দুপুর পার করে তারপর জেনেভা হার্বারে পৌঁছল সেইলবোট। মোলান পরের দিকে প্রশমিত হয়ে এসেছিল অনেকখানি। সূর্যকিরণ ঝিকমিক করছে এখন হ্রদের পানিতে। কুয়াই-ডু-মন্ট-ব্লা-র কাছে বন্দরের ফোয়ারাটা শুন্যে দুশো ফীট ছুঁড়ে দিচ্ছে দুধ-সাদা ফেনা। জলকণাগুলো অগুনতি খুদে খুদে রংধনু হয়ে ঝরে পড়ছে নিচে।

রানা সুটকেস ও লাঞ্চ হ্যাঁম্পারটা বইছে, জুলিকে তাগাদা দিল কুয়াই থেকে শিগগিরি সরে পড়ার জন্যে। ওদেরকে স্পষ্ট করা হয়েছে মনে করে না রানা, কিন্তু কোন ঝুঁকি নিতেও রাজি নয়।

তোমাকে কিছুক্ষণের জন্যে একা থাকতে হবে, বলল ও। তবে ভয়ের। কিছু নেই। রানা এজেন্সীর ডিপোটার কথা উল্লেখ করল না রানা। রু গাস্টনে বাঁক নিয়েছে ওরা এ মুহূর্তে।

সিভিক গার্ডেনসের একটা বেঞ্চিতে ব্যারোনেসকে বসিয়ে, লাঞ্চ হ্যাঁম্পারটা পাশে রাখল রানা। নো চিন্তা ডু ফুর্তি, আশ্বস্ত করল। পিকনিক করতে এসেছ তুমি, অপেক্ষা করছ একজনের জন্যে। অস্থির হয়ে উঠছ তার দেরি দেখে। পুলিশ বা আর কেউ কৌতূহলী হলে একটু অভিনয় দেখিয়ে দিয়ো। তবে তার দরকার পড়বে মনে হয় না। ভদ্রমহিলাদের ওরা ঘটায় না। আর যদি অন্য ধরনের বিপদ আসে, ও দুটো তো আছেই। যুবতীর সুগঠিত পা দুটো গ্রে স্ন্যাক্সে মসৃণ দেখাচ্ছে আরও। কি, আছে তো? পা লক্ষ করে বলল।

রানার বাহুতে চাপ দিল ব্যারোনেস। আছে। আশা করি ওগুলোর দরকার পড়বে না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো কিন্তু, রানা। পর যত তাড়াতাড়ি পারি। বাদামঅলার কাছ থেকে এক ঠোঙা বাদাম কিনে ব্যারোনেসকে দিল রানা। কবুতরকে খাওয়াতে থাকো। সময় কাটবে।

ব্যারোনেসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে পড়ল রানা। খদ্দেরদের ভিড়ে মিশে গিয়ে এক সময় সাইড ডোর দিয়ে বেরিয়ে গেল। দুবার ক্যাব পাল্টে, শেষ ছটা ব্লক হেঁটে মেরে দিল। বিল্ডিংটায় প্রবেশ যখন করল তখন নিশ্চিত ও, কেউ নেই পিছনে। অন্ধকার সিঁড়িগুলো টপকানোর সময় মৃদু হাসি ফুটল ওর মুখে। এমুহর্তে ওরা মাসুদ রানার প্রতি আগ্রহী নয়, রানার চিন্তা-ভাবনায় যদি কোন ভুল না হয়ে থাকে।

পাঁচ মিনিট পর ঢাকায় মেজর জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ হলো রানার। সংক্ষেপে যা যা ঘটেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিল ও। একমনে শুনে গেলেন  বস, বাধা দিলেন না।

স্যার, সবশেষে বলল রানা, ব্রিগল শিগগিরিই চাল দেবে। তার আগে। আমার কন্টেস ডি কারেন্ধু সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার দরকার।…জ্বী, কা-রে সু। উনি প্যারিসে থাকেন। এক সময়কার বিখ্যাত পিয়ানিস্ট।

আর কিছু?

ব্যাঙ্কে ওয়াচ রাখার দরকার নেই, স্যার, বসকে বলল রানা। বর্ডারের পাহারাও তুলে নিতে বলুন। ব্রিগল সতর্ক হয়ে যাক সেটা চাইছি না। ওকে খোলাখুলি মোকাবিলা করতে চাই আমি। আমার সবচেয়ে যেটা অবাক লাগছে, ও বসে বসে অপেক্ষা করছে, নিজেকে ওপেন করছে না। দুনিয়ার সমস্ত সময় যেন হাতে ওর। ব্যাপারটা আমার একদমই পছন্দ হচ্ছে না। লোকটা অসম্ভব ধূর্ত এবং তার সংগঠনটাও শক্তিশালী। সময় যত যাবে ততই শক্তি সঞ্চয়। করবে ও। মুখোমুখি হতে না পারলে আঘাত হানব কিভাবে?

