১৬.

ইঙ্গিতে লুসি লরেনের ধ্বংসাবশেষ দেখাল ডাইভার। তারপর বোর্ডে লিখল: আপনারা যখন হামলা চালিয়েছেন, ওরা তখন জাহাজে বম ফিট করেছে।

তারমানে শত্রুপক্ষ আগেই ঠিক করে রেখেছিল, যা খুঁজছিল তা যদি নিতে না পারে তা হলে অন্য কারও হাতে পড়তে দেবে না। 

বম কোথায় আছে, দেখাও, ডাইভারকে বলল রানা।

সাঁতার কাটতে শুরু করল লোকটা, এগিয়ে যাচ্ছে জাহাজের দিকে। ওটার বাইরের দিকের কিছু তক্তা গায়েব হয়ে গেছে, তবে মোটা গুঁড়ি দিয়ে বানানো কাঠামোটা দেখা যায়। কাছে গিয়ে আলো ফেলে দেখিয়ে দিল লোকটা একদিকের তলদেশ। এখান থেকে ভ্যাকুয়ামের সাহায্যে প্রচুর গাদ অপসারণ করা হয়েছে। যেসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন মিশরীয় না, যেমন মাস্কেট, লোহার বেড়ওয়ালা পিপা, পুরনো বুট ইত্যাদি স্তূপ হয়ে পড়ে আছে একপাশে।

রানা দেখল, একটা না, দুটো বম ফিট করা হয়েছে। সংযোগ দেয়া হয়েছে টাইমারের সঙ্গে। আরও কাছে গেল রানা, ডিজিটাল টাইমারটা দেখতে পাচ্ছে এখন। আর দুই মিনিট একান্ন সেকেণ্ড বাকি আছে। প্রতি মুহূর্তে কমছে সেকেণ্ডের হিসেব।

তক্তার ফাঁক দিয়ে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিল রানা, শরীর টানটান করে দিয়েছে, বোমাটার নাগাল পেতে চায়। কিন্তু পারল না। দুফুট দূরে রয়ে গেছে ওটা।

সোহেল, ডাকল ও, তোর সাহায্য লাগবে।

টাইমার যখন বলছে বোমা ফাটতে আর দুমিনিট বাকি, আর.ও.ভি.-সহ তখন হাজির হলো সোহেল। একটা ম্যানিপুলেটর আর্ম আছে রোবটটাতে, সুইচ টিপে ওটা চালু করল সোহেল। কিন্তু যন্ত্রের বর্ধিত বাহুও ওদের উদ্দেশ্য সাধনে সফল হলো না।

এমন সময় কিছু একটা দিয়ে মৃদু আঘাত করা হলো রানার পিঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ও। বোমার কথা জানিয়েছে যে-ডাইভার, হাতে ভ্যাকুয়াম পাইপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ওটা দিয়েই বাড়ি মেরেছে রানার পিঠে।

চমৎকার আইডিয়া, বলল রানা।

ভ্যাকুয়াম কাজ করছে এখনও। পাইপটা জাহাজের পাঁজরার ভিতরে ঢুকিয়ে দিল রানা। ওটা একদিকে এমনভাবে কাত করে রেখেছে যে, ভ্যাকুয়ামের টানে বোমাটা ঢুকে যাবে না ভিতরে, বরং পাইপের মুখে আটকে থাকবে। হলোও তা-ই। পাইপ কিছুটা চেপে ধরল রানা-ভ্যাকুয়ামের জোর কমিয়ে দিচ্ছে, একইসঙ্গে একটু একটু টেনে বের করে আনছে পাইপটা।

বোমাটা বের হওয়ামাত্র ওটা পাইপের মুখ থেকে আলগা করে নিল সোহেল। অভ্যস্ত হাতে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ইলেকট্রিকাল লীডগুলো সরিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দিল ওটা। বন্ধ করে দিল টাইমারও। আর চল্লিশ সেকেণ্ড বাকি ছিল। চল দ্বিতীয় বোমাটার ব্যবস্থা করি এবার।

ও বলার আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছে রানা। ভ্যাকুয়াম পাইপ আগেরবারের মতো নিয়ে গেছে বোমার কাছে, পাইপের একটা পাশ চেপে ধরে ওটার মুখে আটকে ফেলার চেষ্টা করছে বোমাটা। কিন্তু পারল না এবার-তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে জাহাজের কাঠের সঙ্গে বাড়ি খেল ওর হাত, ছুটে গেল পাইপ। ভ্যাকুয়ামের টানে পাইপের ভিতরে সেঁধিয়ে গেল বেইযবল আকারের বোমা, রানা বা সোহেল কিছু করার আগেই সোঁ করে উঠে গেল পাইপ বেয়ে উপরে।

নব্বই ফুট উপরে, যেখান থেকে আলোর একটুখানি আভা ভেদ করে নেমে এসেছে পাইপটা, সেদিকে তাকিয়ে আছে রানা আর সোহেল।

যা ঘটল তা একটা দুর্ঘটনা।

এবং বোমাটা বিস্ফোরিত হতে আর মাত্র আধ মিনিট বাকি।

.

বার্জের ইনচার্জের নাম জাওয়াদ। বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ করছে সে, কেবল লবণপানি আছড়ে পড়ছে ছাঁকনির গায়ে; না আসছে গাদ, না আসছে অন্যকিছু। তারপরও সন্তুষ্ট সে-প্রথমদিনই কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে কাজ। উদ্ধার করা হয়েছে বেশকিছু জিনিস, তবে ওগুলো মামুলি বলে মনে হয়েছে জাওয়াদের কাছে। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে এই বলে, বড় মাছ জালে পড়তে সময় নেয়।

তবে জাওয়াদ যে ফুরফুরে মেজাজে, তা কিন্তু না। কাছ দিয়ে তো বটেই, দূর দিয়েও যখন কোনও জাহাজ যাচ্ছে, বুকের ধুকপুকানি টের পাচ্ছে সে। বার বার মনে হচ্ছে ওর, হাজির হয়ে গেছে মাল্টা কোস্টগার্ডের পেট্রোল ভেসেল।

ছাঁকনিটার কাছে এগিয়ে গেল জাওয়াদ। ঠিক তখনই ভ্যাকুয়ামের টানে টাইমবোমাটা উঠে এল সাগরের তলদেশ থেকে। চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল সে, ভয়ঙ্কর একটা বিস্ফোরণ স্তব্ধ করে দিল ওকে চিরদিনের জন্য।

শকওয়েরে ধাক্কায় উড়ে গেল জাওয়াদ আর ওর সঙ্গে বার্জে-থাকা আরেকজন। উড়ে গেল গ্রেইট, কম্প্রেসর আর বার্জের কাঠামোর বড় একটা অংশও।

একদিকে কাত হয়ে গেছে বাজটা। গলগল করে পানি ঢুকছে ওটার খোলসের ভাঙা অংশ দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যাবে।

বার্জের একজন মাত্র লোক, অলৌকিকভাবে, বেঁচে গেছে। কান ভোঁ ভোঁ করছে ওর, মাথা ঘুরাচ্ছে, বুঝেও যেন বুঝতে পারছে না বার্জের কাঠামো উল্টে গেলে ওটার নিচে চাপা পড়ে সলিলসমাধি ঘটবে ওর। শেষমুহূর্ত যখন এসে গেছে, সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে; অন্য বোটটার উদ্দেশে সাঁতার কাটছে।

.

ডিসুজা কনরভেন্সির ডাইভ-ল্যাডার ঘেঁষে পানির উপর নিঃশব্দে মাথা তুলল রানা। কারা যেন উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলছে বোটে। কিছুটা দূরের পানিতে প্রায় তলিয়ে গেছে বাজটা।

রানার উল্টোদিকে আর.ও.ভি.-সহ ভেসে উঠল সোহেল, বোটের রাইফেলওয়ালাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। এ ব্যাপারে প্ল্যান করেছে পানির নিচে থাকতেই।

ঘটনা ঘটল পরিকল্পনা মাফিক।

ডেকে ছুটন্ত পদশব্দ শুনতে পেল রানা। তারমানে সোহেল যেদিক দিয়ে দেখা দিয়েছে, সেদিকের রেইলিঙের কাছে দৌড়ে যাচ্ছে রাইফেলওয়ালারা।

নিঃশব্দে কিন্তু দ্রুত বোটে উঠে পড়ল রানা।

সোহেলের দিকে অস্ত্র তাক করছে দুজন রাইফেলওয়ালা, রানার দিকে উল্টো ঘুরে আছে ওরা। ওদেরকে সুযোগ দিল না রানা। সঙ্গে করে আনা আণ্ডারওয়াটার রাইফেল তুলল কাঁধে, শীতল কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ কণ্ঠে বলল, অস্ত্র ফেলে দাও সাগরে, দুজনই।

বরফের মতো জমে গেছে দুই রাইফেলওয়ালা। বার্জ থেকে সাঁতার কেটে যে-লোক হাজির হয়েছিল বোটে, রেইলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল সে-ও; সঙ্গীদের মতো অবস্থা হয়েছে ওরও।

ঘাড় একটুখানি ঘুরিয়ে চোখের কোনা দিয়ে রানাকে দেখল দুই রাইফেলওয়ালা, তারপর সাগরে ফেলে দিল ওদের অস্ত্র।

দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ো ডেকে, আদেশ দিচ্ছে রানা। কপাল আর মুখ ঠেকিয়ে রাখবে ডেকের সঙ্গে।

যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে শুয়ে পড়ল ওরা তিনজন।

 রানা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে পুরো বোট কভার দিতে পারছে; ওকে বোটের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেখে কাছে এল সোহেল, উঠে পড়ল ডেকে। একটা আণ্ডারওয়াটার রাইফেল আছে ওর হাতেও। ওটা তাক করল প্রতিপক্ষের তিন লোকের দিকে, রানাকে বলল, আমি কভার দিচ্ছি এদেরকে। তুই ডাইভ মাস্টারের খোঁজ কর।

খোঁজ করতে হলো না, পাশা পাল্টে গেছে বুঝে হুইলহাউস থেকে গোঁ গোঁ আওয়াজ করে নিজের উপস্থিতির জানান দিল লোকটা। ঘটনা কী ঘটেছে আঁচ করে নিল রানা, রাইফেল কাঁধে ঝুলিয়ে ছুরি হাতে ঢুকল হুইলহাউসের ভিতরে। দড়ির বাঁধন কেটে দিল ডাইভ মাস্টারের হাত পায়ের। কতগুলো বাক্সের আড়ালে ফেলে রাখা হয়েছিল লোকটাকে, ওগুলো সরিয়ে বের করে আনল ওকে। গোঁজ বের করে নিল লোকটার মুখ থেকে।

আমার লোকদেরকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডুব দিতে বাধ্য করেছে ওরা, ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর বয়সী লোকটা।

চিন্তার কিছু নেই, আশ্বাস দিল রানা। ওদের কারও ক্ষতি হয়নি। কী ঘটেছে, তা জানাল সংক্ষেপে।

হায়, হায়! বাৰ্জটা উড়ে গেছে? ওখানে আমাদের ডিকম্প্রেশন ট্যাঙ্কটা ছিল। আমার ডাইভাররা তো মারা পড়বে।

আমাদের বোটে ডিকম্প্রেশন ট্যাঙ্ক আছে। খবর দিচ্ছি, এখনই চলে আসবে। রেডিওতে যোগাযোগ করল সি-হর্সের সঙ্গে।

কিন্তু ডিসুজা দম্পতির কী হবে?

ডিসুজা দম্পতি? ডাইভ মাস্টারের কথা বুঝতে পারেনি রানা।

মাথা ঝাঁকাল লোকটা। আমরা আসলে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মাল্টার নদী, জঙ্গল, বন্দর ইত্যাদি নিয়ে কাজ করি। যারা বন্দি করেছিল আমাকে, জিম্মি করেছিল আমার ডাইভারদের, তাদের আরও কিছু লোক পাকড়াও করেছে আমাদের মালিক আর তার বউকে। ওরাই ডিসুজা দম্পতি।

গম্ভীর হলো রানার চেহারা। ব্যাপারটা বুঝতে পারা উচিত ছিল আমার। হুইলহাউস ছেড়ে বের হলো, এগিয়ে গেল ডেকে শুয়ে-থাকা তিন লোকের দিকে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল একজনের পাশে, রাইফেলের নল ঠেকাল লোকটার পিঠে। যার পা চাটো তার নাম কী?

হুসাইন আখতার, একটুও ইতস্তত না করে বলে দিল লোকটা, বোঝা গেল পা চাটার ইচ্ছার চেয়ে জানের মায়া বেশি ওর।

ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে কীভাবে?

আমার ব্যাকপ্যাকে স্যাটেলাইট ফোন আছে।

ফোনটা বের করল রানা। আখতারের নম্বর বলো। উনিশ-বিশ কিছু করবে না।

উনিশ-বিশ পরের কথা, উনিশ থেকে সোয়া উনিশও করল না লোকটা। বাটনগুলো চাপার সময় নম্বরটা মুখস্থ করে ফেলল রানা।

তোমাদের অগ্রগতি কতদূর? ফোনের স্পিকারে শোনা গেল একটা কর্কশ কণ্ঠ।

ডিসুজা দম্পতিকে জিম্মি করেছ তুমি?

নীরবতা।

অপরিচিত একটা কণ্ঠ এবং অপ্রত্যাশিত একটা প্রশ্ন শুনে থমকে গেছে ওপ্রান্তের লোকটা।

কিছুক্ষণ পর বলল, কে তুমি?

