খেলনা ভালুক — রকিব হাসান
প্রথম প্রকাশ: ২০০২

০১.

গোবেল বীচ গাঁয়ের পথ ধরে সাইকেল চালাচ্ছে জিনা। পাশে তার বন্ধুরা, কিশোর, মুসা আর রবিন। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ডিসেম্বরের ২৩ তারিখে এ রকম হবেই। চকচক করছে তার চোখ। ঠাণ্ডা আবহাওয়া খারাপ লাগে না তার, যদি দিনটা হয় মেঘমুক্ত, উজ্জ্বল। অন্যদেরও খারাপ লাগছে না। গান গাইছে চারজনেই। কেউ গলা ফাটিয়ে, কেউ গুনগুন করে।

চারটে সাইকেলের পাশে দৌড়াচ্ছে রাফি, গা আর পায়ের পাতা গরম করার চেষ্টা করছে। পাঁচজনের মধ্যে এই একটি চরিত্র, যার ভাল লাগছে না এই আবহাওয়া। কান চেপে রেখেছে মাথার সঙ্গে। কারণ মাথা গরম রাখার আর কোন ব্যবস্থা নেই তার। উলের গরম টুপি নেই মানুষের মত। ঘরে থাকলে অবশ্য এই কষ্টটা করতে হত না, তবে সেটা চায় না সে। জিনাকে ফেলে একলা থাকতে ভাল লাগে না তার। মাঝে মাঝে হেঁড়ে গলায় ডেকে উঠছে ঘাউ ঘাউ করে। তাতে গানের সঙ্গে সঙ্গত হচ্ছে না, বরং বেসুরো বেতাল করে দিচ্ছে।

রাস্তার শেষ মোড়টা পেরোতেই চোখে পড়ল সামনে গোবেল বীচ গির্জার উঁচু স্তম্ভ।

এসে গেছি, খুশি খুশি গলায় বলল জিনা। দেখো, গ্রামটাকে কি রকম বদলে দিয়েছে বড় দিনের উৎসব।

গাঁয়ের সবচেয়ে বড় দোকান গোবেল বীচ স্টোর। সেটার সামনে আসার আগে সাইকেল থেকে নামল না ওরা। নানা রকম জিনিস বিক্রি হয় দোকানটায়। জানালার কাছে শো-কেসে অসংখ্য খেলনা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর রয়েছে উপহারের বিভিন্ন সামগ্রী। থাকবেই। কারণ আজ হলোগে ক্রিসমাস ইভের আগের দিন।

ইস্কুল ছুটি। গোবেল বীচে, জিনাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে তিন গোয়েন্দা। জিনার আব্বা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জনাথন পারকার আর জিনার আম্মা মিসেস ক্যারোলিন, তিন গোয়েন্দার কেরিআন্টি, ভীষণ আদর করেন ওদের। এখানে এলে একেবারে ঘরোয়া পরিবেশ পেয়ে যায় ওরা। তার ওপর লেখাপড়ার চাপ না থাকলে তো কথাই নেই। তাই ছুটি কাটানোর কথা ভাবলে প্রথমেই মনে চলে আসে গোবেল ভিলার কথা। এটা হলো জিনাদের বাড়ির নাম। সত্যিই যেন চিরবসন্ত বিরাজ করে এই বাড়িটাতে। এখানে যেন শুধুই সুখ, দুঃখ নেই। বাড়িটা অনেক বড়। বহু বছরের পুরানো। কিনে সংস্কার করে নিয়েছেন জিনার আব্বা।

 সেদিন সকালে ছেলেমেয়েদেরকে ডেকে বাজার করে আনতে বললেন কেরিআন্টি। সেজন্যেই বেরিয়েছে ওরা।

এই দেখো! প্রায় চিৎকার করে উঠল রবিন। জানালার কাঁচে নাক ঠেসে ধরেছে। দারুণ সুন্দর, না? ওই যে ওই জেট প্লেনটা? আর ওই যে ওই ইলেকট্রিক ট্রেন, কি বিশাল! আর…কিন্তু আন্টিকে তো এগুলো উপহার দিতে পারব না…

জিনা আর মুসাও জানালার কাঁচে নাক চেপে ধরে খেলনা দেখছে।

হ্যাঁ, ভাল ভাল খেলনা আছে, একমত হল মুসা। আর ওই যে সাইকেলগুলো দেখো। কি সুন্দর! কোন্ কোম্পানির বুঝতে পারছি না। ওরকম একটা সাইকেল পেলে চুটিয়ে চালাতে পারতাম, যেখানে খুশি যেতে পারতাম। ভাড়া করা সাইকেল দিয়ে কি আর মজা হয়।

এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলনা আর সাইকেল দেখলে কাজ হবে না, তাগাদা দিল কিশোর। জিনিসপত্রগুলো কিনে ফেলা দরকার। আন্টি নিশ্চয় বসে আছেন। তাড়াতাড়ি যেতে বলে দিয়েছেন মনে নেই?

ঠেলে দোকানের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সে। পেছনে ঢুকল অন্য তিনজন। ভেতরে উজ্জ্বল আলো। আর বেশ গরম। সব কিছুতেই কেমন যেন একটা উৎসব উৎসব গন্ধ। বাজারের তালিকা নিয়ে কাউন্টারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ওরা।

জিনিসপত্র বের করে সাজিয়ে গুছিয়ে প্যাকেট করে ব্যাগে ভরে দিল সেলসম্যান। হিসেব মিলিয়ে দাম মিটিয়ে দিল কিশোর। বেরোনোর আগে আরেকবার ঘুরে ঘুরে দেখল রবিন আর জিনা। অনেক চমৎকার জিনিস রয়েছে, দেখলেই কিনতে ইচ্ছে করে।

দোকানের একজন কর্মচারী এককোণে একটা মলাটের বড় বাক্স খুলছে। বয়েসে তরুণ। নাম ডিক, তাকে চেনে জিনা! জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন?

মুখ তুলে তাকিয়ে হাসল লোকটা। বলল, আরে, তুমি। ওরা কারা? বন্ধু বুঝি?

হ্যাঁ।

তা বন্ধুদের নিয়ে চলে এসো না আমাদের বাড়িতে। বড়দিনের দাওয়াত।

আরও অনেক দাওয়াত পেয়েছি, হেসে বলল জিনা। দেখি, চেষ্টা করব যাওয়ার। থ্যাংক ইউ।

বাক্সটা খোলা শেষ করল ডিক। ইতিমধ্যে মুসা আর কিশোরও এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। এ-হপ্তায় সাংঘাতিক বিক্রি হচ্ছে, তরুণ কর্মচারী জানাল। বিশেষ করে ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর জিনিসপত্র। লোকের কাণ্ড! কিনতেই যখন হবে আগে কিনলেই হয়ে যায়। অনেক ঝামেলা বেঁচে যায়। দামেও সস্তা পায়। তা না। কিনবে তো কিনবে, একেবারে শেষ মুহূর্তে। তবে লোকের দোষও একতরফা ভাবে দেয়া যায় না। কোম্পানিগুলোরও দোষ আছে, যারা বানায়। আরে বাবা আরেকটু আগে বানিয়ে দিলে কি এমন ক্ষতি হয়? দিলি তো দিলি, সেই পনেরো দিন পর। পনেরো দিন ধরে বসে আছি এই ভালুকগুলোর জন্যে।

বড় বাক্সের ভেতর থেকে ছোট একটা বাক্স বের করল সে। ভেতরে আরও দুটো ওরকম বাক্স রয়েছে। একটা বাক্সের ডালা খুলে দেখাল ছেলেমেয়েদেরকে। ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট খেলনা ভালুক সাজানো রয়েছে। বিভিন্ন রঙের। গাঢ় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা, বেগুনি আর কমলা।

আরে, দারুণ তো! রবিন বলল। এগুলো অবশ্য উপহার দেয়া যায়। কেরিআন্টি সাজিয়ে রাখতে পারবেন।

ক্রিসমাস ট্রি ভালুক দিয়ে সাজাতে দেখিনি আর কখনও! অবাক হয়ে বলল কিশোর।

আসলে, ডিক বলল। ট্রি সাজানোর জন্যে নয় এগুলো। ম্যাসকট হিসেবে ব্যবহার হয়। গাড়ির মধ্যে ঝুলিয়ে রাখে না লোকে, ওরকম। এই কিছুদিন আগেও এ রকম খেলনা ঝোলানোর ধুম পড়ে গিয়েছিল। এখন একটু কমে এসেছে। তবে এ রকম ভালুক জনপ্রিয় হয়ে গেছে বেশ, বিশেষ করে এদিকটায়। তাই আমার বস্ মিস্টার ফোকসন বেশি করে অর্ডার দিয়েছেন এবার। মনে করছেন বড়দিনের সময় বেশি বিক্রি হবে। লোকের তো ঠিকঠিকানা নেই, হয়তো ট্রিতেও নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু দিল তো অনেক দেরি করে, জিনা বলল। লোকের কি আর কেনার সময় আছে? কেনাকাটা যা করার করে ফেলেছে। কালকের আগে বেচে শেষ করতে পারবেন বলে মনে হয় না। অনেক আছে।

তিন ডজন। একেক বাক্সে এক ডজন করে, জানাল ডিক। অত ভাবনা নেই। আগে না হলেও পরে হবে। সুন্দর জিনিস। লোকে কিনবেই। বারোটার অর্ডার ইতিমধ্যেই এসে গেছে, হাসল সে। মিস্টার মরিস দিয়েছেন। তার মানে বারোটা বিক্রি হয়ে গেছে ধরে রাখা যায়। তার মেয়ে পলি বন্ধুদের নিয়ে একটা পার্টি দেবে। সেজন্যেই কিনছে। ক্রিসমাস পার্টি। ক্রিসমাস ট্রিতে লাগাবে এই ভালুক। যাই, ফোন করিগে তাকে। এসেছে যে খবরটা দিই।

জিনা হাসল। হ্যাঁ, পলি যে পার্টি দিচ্ছে জানি। আমাদেরকেও দাওয়াত করেছে। যাই বলেন, ভালুকগুলো কিন্তু সুন্দর। ট্রিতে ঝোলালে ভালই লাগবে। অন্যান্য সাজ আর আলোতে একেবারে ঝলমল করবে, যা সুন্দর রঙ!

নীল রঙের একটা ভালুক হাতে নিয়ে দেখতে লাগল রবিন। বাদামী কাঁচের চোখ যেন জ্যান্ত হয়ে আছে ওটার। ঝিক করে উঠছে আলো লাগলেই। নরম মখমলের শরীর। আদর করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, বাহ, খুব মিষ্টি!

