আরলিসকে যে আমি এতটা ভালবাসি, ভালুকটার সঙ্গে লড়াইয়ের আগে বুঝতে পারিনি। আব্বা আর আম্মা যতটা বাসে তার চেয়ে কম বাসি না। মনে হতে লাগল, কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের চেয়ে বরং বেশিই বাসি। সুতরাং সে যাকে পছন্দ করে সেই কুকুরটাকে আমি শেষ পর্যন্ত যে পছন্দ না করে পারব না এ তো স্বাভাবিক।

যতই মাংস চুরি করুক, আমাকে তার দিকে আড়চোখে তাকাতে দেখে মাটিতে শুয়ে পড়ে আতঙ্কে চেঁচাক, ষাড়ের লড়াইয়ের সময় আমাকে সাহায্য না করে দৌড়ে পালাক, এই ঘটনার পর ওল্ড ইয়েলারের ওপর আর রাগ ধরে রাখা গেল না। আমি যা করতে পারিনি তাই করে বসেছে ওল্ড ইয়েলার। আরলিসের জীবন বাঁচিয়েছে সে।

ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম আমি। চাপড়ে দিলাম। লেজ নেড়ে বুঝিয়ে দিল কতটা সুখি সে। ওর সঙ্গে কি দুর্ব্যবহারটা না করেছি এ-কদিন ভেবে লজ্জা লাগল। ওর যত্ন শুরু করলাম। পায়ের তলা খুঁজে দেখতে পেলাম দুই নখের মাঝে একটা মেসকিটের কাঁটা গেঁথে আছে। টেনে বের করলাম সেটা। কানের ভেতরে পেলাম তিনটে জোঁক, চামড়া কামড়ে ধরে আছে। রক্ত খেয়ে ফুলে উঠেছে। জ্বলন্ত কয়লার ছ্যাকা দিয়ে খসালাম ওগুলোকে। সাবান দিয়ে ভাল করে ডলে ডলে গোসল করালাম। উকুন দূর করার জন্যে লবণ মাখানো শুয়োরের চর্বি ডলে দিলাম। সারা গায়ে।

সেদিন রাতে অন্ধকারে আমাদের বিছানায় উঠে এল ইয়েলার। আমার আর আরলিসের মাঝে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। একসঙ্গে ঘুমালাম আমরা। কথাটা আম্মার কাছে চেপে গেলাম বেমালুম।

পরদিন ওকে আর আরলিসকে নিয়ে কাঠবেরালি শিকারে বেরোলাম। এই প্রথম আমার সঙ্গে শিকারে নিয়ে গেলাম আরলিসকে। চুপ থাকতে পারে না সে। বাড়িতে যে হারে চেঁচামেচি করে, শিকারে গিয়ে ওরকম করলে ত্রিসীমানায় থাকবে না কোন শিকার।

তাকে সাবধান করে দিলাম, শিকারে বেরোলে চুপচাপ থাকতে হয়। চুপ করেই আমাদের সঙ্গে চলল সে, অন্তত যতক্ষণ কোন কিছু নজরে না পড়ল। কিন্তু যেই একটা রঙিন প্রজাপতিকে উড়তে দেখল, প্রতিজ্ঞা ভুলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তাড়া করল ওটাকে। ধরতে পারল না। চেঁচিয়ে আমাকে ডাকতে লাগল, গিয়ে তাকে সাহায্য করার জন্যে। কেন গেলাম না সে জন্যে রেগে গিয়ে আরও জোরে চেঁচাতে লাগল। তারপর থেকে আর চুপ থাকল না সে। কোন না কোন কারণে চেঁচিয়েই চলল। এক জায়গায় একটা চ্যাপ্টা পাথর দেখে দাঁড়িয়ে গেল। কৌতূহলী হয়ে উল্টে ফেলল পাথরটা। ওটার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল পিঁপড়ে, শতপদী, ঝিঁঝি পোকা আর মারাত্মক বিষাক্ত কাঁকড়া বিছে। আচমকা আলো পড়ায় হুড়াহুড়ি করে ছুটে পালাতে শুরু করল ওগুলো। তাই দেখে আরলিসের সে কি চিৎকার। আমাকেও ডাকতে লাগল গিয়ে দেখার জন্যে।