মাসুদ রানা।

আবারও নীরবতা। ওপ্রান্তের লোকটা বুঝতে পারছে না কী বলবে। যে-কোনও কারণেই হোক ফোনের লাইনও কাটতে পারছে না।

আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি, মনে করিয়ে দিল রানা।

 সেটা দিতে আমি বাধ্য নই।

ভুল বললে, হুসাইন আখতার। লুসি লরেন থেকে উদ্ধার-করা আটিফ্যাক্টগুলো যখন আমার হাতে, তখন আমার কথামতো অনেককিছু করতেই তুমি বাধ্য।

আখতারকে বাজিয়ে দেখার জন্য মিথ্যা বলেছে রানা, লোকটা চুপ হয়ে যাওয়ায় বুঝল জায়গামতো টোকা দিয়েছে।

গজব পড়ল নাকি তোমার উপর? সুযোগ পেয়ে টিটকারি মারল রানা। হঠাৎ ব্রেইনস্ট্রোকে মুখটা বাঁকা হয়ে যায়নি তো? শুনছ?

শুনছি।

বলছিলাম, মিশরীয় যেসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়ে কি চলে যাব? আরও সুতো ছাড়ছে রানা। সবুজ রঙের একটা লম্বাচওড়া লোককে দেখা যাচ্ছে একটা লিপিফলকে, জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে মরা মানুষ জীবিত করছে সে।

আবারও কিছুক্ষণের নীরবতা।

লিপিফলকটা…পেয়েছ তুমি?

জী, জনাব। এবং একটা না, তিনটা।

তা হলে এসো একটা চুক্তি করি।

 শুনছি।

লিপিফলকগুলো আমার হাতে তুলে দেবে তুমি, বিনিময়ে ডিসুজা দম্পতিকে নিয়ে যাবে।

জীবিত?

হ্যাঁ, জীবিত।

কোথায় আসতে হবে?

সেইন্ট পিটারস পুল উপসাগর।

উপসাগর? সৈকতে রোদ পোহাচ্ছ নাকি?

এলেই বুঝবে।

.

১৭.

 ছুটছে সি-হর্স।

ওটার রেইলিঙের সঙ্গে কষে বাঁধা হয়েছে আটক-করা তিন লোককে। ওদেরকে ইঙ্গিতে দেখিয়ে লামিয়া বলল, আখতার যখন দেখবে লিপিফলকের বদলে ওরই তিন চামচাকে নিয়ে গেছ, তখন কী করবে?

গুলি চালাবে, শান্ত গলায় বলল রানা।

আমরা কী করব?

নব্বই রাউণ্ড বুলেটসহ দুটো একে ফোর্টি সেভেন আর দুটো আণ্ডারওয়াটার রাইফেল দিয়ে যতটুকু যা করা যায়, বলল সোহেল।

আমার কাছে এক্সট্রা ক্লিপসহ একটা বেরেটা নাইন মিলিমিটার আছে, বলল লামিয়া। সবমিলিয়ে আঠারোটা বুলেট।

আর আমার কাছে আছে সি-ফোর–প্ল্যাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, বলল রানা। আচ্ছা, লামিয়া, সেইন্ট পিটারস পুল বের স্যাটেলাইট ইমেজ পাওয়া গেছে?

গেছে, পোর্টেবল মোডেম ব্যবহার করে ওই জায়গার স্যাটেলাইট ইমেজ নামিয়েছে লামিয়া নিজের ল্যাপটপে, ওটা তুলে দিল রানার হাতে।

সাগরসৈকতটা বোঝা যাচ্ছে সহজেই। দেখতে অনেকটা অশ্রুর ফোঁটার মতো। আশপাশে চুনাপাথরের ছোটখাটো পাহাড়। এককোনায় পেয়ালা আকৃতির উপসাগরটা। রোদের কারণে ফিরোজা রঙ ধারণ করেছে সাগরের পানি। চুনাপাথরের পাহাড়গুলোর ঢালে কয়েকটা বহুতল দালান। সারি করে বানানো ব্যালকনিও দেখা যায়। সেতুর মতো দেখতে একটা স্থাপনা সৈকত থেকে এগিয়ে গেছে বাড়িগুলোর দিকে।

পরিত্যক্ত কিছু হোটেল, বলল লামিয়া। গেস্টরা যাতে সহজেই হোটেল থেকে সৈকতে যেতে পারে সেজন্য একসময় ব্যবহৃত হতো ওই সেতু।

এবং ওটাই সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে আমাদের জন্যে, বলল রানা। ওদের স্নাইপার ওখানে পজিশন নিয়ে থাকতে পারে। লোকটাকে, সৈকত থেকে দেখতে পাব না আমরা।

ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল লামিয়া। স্নাইপার?

ডারহাম যেভাবে মরেছে তা মনে করিয়ে দিল রানা।

লোকটা পাহাড়ের উপরেও থাকতে পারে, বলল সোহেল।

কোনও হোটেলের ছাদেও থাকতে পারে, বলল লামিয়া।

ওই ব্যাপারে আর কিছু না বলে অশ্রুবিন্দুর এককিনারায় যুম করল রানা। বোঝা যাচ্ছে, সবচেয়ে কাছের জনবহুল এলাকার সঙ্গে পরিত্যক্ত হোটেলগুলোর দূরত্ব যথেষ্ট। সড়কপথে যোগাযোগের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ধূলিধূসরিত সরু একটা রাস্তা। একদিকের একটা চুনাপাথরের পাহাড়ের ঢাল কেটে বানানো আঁকাবাঁকা সিঁড়ি ছাড়া সৈকত থেকে ওই রাস্তায় যাওয়ার আর কোনও পথ নেই।

রেইলিঙের সঙ্গে বাঁধা লোকগুলোকে আবারও ইঙ্গিতে দেখাল লামিয়া। ওদেরকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

লাভ হবে না, বলল রানা। নিজের লোকদের খুন করতে দ্বিধা করে না ওরা। তা ছাড়া আমার মনে হয় না আমরা উপসাগরে ঢোকামাত্র আমাদের উপর হামলা করবে ওরা। আগে আর্টিফ্যাক্টগুলো পেতে চাইবে, দেখতে চাইবে। ডেকের উপর পড়ে-থাকা স্কুবা ট্যাঙ্ক, হোস, বোট হুক আর দড়িদড়ার উপর নজর বুলিয়ে নিল।– কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, একটা আইডিয়া এসেছে মাথায়, কিন্তু কতখানি কাজে লাগবে জানি না।

.

ফ্লাইব্রিজে চালকের ভূমিকা পালন করছে সোহেল। সি-হর্স এগিয়ে চলেছে সেইন্ট পিটারস পুল বের নিরালা সৈকতের দিকে। স্কুবা ট্যাঙ্ক আর অন্যান্য হাবিজাবি জিনিস একসঙ্গে জড়ো করে একটা বাঙ্কারের মতো বানিয়ে ফেলেছে রানা।

বুলেট লাগামাত্র উড়াল দেবে ওগুলো, আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে লামিয়ার কণ্ঠে।

আমি কিছু কারিগরি ফলিয়েছি. এগুলোর ওপর, বলল রানা, ফলে পুরু হয়ে গেছে এগুলো, জরুরি মুহূর্তে কভার নিতে পারব। আর সোহেলের ক্রোস-নেস্টটাকে রীতিমতো দুর্গ বানিয়ে দিয়েছি।

উপসাগরে ঢুকছে সি-হর্স।

লামিয়ার দিকে তাকাল রানা। তুমি বরং কোথাও লুকিয়ে পড়ো। ওরা এখনও কিছু জানে না তোমার ব্যাপারে।

আমার দেশের জন্য লড়াই করবে তোমরা, আর সে লড়াইয়ে যোগ না দিয়ে আমি থাকব লুকিয়ে? জীবনেও না!

আমি আসলে লুকিয়ে পড়া বলতে আড়ালে চলে যাওয়া বুঝিয়েছি। সি-হর্সের পেছনদিকে স্কাইলাইটওয়ালা অ্যাট কেবিন আছে, ওখানে যাও। ল্যাচটা লক কোরো না, পরে দরকার হলে সাহায্য করতে পারবে আমাদের।

অ্যাফট কেবিনে কেন?

সি-হর্সের পিছনটা গুণ্ডাদের দিকে দিয়ে উপসাগরে ঢুকব আমরা, বলল সোহেল। অবস্থা বেগতিক দেখলে যেন পালাতে পারি।

মেনে নেয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল লামিয়া। মনে থাকে যেন, এ-ই শেষবার। এরপর আর আমাকে তাড়াতে পারবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরেটা হাতে নিয়ে গিয়ে ঢুকল অ্যাট কেবিনে।

সাগরের বুকে মাথা তুলে আছে কতগুলো বিশাল প্রবালপ্রাচীর, আসলে ওগুলোই সাগর থেকে আলাদা করেছে উপসাগরটাকে। প্রাচীরগুলোর কাছে সি-হর্সকে একবার চক্কর খাওয়াল সোহেল, বোটের নাক সাগরের দিকে রেখে সৈকতের দিকে পিছিয়ে নিচ্ছে ওটাকে, ঢুকছে উপসাগরে।

কয়েকটা অক্সিজেন ট্যাঙ্কের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে রানা, হাতে একে ফোর্টি সেভেন। দূরের ওই সেতু আর চুনাপাথরের পাহাড়গুলো দেখছে, বোঝার চেষ্টা করছে ওখানে কোথাও বিপদ লুকিয়ে আছে কি না।

অস্ত্র হাতে দেখতে পাচ্ছি তিনজনকে, আওয়াজ দিল সোহেল, ব্রিজের পাশে কংক্রিটের ডকে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার এককোনায় দুটো গাড়িও দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনও বোট নেই।

একটা হোটেলের ছাদে একজন স্নাইপারকে দেখতে পেয়েছি, বলল রানা। রোদ লেগে ঝিক করে উঠেছে একটা টেলিস্কোপিক লেন্স। লামিয়া ঠিকই অনুমান করেছে।

সি-হর্সকে আরও পিছিয়ে নিচ্ছে সোহেল। ওটার স্টার্ন কংক্রিটের-ডকের সঙ্গে আলতো ধাক্কা খেল একসময়। উক থেকে সিঁড়ি এগিয়ে গেছে ব্রিজের দিকে। আরেকদিকে দেখা যাচ্ছে একটা পরিত্যক্ত মেইনটেন্যান্স শ্যাক, দেখভালের অভাবে হতশ্রী হয়ে গেছে নিজেই।

ডকে দাঁড়িয়ে-থাকা তিন লোকের একজন হাতে দড়ি নিয়ে এগিয়ে এল।

বাঁধা পড়তে আসিনি আমরা, স্কুবাট্যাঙ্কের আড়াল থেকে চেঁচিয়ে বলল রানা, দুটো ট্যাঙ্কের মাঝখানের সরু ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে আছে। হুসাইন আখতার কোথায়?

শ্যাকের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল মোটা আর গাঁট্টাগোট্টা এক লোক। চোখে সানগ্লাস, চুল কাটিয়েছে মিলিটারি ছাঁটে। সানগ্লাস ওর চোখ আড়াল করতে পেরেছে, চেহারার বিরক্তি ঢাকতে পারেনি।

লাজুক-লতা ইস্তিরীলোকের মতো লুকিয়ে থেকে কথা বলছ কেন? কর্কশ ভারী কণ্ঠে বলে উঠল সে। উঠে দাঁড়াও, তোমার নূরানী চেহারাটা দেখি।

অবশ্যই। তবে তার আগে তোমার স্নাইপারকে রাইফেল ফেলে দিতে বলল।

কীসের স্নাইপার?

হোটেলের ছাদে যে আছে।

রানা দেখল, আখতারের চেহারার বিরক্তি বেড়েছে। কিছু বলছে না লোকটা। সম্ভবত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।

তোমার স্নাইপার হয় রাইফেল ফেলবে, বলল রানা, নয়তো চলে যাব আমরা। এত সাধের আর্টিফ্যাক্ট দেখতে পাবে না আর।

রানার কথার গুরুত্ব বোঝাতে থ্রটলে চাপ বাড়িয়ে সি হর্সের ইঞ্জিনে গর্জন তুলল সোহেল।

মুখের কাছে রেডিও তুলল আখতার, কী যেন বলছে।

কিছুক্ষণ পর একটা হোটেলের ছাদে সিধে হয়ে দাঁড়াতে দেখা গেল এক লোককে, হাতে ভারী রাইফেল। ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। সৈকতের বালিতে এসে পড়ল অস্ত্রটা।

সন্তুষ্ট? জিজ্ঞেস করল আখতার।

হব, যদি ওই লোকের কাছে অন্য কোনও রাইফেল অথবা তোমার অন্য কোনও স্নাইপার না থাকে। উঠে দাঁড়াল রানা।

ওর হাতে একটা আণ্ডারওয়াটার রাইফেল। ডকে দাঁড়িয়ে থাকা তিন গুণ্ডার হাতেও একই জিনিস, তাক করে রেখেছে। রানার দিকে। হাফহাতা শার্টের উপর শোন্ডার হোলস্টার পরে আছে আখতার, সেটাতে একটা পিস্তল আছে।

ডিসুজা দম্পতি কোথায়? জিজ্ঞেস করল রানা।

আগে আর্টিফ্যাক্ট, যেন দাবি করছে এমনভাবে বলল আখতার।

আরও একবার গর্জন করে উঠল সি-হর্সের ইঞ্জিন।

মুখের কাছে আবারও রেডিও তুলতে বাধ্য হলো আখতার।

চোখের কোনা দিয়ে ব্রিজের একদিকে নড়াচড়া দেখতে পেল রানা। পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে দুজন বুড়ো-বুড়িকে নিয়ে আসা হচ্ছে ব্রিজের শেষমাথার দিকে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বেচারাদের, কারণ তাদের পায়ে শেকল বাঁধা। যেদিকে যাচ্ছেন তারা সেদিকে কোনও রেইলিং নেই, অথবা কোনওকালে থাকলেও এখন গায়েব।

আংটার মতো দেখতে একটা কী যেন বুড়ো লোকটার হাতে। জিনিসটা ভারী, কারণ ওটা বহন করতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। আরেকটা শেকল দিয়ে ওটা বেঁধে দেয়া হয়েছে তাঁর অন্য পায়ের সঙ্গে।

বুড়োবুড়িকে শেকল পরিয়ে দিয়েছে ওরা, চাপা গলায় সোহেলকে বলল রানা। আরেকটা শেকল দিয়ে একটা নোঙর আটকে দিয়েছে মিস্টার ডিসুজার পায়ে।

মানে তাদেরকে ডুবিয়ে মারার ফন্দি করেছে ওরা?