তার দিকে তাকিয়ে হাসল কিশোর। বলল, নিয়ে নাও। কেরিআন্টির পছন্দ হবে।

ভালুকটার দাম মিটিয়ে দিচ্ছে রবিন, এই সময় দোকানের একধারে ডন নামে একজনকে ডাকল কেউ।

কমে গেল একটা, হাতের বাক্সটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল ডিক। মিস্টার মরিসকে বারোটা পুরো করে দিতে হলে আরেকটা বাক্স খুলতে হবে। থাক এখন। খোলার সময় নেই। পরে।

আমরা খুলে দেব? সাহায্য করতে চাইল জিনা।

না, না, লাগবে না। থ্যাংক ইউ। অসুবিধে হবে না। কিছু জরুরী কাজ আছে, সেগুলো সেরে নিই আগে। কয়েকটা ভালুককে শো-কেসেও সাজাতে হবে, লোকের নজর কাড়ার জন্যে। অনেক সময় আছে। কাল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখব। গুডবাই।

তার পরদিন বিকেল চারটে। জমজমাট হয়ে উঠেছে ডক্টর মরিসের বাড়ির পার্টি। তার মেয়ে পলি, জিনার বয়েসী, খুব খাতির যত্ন করছে মেহমানদের। ক্রিসমাস ট্রির। চারপাশে জড়ো হয়েছে তার বন্ধুরা। অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস দিয়ে সাজানো হয়েছে গাছটা। চকচকে রঙিন কাগজের মোড়ক, সিল্কের ফিতে, কাগজের ফুল, ঘোট ঘোট রঙিন বালব, আর সাজানোর আরও নানা জিনিস যা যা পেরেছে, সব লাগিয়েছে এতে। এমনকি বারোটা রঙিন ভালুকও ঝুলছে গাছের ডালে।

বিরাট ঘরের এককোণে বিশাল এক টেবিল বোঝাই নানা রকম লোভনীয় খাবার। কোন কিছুর কমতি রাখেনি পলি। বন্ধুদেরকে খুশি করার জন্যে সব রকম চেষ্টা করেছে সে।

প্লেটে করে হাতে হাতে খাবার দেয়া হলো। ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠল পলি। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরছে, তদারকি করছে। এটা সেটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আরও খাবার নেয়ার জন্যে চাপাচাপি করছে। কেউ নিতে না চাইলে জোর করে তুলে দিচ্ছে তার প্লেটে।

খাওয়া দাওয়া শেষ হলে খেলার আয়োজন করল পলি। চমৎকার জমল মিউজিক্যাল চেয়ার। হৈ-হুঁল্লোড় আর হাসাহাসি চলল একনাগাড়ে।

তুমি ঠকিয়েছ, বব!

কে বলে রে! তুমি যে রবিনকে ধাক্কা মারলে সেটা কি?

না, আমি মারিনি! সে-ই বসতে পারেনি ঠিকমত!

বাইরে রাত নামছে। দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে গেল। পরীর রাজ্যের পরীরানীর বাগান থেকে যেন তুলে আনা হয়েছে ক্রিসমাস ট্রিটা। এতই সুন্দর, এতই ঝলমলে।

এবার পুরস্কার দেয়া হবে, ঘোষণা করল পলি। ক্রিসমাস ট্রিতে ঝোলানো রয়েছে উপহার সামগ্রী, সেগুলো খুলে আনল সে। আরও নানা রকম জিনিস রয়েছে বাক্সে, টেবিলে স্তূপ করে রাখা। এক এক করে নাম ধরে ডাকতে শুরু করল পলি, ডায়না, এসো। এই দেখো, কি সুন্দর একটা পোশাক। নার্সের ইউনিফর্মের মত লাগে দেখতে, না?

খুব সুন্দর! এ রকমই একটা জিনিস চাইছিলাম, খুশি হয়ে বলল ডায়না।

মুসা আর জিনা পেল রোলার-স্কেট।

গুড! হেসে বলল জিনা। দুজনে এক জিনিস পেয়ে ভাল হলো। পাল্লা দিয়ে স্কেট করতে পারব।

কিশোর পেল বহু ফলাওয়ালা একটা ছুরি। রবিনকে দেয়া হলো চামড়ার একটা চমৎকার নোটবুক। রাফিকে পর্যন্ত দেয়া হলো একটা পুরস্কার। রবারের একটা হাড়, গলায় ঝোলানোর জন্যে, দেখতে একেবারে আসল হাড়ের মতই লাগে। কামড় বসিয়ে দিল রাফি। যখন দেখল রবার, ফেলে দিল মুখ থেকে।

তারপর হঠাৎই দপ করে নিভে গেল সমস্ত বাতি। আলোয় ঝলমল ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠল একটা ছোট মেয়ে। তার পর পরই আরও কয়েকজন চেঁচাল।

ভয় পেও না, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। ভয়ের কিছু নেই নিশ্চয় ফিউজ কেটে গেছে। ছোটাছুটি কোরো না। গায়ের ওপর পড়বে জিনিসপত্র ফেলে দেবে। ফিউজটা লাগিয়ে দিলেই আলো জ্বলে যাবে আবার

কিশোরের পরামর্শ কেউ শুনল, কেউ শুনল না ত চেঁচামেচি কমে এল। অনেকখানি। শোনা গেল ডক্টর মরিসের ভারী গমগমে কণ্ঠ, সমস্ত কোলাহল। ছাপিয়ে, শোনো, গোলমাল কোরো না কেউ। চুপ করে থাকো আমি সেলারে যাচ্ছি, ফিউজটা লাগিয়ে দেব।

তার কথাও অনেকেই শুনল না। কথা বলতে লাগল কেউ কেউ নড়তে শুরু করল অন্ধকারের মধ্যেই। দরজার কাছে রয়েছে মুসা। বাতাস লাগল গায়ে। ফিরে তাকিয়ে দেখে, কে যেন বেরিয়ে যাচ্ছে। কাপড়ের ঘষা লাগল তার মুখে। এক পা বাড়াল সে, কে দেখার জন্যে। জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঠেলে দিল আবার তাকে মূর্তিটা।

এই, শুনুন, শুনুন! চিৎকার করে বলল মুসা। কি করছেন?

তার কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে কিশোর আর রাফি ছুটে বেরিয়ে গেল কুকুরটা একটু পরেই বাগানে শোনা গেল তার উত্তেজিত চিৎকার।

ব্যাপার কি? অবাক হলো কিশোর। কে বেরোল? দরজা খোলা ফেলে। রেখে?।

কাউ করে উঠল রাফি ব্যথায়। কেউ মেরেছে মনে হয় তাকে।

 রাফি! ডাকল কিশোর। কি করছিস ওখানে?

বেরোতে যাবে সে, এই সময় আলো জ্বলে উঠল। হাসিমুখে ফিরে এলেন ডক্টর মরিস। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে গিয়েই থমকে গেলেন ছেলেমেয়েদের মাথার ওপর দিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। চোখে বিস্ময়। তাঁর এই অবস্থা ওদেরকেও অবাক করল। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার দৃষ্টি অনুসরণ করে। বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ওরাও।

আরে, ক্রিসমাস ট্রিটা কই!

নেই তো!

হলো কি!

চুরি করেছে।

 হ্যাঁ হ্যাঁ, চুরি করে নিয়ে গেল কে যেন!

.

০২.

অবাক কাণ্ড! ক্রিসমাস ট্রি চুরি করার কথা কে কবে শুনেছে? তবে সেটা মেনে না। নিয়েও উপায় নেই জায়গামত নেই ওটা। ঘরের কোথাও নেই ডক্টর মরিস আর মিসেস মরিস স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে চুরিই হয়েছে ওটা আর কোন ব্যাখ্যা নেই বাতাসে তো মিলিয়ে যেতে পারে না।

আরেকটা ব্যাপার দেখে এসেছেন ডক্টর মরিস। ফিউজ কাটেনি। মেইন সুইচ অফ করে দেয়া হয়েছিল। তারমানে ওটা অফ করে আলো নিভিয়েছে চোর গাছটা চুরি করার জন্যে। কিন্তু কে করল?

শুনছেন, আংকেল? কিশোর বলল। আমার কুকুরটা এখনও ঘেউ ঘেউ করছে। বাগানে। নিশ্চয় চোরের পিছু নিয়েছিল।

দরজার দিকে দৌড় দিল সবাই। হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। আগে গেছেন ডক্টর মরিস। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে চলেছে রাফি। বাগানের গেট বন্ধ থাকায় বেরোতেও পারছে না, ফলে রেগে গেছে আরও। রাস্তায় একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার শব্দ হলো, একটা ভ্যান চাঁদ উঠেছে। সেই আলোয় মুসা আর কিশোর দেখতে পেল গাড়িটার পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে ক্রিসমাস ট্রির দুটো ডাল।

ওই যে যাচ্ছে! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। চোর! চোর!

মুসার মনে পড়ল, অন্ধকারে ঘষা লেগেছিল তার মুখে। অবশ্যই গাছের ডালের, কোন ভুল নেই তাতে। কিন্তু কে এই কাজটা করল? একটা ক্রিসমাস ট্রি চুরি করে কি লাভ? এমন কোন দামী বস্তু নয় ওটা, অবশ্যই টাকার হিসেবে। বিক্রি করতে পারবে না। তাহলে এত কষ্ট করে এ রকম একটা জিনিস চুরি করতে এল কেন?

ডক্টর মরিস আর তার স্ত্রীও একই কথা বলাবলি করতে লাগলেন, কে চুরি করল? কেন? পাগল-টাগল নাকি?

ছেলেমেয়েদেরকে আবার ঘরে যেতে বললেন তারা। বাইরে থাকলে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। ঘরে এসে পুলিশকে ফোন করলেন ডক্টর মরিস, চুরির খবর দিলেন। দেরি হলো না। খানিক পরেই দুজন পুলিশম্যান এসে হাজির। সবাইকে অনেক অনেক প্রশ্ন করল তারা। নোটবুকে লিখে নিয়ে চলে গেল। ওরাও অবাক হয়েছে। কিছুতেই আন্দাজ করতে পারছে না কেউ, এ রকম জিনিস চুরির জন্যে এতটা ঝামেলা কেন করতে গেল চোর!

