১৬.
হৈ-চৈ, হুলুস্থুল শুনে মূল ক্যাসিনোতে সতর্ক হয়ে উঠেছে সিকিউরিটির লোক ও ডোরম্যানরা। রানা দরজা হাট করে পার্টিরুম থেকে ছিটকে বেরোতেই চমকে গেল এক ডোরম্যান। চোয়ালে প্রচণ্ড এক ঘুষি খেয়ে মেঝেতে পড়ল সে। তবে তার সঙ্গী ধাক্কা দিয়ে ফেলতে চাইল রানাকে। কিন্তু হঠাৎ হুড়মুড় করে নিজেই পড়ল মেঝেতে। ফেটে চ্যাপটা হয়ে গেল তার নাক।
লাফিয়ে দুই ডোরম্যানকে পেরোল রানা। দৌড় দেবে লাউঞ্জ থেকে বেরোতে। তখনই টের পেল, পেছনের দরজায় ডোরম্যানের পায়ে পা বাধিয়ে তাকে ফেলে দিয়েছে বেলা। নীরবে মুখ নেড়ে ওকে ধন্যবাদ দিল রানা। ওর পিছু নেবে ভেবেছিল বেলা, কিন্তু ছুটতে শুরু করে মাথা নাড়ল রানা। হাতের ইশারায় দেখাল, ভিড়ে হারিয়ে যেতে। ওরা একসঙ্গে এসেছে, তা জানলে বিপদ হবে।
মস্তবড় ঘরের আরেক দিকে চলল বেলা।
জুয়াড়ীদেরকে বিস্মিত করে দৌড় দিয়েছে রানা। পেছনে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে নাদির মাকালানি। রেলগাড়ির দ্রুতগামী ইঞ্জিনের গতি তুলে রানার পিছু নিল কাদির ওসাইরিসের দুই বডিগার্ড। উঠানের দুই ডোরম্যানও এল রানাকে ঠেকাতে! জুয়ার টেবিলগুলোর মাঝ দিয়ে তীরবেগে ছুটছে বাঙালি গুপ্তচর।
একটু দূরেই সামনে খোলা দরজা। কিন্তু ওই পথে হুড়মুড় করে ঢুকল ক্যাসিনোর সিকিউরিটির অন্তত চারজন লোক। খড়-মড় আওয়াজ তুলছে তাদের ওয়াকি-টকি। জুয়াখেলার প্রতিটি ঘরে আছে সিসিটিভি। কেউ ঠকবাজি করলে ধরা পড়বে। একই কারণে পার্টিরুমে গোলমাল হতেই বাজিয়ে দেয়া হয়েছে অ্যালার্ম।
ফাঁদে পড়ে রানা বুঝে গেল, যেভাবে হোক সরাতে হবে সবার মনোযোগ।
একটা রুলেত টেবিল লক্ষ্য করে চলেছে ক্যাসিনোর ইউনিফর্ম পরা এক মহিলা ক্লার্ক। হাতের ট্রেতে উঁচু করে রাখা সারি সারি চিপস্। একদৌড়ে মহিলার কাছে হাজির হলো রানা, পাশ কাটাবার আগে লাথি ঝেড়ে দিল ট্রের নিচে। ছিটকে শূন্যে রওনা হলো একরাশ রঙিন চিপস্। তিন সেকেণ্ড পর ঝরঝর করে নেমে এল বৃষ্টির মত।
তাতে স্রেফ পাগল হয়ে গেল সবাই।
জিনিসগুলোর ভেতর রয়েছে সামান্য ইউরো থেকে শুরু করে দশ হাজার ইউরোর চিপস্। পরেরগুলো পেতে মেঝেতে হামলে পড়ল সবাই। পাশের স্টুলের এক মহিলাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে এক লোক। জাহাজের ভেঁপুর মত বিকট আর্তনাদ ছাড়ল মহিলা। ধাক্কাধাক্কির ভেতর কাত হয়ে পড়ল একটা ড্রিঙ্ক কার্ট। ঝনঝনঝনঝন আওয়াজে মেঝেতে ভাঙল ক্রিস্টালের গ্লাস ও দামি মদের বোতল। একটা ব্ল্যাকজ্যাক টেবিলের মহিলা ডিলার হাউমাউ করে উঠল তার টেবিল উল্টে পড়তেই। তার চিপস্ও ছড়িয়ে গেল মেঝেতে। চারপাশে শুরু হয়েছে হরিলুঠ। রানাকে ধাওয়া করা বাদ দিয়ে শত শত হাতের মাঝ দিয়ে পথ খুঁজছে কাদির ওসাইরিসের দুই বডিগার্ড।
প্রায় রায়ট শুরু হওয়ায় বাইরের দরজার কাছেই থেমে গেছে সিকিউরিটির লোক। রানা ও তাদের মাঝের মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে একদল সুশীল। তাদেরই কারও কারও হাত মাড়িয়ে দিয়ে বেরোবার পথ খুঁজছে রানা।
ধর, ওই যে শালা! গর্জন ছাড়ল ভগলার। বেরিয়ে এসেছে পার্টিরুম থেকে। পাশেই কাদির ওসাইরিসের আরেক বডিগার্ড। ভগলারের হাতে এখন রিভলভার। এতই রেগে গেছে, খেয়াল নেই যখন তখন তাকে গ্রেফতার করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক।
এর-ওর পাঞ্জা মাড়িয়ে এগোচ্ছে রানা। শক্ত কী যেন লাগল পায়ে। ওটা কার্ট থেকে পড়া আস্ত এক শ্যাম্পেনের বোতল। উবু হয়ে তুলে নিল রানা। অস্ত্র না থাকার চেয়ে বোতল ভাল। ব্যবহার করতে পারবে গদার মত। তখনই ওর সামনে খুলল অবারিত পথ। একটা রুলেত টেবিলের নিচে নিজেদের ভেতর চিপস নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে একদল লোক।
নিজেও রুলেত টেবিলের নিচে ঢুকল রানা। হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করে খুলে ফেলল শ্যাম্পেনের বোতলের ফয়েল ও তারের জাল। এবার সহজেই খুলতে পারবে কর্ক। পেছনে শুনল ফ্রেঞ্চ গালি। ওকে হারিয়ে ফেলেছে সিকিউরিটির লোক। টেবিলের আরেক প্রান্তে পৌঁছে ভোরের সূর্যের মত লাফিয়ে উদয় হলো রানা।
ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ল এক লোক। তাকে মাড়িয়ে আসছে কাদির ওসাইরিসের এক বডিগার্ড। পেছনেই কিলিয়ান ভগলার। রুলেত টেবিল ঘুরে তেড়ে এল রানার দিকে। ওই একইসময়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে শ্যাম্পেইনের কর্ক খুলল রানা।
পপ!
বোতল থেকে ম্যাগনাম বেগে গিয়ে বডিগার্ডের ডান চোখে লাগল কর্ক। কাতরে উঠল লোকটা। একহাতে চেপে ধরেছে আহত চোখ। মুখে পড়ল শ্যাম্পেনের মিষ্টি ও ঝাঁঝাল ফোয়ারা। তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল ভগলার। তা না পেরে কাঁধের ওপর দিয়ে তাক করল রিভলভার…
ভুসভুস করে বেরোচ্ছে শ্যাম্পেন, কাঁধের সর জোর খাটিয়ে বোতল ছুঁড়ল রানা। ঠনাৎ করে রিভলভারের নলে লাগল বোতল। ভগলারের হাত থেকে রুলেত টেবিলে পড়ে গেল রিভলভার, বেইয থেকে পিছলে চলে গেল ঘুরন্ত হুইলে। কিনারা থেকে বেরিয়ে আছে কাঠের বাট।
অন্ধপ্রায় বডিগার্ডকে ঠেলে রানার ওপর ফেলতে চাইল ভগলার। সরাসরি বাড়ি খেল রানা ও বডিগার্ড। টলমল করছে রানা, ওদিকে টেবিলের আরেক দিকে ঝাঁপ দিয়েছে। ভগলার। তার চাই ওই রিভলভার। কিন্তু অস্ত্রটা ঘুরে অন্যদিকে চলে যেতেই বাম কনুইয়ে ভর করে ওটা ধরতে চাইল সে।
ধাক্কা মেরে বডিগার্ডকে সরিয়েই টেবিলে ঝাঁপ দিল রানা। ওর চোখা কনুই খচ্ করে নামল ভগলারের শিরদাঁড়ার ওপর। ওউপস্! মারাত্মক ব্যথায় কেঁদে উঠল আমেরিকান খুনি। হাত ফস্কে গেল রিভলভার। ঘুরে চলে গেল আরেক দিকে। দুই হাঁটু ধরে হিড়হিড় করে টেবিল থেকে ভগলারকে নামাল রানা। প্রচণ্ড এক ঘুষি মারল ওর মাথায়। পরক্ষণে নিজে ডাইভ দিল রিভলভার পেতে।
বাতাসে খামচি মারল ওর আঙুল। ঘুরে অন্যদিকে গেছে রিভলভার। তখনই ওর মাথায় নামল কী যেন! ঘোলা হয়ে গেল দৃষ্টি। ঘুরছে রুলেত টেবিলের হুইল। রানার মাথায় আবারও ঘুষি বসাল ভগলার। ভেলভেট কাপড়ে মুখ থুবড়ে পড়ল রানা। চোখ তুলে দেখার আগেই ওর কোমরে লাগল ভগলারের প্রচণ্ড এক লাথি। টেবিল থেকে ছিটকে একপাশে পড়ল রানা। হুইল থেকে ঝরঝর করে ঝরল বাজির চিপস।
বেইয-এ কাউবয় বুট বাধিয়ে টেবিল ধরে সামলে নিল ভগলার। থাবা মেরে আটকে ফেলল ঘুরন্ত হুইল।
অসহায় রানা দেখল, রিভলভারের বাঁট খপ করে চেপে ধরেছে ভগলার। এদিকে লাথি মেরে ওকে এত দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে, চাইলেও ঘুষি মারতে পারবে না ও। বাঁচতে হলে দরকার উপযুক্ত কোনও অস্ত্র!
ক্রুপিয়ের র্যাক…।
লম্বা দণ্ড তুলেই সাঁই করে চালাল রানা।
মাঝখান থেকে মড়াৎ করে ভেঙে গেল পাতলা র্যাক।
কালো হাতলটা বড়জোর ছোট একটা কীলক। টিটকারির চোখে ওকে দেখল ভগলার। হালকা দণ্ডের আঘাতে কিছুই হয়নি তার। হাত নাচিয়ে রানার দিকে রিভলভার তাক করল সে…
তখনই চোখা র্যাকের শেষাংশ গেঁথে দিল রানা ভগলারের পেটে।
এবার আর ব্যথা না পেয়ে পারল না ভগলার। একেকটা চোখ হয়ে উঠল পিংপং বলের মত বড়! এদিকে সুযোগ পেয়ে সামনে বেড়ে ভগলারের আঁশ ভরা জ্যাকেটের কলার চেপে ধরেছে রানা, পরক্ষণে মাথা দিয়ে ভয়ঙ্কর এক গুঁতো মারল নোকটার কপালে! শত্রুর হাত থেকে কেড়ে নিল রিভলভার। লাফিয়ে উঠল টেবিলের ওপর। বুঝে নিতে চাইল ঘরের কোন দিক দিয়ে পালাবে।
ভূরি ভূরি চিপসের লোভে মস্তবড় ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে রায়ট। তবে পালাতে চাইছে শুঁটকি কেউ কেউ। ওদিকে হঠাৎ টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার আগেই ঘরের দূর থেকে ছুটে আসছে শক্তিশালী লোকগুলো।
রানার হাতে রিভলভার দেখে চিলের মত চিৎকার ছাড়ল আতঙ্কিত এক মহিলা। ঘুরে ওদিকে তাকাল রানা। ছুটে আসছে সিকিউরিটির কয়েকজন। যেভাবে হোক বেরিয়ে যেতে হবে ওকে। অথচ, প্রতিটি দরজায় পাহারা দিচ্ছে ক্যাসিনোর লোক।
বাদ থাকল শুধু জানালা।
টেবিল থেকে নেমে উঠানের দরজা লক্ষ্য করে ছুট দিল রানা। ওকে ঠেকাতে চাইল কাছের এক অ্যাটেণ্ড্যান্ট। কিন্তু তার দিকে রিভলভারের নল ঘুরতেই হারাল সব উৎসাহ। বুলেট বলতে রানার মাত্র ছয়টা, তা ছাড়া নিরীহ মানুষের ভিড়ে চালাবে না গুলি। একটা ক্র্যাপ টেবিল ঘুরে এগোবার সময় কারুকাজ করা ছাত দেখল রানা। একটু ওপরে ঝুলছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি…
একসারি স্লট মেশিনের পেছন থেকে তেড়ে এল কাদির ওসাইরিসের আরেক বডিগার্ড। ওকে জাপ্টে ধরার আগেই মোড় নিল রানা, তবুও একহাতে ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরল ষাড়ের মত লোকটা। প্রায় পাশাপাশি ওরা, সে-সুযোগে শত্রুর মাথায় কনুইয়ের জোর গুলো বসাল রানা। তবে তাতে দমে না গিয়ে ধাক্কা মেরে সামনের স্লট মেশিনে ওকে ফেলতে চাইল বডিগার্ড।
হুমড়ি খেয়ে পড়বে বুঝে শত্রুর গলা পেঁচিয়ে ধরল রানা। সামনে বাগিয়ে রেখেছে শত্রুর মাথা। ভয় পেয়ে থামতে চাইল বডিগার্ড, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে অনেক!
মুখোমুখি সংঘর্ষে চুরমার হলো স্লট মেশিনের ভিডিয়ো স্ক্রিন। প্রায় কোমর পর্যন্ত গেঁথে গেল বডিগার্ড। কারেন্টের শকের ভয়ে থমকে গেছে রানা। সামনের গর্ত থেকে ঝিলিক দিচ্ছে লালচে ফুলকি। ঝরঝর করে ট্রেতে নামল টোকেন। খদ্দেরের বিজয়ে খুশির রিনরিনে আওয়াজ ছাড়ছে মেশিন।
অচেতন বডিগার্ডের প্রশংসা করল রানা, বাহ, এই তো জ্যাকপট পেয়েছ! সবচেয়ে কাছের জানালা ওর কাছ থেকে কমপক্ষে চল্লিশ ফুট দূরে। ওদিকে পঁয়ত্রিশ ফুট দূর থেকে তেড়ে আসছে সিকিউরিটির কয়েকজন।
অজ্ঞান বডিগার্ডের কোমরে পা রেখে স্লট মেশিনের ছাতে উঠল রানা। সারি সারি মেশিনের ছাতে উড়ে চলেছে ও।
একপাশ থেকে তেড়ে এসে গোড়ালি ধরতে চাইল দুএকজন গার্ড। কিন্তু তাদেরও দেরি হয়ে গেছে। শেষ মেশিনের ওপর থেকে ঝাঁপ দিল রানা। খপ করে ধরল ছাত থেকে ঝুলন্ত এক ঝাড়বাতি।
টুং-টাং মিষ্টি শব্দে পরস্পরের গায়ে লাগছে অসংখ্য ক্রিস্টালের টুকরো। টারজানের মত দুলতে দুলতে জানালায় পৌঁছে গেল রানা। ওকে মুড়িয়ে নিয়েছে ভারী পর্দা। ঝাড়বাতি ছেড়ে দিতেই জানালার কাঁচ ভেঙে বেরিয়ে গেল। পর্দার কারণে ওর শরীরে বিঁধল না ভাঙা কাঁচ। কিন্তু কিছুই দেখতে পায়নি বলে ধুপ করে পড়ল শক্ত সিমেন্টের চাতালে। চারপাশে ছড়িয়ে গেল ভাঙা কাঁচের অসংখ্য টুকরো। বার কয়েক গড়ান দিয়ে পর্দা সরিয়ে উঠে বসল ও। ব্যথা পেয়ে কুঁচকে ফেলেছে নাক-মুখ। একটু দূরে হতবাক হয়ে ওকে দেখছে পার্টিতে আসা কয়েকজন।
আরে, এই হতভাগার কথা বাদ দিন, উঠে দাঁড়াল রানা। যান, পার্টিতে যান! ওর চোখ পড়েছে উঠানের মাঝে সবুজ-সোনালি ওসাইরিয়ান টিমের রেসিং কার। এখনও ধিক-ধিক আওয়াজে চলছে ইঞ্জিন। আধবসা হয়ে এদিকে চেয়ে আছে ড্রাইভার।
ওই গাড়িটা দরকার, বুঝে গেল রানা। একদৌড়ে হাজির হলো ওসাইরিয়ান রেসিং গাড়ির সামনে। চিনেও ফেলল ড্রাইভারকে। বেশ নাম করেছে। রনি রুবিল্যাক। খুব দ্বিধার ভেতর পড়ে গেছে তরুণ।
দুঃখিত, দোস্ত, ঘাড় ধরে রুবিল্যাককে বের করে নিজে লাফিয়ে ককপিটে উঠল রানা। প্রায় শুয়ে পড়তে হয়েছে ওকে। আগেও ড্রাইভ করেছে এসব গাড়ি। তোমার রেস ভাল হোক, দোস্ত!
তাদের হিরোকে বের করে দিয়ে গাড়ি লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে বাদামি এক যুবক! চমক কাটল টিম টেকনিশিয়ানদের, হৈ-হৈ করতে করতে তেড়ে এল তারা। কিন্তু ততক্ষণে ক্লাচ চেপে গিয়ার ফেলে অ্যাক্সেলারেটর চেপে ধরেছে রানা। ওর জানা ছিল, হেলমেট নেই বলে কানে বিকট আওয়াজ তুলবে ইঞ্জিন। তীরের গতি তুলে রওনা হয়ে গেছে সুপারকার।
কয়েকজন আসছিল রাস্তা ধরে, চোখের সামনে তুমুল বেগের গাড়ি দেখে দুপাশে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণরক্ষা করল তারা। হালকা ওজনের ব্যারিয়ার উড়িয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল রানা।
বলরুম থেকে দৌড়ে এল কাদির ওসাইরিস, পেছনেই লাবনী। অবাক হয়ে দেখল, কর্ডন চুরমার করে ক্যাসিনো স্কয়ারের জমিতে চলে গেছে রানা। থামাও! ওকে থামাও! চিৎকার করল কাদির ওসাইরিস।
ক্যাসিনো থেকে ছিটকে এল নাদির মাকালানি ও কিলিয়ান ভগলার। শেষেরজনের হাতে দ্বিতীয় রিভলভার। তাক করল রেসিং গাড়িটার দিকে। কিন্তু ধমকে উঠল কাদির ওসাইরিস, না-না! গুলি না! ট্রিগার থেকে আঙুল সরাল ভগলার। পিছু নাও! পিছু! নাদির, যাও!