হুঁ।

দেখতেই পাচ্ছ, উঁচু কণ্ঠ শোনা গেল আখতারের, বেঁচে আছে বুড়ো-বুড়ি। তবে আমি যা চাই তা যদি দিতে না পারো তা হলে বেশিক্ষণ বাঁচবে না। …রেইলিঙের সঙ্গে ও-রকম নিষ্ঠুরভাবে কেন বেঁধে রেখেছ আমার লোকদেরকে? বাকিরা কোথায়?

যারা অমানুষ তাদের বেলায়, আবার কীসের নিষ্ঠুরতা? আর তোমার বাকি লোকরা এতক্ষণে চলে গেছে হাঙরের পেটে।

আর্টিফ্যাক্ট দাও, চেঁচাল আখতার।

কথা আর বাড়াল না রানা, নাইলনের একটা দড়ি ধরে টান দিল। তেরপল দিয়ে ঢাকা ছিল সি-হর্সের ডেকের একটা পাশ, সরে গেল সেটা। বড় একটা ট্রাঙ্ক দেখা যাচ্ছে এখন, ওটার ভিতরে ডাইভিং ইকুইপমেন্ট রাখা হয়।

হাতের ইশারায় ট্রাঙ্কটা দেখিয়ে দিল রানা। তোমার আর্টিফ্যাক্টের খনি।

ডকের তিন লোককে আগে বাড়ার ইঙ্গিত করল আখতার।

রাইফেল উঁচিয়ে সাবধানে এগোচ্ছে ওই তিনজন। সি হর্সের ডেকে উঠে পড়ল একসময়, রানার চোখে চোখ রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাঙ্কের দিকে। রানার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়ল একজন, রাইফেলের নল তাক করল রানার বুকে। বাকি দুজন এমন ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাঙ্কের দিকে, মনে হচ্ছে ওটা ট্রাঙ্ক, ঘুমন্ত ডাইনোসর-জেগে উঠলেই খবর আছে।

সাবধানে ঘাড় ঘুরিয়ে সোহেল যেদিকে আছে সেদিকে তাকাল রানা। বিশেষ একটা ইঙ্গিত দিল সোহেলকে।

ততক্ষণে ট্রাঙ্কের কাছে পৌঁছে গেছে দুই রাইফেলধারী। ওটার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে একজন, নিজের রাইফেল নামিয়ে রেখে হুড়কো খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যজন দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতো।

রানার মতো সোহেলও পজিশন নিয়েছে কতগুলো স্কুবাট্যাঙ্কের আড়ালে। প্রেশারাইড় অবস্থায় আছে দুটো ট্যাঙ্ক, দুটো থেকেই হোস বেরিয়ে তেরপলের নিচ দিয়ে গিয়ে ঢুকেছে ট্রাঙ্কের ভেতরে-আগেই বানানো ছিদ্রপথে।

ট্রাঙ্কের হুড়কো খোলা হয়েছে মাত্র, সঙ্গে সঙ্গে ট্যাঙ্ক দুটোর ভাড়পুরো আলগা করে দিল সোহেল।

গ্যাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে খুলে গেল ঢাকনা, নাকেমুখে প্রচণ্ড বাড়ি খেল শত্রুপক্ষের লোকটা। ট্রাঙ্কের ভিতরে কায়দামতো গ্যাসোলিন ছিটিয়ে দিয়েছিল রানা, প্রেশারাইড় অক্সিজেন মুক্তি পাওয়ামাত্র ছিটকে উঠল ওসব–সৈকতের পাহাড়ি ঢলে সমুদ্রস্রোত আছড়ে পড়লে যেভাবে ফেনা ছিটকে ওঠে সেভাবে। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা দড়ি ধরে টান মারল সোহেল, ট্রাঙ্কের আরেক ছিদ্রপথে ঢুকে একটা চকমকি পাথরকে পেঁচিয়ে রেখেছিল ওটা। হ্যাঁচকা টানে ট্রাঙ্কের ধাতব কাঠামোর সঙ্গে বাড়ি খেল পাথর, দেখা দিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

তখনও, গ্যাসোলিনে অক্সিজেনের জোগান দিচ্ছে হোস, ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে একটা হলিউডি বিস্ফোরণ ঘটল ট্রাঙ্কে, কয়েক সেকেন্দ্রে জন্য বাতাসে ভেসে রইল একটা অগ্নিগোলক।

নাকেমুখে বাড়ি খাওয়া লোকটা উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়েছে রেইলিঙে। একই দশা হয়েছে ওর সঙ্গীর। অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণে মূর্তির মতো জমে গিয়েছিল ডেকে ওঠা তিন নম্বর লোকটা, নিজেকে সামলে নিয়েই রাইফেলের ট্রিগার টানল সে।

কিন্তু তার আগেই ডেকে শুয়ে পড়েছে রানা। আণ্ডারওয়াটার রাইফেল দিয়ে জবাব দিল ও। পাঁচ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের অরী বুলেট টেনিসবলের সমান গর্ত তৈরি করল তিন নম্বর লোকটার বুকে। হুমড়ি খেয়ে চিৎ হয়ে পড়ে গেল লোক ডেকে, হাত থেকে ছুটে গেছে রাইফেল।

গড়ান দিয়ে জায়গা বদল করল রানা, যেদিকে দাঁড়িয়ে ছিল আখতার সেদিকে বুলেট পাঠাল আরেকটা। কিন্তু জাহাজের ডেকে বিস্ফোরণ দেখামাত্র যা বোঝার বুঝে গেছে লোকটা, চট করে সরে গেছে শ্যাকের আড়ালে।

আরেকবার গড়ান দিয়ে আরেকটু ভালো পজিশনে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল রানার, কিন্তু পারল না–হোটেলের ছাদ এবং ব্রিজের উপর থেকে সমানে গুলি চালানো হচ্ছে ওকে নিশানা করে, সি-হর্সের রেইলিং, ডেক আর স্কুবাট্যাঙ্কগুলোয় মুহুর্মুহুঃ কাঁপন তুলছে বুলেটগুলো। চলটা উঠে যাচ্ছে ডেকে, বাতাসে উড়তে শুরু করেছে কাঠের গুঁড়ো, রেইলিং আর স্কুবাট্যাঙ্ক থেকে স্প্রিন্টারের মতো ছিটকে উঠছে ধাতব টুকরো।

ট্যাঙ্কগুলোর আড়ালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো রানা।

 নীরবতা।

সময় নিচ্ছে উভয়পক্ষ।

রানার আণ্ডারওয়াটার রাইফেলের গুলি খেয়েছে যে-লোক, সে মারা গেছে। নাকেমুখে ট্রাঙ্কের-ঢাকনার বাড়ি-খাওয়া লোকটা নেতিয়ে পড়ে আছে রেইলিং ঘেঁষে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে বোঝা যাচ্ছে না। অন্যজন প্রচণ্ড আঘাতে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল কিছু সময়ের জন্য, এখন অল্প অল্প নড়ছে।

রানার কিছু হয়নি, শুধু কিছু গুড়োকাঠ চোখে ঢোকার কারণে বার বার পিটপিট করতে হচ্ছে। সোহেল যেদিকে আছে সেদিক নিশানা করে গুলি চালায়নি শত্রুপক্ষ। লামিয়াও সম্পূর্ণ অক্ষত।

রাইফেলের গুলির আওয়াজ শোনা গেল–সময় নিয়ে বার বাৰু ট্রিগার টানছে কেউ রানাকে নিশানা করে। প্রতিটা বুলেট ফুটো করছে স্কুবাট্যাঙ্কগুলোকে, কিন্তু বেরুবার সময় ট্যাঙ্কের উল্টোদিকে আটকে গিয়ে কেঁড়ার মতো বানাচ্ছে ওটার বডিতে।

সোহেল! চেঁচাল রানা, ছাদের লোকটা আরেকটু সময় পেলে গেঁথে ফেলবে আমাকে!

আড়াল ছাড়ল সোহেল, একে ফোর্টি সেভেনের ট্রিগারে একটু পর পর চাপ দিয়ে একের পর এক বুলেট পাঠাচ্ছে হোটেলের ছাদে। মাথা নামাতে বাধ্য হলো ওখানকার লোকটা। সেই সুযোগে চট করে আড়াল ছাড়ল রানাও, চটপট আণ্ডারওয়াটার রাইফেল তিনটে বাগিয়ে নিয়ে চলে এল ট্রাঙ্কের আড়ালে।

অল্প অল্প নড়ছিল যে-লোক, উঠে দাঁড়াল সে, খানিকটা টলছে। রাইফেলের খোঁজ করল, কিন্তু সেটা আগেই হাতিয়ে নিয়েছে রানা। ইনছাড়া শার্ট সরিয়ে প্যান্টের কোমরে গোঁজা রিভলভার বের করল সে, সোহেলের দিকে তাক করছে।

অ্যাফট কেবিনের স্কাইলাইট সরিয়ে লড়াই পর্যবেক্ষণ করছিল লামিয়া। নাইন মিলিমিটারের পর পর দুই গুলিতে রিভলভারওয়ালার ডান হাঁটুর মালাইচাকি গুঁড়ো করে দিল-পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে ভেবে মেরে ফেলেনি। চিৎকার করে হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিল লোকটা, হাঁটু চেপে ধরে শুয়ে পড়েছে ডেকে, গড়াগড়ি খাচ্ছে আর সমানে গালমন্দ করছে। ওর সামনে থেকে রিভলভারটা নাইন মিলিমিটারের আরেক গুলিতে দশ হাত দূরে পাঠিয়ে দিল লামিয়া।

ছাদের উপর থাকা লোকটা জায়গা বদল করেছে, সরে গেছে দূরের এককোনায়। মাথা তুলল সে হঠাৎ, এবার সোহেলের অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি করছে। ব্রিজে থাকা ওর কমরেডরা সাপোর্ট দিচ্ছে ওকে।

ট্রাঙ্কের আড়াল থেকে মাথা আর আণ্ডারওয়াটার রাইফেলের নল বের করল রানা, সময় নিয়ে গুলি করল দুবার। ব্রিজের উপর থেকে নিচের পানিতে খসে পড়ল একশত্রুর লাশ।

ধাক্কা মেরে ফেলে দাও ওই শালা-শালীকে! শ্যাকের আড়াল থেকে চেঁচিয়ে উঠল আখতার।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা মারা হলো ডিসুজার পিঠে, ব্রিজের রেইলিং-ছাড়া জায়গা দিয়ে উড়াল দিলেন তিনি। শেকলে বাঁধা থাকায় নিজেকে সামলাতে পারলেন না মিসেস ডিসুজা, সহ-উড়াল দিলেন স্বামীর সঙ্গে। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই ত্রিশ ফুট নিচের পানিতে আছড়ে পড়লেন দুজনে। তলিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে।

সোহেল, কাভার দে! হোসসহ একটা স্কুবাট্যাঙ্ক নিয়ে ট্রাঙ্কের আড়াল ছাড়ল রানা, দৌড়ে গিয়ে ডাইভ দিল। ওর উড়ন্ত শরীরটা রেইলিঙের উপর দিয়ে একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে পড়ল পানিতে।

একটা স্কুবাট্যাঙ্কের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে সোহেল, একে কোটি সেভেন দিয়ে একইসঙ্গে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে মার্কসম্যান আর ব্রিজের লোকটাকে।

ওর পক্ষে একা কুলানো সম্ভব না বুঝতে পেরে অ্যাস্ট কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এল লামিয়া, যত দ্রুত সম্ভব ক্রল করে গিয়ে পজিশন নিল ট্রাঙ্কের পেছনে। এখানে বুলেটভর্তি দুটো আণ্ডারওয়ার্টার রাইফেল রেখে গেছে রানা, একটা তুলে নিল কাঁধে। সোহেল! চেঁচিয়ে ডাকল, ছাদের লোকটাকে সামলাও তুমি। ব্রিজের দায়িত্ব আমার।

এতদিনে মহৎ দুই বাঙালিকে চিনতে শুরু করেছে ও।

.