জিনাদের বাড়িতে ফিরে এল জিনা আর তার বন্ধুরা। চারজনের মুখে কেবল একই কথা, ক্রিসমাস ট্রি চুরি। ভাবছে, আলোচনা করছে। যতই করছে, ততই অবাক হচ্ছে। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না।

চোরেরা গাছটা নয়, অনুমানে বলল রবিন, উপহারগুলোই চেয়েছে। খুলে নিতে অনেক সময় লাগত। তাই গাছটাই তুলে নিয়ে গেছে।

আমার তা মনে হয় না, জিনা বলল। উপহারগুলো ভাল, সন্দেহ নেই। তবে তেমন দামী নয় যে চুরি করতে আসবে। না, গাছটাই ওদের দরকার ছিল। প্ল্যানট্যান করেই এসেছে।

কিন্তু ক্রিসমাস ট্রি একটা সাধারণ ফার গাছ, মুসা বলল। এটা দিয়ে কার কি কাজ হবে? ক্রিসমাসের পরে এটার কোন প্রয়োজনই নেই।

কি জানি, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। এই বিশেষ গাছটা দিয়ে হয়তো হবে। কি হবে সেটা যদি বুঝতে পারতাম!

রাত হলে শুতে গেল সবাই। চারজনেরই মাথায় ঘুরছে শুধু গাছটার ভাবনা। অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে মনে। জবাব মিলছে না কোনটারই।

কিশোর ভাবছে আরেকটা কথা। ক্রিসমাস ট্রি চুরি হয়েছে যখন, নিশ্চয় এর পেছনে কোন রহস্য রয়েছে। তবে কি আরেকটা রহস্য এসে হাজির হয়েছে ওদের কাছে? সমাধানের জন্যে? এলে ভালই হত। রহস্য পেলে ভাল লাগে। আর এ রকম জটিল আর আশ্চর্য হলে তো কথাই নেই।

*

পরদিন সকালে আরেকটা রহস্য পাওয়া গেল। রাতে ঘুমাতে দেরি করে ফেলেছে, পরদিন তাই ঘুম ভাঙতেও বেলা হয়ে গেল। নাস্তার টেবিলে এসে বসল গোয়েন্দারা। খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে বাজারে গিয়েছিলেন কেরিআন্টি। ওরাও বসল, তিনিও ফিরলেন। সাথে করে নিয়ে এসেছেন কিছু চমৎকার কেক, আর একটা দারুণ খবর। আগের দিন রাত দুটোয় নাকি গোবেল বীচ স্টোরে চোর। ঢুকেছিল।

তাজ্জব ব্যাপার, বুঝলি জিনা, আন্টি বললেন। এত কষ্ট করে ঢুকল চোর। কিন্তু কিছুই নিল না। শুধু কিছু খেলনা ভালুক ছাড়া। বাক্সে ভরা ছিল, নিয়ে চলে। গেছে। শো-কেসে ছিল একটা না দুটো, তা-ও নিয়ে গেছে। মিস্টার ফোকসন বললেন, পুলিশও নাকি অবাক হয়েছে। কি ব্যাপার, বুঝতে পারছে না। ওদের ধারণা। হয় চোরটা পাগল, নয়তো বড়দিনে রসিকতা করেছে।

আজব ব্যাপার! কিশোর বলল।

 হ্যাঁ। সে-রকমই লাগছে, বলল মুসা।

কয়েকটা খেলনা ভালুক শুধু? জিনা বলল। আর কিছুই নেয়নি? কোন মানেই হয় না এর।

নাহ! মাথা নাড়ল মুসা।

পলির গাছ চুরির চেয়ে আজব কিন্তু নয় ব্যাপারটা, বলল কিশোর।

কি যেন ভাবছে রবিন। মোলায়েম গলায় বলল, মনে আছে, গাছটা থেকে সমস্ত উপহার খুলে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ভালুকগুলো সব রয়ে গিয়েছিল। গাছের সঙ্গে ওগুলোও নিয়ে গেছে চোর।

রবিনের মত একই খাতে বইতে শুরু করল মুসা, জিনা আর কিশোরের ভাবনাও।

ঠিকই বলেছ, কিশোর বলল। লোকটা পাগলই হবে। খেলনা ভালুকের ওপর তার লোভ। যেখানেই দেখেছে, লোভ সামলাতে না পেরে তুলে নিয়ে গেছে।

তবে আইডিয়াটা এতই হাস্যকর মনে হলো, হাসির পাত্র হওয়ার ভয়ে কারও কাছে কথাটা বলল না ওরা। বলার মত আর কেউ তখন অবশ্য নেইও ওখানে। আন্টি চলে গেছেন রান্নাঘরে। হাঁড়িপাতিলের খুটখাট শব্দ হচ্ছে। লোভনীয় গন্ধ আসছে। কোথায় কার গাছ চুরি হলো, ভালুক চুরি হলো, পারকার আংকেলের এ সব ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা নেই। তিনি গিয়ে ঢুকেছেন তার পড়ার ঘরে। নিশ্চয় জটিল কোন বৈজ্ঞানিক থিউরি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন এখন।

কি আলোচনা হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না রাফি। যেন সেটাই জিজ্ঞেস করল, ঘাউ! অর্থাৎ ব্যাপার কি? কি নিয়ে অমন মাথা গরম করছ তোমরা?

রাফি, তুই কি ভাবছিস বল তো? জিজ্ঞেস করল কিশোর, আসলে নিজেকেই করল প্রশ্নটা। বলছি বটে পাগল, কিন্তু সে-রকম ভাবতে পারছি না লোকটাকে। এর অন্য কোন ব্যাখ্যা আছে…

খেলনা ভালুক সংগ্রহ করে না তো? বাধা দিয়ে বলল মুসা।

না, মাথা নাড়ল জিনা। সংগ্রাহক হলে একজন হত। ভেবে দেখো, ক্রিসমাস ট্রিটা যথেষ্ট ভারী। সেটাকে নিয়ে ভ্যানে তুলে ওরকম তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া একজনের পক্ষে সম্ভব না। কমপক্ষে দুজন। পাগল হলেও একজন হত। তারমানে সগ্রহ কিংবা পাগলামি কোনটাই নয়।

ঠিকই বলেছ, একমত হলো কিশোর। কয়েকটা খেলনা ভালুক জোগাড়ের জন্যে শুধু এতসব করেনি লোকগুলো।

কি মনে হয় তোমার? ওই ভালুকগুলোর কোন বিশেষত্ব আছে?

থাকতে পারে। সে-কথাই ভাবছি আমি।

সে-কারণেই যেখানে যত ভালুক পেয়েছে সব তুলে নিয়ে গেছে ওরা। গাছটা নিয়েছে, দোকানের বাক্সগুলো নিয়েছে, এমনকি শো-কেসে একটা যে ছিল, সেটাও নিয়ে গেছে। তার মানে জানত কোথায় ওগুলো পাওয়া যাবে।

হ্যাঁ, একেবারে ঝেড়েপুছে নিয়ে গেছে, কিশোর বলল। একটাও রাখেনি।

এখন কি করবে ওরা? মুসার প্রশ্ন। সব তো নিল…

না, সব নিতে পারেনি, হাত নাড়ল রবিন। একটা রয়ে গেছে আমার কাছে। যেটা আন্টিকে উপহার দিতে কিনেছি।

তাই তো!

রবিন, উত্তেজিত কণ্ঠে কিশোর বলল। জলদি যাও! নিয়ে এসো!

ছুটে ওপরতলায় চলে গেল রবিন। একটু পরেই ফিরে এল নীল ভালুকটা নিয়ে।

কৌতূহলে ফেটে পড়ছে চারজনেই। গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি করে এল দেখার জন্যে। কিছুই অস্বাভাবিক লাগছে না খেলনাটার। সাধারণ, ছোট, নরম একটা জিনিস, যেটার কোন বিশেষত্বই চোখে পড়ল না।

নাহ! মাথা নাড়তে লাগল মুসা। কিছু নেই। বাকিগুলোও, যেগুলো দেখেছিলাম, একই রকম দেখতে। ছোট ছোট, সুন্দর। তবে অস্বাভাবিক কিছুই নেই।

ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়, কিশোর বলল। আমার মনে হচ্ছে দুটো চুরিরই কোন একটা সম্পর্ক আছে। আচ্ছা, রহস্যটা কি তা বের করলেই তো পারি আমরা? অন্তত করার চেষ্টা তো করতে পারি?

অন্য তিনজনও ভেবে দেখতে লাগল কথাটা।

হ্যাঁ, তা করতে পারি, মাথা দোলাল মুসা। শুরুটা করা যায় গোবেল বীচ স্টোর থেকেই। ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারি আমরা। কিভাবে কি হয়েছে তদন্ত করে আসতে পারি।

হ্যাঁ, তা পারি, জিনা বলল। এখন নিশ্চয় খোলাই আছে দোকান। এ সময়ে থাকে।

ওঠো তাহলে, উঠে দাঁড়াল কিলোর। চলো, যাই।

যত তাড়াতাড়ি পারল বাইরে বেরিয়ে এল ওরা। মিনিটখানেক পরেই গোবেল বীচ কটেজের দিকে চলল চারটে সাইকেল আর একটা কুকুরের মিছিল।

.

০৩.

দোকানে পৌঁছে দেখল আরও অনেক লোক রয়েছে ভেতরে। কেউ কেউ সত্যি এসেছে জিনিস কিনতে, কেউ এসেছে কৌতূহল মেটাতে। কাউন্টারে কাউন্টারে লোক ঘুরছে। যারা কিনতে এসেছে তারাও কম কৌতূহলী নয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলেছে। তাদের মাল প্যাকেট করতে আর প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে দোকানের তিনজন কর্মচারী। প্রসঙ্গ একটাই, গতরাতের চুরি।

কিশোর দেখল, বেঁটে, গাট্টাগোট্টা এক লোকের সঙ্গে কথা বলছে ডিক। লোকটার বয়েস চল্লিশ-টল্লিশ হবে। চোখে কালো কাঁচের সানগ্লাস। সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়েছে। এক কোণে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আর ডিক যা বলছে সব লিখে নিচ্ছে নোটবুকে। কাছে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেমেয়েরা। ওদেরকে একটা আন্তরিক হাসি উপহার দিল ডিক।

হাল্লো, বলল সে। কি চাই? আরও খেলনা?