হুমমম বসকে সন্দিহান মনে হলো। দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছে রানা, ডেস্কের পেছনে বসে আছেন বৃদ্ধ। কাঁচা-পাকা ভুরুজোড়া কুচকানো তার, তুরুপের তাস, ঠোঁটে নিভে যাওয়া চুরুট। কম্পিউটারের গতিতে চলছে মগজ।

কাজটা একা করতে চাইছ? বসের সন্দেহ তখনও কাটেনি।

জ্বী, স্যার। ওর সঙ্গে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া আছে আমার, আপনি জানেন। তাছাড়া নাকাতার চাবির টুকরোটা এখন আমার কাছে। ওটা ছাড়া ব্রিগল কানা। খোলস ছেড়ে বেরোতে ওকে হবেই, স্যার। এবং খুব শিগগিরিই ঘটতে যাচ্ছে সেটা। আমি নিজেও অবশ্য একটা টোপ দেব ঠিক করেছি। এইবার বস ওর পরের কথাগুলো পছন্দ না-ও করতে পারেন।  

কি টোপ দেবে, রানা? বসের কণ্ঠস্বর শুকনো, প্রশ্নবোধক। কপালে ভাজ, আবারও কুঁচকে উঠেছে কাঁচা-পাকা ভুরু, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে রানা মনের আয়নায়।

ব্যারোনেসকে ব্যবহার করব টোপ হিসেবে, বলল রানা। ওকে সিভিক গার্ডেনসে বসিয়ে রেখে এসেছি। আমি শিয়োর ওখানে ফলো করা হয়েছে। আমাদের, যদিও বলিনি সেটা ব্যারোনেসকে। ওরা যদি কিডন্যাপ করে। ব্যারোনেসকে, এবং আমার ধারণ করবে, তাহলেই রাস্তা খুলে যায়।

দীর্ঘ নীরবতা। স্ক্র্যামলারের ও প্রান্ত থেকে বসের গলা খাকরানির শব্দ। শুনতে পেল রানা।

ব্যাপারটা খুবই রিস্কি, রানা। বন্ধুদেশের কাছ থেকে ধার নেয়া হয়েছে। ওকে। ওর সমস্ত দায়-দায়িত্ব আমাদের। আমি এটা অ্যাপ্রুভ করতে পারি না।

যা করার তা তো করেই ফেলেছি, স্যার, খুশিখুশি গলায় বলল রানা। আপনাকে জিজ্ঞেস করার সময় পাওয়া গেল না। তবে আমি শিয়োর বুদ্ধিটা কাজে দেবে, স্যার।

কিন্তু মেয়েটাকে তুলে দিয়ে তুমি তো ওদের আপারহ্যান্ড দিয়ে দিলে।

আমি সেভাবে দেখছি না, স্যার। ও স্রেফ গো-বিটউইনের কাজ করবে। . আমার মনে হয় না ব্রিগল মেয়েটার ক্ষতি করবে-অন্তত এত তাড়াতাড়ি না।

কাশতে শোনা গেল মেজর জেনারেলকে। মেয়েটাই একমাত্র ব্রগলের এখনকার চেহারা চেনে। একথা জানার পরও বলছ বাঁচিয়ে রাখবে ওকে

জী না, স্যার, স্বীকার করল রানা। মেরে ফেলার চেষ্টাই করবে।

তাহলে কিভাবে তুমি- মেজর জেনারেল গর্জে উঠতে যাচ্ছিলেন।

পারবে না, স্যার, কথা দিল রানা। ওকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছি . আমি, উদ্ধারও করব আমি।.কোন ক্ষতি হবে না ওর।

অত নিশ্চিত হচ্ছ কি করে? চাবির টুকরোটা?

হ্যাঁ, স্যার, চাবির টুকরো পেতে হলে আমার সাথে সমঝোতায় আসতে হবে ব্রিগলকে। তা নাহলে ওর এতদিনকার অপেক্ষার কোন মূল্য থাকবে না। আর আমার সাথে ডিল করতে হলে, ও জানে, মেয়েটার কোন ক্ষতি করা চলবে না। আরেকটা ব্যাপার হলো ওর সময় ফুরিয়ে আসছে-ব্যারোনেস আমাকে বলেছে আবারও নাকি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। ওকে। এবং সুইস ব্যাঙ্কও চিরদিন ডিপোজিট হোন্ড করবে না। আইনটা জানা নেই আমার, তবে মনে হয় ভল্ট বাজেয়াপ্ত করার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

এসবই জানে ব্রিগল। ফাঁদে পড়ে গেছে সে। আমিই এখন তার একমাত্র আশা-ভরসা! চাবির টুকরোটা উদ্ধার করতেই হবে ওকে-এবং তা করতে হলে সামনাসামনি হতে হবে। ও হয়তো জানে না, কায়সার আমার বন্ধু ছিল। আর জানলেই বা কি, শত্রুর মুখোমুখি ওকে হতেই হচ্ছে।

হ্যাঁ, আর কিছু বলবে?

 আমি এখন কাজে নেমে পড়ছি, স্যার, বলল রানা। ভাত ছিটালে কাক আসবে-কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাফ সুতরো করে ফেলব সব কিছু। একটা কথা, স্যার, আমি না চাইলে যাতে সাহায্য করা না হয়। আমি নিজের মত করে সারতে চাই কাজটা।

বুঝেছি। তোমার মনের মধ্যে কি চলছে জানি আমি, রানা, বললেন। মেজর জেনারেল। কিন্তু প্রতিশোধের নেশায় হুট করে কোন বিপদ ডেকে এনো না আবার। বি কেয়ারফুল।

রাখি, স্যার?

