এখনও জেলের ভেতরেই অপেক্ষা করছে জনতা। জঙ্গী ভাব উধাও হয়েছে ওদের চেহারা থেকে, প্রাণ ভয়ে এতটুকু হয়ে গেছে, নিরাপত্তার আশ্বাস পেতে ছুটে এসেছে এখানে।
দরজা খোলাই ছিল, ভেতরে ঢুকল ক্লিফ ফ্যারেল। কী ব্যাপার?
কী যেন বলছিল ডেল পোমরয়, সে-ই জবাব দিল। একটা সমাধান পথ খুঁজছি আমরা।
সমাধান না ছাই, বাঁকা সুরে বলল ক্লিফ, রেগানকে ছেড়ে দেয়ার ফিকির!
তাতে দোষ কী? বাইবেল অশুদ্ধ হয়ে গেছে? বোমা ফাটলে কেউ যদি না-ও মরে, কত টাকার সম্পদ বিনষ্ট হবে, জানো?
বোমা ফাটবে না, বলেছি তো, বলল ক্লিফ।
এহ্, একেবারে সবজান্তা! তুমি বলার কে? যা বলার শেরিফ বলবে, তুমি, তাঁর ডেপুটি, কথা বলার অধিকার তোমার নেই। বলতে বলতে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল রুফাস মুর, শহরের কামার।
দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী রুফাস, পরনে ওভারঅল থাকায় আরও বিশাল লাগছে। ওভারঅলের ভোলা বুকের ফাঁকে চেনো বুকের লোমশ ছাতি উঁকি দিচ্ছে। স্টোনের দিকে ঘাড় ফেরাল সে। জেস চাইলে যে কোন সময় তোমার চাকরি খেতে পারে, তাই না?
পারি কিন্তু খাব না, বলল স্টোন। নিজে রেগানকে ধরে এনেছে ক্লিফ, ওর কাজে অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো কিছু ঘটে নি, কোন দোষে চাকরি খেতে যাব? আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছে ও-সেটাই ওর চাকরি। তাছাড়া একটা কথা তোমরা ভুলে যাচ্ছ কেন? সোনির সঙ্গে ওর বিয়ের কথা পাকাঁপাকি হয়ে আছে, দুর্ঘটনাটা ওর মনেও গভীর ক্ষত জন্ম দিয়েছে।
আচ্ছা! ঠোঁট বাঁকাল রুফাস। ব্যাপারটা আদৌ দুর্ঘটনা কিনা কীভাবে বুঝব? সোনিই লোকটাকে উস্কানি দেয় নি, তার কী প্রমাণ আছে?
প্রথমে কথাটার মানে বুঝতে পারল না ক্লিফ, মুহূর্তের জন্যে হতবাক হয়ে গেল, পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল মুরের ওপর। হিংস্র হয়ে গেল চেহারা, জ্বলে উঠল চোখজোড়া।
ক্লিফের ঘুসিতে নাক থেঁতলে গেল মুরের, হঠাৎ ধাক্কায় আছড়ে পড়ল জনতার ওপর। কয়েকজনকে নিয়ে ধরাশায়ী হলো সে। বাকি সবাই পড়িমরি করে ছুটে গেল দরজার দিকে।
ক্লিফ! চেঁচিয়ে উঠল জেস স্টোন।
শুনল না ক্লিফ। শরীরের সব শক্তি এক করে ঘুসি বসাল রুফাসের ভূঁড়িতে। কক করে উঠল কামার। সময় নষ্ট করল না ফ্যারেল, বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেল বা হাত, আরেকটা ঘুসি পড়ল রুফাসের মুখে, থেঁতলে গেল তার ঠোঁটজোড়া।
বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠল রুফাস মুর। ছোট ছোট দু-চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলল। দুহাত ছড়িয়ে কুস্তিগীরের মতো সামনে ঝুঁকে পড়ল সে।
রুফাসের মতলব টের পেল ক্লিফওকে জাপটে ধরতে চায় লোকটা, পিষে মারবে।
অফিস কামরা ফাঁকা হয়ে গেছে, স্টোন ছাড়া কেউ নেই। সামনে বাড়ল ক্লিফ, কাঁধের ধাক্কা দিল প্রতিপক্ষকে। কোনও প্রতিক্রিয়াই হলো না, যেন দেয়ালে বাড়ি খেয়েছে ও। কাঁধের হাড় ভেঙে গেছে বলে মনে হলো!