রাগী চোখে লাবনীকে দেখে নিয়ে রানার গাড়ির পেছনে ছুটল নাদির। পেছনে ভগলার এবং এক বডিগার্ড। এদিকে উঠানে বেরিয়ে এসেছে সিকিউরিটির লোক। কিন্তু আপাতত তাদের কিছুই করার নেই। ক্যাসিনোর দরজায় থেমেছে বেলা। হাতের ইশারায় ওকে আবারও লুকিয়ে পড়তে বলল লাবনী।
ওর দিকে তাকাল কাদির ওসাইরিস। লাবনী, এইমাত্র তোমার প্রেমিক চুরি করেছে আমার মিলিয়ন ডলারের রেসের গাড়ি!
এসব কারণেই তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখিনি, রাগী গলায় বলল লাবনী, জঘন্য লোক! অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করার ওস্তাদ!
বিরক্তি নিয়ে মাথা নাড়ল কাদির ওসাইরিস। কপাল ভাল, ওটা প্রদর্শনী গাড়ি। পেশাদার ড্রাইভার তো নয়, বেশি দূরে যেতে পারবে না।
.
বহুদিন পর আবারও রেসিং কার চালাচ্ছে রানা। মনে পড়ছে। গ্রা প্রি-র উত্তেজনাময় সেসব দিনের কথা। সত্যিই আবারও রেসিং ট্র্যাকে নেমেছে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি অন্যরকম, সামনে থেকে এসে ঘাড়ে চাপতে চাইছে সিভিলিয়ান সব গাড়ি। রেসিং কার নিয়ে তুমুল বেগে চলেছে উল্টোপথে সার্কিট ধরে। উঁচু গাড়ির হেডলাইটের কড়া, সাদা আলো ধাঁধিয়ে দিচ্ছে ওর চোখ।
আরেকটু হলে মস্ত নাকওয়ালা এক বেন্টলি চ্যাপ্টা করে দিত ওকে। একেবারে শেষসময়ে বাঁক নিয়ে সরে গেল রানা। তাতে রাস্তার পাশের ক্র্যাশ ব্যারিয়ারে লাগল ফ্রন্ট উইং। ভাঙল পাতলা কার্বন ফাইবার। সোজা পথে যাওয়ার জন্যে বারবার সতর্ক করছে ব্যাটারি চালিত ওয়ার্নিং বাতি।
অ্যাভিনিউ ডিঅস্টেণ্ডের টু-ওয়ে রোডে পড়ল রানা। টিলা বেয়ে রকেটের বেগে নেমে যেতে লাগল বন্দরের দিকে। খুব ব্যস্ত রাস্তা। হঠাৎ করেই সামনে হাজির হলো এক রেঞ্জ রোভারের পেছনদিক। কষে ব্রেক করেছে ওই ড্রাইভার। রানাও চাপল ব্রেক প্যাডেল। আটকে গেল ওর গাড়ির চার চাকা। তবুও চলেছে পিছলে। রেসিং কারের সামনের ফেণ্ডার ধুম করে লাগল রেঞ্জ রোভারের পেছনের চাকায়। ছিঁড়ে দিল সামনের গাড়ির রাবারের টায়ার।
ভুম শব্দে ফাটল চাকা। রাস্তায় ঘষা খেল রেঞ্জ রোভারের অ্যালয় হুইলের রিম।
দুঃখিত! বিড়বিড় করল রানা। তবে কার্বন ফাইবারের ধারাল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে রেসিং কারের চাকাও। থরথর করে কাঁপছে। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পরের গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে গেল রানা। প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে মার খাওয়া গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তার চেয়েও খারাপ সংবাদ পেয়ে গেছে রানা।
ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ছাপিয়ে এল পুলিশের সাইরেনের হাহাকার। রাস্তার আর সব গাড়ি বাদ দিয়ে ওকে খুঁজে নিতে সময় লাগবে না অফিসারদের!
ধরা পড়ার আগেই পৌঁছুতে হবে বন্দরে।
অপেক্ষাকৃত উঁচু সব গাড়ির কারণে সামনের রাস্তা প্রায় দেখছেই না রানা। বোঝার উপায় নেই কোন গাড়ি উঠছে টিলা বেয়ে। টিভিতে দেখেছে, একটু সামনে প্রথমবারের মত বাঁক।
চুলের কাঁটার মত তীক্ষ্ণ ওটা।
সর্বনাশ! বিড়বিড় করল রানা। প্রথম গিয়ারেও ষাট মাইল বেগে অন্যসব গাড়ির মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে। ওর গাড়ি। সামনেই সেইন্ট ডেভোট কর্নার, অতিব্যস্ত রাস্তার অন্তচ্ছেদ।
তবে সামনে সোজা চলে যাওয়া পথ দেখল রানা। হুঁ–ই ই শব্দ তুলল রেসিং কারের ইঞ্জিন। ত্যাগ করছে হাই প্রেশারের নাইট্রোজেন। কিন্তু তখনই রিম থেকে খসে গেল সামনের ক্ষতিগ্রস্ত একটা চাকা।
চরকির মত ঘুরল রেসিং কার। পিছলে গিয়ে পেছনের দিক লাগল এক ফেরারি গাড়ির পেটে। আরেক পাক খেয়ে চৌরাস্তার মাঝে পৌঁছে গেল রানা। আবছা চোখে দেখল, ঝড়ের বেগে আসছে ওদিকের ক্র্যাশ ব্যারিয়ার।
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল ও।
একইসময়ে পাশ থেকে ব্যারিয়ারের গায়ে চেপে বসল গাড়ি। মুহূর্তে চ্যাপ্টা হলো ইমপ্যাক্ট-অ্যাবর্নিং বডিওয়ার্ক। এখনও চরকির মত ঘুরছে গাড়ি। ছিটকে গেল রাস্তার মাঝে। বিধ্বস্ত রেসিং কারের সঙ্গে দুর্ঘটনা এড়াতে সরে যাচ্ছে অন্যান্য গাড়ি। তবে টিলা বেয়ে উঠে এসে কড়া ব্রেক কষল এক বড় ভ্যান। সোজা গেল রানার গাড়ির দিকে।
তবে পাঁচ সেকেণ্ড পর একইসময়ে থামল মুখোমুখি দুই গাড়ি। রেসিং কার নাক খুঁজেছে ভ্যানের সামনের বাম্পারের নিচে।
ককপিটের কোনা লেগে কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে রানা। অবশ্য, ঠিকই কাজ করেছে গাড়ির সেফটি ফিচার। এই দুর্ঘটনা থেকে হেঁটে সরে যেতে পারবে ও। অবশ্য, বনবন করে ঘুরছে মাথা। কয়েক সেকেণ্ড চারপাশ দেখল রানা, তারপর চোখে পড়ল দক্ষিণে স্টার্ট/ফিনিশ সাইনবোর্ড। ওদিকেই বন্দর।
সিয়েস, জেম্স্ বণ্ড! ফ্রেঞ্চ ভাষায় উঁচু গলায় বলে উঠল কে যেন।
মনে মনে বলল রানা, জেম্স্ বণ্ড নই, বাঙালি গুপ্তচর মাসুদ রানা। টের পেল, জমছে ভিড়। পরনে ওর টুক্সেডো, গাড়ি দুর্ঘটনা করেছে মোনাকোর মাঝে, এটা খুব অস্বাভাবিক কিছুই নয়।
ফেরারির ড্রাইভার বড় বড় চোখে দেখছে নিজের গাড়ির ক্ষত-বিক্ষত পেট। রেসিং কার থেকে নেমে পড়ল রানা, জগিং করে বন্দর লক্ষ্য করে রওনা হওয়ার আগে বলল, বিলটা পাঠিয়ে দেবেন ওসাইরিয়ান টিমের কাছে!
ব্যারিয়ার টপকে ভিড়ের মাঝে দেখতে না দেখতে উধাও হলো রানা। তখনই দুর্ঘটনার অকুস্থলে হাজির হলো পুলিশের প্রথম গাড়ি।
.
বদমাসটা গাড়ি চুরমার করে ফেলেছে? দুঃখে কালো হয়ে গেছে কাদির ওসাইরিসের মুখ। এইমাত্র ফোন করে এসব বলেছে তার ছোটভাই। ধরতে পেরেছ লোকটাকে? উত্তর নেতিবাচক। তা হলে অন্তত তাকে ধরেছে পুলিশ? আবারও না-সূচক জবাব পেল কাদির। বাহ! কীসব খুশির খবর!
স্বস্তি চাপতে গিয়ে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে লাবনীর। নাক বাঁকা করে বলল, ওই লোক পৃথিবীতে এসেছে সব ধ্বংস করতে! সম্পর্ক… জীবন… রেসিং কার…।
বুঝলাম, কীজন্যে ওর হাত থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছ, বিড়বিড় করল কাদির ওসাইরিস। আবার মনোযোগ দিল ফোনের দিকে। আমি আমুন রা ইয়টে ফিরছি। …হ্যাঁ, সঙ্গে ডক্টর লাবনী আলম। …না, নাদির, আবারও ওই একই কথা শুনতে চাই না। …দলের সবাইকে নিয়ে কাজে নেমে পড়ো। ওই মাসুদ রানাকে খুঁজছে পুলিশ। তাদের রেডিয়ো মনিটর করো। ওকে হাতে চাই। নাদির মাকালানির কথা শুনছে কাদির ওসাইরিস। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, শুধু বাধ্য হলে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলায় যেতে চাই না। অন্তত আজ রাতে নয়। মাসুদ রানাকে ধরে এনে তুলবে ইয়টে।
কাদির ফোন রাখতেই আপত্তির সুরে জিজ্ঞেস করল লাবনী, বদমাসটাকে খুন করবে না? কাঁপছে ওর বুক।
পার্টির ধ্বংসাবশেষ দেখল কাদির ওসাইরিস। এসব কেন ঘটল, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জান যাবে আমার। তার ওপর এখন চাই না টিভিতে বলুক, মাসুদ রানা নামের এক ফালতু লোককে খুন করে গ্রেফতার হয়েছে নাদির মাকালানি!
মাসুদ রানাকে হাতে পেলে তখন কী করবে?
দাঁতে দাঁত পিষল কাদির ওসাইরিস। মেডিটারেনিয়ান যেমন বড়, তেমনি গভীর।
ও… তা হলে আর ওই লোককে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না আমাকে।
শীতল চোখে লাবনীকে দেখল কাদির। ঠিক আছে, ভেঙে গেছে পার্টি। জানি না দেখার জন্যে তৈরি হয়েছে কি না যোডিয়াক, তবে এখন আমরা ফিরব ইয়টে। একমিনিট অপেক্ষা করো। কয়েকজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি।
একটু দূরে গিয়ে একদল লোকের সঙ্গে আরবিতে কথা শুরু করল কাদির। এই সুযোগে দরজার কাছে গেল লাবনী। দর্শকদের ভেতর বেলাকে দেখে হাতের ইশারায় ডেকে নিল।
মাসুদ রানা কোথায়? জানতে চাইল বেলা। উনি ঠিক আছেন তো?
একটা রেসিং গাড়ি নিয়ে সরে গেছে।
হাসল বেলা। সত্যিই ওই লোক দুর্দান্ত সুপুরুষ!
আমারও তাই ধারণা, উঠানে চোখ বোলাল লাবনী। এখনও আলাপে ব্যস্ত কাদির ওসাইরিস। বেলা, শুনলে অবাক লাগবে, কিন্তু সত্যি কথা হলো, এটা এখন তোমার জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। রানাকে খুঁজতে গেছে নাদির মাকালানি ও কিলিয়ান ভগলার। এদিকে যোডিয়াক দেখাতে আমাকে ইয়টে নেবে কাদির ওসাইরিস।
ঠিক আছে। কিন্তু ক্যাসিনো বন্ধ হয়ে গেলে? তখন কী করব? হোটেল রুমও পাব না। আমার পাসপোর্ট সঙ্গে নিয়ে গেছেন মাসুদ রানা!
আপাতত আমার কিছু করার নেই, বেলা। পেছনে তাকাল লাবনী। ওকে খুঁজছে কাদির ওসাইরিস। একটা উপায় বের করে নেবে। এবার আমাকে যেতে হচ্ছে। রানা বা আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে, একটু দূরের ওই হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করবে। আমরা তোমাকে খুঁজে নেব।
খুব অখুশি হলো বেলা। দুসেকেণ্ড পর মাথা দোলাল। গুড লাক, ডক্টর আলম। সাবধানে থাকবেন।
তুমিও সতর্ক থেকো। উঠানে ঢুকে ওসাইরিসের পাশে থামল লাবনী। আমরা কি এবার ফিরব?
গাড়ি আসছে, পৌঁছে দেবে বন্দরে। সঙ্গীদের উদ্দেশে নকল হাসি দিল কাদির ওসাইরিস। বন্দরে যেতে সময় লাগবে। সেইন্ট ডেভোটিতে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। এ কথা শুনে শুকনো কাঠফাটা হাসি হাসল কেউ কেউ।
লাবনীর কনুই ধরে আবারও ক্যাসিনোয় ঢুকল কাদির ওসাইরিস। পিছিয়ে পথ করে দিল অ্যাটেণ্ড্যান্টরা। সেই সুযোগে উঠানে বেরিয়ে গেল বেলা। কেউ চেনার আগেই চলল হোটেলের দিকে। চাকার ধোঁয়া তুলে সেরা আকর্ষণ বিদায় নেয়ায় ঝিমিয়ে পড়েছে পার্টি।
অবশ্য নতুন এক আকর্ষণ খুঁজে পেয়েছে বেলা। রেসিং ওভারঅল পরা সোনালি চুলের রনি রুবিল্যাক আছে রাস্তার পাশে। বয়স্ক দুই লোকের সঙ্গে উত্তেজিত সুরে কথা বলছে। বেলা বুঝল, এই তরুণ রেসের ড্রাইভার না হয়েই যায় না। সামনে গিয়ে হাজির হলো ও। বলবেন এখানে কী হয়েছে?
বিরক্ত চোখে ওকে দেখল রনি রুবিল্যাক। তবে পরক্ষণে টের পেল, দারুণ সুন্দরী এই তরুণী। সবচেয়ে বড় কথা, এই মেয়ে মধ্যবয়স্ক স্পন্সরের কেউ নয়। ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে না। দমে যাওয়া সুরে বলল রনি, ভয়ঙ্কর ঘটনা! ডাকাতি করে নিয়ে গেছে আমার গাড়ি। লোকটার হাতে ছিল কুচকুচে কালো রিভলভার! আমি ঠেকাতে চেয়েছি, কিন্তু তখনই সাহস হারিয়ে পালিয়ে গেছে। মিটমিট করে হাসছে। তার বয়স্ক দুই সঙ্গী। দলের তারকাকে অপমান করতে চায় না।
মাই গড! আপনি এত বড় ঝুঁকি নিলেন কী করে? ঠিক আছেন তো? ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে বেলা।
সারাশরীর ছড়ে গেছে, কিন্তু ঠিকই আছি। কাল রেসেও নামব। এবার বোধহয় হোটেলে ফেরা উচিত। অবশ্য… চওড়া হাসি দিল রুবিল্যাক। তার আগে তোমার সঙ্গে দুটো ড্রিঙ্ক নিলে মন্দ হয় না। সঙ্গিনী হবে আমার?
খুশি হয়ে বলল বেলা, আমার কোনও আপত্তি নেই!
.
১৭.
হাজারো রঙিন বাতির আলোয় ঝলসে উঠছে বন্দর, যেন ব্যস্ত শহরেরই অংশ। দালানগুলোর খুব কাছেই একের পর এক জেটি, পাশেই কালো জলে ভাসছে সারি সারি দামি ইয়ট।
চট করে কাদির ওসাইরিসের দিকে তাকাল উদ্বিগ্ন লাবনী।
এইমাত্র তীরে ভিড়েছে আমুন রা ইয়টের টেণ্ডার।
ও ভেবেছিল, কাছেই থাকবে রানা। পিছু নেবে। গিয়ে উঠবে ইয়টে। কিন্তু ভাসমান এসব প্রাসাদের আশপাশে কোথাও নেই মানুষটা।
ভয় লাগছে লাবনীর।
রানাকে ধরে ফেলল পুলিশ?
নাকি আরও খারাপ কিছু হয়েছে?
রানাকে মেরে ফেলেছে নাদির মাকালানি?
আনমনে মাথা নাড়ল লাবনী। সহজে রানাকে ধরতে পারবে না এরা। তা ছাড়া, ওকে ধরে আনতে বলে দিয়েছে কাদির ওসাইরিস।
রানা এখন কোথায়?
দূর সাগরে তাকাল লাবনী। দেখা গেল, ওদিকে আধমাইল দূরে দাঁড়িয়ে আছে আমুন রা।
নিশ্চয়ই ওখান থেকে ওকে উদ্ধার করবে রানা?
