কেড্রিক সহ সবাই ইয়েলো বাট-এর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ার পর অস্থির হয়ে উঠল সামান্থা। এরপর কী হতে যাচ্ছে? ফ্রেড র‍্যানসাম পারবে কিছু করতে? কী হবে আসন্ন তদন্তের ফলাফল? এখানে মামার ভূমিকাকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখা হবে?-অসংখ্য প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলল ওকে।

মাস্ট্যাংয়ের ধূসর পাথুরে ভবনের একটা ডেস্কের ড্রয়ারে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে মামার কাগজপত্র; ওর বিভিন্ন দলিলও রয়ে গেছে ওখানে। বারউইকের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে হলে কিংবা মামাকে অপবাদের হাত থেকে বাঁচাতে চাইলে ওগুলো লাগবে। চট করে সিদ্ধান্ত নিল সামান্থা। ঘোড়ায় চেপে রিমের উল্টোদিকের হাইডআউট থেকে বেরিয়ে পড়ল। ওল্ড মরমন ট্রেইলে পৌঁছে দক্ষিণে বাঁক নিল, ভোর হচ্ছে, বহুদূর থেকে ভেসে আসা গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

ট্রেইল ছেড়ে সল্ট ক্রিক ওঅশের নিচু অংশে চলে এল সামান্থা; কিছুক্ষণ এগোনোর পর, ডরনিশয়ের হাতে কীথ যেখানে মরতে যাচ্ছে, সেই জায়গাটা পেছনে ফেলে আবার দক্ষিণে রওনা হলো। কোনওভাবে একবার শহরে পৌঁছুনো গেলেই ঝামেলা চুকে যাবে, ভাবছে ও। বারউইক ছাড়া আর কাউকে হেডকোয়ার্টারে আশা করছে না। এই লোকটা কদাচিত চেয়ার ছেড়ে নড়ে।

ইয়েলো বাট থেকে পরাজিত গানম্যনরা ফিরতে শুরু করার কিছুক্ষণ আগে মাস্ট্যাংয়ে পৌঁছুল সামান্থা। রাস্তা ধরে এগোল ও। হেডকোয়ার্টারের পেছনের দরজায় চলে এল। তারপর ঢুকে পড়ল নিঃশব্দে এতটা সাবধানতার প্রয়োজন ছিল না। অল্টন বারউইক ঘরে নেই। পুরোনো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় এসে অ্যাপার্টমেন্টের তালা খুলল সামান্থা। মামার সঙ্গে এখানে থাকত ও। ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিল।

কোনও কিছুতে হাত পড়েছে বলে মনে হলো না। জানালার পর্দাগুলো টেনে রেখে গিয়েছিল, তেমনি আছে। নিঝুম কামরা। ধুলোর হালকা আস্তরণ পড়েছে আসবাবপত্রের ওপর, পর্দার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকে পড়া রোদে চকচক করছে। ট্রাংকের কাছে চলে এল সামান্থা। ইস্পাতে মোড়া একটা বাক্স বের করল ওটা থেকে। এই বাক্সেই সব কাগজপত্র আছে। বাক্সটা খোলার চেষ্টা করা হয়েছে, তেমন কোনও আলামত নেই। ট্রাংকের নীচ থেকে পুরোনো একটা পার্স বেরিয়ে এল এবার। চব্বিশটা স্বর্ণমুদ্রা ছিল ওটায়, বের করে হাতের পার্সে রাখল সামান্থা।

অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে এরপর কিম্ভুতকিমাকার একটা পুরোনো আমলের পিস্তল পাওয়া গেল ট্রাংকে। পিস্তলটা বের করে পাশের টেবিলে তুলে রাখল। পয়েন্ট-টু-টু ক্যালিবারের একটা ডেরিঞ্জারও বেরুল। বাবার দেয়া শেষ উপহার। অস্ত্রটা পকেটে রাখল ও।

চট করে এবার পাশের কামরায় চলে এল সামান্থা। দ্রুত সহজ ভঙ্গিতে মামার ডেস্ক তল্লাশি করল। একটু খুঁজতেই পাওয়া গেল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। এখনও কেউ ওগুলো স্পর্শ করে নি। ওরা হয়তো ভেবেছে এসব। কাগজের আর প্রয়োজন নেই কিংবা পরে সংগ্রহ করা যাবে। কাগজপত্র গোছগাছ করছে সামান্থা, এমন সময় বাড়ির পাশে ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠল। পেছনের সিঁড়ির কাছে থামল একটা ঘোড়া।

সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাজ রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল সামান্থা ফক্স এ ঘরের একটা জানালার পর্দা কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে। স্যাডলের সঙ্গে কাপড়ের ঘর্ষণের মৃদু আওয়াজ হলো। সওয়ারী যেই হোক, ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমেছে। এবার স্পারের ঝুনঝুন শব্দ ভেসে এল। পা বাড়িয়েছে আগন্তুক। তারপর নীরবতা।

ও, তুমি?