আরেকবার গিয়ে উঠল একটা কাঁটাঝোপের ডালে। আর নামতে পারে না। ব্যস, শুরু হলো চিৎকার। শেষে বাধ্য হয়ে আমাকে গিয়ে নামাতে হলো। হাঁটার সময়ও স্বস্তি নেই। পাথরের ওপর পড়ে গিয়ে কনুইয়ে ব্যথা পেল। কয়েক মিনিট চুপচাপ থাকার পর আচমকা তারস্বরে এমন চিৎকার করে উঠল যেন মেরে ফেলা হচ্ছে তাকে। কি ব্যাপার? কনুই উল্টে দেখাল। যেখানে ব্যথা পেয়েছিল সেখান থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।

হতাশ হয়ে গেছি আমি। বুঝতে পারছি, কোন শিকারই আর আমাদের ধারেকাছে নেই। সব পালিয়েছে তল্লাট ছেড়ে, কেবল কাঠবেরালিরা বাদে। ওগুলোও উঠে গেছে গাছের মগডালে, লুকিয়ে থাকার জন্যে। তবে লুকানোর আগেই একটাকে দেখে ফেললাম। যে হট্টগোলে শিকার সব পালিয়েছে সেই হট্টগোলকেই কাজে লাগালাম এখন, কাঠবেরালিটাকে বোকা বানানোর জন্যে।

আরলিসকে পাঠালাম গাছের গোড়ায়। ঘুরে ঘুরে চিৎকার করবে আর লাঠি দিয়ে বাড়ি মারতে থাকবে ঘাস আর ঝোপঝাড়ে। আমি একটু দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব।

দারুণ এক মজার কাজ পেয়ে গেল আরলিস। কাঠবেরালিটার চোখ তার ওপর। ঘুরতে শুরু করল ওটা। যাতে চোখে চোখে রাখতে পারে আরলিসকে। আমার কথা ভুলেই গেল। এটাই চেয়েছিলাম আমি। আমার দিকে ঘুরে আসতেই এক গুলিতে ফেলে দিলাম।

আমরা কি চাই বুঝে গেল ওল্ড ইয়েলার। আরলিসের চিৎকারে মাটি থেকে লাফিয়ে গাছে গিয়ে ওঠে কাঠবেরালি। কড়া নজর রাখে ইয়েলার। আমরা না দেখলেও সে ঠিকই দেখে ফেলে। ঘেউ ঘেউ করতে করতে ছুটে যায়। আরলিসকে তখন পাঠাই কাঠবেরালিটার নজর তার দিকে ধরে রাখার জন্যে। ঘুরতে ঘুরতে ওটা যেই আমার দিকে আসে, গুলি করে ফেলে দেইI

গোটা পাঁচেক কাঠবেরালি শিকার করতে খুব বেশিক্ষণ লাগল না আমাদের। রাতে ভেজে খাওয়ার জন্যে যথেষ্ট। আর দরকার নেই।

দিন সাতেক পর। একটা বুনো গবলার ধরতে সাহায্য করল আমাকে ইয়েলার। ও না থাকলে খুঁজেই পেতাম না পাখিটাকে। খেতে ঢুকেছিলাম মটরশুটি তোলার জন্যে। সঙ্গে বন্দুক ছিল। পাথর এনে খেতের চারপাশে বেড়া দিয়েছে আব্বা। বেড়ার কাছে পৌঁছেই দেখি গবলারটাকে। গাছ থেকে মটর ঠুকরে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে গাছের গোড়ায় নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে পোকা বের করার জন্যে।

আরি, আম্মা বলল, গাছগুলোর সর্বনাশ করবে তো!