ওর নিজের সাধ্য নেই সাগর পেরিয়ে তীরে এসে উঠবে।
কাদির ওসাইরিসের সঙ্গে টেণ্ডারে লাবনী উঠতেই ডিজেল ইঞ্জিনের চাপা গর্জন ছেড়ে রওনা হলো বোট। সন্ধ্যায় গরম ছিল বাতাস, কিন্তু এখন সাগরে বইছে শীতল হাওয়া। খোলা বাহু ডলল লাবনী।
এই যে, নিজের জ্যাকেট খুলে ওর কাঁধে চাপিয়ে দিল কাদির ওসাইরিস।
ধন্যবাদ, বিড়বিড় করল লাবনী। ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপছে। রানার কিছু হয়ে গেল কি না, সেজন্যে দুরুদুরু করছে বুকটা।
বিলাসবহুল সব ইয়ট পেরিয়ে পোর্ট হারকিউল বন্দরের ইনার হার্বার পেরোল টেণ্ডার। সামনে পড়ল কুচকুচে কালো মেডিটারেনিয়ান সাগর। বন্দর ও কংক্রিটের বাঁধ পেছনে ফেলে জোরালো স্রোতে পড়ল দুলন্ত বোট। গতিপথ অ্যাডজাস্ট করল পাইলট।
বিশাল ঢেউয়ের বিক্ষুব্ধ সাগর সাঁতরে তীরে উঠতে পারবে না, বুঝে গেছে লাবনী। খোলে লেগে ছিটকে উঠছে ঢেউ ও ফেনা। বোটে বাড়ি খেয়ে প্রতিবার ঠং-ঠুং শব্দ তুলছে নোঙরের শেকল।
তীরের দিকে তাকাল লাবনী। তিন দিক থেকে ঘিরে রাখা টিলার কোলে ঝলমল করছে মোনাকো। দেখার মত দৃশ্য। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণে কিছুই ভাল লাগছে না ওর।
তীর থেকে দূরে নোঙর করেছে কিছু জলযান। তবে অন্যসব মেগা ইয়টের চেয়েও বড় আমুন রাঁ। মস্তবড় ইয়টের স্টার্নে চওড়া মুরিং প্ল্যাটফর্মে ভিড়ল টেণ্ডার। পাশেই দুটো ছোট স্পিডবোট এবং বেশ কয়েকটা জেট স্কি।
ইয়টের এক ক্রু বোটের দড়ি বেঁধে নেয়ায় উঠে দাঁড়াল কাদির ওসাইরিস, লাবনীর হাত ধরে পা রাখল ইয়টের ডেকে। নরম সুরে বলল, পুরো সময় সুন্দর না কাটলেও খুব ভাল লাগল তোমার সঙ্গ।
আমারও খুব ভাল লেগেছে, বলল লাবনী। আর… সরি… তোমার এত ক্ষতি করে দিল মাসুদ রানা! তাকে বোঝাতে চেয়েছি, কিন্তু কিছুতেই কিছু শুনবে না। ওর মত বাজে লোক জীবনে দেখিনি আমি!
ওর জন্যে তোমাকে দোষ দেবে না কেউ, নির্দ্বিধায় বলল কাদির ওসাইরিস। আর আর্থিক ক্ষতির কথা যে বলছ, ওটা কিছুই নয়। একবার ওসাইরিসের পিরামিড পেলে পুষিয়ে নেব তার হাজার কোটি গুণ!
সেক্ষেত্রে বোধহয় সময় নষ্ট না করে দেখা উচিত ওই যোডিয়াক? বলল লাবনী।
ইয়টের ওপরের ডেকে উঠল ওরা।
লাবনীকে নিয়ে ভেতরের এক দরজার সামনে থামল কাদির ওসাইরিস। এটা আমার কেবিন। ভেতরে অপেক্ষা করবে তুমি। দেখে আসছি যোডিয়াক তৈরি কি না।
লাবনী ঘরে ঢুকে বুঝল, ওর অ্যাপার্টমেন্টের চেয়েও বড় এ কেবিন। আরও প্রকাণ্ড লাগছে সংলগ্ন বাথরুম ও ওয়াক ইন ক্লযিটের জন্যে। বিশাল বেডের ওপরের ছাতে নিখুঁত আয়না। প্রতিটি দুর্মূল্য জিনিস জাহির করছে: এই ইয়টের মালিক সত্যিকারের প্লেবয়। সুইটয়ারল্যাণ্ডের দুর্গের কথা মনে পড়ল লাবনীর। এই কেবিনে অবশ্য মেঝেতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছাল নেই। দারুণ সুন্দর কেবিনটা! না বলে পারল না লাবনী।
ঘরের আরেকদিকের দরজার কাছে চলে গেছে কাদির, ঠোঁটে মৃদু হাসি। আরাম করে বসো। দুই মিনিটের ভেতর ফিরব।
বেডের এক কোণে বসল লাবনী।
দেড় মিনিট পর ফিরল কাদির ওসাইরিস। আরও চওড়া হয়েছে হাসি। খুলল ভাঁজ করা এক দরজার ছিটকিনি। ওদিকে দেখা গেল আরেকটা বড় ঘর। যোডিয়াক তৈরি।
উঠে ওই দরজার দিকে চলল লাবনী। পাশ কাটাল কাদির ওসাইরিসকে। প্রথমবারের মত দেখল সম্পূর্ণ যোডিয়াক।
কাজটা যেই করুক, ভালভাবেই জোড়া দিয়েছে। ছয় ফুটি বৃত্তাকার পাথরের যোডিয়াক এখন নিচু এক স্ট্যাণ্ডে। যোডিয়াকের ওপরে স্বচ্ছ বুলেটপ্রুফ লেক্সান। খুব কাছে না। যাওয়া পর্যন্ত হল অভ রেকর্ডস থেকে কেটে আনার চিহ্ন চোখে পড়ল না লাবনীর।
দেখার মতই সুন্দর যোডিয়াক। লুভরেরটার চেয়ে একটু ছোট। প্রাকৃতিক অত্যাচার ছিল না বলে স্ফিংসের ভেতর ক্ষতি হয়নি ওটার। কালচে পটভূমির মাঝে নানান রঙে ঝিকমিক করছে প্রতিটি নক্ষত্রমালা। ফ্যাকাসে নীল দিয়ে বোঝানো হয়েছে আকাশ। ওটা সম্ভবত মিল্কি ওয়ে, ভাবল লাবনী।
এ ছাড়া রয়েছে নানান চিহ্ন। যেমন একটা লাল বিন্দু। ওটা মঙ্গল। বেলার ফোটোতে দেখেছে লাবনী। আরও আছে। সৌরজগতের অন্য কয়েকটি গ্রহ। ওসাইরিসের ছোট প্রতাঁকের খুব কাছে হলদে এক ত্রিকোণ আকৃতির ওপর চোখ গেল ওর।
ওটা একটা পিরামিড। ওসাইরিসের।
ঝুঁকে দেখল লাবনী। পিরামিডের খুব কাছে অস্পষ্ট রঙে আঁকা খুদে অক্ষর: হায়ারোগ্লিফ।
ঘুরে উত্তেজিত চোখে কাদির ওসাইরিসকে দেখল লাবনী। এটা আগেই দেখেছ?
অবশ্যই, বড় এক টেবিলের সামনে থামল কাদির। ল্যাপটপের পাশ থেকে নিল প্রিন্টআউট। যোডিয়াক টুকরো অবস্থাতেই অনুবাদ করিয়ে নিয়েছি। এসব হায়ারোগ্লিফে আছে দিক নির্দেশনা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কোথা থেকে শুরু করতে হবে, তা জানি না। আর সেজন্যেই তোমার সাহায্য এত দরকার।
অনুবাদ করা লেখা লাবনীর হাতে দিল সে।
পড়ল লাবনী, ওসাইরিসের দ্বিতীয় চোখ থেকে যেতে হবে রুপালি গভীর খাদে। বুধগ্রহ থেকে যেতে হবে এক আতুর, তাতেই পাওয়া যাবে অমর দেবতা-রাজার সমাধি। আতুর বোধহয় প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যার একক। ঠিক?
এগারো হাজার পঁচিশ মিটার।
মনে মনে হিসাব কষল লাবনী। কসেকেণ্ড পর বলল, তার মানে ছয় পয়েন্ট আট-পাঁচ মাইল। কপালে ভুরু তুলল কাদির ওসাইরিস। অঙ্কে খারাপ নই। হাসল লাবনী। অর্থাৎ, রুপালি গভীর খাদ বা ক্যানিয়ন থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে বুধগ্রহের দিকে গেলেই ওই পিরামিড। কিন্তু জানতে হবে এই যোডিয়াকের গ্রহগুলোর ভেতর কোটা বুধগ্রহ।
ঠিক তা পাবে না, বলল কাদির, এই যোন্ডিয়াকে আছে মঙ্গল, শনি ও বৃহস্পতি। আঙুল তুলে ওগুলো দেখিয়ে দিল সে। ওগুলোর পযিশন হিসাব কষে বের করেছি বুধগ্রহের পযিশন। এই যে, ওটা এখানে। পিরামিডের কাছে নির্দিষ্ট এক জায়গা দেখাল ধর্মগুরু।
তো ক্যানিয়নের শেষে প্রায় সাত মাইল পুবে পিরামিড। কিন্তু… দেয়াল আয়না দেখাল লাবনী। আমরা যেহেতু দেখব মানচিত্র ওপর থেকে, কাজেই ওই জায়গা আছে সাত মাইল পশ্চিমে।
খুশি হয়ে মাথা দোলাল কাদির। ঠিক। তবে আগে খুঁজে বের করতে হবে রুপালি গভীর খাদ।
অর্থাৎ, আগে চাই ওসাইরিসের দ্বিতীয় চোখ। তা হলে জানতে হবে, প্রথম চোখ কোটা। …তোমার জানা আছে?
যোডিয়াকে সবমিলে আছে ওসাইরিসের দুটো প্রতীক, বলল কাদির ওসাইরিস। হয়তো দুটো মিলেই নির্দিষ্ট কোনও দিক দেখাচ্ছে?
মনোযোগ দিয়ে দুই প্রতীক দেখল লাবনী। মিশরের প্রাচীন সব নক্সার মত। একটা করে চোখ। বড়জোর বিন্দুর মত। দুই প্রতাঁকের মাঝে মনে মনে একটা রেখা তৈরি করল লাবনী। কিন্তু কোনওভাবেই পিরামিডের দিকে গেল না ওটা।
মনে হচ্ছে ওসাইরিসের চোখ বিশেষ সঙ্কেত, তাই না? জানতে চাইল লাবনী।
মাথা দোলাল কাদির ওসাইরিস। নিরাপত্তা চিহ্ন। মন্দিরে পাওয়া যায়। বা সমাধিতে। দেখিয়ে দেয় কীভাবে যেতে হবে প্রেতলোকে।
ওসব সহজেই মেলে। তার আরেক মানে, সহজ হবে না কাজ। যযাডিয়াকের দিকে তাকাল লাবনী, ভাবছে। রুপালি ক্যানিয়ন কোনও সূত্র হতে পারে? প্রাচীন মিশরীয়রা সোনার চেয়ে মূল্য দিত রুপাকে। সেক্ষেত্রে কি রাজ বংশের পত্তনের আগে মিশরে কোনও রুপার খনি ছিল?
জানি না। ইতিহাস তোমার জানার কথা, আমার নয়।
কথা ঠিক। আরও রিসার্চ করতে হবে। সেজন্যে চাই আর্কিওলজিকাল ডেটাবেস। জটিল এই রহস্য লাবনীর বুকে তৈরি করেছে পেশাদারী উত্তেজনা। প্রায় ভুলেই গেছে, যাকে ঠেকাতে চায়, তাকেই সাহায্য করার চেষ্টা করছে।
তুমি ঠিক আছ তো? জানতে চাইল কাদির ওসাইরিস।
আসলে… সারাদিন উত্তেজনার ভেতর থেকেছি, বলল লাবনী। বড় ক্লান্তি লাগছে।
হাসল ধর্মগুরু। সত্যিই দুঃখিত। আমার বোঝা উচিত ছিল। আজ রাতেই এই ধাঁধা সমাধান করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। তা ছাড়া, আগামীকাল রেস। আশা করি ট্রাকে তুমি আমার সঙ্গে যাবে।
ভাল লাগবে, মিথ্যা বলল লাবনী। মন খারাপ, বিকট আওয়াজের গাড়িগুলোকে সহ্য করতে হবে।
গুড। তো এসো, এক গ্লাস শ্যাম্পেইন খেয়ে যে যার মত বিদায় নিই।
ইয়ে… আমার গিয়ে শুয়ে পড়াই ভাল। একবার একা হলে রানার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করবে লাবনী।
মাত্র এক গ্লাস, প্লিয, নরম স্বরে বলল কাদির। পাশের ঘরে এক বোতল ভিউভ ক্লিকো রেখেছি। মন খারাপ হবে ওটা একা খেতে হলে।
তোমার ওসব… পতিতা প্রায় বলে ফেলেছিল লাবনী, নিজেকে সামলে বলল, তরুণী বান্ধবীদের কী হলো?
আমার পূজারিণীরা? মাথা নাড়ল কাদির। ওরা সুন্দরী, তবে ওদের চেয়ে অনেক বেশি ভাল লাগে বুদ্ধিমতী কাউকে। সে হবে এমন কেউ, যার জীবনে আছে অনেক কাহিনী। যেমন তুমি। আজও জানতে পারিনি কীভাবে আবিষ্কার হলো আটলান্টিস। মিষ্টি করে হাসল কাদির। মাত্র এক গ্লাস, ঠিক আছে?
.
একঘণ্টা গল্পের পর তৃতীয় গ্লাস শ্যাম্পেইন গলায় ঢালল কাদির ওসাইরিস। সত্যি, তোমার জীবনও আমার মতই, একের পর এক অভিযান। কপাল ভাল, আমাদের পাশেই আছে ভাগ্যদেবী।
আমার ভাগ্য অতটা ভাল নয়, বলল লাবনী। বেডের কিনারায় বসে আছে।
পাশে আয়েস করে শুয়ে পড়ল কাদির ওসাইরিস। আর কখনও দুশ্চিন্তা করবে না। একবার ওসাইরিসের পিরামিড পেলেই জীবনে যা চাইবে, তার সবই পাবে।
সেই প্রথম গ্লাস শ্যাম্পেইনেই মৃদু চুমুক দিল লাবনী। তা হলে কাদিরের আয়ু বর্ধনকারী পাউরুটি পাব নিয়মিত?
যা চাইবে, তাই পাবে।
শুনে খুশি হলাম। ভুরু কুঁচকে গেল লাবনীর। ভাবছে সুইটযারল্যাত্রে ওই ল্যাবের কথা। ওই পাউরুটি খাওয়া কি নিরাপদ হবে? তুমি না বলেছ, ওটা জেনেটিক্যালি মডিফাই করবে?
হাসল কাদির ওসাইরিস। সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে। আমি নিজেই খাব! তবে জেনেটিক্যালি বদলে দেব অন্যদের জন্যে। যা চাইব, তাই তৈরি করে দেবে বিজ্ঞানীরা।
কী বানাবে তারা? নাকি তুমি এসব আমাকে বলে দিলে ধমক খাবে তোমার ভাইয়ের কাছে?
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল কাদির ওসাইরিস। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি নই, নাদির আছে টেম্পলের দায়িত্বে! তা কিন্তু সত্যি নয়। মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক ও। আসলে জেনেটিক্যালি পাল্টে নেব, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে কপিরাইট করাতে পারি নতুন ওই অর্গানিযমকে। পেটেন্টও নেব। ইস্ট গজিয়ে নেয়া সহজ। চাই না ওসাইরিসের পাউরুটি তৈরি করুক আর কেউ। আইনের কারণে ওসাইরিয়ান টেম্পলের কাছ থেকেই কিনতে হবে ওই জিনিস। চতুর হাসল কাদির। দেখতে তাকে লাগল ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত। তা ছাড়া, চাইব না ঠিকভাবে মানুষের কোষ মেরামত হোক। সবাই বছরে মাত্র একবার ওই পাউরুটি খাবে, তা হলে আমার চলবে না। প্রতি সপ্তাহ বা তিন দিনে আমার কাছ থেকে কিনতে হবে।
তার মানে বড়শিতে আটকে নেবে সবাইকে?
কাঁধ ঝাঁকাল কাদির। তাতে কম পাবে না মানুষ, সামান্য পয়সায় হয়ে উঠবে প্রায় অমর। ড্রাগ, সিগারেট বা মদের পেছনে খরচ করবে কেন? তার চেয়ে ওই টাকা দেবে ওসাইরিয়ান টেম্পলকে! দাঁতব্য নানান কাজে খরচ করব আমরা ওই টাকা।
ওসাইরিয়ান টেম্পলের কথা শুনে চলবে যেসব দেশ, তারাই পাবে ওই পাউরুটি, ভাবল লাবনী। ও, তা হলে তুমি চাও না সবাই অমর হোক?
সহজ কথা, বুঝতে পারোনি? হাসল কাদির। ওসাইরিস চেয়েছিল অমর হতে। তাকেই অনুসরণ করছি। আমার তো ধারণা, দুনিয়ার মানুষ প্রশংসা করবে আমাকে। আর যাই হোক, আমিই তো এনেছি প্রায় অমর হওয়ার ওষুধ। আধ শোয়া হয়ে গ্লাস শেষ করল সে। আরেক গ্লাস নাও?
নিজের গ্লাস দেখাল লাবনী। এখনও একটু আছে। আমার বোধহয় উচিত হবে না আর নেয়া।
নিলে কী হবে? কিছুই না! পিছলে বেড ছেড়ে নেমে পড়ল কাদির ওসাইরিস।
চিন্তায় পড়ে গেছে লাবনী। মাতাল হয়ে উঠছে লোকটা। এবার যে-কোনও সময়ে জাপ্টে ধরবে ওকে।
খুবই খুশি হব আমার সঙ্গে আরেক গ্লাস নিলে। মার্বেলের তৈরি বারের ওদিকে গেল কাদির। ফ্রি খুলে বের করল নতুন শ্যাম্পেইনের বোতল। ওটা রাখল বারের ওপর। এক্সকিউয মি, এক্ষুণি টয়লেট থেকে ফিরছি।
পাশের দুর্দান্ত সুন্দর টয়লেটে ঢুকল সে। বিশাল আয়নায় মুগ্ধ হয়ে দেখল নিজেকে। খুলে ফেলল পোশাক। পরনে শুধু সিল্কের জাঙ্গিয়া। গায়ে চাপিয়ে নিল সিল্কের গাউন। গলা ও বুকে স্প্রে করল দামি কোলন। ছোট কাজ সেরে বেরিয়ে এল টয়লেট ছেড়ে। হেসে ফেলল খুশিতে। প্রায় নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ঘরের সব বাতি জ্বলছে ডিম লাইট। বেডের চাদরের নিচে পরিচিত, সুন্দরী যুবতীর লোভনীয় দেহ!