চমকে ঘুরে দাঁড়াল সামান্থা। চোখ বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে স্যু লেইন। হ্যাঁ, জবাব দিল ও, আমার কিছু জিনিস রয়ে গিয়েছিল, নিতে এসেছি। তুমি স্যু, তাই না?

জবাব না দিয়ে মাথা দুলিয়ে জানালার দিকে ইঙ্গিত করল মেয়েটা। কে এসেছে জানো?

না।

লরেন ফিরে এল বোধ হয়। গম্ভীর চেহারায় সামান্থাকে মাপল স্যু লেইন। ওরা কেমন আছে? সবাই ভালো? ইয়ে, মানে-পিটের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?

হ্যাঁ, তোমার ওপর খেপে আছে ও।

একটু লাল হলো সুলেইনের চেহারা, কিন্তু উদ্ধত ভঙ্গিতে চিবুক উঁচু করে রাখল সে। জানি, কিন্তু আর কী আশা করেছিল ও, ওই মরা মরুতে ভিখেরীর মতো জীবন কাটাব? ওফ, বিশ্বাস করো, ঘেন্না ধরে গেছে আমার!

হাসল সামান্থা। আশ্চর্য! অথচ এখানে আমার কত ভালো লাগে। এ জায়গাটাকে আমি ভালোবাসি। যত দিন যাচ্ছে ততই ভাঁলো লাগছে। এখানে জীবন কাটাতে পারলে আর কিছু চাই না আমি।

পল কেড্রিকের সঙ্গে?

স্যুর চোখের তারায় ঈর্ষা খেলে গেল, সেই সঙ্গে দৃষ্টিতে কৌতূহলও ফুটে উঠল। মেয়েটা ওর চেহারা আর কাপড়চোপড় পরখ করছে, বুঝতে পারল সামান্থা।

কেন-আমি-একথা তোমার মনে হলো কেন?

পল-কে আমি দেখেছি তো! ওকে কাছে পেতে চাইবে না এমন মেয়ে আছে? এতগুলো লোকের মধ্যে ও-ই সেরা।

আমি জানতাম, কর্নেল কীথকে তোমার পছন্দ।

আবার রক্ত ছলকাল সুর চোখেমুখে। আমি-আমিও তাই ভেবেছিলাম। আসলে পল কেড্রিক আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই ওর প্রতি এতটা ঝুঁকে পড়েছি আমি। তা ছাড়া এখান থেকে দূরে কোথাও যেতে চাই আমি-সেটাও একটা কারণ। এই জন্যেই আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে পিট।

ভাই কোনওদিন বোনকে ঘৃণা করতে পারে না। তুমি ফিরে গেলে ও সত্যিই খুব খুশি হবে।

ওকে চেনো না, তাই এ-কথা বলছ। অ্যাল্টন, বারউইকের সঙ্গী না হয়ে আর কেউ হলে

তার মানে বারউইককে আগে থেকেই চিনতে তোমরা?

চিনতাম মানে? ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল লেইন। তুমি জানো না? পিট বলে নি? বারউইক তো আমাদের সৎ-বাবা!

অ্যাল্টন বারউইক? হতবাক সামান্থা ফক্স।

হ্যাঁ, ওই লোকটাই আমাদের বাবাকে খুন করেছিল। আমরা প্রমাণ পাই নি। পরে মা-ও সন্দেহ করতে শুরু করে তাকে, তাই আমাদের নিয়ে তার কাছ থেকে পালায়। কিন্তু আমাদের পিছু ছাড়ে নি বারউইক। মায়ের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল আমরা জানতে পারি নি, এক রাতে বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসে নি। অন্য এক পরিবারের কাছে বড় হয়েছি, আমরা।

করিডরে কাঠের পাটাতন ককিয়ে উঠল। রূঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল ওরা, কান পাতল।