না, এমনি এলাম, হেসে বলল জিনা। জাস্ট কৌতূহল।

 মেটাতে, হেসে যোগ করল কিশোর।

বাধা পড়ায় বিরক্ত হলো চশমাওয়ালা লোকটা। ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরেও তাকাল না। ডিককে বলল, ওদেরকে বাদ দিন না। যা, কোথায় যেন এসেছিলাম?

নতুন আর কি বলব, যা বলার তো বলেই দিয়েছি, ডিক বলল। চোরেরা আর কিছুই নেয়নি, শুধু…।

হ্যাঁ, জানি, শুধু রঙিন খেলনা ভালুকগুলো নিয়েছে, অধৈর্য ভঙ্গিতে বলল লোকটা। আমার কথার জবাব কিন্তু এখনও পাইনি। আমি জানতে চাইছি সবই কি নিয়ে গেছে? দোকানে যা ছিল…মানে, এসেছিল? কটা এসেছিল?

এসেছিল ছত্রিশটা, ডিক বলল। চশমাওয়ালা লোকটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। তার মনে হলো, সেলসম্যানের জবাব শুনে সামান্য যেন চমকে গেল লোকটা। তবে মুহূর্তে সামলে নিল সেটা। দ্রুত লিখে নিল নোটবুকে। বারোটা নিয়ে গেছেন ডক্টর মরিস। আর চব্বিশটা… রবিনের ওপর চোখ পড়তে থেমে গেল সে। না না, তেইশটা ছিল দোকানে। কারণ এই ছেলেটা একটা নিয়ে গিয়েছিল, রবিনকে দেখাল সে।

এতক্ষণ এমন ভাব করছিল লোকটা যে ছেলেমেয়েগুলো চলে গেলেই বাঁচে। হঠাৎ করেই তার আচরণ বদলে গেল। এখন যেন ওদের প্রতিই বেশি মনোযোগ। আন্তরিক হওয়ার জন্যে হাসল। তাই নাকি? রবিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সে। তাহলে তুমিও একটা নিয়েছ? আমি শুনলাম, চোরেরা নাকি সব চুরি করেছে, যতগুলো ভালুক এসেছিল।

হ্যাঁ, সবই নিয়েছে, আরেকবার বলল ডিক। ডক্টর মরিসের বারোটা, আর এই ছেলেটার একটা বাদে। তার মানে দোকান থেকে চুরি হয়েছে তেইশটা।

কিশোর বুঝল, পলিদের ভালুকগুলো চুরি হওয়ার খবরটা জানে না সেলসম্যান।

রবিনের দিকে তাকিয়েই রয়েছে চশমাওয়ালা। একটা তাহলে আছে তোমার কাছে? কেন জিজ্ঞেস করছি জানো? পত্রিকায় লেখার জন্যে।

অ, পকেটে হাত ঢোকাল রবিন। নীল ভালুকটা সঙ্গেই রয়েছে। সেটা বের করে দেখিয়ে বলল, এই যে এটাই। খুব মিষ্টি, না?

রবিনের হাত থেকে ভালুকটা নিয়ে দেখতে লাগল সাংবাদিক। বলল, হ্যাঁ, মিষ্টি! ফিরিয়ে দিল আবার। শোনো, খবরের কাগজে নাম আর ছবি ছায়া দেখতে। কেমন লাগবে? আমার প্রতিবেদনে তোমার নাম আমি উল্লেখ করতে পারি। হেডলাইনটাও বলে দিতে পারি এখনি। বড়দিনের অপরাধ: নীল ভালুকের রহস্য। খুব আকর্ষণীয় হবে, তাই না?

লোকটার হাবভাব একটুও ভাল লাগল না কিশোরের। রবিনের হাত ধরে টান দিল, এসো। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বেরোই। কিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে বুঝল না রবিন। তবে জিজ্ঞেসও করল না। যা বলছে করার জন্যে ঘুরতে গেল।

এক মিনিট, হাত তুলল লোকটা। আর দুএকটা কথার জবাব দিয়ে যাও, কাগজের জন্যে। আমার কলামটা পুরো করতে হবে তো… রবিনের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করল সে।

বাড়ি তো এখানে না, জবাব দিল রবিন। বেড়াতে এসেছি। ওদের বাড়িতে, জিনাকে দেখাল সে। বাড়ির নাম গোবেল ভিলা। আর আমার আংকেলের নাম জনাথন পারকার। তিনি বিজ্ঞানী।

পুরোপুরি অধৈর্য হয়ে গেছে কিশোর। লোকটা এখন রবিনকে ছেড়ে দিলেই খুশি হয় সে। চশমাওলাকে প্রথম থেকেই খারাপ লাগছে তার। আর এখন সন্দেহ ঢুকে গেছে মনে। লোকটার প্রশ্নগুলো বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না, খটকা লাগছে। কি করে চুরি হয়েছে, সেটা নিয়ে মোটেও আগ্রহ নেই, যত আগ্রহ কটা চুরি হয়েছে সেটা নিয়ে। কেন?

কোন কাগজে কাজ করেন আপনি? আচমকা জিজ্ঞেস করে বসল কিশোর।

হঠাৎ করে নোটবুক বন্ধ করল লোকটা। দা নিউজ! যাই এখন। তাড়াতাড়ি গিয়ে প্রতিবেদনটা লিখে ছাপতে দিতে হবে…গুডবাই!

বেরিয়ে গেল সে। ব্যাপারটা মুসারও অবাক লাগল। ভুরু কুঁচকে বিড়বিড় করতে লাগল সে, দা নিউজ তো বুঝলাম, কিন্তু কোন নিউজ? ডেইলি নিউজ? ইভনিং নিউজ? গোবেল বীচ নিউজ? কাগজের পুরো নাম বলেনি লোকটা। ওর কথাবার্তা হাবভাব কিছুই ভাল লাগেনি আমার।

আমারও না, জিনা বলল।

এতক্ষণে সুযোগ পেয়েছে কিশোর। দেরি করল না আর। প্রশ্ন শুরু করল ডিককে। তবে নতুন কিছু তেমন জানতে পারল না। আগেই জেনেছে এ সব। গত রাতে দুটোর দিকে চোর ঢুকেছিল দোকানে। ওদের জানা ছিল কোথায় রয়েছে বার্গলার অ্যালার্ম। তারগুলো কেটে দিয়েছে ঢোকার আগে, যাতে ঘণ্টা বেজে ওদেরকে ধরিয়ে দিতে না পারে। বাক্সে যতগুলো ভালুক ছিল, সব নিয়েছে। শো কেসেরটাও নিয়ে গেছে। অন্য কোন জিনিসে হাত দেয়নি।

এটাই অবাক লাগে, ডিক বলছে। এত দামী দামী জিনিস থাকতেও কিছুই নিল না। নিল কিনা শুধু কয়েকটা সাধারণ খেলনা ভালুক! আরও আশ্চর্য, শো কেসেরটা পর্যন্ত বের করে নিয়ে গেছে। এতে পরিষ্কারই বোঝা যায়, ওরা এসেছিলই শুধু ওগুলো নিতে। আর কোন কিছুতে ইন্টারেস্টেড নয়। এই কাজ করতে ভেতরের কারও সাহায্য নিয়েছে। এই দোকানেরই কেউ! পুলিশের তাই ধারণা।

কেমন যেন লাগে! দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল কিশোর। স্বাভাবিক মনে হয় না। মাথা নাড়ল সে। বিড়বিড় করল, পলিদের বাড়ি থেকে গাছ নিয়ে যাওয়াটাও অদ্ভুত। ভাবছি, কি আছে এ সব চুরির পেছনে? কারণটা কি?

একজন খরিদ্দার এগিয়ে এল ডিকের দিকে। জিনিস চাইল। ব্যস্ত হয়ে পড়ল সেলসম্যান। আর কথা বলা যাবে না, বুঝতে পারল ছেলেমেয়েরা। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল দোকান থেকে।

আপাতত আর কিছু করার নেই। কাজেই ভালুক চুরির ব্যাপারটা মন থেকে দূর করে দিয়ে লোকের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ায় মন দিল। জিনাকে দাওয়াত করে গেছে.তার অনেক বন্ধু। একলা গেল না কোথাও সে, মুসা, কিশোর আর রবিনকে নিয়েই গেল।

উড়ে যেতে লাগল যেন সময়। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া হলো। সেই সাথে পেল অনেক সুন্দর সুন্দর উপহার। খুব খুশি ওরা। একে অন্যের উপহারের প্রশংসা করল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে। তারপর সাগরের ধারে বেড়াতে বেরোল।

সারাদিনে এত খেয়েছে, সাগরের তীরে খোলা বাতাসে ঘুরে আসার পরেও খিদে পেল না তেমন। কাজেই হালকা কিছু খেয়ে খেলতে বসে গেল। তারপর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গেল।

ঘুমানোর আগে মুসার শেষ কথা, কাল আমার কিছু খাওয়া লাগবে না, বুঝলে।

শুধু হুঁ বলতে পারল কিশোর। তার পরেই ঘুম।

কথাটা একেবারেই ভুল বলেছে মুসা। সকালে উঠেই ভীষণ খিদে। প্রচুর খেতে পারল। অন্য তিনজনও কম গেল না। খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাগানে ঘোরাঘুরি করল খানিকক্ষণ। শেষে চলল সৈকতে। দুপুরের খাওয়ার সময় আবার যে খিদে সেই খিদে।

সেদিনটাও কেটে গেল খুব দ্রুত। নতুন কিছু ঘটল না।

তার পর দিন সকালে উঠে কেরিআন্টি দেখলেন খাবারে টান পড়েছে। দোকান থেকে আনতে হবে। তালিকা লিখে ছেলেমেয়েদের ডেকে বললেন বাজার থেকে নিয়ে আসতে।

 এই যে এগুলো দরকার, বললেন তিনি। ডিম, ফল, সবজি…সব লিখে দিয়েছি। দুটো ঝুড়ি নিয়ে যাও। সাইকেলের স্যাডল ব্যাগে এত কিছু ধরবে না।

সাইকেল নিয়ে রওনা হলো ওরা। সাথে চলল রাফি। আকাশ মেঘলা নয়, বৃষ্টি পড়ছে না, পথঘাটও খটখটে শুকনো। এমন দিনে সাইকেল চালাতে ভাল লাগে ওদের। বাজারে পৌঁছে কেনাকাটাগুলো জিনাই করতে লাগল, আর ছেলেরা বোঝ বইতে লাগল।

রবিন পকেটে হাত দিতেই হাতে ঠেকল খেলনা ভালুকটা। আন্টিকে দিতে ভুলে গেছে। হাতের কাছে পেল যখন বের করে হাতে নিয়ে দেখতে লাগল নেড়েচেড়ে। বোঝার চেষ্টা করল কি এমন মাহাত্ম্য আছে? রাফিকে দেখাল।

রাফি, দেখ। সুন্দরই জিনিসটা, কি বলিস? কি নাম রাখা যায়, বল তো? এক কাজ করি। নীল রঙ যখন, নীল ভালুকই নাম রেখে দিই।

শান্তকণ্ঠে পেছনে বলে উঠল কেউ, বাহ্, খুব সুন্দর ভালুক তো। হাতে নিয়ে দেখতে দেবে?