আহ্, একেই বলে স্বর্গসুখ!
একটু টলতে টলতে বেড়ে উঠল কাদির। ভাল লাগছে, আরাম করে শুয়েছ। নিজেও নিঃশব্দে সেঁধিয়ে গেল চাদরের নিচে। আবেগী এক চুমু দেবে বলে মুখ নিচু করতেই চমকে দেখল, ঐ-কুঁচকে কঠোর চোখে তাকে দেখছে মাসুদ রানা, মুখে নিষ্ঠুর হাসি!
হাই, এভারগ্রিন রোমিয়ো! হতভম্ব কাদিরের হাঁ করা মুখে ভগলারের রিভলভারের লম্বা নলটা জল রানা।
.
১৮.
আত্মা চমকে যাওয়ায় কালচে পাথর হয়ে গেছে কাদির। উঠে বসে রিভলভারের নলটা মুখ থেকে বের করে তার গলায় ঠেকাল রানা।
প্রথমে মোরগের মত কে করে উঠল কাদির, তারপর নিজেকে সামলে বলল, কু-কী করে?
আমিও খুব অবাক হয়েছি, যোডিয়াকের ঘর থেকে বেরিয়ে এল লাবনী। একটু আগে চোরের মত ঘরে ঢুকে ওদিকের ঘরে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছে রানা।
বন্দির ওপর রিভলভার তাক করে গায়ের ওপর থেকে চাদর সরাল বাঙালি গুপ্তচর। ভিজে চুপচুপ করছে পোশাক। জানতাম ইয়টের টেণ্ডার আসবে বন্দরে। পিয়ারের তলায় অপেক্ষায় ছিলাম। তারপর টেণ্ডারের নোঙরের শেকল ধরে ভেসে এসেছি এখানে।
কঠোর দৃষ্টিতে বিশ্বাসঘাতিনী লাবনীকে দেখছে কাদির। ও, তা হলে তোমরা একই দলের? নাদির ঠিকই বলেছিল!
তাই তো মনে হচ্ছে, বলল লাবনী, ভাবলে কীভাবে উন্মাদ এক ধর্মগুরুর দলে ভিড়ে খুন হব? রানার দিকে তাকাল। এবার কী করব আমরা?
ইশারায় কাদিরকে টয়লেট দেখাল রানা। প্রথম কাজ একে বেঁধে ফেলা। যেন টু-শব্দ করতে না পারে। পরের কাজ পিরামিড কোথায় জেনে সেখানে গিয়ে হাজির হওয়া।
মাথা দোলাল লাবনী।
ঠিক আছে, লাভার বয়, এবার নেমে পড়ো, তাড়া দিল রানা। সোজা টয়লেটে। নিজে নেমে পড়েছে বেড ছেড়ে।
লাবনীর ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না মিশরীয় নায়ক। মেঝেতে পা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, ভেবেছিলাম কারও ক্ষতি করব না, কিন্তু এখন ভাবছিঃ তার উল্টোও করতে পারি।
কথা কম, কাজ বেশি, রানার অস্ত্রের ইশারায় বাথরুমে গিয়ে ঢুকল কাদির। পিঠে ধাক্কা খেতেই তার কনুই লেগে ঝনঝন করে তাক থেকে মেঝেতে পড়ল একরাশ টয়লেট্রি। বসে মাথা নিচু রাখো। ইশারা পেয়ে লোকটা বসল নিচু কমোডের বাউলে। আরেক হাতে টান দিয়ে তার গাউনের বেল্ট খুলল রানা। লাবনী, ওর দুহাত নিয়ে পেছনের ওই নিচের পাইপে বাঁধো। একপাশ থেকে রিভলভার তাক করে রেখেছে ও। নিচে যাওয়ার ময়লার পাইপে ভালভাবে কাদিরের দুই হাত বাঁধল লাবনী। পা বাঁধার মত কিছু নিয়ে এসো।
কেবিনে গিয়ে ঢুকল লাবনী। ফিরে এল রঙিন সব টাই হাতে। রঙ কিন্তু তুমিই বেছে নেবে, কাদির।
আমার আপত্তি আছে। একটা টাই নিয়ে গোল পাকাল রানা। আপত্তি তুলতে হাঁ মেলতেই কাদিরের মুখে গুঁজে দিল ওটা। বড় মুখে লাগবে আরেকটা। কাদিরের মুখে ভরল দ্বিতীয় টাই। এবার তৃতীয় টাই দিয়ে তার দুই পায়ের গোড়ালি বাঁধল বেসিনের পাইপে। লম্পট ধর্মগুরুর মাথায় রিভলভারের নল ঠুকল রানা। এবার মন দিয়ে শোনো, কিং তুত! আওয়াজ করলে তুমি শেষ!
মুখ ভরা টাই, রাগী গার্গলের আওয়াজ তুলল কাদির।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে কেবিনের দরজা লক করল রানা। ফিরে এল লাবনীর পাশে যোডিয়াকের সামনে। পিরামিডটা পেলে, লাবনী?
এখনও না।
কত সময় লাগতে পারে?
জানি না। তবে ওদিকের টেবিলে কাদিরের লোকদের সংগ্রহ করা ডেটা আছে।
টেবিলের সামনে গিয়ে থামল ওরা।
যোডিয়াক বিষয়ে প্রচুর ডেটা জোগাড় করেছে কাদিরের লোক। ওটা তৈরির সময়ে সব গ্রহের অবস্থানও বের করেছে। সেই হিসাব অনুযায়ী যোডিয়াক তৈরি হয়েছে অক্টোবরে, খ্রিস্টপূর্ব ৫,৫৭৬ সালে। এ তথ্য মিলল বেলার কথার সঙ্গে। খুফুর পিরামিডের অনেক আগেই ছিল স্ফিংস। এ ছাড়াও রানা ও লাবনী পেল নানান নক্ষত্রমণ্ডলীর নাম, রঙের কেমিকেল অ্যানালাইসিস, যোডিয়াকের নিখুঁত মিলিমিটার ডিমেনশন, পাথরের ধরন ইত্যাদি।
সব অর্থহীন, বিড়বিড় করল লাবনী। পাতার পর পাতা ঘটছে।
পাশের কেবিন থেকে ঘুরে এসে জানতে চাইল রানা, পেলে কিছু?
সবই আছে যোডিয়াকের ব্যাপারে, কিন্তু যা চাই, তা নেই। হায়ারোগ্লিফিক্স বলছে: কোথায় গিয়ে পেতে হবে ওসাইরিসের পিরামিড। কাদিরের লোক বুধগ্রহের পযিশন বের করেছে, ওটা সূত্র। কিন্তু অন্যান্য দরকারি তথ্য কোথায় পাব!
অন্যান্য সূত্র কী কী? জানতে চাইল রানা।
রুপালি এক গভীর খাদ, যেটা কোথায় আমরা জানি না। আছে ওসাইরিসের দ্বিতীয় চোখ। সেটাও জানি না কোথায় আছে। জানা নেই প্রথম চোখই বা কোথায় গেল বেয়াক্কেলে লোকটার! যোডিয়াক একচক্কর ঘুরল লাবনী। ভাবছে, পাবে নতুন প্রয়োজনীয় তথ্য। কয়েক মিনিট পর বলল, কোথাও কিছু ভুল করেছি?
যোডিয়াক মিশরীয়, বেলা হয়তো কিছু বুঝবে। টুক্সেডোর ভেতর হাত ভরল রানা। ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে?
হ্যাঁ। হোটেলের লবিতে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছি।
ভাল হতো ওকে কোনও হোটেলে তুলে দিতে পারলে। যে সংক্ষিপ্ত পোশাক, শীতে মরেও যেতে পারে। প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন রেখেছে রানা। ভেবেছিল সাগরের পানি ভেতরে ঢুকবে না। কিন্তু ফেটে গেছে ব্যাগ। ভিজে নেতিয়ে পড়েছে বেলা আর ওর পাসপোর্ট। বিসিআই থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট মোবাইল ফোনের কেসিং থেকে টপটপ করে পড়ছে পানি। লাবনী, তোমার মোবাইল ফোনটা আছে তো?
হ্যাঁ। কিন্তু আছে দুই ডেক নিচে আমার কেবিনে। তা ছাড়া, প্রয়োজন না পড়লে জাহাজে ঘুরে বেড়াব না। বিশেষ করে যখন ওটার মালিককে আটকে রেখেছি টয়লেটে।
হুঁ, ভাবছে রানা। কিছু হলেই কাদিরের লোক প্রথমে আসবে এই কেবিনে। তার মানে, আপাতত পাব না বেলার সাহায্য।
নানান কাগজ ঘেঁটে সূত্র বা দরকারি তথ্য খুঁজছে লাবনী। তাক থেকে নিল প্রাচীন মিশরের ওপরে লেখা রেফারেন্স বই। রুপালি ক্যানিয়ন বা ওসাইরিসের চোখের কথা কোথাও লেখা নেই।
বুঝলাম না, হতাশ হয়ে হাল ছাড়ল লাবনী। অবশ্য কয়েক সেকেণ্ড পর আবার গেল যোডিয়াকের সামনে। এটা কোথায় যেতে বলেছে? নক্ষত্রের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে। নক্ষত্রমালা পেয়েছি। মিল্কি ওয়ে। গ্রহ। কিন্তু এসব মিলে কী বুঝব? ওই যে যযাডিয়াকে এঁকে রেখেছে পিরামিড। দেখিয়ে দিয়েছে কোন্ দিকে যেতে হবে। কিন্তু জানব কী করে কোথা থেকে রওনা হতে হবে?
একটা কথা বলব, ম্যাডাম? জানতে চাইল রানা।
কী?
তোমার ওই যোডিয়াকে ওটা কিন্তু মিল্কি ওয়ে নয়।
হালকা নীল ছাপ দেখল লাবনী। নয়?
না। ওটার শেপ অন্যরকম। দেখতে অন্যরকম হয় মিল্কি ওয়ে।
ওটা যদি মিল্কি ওয়ে না হয়, তা হলে কী? সেক্ষেত্রে নক্ষত্রের মানচিত্রে ওটা দেবে কেন?
মাথা নাড়ল রানা। ওটা আসলে নক্ষত্রের ম্যাপই নয়। আয়নার সামনে চলে গেছে। নক্ষত্র রাখলেও জিনিস অন্য। ওর মুখে ফুটে উঠেছে রহস্যময় হাসি। এবার দেখো কী হয়। তাক থেকে অ্যাটলাস নিল রানা। পাতা খুলে কী যেন খুঁজছে।
যোডিয়াকের প্রতিবিম্ব দেখছে লাবনী। কী দেখব?
এটা। অ্যাটলাস থেকে নির্দিষ্ট ম্যাপ বের করেছে রানা। কাগজে শুয়ে আছে মিশর। ওর আঙুল নামল একটা নদীর ওপর। উত্তর থেকে গেছে দক্ষিণে। কিছু বুঝতে পারছ?
ম্যাপের দিকে তাকাল লাবনী, তারপর দেখল আয়না। কসেকেণ্ড পর আবারও দেখল ম্যাপ। বুঝে গেছে। একই নদী! হায়, আল্লা, ওটা তো নীল নদ!
যোডিয়াক ছাতে থাকলে, দেখতে পাবে উল্টো নীল নদ। কাগজে এঁকে নিলে সাধারণ মানচিত্রে পাবে একই জিনিস।
প্রায় ছুটে গিয়ে যোডিয়াক দেখল লাবনী। নির্দিষ্ট আঁকাবাঁকা রেখায় চোখ। হ্যাঁ, উত্তরদিকে নীল নদের ব দ্বীপ। সেক্ষেত্রে উল্টোদিকে… রানা, অ্যাটলাসটা আনবে?
এগিয়ে লাবনীর জন্যে মানচিত্র খুলে ধরল রানা। তবে আঁকা রেখার সঙ্গে তফাৎ আছে প্রতিবিম্বের।
কয়েক সেকেণ্ড পর বলল লাবনী, একই ব-দ্বীপ নয়। পুরনো আমলের মানচিত্রে আরও নদী ছিল।
নীল নদের সেসময়ে আরও মুখ ছিল, পরে বুজে গেছে, বলল রানা। যোডিয়াকের নদের উজান দেখাল। ওই যে, ভ্যালি অভ কিংস্-এর কাছে বাঁক নিয়ে অন্যদিকে গেছে।
লেক্সান কাঁচে টোকা দিল লাবনী। এই ওসাইরিসের প্রতীক কিন্তু ডেনডারা যযাডিয়াকে ছিল না। এবার বুঝলাম, কোথায় ওসাইরিসের চোখ!
মনে মনে যোডিয়াকের সঙ্গে অ্যাটলাসের মানচিত্র মেলাল রানা। প্রতাঁকের মাথা তাক করা নদের উত্তরে। ওদিকে আছে আল বালায়ানা।
আরও কিছু আছে। একটু দূরের কফি টেবিল থেকে ছবির বই নিল লাবনী। ওটা ছিল প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। উল্টে সঠিক পাতা খুলল। অ্যাবাইদোস। ওসাইরিসের শহর!
ছবিতে বেশ কয়েকটা বিশাল ধ্বংসাবশেষ।
মিশরে যাওয়ার পর খুঁজে নেব রুপালি ক্যানিয়ন, বলল রানা।
মাথা দোলাল লাবনী। সাত মাইলের মধ্যে পড়বে ওই পিরামিড। ওসাইরিসের শহরেই আছে তার দ্বিতীয় চোখ। যোডিয়াকের প্রতীক দেখাত অ্যাবাইদোসকে। হয়তো মুছে গেছে হায়ারোগ্লিফ, বা ছিল বিশেষ কোনও বিন্দু, দেখাত রুপালি ক্যানিয়ন। নিশ্চয়ই অ্যাবাইদোসেই আছে ওসাইরিসের আসল প্রতীক বা চোখ দেখাবে গন্তব্য। অবশ্য, জানি না শহরের কোথায় আছে ওই চোখ। বেলা হয়তো জানে।
তো চলো, ইয়ট ছেড়ে শহরে ফিরি, বলল রানা, দেখছে যোডিয়াক।
ঘন-ঘন মাথা নাড়ল লাবনী। ভাল করেই চেনে রানাকে। না! খবরদার, রানা!
কী? ভুরু নাচাল রানা।
ভুলেও ভাঙচুর চলবে না যোডিয়াক!
এটা না পেলে ওসাইরিসের পিরামিড পাবে না কাদির।
সব তথ্য পেয়েও যখন খুঁজে পায়নি সূত্র। ভবিষ্যতেও পাবে না।
ভাবছ, পিরামিড পেলে মিশরের কর্তৃপক্ষকে বলবে, তখন তারা দেশে ফিরিয়ে নেবে যোডিয়াক? সেজন্যে আগে গ্রেফতার করতে হবে ওই ইমহোটেপকে। বাথরুম দেখাল রানা।
পিরামিড পেলে সহজেই যোডিয়াকসহ ধরিয়ে দেব। পনিটেইল দোলাল লাবনী। যাওয়ার আগে কেবিন থেকে নেব টুকটাক জিনিস। আরও দুইতলা নিচে কেবিন।
ঠিক আছে। কাদিরকে দেখতে টয়লেটে গেল রানা। আগের মতই থম মেরে বসে আছে ধর্মগুরু। আবার কেবিনে ঢুকল রানা। এবার চলো। হাতে উঠে এসেছে রিভলভার।
কিন্তু তখনই ঠক-ঠক শব্দে কেবিনের দরজায় টোকা দিল কেউ!
রানার পাশে পৌঁছে গেছে লাবনী। ফিসফিস করল, এবার? এবার কী করব?
সসসসস! বাথরুমে চাপা আওয়াজ তুলছে কাদির।
দুই লাফে টয়লেটে ঢুকে পাশ থেকে তার কোমরে কষে এক লাথি লাগাল রানা। একদম চুপ, ইমহোটেপ!
কাদির! বাইরে থেকে অধৈর্য স্বরে হাঁক ছাড়ল কেউ। নাদির মাকালানি! প্রেমিক-প্রবর, ভাল করেই জানি ভেতরে আছ। সঙ্গে আমেরিকান ওই সুন্দরী আর্কিওলজিস্ট! ঢুকতে দাও! খট-খট আওয়াজ তুলল তালা মারা দরজার হ্যাণ্ডেল।
ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে ওটার দিকে চেয়ে আছে লাবনী।
এক সেকেণ্ড পর বেডের পাশে পৌঁছুল রানা। গায়ের জোরে ডানহাতে চাপ দিল স্প্রিঙের জাজিমে। কাঁচ-কোচ আওয়াজ তুলছে স্প্রিং। লাবনীর দিকে তাকাল রানা।
বুঝেছে লাবনী, লাল হয়ে গেল দুই গাল। তবে দুসেকেণ্ড পর বেসুরো কণ্ঠে চেঁচাল: না, কাদির! মাই গড, খুলবে না দরজা…
ওদিকে থেমে গেছে হ্যাণ্ডেলের ঝাঁকুনি। নাক দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করল নাদির মাকালানি। গট-মট আওয়াজ তুলে দূরে সরে গেল জুতোর আওয়াজ।
আরও পঁচিশ সেকেণ্ড স্প্রিং ঝাঁকিয়ে কেবিনের দরজার সামনে হাজির হলো রানা। তালা খুলে সামান্য ফাঁক করল কবাট। প্যাসেজে কেউ নেই। লাবনীর দিকে তাকাল। কোন দিকে যেতে হবে?
লজ্জায় রানার চোখে তাকাতে পারছে না লাবনী। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল, সোজা সামনের কোণে। ওদিকে সিঁড়ি আছে।
এসো! রিভলভার হাতে প্যাসেজে বেরোল রানা। আশপাশে কেউ নেই। বামে ধোঁয়াটে কাঁচের দরজার ওদিকে ডেক। আবছাভাবে দেখা গেল মোনাকোর আলো। প্যাসেজ ধরে এগোতেই ডানে পড়ল বাঁক। সাবধানে ওপাশে উঁকি দিল রানা। কেউ নেই। ত্রিশ ফুট দূরে সিঁড়ি। লাবনী, পথ পরিষ্কার!