ডিপো থেকে বেরিয়ে সিভিক গার্ডেনসে ফেরার পথে মৃদু শিস দিচ্ছে রানা। ব্যারোনেসকে দেখতে পাবে না, আশা করছে। কুয়াই থেকেই পিছু নেয়া হয়েছে ওদের নিশ্চিত ছিল রানা, ব্যারোনেসকে মিথ্যে কথা বললেও ফেউটাকে স্পট করতে পেরেছিল ও। বেটে মোটা এক লোক। পরনে ছিল লেদার উইন্ডব্রেকার আর ট্রিলবি হ্যাট।

এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। রানা আশা করেনি লেকে বৈঠা বাইলেই থোকা খেয়ে যাবে ব্রিগলের লোকেরা। আচমকা ঝড় বোকা বানাবে এদের তেমন। সম্ভাবনাও খুবই ক্ষীণ। রানা আর জুলিকে অন্য কোন বোট তুলে নেবে ওরা কি আর বোঝে না? প্রশ্ন থাকতে পারে কেবল ওদের গন্তব্য সম্পর্কে। কিন্তু, রুডলফ ব্রিগলের সংগঠন বেশ বড় প্রতিটি সম্ভাব্য বন্দর কভার করবে তারা।

ব্যারোনেসের যেখানটায় অপেক্ষা করার কথা তার কাছাকাছি পৌঁছে হাঁটার গতি বাজল রানা। উদ্বিগ্ন এক লোক যেন তড়িঘড়ি হেঁটে চলেছে। রুডলফ ব্রিগলের চোখে ধুলো দিতে হলে নিখুঁত হতে হবে অভিনয়টা।

বেঞ্চিটা দূর থেকেই খালি দেখতে পেল রানা। পা চালিয়ে চলে এল ওটার কাছে, ভ্রূ কুঁচকে ইতিউতি চাইছে। ব্যারোনেসই। চমৎকার। সুকৌশলে, পেশাদারী দক্ষতা দেখিয়ে নিশ্চয়ই কাজটা সেরেছে তারা। অস্ত্র ব্যবহার করবে কি, হয়তো লোকের দৃষ্টি আকর্ষণেরও সুযোগ পায়নি ব্যারোনেস। রানাও ঠিক এইই চেয়েছিল। কিন্তু যদি উল্টোটা ঘটে থাকে। ব্যারোনেস ধস্তাধস্তি করতে, বগলের লোকেরা সটকে পড়তে বাধ্য হয় এবং পলিস এসে ব্যারোনেসকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে কেচে যাবে সমস্তটাই। যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকবে রানা আর ব্রিগল।

শীঘ্রি অবশ্য জানা যাবে কোনটা ঘটেছে। ব্রিগলের লোকের হাতে। ব্যারোনেস ধরা পড়লে রানার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করবে।

রানা বেঞ্চিটার সামনে তার অভিনয় পর্ব চালিয়ে যেতে লাগল। ভ্রূ কুঁচকে চিবুক ঘষে, চিন্তিত ভঙ্গিতে চারধারে নজর বুলাচ্ছে। একটা সিগারেট জ্বলে নার্ভাস ভঙ্গিতে কয়েকবার ফুক দিয়ে ফেলে দিল। ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানাচ্ছে, ওয়াচ করা হচ্ছে ওকে। কে করছে এখনও জানে না, তবে টের ঠিকই পাচ্ছে। পার্কে আসা মানুষ-জনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সে।

দশ মিনিট অপেক্ষা করল রানা। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া প্রতিটি মহিলাকে লক্ষ করল উদ্বেগভরা চোখে। ভঙ্গিটা এমন ব্যারোনেস একবার ফিরে আসুক, তারে আমি মজা দেখাব। এমন বকা দেবে রানা, যেখানে খুশি চলে যাওয়ার মজা টের পবে। প্রায়ই সুটকেসটার ওপর লাথি মেরে গায়ের ঝাল ঝাড়ছে ও।

 শেষ পর্যন্ত, যখন বুঝল ওয়াচার লোকটার বিশ্বাস জন্মানো গেছে, ঘুরে দাঁড়িয়ে মন্থর গতিতে গার্ডেনস ছেড়ে বেরিয়ে গেল রানা। হতভম্ব, গভীর চিন্তায় মগ্ন এক লোকের মত হেঁটে চলেছে ও।

শহরের প্রাণকেন্দ্রের উদ্দেশে এগোচ্ছে রানা। এক্সেলশিয়র হোটেলে এসে পৌঁছল পনেরো মিনিট বাদে। অ্যাডভান্স পেমেন্ট করে, ছেলেটার হাতে দিয়ে, নিজেই বয়ে তুলল সুটকেসটা।