শহরের রাস্তা থেকে বন্দুকের প্রচণ্ড গর্জন ভেসে এল। দৃষ্টি বিনিময় করল ওরা। নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। একটু বিরতি, তারপর আবার ভেসে এল, গুলির আওয়াজ। আস্তে করে খুলে গেল দরজাটা। দোরগোড়ায় ওদের মুখোমুখি দাঁড়াল ডরনি শ।

সামান্থা ফক্স আর স্যু, লেইনকে একসঙ্গে দেখে অবাক হলো সে। উজ্জ্বল বাদামি চোখে দ্বিধার ছায়া পড়ল, পালা করে দুজনের দিকে তাকাল।

তারপর স্যু লেইনের ওপর স্থির হলো তার দৃষ্টি। তুমি এবার কেটে পড়তে পারো, বলল সে। কীথ অক্কা পেয়েছে।

কী? সন্ত্রস্ত সুঢোক গিলল। ওকে ওরা মেরে ফেলেছে?

না, আমি মেরেছি। সল্ট ক্রিকের ধারে। আমাকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল সে।

কীথ–মারা গেছে? প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেয়েছে স্যু লেইন।

অন্যরা? ওরা কোথায়? চট করে জানতে চাইল সামান্থা।

দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ডরনি শ, কঠিন দৃষ্টি হানল সামান্থার দিকে। মেয়েটাকে নিয়ে কী করা যায় বুঝে উঠতে পারছে না যেন। বেশ কয়েকজন মারা গেছে, সহজ কণ্ঠে বলল ডরনি। আমাদের বারটা বাজিয়ে দিয়েছে ওরা। ওই কেড্রিক শালার জন্যেই! যেন কিছুই আসে যায় না এমনি নিরুত্তাপ কণ্ঠে কথা বলছে সে। কেড্রিক ওদের সঙ্গে নিয়ে ওত পেতে ছিল, কুত্তার বাচ্চাগুলোকে আমাদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছে, মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে সবাইকে! মাথা নেড়ে রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করল ডরনি শ। এখন বোধ হয় শেষ পলিশ পড়ছে। ফেসেনডেন আর মিক্সাসরা দুভাই বেঁচে ছিল।

এখানেও আসরে ওরা; দৃঢ় কণ্ঠে বলল সামান্থা ফক্স। এর পর এখানেই আসবে।

জানি, মোটেই বিচলিত মনে হলো না ডরনি শকে। কেড্রিকই আসবে সবার আগে, হাসল সে, মরবেও সবার আগে।

সিগারেটের কাগজ আর তামাক বের করল ডরনি, কামরার চারদিকে নজর বোলাল। তারপর আবার তাকাল স্যু লেইনের দিকে। তুমি ভাগো। সামান্থার সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে।

নড়ল না স্যু। যা বলার আমার সামনেই বলো। এখানে থাকতে আমার ভালো লাগছে।

সিগারেট পেপারে জিভ ছুঁইয়ে বাঁকা চোখে স্যু লেইনের দিকে তাকাল উরনি শ। ভাবলেশহীন দৃষ্টি। কী বলেছি, শুনেছ, বলল সে, আমি জোর জবরদস্তি করতে চাই না।

অত, সাহস আছে নাকি! চেঁচিয়ে উঠল স্যু লেইন। এখানে মেয়েদের গায়ে হাত তুললে কী হবে ভালো করে জানো তুমি। আমাকে খুন করলে যদিও বা রেহাই পাবে, কিন্তু গায়ে হাত তোলা সইবে না কেউ-তোমার মতো খুনীও নিস্তার পাবে না।

 পকেটের ডেরিঞ্জারটার কথা ভাবছে সামান্থা ফক্স। কোমরে অস্ত্রের কাছে হাত নামিয়ে আনল ও।

আচমকা কামানের আওয়াজের মতো গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দ ভেসে এল। তারপর উপর্যুপরি আরও কয়েকটা গুলির শব্দ। ফেসেনডেনের সঙ্গে চুড়ান্ত মোকাবিলা করছে কেড্রিক। কান খাড়া করে ব্যাপার কী বোঝার চেষ্টা করল ডরনি। এগিয়ে আসছে, বলল সে। আমি কেড্রিকের জন্যে অপেক্ষা করব, এখানে।

ও আসার আগেই ভাগো, নিজের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়ায় অবাক হলো সামান্থা। ওর সঙ্গে পারবে না তুমি। সবার মতো তোমার ভয়ে কেঁচো হয়ে যায়নি ও। স্রেফ মারা পড়বে, ডরনি!