একই কায়দায় আবার রুফাসকে ধাক্কা দিল ক্লিফ। টলতে টলতে গানরাকের ওপর আছড়ে পড়ল লোকটা। সশব্দে মেঝেয় পড়ল সবগুলো আগ্নেয়াস্ত্র। উঠেই ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো তেড়ে এল মুর। শেষ মুহূর্তে বাউলি কেটে সরে গেল ক্লিফ। সোজা ডেস্কের সঙ্গে টক্কর খেলো রুফাস, পিছলে পেছনে চলে গেল টেবিলটা। স্টোনসহ উঠে পড়ল সুইভেল চেয়ার। ঘুরে দাঁড়াল মুর; ঘোলাটে চোখে তাকাল ক্লিফের দিকে।
জীবনে আর কখনও এত খেপে নি ক্লিফ। গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে রুফাসকে। সেরাতেও এমনি খুনের নেশা চেপেছিল। রেগানের মতোই আজ সনিকে অসম্মান করেছে রুফাস। সোনির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে ওর কথায়। এর চেয়ে মারাত্মক আর কী হতে পারে?
কিন্তু রুফাস নিশ্চয়ই মন থেকে বলে নি কথাটা! আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে লোকটা, ম্যাটরা সত্যি সত্যি ডিনামাইট ফাটালে ভয়াবহ পাথর-কস নামবে, ঘর বাড়ি মিশে যাবে মাটির সঙ্গে।
ফের এগিয়ে গেল ক্লিফ, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেছে, ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটের ফাঁকে শাদা দুপাটি দাঁত দেখা যাচ্ছে। আচমকা হাঁটু আর কনুই দিয়ে একসঙ্গে রুফাসের গলায় আঘাত হানল ও। বাতাসের জন্যে আঁইটাই শুরু করে দিল লোকটা। কিন্তু এই অবস্থাতেই হঠাৎ ক্লিফকে জাপটে ধরল সে, সাঁড়াশির মতো চেপে বসল তার দুই হাত।
আবার নির্দয়ভাবে হাঁটু চালাল ফ্যারেল। সামান্য কমল কঠিন হাতের চাপ, মুরের হাঁটুর নীচের হাড়ে অবিরাম লাথি মেরে চলল ও।
ইস্পাতের মতো কঠিন দুটো হাতক্রমশ চেপে বসছে বুকের ওপর। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে এখন ক্লিফ। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দেয়ার পর ভাঙা পাঁজরের কথা ভুলে গিয়েছিল ও, এখন আবার সেই ভয়াবহ যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, মাথা ঘুরছে।
ডেস্কের দিকে ঘুরল রুফাস মুর। ডেস্কের ধারাল প্রান্তে ক্লিফের পিঠ ঠেকিয়ে চাপ দিতে শুরু করল।
যন্ত্রণায় অচেতন হবার দশা হলো ক্লিফের, ধনুষ্টংকার রোগীর মতো বাঁকা হয়ে গেল শরীর। রুফাসের কবল থেকে রেহাই পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। নিষ্ফল। হাত দুটো চাপা পড়ে গেছে বিশাল হাতের নীচে, দুটো পা মুক্ত থাকলেও লাথিতে জোর পাওয়া যাচ্ছে না। মুর ওর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চায়, বুঝতে পারছে ক্লিফ, অথর্ব করে দিতে চায় ওকে।
হঠাৎ পিস্তলের বাঁট আঁকড়ে ধরল ক্লিফ, একটানে খাপমুক্ত করল। হ্যামার। পেছনে এনে টিপ দিল ট্রিগারে।
একটু যেন কমল সাঁড়াশি চাপ! দুই পা একসঙ্গে ভঁজ করল ক্লিফ, পরক্ষণে ঝাঁকি খেলো ওর শরীর, ছুটে গেল মুরের লৌহকঠিন বাঁধন, পিছলে ডেস্কের ওপর দিয়ে স্টোনের উল্টানো চেয়ারে গিয়ে পড়ল ও।