এলিভেটরটা পুরানো আমলের, কন্টিনেন্টাল ধাঁচের খোলা খাঁচা একটা। ওটা হড়াক করে উধমুখী হতে, জাফরির ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল রানা, ট্রিলবি হ্যাট এইমাত্র হোটেলে প্রবেশ করে ডেস্কের দিকে যাচ্ছে। বেশি দেরি হবে না আর। দাঁত বেরিয়ে পড়ল রানার। রেজিস্টারে গোটা গোটা হরফে নাম লিখেছে। ওঃ মাসুদ রানা। বল এখন রুডলফ ব্রিগলের কোর্টে।  

ডিপোতে যখন ছিল রানা, সুটকেসটাকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। নয়া কাপড়-চোপড় সঙ্গে এখন ওর, সেই সঙ্গে দেয়া হয়েছে আরও মারাত্মক ধরনের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। শাওয়ার নিয়ে কাপড় পাল্টাল রানা, অপেক্ষা করছে। কল আসবে যে-কোন মুহূর্তে। শেভ করার সময় গুনগুনকরতে লাগল রানা।

দিনের যোগ ব্যায়াম যেই সেরেছে অমনি ঝনঝন করে উঠল। টেলিফোনটা। রিসিভার তুলে নিল রানা। ইয়েস?

 মিস্টার রানা? মিস্টার মাসুদ রানা? অনুচ্চ অথচ দঢ় ও কর্তৃত্বপূর্ণ একটা কণ্ঠস্বর। গলা শুনে বোঝা যায় এ লোক হুকুম করতে অভ্যস্ত, তামিল করতে নয়।

বাঁকা হেসে এক হাতে একটা সিগারেট বের করল রানা প্যাকেট থেকে। হ্যাঁ, আমি মাসুদ রানা। কে বলছেন, রুডলফ ব্রিগল?

দীর্ঘ নীরবতা ভঙ্গ হচ্ছে, কেবলমাত্র তারের গুনগুন শব্দের কারণে। এবার বলল কণ্ঠস্বরটা হ্যাঁ, আমি রুডলফ ব্রিগল। চিনে ফেলেছেন দেখছি।

না চিনে উপায় কি বলুন, দাঁতের ফাঁকে বলল রানা। আপনার ওপর মোটাসোটা একটা ফাইল আছে যে আমাদের কাছে।

তা তো থাকবেই, মি. রানা। আচ্ছা, আমরা বরং কাজের কথায় আসি। কুশল বিনিময়ের জন্যে ফোন করিনি আমি। সংক্ষেপে সারব-ওহ, কলটাকে ট্রেস করার কথা ভেবে থাকলে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। পাবলিক ফোন থেকে কথা বলছি আমি।

জানা ছিল, বলল রানা। তাই মাথা ঘামাইনি। কি ব্যাপারে ফোন করেছেন, তাই বলুন। যেন জানি না আমি! মনে মনে বলল রানা।

এক কথায় সারি, মি. রানা। ব্যারোনেস জুলি গ্রাফ। এটাও আন্দাজ করেছিলেন বুঝি?

করেছিলাম। ওকে ওভাবে রেখে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। আমি ভেবেছিলাম, আপনার লোকদের খসাতে পেরেছি। ভুল ভেবেছিলাম। গলায় চাতুর্যের সঙ্গে উদ্বেগ ও ক্ষোভ মিশিয়ে দিল রানা। ওকে কষ্ট দেবেন না, মি. ব্রিগল। আমি সহ্য করব না। সাবধান করে দিচ্ছি আপনাকে-ওর কিছু হলে আপনি দায়ী থাকবেন।

ঘোঁৎ করে উঠল ব্রিগল, রুক্ষ স্বরে বলল, আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে, অপেক্ষা করছি আমি, রানা। সত্যিই তর সইছে না আমার। অনেক কথাই, কানে এসেছে আপনার সম্পর্কে। আমি সেগুলো এতদিন নিছক গাল-গল্প ভেবে, উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু আপনার ধৃষ্টতা সম্বন্ধে যা শুনেছিলাম দেখছি তা মিথ্যে নয়। দর কষাকষির পর্যায়ে আপনি নেই, রানা। ব্যারোনেসের জন্যে এতটুকু কেয়ার করলে সে সুযোগ আপনার থাকতে পারে না।

ব্যারোনেসকে আমি ভীষণ কেয়ার করি, ব্রিগল। সেজন্যেই সাবধান করে দিচ্ছি, ওর কোন ক্ষতি করতে যাবেন না। তার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কাউকে আহত না করেও আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া হতে পারে।

আবার বিরতি। ফোনে দাঁত বের করে হাসল রানা। রুডলফ ব্রিগলের পূর্বকল্পিত আইডিয়াগুলো উল্টোপাল্টা করে দিচ্ছে ও। তার ফলে ধূর্ত লোকটাকেও এখন মাথা খাটাতে হচ্ছে পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্যে।

আপনি বারগেইনে ইচ্ছুক তারমানে? মেয়েটার বদলে-দেবেন আমি যেটা চাই?