সামান্থার দিকে তাকিয়ে কাষ্ঠ হাসি হাসল ডরনি শ। কেড্রিক মারবে আমাকে? হাহ! ড্রতে ডরনিকে হারানোর মতো বান্দা এখনও জন্মায় নি দুনিয়ায়, বুঝলে? সবার ক্ষমতা জানা আছে আমার। ফেসেনডেনের মতো লাৈক পর্যন্ত আমার সঙ্গে লাগার সাহস করে নি!

ঠাণ্ডা মাথায় পকেটে হাত ঢুকিয়ে ডেরিঞ্জারের বাঁট ধরল সামান্থা ফক্স। অস্ত্রের স্পর্শ আত্মবিশ্বাস জোগাল। আল্লার ওয়াস্তে চলে যাও, শান্ত কণ্ঠে বলল ও, আমরা তোমাকে আসতে বলি নি, তুমি এখানে থাকো, তাও চাই না।

নড়ল না, ডরনি শ। এখনও বড় বড় কথা? ধানাইপানাই ছাড়ো! এসো, আমার সঙ্গে যাচ্ছ তুমি।

তুমি যারে? আগুন ঝরল, সামান্থা, ফক্সের দৃষ্টিতে, দ্বিতীয়বার বলব না, আমি!

কী যেন বলতে চাইল ডরনি শ, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হলো না ওর। ডেরিঞ্জার আঁকড়ে ধরে পকেটের ভেতর থেকেই ট্রিগার টিপল সামান্থা ফক্স। পিস্তল মোটামুটি ভালোই চালাতে জানে ও, কিন্তু এই রকম অবস্থান থেকে আগে কখনও গুলি করে নি। প্রথম গুলিটা ডরনি শয়ের কান উড়িয়ে দিল; দ্বিতীয়টি গিয়ে ঢুকল পাঁজরে; তিন নম্বরটা পাশের টেবিলের কাঠে আশ্রয় নিল।

বিস্ময়ে আর্তনাদ করে উঠল ডরনি শ। এক লাফে দরজা গলে করিডরে ছুটে গেল। সামান্থার দিকে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্যু লেইন। আরে, আশ্চর্য! পকেট থেকে ডেরিঞ্জারটা বের করে আনল সামান্থা, ওটার দিকে তাকাল সে। ওটা দিয়ে মেরেছ ডরনি শকে! লোকের কানে যাক একবার কথাটা! গলা ছেড়ে হাসতে শুরু করল স্যু লেইন, অজান্তে সামান্থাও যোগ দিল সে হাসিতে।

সিঁড়ি বেয়ে নীচে এসে দরজার কাছে পৌঁছে কান স্পর্শ করল ডরনি শ। হাঁপাচ্ছে। যেন বহুদূর কোথাও থেকে দৌড়ে এসেছে। হাতে রক্ত দেখে মুখ বেঁকে গেল তার। বিস্ময়ের চোটে বুঝতেই পারল না কখন রাস্তার দিকের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছে পল কেড্রিক। দরজা খুলতেই সামনে ওকে দেখে অধিক-শোকে-পাথর অবস্থা হলো তার। মুহূর্তের জন্যে বরফ হয়ে গেল। পরমুহূর্তে হাত বাড়াল পিস্তলের দিকে। কিন্তু তার আগেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। ওই এক মুহূর্তের দ্বিধার সুযোগ নিয়েছে পল কেড্রিক, ঝাপিয়ে পড়েছে ডরনির ওপর। ডরনির পিস্তলের দিকে বাড়ানো হাতের কজি ডান হাতে আঁকড়ে ধরল ও, হ্যাচকা টানে ঘুরিয়ে দিল তাকে, তারপর সর্ব শক্তিতে ঠেলে দিল দেয়ালের দিকে, ছাড়ল না হাতটা। দড়াম, করে দেয়ালের গায়ে, বাড়ি খেলো ডনি শ। পরক্ষণে শ্বাসনালীর ওপর বেমক্কা রদ্দা খেয়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল তার।

হাতাহাতি মারপিটে আনাড়ি ডরনি শ। এরকম ঘুসি খেয়ে ওর চেয়ে বিশালদেহী লোকেরও জ্ঞান হারানোর কথা, স্বভাবতই বাতাসের জন্যে হাঁসফাস শুরু করল সে। দেয়ালের গায়ে ওকে ঠেসে ধরল পল কেড্রিক। ডরনি, ক্ষিপ্র লোকের মুখোমুখি হলে কী করব, একবার জিজ্ঞেস করেছিলে, এবার জবাব পেয়েছ নিশ্চয়ই!