ফিরে তাকিয়ে রবিন দেখল এক তরুণী মহিলা তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে হাসিমুখে। চোখগুলো কেমন বিষণ্ণ। হাত বাড়িয়ে রেখেছে ভালুকটার জন্যে।

দিল রবিন। চকচক করে উঠল মহিলার চোখ। উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। ভালুকটার শরীর টিপে টিপে দেখছে।

আমাকে দেবে এটা? অনুনয় শুরু করল মহিলা। দাম আমি দিয়ে দেব। যত চাও, দেব। খেলনাটা আমাকে দিয়ে দাও। আমার ছেলের জন্যে। তার খুব অসুখ। বিছানায় পড়ে আছে। এটা পেলে খুব খুশি হবে।

মহিলার এই অনুনয় অবাক করল রবিনকে। মনটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল। খেলনাই তো একটা, এতে যদি মহিলার ছেলে খুশি হয়, তোক না। হ্যাঁ বলতে যাবে সে, এই সময় একটা হাত এগিয়ে এল তার কাঁধের ওপর দিয়ে। মহিলার হাত থেকে প্রায় থাবা মেরে কেড়ে নিল ভালুকটা।

.

০৪.

খুবই দুঃখিত আমি, কিশোর বলল ভদ্র কণ্ঠে। কিন্তু এটা অন্য একজনের জন্যে কেনা হয়েছে, ক্রিসমাস প্রেজেন্ট। এই উপহারের মূল্য আপনার জানা আছে। এটা আর কাউকে দেয়া যাবে না। আপনি চাইলে এ রকম ভালুক অনেক কিনতে পারেন, গোবেল বীচ স্টোরে পাওয়া যায়। ওদের কাছে এখন না থাকলেও অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নিতে পারবেন।

প্রতিবাদ করার জন্যে মুখ খুলল মহিলা। কিন্তু শোনার অপেক্ষায় থাকল না কিশোর। রবিনকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল ক্রেতার ভিড়ে।

কাজটা কি ঠিক হলো? রবিন বলল। কি আর এমন জিনিস? মহিলাকে দিয়ে দিলেই হত। তার ছেলেটার খুব অসুখ।

অসুখ না ছাই! বানিয়ে বলেছে। জিনাদের বাড়ি থেকেই আমাদের পিছে লেগেছে। তুমি খেয়াল করোনি। অবাকই লাগছে আমার এখন! আর কত লোক ওই খেলনা ভালুকের ব্যাপারে আগ্রহী!

মানে? চোখ বড় বড় হয়ে গেছে জিনার। ওই মহিলা আমাদের বাড়ি থেকে পিছে লেগেছে?

হ্যাঁ। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখলাম ছোট একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার পাশে। আমাদেরকে দেখে স্টার্ট নিল। খুব ধীরে ধীরে আসতে লাগল আমাদের সাইকেলের পিছে। পুরো রাস্তাটা সেকেন্ড গীয়ারে এসেছে। অথচ ইচ্ছে করলেই আমাদের পাশ কাটিয়ে অনেক আগে চলে আসতে পারত। আসেনি। কেন? আমাদেরকে অনুসরণ করছিল বলে। বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে তারপর পাশ কাটাল। ওই মহিলাই গাড়িটা চালাচ্ছিল, আমি দেখেছি।

কিন্তু কেন? মুসার প্রশ্ন। তোমার কি মনে হয় এই মহিলাও ভালুক শিকারীদের একজন?

তাই তো মনে হচ্ছে এখন। আরও একটা ব্যাপার, যে চশমাওয়ালা লোকটা সেদিন ডিককে প্রশ্ন করছিল, খবরের কাগজের লোক বলে পরিচয় দিয়েছিল, তাকেও এখন চোরের দলের লোক বলেই মনে হচ্ছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করোনি, কটা ভালুক ছিল, কটা চুরি হয়েছে, খালি সে-কথা জিজ্ঞেস করছিল বার বার লোকটা। রবিনের কাছে একটা আছে শুনে কেমন চমকে গিয়েছিল।

কিশোরের কথা শুনে রবিনও অবাক। তাই তো! হা হা, এই একটা ভালুকই নিতে পারেনি চোরেরা। সেজন্যেই এটা নিয়ে যেতে চেয়েছিল মহিলা!

দিয়ে তো দিয়েছিলে আরেকটু হলেই, মুসা বলল। আরেকটা বোকামি করেছ চশমাওয়ালাকে বাড়ির ঠিকানা জানিয়ে দিয়ে। উচিত হয়নি। ওই ব্যাটা সাংবাদিক না কচু। মহিলাকে বলেছে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমাদের পিছু নিতে। কোনভাবে ভালুকটা জোগাড় করে নিয়ে যেতে। হয়তো এর জন্যে টাকাও দিয়েছে মহিলাকে।

নিয়ে গিয়েছিল আরেকটু হলেই! জিনা বলল। কিশোর বাধা না দিলে তো যেতই।

চিন্তিত লাগছে কিশোরকে। বলল, এবার পারল না বটে, তবে আমার বিশ্বাস, আবার চেষ্টা করবে ওরা।

অতি কল্পনা হয়ে যাচ্ছে না তো? মুসা বলল। হয়তো বেশি বেশিই ভেবে ফেলছি আমরা। দোকানে চুরি হয়েছে, ঠিক। পলিদের বাড়িতেও হয়েছে। কিন্তু তাতেই কি মনে হয় ঘটনাগুলোর মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে? খেলনা ভালুকগুলোর পিছেই লেগেছে চোর, এমন তো না-ও হতে পারে। আর ওই মহিলা সত্যি কথাও বলে থাকতে পারে। হয়তো তার বাচ্চার সত্যিই অসুখ।

তার দিকে তাকিয়ে অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নাড়ল কিশোর। দূর! একেবারেই মিছে কথা বাড়ি চলো। ভালুকটা খুলে দেখব ভেতরে কি আছে।

ভেতরে? ভুরু কুঁচকে ফেলল রবিন।

হ্যাঁ। আমি কি ভাবছি বলছি। আমার ধারণা, ওই ভালুকগুলোর কোনটার মধ্যে রয়েছে মূল্যবান কিছু। চোরেরা ছত্রিশটার মধ্যে পয়তিরিশটাই নিয়ে গেছে। ওগুলোতে যদি থাকত এই একটা নেয়ার জন্যে আর অত চেষ্টা করত না। তারমানে রবিনের ভালুকটার মধ্যেই রয়েছে সেই জিনিস, তুড়ি বাজাল সে। গোপন কথা বলতে আমরা বাধ্য করব নীল ভালুককে!

তাড়াতাড়ি বাজার শেষ করল ওরা। তারপর বাড়ির পথ ধরল। অস্বস্তি বোধ। করছে। বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। কেউ অনুসরণ করছে কিনা দেখছে। কিন্তু সন্দেহজনক কোন গাড়িকে পিছু নিতে দেখল না।

দুশ্চিন্তা গেল না তবুও। গোবেল ভিলার বাগানে ঢোকার আগে আর নিশ্চিন্ত হতে পারল না। ঢুকে, তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক! এবারে শান্তি!

জিনিসপত্রগুলো রান্নাঘরে নিয়ে এল ওরা। সেখানে ওগুলো রেখে রওনা হলো একটা পুরানো স্টোর রূমে। পারকার আংকেলের স্টাডি থেকে দূরে ঘরটা। ওখানে চেঁচামেচি করলেও তার কানে পৌঁছবে না। বিরক্ত হবেন না তিনি। কাজে বিঘ্ন ঘটবে না। গোলমাল একেবারেই সইতে পারেন না তিনি।

স্টোর রূমে ঢুকে পকেট থেকে ভালুকটা বের করল কিশোর।

 ঘাউ! আগ্রহী মনে হলো রাফিকে।

দেখি তো, কিশোরের হাত থেকে ভালুকটা নিল মুসা। ছোট। খেলনা। এর ভেতরে কি থাকতে পারে বুঝতে পারছি না।

হীরাটীরা কিছু? রবিনের অনুমান।

কিংবা হয়তো এক টুকরো কাগজ, আবার মুসার হাত থেকে ভালুকটা নিয়ে ওটার পেট টিপেটুপে দেখতে শুরু করল কিশোর। দাঁড়াও! জোরে টিপলে কি যেন লাগছে!

কেটে ফেলো, মুসা বলল।

ঠিক। পকেট থেকে বহু ফলাওয়ালা ছুরিটা বের করল কিশোর, যেটা পলির কাছ থেকে উপহার পেয়েছে।

আমার কাছে দাও! উত্তেজনায় কাঁপছে মুসা।

বন্ধুর দিকে তাকাল কিশোর। কি ভাবল। তারপর হেসে ভালুক আর ছুরিটা বাড়িয়ে দিল। নাও, কাটো।

হাত কাঁপছে মুসার। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে দিল ছেড়ে। একসাথে ধরতে গেল জিনা আর কিশোর। ঠোকাঠুকি হয়ে গেল হাতে হাতে। ভালুকটার গায়ে লেগে লাফ দিয়ে ওপরে উঠে গেল ওটা। পড়তে লাগল আবার। রাফি ভাবল, এটা এক ধরনের মজার লোফালুফি খেলা। সে-ও অংশ নিল তাতে। ভালুকটা মাটিতে পড়ার আগেই লুফে নিল, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল জোরে, যাতে না ফসকাতে পারে।

এই, এই! চিৎকার করে উঠল রবিন।

ফেল! ছাড়, জলদি! রাফির কলার ধরে ঝাঁকি দিল কিশোর।

কুকুরটার মুখ থেকে ভালুকটা বের করে নিতে গেল মুসা। কিন্তু এটাও খেলা ভেবে ছাড়ল না রাফি। আরও জোরে কামড়ে ধরল। গরগর শব্দ বেরোচ্ছে গলার ভেতর থেকে। যেন চ্যালেঞ্জ করছে, দেখি বের করো তো, কেমন পারো!