আপনাকে খুন করতে পারলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম, বলল রানা, মন থেকেই। কিন্তু গ্যাড়াকলে পড়ে গেছি যেহেতু, বারগেইন না করে উপায় কি? মেয়েটাকে ফেরত চাই আমি, ব্রিগল।

 হেসে উঠল ব্রিগল। আপনি আর যাই হন ভণ্ড নন অন্তত। কিন্তু আমার ওপর কেন এত রাগ আপনার জানতে পারি?

কায়সার রশীদের কথা মনে পড়ে? ওর নিরীহ স্ত্রী, নিষ্পাপ বাচ্চাটার কথা? কঠোর হয়ে উঠেছে রানার কণ্ঠস্বর। ওরা আমার বন্ধু ছিল।

 ওপ্রান্তে দুমুহূর্তের নীরবতা। আপনি সে সুযোগ পাবেন না, শেষমেষ বলল ব্রিগল। আর বারগেইনের ব্যাপারে একটা সমঝোতায় আসতে পারি। আমরা। তবে খবরদার, রানা। আবারও সাবধান করে দিচ্ছি-কোন ট্রিকস নয়! কথাটা তোমার ভালর জন্যেই বলা হল।

ক্লান্তির ও পরাজয়ের সুর কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলল রানা। আমার ভাল আমিই বুঝব। কিন্তু দর কষাকষির অবস্থায় সত্যিই নেই আমি। তোমার মত একটা বজাতের কথায় নাচতে ঘেন্না, করছে আমার। কিন্তু নাচতে হলে আর কি করব,নাচব। তা তোমার প্রস্তাবটা কি?

আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে হিদেতোশি নাকাতার চাবির টুকরোটা এখন তোমার পকেটে, বলল ব্রিগল। আমার চাই ওটা। বিনিময়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেব ব্যারোনেসকে।

এটুকুই যথেষ্ট নয়, বলল রানা। চিতাবাঘ তুমি নিলে নাও, তারপর যেখানে খুশি চলে যেয়ো, বাধা দেব না। কিন্তু গোয়েরিঙের বাদবাকি লুটের মাল আমাকে দিতে হবে। বাংলাদেশ যাদের যাদের জিনিস তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে। কি, রাজি?

 ব্রিগল এত দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল যে ঘাবড়ে গেল রানা, অতিচালাকের না গলায় দড়ি পড়ে-সন্ত্রাসীটার মুখোমুখি হওয়া ওর কাছে এখন সব কিছুর চাইতে বেশি জরুরী। গুবলেট হয়ে গেল না তো সে সম্ভাবনা? এমনিতেই আপোষে ব্যারোনেসকে ওদের হাতে তুলে দিয়ে সন্দেই উদ্রেক করার মত কাজ করেছে

 ওপ্রান্তে শেষ অবধি জবান চালু হলো ব্রিগলের। টেলিফোনে অনেক কথা হলো, প্রাঞ্জল সুরে বলল। এখন সামনাসামনি বসে একটা ফয়সালা করা প্রয়োজন। তুমি ভিলা রিকোয় ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করবে, রানা। মাইন্ড ইট, ওয়েট। সময় মত তোমার সাথে যোগাযোগ করব আমি। আর মনে রেখো-কোন চালাকি নয়! চালাকি করতে গেলে ব্যারোনেস জুলি গ্রাফকে জ্যান্ত ফেরত পাবে না।

এবং তোমাকেও, ঠাণ্ডা গলায় কথা যুগিয়ে দিল রানা, ফ্রেঞ্চ কী-র বাকি অর্ধেকটা আর পেতে হবে না। আচ্ছা, তোমার দোসরের কি হলো বলো তোর ওর লাশের ব্যাপারে মুখে তালা মেরে রেখেছে পুলিস।

রুডলফ ব্রিগল আবারও হেসে উঠল, এবারে অকপটে। পুলিস নাকাতার কথা জানে না। এবং শুনে দুঃখ পাবে, সে মারাও যায়নি।

এহ-হে, বলল রানা। হাত খারাপ হয়ে যাচ্ছে দেখি আমার।

সে আমার জিম্মায় আছে, বলে চলেছে ব্রিগল, এবং সময় হলে তার উপযুক্ত ব্যবস্থাও করা হবে। আপাতত ওর কথা বাদ রাখো-ওর এখন কোন গুরুত্ব নেই!

 হ্যাঁ, সায় জানাল রানা। চাবি খুইয়েছে, ওর আবার কিসের দাম সলিল সমাধি ঘটতে যাচ্ছে বেচারার, আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি।খোশমেজাজে আরও বলল ও, ওজনে কোন ভুল যেন না হয়, ব্রিগল। প্রচুর ভার চাপিয়ে। আমরা চাই না ও লেকে ভেসে উঠে সবাইকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিক।

নাকাতা একটা নির্বোধ, আক্কেলসেলামী তাকে দিতেই হবে, অসন্তুষ্ট কণ্ঠে জানাল ব্রিগল। অনেক হয়েছে-ভিলায় গিয়ে অপেক্ষা করোগে যাও।

ও, বিটকেল, ব্রিগলের নামটাকে বিকৃত করে উচ্চারণ করল রানা। তোমাকে একটা কথা জানানো দরকার। ওমর আব্রাহামকে খুন করতে বাধ্য। হয়েছি আমি। এ মুহর্তের বিরতির পর খলখল করে হাসল ব্রিগল। নো ম্যাটার। ও-ও একটা অপদার্থ ছিল। হাতের পুতুল-কিন্তু তোমার সম্পর্কে চালু গল্প-গাছাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছি আমি। খুব হুশিয়ার থাকতে হবে বুঝতে পারছি।

আমাকেও, বলল রানা। গুড বাই, ব্রিগল। দেখা হচ্ছে।

আউ রিভয়, মিস্টার রানা। অবশ্যই দেখা হচ্ছে।

.