ওকে অনুসরণ করছে লাবনী। ইয়টের নৈঃশব্দ্যের ভেতর প্রতি পদক্ষেপে খসখস আওয়াজ তুলছে দীর্ঘ ড্রেসের শেষপ্রান্ত। ফিসফিস করল, এজন্যেই আঁটো পোশাক পরি।
সিঁড়ির কাছে থামল রানা। ওপরের ডেকে একাধিক লোক। কথার অস্পষ্ট আওয়াজ। তবে এদিকে আসছে না কেউ।
সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল রানা। দুইডেক নিচে, ঠিক?
হুঁ।
দোতলায় নেমে প্যাসেজের কোনা ঘুরল ওরা। পাশের এক কেবিন থেকে এল পপ গানের জোরালো আওয়াজ। ওই ঘর পেরিয়ে পৌঁছে গেল লাবনীর কেবিনের সামনে। দরজায় তালা দিয়ে যায়নি লাবনী, ওরা ঢুকে পড়ল ভেতরে।
বাথরুমে ঢুকল লাবনী, মাত্র পাঁচ মিনিট পর বেরিয়ে এল স্বাভাবিক পোশাক পরে। গুছিয়ে নিয়েছে সঙ্গে আনা সামান্য কিছু জিনিস। মোবাইল ফোন হাতে বলল, বেলার সঙ্গে কথা বলবে?
না, আগে ইয়ট থেকে নামব, বলল রানা।
তীরে যাব কীভাবে?
বোট ধার করে, করিডোরে বেরোল রানা। এসো।
আবারও পপ গানের কেবিন পেরোল ওরা। এবার গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠবে মেইন ডেকে। প্রথম কাজ হবে বোট জোগাড় করা।
কিন্তু কাজটা অত সহজ নয়!
খুলে গেছে মিউযিক ভরা কেবিনের দরজা। দুই হাতে দুই খালি গ্লাস হাতে বেরিয়ে এসেছে সোনালি চুলের এক তরুণী। থমকে গেল নাকের কাছে রানার রিভলভারের নল দেখে। কিন্তু এক সেকেণ্ড পর লাফিয়ে পেছাল। বিকট চিৎকার ছেড়েই আবারও ঢুকল কেবিনে। চমকে গিয়ে হাউমাউ করে উঠল তার সঙ্গী।
পরস্পরের দিকে তাকাল রানা ও লাবনী।
ভাগো! তাড়া দিল রানা।
ঘুরেই সিঁড়ির দিকে ছুটল ওরা। ওপরের ডেকে উঠতে না উঠতেই বেজে উঠল জোরালো অ্যালার্ম। আরও ওপরের ডেক থেকে এল চিৎকার। হঠাৎ অ্যালার্মের শব্দে অপ্রস্তুত হয়েছে কাদিরের লোক। কিন্তু পাঁচ সেকেন্দ্রে মধ্যে সামলে নেবে।
ধোঁয়াটে কাঁচের দরজার ওদিকে পেছনের ডেক। সংক্ষিপ্ত প্যাসেজে লাবনীকে নিয়ে ছুটছে রানা। পেছনে চিৎকার করে উঠল কে যেন!
সময় নেই থেমে দরজা খুলবে রানা, সরাসরি গুলি করল। ভেঙে ঝনঝন করে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল কাঁচের অসংখ্য টুকরো। ওগুলো মাড়িয়ে একদৌড়ে ডেকে বেরিয়ে এল রানা ও লাবনী।
ওরা ছাড়া ডেকে কেউ নেই। সামনে সিঁড়ি গেছে নিচের মুরিং প্ল্যাটফর্মে। রানার পাশে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করল লাবনী, কোন্ বোট?
যেটাতে চাবি আছে! কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল রানা। একটা দরজা খুলে ওপরের ডেকে বেরিয়ে এসেছে কেউ। তার দিকে গুলি পাঠাল রানা। লুকিয়ে থাকুক লোকটা। ওর ইশারায় সিঁড়ি বেয়ে নামল লাবনী। নিজে কাভার দিতে ওপরে রয়ে গেছে রানা।
ওদিকে ছোটসব জেট স্কি অপছন্দ করেছে বলে বোটের কাছে চলে গেছে লাবনী। অনেক বেশি গতি তুলবে ওগুলো। কিন্তু চাবি নেই ইগনিশনে। একই কথা বলা যায় না আমুন রা-র টেণ্ডারের ব্যাপারে। ওটার ইগনিশনে ঝুলছে চাবি।
লাফিয়ে টেণ্ডারে উঠল লাবনী। রানা, চলে এসো!
ঘুরে টেণ্ডার দেখল রানা।
চালু হয়েছে বোটের ইঞ্জিন। কিন্তু দড়ি খোলেনি লাবনী!
গলা ছাড়ল রানা, আগে দড়ি তো খোলো! ওর গুলির আওয়াজে সতর্ক হয়েছে আমুন রা-র ক্রুরা। কারও ইচ্ছে নেই যে আগে গিয়ে বিপদে পড়বে।
অবশ্য, বেশিক্ষণ থাকবে না সহজ এই পরিস্থিতি। যে কোনও সময়ে হাজির হবে নাদির মাকালানি বা কিলিয়ান ভগলার। তাদের নির্দেশ পেলেই দৌড়ে এসে বোট ডক দখল করবে লোকগুলো। এদিকে রিভলভারে আছে মাত্র চারটে গুলি। এত কম বুলেট নিয়ে শত্রুর দলকে ঠেকাতে পারবে না রানা। কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল। এখনও দড়ির জট খুলতে পারেনি লাবনী।
ওপরের ডেকে বেরোল দুই লোক। কিন্তু রানার হাতে রিভলভার দেখে ডাইভ দিয়ে পড়ল আরেক দিকে। গুলি ঠিকই করেছে রানা, কিন্তু লাগাতে পারেনি কারও গায়ে।
গুলি আছে আর মাত্র তিনটে!
রানা! চিৎকার করল লাবনী। টেণ্ডার থেকে খুলেছে দড়ি। লাফিয়ে গিয়ে পড়ল স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে।
রওনা হও! নির্দেশ দিল রানা।
কিন্তু মাথা নাড়ল লাবনী। সরে যাবে না রানাকে ছেড়ে।
আরে, আমি লাফিয়ে নামব! তুমি রওনা হও!
বিকট গর্জন ছাড়ল টেণ্ডারের ইঞ্জিন। ঘুরেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে গেল রানা, কিন্তু তখনই ভাঙা কাঁচের দরজা দিয়ে ছিটকে এল কিলিয়ান ভগলার। চোখের কোণে তাকে দেখে গুলি পাঠাল রানা। কিন্তু ডাইভ দিয়ে সরে গেছে লোকটা। তার মাথার ওপর দিয়ে গেছে বুলেট।
রানার রিভলভারে আছে মাত্র দুটো গুলি!
ওপরের ডেকের কিনারায় উঁকি দিল কালো ব্যারেলের এক এমপি-সেভেন। অন হলো লেসার সাইট। তাক করছে। লাল বিন্দু, কিন্তু রানার গুলি সরাসরি লাগল ওই অস্ত্রের স্টকে। হাত থেকে ছিটকে গেল লোকটার এমপি-সেভেন।
হায় রে, রিভলভার! বিড়বিড় করল রানা।
গুলি আছে আর মাত্র একটা!
ওয়ালথার পি.পি.কে. হলে চেম্বারে থাকত একটা বুলেট, ম্যাগাযিনে আটটা। সেক্ষেত্রে রয়ে যেত চারটে বুলেট!
এখন সর্বসাকুল্যে গুলি বলতে একখানা, অথচ সশস্ত্র শত্রু বেশ কজন!
না, এবার সময় হয়েছে লেজ গুটিয়ে পলায়নের!
ঝাঁপ দিয়ে নিচের ধাতব ডেকে পড়েই শরীর গড়িয়ে দিল রানা। ইয়ট থেকে সরে যেতে শুরু করেছে টেণ্ডার। তবে রানা আসবে সে আশায় পুরো থ্রটল খুলছে না লাবনী।
উঠে তীরের মত ছুটল রানা। দৌড়ে গিয়ে ডাইভ দিয়ে পড়বে টেণ্ডারে…
কিন্তু হঠাৎ করেই ভীষণ টলে উঠল রানা। প্রচণ্ড ব্যথায় মনে হলো বিস্ফোরিত হয়েছে ওর মাথা!
কাটা কলা গাছের মত ডেকে ধুপ করে পড়ল ও। এখনও কয়েক ইঞ্চি দূরে ডেকের কিনারা। ডানহাতে চেপে ধরল তীব্র ব্যথার জায়গাটা। চোখের সামনে হাত নিতেই দেখল, পাঞ্জা ভেসে যাচ্ছে তাজা রক্তে। রিভলভারের গুলি চিরে দিয়েছে ওর বাম কানের ওপরে করোটির হাড়।
ছুটবার সময় ডান পায়ের বদলে বাম পায়ে ভর দিলে এতক্ষণে খুন হতো। প্রচণ্ড ব্যথায় চোখ কুঁচকে টেণ্ডারের দিকে তাকাল রানা।
ভীষণ ভয় নিয়ে ওকে দেখছে লাবনী।
ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাত নাড়ল রানা। লাবনী, যাও! পালাও!
কী করবে বুঝতে গিয়ে সময় নষ্ট করেছে, লাবনীর বুকে তাক করা হলো লেসারের লাল বিন্দু।
খুব সাবধানে থ্রটল থেকে হাত সরিয়ে নিল লাবনী।
কাউবয় বুটের ক্লিপ-ফ্লপ শব্দ শুনল রানা। তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে ঘুরে তাকাল। মাত্র দুফুট দূরেই রিভলভার। হাত বাড়াল ওটার দিকে। কিন্তু আগেই তুলে নেয়া হলো অস্ত্রটা। গম্ভীর কণ্ঠে বলল ভগলার, আমার ধারণা, এটা আমার।
নিতে পারো, জিনিস সুবিধার না, চাপা স্বরে বলল রানা। ভীষণ ব্যথায় পৌঁছে গেছে নরকে। মাত্র একটা গুলিই আছে!
ওই একটাই তোমাকে শেষ করতে যথেষ্ট। ট্রিগার টেনে নেয়ায় মৃদু খুট শব্দে ঘুরছে সিলিণ্ডার। খালি বুলেটের খোসা সরিয়ে ঠিক জায়গায় আসছে তাজা বুলেট, ওপরে উঠছে হ্যামার…
না, গাধা! চিৎকার করল কেউ। কাদির ওসাইরিস। তুমি পাগল নাকি! অন্য ইয়ট থেকে দেখছে সবাই!
কিলিয়ান ভগলারের চাপা কণ্ঠ শুনল রানা। তাতে কী? মরুক শালারা! অবশ্য দুসেকেণ্ড পর মৃদু আওয়াজে নামিয়ে নেয়া হলো হ্যামার। মোনাকোর উপকূলে একমাত্র দামি মেগা ইয়ট নয় আমুন রা। এরই ভেতর গোলাগুলির আওয়াজ পেয়েছে অন্যরা। সবার নজর এখন এই ইয়টে।
এদেরকে চোখের আড়ালে সরাও! নির্দেশ দিল কাদির।
বড়ভাইয়ের পাশে থামল নাদির। এদের খুন না করে উপায় নেই। আগেই উচিত ছিল আমার কথা শোনা।
হ্যাঁ, কথা ঠিক। খুনই করব এদের। তবে এখানে নয়। গোলাগুলির শব্দে মোনাকোর পুলিশ এলে ফেঁসে যাব জাহাজ ভরা লাশ…।
মুরিং প্ল্যাটফর্মে আনা হলো টেণ্ডার।
অস্ত্রের মুখে আবারও ডেকে এসে দাঁড়াল লাবনী। ওর দিকে তিক্ত, ঘৃণাভরা দৃষ্টি ফেলল কাদির ওসাইরিস। চাইনি মেরে ফেলতে, কিন্তু উপায় রাখলে না। আগামীকাল রেসের পর যখন মোনাকো ত্যাগ করবে ইয়ট… তখন লাশ হবে তোমরা।
.
১৯.
এ-ই তোমার আতিথেয়তা? বিরক্তির সুরে বলল রানা।
কাদির ওসাইরিসের দিকে চেয়ে আছে লাবনী। মনে মনে বলল, ভাল দিক হচ্ছে, তোমাকে বসতে দেয়ার আগে অন্তত ফ্লাশ করেছে নিজের পয়মাল।
বুকের ঝাল মেটাতে রানা ও লাবনীকে এনে নিজের বাথরুমে গুঁজে দিয়েছে ধর্মগুরু। লাবনীর দুহাত বাঁধা হয়েছে ওয়াশ বেসিনের নিচের পাইপে। ওদিকে নিচু কমোডে বসে আছে রানা। ময়লার পাইপে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা দুই কবজি। তবে নেক টাইয়ের বদলে ওদের জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে দড়ি। পা না বাঁধলেও ওদের ওপর চোখ রাখবে এক লোক। ঠিক হয়েছে, আজ সারারাত যোডিয়াক নিয়ে গবেষণা করবে কাদির ওসাইরিস এবং তার গবেষকদল,
সারারাত আরাম করে বসতে পারোনি, তাই না, রানা? জানতে চাইল কাদির। খুব দুঃখের কথা!
গতরাতে পুলিশের লোক সামলাতে গিয়ে নিঘুম কেটেছে নাদির মাকালানির, ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ ডলল। যোড়িয়াক থেকে কিছুই জানা যাচ্ছে না। সময় নষ্ট করছি আমরা।
ওখানেই আছে সূত্র, বলল কাদির। ওটা পেয়েছে এই মেয়ে। আমরাও পাব।
লাবনীর দিকে চেয়ে বাঁকা হাসল নাদির। লজ্জার কথা, এ যখন কিছু জানল, কান খাড়া রেখেও কিছুই শুনলে না তুমি। যাই হোক, এরা সত্যিই পিরামিডের ব্যাপারে কিছু জানলে, সেটা নির্যাতন করে জেনে নিতে পারব আমরা। ভাইয়ের দিকে চেয়ে টিটকারির হাসি হাসল সে।
কাদির ওসাইরিস বলল, নাদির! নিজেরাই আমরা জেনে নেব কোথায় আছে ওই পিরামিড। কাউকে বাড়তি কোনও ব্যথা দেব না।
ব্যথা সম্পর্কে কতটুকু জানো? বড়ভাইয়ের নাকের ডগায় প্রায় নিজের নাকের ডগা ঠেকিয়ে ফেলল নাদির। রাগে টিপটিপ করে লাফ দিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত গালের পেশি।
দুজনের মাঝে নামল অস্বস্তিকর নীরবতা। তবে কয়েক সেকেণ্ড পর সামান্য পিছিয়ে গেল কাদির ওসাইরিস। নিচু স্বরে বলল, আমরা ঠিকই বের করব ওই পিরামিড। এদের দুজনকে ফেলে দেব সাগরে। তবে তার আগে জরুরি কাজ আছে। প্রথম কাজ ওই রেসে জেতা।
তুমি যাও, অনেকটা অনুমতির সুরে বলল নাদির, আমি এখানেই থাকছি। নিষ্ঠুর হাসি ফুটল ঠোঁটে। পিরামিডের লোকেশন নিয়ে আন্তরিক আলাপ করব ডক্টর আলমের সঙ্গে।
মুখ শুকিয়ে গেল লাবনীর।
মাথা নাড়ল কাদির। সবাই আশা করবে আমার সঙ্গে ওখানে থাকবে তুমি।
তা হলে তাদেরকে বলবে, আমি অসুস্থ।
নাদির, ওসাইরিয়ান টেম্পলের স্বার্থে আমার সঙ্গে যেতে হবে তোমাকে! কড়া চোখে: ছোটভাইকে দেখল কাদির। এবার পিছিয়ে গেল নাদির। অবশ্য, থরথর করে কাঁপছে ঘাড়ের ফোলা রগ। গার্ডের দিকে তাকাল কাদির। আমরা ফেরত আসা পর্যন্ত এদের ওপর চোখ রাখবে।
মাথা দুলিয়ে চেয়ারে বসল গার্ড। সরাসরি দেখছে বাথরুমের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে। কেবিন ছেড়ে চলে গেল কাদির ওসাইরিস ও নাদির মাকালানি।
রেস কখন শেষ? জানতে চাইল লাবনী।
বিকেল চারটেয়, বলল রানা। এখন কটা বাজে?
কাত হয়ে হাতঘড়ি দেখল লাবনী। প্রায় দশটা।
অ্যাই! এমপি-সেভেন তুলে ধমক দিল গার্ড। নড়বে না! কথা বলবে না!
আরও একটু নিচু হয়ে বসে গার্ডের দিকে চেয়ে রইল লাবনী। কিন্তু কয়েক মিনিট পর অন্যদিকে মনোযোগ গেল লোকটার। বন্দিদের ওপর থেকে সরে গেছে অস্ত্রের নল। চোখ দিয়ে কেবিনের দামি সব জিনিস চাটছে লোকটা।
গার্ড দেখছে না বলে বাথরুমে চোখ বোলাল রানা। এক কোণে পড়ে আছে নখ-কাটা কাচি। পিঠে ঠেলা দেয়ায় কাদিরের কনুইয়ের পুঁতো খেয়ে টুকটাক জিনিস পড়ে গিয়েছিল মেঝেতে। ওকে আটক করার সময় এসবই দেখেছে। রানা। কিন্তু নাগালে পাবে না কিছুই। অবশ্য, লাবনীর হাত পাইপে বাঁধা থাকলেও পা দিয়ে স্পর্শ করতে পারবে কাঁচি। কিন্তু ও নড়লেই ওকে দেখবে গার্ড।
ছয় ঘণ্টা সময় পাবে ওরা। তার ভেতরে বের করতে হবে মুক্তির পথ।
অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রায় চারঘণ্টা পর এল সুযোগ।
ওদের গার্ডও রেসিং ফ্যান। একটু পর রেস শুরু হবে বলে চালু করেছে বিশাল বড় প্লামা টিভি। কিন্তু ওটা আছে বেকায়দা অ্যাংগেলে। টিভি স্ক্রিন ও দুই বন্দির ওপর একই সময়ে চোখ রাখতে চেয়ার একটু সরিয়ে নিল গার্ড।
গ্রিড শুরু হওয়ার আগে শোনা গেল দর্শকের চাপা গর্জন। সেই সুযোগে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল রানা, তুমি ঠিক আছ?