হয়েছে, রাফি! ধমক দিয়ে বলল কিশোর। ফেল ওটা! ছাড়! দেখি, দে আমাকে!

মুসাও হাত বাড়িয়েছে। দুজনে দুদিকে ধরে টান মারল। প্রচণ্ড টান, সইতে পারল না সামান্য একটা খেলনা। ছিঁড়ে গেল ওটা।

অবাক হয়ে অবশেষে কামড় ছেড়ে দিল রাফি। ছেঁড়া ভালুকটা তুলে নিল মুসা। দেখার জন্যে এত দ্রুত ঝুঁকে এল চারজনে, ঠোকাঠুকি হয়ে গেল মাথায়। ভেতরে আর কিছুই চোখে পড়ল না, তুলা ছাড়া। শেষে ফুটোর ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে দিল রবিন।

এই, আছে তো! কি যেন রয়েছে!

ভালুকটা নিয়ে ফুটোটা টেনে আরও বড় করল জিনা। কিছু তুলা টেনে টেনে বের করে ফেলল। তারপর ফুটোটা নিচের দিকে করে ঝাঁকি দিল জোরে। নিচে বাড়িয়ে রাখল আরেক:হাত। শক্ত করে পাকানো এক টুকরো কাগজ পড়ল তার ছড়ানো তালুতে।

 একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল সকলেই। নীরবে তাকিয়ে রয়েছে জিনার হাতের কাগজটার দিকে। তাহলে নীল ভালুক মুখ খুলল অবশেষে, বলতে যাচ্ছে তার। গোপন কথা!!

ভাল, কথা বলল কিশোর। লুকানোর চমৎকার জায়গা! এখন দেখা যাক কাগজে কি রয়েছে!

খুলতে আরম্ভ করে দিয়েছে জিনা। চুপ করে সেদিকে তাকিয়ে রইল অন্য তিনজনে। উত্তেজনায় এখন সবাই কাঁপছে। ভাজ খুলে হাতের তালুতে বিছিয়ে ডলে। কাগজটা সমান করল জিনা। কি আছে পড়ার জন্যে ঝুঁকে এল সকলেই।

কালো কালিতে নিখুঁত করে আঁকা রয়েছে কতগুলো আয়তাকার চিহ্ন। তার মধ্যে থেকে গজিয়ে উঠেছে কিছু নকশা, কিংবা জ্যামিতিক চিহ্ন। আর কিছু লেখা রয়েছে ভেতরে।

নকশা! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

 হু! চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল জিনা। তাহলে এর পেছনেই লেগেছিল ওরা!

কারা সে-কথাটা জিজ্ঞেস করল না কেউ। জানাই তো আছে। চোরের কথা বলছে জিনা। ক্রিসমাস ট্রি আর দোকানে ঢুকে খেলনা ভালুক চুরির রহস্যের একটা জবাব এখন পরিষ্কার।

আমাদের অনুমানই ঠিক! বেশ সন্তুষ্ট লাগছে কিশোরকে। মুসা, এখন তো বিশ্বাস করবে? নীল ভালুকটার পেছনেই লেগেছিল চোরেরা।

হায়রে আমার নীল- ভালুক! ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল রবিন। কি নিষ্ঠুর ভাবেই না খুন করা হলো তোকে!

কিশোর বলল, ঠিক করে ফেলা যাবে। নষ্ট হয়নি। ভাল করে দেখো, শুধু জোড়াটা ছুটেছে। তুলা ভরে আবার সেলাই করে নিলেই হয়ে যাবে।

কাজে বসে গেল রবিন। ও যখন খেলনা মেরামতে ব্যস্ত, অন্য তিনজন তখন নকশাটা নিয়ে বসল। মানে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল।

নকশা, তাতে কোন সন্দেহ নেই, মুসা বলল। কিন্তু কিসের নকশা? হাতমাথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।

এত সহজে হাল ছাড়ছি না, জিনা বলল। হয়তো কোন বাড়ির নকশা…

কিংবা গুপ্তধনের! বলে উঠল কিশোর। কোন নির্জন দ্বীপে লুকানো থাকলেও অবাক হব না। সব সময়েই কল্পনার বন্ধু ছেড়ে দেয় সে। তাতে ক্ষতি বিশেষ হয় না। রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে বরং লাভই হয়েছে এতে, বহুবার দেখেছে।

রান্নাঘর থেকে কেরিআন্টির ডাক শোনা গেল। এই জিনা, তোরা কোথায় গেলি? খাবার রেডি।

দাঁত দিয়ে কামড়ে সুতো কাটল রবিন। হয়েছে! ভালুকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাতের কাজ দেখতে দেখতে বলল, একেবারে নতুনের মত। হ্যাঁ রে নীল ভালুক, আর কোন দুঃখ নেই তো তোর?

এটা আর আন্টিকে দেয়া যাবে না, মুসা বলল।

খাওয়ার পর আবার নকশাটা নিয়ে বসব, বলল কিশোর। এখন লুকিয়ে রাখি। কোথায় রাখব?

ঘাউ! জবাব দিল রাফি।

বাহ, ভাল জায়গার কথা বলেছিস তো, হেসে বলল কিশোর। ও বলছে, কুকুরের ঘরে রেখে দিতে। তারমানে ওর ঘুমানোর জায়গায়। ভালই হবে, কি বলো?

রাফির কথা বললেও তার বন্ধুরা জানে বুদ্ধিটা কিশোরের মাথা থেকেই বেরিয়েছে। একটা খাম খুঁজে বের করল সে। ভাজ করে কাগজটা তাতে ভরে টেপ দিয়ে মুখ আটকে দিল। খামটা নিয়ে গিয়ে আটকাল কুকুরের ঘরে ছাতের ভেতর। দিকটায়।

চলো, জলদি চলো, জিনা বলল। টেবিলে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখলে রেগে যায় আব্বা।

বকা খেতেই হবে, ধরে নিল সে। তবে খেতে হলো না। একটা জরুরী কাজে এতই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন পারকার আংকেল, কয়েকবার করে ডেকে তারপর বের। করে আনতে হলো তাকে। টেবিলে আসতে বরং তিনিই দেরি করে ফেললেন।

খুশি মনে খেতে বসল ছেলেমেয়েরা। একটা রহস্যের কিনারা করতে না করতেই এসে হাজির হয়েছে আরেকটা রহস্য।

নকশা!

.

০৫.

সেদিন বিকেলেও আবহাওয়া ভাল রইল। তুষার পড়লেও অবশ্য ক্ষতি ছিল না। এই সময়টায় ভালই লাগে তুষার। ঘরে বসে লুডু-কেরম খেলা যায়। তবে পড়ল না। পরিষ্কার দিন। শুকনো। উজ্জ্বল। বাইরে বেরোনোর সুযোগটা হাতছাড়া করল না ওরা।

চলো, সাইকেল নিয়ে বেরোই, প্রস্তাব দিল জিনা।

চলো, রাজি হলো কিশোর। নকশা নিয়ে বিকেলেও বসা যাবে। এত তাড়াহুড়ো নেই।

 কিশোরের পরামর্শে নীল ভালুকটা সাইকেলের স্যাডল ব্যাগে ভরে নিল রবিন।

নিচ্ছ যে, মুসা হাসল। ভয় লাগছে না? কেড়ে নিতে পারে ওরা…

খুব ভাল হয় তাহলে, কথাটা ধরল কিশোর। ব্যাটাদের ওপর নজর রাখার একটা ব্যবস্থা হয় নিতে এলে। চোরাই মাল সহ হাতেনাতে ধরেও ফেলা যেতে পারে। জানা যাবে ওরা কারা।

ঠিক, জিনা বলল। কড়া নজর রাখব আমরা। তবে রাখছি যে সেটা বুঝতে দেয়া চলবে না।

টোপ একবার গিললেই হয়, মুসা বলল। চোরগুলোর পিছু নিয়ে গিয়ে ব্যাটাদের গোপন আস্তানা বের করে ফেলব। গিয়ে বলব পুলিশকে। পুলিশ গিয়ে ধরবে…

হয়েছে, বকবক থামাও এখন, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে সোজা করল, উঠে বসার জন্যে। কোথায় যাওয়া যায়? চলো, বনের দিকেই চলে যাই।

কেউ অরাজি নয়।

গোবেল বীচের একধারে ছোট বন। সেখানে পৌঁছে সাইকেল রেখে একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে জিরাতে লাগল কিশোর। দেখাদেখি অন্যেরাও তাই করল। তবে এ সময়টায় ঠাণ্ডা এত বেশি, বনের ভেতর ভাল লাগে না। বেশিক্ষণ থাকল না ওখানে ওরা। আবার সাইকেলে চেপে বসল।

ফেরার পথে ছোট একটা দোকান দেখে কিছু কেনাকাটার ইচ্ছে হলো রবিনের। দোকানটা নতুন খুলেছে। কাঠ কুঁদে নানা রকম খেলনা আর ঘর সাজানোর জিনিস বানিয়ে বিক্রি করে দোকানদার। চালাক-চতুর লোক।

দোকানের দেয়ালে সাইকেল ঠেস দিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকল ছেলেমেয়েরা। রাফিও ঢুকল। লোকটার তৈরি জিনিসপত্র দেখতে লাগল প্রশংসার দৃষ্টিতে। সালাদের বাটি, চামচ, কাটাচামচ, খেলনা, জীবজন্তুর মডেল, সবই কাঠের তৈরি। পুঁতির মালাও আছে অনেক রকমের। কেরিআন্টিকে উপহার দেয়ার জন্যে একটা। সালাদের বাটি কিনল কিশোর।

রবিনের কিছু পছন্দ হলো না। কেনার মত জিনিস পেল না

। উপহার দেয়ার জন্যে মুসা কিনল একটা কাঠের অ্যান্টিক।

 ঠাট্টা করে রবিন বলল, দেখো, এর ভেতর থেকে আবার কি বেরোয়।

দোকান থেকে বেরিয়ে এল ওরা। বেরোতেই রবিনের চোখে পড়ল, সাইকেলের স্যাডল ব্যাগ খোলা। দৌড়ে গেল কাছে।

হায় হায়, চিৎকার করে উঠল সে। আমার ভালুক!