১০.

এক্সেলশিয়রের পার্কিং লটে, কথামত জাগুয়ারটা অপেক্ষা করছিল রানার জন্যে। ডিপোতে বলে এসেছিল রানা একটা জাগুয়ার পাঠাতে। চাবি ঝুলছে। সুইচ লক থেকে। রঙচটা, তোবড়ানো ছদ্মাবরণের নিচে ঝাঁ-চকচকে একটা গাড়ি-ঘণ্টায় একশো চল্লিশ মাইল স্পীড ওটার।

সুটকেস থেকে যা যা প্রয়োজন সব বের করে নিয়ে হোটেলে রেখে। এসেছে ওটা রানা। এখন থেকে ঝাড়া হাত-পা সে, মুক্তবিহঙ্গ। উদ্দাম গতিতে এখন শুধু সামনে ছুটে চলার পালা।

 বিকেলটা পার করতে হবে ওকে। পেছনে ফেউ.লাগাবে রুডলফ ব্রিগল। তেমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। রাতের আঁধারে ভিলায় আসবে সে কিংবা তার লোকজন। রানা অপেক্ষা করবে ওদের জন্যে সেটাই আশা করবে। তাইই। করবে রানা। প্রতি মুহূর্তে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে ও। পরিস্থিতির ওপর আসলে নিয়ন্ত্রণ চাইছে। রুডলফ ব্রিগলকে খুন যদি করতেই হয়, এবং ও নিশ্চিত করতে হবে, সেক্ষেত্রে অনতিবিলম্বে কাজটা সেরে ফেলতে চাইছে রানা। নাকাতাকে থোড়াই পরোয়া করে ও। ব্যক্তিগত শত্রুতার কোন ব্যাপার নেই তার সাথে। এবং ব্রিগলের চাবির টুকরোটাও যদি কোনভাবে হাত করা যায় তবে তো পোয়াবারো। কিন্তু যদি না পায়-রানার মত ব্রিগলও নিশ্চয়ই গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখবে ওটা-তাহলেও ক্ষতি নেই, বন্ধু হত্যার প্রতিশোধ তাতে ঠেকে থাকবে না। গোয়েরিঙের লুটের মাল না পেলে কি হবে, পরোয়া করে না রানা।

হোটেল ত্যাগের আগে তেল দিয়ে মুছে লগারটা পরীক্ষা করে নিয়েছে। রানা। তৈরি রয়েছে পকেটে গুটিসুটি মেরে গ্যাস বমটা। স্লীভ স্ক্যাবার্ডে রাখা স্টিলেটোটাকে ভাল মতন গোসল করাতে হয়েছে সাবান, পানি ও অ্যালকোহল দিয়ে, তারপর দূর করা গেছে ওমর আব্রাহামের রক্তের চিহ্ন।

ভাবছে রানা, লেকের পাশ দিয়ে মন্ট্রেয়ক্সের উদ্দেশে ড্রাইভ করার সময়, ওমরের দড়ি বাঁধা লাশ কি এখনও ভাসছে বোটহাউজে? সম্ভবত ডুবে গেছে এতক্ষণে। কঙ্কালটা বাদে বাকি দেহ তো ইঁদুরের ভোজে লাগার কথা।

ছোট্ট এক রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরে নিল রানা। দীর্ঘ সময় নিয়ে কোক পান করল দুটো। সূর্য পাটে বসার অনেকক্ষণ পরে রওনা দিল ভিলার উদ্দেশে। ব্যারোনেসের কথা খুব মনে পড়ছে ওর। কেমন যেন অদ্ভুত এক সহানুভূতি অনুভব করছে ও মেয়েটির প্রতি। নিজের সুবিধার জন্যে ওকে ব্রিগলের হাতে তুলে দিয়েছে রানা। পরে পস্তাতে না হলেই হয়। জুলিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে আনা ওরই দায়িত্ব।

আঁধার রাত, এলোমেলো বাতাস বইছে। ছাই রঙা মেঘের পুঞ্জ ঢেকে রেখেছে চাঁদটাকে। সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়েছে মনোরম আবহাওয়া। বাতাসের আন্দোলনে নতুন এক ঝড়ের স্যাঁতসেতে উত্তেজনার গন্ধ। ভালই হলো, ভাবল রানা। যেমন কালো রাত তেমনি কালো কাজ।

