেশ অনেকক্ষণ পর যা খুঁজছিল পেয়ে গেল। একটা ঘোড়া গরুর পালের ট্র্যাক থেকে সরে পাহাড়ের দিকে গেছে। অনুসরণ করতে শুরু করল বেনন। ধীরেসুস্থে এগোচ্ছে। সতর্ক। সামনে আছে কেগল আর ডিলন।
জমিটা সামনে ঢালু। বাতাস বইছে সামনে থেকে। সামনেই আছে কেগল আর ডিলন। একটা সিগার ধরাল বেনন। লক্ষ করল ট্রিপল বার আর বার। কিউয়ের দিকে কোনাকুনি ভাবে যাচ্ছে ট্রাক। পাহাড়ী পথ। দু’পাশে পাহাড়, পাইনের সবুজ রেখা তাদের গা ছুঁয়ে আছে।
সমতল চুড়োওয়ালা একটা টিলা পেরিয়ে বাঁক নিল বেনন। সামনে ঢালু টিলার রাজ্য। ওপর থেকে দেখলে মনে হয় লাল-হলদে ঢেউ বইছে। কেগল আর ডিলন সেদিকেই যাচ্ছে। ওগুলো পেরিয়ে গেলে আবার খোলা রেঞ্জে পড়বে ওরা। দিক না বদলালে আকাশে মাথা উঁচু করে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়শ্রেণীর কাছে চলে যাবে। ওই পাহাড়শ্রেণীর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী, সমতলের জমিকে করে তুলেছে উর্বর। ওদিকে যাচ্ছে কেগল। কেন? কোন জবাব। জানা নেই বেননের। অনুসরণ করছে ও। চারদিক লক্ষ করতে করতে চলেছে। সেজন্যেই ডিলন কতটা সামনে আছে সে-ধারণা পেয়ে গেল। আগেও লক্ষ করেছে ঘাসের ডগায় ঘোড়ার মুখের ফেনা। পরপর খুব কাছাকাছি দু’জায়গায় ফেনা দেখে স্যাডল থেকে নামল ও, একটা ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ফেনা নাড়াচাড়া করল। এখনও শুকাতে শুরু করেনি। বড়জোর মাইল খানেক সামনে আছে ডিলন। ঘোড়াটাকে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করিয়েছে লোকটা, ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। প্রয়োজনের সময় ঘোড়াটা এখন দ্রুত ছুটতে পারবে না। সেকারণে ডিলন কম বিপজ্জনক হয়ে যায়নি, আরও সাবধান হয়ে গেল নেন। চলার গতি আরও কমে গেল।
একটা ক্যানিয়ন ধরে এগোচ্ছে ও এখন। পাথরের মেঝেতে ঘোড়ার নালের ঘষা খাওয়ার দাগ ওর চোখ এড়ায়নি। এক জায়গায় নাদিও দেখেছে। কাঠি দিয়ে খুচিয়ে দেখেছে, নরম। আঙুল দিয়ে ঘাঁটলে বোঝা যেত গরম কিনা, ঠিক কতক্ষণ আগে ঘোড়াটা গেছে এপথে। কিন্তু ইচ্ছা করেনি বেননের।
এক ঘন্টা পর পুবের পাহাড়ে উঠল বেনন। এখানে থামল। নিচে, বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে-টিলা, ক্যানিয়ন, জঙ্গল আর খোলা ঘাস জমি এবং ট্রিপল বার আর বার কিউয়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা নদী। সূর্যের আলোয় ঝিলিক মারছে ঢেউয়ের মাথা। ডিলনকে খুঁজল ওর চোখ। ডিলন বা কোলের কোন চিহ্ন নেই। হরিণের তৈরি পাহাড়ী ট্রেইলটা পাহাড়ের গায়ে বাঁক নিয়ে ওপরে উঠেছে, সেদিকে তাকাল। ট্রেইলে দুটো ঘোড়ার ছাপ। একটা কোলের অন্যটা ডিলনের। কেগল এগিয়ে আছে, ডিলন চাইছে তাকে ধরতে। কেগলের ঘোড়াটা পরিশ্রান্ত নয়, কিন্তু ডিলনেরটা পরিশ্রান্ত। কেগল চাইবে নিজের সুবিধে মতো জায়গায় গিয়ে রুখে দাঁড়াতে।
পাহাড় থেকে ধীরেসুস্থে নেমে এলো বেনন। নদী যে-পাহাড়শ্রেণীর কোল ঘেঁষে গেছে, সেদিকে যাচ্ছে ট্র্যাক। চোখের ওপর হ্যাট টেনে দিয়ে সামনের জমি ভাল করে লক্ষ করল বেনন। অনেকদূরে, ছোট্ট একটা বিন্দু নড়ছে না? প্রায় ওই পাহাড়সারির কাছে?