চুপ করে থাকো, আম্মাকে কথা বলতে নিষেধ করে বন্দুক কাঁধে তুলে নিলাম। নলটা রাখলাম সামনের পাথরে। নিশানা যাতে স্থির থাকে।

বেশি দূরে না পাখিটা। সহজ নিশানা। ফেলে দিতে পারব। পাখদুটো যেখানে পিঠের সঙ্গে জোড়া লেগেছে ঠিক সেখানে লক্ষ্য স্থির করলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ করে ট্রিগার টিপতে যাব, এই সময় ছুটতে ছুটতে এল আরলিস। আস্তে তো কথা বলতে পারে না, চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাকে গুলি করছ, ট্রাভিস, আঁ! কি দেখেছ?

একই সঙ্গে চমকে দিল আমাকে আর গবলারটাকে। চাপ লেগে গেছে ট্রিগারে। পড়ে যেতে দেখলাম পাখিটাকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। একটা ডানা ভেঙে ঝুলছে শরীরের পাশে। সেটাকে টানতে টানতে দৌড় দিল শস্য খেতের ভেতর দিয়ে।

প্রচণ্ড রাগ লাগল আরলিসের ওপর। ধরে গলাটা মুচড়ে দিতে পারলে ওই মুহূর্তে খুশি হতাম। চেঁচিয়ে বললাম, আরলিস, মুখটা বন্ধ রাখতে পারিস না একটু! দিলি তো তাড়িয়ে! গেল, আর পাওয়া যাবে না!

আমার এই রাগের কারণ বুঝতে পারল না আরলিস। ওখানেই ধপ করে বসে কান্না জুড়ে দিল। মাটি ভেজাতে লাগল চোখের পানিতে। কিছু পড়ল খালি পায়ে। পুরু হয়ে লেগে থাকা বালিতে কালো কালো ফুটকি সৃষ্টি করল। ওর চোখের পানি দেখে অবাকই লাগে আমার। অকারণে, এত সহজে, এত তাড়াতাড়ি, এত বেশি পানি বেরোতে দেখিনি আর কারও।

আম্মা বলল, ট্র্যাভিস, গবলারটা পালায়নি। আছে এখনও। ওই যে দেখ।

তাকিয়ে দেখি মটর খেতের একধারে পাথরের বেড়ার কাছে লাফালাফি করছে ওল্ড ইয়েলার। কয়েকটা লাফ দিয়ে ছুটে এল গবলারটা যেখানে গুলি খেয়েছে সেখানে। জায়গাটাকে ঘিরে চক্কর দিল, গন্ধ শুকল, লেজের-গোড়া নাড়ল, তারপর ছুটল আবার। গবলারটা যেদিক দিয়ে গিয়ে গম খেতে ঢুকেছে ঘেউ ঘেউ করতে করতে গিয়ে সে-ও ঢুকে পড়ল সেদিক দিয়ে।

মিনিট দুয়েক পর খেতের ওপাশের জঙ্গলে শোনা গেল তার ডাক। ছুটে গেলাম। কাঠবেলিকে গাছে তুলে যে ভাবে চিৎকার করেছিল, সেরকম করছে। নিশ্চয় দেখতে পেয়েছে গবলারটাকে।

আমরাও দেখলাম। একটা ওকগাছে উঠে গেছে। চুপ করে এমন ভঙ্গিতে বসে আছে ডালে, ভাবখানা যেন তোমরা এদিকে তাকিয়ো না, লাভ হবে না-আমি নেই এখানে।

বন মোরগের রোস্ট, গমের আটার রুটি, শালুক সেদ্ধ দিয়ে সে রাতে খাওয়াটা আমাদের দারুণ জমল। ওল্ড ইয়েলার কিন্তু তেমন খেল না। বার বার খাওয়াতে চেষ্টা করলাম আমরা। হাজার হোক, গবলার শিকারে তার অবদানই বেশি। সৌজন্য বলেও তো একটা কথা আছে। ভাল মাংস তুলে নিয়ে দিলাম ওকে। কিন্তু দু-একবার চেটে দেখল কেবল, খেল না। অথচ এত স্বাদের খাবার গপ গপ করে গেলার কথা। মনে পড়ল, গত কদিন ধরেই ও কিছু খায় না বাড়িতে। তাজ্জব ব্যাপার! সুস্থ আছে কি করে? একেবারেই তো স্বাভাবিক চেহারা! চকচকে রোম! যেন দিনে তিনবার করে পেট ভরে খায়! ভূতুড়ে কাণ্ড নাকি!