জেনেভা শহরের উপকণ্ঠে এখন রানা। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের সংখ্যা এখানে নগণ্য। এ অঞ্চল অচেনা ওর। বার দুয়েক পথ হারিয়ে, অবশেষে গত রাতে দেখা স্ট্রীট কার্নিভালের উজ্জ্বল আলোগুলো খুঁজে পেল। ওগুলোকে সঙ্কেত ধরে নিয়ে শেষমেষ ঢুকে পড়ল সরু এক ধুলোটে রাস্তায়। দ্বীপের ও ভিলার উল্টোদিকেহদের কাছে চলে এল গাড়ি নিয়ে। পথ যেখানে ফুরিয়েছে, ওখানে এক ঝড় সিলভার বার্চের আড়ালে জাগুয়ারটা ছেড়ে, পায়ে হেঁটে পৌঁছল এসে লেকের কিনারে। ছোট্ট দ্বীপটা দেখা যায় এখান থেকে, আলো জ্বলছে ভিলার প্রতিটি জানালায়।

এত বাতি জ্বালা হয়েছে কেন? আঁধারে একাকী ভয় পাচ্ছে মেরী? নাকি মেইনল্যান্ড থেকে ওর বন্ধু-বান্ধব এসে আসর জমিয়েছে? ঐ কুঁচকে গেল রানার। জটিলতা বেড়ে যাবে তাহলে।

কার্নিভল থেকে ভেসে আসা হুল্লোড়ের শব্দ এক মুহূর্ত কান পেতে শুনল রানা, তারপর শ্রাগ করে অনুসন্ধান আরম্ভ করল। পেন্সিল-বীম ফ্ল্যাশলাইটটা রয়েসয়ে ব্যবহার করছে। একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেছে রানা। রুডলফ ব্রিগল, অথবা তার লোকেরা, এরমধ্যেই পৌঁছে গেছে দ্বীপে।

লেকের কিনারে, ভাঙাচোরা ছোট্ট ডকটায় বাধা একটা স্কিফ। ওটা খুঁজে পেতে পাঁচ মিনিট ব্যয় হলো রানার। খুশিমনে চুরি করতে যাবে ওটা, লক্ষ করল, আজ রাতে বেশ কিছু বোট রয়েছে লেকে। ওগুলোর সাদা, লাল ও সবুজ বাতি অন্ধকার পানির বুকে মূল্যবান মণিমুক্তোর মতন ইতস্তত ঝিকমিক করছে। দ্বীপের কাছাকাছি কোনটাই নেই অবশ্য। বাতাসের জোর বাড়তে বেশিরভাগই তীরমুখো হয়েছে। তীরের ও-ই দূরপ্রান্তে ঝলমলে বেশ কিছু। আর্কলাইট দৃষ্টি কাড়ল রানার, প্রকাণ্ড কোন বোটহাউজ হবে হয়তো। বোটগুলোর অধিকাংশ ওদিকেই ছুটছে। স্কিফে,জেঁকে বসে, ঠেলা মেরে লেকে নামতে গিয়ে রানার ধারণা হলো, রুডলফ ব্রিগল বা তার লোকেরা ওই বোটহাউজটা থেকেই নৌকায় উঠবে। যদি না ব্রিগলের অর্গানাইজেশন, যেটা ক্রমেই আরও শ্রদ্ধা অর্জন করছে ওর, মোটরবোট ব্যবহার করে। কিন্তু সন্দেহ আছে রানার। ব্রিগল একা ভিলায় আসবে এটাও বিশ্বাস করে না ও। লোকটা অসম্ভব ধুরন্ধর।

ঘুরপথে নৌকা চালিয়ে, লেক সাইড থেকে দ্বীপটার উদ্দেশে অগ্রসর হচ্ছে রানা। ভাগ্য ভাল, নিয়মিত তেল দেয়া হয় ওরলকগুলোতে। ফলে শব্দ হচ্ছে খুব সামান্য। প্রথম পাঁচ মিনিট পাড়ের কাছাকাছি থাকল ও। চোখ-কান খোলা রেখেছে। বাতাসে দোল খেয়ে ধীরেসুস্থে যেটুকু পারে নিজে থেকে এগোচ্ছে নৌকাটা। বাতাস আজকে বড় খেল দেখাচ্ছে। প্রায় প্রতি মিনিটেই পরিবর্তন করছে দিক। দ্বীপের দিক থেকে যখন বইছে মিউজিকের সুর। আবছাভাবে কানে আসছে রানার। মেরী কি রেডিও বাজাচ্ছে, না স্টিরিও?

 কাদা-পানিতে নৌকা ঠেকতেই নেমে পড়ল রানা, টেনে ওটাকে তুলে আনল পাড়ে। কূল থেকে পঞ্চাশ ফুট ভেতরে পর্বতমালার শুরু। পেন্সিল লাইট জ্বেলে, শেষমেষ ঊর্ধ্বমুখী একটা বন্ধুর পথ আবিষ্কার করল রানা। পাঁচ মিনিট বাদে দেখা গেল ভিলার পেছনে, গাছ-পালার আড়ালে পৌঁছে গেছে ও। আলোয় উদ্ভাসিত কিচেনের জানালাগুলোর দিকে চেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। রানা।