দ্রুত ঘোড়া ছোটাল বেনন। পনেরো মিনিট একই গতি ধরে রাখল। সামনের অশ্বারোহী এখন আর বিন্দু নয় ওর চোখে। অনেক কাছে চলে এসেছে ও লোকটার। তবে এতটা কাছে নয় যে ওর ঘোড়ার খুরের শব্দ পাবে ডিলন।
এক ঝলকের জন্যে কেগলকেও দেখতে পেল বেনন। লোকটা ডিলনের রাইফেলের রেঞ্জের বাইরে আছে, পেছনে তাকাচ্ছে না একবারও। ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে। দ্রু কুঁচকে গেল বেননের। কেগল কি আর জানে না ডিলন তাকে ধাওয়া করছে? বদমাসের হাড় এই কেগল লোকটা, শিয়ালের চেয়েও ধূর্ত। বেড়াল যেমন মারার আগে ইঁদুরকে নিয়ে খেলে, তেমনি করে ডিলনের সঙ্গে খেলছে কেগল। নিজের পছন্দ মতো জায়গায় নিয়ে লিনকে শেষ করে দেবে। আত্মবিশ্বাস আছে লোকটার। তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। ডিলন লোকটাও বোকা নয়। তারও হাত চালু। নেতৃত্বের একটা সহজাত ক্ষমতাও আছে। দেখা যাক কি হয় শেষ পর্যন্ত।
ডিলন আর কোল যেদিকে যাচ্ছে তাতে একমাইল পর পৌঁছে যাবে নদীর কাছে। নদী ওখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গেছে। পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল কেগল। একটু পরই ধূসর ধোঁয়ার একটা ছোট্ট কুণ্ডলী দেখল বেনন। কয়েক সেকেন্ড পর রাইফেলের আওয়াজ পেল। পাহাড়ের কিনারায় টলমল করছে ঘোড়াটা। পড়ে গেল কিনারা থেকে। তার আগেই লাফ দিয়ে স্যাডল থেকে নামল কেগল, স্যাডলব্যাগ আর রাইফেল বুকে চেপে ধরে বাউলি কেটে দৌড়ে একটা বোন্ডারের পেছনে চলে গেল।
ঝোঁপের ভেতর লুকিয়ে এগোচ্ছে ডিলন, একটু পরই তাকে পাহাড়ের পায়ের কাছে দেখতে পেল বেনন
কড়াৎ!