পানিতে পড়ামাত্র ডুবসাঁতার দিচ্ছে রানা।

একহাতে শরীরের সঙ্গে জাপ্টে ধরেছে স্কুবাট্যাঙ্ক, অন্যহাত চালিয়ে এগোচ্ছে ব্রিজের দিকে। ভালভূ খুলে দিল ট্যাঙ্কের, কিছু বুদ্বুদ উঠে যেতে দিল, তারপর হোস লাগাল মুখে। দম নেয়ার জন্য খুব ভালো না কায়দাটা, তারপরও নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

উপসাগরটা বিশাল এক পুলের মতো; এখানকার পানি প্রায় স্বচ্ছ। পানি ভেদ করে নিচে ঢুকে পড়তে অসুবিধা হচ্ছে না রোদের। অসহায় ডিসুজা দম্পতিকে দেখতে পাচ্ছে রানা দূরে। সাঁতুরে উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন তারা, কিন্তু ভারী নোঙরের কারণে পারছেন না। যত সময় যাচ্ছে, বেঁচে থাকার আশা দূর হয়ে যাচ্ছে তত।

সাঁতারের গতি বাড়াল রানা।

ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, এমন সময় পানিতে বুদ্বুদের সাদা রেখা তৈরি করে একটা বুলেট ধেয়ে এল ওর দিকে।

ব্রিজের উপর থেকে গুলি করা হচ্ছে ওকে।

.

রানা কত বড় বিপদে পড়েছে, বুঝতে পারছে সোহেল।

কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নিচে কোনও আড়াল নেই রানার জন্য, আছে শুধু প্রতিসরণের সুবিধা। ওর গায়ে গুলি লাগাতে দু-একবার মিস হতে পারে ব্রিজে থাকা লোকটার, কিন্তু তৃতীয়বার?

সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে লামিয়া, কিন্তু গুলি লাগাতে পারছে না ব্রিজের লোকটার গায়ে। আসলে আণ্ডারওয়াটার রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্রে অভ্যস্ত নয় সে। ব্রিজের রেইলিঙে অথবা লোহার স্প্যানে নিষ্ফল আঘাত হানছে ওর বুলেটগুলো।

এখন একটাই উপায় আছে, এবং সেটা করারই সিদ্ধান্ত নিল সোহেল।,

নিজেকে আড়াল করে সি-ফোরের একটা ব্লক টেনে নিল ও। পাঁচ সেকেণ্ডে সেট করল টাইমার, চাপ দিল এণ্টার সুইচে। আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে শ্যাকের উদ্দেশে জোরে ছুঁড়ে মারল এক্সপ্লোসিভ, সঙ্গে সঙ্গে সরে এল। শ্যাকেই গিয়ে পড়ল ওটা, বিস্ফোরণের ধাক্কায় উড়ে গেল একদিকের দেয়াল আর ছাদ। কয়েক সেকেণ্ড পর ভেঙে পড়ল পুরো শ্যাক।

অনেক আগেই জয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিল আখতার, সি-ফোর উড়ে আসতে দেখে ছুট লাগিয়েছে পার্ক-করে-রাখা গাড়ি দুটোর উদ্দেশে। শকওয়েভের ধাক্কায় পড়ে গেল রাস্তায়, চোট পেল, কিন্তু উঠেই দৌড়াতে শুরু করল আবার। যত জলদি সম্ভব পালাতে চাইছে।

সি-হর্সের থ্রটলে চাপ দিল সোহেল, একহাতে হুইল ধরে রেখে আরেকহাতে একে ফোর্টি সেভেন চালাচ্ছে–কোনও সুযোগ দিতে চায় না মার্কসম্যানকে। একইসঙ্গে ব্রিজের কাছে নিয়ে যাচ্ছে জাহাজ, চাইছে ওখানকার লোকটাকে আরও কাছ থেকে গুলি করার সুযোগ পাক লামিয়া।

এবং সে-সুযোগ পেয়ে গেল মেয়েটা। ডক ছাড়িয়ে সি হর্স মোচড় কাটতেই আড়ালবিহীন অবস্থায় পেয়ে গেল সে ব্রিজের লোকটাকে। তখন ওর আণ্ডারওয়াটার রাইফেলে একটামাত্র বুলেট বাকি আছে। সময় নিয়ে নিশানা করল সে, তারপর টান দিল ট্রিগারে।

রানাকে লক্ষ্য করে একটা ম্যাগনাম খালি করছিল লোকটা, বুক আর পেটের মাঝখানে ভারী বুলেটের ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। পতন সামলাতে আঁকড়ে ধরল একদিকের রেইলিং। কিছুক্ষণ পর রেইলিং ঘেঁষে বসে পড়ল আস্তে আস্তে। মারা যাচ্ছে।

.

সহজ টার্গেট হওয়ার পরও আলোর-প্রতিসরণের কারণে বেঁচে গেছে রানা। সে-সুযোগই নিয়েছিল ও। অবশ্য পুরোপুরি বাঁচতে পারেনি-একটা বুলেট আঁচড় কেটে গেছে ওর বাঁ কাঁধে, সরু ধারায় রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে। আরেকটা বুলেট চুমু দিয়ে গেছে স্কুবাট্যাঙ্কের পাদদেশে, যদিও ফুটো করতে পারেমি ওটাকে।

লবণপানির কারণে জ্বালা করছে রানার ক্ষতস্থান, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। অক্সিজেনের অভাবে যখন দপদপ করছে ডিসুজা দম্পতির মাথা, ঠিক তখন তাঁদের কাছে হাজির হলো ও। নিজের মুখ থেকে হোস সরিয়ে পালাক্রমে দিচ্ছে বুড়ো-বুড়িকে। মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন তাঁরা মনে মনে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রানার দিকে।

উপরের দিকে তাকাল রানা। কাছিয়ে আসছে সি-হর্স।

.

১৮.

 গাদা গাদা জিয়োলজিকাল প্রিন্টআউট ঘেঁটে, নুমার ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড-করা কম্পিউটার প্রোগ্রামের সাউণ্ডওয়েভ-অ্যানালাইসিস পাঠ করে, আর মগের পর মগ কফি গিলে সময় যাচ্ছে আসিফের।

সাউণ্ডওয়েভের নতুন একটা প্রিন্টআউট নিল সে, মন দিয়ে দেখল কিছুক্ষণ। প্রিন্টআউটের বিশেষ একটা অংশের উপর আঙুল রেখে ডাকল তানিয়াকে। এটা বেলেপাথর। আর এটা পাথরের নিচে পানির স্তর। তারমানে পাথরের নিচে এখনও পানি আছে।

তা হলে পাম্পগুলো পানি তুলতে পারছে না কেন?

কারণ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ক্রমশ, ঢুকে যাচ্ছে আরও গভীর পাথর ও কাদামাটির ভেতরে।

মানে?

মানে, আমার ধারণা, নুবিয়ান অ্যাকুইফারের নিচে আরেকটা অ্যাকুইফার আছে।

আরেকটা?

মাথা ঝাঁকাল আসিফ। মাটির সাত হাজার ফুট নিচে। ছোটখাটো একটা সাগর বলা যায় ওটাকে। কিন্তু এখানে, প্রিন্টআউটের বিশেষ একটা দাগ দেখাল, আর এখানে, এবার দেখাল অন্য একটা দাগ, সাউণ্ডওয়েভের যে-ডিসটর্শন দেখতে পাচ্ছ, তার ফলে বোঝা যাচ্ছে সাগরটা সরে যাচ্ছে একজায়গা থেকে আরেক জায়গায়।

ভূগর্ভের নদীর মতো?

হতে পারে…আমি শিয়োর না আসলে। তবে কম্পিউটার কিন্তু মনগড়া কিছু বলতে পারে না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল তানিয়া। তারপর বলল, এত পানি যাচ্ছে কোথায়?

জানি না।

কেন যাচ্ছে?

 তা-ও জানি না। শুধু জানি পানির স্তর সরে যাচ্ছে।

প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল অফিসের জানালা। তারপরই শোনা গেল একটানা গুলির আওয়াজ।

প্রিন্টআউটটা সরিয়ে রাখল আসিফ, চটজলদি গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে।

বাইরে খররোদে যেন জ্বলছে দক্ষিণ লিবিয়ার প্রকৃতি। আরেকদফা বিস্ফোরণ ঘটল অনতিদূরের একটা পাম্পিং টাওয়ারের কাছে, চোখ ধাধিয়ে গেল উজ্জ্বল লালচে-গোলাপি অগ্নিগোলকের কারণে। একদিকে কাত হয়ে পড়ে গেল টাওয়ারটা।

কী ঘটনা? আসিফের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তানিয়া।

পালাতে হবে আমাদেরকে, দরজার কাছ থেকে শোনা গেল খালিদের উত্তেজিত কণ্ঠ।

আসিফ-তানিয়া দুজনই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল খালিদের দিকে।

বিদ্রোহীরা হামলা করেছে আমাদের স্টেশনে, বললেন খালিদ। জলদি চলুন, প্লেনে গিয়ে উঠতে হবে আমাদের।

প্রিন্টআউটগুলো ঝটপট হাতিয়ে নিল আসিফ। তানিয়া ততক্ষণে ছুট লাগিয়েছে খালিদের পিছন পিছন। অফিসের বাকিরাওঁ জড়ো হয়ে গেছে এতক্ষণে, নুড়িপাথর বিছানো পথ ধরে ছুটে চলেছে ডিসি-৩-এর দিকে। যক্ষ্মারোগীর মতো খকখক করে কাশতে শুরু করেছে ওটার ইঞ্জিন, তৈলাক্ত কালচে ধোয়াউগলে দিচ্ছে বাতাসে।

প্লেনে জায়গা হয়ে যাবে আমাদের সবার, দৌড়াতে দৌড়াতে বললেন খালিদ।

হুড়োহুড়ি করে প্লেনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল সবাই। আবারও বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া গেল। রকেট হামলা চালানো হচ্ছে কন্ট্রোল সেন্টারে।

প্লেনে যারা উঠেছে তাদের মাথা গুনছেন খালিদ। তিনিসহ একুশজন, পাইলটকে গণনায় ধরলে বাইশ। যাও! চিৎকার করে বললেন পাইলটের উদ্দেশে।

থ্রটল ঠেলে দিল পাইলট, হেলেদুলে আগে বাড়ল পুরনো ডিসি-৩। যত এগোচ্ছে তত গতি বাড়ছে।

প্লেনের একটা জানালার পাশে নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছে আসিফ, তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। পর পর আরও কয়েকটা রকেট গিয়ে আঘাত হানল কন্ট্রোল সেন্টারে, ওটা আজ ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দের বিদ্রোহীরা।

স্বভাবসুলভ গর্জন করতে শুরু করেছে ডিসি-৩-এর ইঞ্জিন, তারমানে পূর্ণ শক্তি পাচ্ছে ওটার ইঞ্জিন। কিন্তু পুরনো একটা প্লেনে একুশজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ নিয়ে উড়াল দেয়া মুখের কথা না, তাই সময় নিচ্ছে পাইলট। এয়ারস্ট্রিপের শেষমাথায় পৌঁছে গেছে বিমানটা, এমন সময় ওটার নাক উপরে তুলল সে। বাউণ্ডারি দেয়ালের মাথায় চুমু দেয়া থেকে ফুট পাঁচেকের জন্য বঞ্চিত হলো ডিসি-৩-এর চাকা।

এয়ারস্ট্রিপ ধরে পিকআপ ট্রাক নিয়ে ধেয়ে আসছে বিদ্রোহীদের একটা দল, মেশিনগান খালি করছে পলায়নরত ডিসি-৩-এর উদ্দেশে।

কিন্তু বিমানের আরোহীরা ওটার গর্জনের কারণে শুনতে পেল না মেশিনগানের আওয়াজ। ওদের প্রায় সবাই ভয়ে কাঁপছে, দোয়াদরুদ যে যা জানে পড়ছে।

শুধু একজনের কোনও আওয়াজ নেই।

খালিদ সাইফুল্লাহ্।

গুলি খেয়েছেন তিনি।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন, হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন কাত হয়ে।

আসিফ আর তানিয়া ছুটে গেল সবার আগে। পেট আর পায়ে গুলি লেগেছে খালিদের।

রক্তপাত থামাতে হবে, চিৎকার করে বলল আসিফ, পট্টি বানানোর জন্য খুলতে শুরু করেছে নিজের শার্ট। কোলে তুলে নিয়েছে খালিদের মাথা।

চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে প্লেনের ভিতরে। আরবিতে হইচই করছে বাকিরা। ওদের কথা বুঝতে পারছে না আসিফ বা তানিয়া।

স্বামীর পাশে বসে পড়েছে তানিয়া, শার্টটা ছিঁড়ছে। হাসপাতালে নেয়া দরকার আপনাকে, বলল খালিদকে। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটা কোথায়?

বেনগাজি, দুর্বল গলায় বললেন খালিদ।

তারমানে আবার সেই নব্বই মিনিটের যাত্রা।

কিছু হবে না আপনার, আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছে তানিয়া। আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব আমরা।

চোখ বন্ধ করলেন খালিদ। আল্লাহকে ডাকছেন একমনে।

.