সন্দিহান হয়ে উঠল আম্মা। মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, মুরগীর খোয়াড় থেকেও তো কিছু চুরি করে না! ডিম চুরি করে না, বাচ্চাগুলো সব ঠিকঠাক আছে। আজকেও দেখেছি।

ব্যাপারটা নিয়ে লম্বা আলোচনা করলাম আমরা। কি খেয়ে বাঁচে ওল্ড ইয়েলার ভেবে ভেবে মাথা গরম করলাম। কিন্তু অবাক হওয়াই সার। কিছুই বুঝতে পারলাম না। রহস্যটা মাথায় নিয়েই ঘুমাতে চললাম। খচখচ করতে থাকল মনের মধ্যে।

রহস্য ভেদ হলো বাড সারসি যেদিন আমাদের বাড়িতে এল, আমরা কেমন আছি দেখার জন্যে, সেই দিন।

সারসির মুখটা লাল। পেট মোটা। বসতির এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। বসে বসে ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকে-দিনকাল বড় খারাপ চলছে হে, খেয়ে পরে আর বেঁচে থাকা যাবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। তামাক খায় আর সর্বত্র থুতু ছিটায়। আশায় আশায় থাকে কেউ তাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানাবে।

আমি তার খুব একটা উপকারে আসতে পারিনি কখনও। আব্বা-আম্মাও তাকে পছন্দ করে না। আম্মা বলে, লোকটা একটা অকর্মার ধাড়ি। সে জন্যেই গরু বেচতে কেউ তাকে সঙ্গে নেয়নি। তাকে নিলে নাকি গরু নিয়ে কানসাসে পৌঁছতে পৌঁছতেই সবাই বুড়ো হয়ে যাবে। কাজেই রয়ে গেছে বাড সারসি। এখন সল্ট লিক আর অ্যাবিলেনে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ।

সাদা চুলওয়ালা তার একটা নাতনী আছে, মেয়েটাকে আমার পছন্দ। বাবা-মা নেই, নানার কাছেই থাকে। এগারো বছর বয়েস। আর সব মেয়ের চেয়ে আলাদা। ছেলেদের কাছে কাছে ঘুরঘুর করে, ওরা কি করে না করে দেখে। কোন ছেলে কতটা ভাল গাছে চড়তে পারে, কে কত জোরে পাথর ছুঁড়ে কতটা বেশি দূরে নিতে পারে, কে ভাল সাঁতার কাটতে পারে, বন্দুকে কার নিশানা কত ভাল, এই সবে তার আকর্ষণ। অহেতুক জটিলতা পাকায় না, মাতব্বরী করার চেষ্টা করে না, মেয়েগুলো সাধারণত যা করে থাকে। ওর সব কিছুই আমার পছন্দ, কেবল চোখ বাদে। বড় বড় বাদামী চোখ দুটো সত্যিই সুন্দর। কিন্তু যখন কারও দিকে তাকায় মনে হয় দৃষ্টিটা ছুরির ফলার মত চিরে ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে, কি আছে ওখানে সব দেখে আসে। অস্বস্তি বোধ করতে থাকি আমি। তাই পারতপক্ষে তার চোখের দিকে তাকাই না।

ওর নাম লিজবেথ। নানার সঙ্গে সেদিন আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলো। রোগা একটা ঘোড়ায় চেপে এল ওরা। হাড় জিরজিরে জানোয়ারটাকে দেখে মনে হয় না কয়েক মাস পেটে দানাপানি কিছু পড়েছে। নানার পেছনে তার কোমরের বেল্ট চেপে ধরে বসেছে মেয়েটা। সাদা কোঁকড়া চুল ঝলমল করছে রোদে। পিছে পিছে এল একটা নীলচে রঙের মাদী কুকুর। অনেকেরই ধারণা, ওটা আমার বেলের বাচ্চা।