পাহাড়ে পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হলো শব্দটা। খিচে দৌড় দিল ডিলন, রাইফেলটা দুহাতে ধরে আছে বুকের কাছে, একটা বোল্ডারের পেছনে ঝাপিয়ে পড়ে আশ্রয় নিল। রাইফেল ব্যবহার করেছে কেগল। তারমানে স্যাডলরোলে একটা রাইফেল ছিল তার। বিরক্ত হলো যেনন। লড়াইটা দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা বেশি।
মনোযোগ দিয়ে পাহাড়টা লক্ষ করল ও। কেগল আর ডিলন যেখানে আছে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ের গায়ে ঘোড়া নিয়ে ওঠা সম্ভব। তাতে চোখে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। ঝোঁপের মধ্যে ঘোড়া লুকিয়ে পাহাড়ে চড়লে? কপাল ভাল হলে কেউ দেখতে পাবে না। ওই জায়গায় পাহাড়টা ভেতরের দিকে ডেবে গেছে। উঁহু, সহজে ওকে দেখা যাবে না। কেগল আর ডিলনের মাথার ওপর একবার চড়ে। বসতে পারলে…
ঠিক করে ফেলল বেনন, পাহাড়ে উঠবে। এখন একটু পরপরই রাইফেলের গর্জন শুনছে। ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে গুলির আওয়াজ, একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে যাচ্ছে, জোরাল হয়ে উঠছে আরও। পরস্পারকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে কেগল আর ডিলন। একজন আরেকজনকে শেষ করতে না পারলে সন্তুষ্ট হবে না। এই তো সুযোগ। এখন দূর দিয়ে ঘুরে পাহাড়ের কাছে চলে যেতে পারবে বেনা, ঝোঁপের ভেতর ঘোড়া রেখে পাহাড়ে চড়ার সুযোগ পাবে।
কোনাকুনি ঘোড়া ছোটাল বেনন, তীরবেগে দূরত্ব অতিক্রম করছে। পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে কেগল আর ডিলনের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আড়াল পেতে বেছে নিচ্ছে ঝোঁপগুলোকে।
ঘোড়া রেখে পাহাড়ের গায়ে সেঁটে গেল বেনন, ডিলনের অবস্থানের দিকে তাকাল। নদীখাতের পঞ্চাশ গজ দূরে, তিনশো ফুট ওপরে পাহাড়ী ঢালে আছে সে। কয়েকটা বোল্ডারের পেছনে ঘাঁটি গেড়েছে। কেগল ওপরে আছে। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করল বেননের চোখ। একটু থমকে গেল। ডিলন যেখানে আছে তার ফুট তিরিশেক বায়ে কিছুটা ওপরে একটা নালা মতো দেখা যাচ্ছে। চওড়ায় নয় ইঞ্চির বেশি হবে না। ভেতরটা অন্ধকার। গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না। পাহাড়ের গা বেয়ে ওই নালা কতদূর উঠেছে কে জানে! দরকার কি জানার, নালা, দিয়ে বেনন উঠতে পারবে না, ধরা পড়ে যাবে ডিলনের চোখে। কিন্তু চোখ সরাতে পারছে না বেনন। নালাটা চুম্বকের মতো ওর চোখ আটকে রেখেছে। জ কুঁচকে উঠল বেননের। ভুল দেখছে না তো? গোলাগুলির আওয়াজের সাথে সাথে যেন চওড়া হচ্ছে নালাটা! একটু যেন আগুপিছু করছে পাহাড়ের ওই অংশ। চোখ সরু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বেনন। নিচে চিহি করে উঠল ওর ঘোড়াটা। কোন কারণে ভয় পেয়েছে।
পর পর আরও দুবার হুঙ্কার ছাড়ল ডিলন আর কেগলের রাইফেল, তারপর শুরু হলো একটানা গুরুগম্ভীর আওয়াজ। থরথর করে কাঁপতে শুরু করল পাহাড়। পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকির বিকট শব্দ হচ্ছে। আতঙ্কিত বেননের চোখের সামনে চওড়া হলো নালা, পাহাড়ের বিরাট একটা অংশ এগিয়ে আসছে সামনে, যেন পেছন থেকে ঠেলছে কেউ। পাহাড়ের চুড়ো পর্যন্ত গেছে মালা, ওখান থেকে ধুলো আর বালি ঝরে পড়তে শুরু করল। গড়াচ্ছে ছোট-বড় নানা আকারের পাথর খণ্ড। আওয়াজটা শুধু বাড়ছেই। কানে তালা লাগিয়ে দেয়ার মতো আওয়াজ। ধুলোর মেঘে আকাশ দেখা যাচ্ছে না। হাঁ হয়ে গেছে বেননের মুখ। জীবনে এমন দৃশ্য দেখেনি। দেখবে তা কল্পনাও করেনি। পালানোর কথা ভুলে বোকার মতো তাকিয়ে আছে, সম্বিৎ নেই ওর।
অ্যাভালাশ!