শিকল কেটে ডিসুজা দম্পতিকে সি-হর্সে তুলতে বেগ পেতে হলো রানা আর সোহেলকে।

ওরা ডেকে ওঠামাত্র লামিয়া জানাল, নতুন সমস্যা হয়েছে-পানি ঢুকতে শুরু করেছে জাহাজে। শত্রুপক্ষের উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ বিশ্রী চিড় ধরিয়েছে ওটার কাঠামোতে।

গিয়ে দেখো ফরওয়ার্ড কম্পার্টমেন্টের কী অবস্থা, লামিয়ার গলায় হতাশা। বান ডেকেছে ওখানে। আর একঘন্টাও ভেসে থাকতে পারবে না সি-হর্স।

ডিসুজা দম্পতির শুশ্রূষা করছে বলে কোনও মন্তব্য করল না রানা।

ভাগ্যকে ধন্যবাদ, হুইলহাউসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সোহেল, সৈকত থেকে বেশি দূরে নেই আমরা।

জাহাজের ইঞ্জিন চালু করল ও, ওটার নাক ঘুরাল তীর অভিমুখে। কাছাকাছি পৌঁছে কায়দামতো চাপ বাড়াল থ্রটলে। গতির কারণে সৈকতের ভেজা বালিতে পিছলে তীরের বেশ কয়েক গজ ভিতরে উঠে পড়ল সি-হর্স।

বালিতে নামল রানা, তাকিয়ে আছে রেইলিঙের সঙ্গে বাঁধা প্রতিপক্ষের তিন লোকের লাশের দিকে। ভাবছে, হুসাইন আখতার একটা ফ্যানাটিক। প্রয়োজন শেষ হওয়ামাত্র নিজের লোকদের খুন করে বা করায়। যেমনটা করিয়েছে এই তিনজনের বেলায়। অত সহজ তিন টার্গেটের জন্য নিশ্চয়ই তিনবারের বেশি ট্রিগার টানতে হয়নি ছাদের সেই স্নাইপারের। লামিয়ার গুলি-খাওয়া লোকটাও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, স্নাইপারের গুলিতেই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা, এগিয়ে গেল সি-হর্সের ডাইভ ল্যাডারের কাছে। ডিসুজা দম্পতিকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছে সোহেল আর লামিয়া।

তাঁদেরকে সৈকতে নামানোর পর জাহাজে উঠল রানা, ডেকে পড়ে-থাকা লাশগুলোর পকেট ঘাটাঘাটি করছে।

কাজের জিনিস পাওয়া গেল না কিছুই। কোনও আইডি কার্ড নেই, পেশাগত কাজে লাগে এমন কোনও জিনিস নেই। নেই কোনও অলঙ্কার বা ট্যাটু। দীক্ষাকরণ চিহ্ন ব্যবহার করে কোনও কোনও ফ্যানাটিক সংগঠন, সে-রকম কিছুও নেই।

লোকগুলো আসলে কারা, কার বা কাদের হয়ে কাজ করছিল, জানা গেল না।

রেইলিং ঘেঁষে দাঁড়াল রানা। সৈকতে দাঁড়ানো লামিয়াকে বলল, মাল্টা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করো। চেষ্টা করে দেখো ডিফেন্স ফোর্স অথবা সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো কোনও সাহায্য করতে পারে কি না। অনেকেই বলে মরা মানুষ কথা বলে না, কিন্তু কথা বলাতে জানলে অনেককিছুই জানা যায় মরা মানুষদের কাছ থেকে।

কী কী ক্লু আছে আমাদের হাতে? জিজ্ঞেস করল লামিয়া।

ওদের ব্যবহৃত অস্ত্র আর জামাকাপড়। ওদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট। বিশেষ একটা স্যাটেলাইট-ফোনের নম্বর। …আকাশ থেকে আবির্ভাব ঘটতে পারে না এই লোকগুলোর। আমি নিশ্চিত কোনও-না-কোনও অতীত আছে এদের সবার।

মাথা ঝাঁকাল লামিয়া। নেমে এসো তুমি। আগে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে ডিসুজা দম্পতিকে।

.

ডিসুজা এস্টেটের লিভিংরুমে বসে আছে ওরা পাঁচজন। বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়েছে।

পয়সাওয়ালা হয়েও চালচলনে অথবা গৃহস্থালির ব্যবহার্য জিনিসে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাননি ডিসুজা দম্পতি। সাধারণ কাউচ আর চেয়ার দিয়ে সাজিয়েছেন লিভিংরুম। বিভিন্ন রকমের আর্টওয়ার্ক আর গোটা কয়েক মূর্তি আছে ঘরের আনাচকানাচে, একদিকের দেয়াল জুড়ে বানানো সারি সারি র‍্যাকে শোভা পাচ্ছে অনেকগুলো বই। আরেকদিকের দেয়ালের মাঝখানটায় বানানো ফায়ারপ্লেসে পুড়ছে কাঠ।

কিন্তু ঝড় বয়ে গেছে হলওয়ে আর লিভিংরুমে-ডিসুজা দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং ভয়ভীতি দেখানোর সময় তাণ্ডব চালিয়েছে আখতারের লোকেরা। এখানে-সেখানে উল্টে ফেলেছে ল্যাম্প অথবা টিপয়, মেঝেতে পড়ে আছে ছোটখাটো বইয়ের পাহাড়।

সৈকত থেকে ফিরে এসে প্রথমে ধাতস্থ হয়েছেন বুড়ো-বুড়ি, তারপর রানা-সোহেল-লামিয়াকে নিয়ে ডিনার করেছেন। এখন কথা বলার জন্য বসেছেন ওদেরকে নিয়ে।

আমাদেরকে সাগরের নিচ থেকে উদ্ধার করার জন্য ধন্যবাদ, রানাকে বললেন মিসেস ডিসুজা।

কৃতিত্বটা আসলে আমার একার না, আমরা তিনজন করেছি কাজটা, বলল রানা। হাসল, তা ছাড়া, এক অর্থে আমরাই বিপদে ফেলেছিলাম আপনাদেরকে।

মোটেও না, অস্বীকার করলেন মিস্টার ডিসুজা। তোমরা আসার আগেই আমাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ওরা।

কনিয়াক চলবে? প্রস্তাব দিলেন মিসেস ডিসুজা।

আপত্তি করল না কেউ।

মিসেস ডিসুজার সঙ্গে ভিতরের ঘরে গেল লামিয়া, তাকে বহন করতে না দিয়ে নিজেই নিয়ে এল কনিয়াকের ট্রে, পরিবেশন করল সবাইকে।

ওরা কী জানতে চাইছিল আপনাদের কাছে? কনিয়াকের গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করল রানা।

মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন বুড়ো-বুড়ি।

আমার স্টাডিরুম তছনছ করে ফেলেছে ওরা, বললেন মিস্টার ডিসুজা। তারপর…নিজের চোখেই তো দেখলে…আরেকটু হলে মেরেই ফেলেছিল আমাদেরকে।

কিছু মনে করবেন না, যা বললেন তা আমার প্রশ্নের জবাব না। যা জানতে চাইছি তা জানাতে যদি অসুবিধা থাকে তা হলে জোরাজুরি করব না। তবে একটা কথা জেনে রাখুন। আপনাদের সহযোগিতার উপর নির্ভর করছে হাজার হাজার…হয়তো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন।

চেহারায় মেঘ জমেছে মিস্টার ডিসুজার।

মাথা নিচু করে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী, জামার প্রান্ত খুঁটছেন।

উঠে দাঁড়াল রানা, এগিয়ে যাচ্ছে ফায়ারপ্লেসের দিকে। আসলে সময় দিচ্ছে ডিসুজা দম্পতিকে, চাইছে ওর কথায় প্রভাবিত হোন তারা।

ফায়ারপ্লেসের উপরে দেয়ালে ঝুলছে বড় একটা পেইন্টিং, ওটার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল ও। তৈলচিত্রে আশ্চর্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইংরেজ রণতরীর একটা বহর, কোনও এক বন্দরে নোঙর-করে-থাকা অনেকগুলো ফরাসি যুদ্ধজাহাজের উপর হামলা চালিয়েছে ওগুলো।

ওর পাশে এসে দাঁড়াল লামিয়া, পেইন্টিংটা দেখছে সে-ও। কিছুক্ষণ পর বলল, ব্যাটল অভ দ্য নাইল।

মিস্টার ডিসুজার দিকে ঘুরল রানা। আপনার পূর্বপুরুষরা তো ফরাসি, না?

মাথা ঝাঁকালেন বুড়ো।

ব্যাটল অভ দ্য নাইলে পরাজয় বরণ করেছিল ফরাসিরা। নিজেদের পরাজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়–এমনকিছু এই প্রথম ব্যবহার করতে দেখলাম কোনও ফরাসি দম্পতিকে।

কারণ আছে। ছবিটা যিনি এঁকেছেন…এটিন ডিসুজা…আমার পূর্বপুরুষ।

ঘাড় ঘুরিয়ে আবার পেইন্টিং-এর দিকে তাকাল রানা। তারমানে যুদ্ধে মারা যাননি তিনি?

না।

এবং দেশে ফেরার সময় মিশর থেকে কিছু সুভনির নিয়ে এসেছিলেন?

আবারও দৃষ্টির বিনিময় হলো ডিসুজা দম্পতির মধ্যে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন মিসেস ডিসুজা। স্বামীকে বললেন, বলে দাও। এদের কাছে আসলে লুকানোর কিছু নেই আমাদের।

একচুমুকে কনিয়াকের গ্লাস খালি করে ওটা নামিয়ে রাখলেন মিস্টার ডিসুজা। ছবি খুব ভালো আঁকতে পারতেন এটিন, যদিও পেশায় ছিলেন ফরাসি নৌবহরের সৈনিক। ব্যাটল অভ দ্য নাইলে হেরে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি, পরে তাঁকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেশে ফিরে এসে স্মৃতিচারণ করে আঁকেন ওই তৈলচিত্র।

তারপর?

ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল তাঁর। তিনি তেমন বিখ্যাত কেউ না হওয়ায় কখনও নিলামে ওঠেনি তাঁর সেসব ডায়েরি। কোনওদিন উঠবেও না, কারণ আমাদের পারিবারিক সংগ্রহশালায় থাকতে থাকতে একসময় হারিয়ে গেছে। তবে কয়েকটা ডায়েরি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। জানতে পেরেছি, মিশরে যখন ছিলেন তখন খননকাজ চালিয়েছেন কোনও কোনও কবর আর সমাধিসৌধে। জানো নিশ্চয়ই, ফারাওদের প্রায় সবাইকে দাফন করা হয়েছে ওসব জায়গায়?

মাথা ঝাঁকাল রানা।

এটিন আর তার সঙ্গের অনেক অফিসার, যে যা পেরেছেন তা-ই চুরি করেছেন ওসব কবর থেকে–পরে বেশি দামে বেচার লোভে। কিন্তু যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ধ্বংস হয়ে যায় বেশিরভাগ ফরাসি যুদ্ধজাহাজ, যেসব মিশরীয় জিনিস দিয়ে বোঝাই করা হয়েছিল ওসব জাহাজ সেগুলো চলে যায় নীল নদের পেটে।

সব নিশ্চয়ই যায়নি?

মাথা ঝাঁকালেন ডিসুজা। সব ফরাসি যুদ্ধজাহাজ অংশও নেয়নি সেদিনের সেই যুদ্ধে। ও-রকম একটা জাহাজে নিজের কয়েকটা ট্রাঙ্ক তুলে দিতে সক্ষম হন এটিন। ওটার ক্যাপ্টেন সুযোগ পাওয়ামাত্র সব পাল তুলে দিয়ে পালিয়ে আসেন, হাজির হন এখানে।

মানে মাল্টায়?

আবারও মাথা আঁকালেন ডিসুজা।

তারপর নিশ্চয়ই একদিন এটিনের সেই ট্রাঙ্ক তুলে দেয়া হয় লুসি লরেনে? অনুমানে বলল রানা।

খুব সম্ভব। আসলে ওই ব্যাপারে কোনও রেকর্ড নেই কোথাও। অথচ গুণ্ডারা ওটাই জানতে চাইছিল বার বার। মানে মিশর থেকে, বিশেষ করে অ্যাবাইদোস শহর থেকে কী কী জোগাড় করেছিলেন এটিন।

আচ্ছা, এটিনের আর্টিফ্যাক্টগুলোর সঙ্গে কুয়াশা বা ধোঁয়াশার কোনও সম্পর্ক আছে কি, যা একসঙ্গে কয়েক হাজার লোককে মেরে ফেলতে পারে?

মিস্টার ডিসুজার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, বজ্রপাত হয়েছে তার উপর। আছে, ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, কালো কুয়াশা।

নীরবতা।

 থমকে গেছে রানা।

 থমকে গেছে সোহেল আর লামিয়াও।

এটিনের ডায়েরি অনুযায়ী, বলছেন ডিসুজা, কালো কুয়াশা পারে মানুষের জীবন নিতে, আর জীবন কুয়াশা পারে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে।

.

১৯.

মরা মানুষকে জীবিত করতে পারে? পুনরাবৃত্তি করল সোহেল। তাকাল রানার দিকে।

চোখে চোখে কথা হয়ে গেল দুজনের।

জীবন কুয়াশা হলো কালো কুয়াশার অ্যান্টিডোট।

অ্যান্টিডোট, বলল রানা।

কীসের? বললেন মিস্টার ডিসুজা। মৃত্যুর? যত চেষ্টাই করুক, কেউ কখনও মৃত্যু ঠেকাতে পারেনি। কোনওদিন পারবেও না।

বিশেষ একজাতের মৃত্যুর।

 বুঝলাম না।

 লিনোসায় কী ঘটেছে, সেখানকার অধিবাসীদের এখন কী অবস্থা, জানাল রানা। বলল, কালো কুয়াশার প্রভাবে দ্বীপের বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার পরও সুস্থ-সবল একজনের দেখা পাওয়া গিয়েছিল।

তারমানে গুণ্ডারা অ্যান্টিডোট চায়? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস ডিসুজা।

না। ওদের কাছে আছে ওই জিনিস। বরং ওরা চায় না, আর কেউ সন্ধান পাক সেই অ্যান্টিডোটের, পেলে অকার্যকর হয়ে যাবে ওদের হাতে থাকা কালো কুয়াশা। এদিকওদিক তাকাল রানা। আর্টিফ্যাক্টগুলো নিশ্চয়ই এখানে নেই, না?