হাঁটুর ব্যথায় পাগল হয়ে গেলাম!
আমার কপাল ভাল যে মাথার ব্যথা কমেছে। চট করে গার্ডকে দেখল রানা। বাথরুমে একপলক দেখে আবার টিভির স্ক্রিনে মন দিল লোকটা। লাবনী, তোমার পায়ের আওতার মধ্যে আছে কাঁচি। লোকটা অন্যদিকে চেয়ে আছে, এমন সময়ে আমার দিকে পাঠাতে পারবে?
পারব বোধহয়।
মাথা কাত করে কাঁচি দেখল রানা। যদি পায়ের কাছে পাই, কাজে আসবে।
প্রথমবারেই সফল হতে হবে, না? অস্বস্তি নিয়ে হাসল লাবনী।
ওর দিকে চেয়ে ভরসা দেয়ার হাসি হাসল রানা। কাজটা কোরো রেসিং শুরু হলে। মোনাকোর ট্র্যাকের প্রথম বাঁকে বেশিরভাগ সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তখন হৈ-হৈ করে অনেকে।
আমার লাগবে বড়জোর তিন সেকেণ্ড। গার্ডকে দেখল লাবনী।
মাঝে মাঝে দেখছে লোকটা, তবে বেশিরভাগ সময় চোখ টিভির পর্দায়। ফ্রেঞ্চ ভাষায় ধারাভাষ্য চলছে। মূল রেস শুরুর আগে বিকট আওয়াজে ফর্মেশন ল্যাপ দিচ্ছে গাড়িগুলো।
খুব ধীরে এক হাঁটুর ওপর শরীরের বেশিরভাগ ওজন চাপাল লাবনী। অন্য পা সরাল। ব্যথায় ছিঁড়ে যেতে চাইছে উরুর পেশি। ওর দিকে ঘুরে তাকাল গার্ড। বরফের মূর্তি হয়েছে লাবনী। মনে ভয়, লোকটা বুঝে গেছে কী করছিল ও। সন্দেহ দূর করতে ঘাড় ফোঁটাল। ভঙ্গি নিল, ঘাড়ের ব্যথায় অস্থির। ভুরু কুঁচকে ওকে দেখল গার্ড। তারপর আবার মন দিল টিভিতে।
গাড়ি গ্রিডের যে যার জায়গায় থামতেই উত্তেজিত কণ্ঠে কথা শুরু করল ভাষ্যকার। পা সাধ্যমত সামনে বাড়িয়ে দিল লাবনী। ফিসফিস করল, রেডি?
পায়ের আঙুল সামান্য ওপরে তুলল রানা।
রেসের সবাই পৌঁছে গেছে পযিশনে। সামনে ঝুঁকে চোখ সরু করে টিভি দেখল গার্ড। গর্জে উঠছে সব গাড়ির ইঞ্জিন। আর তখনই জ্বলে উঠল স্টার্টিং বাতি। উন, দিউখ, ত্ৰয়েইস, কয়েত্রে, সাই… এবার উত্তেজনা বাড়াতে বিরতি দিল ভাষ্যকার, পরক্ষণে গলা ফাটাল: আলিয!
দশগুণ আওয়াজে গ্রিড ছেড়ে ছিটকে গেল গাড়িগুলো। রুবিল্যাক, রুবিল্যাক! চিৎকার জুড়ল ভাষ্যকার। আরেকটু হলে উত্তেজনায় চেয়ার থেকে পড়ে যেত গার্ড। আর সব গাড়ির আগে ছুটছে ওসাইরিয়ান টেম্পলের সেরা ড্রাইভার। ওহ! ওহ! চুরমার হয়ে গেল মুলারের গাড়ি!
প্রথম বাঁকে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে কেউ। চেয়ারে প্রায় লাফিয়ে উঠল গার্ড। ওই একই সময়ে হালকা লাথি মেরে ছোট্ট কচি রানার দিকে পাঠিয়ে দিল লাবনী।
টিভিতে যতই আকর্ষণীয় দৃশ্য থাকুক, পেরিফেরাল ভিশনের গুণে চোখের কোণে বাথরুমে নড়াচড়া দেখেছে গার্ড। ঝট করে ঘুরে অস্ত্র তাক করল সে। আগেই পা নামিয়ে কাঁচি আড়াল করেছে রানা। এমপি-সেভেন লাবনীর দিকে তাক করল গার্ড। প্রায় দৌড়ে এসে ঢুকল বাথরুমে। আমি না বলেছি না নড়তে!
ভীষণ খিঁচ ধরেছে! মুখ কুঁচকে ফেলেছে লাবনী। কথা মিথ্যা নয়। অসহ্য ব্যথা সহ্য করতে গিয়ে বেকায়দাভাবে নাড়ছে পা। খুব ব্যথা! দয়া করে গুলি করবেন না! …প্লিয!
অ্যাই মেয়ে, ঠিক হয়ে বোসো!
নির্দেশ পালন করল লাবনী।
অস্ত্রের নল ওর মাথায় ঠেকিয়ে ঝুঁকে হাতের দড়ির বাঁধন দেখল গার্ড। ঠিকই আছে। এবার পরখ করল রানারটা। সবই ঠিকঠাক। একদম নড়বে না! আবার কেবিনে ফিরল গার্ড। বারকয়েক সন্দেহ নিয়ে দেখল রানা ও লাবনীকে, তারপর আবার মন দিল রেসিঙে।
পেয়েছ? ফিসফস করল লাবনা।
ডান পায়ের পাতা তুলে কাঁচি দেখাল রানা। একটু পর ধীরে ধীরে নিজের দিকে সরাতে লাগল কাঁচি। প্রতিবারে বড়জোর এক ইঞ্চি করে। বারবার আগের জায়গায় রাখছে পা, তারপর সুযোগ বুঝে নামছে কাজে। মিনিট খানেক পর প্রায় নিয়ে এল হাঁটুর কাছে।
সবচেয়ে কঠিন কাজ, বিড়বিড় করল রানা। এক পাশে কাত করে সরিয়ে নিল পা। এবার… ঝাঁকি দিয়ে পেছনে নিল হাঁটু।
পলিশ করা মেঝেতে পিছলে গেল কাঁচি, সোজা গিয়ে লাগল পেছনের দেয়ালে। ধরা পড়ার আশঙ্কায় নাক-মুখ কুঁচকে ফেলেছে রানা। তবে টিভি ভাষ্যকারের কণ্ঠ চাপা দিয়েছে কাঁচির তৈরি মৃদু টিঙ্ক আওয়াজ।
রানার টানটান করা হাত থেকে এক ইঞ্চির বিশ ভাগের এক ভাগ দূরে রয়ে গেছে কাঁচি!
মহা মুশকিল! পাইপের ফুলে থাকা একটি জয়েন্টে আটকে গেছে ওর হাতের দড়ি। পেছাতে পারছে না। ওদিকে শরীর উঁচু করে কবজির বাঁধন সুবিধামত করতে চাইলে নড়াচড়া দেখবে গার্ড।
অবশ্য, ওই ঝুঁকি না নিয়ে উপায়ও নেই। পিঠ একটু ওপরে তুলল রানা। তাতে কাজ হলো। বাড়তি ওজনের জন্যে সামান্য ছাড় দিচ্ছে দড়ি। জ্বলছে ছড়ে যাওয়া কবজি। কয়েক সেকেণ্ড পর আঙুল চলে গেল কাঁচির খুব কাছে…
অ্যাই! এক দৌড়ে বাথরুমে এসে ঢুকল গার্ড। ওই একইসময়ে কাঁচি পেল রানা। লুকিয়ে ফেলল তালুর ভেতর। ঠিকমত বসো!
পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে! নালিশ করল রানা। তাতে খেল কোমরে মাঝারি একটা লাথি। আমি প্রস্রাব করব!
বড় বড় দাঁত বের করে হাসল গার্ড। হারামজাদা, ঠিক জায়গাতেই আছিস! আবারও দড়ি পরখ করে দেখল। সন্তুষ্ট হয়ে গিয়ে বসল চেয়ারে।
তুমি ঠিক আছ, রানা? খুব দুঃখ পেয়ে জিজ্ঞেস করল লাবনী। ভাবতে পারছে না, লাথি খেতে হচ্ছে রানাকে।
কোমরে লাথি দিলেও কাঁচি এখন হাতে। সাবধানে দুই ফলা ফাঁক করে নিল রানা। এবার দড়ি কাটতে হবে। সময় লাগবে, লাবনী।
করাতের মত করে কাঁচি ব্যবহার করছে ও। ছোট ফলা। খিচ ধরছে আঙুলে। দড়ি কাটার কাজটা মন্থর গতির। অবশ্য কিছুক্ষণ পর ছিঁড়ে যেতে লাগল দড়ির আঁশ। পেরিয়ে গেল দশ মিনিট। তারপর বিশ। রেসে কুঁদ হয়ে আছে গার্ড। রনি রুবিল্যাক এখনও প্রথম। তবে ওর লেজের কাছে লেগে আছে আরেক রেসার। চারভাগের একভাগ সময় পেরিয়ে গেছে প্রতিযোগিতার। বেশিক্ষণ নেই ফিরবে কাদির ওসাইরিস আর নাদির মাকালানি।
আরও কিছুক্ষণ পর মস্ত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা।
ফিসফিস করল লাবনী, রানা? কাজ শেষ?
হু। একহাতে কাঁচি রেখে, অন্যহাতের আঙুলে দড়ি গুটিয়ে নিচ্ছে রানা। পেয়ে গেল ছেঁড়া অংশ। খুলে নিল এক কবজি। এবার সহজেই মুক্ত হলো অন্য হাত। সমস্যা হচ্ছে, আমরা টয়লেটে, আর ওই লোকের হাতে এমপি-সেভেন। চেষ্টা করো ডেকে আনতে। ভঙ্গি করো আবারও খিচ ধরেছে।
ব্যথায় জোরেশোরে গুঙিয়ে উঠল লাবনী। ছটফট করছে দুপা।
রেসের এমন উত্তেজনাময় মুহূর্তে বাধা পড়তে মহাবিরক্ত হলো গার্ড। তবে উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। মাগী, তোকে না বলেছি না নড়তে! বাথরুমে এসে ঢুকল লোকটা।
ব্যথা! দয়া করো! গাল কুঁচকে ফেলেছে রূপসী লাবনী।
আমার পা শেষ হয়ে গেল! ব্যথা! জীবনে আর কখনও হাঁটতে পারব না!
তোর হাঁটতে হবে কেন? বাঁকা হাসল গার্ড। তুই যাবি সাগরের নিচে! লাবনীর কবজির বাঁধন পরীক্ষা করল। এবার ঝুঁকে দেখতে গেল রানার হাতের বাঁধন।
কিন্তু কবজিতে কোনও দড়িই তো নেই!
অ্যাই…।
ঝট করে উঠে এল রানার হাত, পরক্ষণে লোকটার ডান চোখে গাঁথল কাঁচির ফলা।
ওটার ফলা মাত্র এক ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের, কিন্তু পুরো কাঁচি ঢুকে গেছে করোটির ভেতর। প্রচণ্ড ব্যথা ও শক পাথরের মূর্তি করল গার্ডকে ঝট করে কমোড থেকে উঠেই তার শার্ট খামচে ধরে নিচে টান দিল রানা। গার্ডের মাথা পড়ল ফ্ল্যাশ লিভারের ওপর। ঠাস্ করে ফাটল কপাল। টয়লেটের ভেতর গুঁজে গেল মাথাটা। মেঝেতে সাপের মত মোচড়াচ্ছে দুপা।
মেঝে থেকে এমপি-সেভেন সাবমেশিন গান তুলে নিল রানা, ঝুঁকে খুলে দিল লাবনীর কবজির বাঁধন।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল লাবনী। মরে গেছে?
কমোডের দিকে ঘুরে তাকাল রানা। নিথর হয়েছে গার্ড। নাক পানির নিচে। উঠছে না বুদ্বুদ।
মাথা দোলাল রানা। পরীক্ষা করে দেখল এমপি-সেভেন। ম্যাগাযিনে আছে পুরো বিশটা বুলেট।
এবার কী? জানতে চাইল লাবনী।
গতকাল যা চেয়েছি, তাই করব। গিয়ে উঠব তীরে। খুঁজে নেব বেলাকে। তারপর ভাগব এ দেশ ছেড়ে।
আর ওসাইরিসের পিরামিড?
খুঁজে নেব।
কেবিনে ঢুকে ডেস্কের ওপর থেকে নিজের জিনিসপত্র নিল লাবনী। চলে গেল যোডিয়াকের ঘরে। গতরাতে ওটা নিয়ে গবেষণা করেছে কাদির ওসাইরিস এবং তার দলের লোক। টেবিলে আরও কিছু কাগজ ও ছবি। পছন্দমত একটা ছবি নিয়ে পকেটে রেখে দিল লাবনী। রানাকে বলল, পরে এটা হয়তো লাগবে। যোডিয়াক আর দেখতে দেবে না কাদির।
কেবিনের দরজা থেকে বলল রানা, চলো। সাবধানে কবাট ফাঁক করে দেখল বাইরের করিডোর। পেছনে থাকবে।
করিডোরে বেরিয়ে এল ওরা। মাথার ক্ষতে অ্যাডহেসিভ ব্যাণ্ডেজ আটকে নিয়েছে রানা। কান ও মুখের পাশে লেগে আছে শুকনো, কালো রক্ত।
নতুন করে লাগিয়ে নেয়া হয়েছে সামনের দরজায় ধোয়াটে কাঁচ। আপাতত কবাট খোলা। নিচের ডেকে দেখা গেল সূর্যস্নান করছে বিকিনি পরা কাদির ওসাইরিসের কজন তরুণী প্রেমিকা। তাদের সঙ্গে গল্প করছে ইয়টের তিন ক্রু। মাঝে মাঝে দেখছে টিভির স্ক্রিনে রেস। প্রত্যেকে সশস্ত্র।
সোজা উঠবে ভাসমান কোনও বোটে, লাবনীকে বলল রানা। ইঞ্জিন চালু হলেই দেরি না করে রওনা হবে। ওরা চেষ্টা করবে খুন করতে। দ্বিতীয়বার ধরা পড়লে বাঁচার সুযোগ পাব না। বুঝতে পেরেছ?
মাথা দোলাল লাবনী।
ঠিক আছে, ওয়ান… টু… থ্রি! মেডিটারেনিয়ানের তপ্ত সূর্যের আলোয় বেরিয়ে এল রানা ও লাবনী। একদৌড়ে রেলিং টপকে গেল ওরা। নয় ফুট নিচে ডেক। পায়ে ভীষণ ব্যথা পেল লাবনী, টলমল করতে করতেও সামলে নিল। ওদিকে ব্যাঙের মত পা ছড়িয়ে নেমেছে রানা। লাবনী উড়ে চলেছে পেছনের ডেক লক্ষ্য করে। তীক্ষ্ণ চিৎকার ছেড়েছে এক মেয়ে। অবাক চোখে রানা ও ছুটন্ত লাবনীকে দেখল অন্যরা। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকগুলো। হড়বড় করছে অস্ত্র তুলে নেয়ার জন্যে।
ঘুরে এমপি-সেভেন তাক করল রানা। কর্কশ আওয়াজে গর্জে উঠল অস্ত্রটা। দুই ক্রুর বুক থেকে ছিটকে বেরোল রক্তের লাল ফোয়ারা।
পেছনে আওয়াজ। ঘুরেই নিচের ব্যালকনি লক্ষ্য করে আরেক পশলা বুলেট পাঠাল রানা। অস্ত্র ফেলে বুক খামচে ধরে রক্তভরা বাল্কহেডে আছড়ে পড়ল লোকটা। ওখান থেকে মেঝেতে।
বসে পড়েছিল লাবনী, জিজ্ঞেস করল রানা, ঠিক আছ? মাথা দোলাল লাবনী। তা হলে বোটে গিয়ে ওঠো!
লাবনী দৌড় দিতেই কাভার দিল রানা। চিলের মত চিৎকার জুড়েছে মেয়েরা। এখনও অবাক হয়ে মৃত সঙ্গীদের দেখছে তৃতীয় ক্রু। দুসেকেণ্ড পর তার চোখ স্থির হলো মেঝেতে পড়ে থাকা অস্ত্রের ওপর।
তোমরা সাঁতার জানো? জানতে চাইল রানা।
তিন মেয়ে এবং সেই লোক বারকয়েক মাথা দোলাল।
গুড! তিন সেকেণ্ড পেলে সাগরে লাফ দিতে! এমপি সেভেন তাক করেছে রানা।
যা বুঝবার বুঝেছে ওরা, একদৌড়ে রেলিং টপকে ঝাঁপিয়ে পড়ল পানিতে।
লাবনীর পেছনে যাওয়ার আগে আবারও সুপারস্ট্রাকচারের দিকে অস্ত্র তাক করল রানা। দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। সবুজ জ্যাকেট পরা এক লোক। খামচে ধরল এমপি সেভেনের চার্জিং হ্যাণ্ডেল। কিন্তু তখনই রানার গুলি বুকে নিয়ে ছিটকে ঢুকে গেল পেছনের লাউঞ্জে।
অস্ত্রে মাত্র দুএকটা গুলি, বুঝে গেছে রানা। হাতের এমপি-সেভেন ফেলে মৃত এক গানম্যানের অস্ত্র তুলে নিল ও।
ওদিকে ভয় পেয়েছে লাবনী। ডেকে তুলে রাখা হয়েছে দুই বোট। পালাতে হলে ব্যবহার করতে হবে জেট স্কি। রানা! চালাতে পারো এই জিনিস?
ইয়টের সুপারস্ট্রাকচার থেকে বেরোতে চাইছে কজন ক্রু, তাদেরকে ভয় দেখাতে এক পশলা গুলি পাঠাল রানা। ইঞ্জিন চালু করো! একদৌড়ে পৌঁছে গেল লাবনীর পাশে। আমি ড্রাইভ করছি!
মানা করেছে কে! খুদে ক্রাফটের শক্তিশালী তলস্রোতের সম্পর্কে স্টিকার চোখে পড়েছে লাবনীর। শুকিয়ে গেছে মুখ। এখানে লেখা, লাইফ জ্যাকেট পরে চালাতে হবে!