তন্ন তন্ন করে খুঁজল ব্যাগটা, যদিও এত খোঁজার প্রয়োজন ছিল না। নেই তো নেইই। গায়েব হয়ে গেছে খেলনাটা।

ঠোঁট কামড়াল রবিন। আ-আমারই দোষ! আগেই তো আলোচনা হয়েছে, চুরি হতে পারে। তার পরেও মনে রাখলাম না কেন? ভুলে গেলাম কেন? নিশ্চয় কেউ নজর রেখেছে আমাদের ওপর। হয়তো বাড়ি থেকেই অনুসরণ করে এসেছে। তারপর যেই সুযোগ পেয়েছে, নিয়ে চলে গেছে। ইস, রাফিকে পাহারায় রাখলেও হত।

তোমার একার দোষ না, জিনা বলল। দোষ আমাদের সবারই। এতটা পথ আমাদের অনুসরণ করে আসবে, কে ভাবতে পেরেছিল? তবে আমি তেমন কাউকে কিন্তু দেখিনি পথে, যাকে সন্দেহ করা যায়।

আমিও না, মুসা বলল।

কিশোর কিছু বলছে না। চুপ করে ভাবছে। তার মনে পড়ছে এখন, মোটর সাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ শুনেছিল, যখন সাইকেল রেখে দোকানে ঢুকছে ওরা, তখন। না না, ওরা যখন দোকানের ভেতরে ঢুকে গেছে, তখন।

নিশ্চয় চোরটা, চিন্তিত ভঙ্গিতে যেন নিজেকেই কথাটা বলল সে। একটা গাধা আমি! ছাগল! কেন পাত্তা দিলাম না!

গালাগাল করার কারণ আছে। সব সময় এতটা বেখেয়াল হয় না। সেজন্যেই এতগুলো জটিল রহস্যের সমাধান করতে পেরেছে। ভালুকটা চুরি যাওয়ায় একটা মূল্যবান সূত্র হারাল। চোরকে কাছে পাওয়ার জন্যে এটা একটা টোপ ছিল।

এবার কি করব? জিনার জিজ্ঞাসা।

কি আর। পুলিশের কাছে যাব, রবিন বলল। জিনিসটা তো চুরিই হয়েছে, নাকি? জিনিস চুরি গেলে পুলিশের কাছেই যেতে হয়।

পুলিশের কাছে? মুসা যুক্তি দেখাল। গিয়ে কি বলব ওদেরকে? পঞ্চাশ পেন্স দামের একটা খেলনা চুরি গেছে? হেসে খুন হয়ে যাবে না।

হবে না, গম্ভীর হয়ে বলল রবিন। যদি ওদেরকে বোঝাতে পারি, ভালুকটা কত দামী। আর নকশাটা দেখাই ওদের।

কিন্তু এখনই নকশাটার কথা পুলিশকে বলতে যাব না আমরা, কিশোর বলল। একবার দিলে আবার কবে ফেরত পাব, কোনদিন পাব কিনা, ঠিকঠিকানা নেই। ব্যাপারটাকে ওরা সিরিয়াসলি নিলে অবশ্য আমার কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু নেবে তো না।

গ্রহণযোগ্য তেমন কোন যুক্তি অবশ্য দেখতে পারল না সে। তবে সেজন্যে চাপাচাপিও করল না কেউ। ওদেরও তেমন ইচ্ছে নেই পুলিশকে দেয়ার। হাজার হোক, রহস্যটা ওদের। ওরাই এটা খুঁচিয়ে বের করেছে। নিজে নিজে সমাধান করতে পারলে মজাটা ষোলো আনা। তবে সেটা করার কোন উপায় আপাতত দেখতে পাচ্ছে না।

পথের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা করল ওরা। তারপর সাইকেল নিয়ে আবার রওনা হলো।

চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল কিশোর। বলল, এই, শোনো, একটা বুদ্ধি করেছি! আমাদের সাথে চোরের সম্পর্ক এখনও কাটেনি। ভালুকটা নিয়ে গেছে একটা বিশেষ কারণে। নিশ্চয় এখন পেট কাটা হচ্ছে ওটার। ভেতরের জিনিসটা বের করার জন্যে। সকালে আমরা যা করেছিলাম।

তাতে কি? বুঝতে পারছে না মুসা।

কেটে কিছু পাবে না ওর ভেতরে, তুলা ছাড়া। অবাক হবে। পরীক্ষা করতে বসবে তখন। নতুন করে সেলাই করা হয়েছে যে, দেখতে পাবে।

তাতেই বা কি?

কেন, বুঝতে পারছ না? উত্তেজিত হয়ে উঠেছে কিশোর। নকশাটা পাবে না। বুঝে ফেলবে, ওটা আমাদের হাতে পড়েছে!

হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। আবার আমাদের পিছে লাগবে তখন। ভালুকের ভেতরে যে জিনিসটা পেয়েছি, সেটা কেড়ে নেয়ার জন্যে। কিংবা চুরি করার জন্যে। এইবার আর চোখের আড়াল করব না আমরা ওকে। কড়া নজর রাখব।

তবে কিশোরকে এতটা খুশি লাগল না। ভুরু কুঁচকে ফেলেছে। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, টোপটা কোথায় কিভাবে পাতব? ও জানছে না কোথায় রেখেছি আমরা নকশাটা। পেতে হলে পুরো গোবেল ভিলা আতিপাতি করে খুঁজতে হবে তাকে। সেটা করতে যাবে বলে মনে হয় না। সহজ উপায় একটাই আছে…

ঠিক! বুঝে ফেলেছে জিনা। আমাদের একজনকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবে! জোর করে কথা বের করবে মুখ থেকে!

চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মুসার। কাছছাড়া হব না আমরা। কোনমতেই আলাদা হব না। আর রাফির মত একটা কুকুর পাহারায় রয়েছে আমাদের। তুলে নিয়ে যাওয়া কি মুখের কথা? অত সহজ না।

এমনও হতে পারে, রবিন বলল। শুরুতে ওসব কিছুই না করে অন্যভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করবে আমাদের সঙ্গে। এই যেমন টেলিফোন, কিংবা চিঠি।

তা না হয় করল, কিশোর বলল। কিন্তু আমরা তো দিতে চাইব না। তখন বাধ্য করবে কিভাবে? তবে একটা কথা ঠিক, কোন না কোনভাবে যোগাযোগের। চেষ্টা করবেই। তখন আমাদের কাজ হবে, বুদ্ধির খেলায় তাকে পরাজিত করা।

সেই চেষ্টাই করা হবে, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল চারজনে। তারপর অনেকটা হালকা মন নিয়ে ফিরে চলল গোবেল ভিলায়।

*

দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছে ওরা কিছু একটা ঘটার। ঘটল না। সেদিন তো নয়ই, পরের দিনও না। নকশারও সমাধান হলো না। অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারল না কিছু।

তার পরদিন এত উজ্জ্বল রোদ উঠল, সৈকতে খেলতে বেরিয়ে পড়ল ওরা। সাগর শান্ত। বালি বেশ গরম। গায়ের কোটও খুলে ফেলতে হলো এক সময়।

সৈকতে আর কেউ নেই। যত খুশি চেঁচাতে পারল ওরা, যে ভাবে খুশি ছোটাছুটি করতে পারল। বিরক্ত হওয়ার কেউ নেই, ফলে ওদেরকেও অস্বস্তিতে থাকতে হলো না। সবচেয়ে বেশি লাফাচ্ছে রাফি, চেঁচামেচি করছে। এমন সব অঙ্গভঙ্গি করছে, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে ছেলেমেয়েরা।

খেলায় এতই ব্যস্ত রয়েছে ওরা, মোটর সাইকেলটা আসার শব্দও শুনল না। সৈকতের ওপরের পথে এসে থেমে গেল ওটা।

টের পেল প্রথমে রাফি। পেয়েই খেলা থামিয়ে দিল আচমকা। ওপরের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে চাপা গরগর শুরু করল।

অবাক হলো কিশোর। ঘুরে তাকাল। অপরিচিত লোকটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মাত্র কয়েক ফুট দূরে।

.

০৬.

এগিয়ে আসতে লাগল লোকটা। তরুণ বয়েসী। উঁচু গোড়ালি ঢাকা বুট পায়ে। মাথায় হেলমেট, মুখে টেনে দেয়া সামনের স্বচ্ছ অংশ, ফলে চেহারা দেখা যাচ্ছে না স্পষ্ট। গলায় জড়ানো একটা স্কার্ফ।

লোকটাকে অদ্ভুত লাগছে, বোধহয় মুখ ঠিকমত দেখা না যাওয়াতেই লাগছে ওরকম। লোকটাকে পছন্দ হয়নি রাফির। ভাল লোক হলে এমন রেগে যেত না। সে। তাতে সবাই অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। জিনা আর রবিন কাছাকাছি হয়ে গেল, যেন পরস্পরকে রক্ষা করার জন্যে। মুসার হাতে বল। ছোঁড়ার জন্যে। নিয়েছিল। ধীরে ধীরে নামিয়ে নিল হাতটা। কি করবে বুঝতে পারছে না।

এই যে, এগিয়ে আসছে লোকটা। খেলছ বুঝি? রোদটাও ভাল উঠেছে, না? খেলার মতই।

আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরই ফাস করে দিল সব। মেকি। তার কথা একটুও ভাল লাগল না ছেলেমেয়েদের।

হ্যাঁ, মুখ গোমড়া করে রেখে জবাব দিল মুসা। ভালই দিন। কিন্তু তাতে কি?

মিষ্টি কথা বলে সুবিধে হবে না বুঝে গেল লোকটা। তাই আর ওসবের মধ্যে গেল না। তার আসল চেহারায় ফিরে এল। কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, তাতে? কাগজটা কই?।

চুপ হয়ে গেল মুসা। জিনা বলল, কিসের কাগজ?