ওঠার চেষ্টা করে প্রথমে ব্যর্থ হলে ক্লিফ, অবশেষে চেয়ারে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মুরের উরুতে লেগেছে গুলি, ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বেরোচ্ছে গলগল করে, ভিজে যাচ্ছে প্যান্ট। অবিশ্বাস-ভরা দৃষ্টিতে পায়ের দিকে চেয়ে রয়েছে। রুফাস। ক্লিফের দিকে মুখ তুলে তাকাল সে। তারপরই মাটিতে পড়া অস্ত্রের দিকে ঝাঁপ দিল। একটা ডাবলব্যারেল্ড শটগান তুলে ঘুরে দাঁড়াল।
সাধারণত গুলিভরা অবস্থাতেই গানর্যাকে রাখা হয় অস্ত্রগুলো, তবে এটাতে গুলি নাও থাকতে পারে। কিন্তু ঝুঁকি নেয়ার উপায় নেই। সুইভেল চেয়ারে শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে পিস্তলের হ্যামার পিছিয়ে আনল ক্লিফ।
অস্ত্র ফেলে দাও, মুর! ফাসফেঁসে কণ্ঠে বলল ও, নইলে গুলি করতে বাধ্য হব।
ইতস্তত করল রুফাস মুর, একটু ওপরে উঠল শটগানটা, বেপরোয়া দৃষ্টি ফুটে উঠল চোখে। গুলি করতে যাচ্ছে লোকটা, ভাবল ক্লিফ।
অপ্রত্যাশিতভাবে সহসা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল স্টোন। নীরবতার দেয়ালে কুঠারাঘাত করল শেরিফের কণ্ঠস্বর। ওর কথা তুমি শুনেছ, মুর। শটগান ফেলে দাও। নইলে গুলি করব!
রুফাস মুরের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল, হাত থেকে খসে পড়ল শটগান।
বেরিয়ে যাও! বলল ক্লিফ, মেঝে নোংরা করে ফেলছ!
ভেজা চুপচুপে প্যান্টের দিকে তাকাল মুর, তারপর পা টেনে টেনে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দোরগোড়ায় থেমে ঘাড় ফিরিয়ে বিষ-মেশানো দৃষ্টিতে ক্লিফের দিকে তাকাল, কী যেন বলতে চাইল, কিন্তু কর্কশ কন্ঠে বাধা দিল ক্লিফ। বাজে কথার খেসারত একবার দিয়েছ, ফের গোলমাল করতে যেয়ো না!
বেরিয়ে গেল রুফাস মুর। পিস্তল হোলস্টারে রাখল ফ্যারেল। ক্লান্ত দেহে সুইভেল চেয়ারটা সোজা করে বসে পড়ল।
অস্ত্রগুলো আবার তুলে রাখল স্টোন।
ধীরে ধীরে শান্ত হলো ক্লিফের উত্তেজিত স্নায়ু। সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ, জেসকে বলল ও।
এবার কী করবে? ঘুরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল স্টোন।
আমাদের সামনে মাত্র দুটো পথ খোলা আছে, বলল ক্লিফ, রেগানকে ছেড়ে দিতে হবে, নয়তো আটকে রেখে আদালতে হাজির করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে আদালতে নিয়ে কী লাভ?
পরিস্থিতি পাল্টাতেও পারে।
কীভাবে? কায়দা মতোই আমাদের পেয়েছে ব্যাটারা।
জানি না, বিরক্তির সঙ্গে বলল ক্লিফ। শুধু জানি, এ অবস্থা চলতে পারে না। হাল ছেড়ে দেয়ার মতো এখনও কিছু ঘটে নি।
আচ্ছা, ল্যুককে না হয় আদালতে দাঁড় করালে, তারপর? সারা শহর চষে বেড়াও তো ওর বিরুদ্ধে রায় দেয়ার মতো বারজন লোক মিলবে না।
এখানে না মিললে স্যান্তা রোসায় যাব!
ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল স্টোন। কে যাবে? জলজ্যান্ত পাঁচ গুণ্ডার সামনে দিয়ে আমি অন্তত যাব না!
তাহলে আমি একাই যাব। ল্যুককে ওরা কেড়ে নেবার চেষ্টা করলে, স্রেফ ওর মাথায় একটা সীসে ভরে দেব।
খুন হয়ে যাবে।
কাঁধ ঝাঁকাল ক্লিফ। পরোয়া করি না। এমনিতেও ওরা আমাকে খুন করার হুমকি দিয়েছে।
আগে জানলে ল্যুকের টেলিগ্রামটা পাঠাতে দিতাম না।
তার যে আবার পাঁচটি পেয়ারের ভাই থাকতে পারে কে জানত!
যা হোক, শহরবাসী লিঞ্চিংয়ের চিন্তাটা অন্তত বাদ দিয়েছে।
হ্যাঁ। বড় ক্লান্ত বোধ করছে ক্লিফ। প্রচণ্ড চাপের মাঝে কাটাতে হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত। তার ওপর জনতার রুদ্ররোষের মুখে পড়তে হয়েছে, দু দুবার।
এভাবে আর কদিন চলবে? কী করলে অবসান ঘটবে এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির? হঠাৎ সেরাতে সোনির দৌড়ে আসার দৃশ্যটা ফুটে উঠল ওর চোখের সামনে।
মুহূর্তে ফুসে উঠল ক্লিফ ফ্যারেল। রেগানকে উপযুক্ত শাস্তি পেতেই হবে…নতুন করে শপথ নিল ও।
ডিনামাইটের হুমকি না থাকলে দূর করা যায় না?
ম্যাট আর জেসকে জিম্মি করার কথা ভাবল ক্লিফ, ওদের আটক করে দুভাইকে পাহাড় থেকে নেমে আসার নির্দেশ দেয়া যায়
ডেলহ্যান্টির দোকানে ডাকাতির অভিযোগে ম্যাট আর জেসকে গ্রেপ্তার করলে কেমন হয়? ওদের বন্দী করে দুভাইকে বলতে পারি ভাইদের বাঁচাতে চাইলে নেমে আসতে…
শেরিফ মুখ খোলার আগেই জবাবটা জানা হয়ে গেল ওর। ম্যাট আর জেসকে গ্রেপ্তারে ঝুঁকি আছে। ডিনামাইট ফাটানোর জন্যে কীভাবে সঙ্কেত দেবে, ম্যাট, জানা নেই। ধরা পড়ার আগেই নির্দেশ দিয়ে বসতে পারে সে। তাহলে ওর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। শহরবাসীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার ওর নেই। পাহাড় ধসে কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোক প্রাণ হারাবে…
তাছাড়া ম্যাট আর জেসকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও, পাহাড়ের ওই দুজন নির্দেশ অমান্য করলে ঠাণ্ডা মাথায় ওদের হত্যা করতে পারবে না ক্লিফরা। কথাটা বুঝতে কষ্ট হবে না কারও।
তাহলে ম্যাটের হুমকির বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ কী হতে পারে? কীভাবে ল্যুকের বিচারের ব্যবস্থা করবে ও?
পাহাড়চূড়ার দুভাইয়ের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখার ব্যবস্থা করা যায়, ওরা নামার চেষ্টা করলে…
বিস্ফোরণের নাগালের বাইরে যেতে কমপক্ষে দশপনের মিনিট সময় লাগবে ওদের, এই সময়ের ভেতরই চেষ্টা করলে সরে পড়তে সক্ষম হবে। শহরবাসীরা…
আবার মাথা নাড়ল ক্লিফ। শহরবাসীদের আগেই পালিয়ে যাবে রেগানরা, এখানকার কিছু লোক পিছিয়ে পড়তে বাধ্য…এবং ওরা…
আপনমনে বিড়বিড় করে গাল বকল ও। উভয়সঙ্কট বোধহয় একেই বলে! এই সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ল্যুককে ছেড়ে দেয়া। কিন্তু এত সহজে তাকে ছাড়ছে না, এর শেষ দেখে ছাড়বে ও!
<