ওটা ছাড়াই চলবে, জেট স্কির সিটে চেপে বসল রানা। উঠে পড়ো! অস্ত্রটা হাতে নাও! পড়ে যেয়ো না!
এমপি-সেভেনের বাঁট ধরে পেছনের সিটে চাপল লাবনী। আরেক হাতে জড়িয়ে ধরেছে রানার কোমর।
থ্রটল মুচড়ে ধরল রানা। ইয়ট পেছনে ফেলে তুমুল বেগে ছুটল জেট স্কি। পেছনে ছিটিয়ে দিল পিচকারির মত সাদা পানি।
.
২০.
ভিআইপি বক্সে বসে কাঁচে নাক ঠেকিয়ে তুমুল রেস দেখছে কাদির ওসাইরিস। এইমাত্র হুঁই আওয়াজে দূরে গেল রেসের দুই প্রতিযোগীর গাড়ি। এখনও প্রথম জায়গা দখলে রেখেছে রনি রুবিল্যাক। হা! বাম তালুতে ঘুষি বসাল কাদির।
মাত্র গত বছর থেকে প্রাইমারি স্পন্সর হয়েছে। ওসাইরিয়ান টেম্পলের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। আজই হয়তো হবে চ্যাম্পিয়ন স্পন্সর। মোনাকোর রেসের পর দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়কে ওসাইরিয়ান টেম্পলের সুনাম। এরপর নামকরা সব রেসে দল নামাবে তারা।
কাদিরের পাশে বসে আছে নাদির মাকালানি, মোটেও মন দিচ্ছে না রেসে। মোবাইল ফোন বাজতেই কল রিসিভ করল সে। ওদিক থেকে চিৎকার করছে লোকটা। কয়েক সেকেণ্ড চুপচাপ শুনল নাদির, তারপর সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাদির!
বিরক্ত কোরো না! হাতের ইশারায় মাছি তাড়াবার ভঙ্গি করল কাদির ওসাইরিস।
কাদির! আবারও ডাকল নাদির, কণ্ঠে চাপা রাগ। মনোযোগ আকর্ষণ করতে বলল, আমুন রা ইয়ট!
ওটার আবার কী হলো?
বক্সের অন্যরা শুনবে, তাই ভাইকে দূরের কোণে নিয়ে গেল নাদির। মাসুদ রানা আর লাবনী আলম ছাড়া পেয়ে গেছে।
হতভম্ব চেহারা হলো কাদিরের। কী?
আমাদের কয়েকজনকে খুন করে জেট স্কি নিয়ে সরে গেছে।
এটা কখনকার কথা?
কয়েক সেকেণ্ড আগের কথা।
কী করবে ভাবতে শুরু করেছে কাদির ওসাইরিস। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ওদেরকে ঠেকাতে হবে!
দেখছি কী করা যায়। ঘুরে দাঁড়াল নাদির। কানে ঠেকাল মোবাইল ফোন।
তার কাঁধে টোকা দিল কাদির। যা করার গোপনে। ধরে সরিয়ে নেবে। মোনাকোর কেউ যেন না জানে।
সেটা নির্ভর করে ওরা কী করবে। আমুন রা-র ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলল নাদির: ওদেরকে ধরতে লোক পাঠান। টেণ্ডার রওনা হোক, ওরা যাতে আসতে না পারে বন্দরের দিকে। দরকার হলে ইয়ট নিয়ে ধাওয়া করবেন। ঠেকাতে হবে যেভাবে হোক। যে-কোনও মূল্যে! ফোন রেখে বিরক্তির চোখে কাদিরকে দেখল নাদির, তারপর বেরিয়ে গেল ভিআইপি বক্স ছেড়ে।
.
আকাশ পরিষ্কার, তবে বইছে দমকা বাতাস। সাগরে উঠছে মস্তবড় সব ঢেউ। যে-কোনও সময়ে তলিয়ে যাবে হালকা ভেসেল, তাই সাগরে বেরোয়নি সাধারণ জেলেরা। অথচ প্রচণ্ড গতি তুলছে খইয়ের মত পলকা জেট স্কি। যেন রোলার কোস্টারের বগি। বিশাল এক ঢেউ থেকে আরেক ঢেউয়ে ঝাঁপ দেয়ার সময় আকাশে ঝুলছে ওটা।
হায়, আল্লা! খুন হব তো! রানার কানের কাছে চিৎকার করছে লাবনী। পানি চিরে যেতে পারবে না?
কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে দেখল রানা। ধাওয়া করেছে বিশাল ইয়ট আমুন রা! এইমাত্র নামানো হলো স্পিডবোট!
কাদিরের নেভি আসছে! গতি কমালে ধরা পড়ব!
ওদেরকে ছিটকে শূন্যে পাঠাল বড় এক ঢেউ। উড়ন্ত অবস্থায় দিক ঠিক করে নিল রানা। ধড়াস্ করে নেমে এল পরের ঢেউয়ে চড়তে। সামনে আরেকটা ইয়টের স্টার্ন ঘুরে বন্দরের দিকে চলল ও।
একটু দূরে বিলাসবহুল সব ইয়টের ভিড়।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল লাবনী। জেট স্কি যত গতিই তুলুক, এরই ভেতর অনেক কাছে চলে এসেছে স্পিডবোট। রানার কানের কাছে বলল, ওদের স্পিড অনেক বেশি! ধরা পড়ব!
সেজন্যেই তো ওটার নাম স্পিডবোট! জ্ঞান দিল রানা, আরও খারাপ দিক, ওদের কাছে আছে সাবমেশিন গান!
তুমুল বেগে ছুটছে জেট স্কি। একের পর এক রঙিন ইয়ট পাশ কাটিয়ে চলেছে রানা। ওদের সাধ্য নেই যে চিনবে রঙ। সবই ঝাপসা। দূরে কী যেন দেখে সেদিকে চলল রানা।
কী করছ! নার্ভাস কণ্ঠে জানতে চাইল লাবনী। চট করে তাকাল, দূরে সাই করে সরল বন্দরের মুখ। এক সেকেণ্ড পর বুঝল, বন্দর আগের জায়গায় আছে, ওরা চলেছে অন্যদিকে। ওদের দিকে ধেয়ে এল স্পিডবোট।
লাবনী, বললেই নিচু করবে মাথা!
সামনের ইয়টের নাকে প্রচণ্ড বেগে লাগবে জেট স্কি।
ভীষণ ভয় পেল লাবনী। তো লাগলে খুন হব!
ওটার কাছ দিয়ে যাব! ইয়টের বো লক্ষ্য করে ছুটছে হালকা জেট স্কি। তবে আরও কাছে থাকবে অন্য কিছু!
কী বলতে… বাপরে! চমকে গেছে লাবনী।
আরেক ইয়টের স্টার্ন ঘুরে বাঁক নিল লাল বিদ্যুাতি এক পাওয়ার বোট। যাবে সামনের ইয়টের বো-র নাকের কাছ দিয়ে। একপাশে রকেটের বেগে পিছিয়ে পড়ছে সারি সারি ইয়ট। বিকট আওয়াজে ছুটছে পাওয়ার বোট। গতি ঘণ্টায় আশি নট!
হাঁ হয়ে গেল লাবনী। ওরে, বাবা!
এদিকে কাদিরের স্পিডবোটের ড্রাইভার উঁচু করে ধরেছে সাবমেশিন গান।
মাথা নিচু! গলা ফাটাল রানা। হ্যাণ্ডেলবারের নিচে নামিয়ে নিয়েছে মাথা। একই কাজ করল লাবনী, মাথা গুজল রানার কোমরের কাছে।
তখনই সামনের ইয়টের বো পেরোল রানাদের জেট স্কি, আরেকটু হলে চেপে বসত পাওয়ার বোটের স্টার্নে। ওটার পেছনে আসছে এক ওয়াটার স্কিয়ার। তাকে টেনে আনা দড়ি আরেকটু হলে গর্দান নিত রানা ও লাবনীর।
বাঁক নিয়ে প্রচণ্ড বেগে এল কাদিরের স্পিডবোটের ড্রাইভার। ছিটানো পানির কণার জন্যে দেখেনি ওয়াটার স্কিয়ারের নাইলনের সরু দড়ি। দেরি হয়ে গেছে তার। প্রচণ্ড গতির কারণে থুতনির নিচে লাগল টানটান দড়ি। শরীরটা নিয়ে সাঁই করে চলে গেল স্পিডবোট, শূন্যে লাফিয়ে উঠল কাটা মাথা। এক সেকেণ্ড পর ওখানে পৌঁছে গেল স্কিয়ার।
জীবনে প্রথমবারের মত কারও ঘাড়ে দুটো মাথা দেখল রানা। পরক্ষণে সাগরে পড়ে টুপ করে ডুবে গেল বাড়তি মাথা। অনেকটা দূরে চলে গেছে স্পিডবোট। ওদিকে বাঁক নিয়ে থামতে শুরু করেছে পাওয়ার বোট।
জেট স্কির পেছনে আসছে আমুন রা ইয়ট। বন্দরের মুখ লক্ষ্য করে জেট স্কি ঘোরাল রানা। কিন্তু চমকে গেল, বন্দর থেকে বেরিয়ে ওদের দিকেই আসছে আমুন রা-র সবুজ সোনালি টেণ্ডার!
পেছনে আমুন রা, সামনে টেণ্ডার!
মাঝখানে আটকা পড়ছে ওরা!
এক সেকেণ্ড পর সিদ্ধান্ত নিল রানা, আবারও গিয়ে ঢুকবে মিলিয়নেয়ারদের ইয়টের জটলায়। শক্তিশালী সব বোটের গতি বেশি বলেও চট করে এদিক ওদিক সরতে পারবে জেট স্কি। নানান ইয়টের মাঝ দিয়ে এগোবে ওরা। তারপর প্রথম সুযোগেই দৌড় লাগাবে বন্দরে ঢুকতে।
কিন্তু কসেকেণ্ড পরেই দমে গেল রানা। কাজ হবে না ওর প্ল্যানে। বন্দরের মুখ পাহারা দিতে ওদিকে চলেছে আমুন। রা। নামাবে বাড়তি জেট স্কি ও স্পিডবোট। আসছে টেণ্ডার। সবাই মিলে ধাওয়া করবে, উপায় থাকবে না পালাবার।
আমুন রা থেকে আগেই নামিয়ে দেয়া হয়েছে স্পিডবোট। তুমুল বেগে আসছে ওদের জেট স্কি লক্ষ্য করে। বাড়ছে ভারী টেণ্ডারের গতি। নতুন সব ঢেউয়ে পড়ে তৈরি করছে ঘাপ-ঘাপ আওয়াজ।
নতুন কোনও কৌশল চাই।
ভয়ে রানার কোমর জড়িয়ে ধরেছে লাবনী। সরাসরি টেণ্ডারের দিকে জেট স্কি ঘোরাল রানা। কী করো, রানা! ভয় পেয়ে বলল লাবনী, মুখোমুখি হলে খুন হব! সোজা চলেছে ওরা টেণ্ডারের দিকে। ওরা খুনি!
জানি! তা
হলে অন্যদিকে চলো!
বিশ্বাস রাখো আমার ওপর! এঁকেবেঁকে যেতে যেতে সঠিক ঢেউয়ের জন্যে অপেক্ষা করছে রানা।
টেণ্ডারের ডেকে উঠে দাঁড়াল এক লোক। একহাতে শক্ত করে ধরেছে উইণ্ডশিল্ড, অন্য হাতে তাক করছে আগ্নেয়াস্ত্র।
সামনেই রানা দেখল, বড় এক ঢেউয়ের গভীর খোড়ল, ওপাশেই আকাশে উঠছে ঢেউয়ের চূড়া। সরাসরি ওপাশে টেণ্ডার। শক্ত করে কোমর ধরো, লাবনী!
ঢেউয়ের গভীর খোঁড়লে নেমে গেল রানা, মুচড়ে রেখেছে থ্রটল। তীরের মত ছিটকে গিয়ে উঠবে চূড়ায়। ফলে শূন্যে ভেসে উঠবে জেট স্কি।
গুলি করবে কাদিরের লোক, এমনসময় সামনে থেকে উধাও হলো জেট স্কি। দেখা দিল কয়েক সেকেণ্ড পর। টেণ্ডারের বো-র ওপর নেমে এল ধুম করে!
দুহাতের সমস্ত জোর খাটিয়ে হ্যাণ্ডেলবার ধরেছে রানা। জেট স্কির সঙ্গে সঙ্গে কাত হলো লাবনীসহ। ডেকে পড়ে পিছলে চলেছে দ্রুতগামী জলযান। চুরমার করল টেণ্ডারের উইণ্ডশিল্ড, পরক্ষণে ভাঙল নৌযানের একপাশ। আগেই সিটে পিষে দিয়েছে টেণ্ডারের ড্রাইভারকে। অস্ত্র হাতে লোকটা যেন বেসবল, তাকে প্রচণ্ড এক বাড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে জল মোটরবাইক।
সরসর করে পিছলে টেণ্ডারের স্টার্ন পেরিয়ে সাগরে পড়ল জেট স্কি। রানাকে আঁকড়ে ধরেছে বলে পড়ে যায়নি লাবনী। ইমপেলার নতুন করে পানি পেতেই পুট-পুট আওয়াজ তুলল জেট স্কি। নতুন করে রওনা হলো রানা।
ফুল স্পিডে চলেছে টেণ্ডার। ডেক থেকে উঠে ড্রাইভারের লাশ সরাল অন্য লোকটা। ব্যস্ত হয়ে ঘুরিয়ে নিল বোট। কিন্তু চলে গেল সরাসরি স্পিডবোটের গতিপথে। আবারও স্টিয়ারিং ঘোরাতে লাগল সে।
কিন্তু গতি অনেক বেশি, টেণ্ডারের পেটে লাগল প্রচণ্ড গতি স্পিডবোট। বিস্ফোরিত হলো দুই নৌযান। নানাদিকে ছিটকে গেল কাঠ ও ফাইবার গ্লাস। জ্বলন্ত সব টুকরো গিয়ে পড়ল আশপাশের সব ইয়টের ডেকে।
ঘুরে দেখল লাবনী। সাগরে ভাসছে ভাঙা দুই বোটের অসংখ্য জঞ্জাল। ওদিকে খেয়াল নেই রানার। চোখ সরাসরি সামনে। বন্দরের প্রায় মুখে পৌঁছে গেছে আমুন রা। শক্ত করে ধরো!
মস্তবড় ইয়টের ডেকে সবুজ ব্লেযার পরা লোক দেখল লাবনী। তাদের সবার হাতে অস্ত্র! ওরা গুলি করবে!
বাঁধের পাশ দিয়ে চলেছে রানা। আগেই ওদেরকে গুলি করো!
আমি লাগাতে পারব না।
লাগাতে হবে না! মাথার দিকে গুলি করো! তাতেই ভুলে যাবে আমাদের কথা!
অগ্রসরমান ইয়টের দিকে এমপি-সেভেন ঘোরাল লাবনী। চোখ-মুখ কুঁচকে নল তাক করে বলল, কেউ যদি মরেটরে যায়?
মরতে দাও!
ট্রিগারে চাপ দিল লাবনী। ওর হাতের ভেতর লাফিয়ে উঠল সাবমেশিন গান। প্রতিটি গুলি বেরোতেই চাপা খট-খট আওয়াজ তুলছে সাপ্রেসার। একহাতে অস্ত্র ধরেছে বলে প্রায় অসম্ভব তাক করা। কিন্তু অত বড় ইয়ট মিস করাও কঠিন কাজ। আমুন রা-র সুপারস্ট্রাকচারের সাদা গায়ে তৈরি হলো। ছোট সব গর্ত। ঝনঝন করে ভাঙল জানালার কাঁচ। ডেকে ডাইভ দিয়ে পড়ল সবুজ ব্লেযার পরা লোকগুলো।
থামো! থামো! হায়-হায় করে উঠল রানা। কয়েকটা গুলি রাখো! বিপদের খুব কাছে ওরা। বামে তীক্ষ্ণ বাঁক নিল জেট স্কি। কংক্রিটের বাঁধের মাত্র তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে চলেছে। রানা।
এক সেকেণ্ড পর সামনে দেখল বিস্তৃত বন্দর।, তিন দিক থেকে ঘেরা ঝলমলে মোনাকোর ওপর আলো ঢালছে সূর্য। ইনার হার্বারের দিকে চলেছে রানা। বাইরের হার্বারের পাশে তৈরি করা হয়েছে উঁচু প্ল্যাটফর্ম। ওখানে ভিড়বে বাণিজ্য জাহাজ ও লাইনার। তীরে উঠতে হলে রানার চাই নিচু কোনও পিয়ার।
পেছনে চেয়ে চমকে গেল লাবনী। রানা! পালাও। ওদের পেছনেই তেড়ে আসছে আমুন রা। ছুরির মত জল কেটে আসছে উঁচু প্রাউ। অনেক কাছে! আরও জোরে যাও! হায়, আল্লা!
এটা জেট স্কি, জেট ফাইটার না, আর আমি বেচারাও ওলি-আল্লা নই! বলল রানা, ওরা মাথা বের করলে উড়িয়ে দিয়ো!
সিটে বেকায়দাভাবে বসল লাবনী। গায়ের কাছে উঠে এসেছে আমুন রা-র বো। পোর্টসাইডে দেখল এক লোককে। জেট স্কি দেখে ফেলেছে। কিন্তু গুলি করার আগেই লুকিয়ে পড়ল সে। ভয় দেখাতে কয়েকটা গুলি পাঠাল লাবনী।
ঢুকে পড়েছে ওরা ইনার হার্বারে।
উত্তর-পশ্চিম দিকে পছন্দমত জায়গা দেখেছে রানা। কিন্তু ওদিক থেকে আসছে আরেক বিপদ!
ওই বোট কাদির ওসাইরিসের নয়, পুলিশের!
নয় মাস বয়সের শতখানেক বাচ্চার চেয়েও জোরে ওঁয়া ওঁয়া শুরু করেছে সাইরেন। বন্দরের বাইরের দিকে গোলমাল দেখে রওনা হয়েছে পুলিশ। একটা মেগাফোন মুখে ধরে চিৎকার করল এক অফিসার: খবরদার! জেট স্কি, ইয়ট এক্ষুণি থামবে!