বাম হাতে ডরনির গালে একটা প্রচণ্ড চড় কষাল কেড্রিক। রাগে দুঃখে ককিয়ে উঠল দুর্ধর্ষ গানম্যান। কেড্রিকের হাতের বাঁধন আলগা করার চেষ্টা করল। আরও জোরে দেয়ালের সঙ্গে তাকে ঠেসে ধরল পল। শার্টের কলার জাপটে ধরে চটাশ চটাশ আরও দুটো চড় কষাল। তুমি একটা সস্তা দরের খুনী, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। আগেই এক দফা মার হজম করেছ দেখছি। এবার শেষ ডোজ দিচ্ছি তোমাকে।

ডরনির শার্ট দুহাতে টান মেরে ফড়ফড় করে ছিড়ে ফেলল পল। এখানে তোমার রাজত্ব চিরদিনের জন্য ধ্বংস করে দিতে যাচ্ছি আমি, ডরনি। তোমার আসল চেহারা আজ দেখবে সবাই-সস্তা, ভীতু খুনী। খামোকা এতদিন সবাই

ভয় করছিল! ডরনিকে আবার থাপ্পড় লাগাল কেড্রিক। তারপর ওকে দেয়ালের ওপর। আছড়ে ফেলে পেছনে সরে এল।

ঠিক আছে, শ, তোমার সঙ্গে পিস্তল আছে! বের করো!

রাগে দুঃখে ভেউভেউ করে কাঁদার অবস্থা হয়েছে ডরনি শয়ের। চিৎকার করে দুই হাত এক সঙ্গে, পিস্তলের দিকে বাড়াল সে। খাপমুক্ত হলো পিস্তলজোড়া। কিন্তু গত কয়েক মিনিটের অবিশ্বাস্য ঘটনাবলী দিশেহারা করে দিয়েছে ওকে। ডরনি গুলি করার আগেই গর্জে উঠল কেড্রিকের পিস্তল, ডান হাতের বুড়ো আঙুলসহ পিস্তলটা উড়ে গেল। বাম হাতের পিস্তলের ট্রিগার টিপল ডরনি শ, ফসকে গেল গুলিটা। অট্টহাসি হাসল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। সজোরে ডরনির কজি লক্ষ্য করে নামিয়ে আনল পিস্তলের ব্যারেল। গুঁড়িয়ে গেল গানম্যানের কজির হাড়। আঁতকে উঠে পিস্তল ছেড়ে দিল সে। দেয়ালের গায়ে ঢলে পড়ল ডরনি, কাঁপছে থরথর করে, শূন্য দুই হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। বাঁ হাতের কজি গুড়ো হয়ে গেছে, ডান হাতের বুড়ো আঙুল উধাও; গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে ক্ষতস্থান থেকে।

নির্দয়ভাবে আবার ডরনি শকে ধরল কেড্রিক, এক ধাক্কায় দরজা দিয়ে বের করে দিল। হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়ল বেচারা, কিন্তু টেনে হিচড়ে আবার ওকে দাঁড় করল কেড্রিক। ইতিমধ্যে ভিড় জমে উঠেছে রাস্তায়, আঁতকে উঠল ওরা। কিন্তু, সেদিকে খেয়াল নেই কেড্রিকের। জনতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পিট লেইন, ডাই রীড এবং লরেডো শ্যাড; দেশের ভয়ঙ্করতম গানম্যানকে

এভাবে নাজেহাল হতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে। ডরনি শয়ের ঘোর্ডা কাছেই দাঁড়িয়েছিল, ওটার দিকে ইঙ্গিত করল পল কেড্রিক। ঘোড়ার পিঠে তুলে দাও ওকে উল্টো করে!

ঘুরতে যাচ্ছিল ডরনি, থাপ্পড় মারার ভঙ্গিতে হাত তুলল কেড্রিক, আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তিরবশেই কুঁকড়ে গেল লোকটা হাসির রোল পড়ল ভিড়ে। যাও, ঘোড়ায় চাপো! বলল পল, ডাই, ঘোড়ায় উঠিয়ে ব্যাটার দুপায়ের গোড়ালি একসঙ্গে বেঁধে দাও!