ওদের সাড়া পেয়েই দৌড়ে গিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল ওল্ড ইয়েলার। কণ্ঠ শুনে মনে হলো না আগন্তুকদের তার অপছন্দ। তবু চেঁচাচ্ছে। কি জানি, হয়তো আমাদের খুশি করার জন্যেই। থামতে বললাম। একবার বলাতেই চুপ। তারমানে মেহমানদের তার পছন্দ হয়েছে। নাহলে আমার এক কথায় চুপ করার পাত্র সে নয়।

দরজায় বেরিয়ে এল আম্মা। লিজবেথ আর সারসিকে ঘোড়া থেকে নেমে ঘরে ঢোকার আমন্ত্রণ জানাল। ওদের সঙ্গে আসা কুকুরটার সঙ্গে গিয়ে খাতির করতে শুরু করল ইয়েলার। কেন অপছন্দ করেনি সারসিদেরকে বুঝতে আর বাকি রইল না আমার।

ঘোড়ার পিঠ থেকে পিছলে মাটিতে নামল লিজবেথ। বড় বড় চোখ মেলে তাকাল আমার দিকে। তার নানাও নামল। আম্মার দিকে তাকিয়ে সারসি বলল, ঘরে ঢুকতে পারবে না এই গরমের মধ্যে, তার চেয়ে ডগ রানে বসাটাই বরং ভাল। আরাম হবে। সুতরাং আম্মা আমাকে গরুর চামড়ায় তৈরি চারটে চেয়ার বের করে আনতে বলল। আমি যেটাতে বসতে সব চেয়ে পছন্দ করি সেই চেয়ারটাই বেছে নিল সারসি। তামাক বের করে একবারে অনেকখানি মুখে পুরল। উঁচু হয়ে ফুলে গেল এক পাশের গালের চামড়া। চিবাতে না চিবাতেই রস বেরোতে লাগল, ছিটানো শুরু হয়ে গেল তার। যেখানে ইচ্ছে ফেলছে। হাঁটতে গেলে যে কারও পায়ে লাগতে পারে। তোয়াক্কাই করছে না।

প্রথমে আম্মাকে জিজ্ঞেস করল, আমাদের কেমন চলছে। আম্মা বলল, ভালই। ইনিয়ে বিনিয়ে তখন বলতে থাকল সারসি, এই এলাকার সমস্ত পরিবারের খোঁজখবর নিতে, ভালমন্দ দেখতেই তাকে রেখে গেছে বাড়ির কর্তারা। মস্ত দায়িত্ব। কাজের চাপে তার প্রায় মরার অবস্থা, তবু ভাল লাগছে বলে একাজ করে যাচ্ছে। আম্মাকে বলল, সামান্যতম অসুবিধে হলেও যেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে খবর দেয়া হয়। আম্মা বলল, দেবে।

ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল সারসি। নানা রকম খোঁজখবর দিতে লাগল। বেশির ভাগই খারাপ খবর। বসতির কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সব তার মুখস্থ। এ বছর নাকি সাংঘাতিক খরা পড়বে। ফসল সব শুকিয়ে যাবে। ঠিকমত ঘরে তোলা আর হবে না। বসন্তের আগেই খাবার শেষ হয়ে যাবে গৃহস্থের। বলল, গরুগুলো সব শুকিয়ে যাবে, বাগানে সব্জি যাবে মরে।

জেড সিম্পসনের ছেলে রোজাল নাকি একটা বনমোরগ শিকার করতে বসেছিল। হঠাৎ একটা শেয়াল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তখন বন্দুকের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে মারতে হয়েছে শেয়ালটাকে। সারসির ধারণা, নিশ্চয় জলাতঙ্ক রোগ হয়েছিল ওটার। নইলে এভাবে শিকারীকে শেয়ালে আক্রমণ করতে শোনা যায় না সচরাচর।