লুসি লরেন থেকে উদ্ধার-করা কোনওকিছুই নেই এখানে, বললেন ডিসুজা। যা ছিল তার বেশিরভাগই দিয়ে দিয়েছি জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে। বাকি সব নিয়ে গেছে গুণ্ডারা। এটিনের ডায়েরিটাও নিয়েছে। মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এ-রকম যা যা পেয়েছে, তার কিছুই রেখে যায়নি।

রানা বলল, আপনি বললেন লুসি লরেনে কী ছিল সে ব্যাপারে রেকর্ড নেই কোথাও। এমনও তো হতে পারে, এটিনের সব আর্টিফ্যাক্ট তোলা হয়নি জাহাজটাতে?

হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। তখন মাল্টায় চলছে চরম বিশৃঙ্খলা, কোন্ জাহাজে কী তোলা হচ্ছে না হচ্ছে সে-খবর রাখার সময় কই? …হার্বারমাস্টারের লগরেকর্ড অনুযায়ী, লুসি লরেন যেদিন বন্দর ছাড়ে সেদিন আরও দুটো জাহাজ রওনা করে ফ্রান্সের উদ্দেশে। একটা ঝড়ে বিধ্বস্ত হয় লুসি লরেনের মতোই, আরেকটাকে পাকড়াও করে ইংরেজরা।

ইংরেজরা যদি ওই আর্টিফ্যাক্টগুলো পেত, বলল সোহেল, তা হলে কোনও-না-কোনও জাদুঘরে রেখে দিত।

আর ওগুলো যদি মাল্টায় থাকত, বলল লামিয়া, তা হলে পরে কেউ-না-কেউ খুঁজে পেতই।

লুসি লরেনে নেই, বললেন মিসেস ডিসুজা, অন্য জাহাজে নেই। এমনকী মাল্টায়ও নেই। তা হলে কোথায় আছে আর্টিফ্যাক্ট?

অন্যমনস্ক হয়ে গেছে রানা, তাকিয়ে আছে তৈলচিত্রের দিকে। কিছুক্ষণ পর ঘুরে তাকাল ডিসুজার দিকে। আর্টিফ্যাক্ট বা লিপিফলক যা-ই থাকুক না কেন এটিনের কাছে, সেগুলোর গায়ে খোদাই-করা হায়ারোগ্লিফিক্সের অনুবাদই তো ডায়েরিতে লিখেছিলেন তিনি, না?

মাথা ঝাঁকালেন ডিসুজা।

কাজটা কবে করেছিলেন তিনি, মনে আছে? ডায়েরির তারিখ অনুযায়ী, আঠারো শ পাঁচ সালের মাঝামাঝি নাগাদ।

আর মাল্টার যে-বিশৃঙ্খলার কথা বললেন, তা কবে নাগাদ ঘটেছিল?

ওই বছরেরই শুরুর দিকে।

লম্বা করে দম নিল রানা।, আর্টিফ্যাক্ট বা লিপিফলক যদি আগেই তুলে দেয়া হবে লুসি লরেন বা অন্য জাহাজে, অনুবাদের কাজটা কখন করলেন এটিন?

জবাব দিতে পারলেন না মিস্টার ডিসুজা, স্তম্ভিত হয়ে গেছেন।

.

স্টাডিরুমের দরজা ভেঙে ফেলেছে গুণ্ডারা। কিন্তু এসবের দিকে নজর দেয়ার সময় নেই এখন। একটা সাইডবোর্ড কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন মিস্টার ডিসুজা, তাকে অনুসরণ করছে বাকিরা।

কাবার্ড খুলে ভিতর থেকে বহু-পুরনো একটা মামুলি খাতা বের করলেন তিনি, সেটা দেখে মোটেও মিশরীয় মনে হয় না। মলাট উধাও খাতাটার, প্রথম পৃষ্ঠায় ফরাসি ভাষায় কিছু লেখা।

লেখাগুলো ফ্রেঞ্চ বলে এই খাতা আর ঘাঁটাঘাঁটি করেনি গুণ্ডারা, বললেন ডিসুজা। ওরা ফরাসি ভাষা জানে না। উল্টেপাল্টে খাতার ভিতর থেকে বের করলেন একটা চিঠি। যে-জাহাজে, নিজের মালসামান তুলে দিয়েছিলেন এটিন, সেটার ক্যাপ্টেন, জনৈক অ্যাডমিরাল, লিখেছিলেন এই চিঠি এটিনকে। ফরাসি ভাষায় লেখা, অনুবাদ পড়ে শোনাচ্ছি আপনাদের।

গলা পরিষ্কার করে পড়তে লাগলেন:

প্রিয় বন্ধু এটিন, আপনার চিঠি পেয়ে খুব খুশি লাগছে। ব্যাটল অভ দ্য নাইলের পর ট্রাফালগারের যুদ্ধেও হার হয়েছে ফ্রান্সের; কোনওটাতেই অংশ নিইনি আমি। হারানো সম্মান কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে, ভাবছিলাম।

ব্যাটল অভ দ্য নাইলে ফেঁসে গিয়েছিলেন আপনি, শত্রুপক্ষের হাতে আরেকটু হলে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন; আপনাকে উদ্ধার করি আমি, আমার জাহাজে করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ যা পাঠিয়েছেন আমার কাছে, ঠিক করেছি সেটা নিয়ে যাব নেপোলিয়নের কাছে। বিনিময়ে বিশেষ কিছু চাইব।

জানি, আমাকে দেখামাত্র আমার মাথা কাটার নির্দেশ দেবেন সম্রাট, তারপরও বিশেষ সেই অস্ত্র…যার সন্ধান দিয়েছেন আপনি আমাকে…নিয়ে যাব তাঁর কাছে। আমার বিশ্বাস, আমার দুই গালে চুমু খাবেন নেপোলিয়ন, পুরস্কৃত করবেন নিঃসন্দেহে।

কথা দিচ্ছি, প্রাপ্য পুরস্কার যাতে যথাযথভাবে আপনার কপালেও জোটে, সে-ব্যবস্থাও করব। তবে তার আগে সব কথা গোপন রাখতে হবে আমাদের দুজনকে।

আরেকটা কথা। কালো কুয়াশায় যখন লুটিয়ে পড়বে আমাদের শত্রুরা, তখন আমরা যাতে নিরাপদে থাকি সেজন্য প্রস্তুত রাখতে হবে জীবন কুয়াশা। ইতি… পড়া থামালেন ডিসুজা, তাকালেন রানার দিকে।

চিঠিতে কোনও দিন-তারিখ আছে? জিজ্ঞেস করল রানা।

মাথা ঝাঁকালেন ডিসুজা। অগাস্ট সতেরো, আঠারো শ পাঁচ। …এটিনের ডায়েরিটা হাতে থাকলে আরও অনেককিছু দেখাতে পারতাম। ওটাতে বিভিন্নরকম হায়ারোগ্লিফস-এর ড্রইং ছিল, বিভিন্ন শব্দের মানে বুঝবার জন্য ছোট্ট একটা ডিকশনারিও ছিল।

শেষপর্যন্ত কি পুরস্কৃত হয়েছিলেন এটিন? জিজ্ঞেস করল রানা।

খাতা ঘেঁটে আরেক তা কাগজ বের করলেন ডিসুজা। এটা আঠারো শ পাঁচ সালেরই একটা প্রত্যাখ্যানপত্র–এটিন মিশরে গিয়ে নিজের স্টাডি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে, ওরা মানা করে দিয়েছিল। ততদিনে মিশর দখল করে নিয়েছে ইংরেজরা, যাদেরকে হটিয়ে দেশটা দখল করেছে তাদের কাউকে সেখানে মেনে নিতে পারে না ওরা।

অফিশিয়াল লেটারহেড প্যাডে লেখা চিঠিটা হাতে নিল রানা। প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে যে-যুক্তি দিয়েছিল ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেটা পড়ল। তারপর তাকাল ডিসুজার দিকে। কোথায় যেতে চেয়েছিলেন এটিন?

জানি না।

পরে কখনও মিশরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি আর? জিজ্ঞেস করল রানা।

না। আসলে সুযোগ পাননি। চিঠি চালাচালির কয়েক মাসের মধ্যে মারা যান তিনি আর সেই অ্যাডমিরাল।

কীভাবে? জিজ্ঞেস করল সোহেল।

এটিনের মৃত্যু স্বাভাবিক। এখানে, মানে মাল্টায়, একরাতে মারা যান তিনি ঘুমের মধ্যে। আমার ধারণা হার্টঅ্যাটাক হয়েছিল। আর ওই অ্যাডমিরাল মারা যান ফ্রান্সে, মাসখানেক পর। সাতবার ছুরি চালানো হয়েছিল লোকটার বুকে। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আত্মহত্যা।

আত্মহত্যা! তাজ্জব হয়ে গেছে লামিয়া। মেডিকেল রিপোর্ট দিয়েছিল যে-লোক, সে গাঁজা খেয়েছিল নাকি?

ইংল্যাণ্ডের পত্রপত্রিকা ঠাট্টা-তামাশা করেছিল ব্যাপারটা নিয়ে, বললেন ডিসুজা।

নেপোলিয়নের সঙ্গে দেখা করেছিলেন অ্যাডমিরাল? জিজ্ঞেস করল রানা।

করেছিলেন। কয়েকজন ইতিহাসবিদ মনে করেন, দেখা করাটাই কাল হয়েছিল অ্যাডমিরালের জন্য। তাঁকে আসলে কখনোই ক্ষমা করতে পারেননি নেপোলিয়ন।

অ্যাডমিরালকে যা পাঠিয়েছিলেন এটিন, অ্যাডমিরালের মৃত্যুর পর কী হলো সে জিনিসের?

জানি না। তবে কোনও জাদুঘরে দেননি মনে হয়, কারণ কপর্দকহীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। আর যদি নেপোলিয়নকে দিয়ে থাকেন, সম্রাট স্রেফ চেপে গেছেন।

আমার মনে হয় নেপোলিয়নকে দেননি তিনি ওসব, বলল লামিয়া। কারণ যে-লোক অ্যাডমিরাল হয়েও যুদ্ধ না করে প্রাণ বাঁচানোর ধান্দা করে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাতে পেয়েই সওদা করার ফন্দি আঁটে, সে-লোক নিজের জন্য যা চায় তা পাওয়ার আগে… মাথা নাড়ল। তা ছাড়া নেপোলিয়ন কখনও ব্যবহার করেননি কালো কুয়াশা।

তারমানে, মুখ খুলল সোহেল, অ্যাডমিরালের কথা বিশ্বাস করেননি নেপোলিয়ন। এবং তার পর থেকে হুসাইন আখতার আবির্ভূত হওয়ার আগপর্যন্ত আর জীবন কুয়াশা গায়েব হয়ে ছিল।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বলল লামিয়া, কী পাঠিয়েছিলেন এটিন অ্যাডমিরালের কাছে? এবং কী হলো সেগুলোর?

জানি না, মাথা নাড়লেন ডিসুজা। তবে ফ্রান্সের কোথায় শেষ থেকেছেন অ্যাডমিরাল তা বলতে পারি।

ঠিকানা লিখে দিলেন তিনি।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল রানা। একসঙ্গে না থেকে ভাগ হয়ে যেতে হবে আমাদেরকে। একদল যাব মিশরে, জানার চেষ্টা করব আসলে কী এবং এখন কাদের দখলে আছে। অ্যাডমিরালের ঠিকুজি সন্ধানে আরেকদল যাবে ফ্রান্সে।

আমরা বুড়ো-বুড়ি যেতে পারি ফ্রান্সে, প্রস্তাব দিলেন ডিসুজা।

দুঃখিত, বলল রানা। আপনাদেরকে বিপদে ফেলতে চাই না আর। …লামিয়া, তুমি বরং ফ্রান্সে যাও।

লামিয়ার মোবাইলে মেসেজ এসেছে, ওটা দেখছিল সে; রানার কথা শোনামাত্র মুখ তুলে তাকাল। কপালের উপর নেমে-আসা চুল সরাল একঝটকায়, কুটি করে বলল, নিজেরা যাবে মিশরে, ঝাঁপিয়ে পড়বে বিপদের মুখে, আর আমাকে পাঠাতে চাইছ ফ্রান্সে যেখানে হয়তো ঘোরাঘুরি করা ছাড়া আর কোনও কাজই থাকবে না? তাড়াতে চাইছ? জীবনেও যাব না আমি ফ্রান্সে!

মুখ চাওয়াচাওয়ি করল রানা আর সোহেল।

আমাকে জোর করলে তোমাদের দুজনকেই ফ্রান্সে পাঠিয়ে আমি একা যাব মিশরে, বলল লামিয়া। মনে রেখো, এই মিশনে আমিই ডেকে এনেছি তোমাদেরকে

ঠিক। তুমি সাহায্য না চাইলে আমরা এসবে জড়াতাম না। ভাবছ, এখন ইচ্ছে করলেই বিদায় করে দিতে পার আমাদের? নরম গলায় বলল সোহেল।

না, তা ঠিক নয়। তোমাদের দেশের স্বার্থও যেহেতু জড়িত, আমি বিদায় করবার কেউ না।

মনে হচ্ছে, আলাদা কাজ করতে পারলেই ভালো হতো, তাই না? মধুর হাসি হাসল সোহেল, তা হলে এখন থেকে আমরা দুজন আলাদাই হয়ে যাই, কী বলো?