মারের চোটে তালজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে ডরনি শ, কী ঘটছে বুঝতে পারছে না। মুখ তুলে তাকাল সে, সঙ্গে সঙ্গে হেডকোয়ার্টারের কাছাকাছি গ্রুলা, মাস্ট্যাংটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ব্যস, যেটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিল, তাও হারিয়ে ফেলল সে।

পিস্তলে নৈপুণ্য আর প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা সবার কাছে আতঙ্কের বস্তুতে পরিণত করেছিল ডরনিকে। লোকে তাকে এড়িয়ে গেছে; কিংবা ওর মন যুগিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। পল কেড্রিকের হাতে আজ প্রথম বেইজ্জত হয়ে গেল সে। এমন কিছু ঘটতে পারে স্বপ্নেও ভাবে নি। আত্মবিশ্বাসের পাহাড় ধসে পড়েছে তার।

ঘোড়ার পিঠে সারা শহর ঘোরাও ওকে, কর্কশ শোনাল কেড্রিকের কণ্ঠস্বর। সবাই দেখুক খুনীর চেহারা। তারপর ওর কজি আর বুড়ো আঙুল ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দাও!

ছেড়ে দেব? জানতে চাইল শাড়। পাগল হলে?

না। ওকে ছেড়ে দাও। এখান থেকে চলে যাবে ও, কেউ আর কখনও ওর চেহারা দেখবে না। বিশ্বাস করো, এখন বেঁচে থাকাটাই ওর জন্যে কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। কাঁধ ঝাঁকাল ও। এরকম লোক অনেক দেখেছি। ওদের ভয় পায় না এমন কারও পাল্লায় পড়লেই আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। মোটামুটি ভালো পিস্তল চালাতে পারত বলে এতদিন নিজেকে কঠিন মানুষ ভেবে এসেছে। সে লোকজনও তাই ভেবেছে। কিন্তু আসলে ও কঠিন লোক নয়। কঠিন লোকের জয়-পরাজয় দুটোরই অভিজ্ঞতা থাকে। আগে হারতে হবে তোমাকে, তারপর ছিনিয়ে আনতে হবে জয়। হেরে যারা জিততে পারে তারাই আসলে কঠিন লোক মার খেয়ে জয় কী জিনিস বুঝতে হবে।

ইচ্ছে করলেই, শুষ্ক কণ্ঠে বলল কেড্রিক, তুমি একজনকে মেরে শুইয়ে দিতে পারো। কিন্তু মাটিতে পড়েও আবার উঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারলেই তাকে সত্যিকার কঠিন লোক ভাবা যায়। এতদিন বিপদের মুখে পড়ে নি বলে ডরনি শ বিরাট কিছু ভাবতে শুরু করেছিল নিজেকে। এবার নিজের অবস্থান বুঝতে পারবে।

আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হতে শুরু করল। দরজায় এসে দাঁড়াল সামান্থা ফক্স। ওর দিকে তাকিয়ে সহসা হেসে ফেলল কেড্রিক। সামান্থাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বহু বছরের তৃষ্ণার্ত মরুভূমিতে জীবনের স্বাদ দিতে এসেছে এক পশলা বৃষ্টি।

সিঁড়ি বেয়ে নেমে ওর কাছে, এল সামান্থা। তারপর পিটের দিকে তাকাল। তোমার বোনটি ওপরে আছে, পিট। ওর সঙ্গে তোমার কথা বলা দরকার।

একটু ইতস্তত করল পিট লেইন, তারপর বলল, কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই না আমি।

সিগারেটে লম্বা করে টান দিয়ে ধোয়ার ভেতর দিয়ে চোখ ছোট করে পিটের দিকে তাকাল লরেডো শ্যাড। আমি কথা বললে আপত্তি আছে? জিজ্ঞেস করল সে। ওকে আমার ভালো লাগে।

পিট লেইনকে বিস্মিত মনে হলো। এত কিছুর পরেও? সিগারেটের মাথায় আগুনের দিকে তাকাল শ্যাড। কী জানো, গম্ভীর কণ্ঠে বলল ও, সবচেয়ে ভালো. ঘোড়াটিকে বশ করতে কিন্তু সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় সে।

তা হলে যাও, শ্যাডের গমন পথের দিকে তাকিয় রইল পিট, তারপর পিছু ডেকে বলল, ওকে বলো, ওর সঙ্গে পরে দেখা করব।

<

Super User