এই পর্যায়ে তার এক চাচার কথা মনে পড়ে গেল। পূর্ব টেকসাসের পাইন বনে নাকি পাগলা কুকুরের কামড় খেয়েছিল তার চাচা। সারসি তখন ছোট। কুকুরটা কামড়াতেই বুঝতে পারল চাচা, তার আর রেহাই নেই, মরতেই হবে। তখন একটা শেকল নিয়ে এক মাথা আটকাল গাছের সঙ্গে, আরেক মাথা নিজের পায়ে, যাতে কোনমতেই ছুটতে না পারে। ওখানেই থাকল। রোগটা দেখা দিল, পাগল হয়ে গেল সে। মুখ দিয়ে ফেনা বেরোতে লাগল। নিজের স্ত্রীকেও চিনতে না পেরে কামড়ানোর জন্যে তেড়ে গেল। তাড়া করল ছেলেমেয়েদের। কিন্তু শেকল আটকানো থাকায় ছুটতে পারল না, কামড়াতেও পারল না। এভাবেই মারা গেল সে। ওই গাছের নিচেই তাকে কবর দেয়া হলো।

তারপর একটা কালো চিতাবাঘের গল্প বলল সে। জো অ্যানসনের একটা ঘোড়ার বাচ্চা মেরে ফেলেছিল ওটা। তার ছেলেরা তখন কুত্তা লেলিয়ে দিল বাঘের পেছনে। একটা গুহায় কিয়ে কোণঠাসা করল বাঘটাকে। কুত্তাগুলো ঢুকল না ভেতরে। বুদ্ধি আছে ওগুলোর। জানে, গুহার ভেতরে বাঘের পেছনে ঢোকা সাংঘাতিক বিপজ্জনক, ধারাল নখের থাবায় মারাত্মক জখম হয়ে মরতে হবে। জো-র ছেলে জেফ খুব সাহসী। ঢুকে পড়ল গুহায়। বাঘটা তাকে কিছু করার আগেই ওটাকে মেরে ফেলল।

বকর বকর করেই চলল সারসি। ডিনারের আগে আর থামল না। খাওয়ার সময় কথা বলল।। শেষ লোকমাটা গিলেই আবার চালু করে দিল মুখ।

কি এক আজব জীব নাকি উদয় হয়েছে সল্ট লিকে। লোকের ঘরে ঢুকে খাবার চুরি করে। কয়োট নয়, পোসাম নয়, স্কাংক কিংবা কুনও নয়। কেউ জানে না কি জীব। স্মোকহাউস থেকে মাংস চুরি যাচ্ছে, মুরগীর ঘর থেকে ডিম। রুটি বানিয়েও শান্তি নেই মেয়েদের। ঠাণ্ডা হওয়ার জন্যে রেখে হয়তো একটু সরেছে, ফিরে এসে দেখে নেই। সব হাওয়া। গরু কেটে মাংস বানাচ্ছিল আইক ফুলার। উঠে পানি খেতে গিয়েছিল। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে দেখে তিন-চার পাউণ্ড মাংস গায়েব। কিসে যে নিল কিছু আন্দাজই করতে পারল না। যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

শঙ্কিত হয়ে উঠছে সল্ট লিকের মানুষ। কিসে চুরি করছে সেটা জানা থাকলেও একটা স্বস্তি ছিল, জানোয়ারটার পেছনে লেগে ওটাকে খতম করার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু আন্দাজই করতে পারছে না কেউ কিছু।

শুনতে শুনতে অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। মিনিটখানেক পর সেটা আরও বাড়ল, যখন লিজবেথ তার সঙ্গে ঝর্নায় যেতে ইশারা করল।

পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম আমরা। পিছে পিছে আসছে ওল্ড ইয়েলার আর নীলচে কুকুরটা। বাড়ি থেকে দূরে এসে থামল লিজবেথ। মুখ তুলে বলল, ওর কাজ।

মানে? কি বলতে চাও?

তোমার কুকুরটা। আমি দেখেছি।

কি দেখেছ?