একথা বলেছি আমি? আমি প্যারিসে গিয়ে লুভর দেখব না–এই হচ্ছে সোজা কথা। তোমাদের সঙ্গে ইজিপ্ট যাচ্ছি।

রানা বা সোহেলের কেউ কিছু বলল না।

 তেজ একটু কমল লামিয়ার। দুটো ক্লু পেয়েছি।

 কৌতূহল ফুটল সোহেলের চোখে। কী?

আমাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মারা পড়েছে যেসব গুণ্ডা, তাদের একজনের পরিচয় জানতে পেরেছে ইন্টারপোল।

কে লোকটা?

মোবাইলের মেসেজের দিকে আবার তাকাল লামিয়া। ছত্রখান হয়ে-যাওয়া একটা ইজিপশিয়ান-স্পেশাল-ফোর্সের সদস্য। হোসনি মুবারাকের শাসনামলে সক্রিয় ছিল ফোর্সটা। শেষদিকে মিশরের একটা অপরাধচক্রে পর্যবসিত হয়।

তারমানে মিশরই এখন আমাদের প্রধান টার্গেট, বলল রানা। দ্বিতীয় ক্লুটা কী?

তোমার-দেয়া হুসাইন আখতারের স্যাটেলাইট ফোন নম্বর। ট্রেস করা গেছে ওটা। পুলিশ নিশ্চিত, মাল্টায় একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে ওটা, এবং এই মুহূর্তে কায়রোয় ব্যবহৃত হচ্ছে।

একটু আগে মোবাইল নিয়ে কী যেন করছিলে। পাল্টা মেসেজ দিয়েছ নাকি?

হু, আমার টিমকে। ওরা কাজ শুরু করে দিয়েছে। মিশরে যাচ্ছি আমি। তোমাদের ইচ্ছা হলে আমার সঙ্গে এসো, না হলে… কথা শেষ না করে মানে বুঝিয়ে দিল লামিয়া।

মুচকি হাসল রানা। আমরাও যাচ্ছি মিশরে, কিন্তু তোমার সঙ্গে নয়। দুই দলে কাজ করলে ভালো এগোনো যাবে।

তা হলে ফ্রান্সে যাবে কে? জিজ্ঞেস করল লামিয়া।

আসিফ আর তানিয়া।

আসিফ-তানিয়া? ওরা কারা?

আমাদের টিম।

.

২০.

খালিদকে নিয়ে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যখন হাজির হলো আসিফ আর তানিয়া, সেখানকার অবস্থা দেখে দমে গেল ওরা।

যেন ঢল নেমেছে আহত-রক্তাক্ত মানুষের। কেউ ছুরি খেয়েছে, ঘুসি মেরে ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে কারও নাকমুখ, কারও কারও শরীরে বুলেটের ক্ষত। কারণ দাঙ্গা শুরু হয়েছে। বেনগাজিতে। পানির অভাব প্রকট হচ্ছে দিন দিন, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। পত্রিকায় এটাই এখন প্রধান ইস্যু।

ইমার্জেন্সি রুমের একটা কোনা খালি আছে দেখে সেখানে ঠাই নিল আসিফরা। খালিদের অবস্থা দেখে তাকে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো ওটিতে। আগেই খবর দেয়া হয়েছিল, তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হয়ে গেল লিবিয়ান সিকিউরিটি সার্ভিসের একজন সদস্য। আসিফ-তানিয়াকে প্রায় আধ ঘন্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করল লোকটা। জেনে নিল খালিদের সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হয়েছে ওদের, কেন এসেছে ওরা লিবিয়াতে, আজ ঠিক কী ঘটেছে পাম্পিংস্টেশনে ইত্যাদি।

চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না আসিফ-তানিয়ার কথা বিশ্বাস করেছে সিকিউরিটির লোকটা। পাম্পিংস্টেশনের আরও দু চারজন কর্মী কর্তব্যের খাতিরে সঙ্গ দিচ্ছে আসিফ-তানিয়াকে, ওরাও বলল কীভাবে কী ঘটেছে, তারপরও নোট নিল লোকটা। বিদ্রোহীদের হামলা এবং আসিফদের পালানোর ব্যাপারে আরও কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল।

ওটির বাইরে নীরবতা। শেষপর্যন্ত কী হবে খালিদের তা নিয়ে আসিফ-তানিয়া চিন্তিত। পাম্পিংস্টেশনে যে-কর্মীরা আছে, তারা ভাবছে কখন যেতে পারবে হাসপাতাল থেকে।

বাইরে থেকে ধাক্কা মেরে খুলে ফেলা হলো করিডোরের দরজা, চাকাওয়ালা স্ট্রেচারে করে আরেক লোককে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওটির দিকে। রক্তাক্ত লোকটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিকিউরিটি এজেন্ট, চেহারায় দুশ্চিন্তা।

এসব ঘটতে শুরু করল কখন? জিজ্ঞেস করল তানিয়া। এভাবে চলতে থাকলে একটু পরে তিলধারণের জায়গা থাকবে না হাসপাতালে!

বেনগাজির কোনও কোনও এলাকায় পানির সরবরাহ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার, বলল সিকিউরিটি এজেন্ট। তারপরই শুরু হয়েছে দাঙ্গা। আজ বিকেলে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে সেটা। রেশনিং করে পানি দিতে চাইছে। সরকার, কিন্তু এসব বুঝবার মতো বুঝ কই আমজনতার? মরিয়া হয়ে উঠেছে ওরা। আমার মনে হয় উত্তেজিত করে তোলা হয়েছে ওদেরকে।

উত্তেজিত করা হয়েছে? বলল আসিফ। কে করেছে?

ইদানীং লিবিয়ার ওপর চোখ অনেকেরই। মিশরের গুপ্তচরেরা ঢুকে পড়েছে আমাদের বিভিন্ন শহরে। প্রশ্ন করতে পারেন, কেন? উত্তর: জানি না। শুধু জানি, বিদেশি এজেন্টরা এখন খোলাখুলি চলাফেরা করছে এদেশে।

সেজন্যই কি বিশ্বাস করতে পারছেন না আমাদেরকে? বলল তানিয়া। ভাবছেন আমরাই ক্ষতি করেছি মিস্টার খালিদের?

তাকে গতমাসেও খুন করার চেষ্টা হয়েছে, ঘুরিয়ে জবাব দিল এজেন্ট। যে বা যারা পানির জন্য উত্তেজিত করছে সাধারণ মানুষদের, তাদের শত্রু তিনি। কারণ একমাত্র তিনিই পারেন পানি কমে যাওয়ার কারণ বের করতে, সমস্যাটার সমাধান করতে। তাঁকে যদি সরিয়ে দেয়া যায়, বুঝতেই পারছেন কী হতে পারে।

ওটি থেকে বেরিয়ে এলেন একজন সার্জন, এদিকওদিক তাকিয়ে বুঝে নিলেন কারা আছে খালিদের সঙ্গে। ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এসে মাস্ক সরালেন। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে বেচারার, চেহারা বিধ্বস্ত। বোঝা গেল গত কয়েকদিন ধরে একটানা খেটে যাচ্ছেন রোগীদের পেছনে।

লোকটা বেঁচে আছে, সুখবর শোনালেন তিনি। এবং একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছে। একটা বুলেট লেগেছে ঊরুতে, হাড়ের কোনও ক্ষতি হয়নি। আর পেটে যা ঢুকেছিল তা আসলে বুলেট না, ছিটকে-আসা লোহার টুকরো। ভাইটাল কোনও অর্গানের ক্ষতি হয়নি।

কথা বলা যাবে মিস্টার খালিদের সঙ্গে? বলল তানিয়া।

এখনই না। অ্যানেসথেশিয়ার প্রভাব শেষ হতে সময় লাগবে। হাতঘড়ি দেখলেন সার্জন। আরও আধ ঘণ্টা পরে দেখা করতে পারবেন।

পকেট থেকে আইডি ব্যাজ বের করল এজেন্ট। আমাকে এই মুহূর্তে দেখা করতে হবে তাঁর সঙ্গে। ভিতরে নিয়ে চলুন আমাকে।

গাউন পরতে হবে আপনাকে। আর…বেশিক্ষণ কথা বলতে পারবেন না।

এজেন্টকে ড্রেসিংএরিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন সার্জন, এমন সময় বেজে উঠল তানিয়ার স্যাটেলাইট ফোন। স্ক্রিনে নামটা দেখামাত্র একইসঙ্গে আশ্চর্য ও খুশি হলো সে। মাসুদ ভাই!

এদিকওদিক তাকিয়ে ব্যালকনির দিকে ইঙ্গিত করল আসিফ। চলো ওখানে যাই। তাজা বাতাস পাওয়া যাবে।

ব্যালকনিতে এসে ফোনের রিসিভ বাটন চাপল তানিয়া।

কী খবর? জানতে চাইল রানা।

সংক্ষেপে কিন্তু গুছিয়ে সব বলল তানিয়া।

শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল রানা। তারপর বলল, একটা কাজে ফ্রান্সে যেতে হবে তোমাদেরকে।

ফ্রান্স? কিন্তু আমাদেরকে যে লিবিয়ায় থাকতে হবে?

খরা আর মিস্টার খালিদের কারণে তো? কিন্তু ওসব আপাতত ছেড়ে দিতে হবে অন্য কারও দায়িত্বে। বেনগাজি থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে, এ-রকম একটা প্লেনে তোমাদের দুজনের ব্যবস্থা করিয়ে দিচ্ছি।

কী হয়েছে, মাসুদ ভাই?

প্লেনে উঠলেই জানতে পারবে।

যদি সেটাতে উঠতে দেয়া হয় আমাদেরকে, সিকিউরিটি এজেন্ট এবং লোকটার জিজ্ঞাসাবাদের কথা রানাকে জানাল তানিয়া।

যদি কোনও কারণে আটকা পড়ে যাও, জানিয়ে আমাকে।…রাখছি। লাইন কেটে দিল রানা।

ওটি থেকে বেরিয়ে এল সিকিউরিটি এজেন্ট, আসিফ তানিয়াকে খুঁজে নিয়ে হাজির হলো ব্যালকনিতে। আপনাদের ব্যাপারে আর কোনও সন্দেহ নেই আমার মনে। সব বলেছেন মিস্টার খালিদ।

তারমানে যেতে পারি আমরা? বলল তানিয়া।

মাথা ঝাঁকাল এজেন্ট।

মিস্টার খালিদকে বিদায় জানিয়ে সোজা চলে যাব। এয়ারপোর্টে, ওটির উদ্দেশে পা বাড়াল আসিফ।

.

বিসিআই হেডঅফিস, মতিঝিল, ঢাকা।

ফোনে অ্যাডমিরাল হ্যাঁমিল্টনের সঙ্গে কথা বলছেন মেজর জেনারেল (অবঃ) রাহাত খান।

গত বারো ঘন্টায় ব্যাপক রদবদল ঘটে গেছে উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে, বললেন হ্যাঁমিল্টন। পতন ঘটেছে তিউনিসিয়া আর আলজেরিয়া সরকারের। মসনদে বসতে ইচ্ছুক নতুন নতুন জোট গড়ে উঠছে সেখানে। এসবের জন্য দায়ী উত্তরোত্তর বাড়তে-থাকা সন্ত্রাস আর খরা।

চুরুটের সুগন্ধী ধোঁয়ায় নিজের অফিস আচ্ছন্ন করে ফেলেছেন রাহাত খান। আমি অন্তত আশা করিনি এত জলদি পতন ঘটবে আলজেরিয়া সরকারের।

বিশ্বাসঘাতক অনেকেই আছে ওদের প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে। আছে গৃহযুদ্ধ উস্কে দেয়ার মতো অনেক লোক। …উত্তর আফ্রিকার উপর সিআইএ একটা অ্যাসেসমেন্ট পাঠিয়েছে হোয়াইট হাউসে, এক কপি এসেছে আমার হাতেও।

লিবিয়া সরকারের ভাগ্য ঝুলছে সুতোয়।

ওদেরকে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে ইটালি।

হোয়াইট হাউস কী চায়?

ওরা চায়, লিবিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটুক। জনগণের সমর্থন নিয়ে নতুন কোনও দল আসুক।

তাতে কি পানিসমস্যার সমাধান হচ্ছে?

মনে হয় না।

আলজেরিয়া-তিউনিসিয়ার ব্যাপারে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য কী?

আসলে উত্তর আফ্রিকায় যেসব দেশেই গৃহযুদ্ধ দেখা দিয়েছে বা দিতে যাচ্ছে, তাদের সরকারকে নতুন করে সাহায্য দিতে চাইছে না হোয়াইট হাউস। …রানা-সোহেলের কী খবর?

মিশরে গেছে।

.