প্রায় কেঁদে ফেলল লাবনী: পুলিশ ডিপার্টমেন্টে তোমার কোনও বন্ধু নেই? জেলে যেতে চাই না!
বন্ধু? মাথা নাড়ল রানা। ধরা পড়লে সোজা ভরে দেবে! বেরোতে পারব না দশ বছরেও! তার ওপর এ দেশে ঢুকেছি বেআইনীভাবে!
তা হলে খুন হয়ে গেলাম!
ইয়টের বো-তে এসে দাঁড়াল কয়েকজন। অস্ত্র তাক করছে ওদের দিকে….
আগে গুলি করল লাবনী। ঝটকা খেয়ে পিছিয়ে গেল এক লোক। কাঁধে লেগেছে বুলেট। টিপে দিয়েছে ট্রিগার। একরাশ গুলি লাগল সুপারস্ট্রাকচারের গায়ে। চুরমার হলো। ব্রিজের জানালা। হুইলের পেছনে সরাসরি কপালে গুলি খেল ক্যাপ্টেন। ইট্রুমেন্ট প্যানেলের ওপর পড়ল লাশ। ঠেলা খেয়ে সামনে বেড়ে গেল থ্রটল। ঝটকা খেয়ে গতি বাড়াল মস্তবড় ইয়ট। বাইরের ডেকে ক্রুরা চেষ্টা করছে লাবনী ও রানাকে গুলি করতে। ব্রিজে আর কেউ নেই!
ধাওয়া করে ধরতে গিয়ে দিক পাল্টে নিয়েছে পুলিশের সারেঙ। তার বোটের পেছনের ক্ষুব্ধ পানি পেরোল রানার জেট স্কি। স্টার্নে ওরা দেখল এক অফিসারকে। রাইফেল তুলছে সে। লাবনী, মাথা নিচু করো, সাবধান করল রানা। ঘুরে দেখল লোকটাকে।
না, গুলি না করে অস্ত্র ফেলে বোট থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল অফিসার। দলের অন্যরাও বাদ পড়ল না, যে যেখানে ছিল, রেলিং টপকে ঝাঁপ দিল পানিতে। এক সেকেণ্ড পর পুলিশের অপেক্ষাকৃত ছোট বোটের বুকে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসল আমুন রা। সহজেই মাঝ থেকে টুকরো করল পুলিশের বোট। বিস্ফোরিত হলো ওটার ফিউয়েল ট্যাঙ্ক। আগুনের গোলার ভেতর দিয়ে চলল আমুন রা। যেন ধরেই ছাড়বে জেট স্কিকে। ওদিকে আগুনের মাঝে আটকা পড়ে আমুন রা-র ফোরডেক থেকে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছে সবাই।
এরা কি পাগল? অবাক হয়ে বলল লাবনী।
ব্যস্ত সব জেটির মাঝে ছোট এক পিয়ার দেখেছে রানা। জেট স্কির নাক তাক করল ওদিকে। এখন তেড়ে আসছে না আমুন রা। মনে হয় না কেউ রেস করছে!
কীসের রেস… আমি শুধু গুলি করেছি ওই লোকের কাঁধে!
তাতে আমার আপত্তি নেই!
প্রচণ্ড বেগে ওদের পাশ কাটিয়ে গেল আমুন রা। দেখা গেল ওপরের ডেক থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ল অবশিষ্ট কজন ক্রু। তুমুল বেগে চলেছে মেগা ইয়ট।
সরাসরি সামনে হার্বারের কোণে অত্যন্ত দামি কিছু ছোট ইয়ট। হঠাৎ রেস দেখা বাদ দিয়েছে ওগুলোর লোকজন। তেড়ে আসছে বিশাল এক ইয়ট! চিৎকার ছেড়ে যে যেদিকে পারে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা।
ভাগার জন্যে তৈরি হও! চাপা স্বরে বলল রানা। আধ মাইলের ভেতর থামবে না!
পানি ছেড়ে কর্কশ আওয়াজে কংক্রিটের পিয়ারে চাপল জেট স্কি, পিছলে গিয়ে লাগল সামনের ব্যারিয়ারে। রেসিং সার্কিটে ঢুকে পড়ল রানা জেট স্কি নিয়ে। সরসর করে স্থলে চলেছে জলযান। কারও সাধ্য নেই তাকে এদিক ওদিক নেবে।
ধুম! আওয়াজে করাগেটেড ব্যারিয়ারে লাগল জেট স্কি। কলের পুতুলের মত হ্যাণ্ডেলবারের ওপর দিয়ে উড়ে গেল
রানা ও লাবনী, গিয়ে পড়ল সামনের ট্র্যাকের পাশে।
অদ্ভুত অ্যাক্সিডেন্ট দেখেছে এক রেস মার্শাল, দৌড়ে এল রানা ও লাবনীর দিকে। কিন্তু দুসেকেণ্ড পর হাঁ হয়ে গেল আরও বিচিত্র দৃশ্য দেখে। ত্রিশ নট গতি তুলে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ছোট সব ইয়ট চিড়ে-চ্যাপ্টা করল প্রকাণ্ড এক মেগা ইয়ট। কাত হলো নিজেই। উঠে এল তীরে। বো ঘষে ধূসর ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে চড়াও হলো ব্যারিয়ারের ওপর। উড়ে গেল লোহার ব্যারিয়ার। ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে ট্র্যাক ধরে চলল আমুন রা, যেন সাদা স্টিলের দেয়াল। কর্কশ আওয়াজে শেষে গিয়ে থামল এ্যাণ্ডস্ট্যাত্রে সামনে।
রেসে এখনও প্রথম জায়গা রনি রুবিল্যাকের। প্রচণ্ড বেগে ঘুরবে বন্দরের উত্তরদিকের ট্র্যাকে… কিন্তু হঠাৎ করেই দেখল কোত্থেকে এসে রাস্তা দখল করেছে আকাশছোঁয়া এক সাদা ব্যারিয়ার।
ওদিকে টনক নড়েছে মার্শালদের। উন্মাদের মত ওয়ার্নিং পতাকা দেখাতে লাগল তারা।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে!
ব্রেক প্যাডেলে প্রচণ্ড চাপ দিল রনি রুবিল্যাক। রানা ও লাবনীকে পাশ কাটাল তার গাড়ি। ঘুরতে লাগল চরকির মত। সোজা লেজ দিয়ে আছড়ে পড়ল আমুন রা-র খোলের ওপর। চুরমার হলো ওসাইরিয়ান টেম্পলের আরও সম্পদ। ছিটকে একপাশে গিয়ে পড়ল বিধ্বস্ত গাড়ি। কয়েক সেকেণ্ড পর খুলে গেল ওটার দরজা। টলতে টলতে বেরোল রনি রুবিল্যাক। খুলে ফেলল মাথা থেকে হেলমেট।
হাঁ করে তাকে দেখছে লাবনী।
ওর কনুই ধরে টান দিল রানা। চলো! মনে করো শুরু হয়েছে ম্যারাথন দৌড়! থামবে না এখন!
অ্যাঁ? ওহ্! আরও রেস মার্শাল আসার আগেই রানার পাশে দৌড়াতে লাগল লাবনী। ওই কাজ আপনাদের? সর্বনাশ! হা হয়ে গেছে বেলা আবাসি। টিভিতে দেখাচ্ছে হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি। ট্রাকে কাত হয়ে পড়ে আছে আমুন রা ইয়ট। যা দেখছি, ধ্বংস হয়েছে সব মিলে এক শ মিলিয়ন ডলারের বোট!
কাদির ওসাইরিসকে বলতে চেয়েছি, রানার সঙ্গে লাগলে খরচ বাড়বে, কিন্তু পরে আর বলিনি, জানাল লাবনী।
হোটেলের লবিতে বসে আছে ওরা।
এমনভাবে তৈরি রেস সার্কিট, দর্শকের উপায় নেই ওদিকটা দেখবে। বেরিয়ে আসা কঠিন হয়নি রানা ও লাবনীর জন্যে। তবে সর্বক্ষণ ভয় ছিল, আটকে দেবে পুলিশ।
ওরা ফিরেছে ক্যাসিনো স্কয়ারে। চিনতে পারেনি কেউ।
সব ক্যামেরা তাক করা ছিল রেসের দিকে। বন্দরে কী হচ্ছে, জানত না কেউ। তারপর ট্রাকের সব আকর্ষণ হয়ে উঠল আমুন রা ইয়ট। অবশ্য, এবার একাধিক ইস্যুরেন্স কোম্পানি চাইবে কাদির ওসাইরিসের গর্দান!
আহা, আমাদের বেচারা রনি রুবিল্যাক, মাথা নাড়ল বেলা। সত্যিই চ্যাম্পিয়ন হতো!
ওর সঙ্গে কথা বলেছ? জানতে চাইল রানা।
ফিক করে হেসে ফেলল বেলা। শুধু কি কথাই বলেছি? রানা ও লাবনী চেয়ে আছে দেখে বলল, আপনারা নিশ্চয়ই চাননি ক্যাসিনো বন্ধ হলে সারারাত রাস্তায় বসে থাকি?
তো কী করলে? জানতে চাইল লাবনী।
সোজা গেলাম রনি রুবিল্যাকের সঙ্গে তার ঘরে। বলেছিল আমার সঙ্গে দুপেগ নেবে। কিন্তু পার্স থেকে নিয়ে দ্বিতীয় গ্লাসে ছেড়ে দিলাম কড়া ঘুমের দুটো বড়ি। বিপদে লাগবে ভেবে রেখেছি। শত্রুরা ধরে ফেললে নির্যাতনের আগেই বড়ি খেয়ে মরে যেতাম।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। তারপর খেল রুবিল্যাক ঘুমের ওষুধ মেশানো মদ?
হ্যাঁ।
তারপর?
বোধহয় ভেবেছিল রাতে আমাকে কাছে পাবে। পেলও। ও মেঝেতে ঘুমাল, আর আমি ওর বিছানায়। ভোরে বেরিয়ে এসেছি হোটেল থেকে। আসলেই ভাল ড্রাইভার। নইলে আজ মাথা-ব্যথা নিয়েও এত ভাল রেযান্ট করতে পারত না!
এবার জরুরি বিষয়ে মন দেয়া যাক, পকেট থেকে যোডিয়াকের ছবি বের করল লাবনী। কুঁচকে গেছে ছবি। তবে পরিষ্কার বোঝা যায় রঙ ও সব প্রতীক। আমার ধারণা, জেনে গেছি কোথায় ওই পিরামিড। আছে অ্যাবাইদোসের কাছে। ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগল ও।
কিছুক্ষণ ছবিটা দেখল বেলা, তারপর বলল, যুক্তি আছে। ওই শহরের কাছেই থাকবে ওসাইরিসের সমাধি। যদিও খুঁজে বের করতে পারেনি কেউ। মিশরীয় আর্কিওলজিস্টরা বলেন, ওদিকেই আছে প্রথম রাজ বংশের ফেরাউনদের কবর, তাই ওখানেই ওসাইরিসের শহরের কাছে থাকবে ওসাইরিসের সমাধি। …আপনাদের মনে হচ্ছে ওই পিরামিড পশ্চিম দিকে?
মাথা দোলাল লাবনী।
হতে পারে। পশ্চিমের মরুভূমিতে থাকার কথা পাতাল জগতের পথ। ওদিকেই তলিয়ে যায় সূর্য।
ওসাইরিসের দ্বিতীয় চোখ সম্পর্কে কিছু জানো? জিজ্ঞেস করল লাবনী।
ভুরু কুঁচকে ভাবছে বেলা। দ্বিতীয় চোখ? না। তবে… হঠাৎ করে বিস্ফারিত হলো ওর দুচোখ। ওটা থাকতে পারে ওসেইরেন-এ!
ওটা কী? জানতে চাইল রানা।
ওসেইরেন… একটা দালান। ওটা নাকি ওসাইরিসের সমাধির নকল।
দ্বিতীয় সমাধি, বিড়বিড় করল লাবনী। দ্বিতীয় চোখ। ওটা হয়তো চেয়ে আছে রুপালি ক্যানিয়নের দিকে! রানার দিকে তাকাল। এবার বেরোতে হবে এ দেশ ছেড়ে। নিশ্চয়ই সেজন্যে কোনও ব্যবস্থা আছে তোমার?
মাথা দোলাল রানা। আছে, ভাঙাচোরা এক বোট। আমরা মেডিটারেনিয়ান পেরিয়ে গিয়ে উঠব মিশরের তীরে।
.
নিশ্চিত থাকুন, যারা ঘটিয়েছে এই ধ্বংসলীলা, তাদেরকে যে-কোনও মূল্যে ধরতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করব আমরা, সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলল কাদির ওসাইরিস। সত্যিকারের খেলোয়াড়ি মনের শত কোটি মানুষ, ওসাইরিয়ান টিম ও রনি রুবিল্যাকের জন্যে চিরকালের জন্যে বেদনাযুক্ত আজকের এই কলঙ্কিত দিন! আপনারা ভাবতেও পারবেন না আজ আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি।
শোনা যাচ্ছে, গুলির আওয়াজ পাওয়া গেছে আপনার ইয়ট থেকে, বলল এক সাংবাদিক। খেলোয়াড়ি রিপোর্টের চেয়ে অনেক রসাল খবর পাবে ভাবছে।
রপ্ত করা সমস্ত অভিনয় ক্ষমতা ব্যবহার করে চেহারা নির্বিকার রেখেছে কাদির ওসাইরিস। এমন কিছু আমার কানে আসেনি। যা জেনেছি, সেটা শুনেছি মোনাকো পুলিশের কাছ থেকে। কথা শুনতে এসেছেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে এবার জরুরি কাজে যেতে হবে আমাকে। আবারও ভিআইপি বক্সে ফিরল সে। বোমার মত সব প্রশ্ন ছুঁড়ছে সাংবাদিকরা। কাদিরের পেছনে বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
অপেক্ষা করছিল নাদির মাকালানি ও কিলিয়ান ভগলার।
এবার? জানতে চাইল কাদির।
এ এলাকা থেকে সরে গেছে রানা-লাবনী, তিক্ত মুখে বলল নাদির, মোনাকো পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি। পড়ার কথাও না। মাত্র দশ মিনিটে সীমান্ত পেরোতে পারবে যে কেউ।
আমুন রা-র যে অবস্থা, সর্বনাশ হয়েছে যোডিয়াকের?
না, ওটা এখনও অক্ষত। পুলিশ ওই এলাকা থেকে সরলে আরেকটা জাহাজে তুলে পাঠিয়ে দেব সুইটয়ারল্যাণ্ডে।
হায়, ওসাইরিস, বারকয়েক মাথা নেড়ে চেয়ারে বসে পড়ল কাদির। ওরা পালিয়ে গেল কীভাবে?
কারণ, প্রথম থেকেই ওই মেয়ের প্রতি তুমি দুর্বল, কড়া গলায় বলল নাদির। ছোটভাইয়ের রাগের মাত্রা বুঝতে পেরে চমকে গেছে কাদির। বারবার সাবধান করেছি। কিন্তু মেয়েলোকটাকে তোমার চাই-ই চাই! বিশ্বাসঘাতকতা করল, তোমাকে বললাম তাকে মেরে ফেলতে! কিন্তু আপত্তি আছে। তোমার। এবার মন ভরে দেখো কী হয়েছে!
ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে নাদিরের বুকে তর্জনী তাক করল কাদির ওসাইরিস। খবরদার! এই সুরে আমার সঙ্গে কথা বলবে না!
এসবই হয়েছে তোমার দোষে! গর্জে উঠল নাদির। ভয় পেয়ে দুপা পিছিয়ে গেল কাদির ওসাইরিস। আজ পর্যন্ত যা করেছি, তা টেস্পলের স্বার্থে অথচ বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করে বেঁধে দিলে আমার দুহাত! আরে, ওসাইরিসের পিরামিডের সব নিজেদের কাছে রাখতে হলে রক্ত মাখতে হবে হাতে। রক্ত না ঝরলে কিছুই হয় না! জরুরি কাজে বাধা দিলে বলেই শত্রুর রক্তের বদলে রক্ত গেল আমাদের পক্ষের! গলা একটু নামল নাদিরের। এক পা বেড়ে ডানহাত রাখল বড়ভাইয়ের কাঁধে। কিছুই কি বুঝছ না, কাদির? যদি সব না পাই, কিছুই থাকবে না শেষে। কিন্তু সেটা হতে দেব না। যা করার করতে দাও আমাকে। ওরা পিরামিড পাওয়ার আগেই খুঁজে বের করব ডক্টর আলমকে বাঁচতে দেব না ওকে। তুমি নিজেও জানো, ঠিক কথাই বলছি।
তা ঠিক, মেনে নিল কাদির। আগেই শোনা উচিত ছিল তোমার কথা, নাদির।
চোখে-মুখে সন্তুষ্টি নিয়ে মাথা দোলাল নাদির। তা হলে আমরা একমত। ওদেরকে খুঁজে নিয়ে খুন করব। সরিয়ে নেব পিরামিডের ভেতরের সব।
ঠিক আছে, বলল কাদির।
ছোট্ট একটা সমস্যা আছে, টিটকারির সুরে বলল ভগলার, আমরা জানি না তারা কোথায় আছে। এটাও জানি না, কোথায় ওই পিরামিড।
সেসব জানতে এক্সপার্ট লাগবে, বলল নাদির। এমন কেউ, যে কি না ভাল করেই জানে মিশরীয় ইতিহাস।
লুকমান বাবাফেমি? জানতে চাইল কাদির। মাথা নাড়ল নাদির। বাবাফেমি বড়জোর লাইব্রেরিয়ান। আমাদের চাই প্রথম শ্রেণীর আর্কিওলজিস্ট… একটা চিন্তা আসতেই বাঁকা হাসল সে। সেই লোক এমন কেউ, যার রাগ আছে ডক্টর লাবনী আলমের ওপর। মোবাইল ফোন নিয়ে কল দিল সুইটযারল্যাণ্ডে ওসাইরিয়ান টেম্পলে। মাকালানি বলছি, যোগাযোগ করো নিউ ইয়র্কে ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ এজেন্সিতে… তাদের জানাবে আমি কথা বলতে চাই ডক্টর ম্যান মেটয-এর সঙ্গে।
<