গরুর মাংস চুরি করতে। আমাদের মুরগীর খোয়াড় থেকে ডিম চুরি করতেও দেখেছি।

ওর চোখের দিকে তাকালাম। সে-ও তাকিয়ে রইল। একটুও সরাল না। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না আমি, সরিয়ে নিলাম।

কিন্তু আমি কাউকে বলব না, লিজবেথ বলল।

বিশ্বাস করলাম না তার কথা।

বললাম, না বলে কি আর পারবে?

বলব না, মাথা নেড়ে বলল সে।

কুকুরটা যে তোমার এটা না জানলেও বলতাম না।

কেন?

কারণ মিস প্রিসির বাচ্চা দরকার।

মিস প্রিসি?

আমার কুকুরটার নাম। ওটার বাচ্চা লাগবে। ওর বাচ্চার বাপ হতে যাচ্ছে ওল্ড ইয়েলার। কাজেই কিছুতেই চাইব না আমি, ওকে গুলি করে মেরে ফেলা হোক।

আবার তাকালাম ওর দিকে আবার সরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। ওকে ধন্যবাদ জানাতে চাইলাম, কিন্তু ভাষাই খুঁজে পেলাম না। পকেট হাতড়ে বের করে আনলাম একটা তীরের ফলা। ইনডিয়ানদের তীর। কুড়িয়ে পেয়েছি বনের ভেতর। দিয়ে দিলাম ওকে।

হাতে নিয়ে জিনিসটা দেখতে লাগল সে। চোখ চকচক করছে। তারপর ঢুকিয়ে রাখল তার পোশাকের একটা লম্বা পকেটে।

কক্ষণো, কোন দিন আমি একথা কাউকে বলব না। ঘুরে বাড়ির দিকে দৌড় দিল লিজবেথ। ছুটতে ছুটতে চলে গেল।

ঝর্নার কিনারে গিয়ে বসে গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগলাম। এখন মনে হতে লাগল, যতই বেশি কথা বলুক, যতই তামাকের রস ছিটাক না কেন, বাড সারসিকে আমি পুরোপুরি অপছন্দ করি না। কিন্তু ওল্ড ইয়েলারের ব্যাপারে অস্বস্তিটা গেল না মন থেকে। লিজবেথ যখন দেখেছে, আগে হোক পরে হোক আরও কারও নজরে পড়ে যেতে পারে। সেই লোক নিশ্চয় চুপ থাকবে না। গুলি করে মারা হবে ইয়েলারকে। চুরি করলে নিজের বাড়ির কুত্তাকেই দেখতে পারে না কেউ, অন্যের বাড়িরটাকে কে পারবে। ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই, আমি শিওর।

পেট ভরে সাপার খেয়ে, আরও কিছুক্ষণ বকবক করে অবশেষে উঠল সারসি। ঘোড়ায় চেপে রওনা হলো নানা-নাতনী।

মুরগীর খোয়াড় থেকে গিয়ে তিনটে ডিম বের করে আনলাম। ওল্ড ইয়েলারকে বাড়ির কাছ থেকে দূরে ডেকে নিয়ে এসে তার নাকের নিচে ভেঙে দিলাম সেগুলো। খেতে উৎসাহিত করতে লাগলাম। কিন্তু সে খেল না। এমন ভঙ্গি করতে লাগল, যেন ডিম কোন খাবারই নয়। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে লাগল। মুখ চেটে দিল আমার।

খেপে গেলাম। চিৎকার শুরু করলাম, চোরের বাচ্চা চোর! পিটিয়ে হাড্ডিগুড্ডি-সব গুঁড়ো করে দেব!

বললাম বটে, কিন্তু আসলে আমি তা করব না। লাঠি তুললেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করবে ইয়েলার, মাটিতে অহেতুক গড়াগড়ি খেতে শুরু করবে। তেড়ে আসবে আরলিস। লড়াই বেধে যাবে আমার সঙ্গে।

কুকুরটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ধরা যখন পড়বে, তখব বুঝবে মজা। বন্দুকের গুলি কখনও খাওনি তো!

<

Super User