কায়রোর যে-রাস্তা দিয়ে ভাড়া-করা গাড়ি চালাচ্ছে রানা, সেখানে গাড়িঘোড়ার চেয়ে মানুষ বেশি। কোন গাড়ি কোনদিক দিয়ে যাচ্ছে তা দেখারও প্রয়োজন বোধ করছে না লোকজন, অবলীলায় রাস্তা পার হচ্ছে। একটু পর পর ব্রেক চাপতে হচ্ছে রানাকে।

ওর পাশে বসে আছে সোহেল। পেছনের সিটে বসা লামিয়া স্যাটেলাইট থেকে ডেটা রিসিভ করছে নিজের আইপ্যাডে। কিছুতেই ওদের সঙ্গ ছাড়তে রাজি হয়নি মেয়েটা, আঠার মত সেঁটে গেছে রানা-সোহেলের সঙ্গে।

আগে বাড়ছে আখতার, বলল মেয়েটা।

অথবা ওর ফোন, মন্তব্য করল রানা। ব্রেক চাপতে বাধ্য হয়েছে আবারহুট করে গাড়ির সামনে চলে এসেছিল বেতাল এক পথচারী। রাস্তার এদিকটা খানাখন্দে ভরা।

সুচতুর অপরাধীও কোনও-না-কোনও ভুল করে, অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে এমন কোনও সূত্র ফেলে যায় যা পরে ধরিয়ে দেয় তাকে; তা-ই করেছে হুসাইন আখতার। মাল্টায় যে-স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করেছে, সেটাই ব্যবহার করছে মিশরে। স্যাটেলাইটের সঙ্গে কানেক্টেড হয়েছে লামিয়া, কোনদিকে যেতে হবে বলে দিচ্ছে রানাকে। তবে ফোনটা আখতারই ব্যবহার করছে কি না, না দেখা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

রানার ধারণা, নিজেদের আস্তানায় যাচ্ছে আখতার।

বাঁদিকে মোড় নাও, রানাকে বলল লামিয়া। গতি কমাচ্ছে সে।

বাঁদিকের রাস্তায় যাওয়ামাত্র আখতারের গতি কমানোর কারণ বুঝতে পারল রানা। সারি সারি দোকান আর রেস্টুরেন্ট এখানে, দুধারের ফুটপাত বোঝাই হয়ে আছে মানুষ দিয়ে। গাড়িঘোড়া এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে।

এদিকওদিক তাকাচ্ছে সোহেল। আরবি আর ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় কোনটা সোনার দোকান, কোনটা ইলেকট্রনিক্সের, আর কোনটা কার্পেটের। কোনও কোনও দোকানের বাইরে নিজেদের পসরা সাজিয়ে বসে গেছে ফলৈর ব্যাপারীরা।

কয়েক ব্লক এগোনোর পর রানাদের গাড়ি হাজির হলো নীল নদের পুব তীরে। এখন একটা পোতাশ্রয় ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে।

পোতাশ্রয়ের একজায়গায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কয়েকটা ক্রেন। কতগুলো বার্জ থেকে শস্যদানার বিশাল বিশাল বস্তা নামানো হচ্ছে। জাহাজঘাটায় অপেক্ষায় আছে চার-পাঁচটা ফেরি, গাড়ি আর মানুষ সারি বেঁধে উঠছে সেগুলোতে। জাহাজঘাটার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে অনেকগুলো ফিশিংবোট আর প্রমোদতরী।

এসবের উপর থেকে চোখ সরাল রানা। আমাদের টার্গেট কোথায়?

ক্ষুদ্রাকৃতির লাল একটা বৃত্ত জ্বলছে-নিভছে আইপ্যাডে, সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে লামিয়া। কিছুক্ষণ পর বলল, নীল নদের দিকে যাচ্ছে। আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল দূরের একটা ভাঙাচোরা ফুটপাত।

ওই জায়গায় জমিন ঢালু হয়ে নেমে গেছে তীরের দিকে। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বানানো আছে ওখানে।

পোতাশ্রয়ের সঙ্গের একটা পার্কিংলটে গাড়ি থামাল রানা। নামল গাড়ি থেকে।

লামিয়া আর সোহেলও নামল। আইপ্যাড এখনও আছে। মেয়েটার কাছে।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল তিনজনে, একটু দাঁড়াল। সরু ডকইয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে আছে রানা। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা চলমান মূর্তিকে।

আখতার, নিচু গলায় বলল রানা। কোনও সন্দেহ নেই।

যেন কিছুই দেখছে না, কোনওকিছুতেই যেন কোনও পরোয়া নেই, এমনভঙ্গিতে ধূসর একটা পাওয়ারবোটে গিয়ে উঠল আখতার। পেছনদিকে বসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে চালু হলো ওটার ইঞ্জিন। পাওয়ারবোটটা সরে যাচ্ছে ডকইয়ার্ড থেকে।

আমাদেরও একটা বোট দরকার, বলল লামিয়া।

দ্রুত এগোল রানা, ডকইয়ার্ড ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে একসারিতে অনেকগুলো টুরিস্টবোট বাঁধা আছে। রঙচঙে একটা ওয়াটারট্যাক্সিতে উঠে পড়ল ও। ওর পেছন পেছন উঠল সোহেল আর লামিয়া।

ওদের তিনজনকে একদৃষ্টিতে দেখছে ট্যাক্সিচালক, সিগারেট ফুঁকছে। যাত্রী নেয়ার আগ্রহ নেই তার। হাতঘড়ি দেখে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, আজকের মতো কাজ শেষ আমার।

পকেট থেকে একগাদা নোট বের করে দেখাল রানা। ওভারটাইমের কথা ভুলে যাচ্ছ কেন?

চালু হয়ে গেল ওয়াটারট্যাক্সির ইঞ্জিন।

অর্ধচন্দ্রাকৃতিতে বাঁকানো স্টিলের-শিকে ক্যানভাসের ছাউনি লাগানো আছে, তিনটা সিটে বসে পড়ল ওরা।

সোজা এগোতে থাকো, বলল রানা।

মাথা ঝাঁকিয়ে আগে বাড়ল ড্রাইভার।

গতি বাড়ছে ওয়াটারট্যাক্সির, নীল নদের স্রোতের বিরুদ্ধে যুঝতে যুঝতে এগিয়ে চলেছে। নিজেদেরকে ট্যুরিস্ট প্রমাণ করার জন্য সঙ্গে-আনা ক্যামেরা বের করেছে সোহেল, এটা সেটার ছবি তুলছে। নদের মুক্তবাতাস উপভোগ করছে লামিয়া, ফালতু প্রসঙ্গে বকবক করছে, মাঝেমধ্যে তাকাচ্ছে আইপ্যাডের দিকে।

একটা বিনকিউলার বের করল রানা। দূরে দেখা যাচ্ছে আখতারের পাওয়ারবোট।

কতদূর যাবেন আপনারা? জানতে চাইল ড্রাইভার।

আপাতত শুধু যেতে থাকো, বলল রানা। কখন আর কোথায় থামতে হবে, বলে দেব। বিনকিউলার তুলে আরেকবার তাকাল পাওয়ারবোটের দিকে।

এগিয়ে চলেছে আখতার।

কয়েকটা বার্জ পাশ কাটাল রানাদের ওয়াটারট্যাক্সি। রানা আর লামিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করল সোহেল। নদের অন্যতীরে, দূরদিগন্তে, চিত্রার্পিতের মতো দেখা যাচ্ছে গিজার পিরামিডগুলো। বিকেলের রোদ কমলা আভা মেখে দিয়েছে আকাশে; দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, অদ্ভুত সে-আলোয় আলোকিত হয়ে কমলা রঙ ধারণ করেছে পিরামিডগুলোও।

দক্ষিণদিকে মোড় নিয়েছে আখতার, বলল লামিয়া। নদের আরেকপাড়ের দিকে যাচ্ছে।

ড্রাইভারকে দিক বদল করতে বলল রানা।

কাছিয়ে আসছে নীল নদের পশ্চিমতীর। এলাকাটা অনুন্নত-পুব তীরে আছে সারি সারি অ্যাপার্টমেন্ট, হোটেল আর অফিস; পশ্চিম তীরে কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত অতি-পুরনো কিছু দালান। তবে যেন আশার-আলো হয়ে আছে নতুন একটা কন্ট্রাকশন প্রজেক্ট। কতগুলো ক্রেন, বুলডোজার আর সিমেন্ট-বোঝাই ট্রাক দেখা যাচ্ছে ওখানে।

বোঝা গেল, ব্যক্তিগত স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে পশ্চিমতীরের বড় একটা অংশে। কয়েকটা বিল্ডিং আর পার্কিং এরিয়ার কাজ শেষের পথে। কাঁটাতারের উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে পুরো জায়গা, যত্রতত্র ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে বড় বড়, ব্যানার, যেগুলোতে একইসঙ্গে আরবি ও ইংরেজিতে লেখা আছে: আমেনথেস কন্ট্রাকশন। নির্মাণশৈলীর বিচারে কোম্পানিটার কাজ নিঃসন্দেহে মনোমুগ্ধকর, কিন্তু রানার খটকা লাগল অন্য কারণে।

একটা কৃত্রিম খাল খনন করা হয়েছে প্রজেক্টের একপাশে, নদের তীর ঘেঁষে। ওটা কমপক্ষে এক শ ফুট চওড়া এবং আধ মাইল দীর্ঘ। লামিয়ার আইপ্যাডে স্যাটেলাইট থেকে যে সিগনাল আসছে, তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আমেনথেসের প্রায় পুরো প্রজেক্ট ঘিরে আছে ওই খাল। কংক্রিটের পুরু একটা পার্টিশন-দেয়াল নদ থেকে আলাদা করেছে ওটাকে। তীব্র স্রোতের ফেনিল পানি ছুটে চলেছে খালে, পরে জলপ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ছে নদের বুকে।

কৃত্রিম জলপ্রপাত? বিস্মিত হয়েছে লামিয়া।

 হাইড্রো-ইলেকট্রিক, বলল ড্রাইভার। আমেনথেস পাওয়ার অ্যাণ্ড লাইট।

ইন্টারনেটের সাহায্য নিল লামিয়া। নদের একজায়গায় পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে কৃত্রিম পদ্ধতিতে, বদলে দেয়া হচ্ছে পানির গতিপথ, বাধ্য করা হচ্ছে তীব্র গতিতে খাল বেয়ে ছুটে আসতে। ওখানে কতগুলো সাবমার্জড় টারবাইন আছে। ঘণ্টায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ওই পাওয়ার-প্লান্ট। আমেনথেস কন্ট্রাকশনের ওয়েবসাইট বলছে, নদের তীরে আরও উনিশটা প্লান্ট স্থাপন করেছে। ওরা-পুরো মিশরের বিদ্যুচ্চাহিদা পূরণ করতে চায়।

বিনকিউলার দিয়ে জলপ্রপাতটা কিছুক্ষণ দেখল রানা। তারপর ওটা নামিয়ে লামিয়াকে বলল, খাল থেকে বের হওয়া পানির লেভেলের সঙ্গে নদের পানির লেভেলের কয়েক ফুট পার্থক্য আছে। বিনকিউলার এগিয়ে দিল লামিয়ার দিকে।

ব্যাপারটা দেখল লামিয়া, তারপর সোহেলও।

বিনকিউলার রানার হাতে ফিরিয়ে দেয়ার সময় সোহেল বলল, আমার মনে হচ্ছে বাড়তি পানি বেরিয়ে যাওয়ার কোনও নির্গমনপথ বানানো হয়েছে।

কোথাও কোনও বাধ আছে মনে হয়, বলল লামিয়া।

মাথা নাড়ল রানা। নেই। ভালোমতো দেখেছি। খাল আর নদের পানির লেভেল সমান থাকার কথা। শুধু তা-ই না, খাল বেয়ে ছুটে-আসা পানির গতি নদের পানির গতির তুলনায় কম হবে, কারণ ওই পানি অনেকগুলো টার্বাইন ঘোরাচ্ছে।

খালের পানির গতি ত্বরান্বিত করার বিশেষ কোনও উপায় বের করেছে ওরা? সোহেলের কণ্ঠে যতটা না জিজ্ঞাসা, তারচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা।

আবারও বিনকিউলার তুলল রানা, কন্ট্রাকশন সাইটের দিকে তাকাল। পাহারার কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে ওখানে। উর্দিপরা অনেক গার্ড আছে, তাদের কয়েকজনের হাতে শিকলবাঁধা অ্যালসেশিয়ান। খিলানের মতো করে বানানো মূল এন্ট্রেন্সের গেট বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে, যখন কোনও গাড়ি ঢুকছে তখন ভালোমতো পরীক্ষা করা হচ্ছে ওটাকে।

আমেনথেসের ওই প্লান্টকে একটা মিলিটারি ঘাঁটি বলে মনে হচ্ছে আমার, বলল রানা।

আখতার গিয়ে ঢুকেছে ওখানে, আইপ্যাডের উপর চোখ লামিয়ার।

আমেনথেসের ইতিবৃত্ত জানতে হবে আমাদেরকে, বলল রানা। আখতার যদি আর বের না হয়, ওই প্লান্টে ঢুকতে হবে।

জাদুঘরের গুদামে ঢোকার চেয়ে ওই প্লান্টে ঢোকা অনেক। কঠিন, বলল লামিয়া।

অফিশিয়াল কোনও বাহানার দরকার হবে আমাদের। সরকারি কিছু হলে সবচেয়ে ভালো হয়। তোমার বন্ধুরা কোনও সাহায্য করতে পারবে?

মনে হয় না। এদেশের প্রভাবশালী কোনও মহলের সঙ্গে খাতির নেই আমার বন্ধুদের।

সোহেলের দিকে তাকাল রানা, চোখে চোখে কথা হয়ে গেল দুজনের।

লুঙ্কর হোসেইনির কাছে যাবে ওরা (নরকের কীট দ্রষ্টব্য)। প্রমোশন পেয়ে এখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েছে সে।

যেখান থেকে উঠেছিলাম, ওয়াটার ট্যাক্সির চালককে বলল রানা, সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে চলো আমাদেরকে।

<

Super User