আস্ত পাহাড়টার দশ ভাগের এক ভাগ, প্রকাণ্ড পাথরের সুবিশাল স্থূপ, কাত হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে! প্রবল ভূমিকম্পে থরথর করে কাঁপছে চারপাশ। নদীর খাত বুজে গেল ধসে পড়া কয়েক মিলিয়ন টন পাথরে। ডিলন যেখানে ছিল সেই জায়গাটা এখন ছুটন্ত পাথরের একটা শুকনো নদী। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে যেমন করে ধোয়া বেরোয়, তেমনি করে ধুলোর মস্ত কুণ্ডলী নিজের ভেতরে পাক খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়ছে।
এখনও পাহাড়ের গায়ে সেঁটে আছে বেনন। ঘন ঘন ঢোক গিলছে। ওর মাত্র বিশ গজ দূর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর। নানা আকৃতির। ছোট নুড়ি থেকে শুরু করে বিশ টনী বোল্ডার। এই স্রোত পুরোপুরি থামতে কয়েকদিন লাগবে। পাহাড়ের নিরেট পাথুরে দেয়াল যতক্ষণ বেরিয়ে না আসছে, ততক্ষণ পাথর খসতেই থাকবে, নেমে আসার সময় সঙ্গে নিয়ে আসবে আরও পাথর।
ডিলন চাপা পড়েছে কয়েকশো টন পাথরের নিচে।
আরও কিছুক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পর বেননের মধ্যে অনুভূতি ফিরতে শুরু করল। বুঝতে পারল নিরাপদ জায়গায় আছে ও।
ধুলোর একটা ঘন মেঘ চারদিক ঢেকে রেখেছে। আস্তে আস্তে থিতিয়ে আসছে ধুলো। হালকা বাতাসে সরে যাচ্ছে আরেকদিকে।
দুই মিনিট তাকিয়ে থাকার পর বেনন দেখতে পেল কেগল যেখানে ছিল তার আড়াই ফুট দূর থেকে ধসে গেছে পাহাড়। কেগল কোথাও নেই। তাকে দেখতে পাবার কথাও নয়। পাথরের পেছনে লুকিয়েছিল সে।
চিন্তা করছে বেনন, কেগল ওকে দেখেছে তা হতে পারে না। পাহাড় ধস বাদ দিয়ে অন্যকিছু দেখবে সেই ক্ষমতা স্বয়ং শয়তানেরও নেই। কেগল যেখানে আছে সেখানে পাথর পড়েনি। তারমানে লোকটা এখন ভাবছে সমস্ত বিপদ কেটে গেছে।
পাহাড়ের গা থেকে সরে এক ছুটে ঝোঁপের ভেতর ঢুকে পড়ল বেনন, অপেক্ষা করে দেখতে চাইছে কেগল কি করে। ধুলো কমছে, কিন্তু পাথর গড়ানোর আওয়াজ এখনও চলছে একটানা। নদীটা যে খাদ দিয়ে বইছিল অনেকদূর পর্যন্ত সেটার কোন অস্তিত্ব নেই।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো বেননকে, তারপর বোল্ডারের আড়াল থেকে বেরল কেগল। ঘোড়া থেকে লাফ দেয়ার সময় স্যাডল ব্যাগটা হাতছাড়া করেনি দেখা যাচ্ছে, কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে ওটা। বেশ ভারী। ওজন সামলাতে সামনে ঝুঁকে আছে লোকটা, পাহাড়ী ছাগলের দক্ষতায় নেমে আসছে ঢালু পাহাড়ের গা বেয়ে।
তাকে পাহাড় থেকে নামতে দিল বেনন, তারপর উদ্যত সিক্সগান হাতে বেরিয়ে এলো ঝোঁপের ভেতর থেকে।
ওকে দেখে থমকে দাঁড়াল কেগল। চোয়াল স্কুলে পড়ল বিস্ময়ে। পরমুহূর্তেই সামলে নেবার চেষ্টা করল। বলল, হঠাৎ এদিকে? আমি ভেবেছিলাম কালকেই চলে গেছ তোমরা।