আলোকসজ্জা যেন গোটা বাড়ি জুড়েই। ওপরে-নিচে সর্বত্র। মেরী, এখনও যদি এখানে থেকে থাকে, ঝড়ো রাত্রির সঙ্গে ধুন্ধুমার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলা লাইটহাউজের মতন দেখাচ্ছে ভিলাটাকে। মিউজিকের শব্দ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে এখন রানা। স্ট্রাউস ওয়ালয বাজছে।

 রানা অপেক্ষমাণ, সেটআপটা পছন্দ করতে পারছে না মোটেই। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান অনুপস্থিত। ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ডের পেছনে ছায়ার কোন। নড়াচড়া নেই। জানালায় এসে একবারও দাঁড়াচ্ছে না মেরী পেটি। নিথর-নিস্তব্ধ ভিলা রিকো। উজ্জ্বল আলো আর মিউজিকের শব্দ ছাড়া যেন আর কিছুর অস্তিত্ব নেই।

রানার গায়ে কাঁটা দিল। সতর্কসঙ্কেত। যেন কোলাহলমুখর.. আলোকসজ্জায় সজ্জিত এক সমাধি স্তম্ভের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক সুনসান, জনমানুষের সাড়া-শব্দ নেই কোথাও।

তবুও গাছের আড়ালে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়। ছায়ার আড়াল নিয়ে রায়ে সরে গেল রানা। কুঁজো হয়ে দৌড়ে ভিলাটাকে একবার পাক খাবে। সুন্দরবনের মাওয়ালীর দক্ষতায় মুভ করছে ও, পা ফেলছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত সন্তর্পণে। ভিলা থেকে বেরোনো দুটো রাস্তাই পরীক্ষা করে দেখল রানা, সতর্ক। কিছু নেই। কোন ওয়াচার নেই। অপেক্ষা করছে না। কেউ। ভিলাটা বাজনা বাজাচ্ছে, আলোর সাজে সেজেছে অথচ তারপরও আধার ও নৈঃশব্দের চাইতে অনেক বেশি ভীতিকর মনে হচ্ছে এটাকে রানার কাছে।

 চক্করটা শেষ করল রানা। আবার শুরুর জায়গায় ফিরে এসেছে। বেল্টে লুগারটা ঠিকমত আছে কিনা পরখ করার জন্যে এক মুহূর্ত থেমে দাঁড়াল। দেখে নিল গ্যাস বম ও স্টিলেটোটাও রয়েছে বহাল তবিয়তে। এবার ভিলার কিচেন, ডোরটার উদ্দেশে ছুট দিল। এখন জানা যাবে। শীঘ্রি।

 ফক্কা। স্ক্রীন ডোর টেনে খুলে প্রশস্ত কিচেনটায় সেঁধিয়ে পড়ল রানা। থমকে দাঁড়াল ওখানে কাঠ-পুতুলের মতন। মেঝের ঠিক মাঝখানে পড়ে থাকা জিনিসটার ওপর নিবদ্ধ হলো দৃষ্টি। গলার কাছে একটা দলা উঠে এসেছে অনুভব করল। বুকটা টনটন করে উঠল ব্যথায়। বড় হাসিখুশি ছিল মহিলা!

প্রাণপণ লড়ে মৃত্যুবরণ করেছে মেরী পেটি। ঝকঝকে টালির মেঝেতে ছিন্নবাস পুতুলের মতন পড়ে রয়েছে ও। দেখে বোঝা যায় ধর্ষণ করা হয়েছে। বেরিয়ে আছে সুডৌল দুই উরু, হাত দুটোয় এখনও থাবা মারার ভঙ্গি। দৃষ্টি ওর চলে গেছে পেছন দিকে। চোখের চকচকে সাদা অংশ দুটো ছাদের দিকে নিথর একদৃষ্টে চেয়ে।

দরজার কাছ থেকে সরে এল রানা, দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলো। বাড়ির সামনের দিকে কোথাও রেডিওটা বাজছে। কন্টেসার স্টাডিতে। খুব সম্ভব। ভিলার চারধারে ভাসা-ভাসা পর্যবেক্ষণ চালানোর সময় একটা টেলিফানকেন দেখেছিল ওখানে মনে আছে রানার।

কিচেনটা ত্বরিত পার হয়ে মেয়েটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসল ও। প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই। একটা চরম ক্রোধ ফেনিয়ে উঠছে ভেতরে, টের পাচ্ছে রানা। কেন? এবং কে? ও নিশ্চিত, রুডলফ ব্রিগলের সঙ্গে কোনক্রমেই জড়িত ছিল মেরী। ওমর ছিল ব্রিগলের লোক, এবং এখন সে বোটহাউজে পেট ফুলে ভাসছে।

দ্বীপে তাহলে আর কেউ ছিল? কে? এখনও কি আছে?

শুনতে পেল রানা। তবে অসময়ে। ওর অসাধারণ রিফ্লেক্সও এযাত্রা রক্ষা করতে পারল না ওকে।

স্টোররুমের দরজা খুলতে ক্যাচ করে উঠেছিল কব্জা।

ঘাড়ের পেছনে ঠাণ্ডা, ধাতব কিছুর স্পর্শ অনুভব করল রানা।

দয়া করে মাথার ওপরে হাত দুটো তুলুন, মিটার রানা।

<

Super User