আমি সবই জানি, কেগল, শান্ত, ধীর গলায় বলল বেনন। রাতে তুমি ডিলনের র্যাঞ্চে কি করেছ সেটা যেমন জানি তেমনি গরু স্ট্যাম্পিড় করানোর, সময় জারম্যানকে খুন করেছ সেটাও জানি। তোমার কোন কুকীর্তি আমার কাছে গোপন নেই। সামনে বাড়ল ও। চালাকির কোন চেষ্টা কোরো না, কেগল, আমি গুলি করব।
সময় থমকে দাঁড়াল। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। চোখের পলক ফেলছে না কেউ, যেন ফেললেই হেরে যাবে। কেগলের চোখ সাপের মতো চকচক করছে। গানম্যানের চোখে একই সঙ্গে অনেকগুলো চিন্তার ছাপ দেখতে পেল বেনন। ঝুঁকি নেবার প্রবণতা, ভয়, ঘৃণা, আক্রোশ এবং সবশেষে পরাজয় স্বীকার।
স্যাডলব্যাগটা পিঠ থেকে নামানোর চেষ্টা কোরো না, নির্দেশ দিল বেনন। আস্তে আস্তে সামনে বাড়ছে। দৃষ্টি সরাচ্ছে না গানম্যানের চোখ থেকে। কথা দিচ্ছি ন্যায় বিচার পাবে তুমি।
দাঁতে দাঁত চাপল কেগল। ন্যায় বিচার মানেই ফাঁসি। কিন্তু এখন তো বেঁচে আছে! বেনন ঠাট্টা করছে না, গুলি করতে দ্বিধা করবে না। কিছু করা ঠিক হবে না। আপাতত নয়। পরে সুযোগ আসবে। আসতেই হবে। আসে সবসময়। পালানো যাবে। দরকার শুধু একটু সুযোগ। বিচারের আগেই।
মাপা হাতে কেগলের মাথায় সিক্সগানের নল নামিয়ে আনল বেনন। অজ্ঞান দেহটা ধরে শুইয়ে দিল মাটিতে। স্যাডল ব্যাগ থেকে দড়ি এনে ভাল-মতো হাত পা বেঁধে ফেলল। তারপর পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল। কেগল যেখানে ছিল তার ফুট পঁচিশেক নিচে একটা পাথুরে চাতালে দাঁড়াল। একসময় যেখানে নদী বয়ে যেত সেখানে এখন পাথরের স্থূপ ছাড়া আর কিছু নেই। বিরাট একটা বাঁধ তৈরি করেছে প্রকৃতি। বাঁধে বাধা পেয়ে ক্রমশ পানির উচ্চতা বাড়ছে নদীর। উচ্চতা আরও পঞ্চাশ ফুট বাড়লে বাঁধ ডিঙিয়ে পানি উপচে পড়ত, কিন্তু ট্রিপল বারের দিকে যে শাখাটা গেছে সেটাতে পানির স্রোত বাড়ছে। বাঁধ আর ডিঙাবে না নদী, নতুন পথে ছুটবে। প্রয়োজনে নদী নিজেই তার পথের গভীরতা বাড়িয়ে নেবে। কিছুদিন পর বার কিউয়ের ওপর দিয়ে যাওয়া পুরনো নদীখাতটা প্রায় শুকিয়ে যাবে। সেজন্যেই ট্রিপল বার দখল করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিল ডিলন। ডিলন জানত-পাহাড়ে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। একদিন না একদিন নদীর মূল। স্রোত পাহাড় চাপা পড়ে হারিয়ে যাবে।
কৌতূহল মিটিয়ে নেমে এলো বেনন, কেগলকে কাঁধে তুলে নিয়ে স্যাডলে বাঁধল, তারপর রওনা হয়ে গেল টুইন স্প্রিংসের উদ্দেশে। নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে ঝেড়ে কাশবে গেল, কাজেই সমস্ত রহস্যের সমাধান এবার হয়ে যাবে। তবু একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না বেনন। ব্যাগলে ওদিকে কি করছে কে জানে।
<