দেখো, ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা কোরো না। ভাল করেই জানো কিসের কাগজ। নীল খেলনা ভালকটার মধ্যে ছিল।

কিশোর বলল, কি বলছেন কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আর ভালুকটাও নেই। কোন শয়তান লোক জানি সাইকেলের স্যাডল ব্যাগ থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। বিশ্বাস না হলে ওকে জিজ্ঞেস করুন, রবিনকে দেখাল সে। ওর ছিল। হারিয়ে খুব মন খারাপ হয়ে গেছে। বেচারি।

কিশোরের কথার সমর্থনে মাথা ঝকাল রবিন। দুঃখ দুঃখ ভাব ফুটিয়ে তুলল চেহারায়।

কঠিন দৃষ্টিতে কিশোরের দিকে তাকাল লোকটা, মিথ্যে কথা তো ভালই বলতে পারো। তবে ওসব কেচ্ছা গেলাতে পারবে না আমাকে। খেলনাটা চুরি হয়েছে, বিশ্বাস করছি, কিন্তু নকশাটা নেই ওর মধ্যে। তারমানে তোমাদের হাতেই পড়েছে।

চট করে পরস্পরের দিকে তাকাল মুসা আর কিশোর। বেশি কথা বলে ফেলেছে লোকটা। নিজের পরিচয় জানিয়ে দিয়েছে। সে জানে নকশাটা নেই খেলনার ভেতরে। তার অর্থ হয় সে-ই চুরি করেছে, কিংবা তার কোনও দোস্ত। নকশা বলেছে, শুধু কাগজ বলেনি, সুতরাং ওটা নকশাই। কিশোরেরা আন্দাজ করেছিল বটে ওরকম কিছুই হবে, কিন্তু নিশ্চিত ছিল না। এখন হলো।

যাক, এক চোরের দেখা পাওয়া গেল। এখন খুব বুদ্ধি করে মাথা ঠাণ্ডা রেখে চাল চালতে হবে, যাতে ওদের ফাঁদে ফেলা যায়।

কিন্তু গোলমাল করে দিল রাফি। সে খুব বুদ্ধিমান কুকুর, সন্দেহ নেই, তবে কুকুরের তুলনায় বুদ্ধিমান। মানুষের তুলনায় কিছুই না। মানুষের মত মাথা খাঁটিয়ে, চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করতে পারে না। যা করার সহজাত প্রবৃত্তির বশেই করে ফেলে। এখন তার প্রবৃত্তি বলল, নোকটা খারাপ, তার বন্ধুদেরকে হুমকি দিচ্ছে, ক্ষতি করতে চায়, তার মত একটা কুকুরের উচিত তাকে তাড়ানো।

কাজেই সেই কাজই করে বসল রাফি। আক্রমণ করে বসল লোকটাকে। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পা কামড়ে ধরল সে। পায়ে মোটা চামড়ার ভারী বুট থাকায় কামড়টা মাংসে বসল না, বেঁচে গেল লোকটা। তবে ভয় যেমন পেল, রেগে গেল তেমনি।

শয়তান! কুত্তা! চেঁচিয়ে উঠল সে। পকেট থেকে একটা কশ (সীসা ভরা পাইপ) টেনে বের করে জোরে এক বাড়ি মারল রাফির মাথায়। টু শব্দটিও আর করতে পারল না কুকুরটা। বেহুশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। নড়লও না আর।

রাফি! চিৎকার করে উঠল জিনা। হাঁটু গেড়ে বালিতে বসে পড়ল কুকুরটার পাশে। আপনি…আপনি আমার রাফিকে মেরেছেন! পস্তাতে হবে! এর জন্যে পস্তাতে হবে আপনাকে! আমরা আপনাকে ছাড়ব না… ফুঁসতে থাকল সে।

চুপ! ধমক লাগাল লোকটা। তুমিও যদি ওরকম একটা বাড়ি খেতে না চাও, চুপ করে থাকো!

রাগে ফেটে পড়বে যেন মুসা আর জিনা। আগে বাড়ল। লোকটার ওপরে ঝাঁপিয়েই পড়বে বুঝি।

খেঁকিয়ে উঠল লোকটা, এই, থামো! ভাল চাইলে আর এক পা এগোবে না! কশটা মাথার ওপর তুলল সে, বাড়ি মারার ভঙ্গিতে। এখানে খেলতে আসিনি আমি। আবার জিজ্ঞেস করছি। ভালুকের ভেতরে যে নকশাটা পেয়েছ সেটা কোথায়?

একটা কথাও বলল না মুসা, জিনা আর রবিন। কিশোর তো যেন শুনতেই পায়নি। এক জায়গায় পাথরের খাজে জমে রয়েছে পানি। বোধহয় তুষার গলেই হয়েছে। আঁজলা ভরে তুলে এনে ছিটিয়ে দিতে লাগল রাফির নাকেমুখে।

জোরে জোরে নাক টানছে রবিন। তার দিকে ফিরল লোকটা। বলল, এরা তো মুখ খুলবে না। তোমাকেই জিজ্ঞেস করছি। সত্যি সত্যি বলবে। নকশাটা কোথায়?

রাস্তার দিকে তাকাল রবিন। যদি কেউ আসে? কিন্তু কেউ আসছে না। ওদেরকে বাঁচানোর মত কেউ নেই কোথাও। কাঁপা গলায় বলল, আমি…আমি…মানে আমার কাছে নেই।…এখানে নেই আরকি। টা রয়েছে আমার আংকেলের বাড়িতে লুকানো! মনের সমস্ত সাহস এক করে জোর গলায় বলল, কোথায় আছে বললাম, কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না আপনার। গোবেল। ভিলাকে টুকরো টুকরো করে ফেললেও বের করতে পারবেন না। পাবেন না ওটা। এমন জায়গায় লুকানো হয়েছে।

রবিন ভেবেছে এ রকম করে বললেই লোকটা নিরাশ হয়ে চলে যাবে। গেল তো না-ই, তাকে আতঙ্কিত করে দিয়ে হা হা করে হেসে উঠল সে।

হাহ্ হাহ্ হাহ্! হো হো হোহ্! বোকা ছেলে! তুমি কি ভেবেছ আমি আনতে যাব ওটা? এত কষ্ট করব? কক্ষনো না। সেধে গিয়ে ধরা দেব ভেবেছ?

হাসি থামিয়ে দিল হঠাৎ। হ্যাঁ, এখন লক্ষ্মী হয়ে যাও সবাই। ভালয় ভালয় দিয়ে দাও ওটা। কাল পর্যন্ত সময় দিলাম। কাল দুপুর বারোটার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ওই পাথরটার তলায় চাপা দিয়ে রাখবে।

কশটা দোলাল আরেকবার, ওদেরকে দেখিয়ে। হুমকি দিল। এ সম্পর্কে পুলিশকে কিংবা আর কাউকে যদি একটা বর্ণ বলল, ভাল হবে না মনে রেখো। আর নকশাটা না দিলেও খারাপ হবে। খুব খারাপ, শুধু এটুকুই বললাম, হ্যাঁ!

ওরকম করে সিনেমায় হুমকি দেয় খারাপ চরিত্রের লোকেরা দেখেছে ওরা। কেমন হাস্যকর লাগে ওখানে। তবে বাস্তবে সেটা মোটেও হাস্যকর লাগল না ওদের কাছে। যা বলছে, করবে লোকটা। মিথ্যে হুমকি দিচ্ছে না।

কি, বুঝেছ? জিজ্ঞেস করল লোকটা।

হ্যাঁ, মাথা দোলাল মুসা। পাবেন আপনার নকশা। নিচু স্বরে লোকটা যেন বুঝতে না পারে এমন ভাবে অভিশাপ দিল, সেটা তোমার গলায় ঢুকে গিয়ে যেন দম বন্ধ করে মারে!

কশটা পকেটে রেখে দিল লোকটা। কাল দুপুর বারোটা। মনে থাকে যেন।

ঘুরে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সে। উঠে গেল সৈকতের ওপরের রাস্তায়। নীরবে তাকিয়ে রয়েছে গোয়েন্দারা। তখনও রাফির পাশে হাটু গেড়ে বসে রয়েছে কিশোর। হুঁশ ফিরছে কুকুরটার।

হ্যাঁ, নকশা তুমি পাবে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর, ঠিক সময়েই। তবে সেটা দিয়ে কোন লাভ হবে না তোমার।

অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল মুসা। কি বললে?

নকশা একটা দেব তাকে, তবে নকল। আসলটা দিয়ে দেব, এত বোকা নাকি আমি।

ওই, যাচ্ছে, রবিন বলল।

 রাস্তায় মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন স্টার্ট নিল।

খেলা আর জমবে না। রাফি দুর্বল হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে গিয়ে এখন খেতে দেয়া দরকার। তারপর লম্বা একটা ঘুম।

ওঠ, রাফি, ওঠ, ডাকল কিশোর। লক্ষ্মী ছেলে, ওঠ। তোর আর কি দোষ? পেছন থেকে মেরে তো অনেক বাহাদুরকেও চিৎ করে ফেলা যায়। নইলে কি আর ছাড়তি? এতক্ষণে কামড়ে হয়তো কিমাই বানিয়ে ফেলতি।

তারপর সেই কিমাগুলো পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে চুলায় চাপিয়ে দিত, হেসে বলল মুসা।

দুর্বল কণ্ঠে রাফি বলল, ঘাউ! কিমার চেয়ে হাড়ই তার বেশি পছন্দ।

*

বাড়ি ফিরে নিজের বিছানার পায়ের নিচে কার্পেটে রাফিকে আরাম করে শুইয়ে দিল জিনা। তারপর সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসল। উঠে চলে গেল মুসা। নকশাটা আনতে। কুকুরের ঘর থেকে ওটা খুলে এনে টেবিলে বিছাল।

তুমি তো বললে, একটা নকল নকশা দেবে, কিশোরকে বলল মুসা। পাবে কোথায়?

আঁকব, জবাব দিল কিশোর। বানিয়ে বানিয়ে দেব একটা এঁকে। দেখতে যাতে এটার মতই লাগে। তাহলে প্রথমে ধোকা খাবে মোটর সাইকেলওয়ালা লোকটা। নিয়ে চলে যাবে। বুঝবে, আসল নয়। আবার লাগবে তখন আমাদের পেছনে।

তাহলে কাগজও একই ধরনের ব্যবহার করতে হবে, রবিন বলল।

আগেই ভেবেছি সেটা, হেসে বলল কিশোর। সাধারণ কাগজ। সাদা খাতা থেকে ছিঁড়ে নিয়েছে ওরা। ইস্কুলে যেগুলো ব্যবহার করি আমরা। আমরাও ওরকমই একটা পাতা নেব…

খুব সাবধানে আঁকতে হবে, মুসা বলল। দেখতে যেন একেবারে আসলের মত লাগে।

তা লাগবে। শোনো, আরও সহজেই কাজটা করা যায়। এটার ওপরেই ছাপ দিয়ে আঁকতে পারি। কিছু কিছু জায়গা সামান্য বদলে দিলেই হবে।

প্রশংসার দৃষ্টিতে কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ভাল বুদ্ধি বের করেছ।

নকশাটার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। নিজেকেই যেন বলল, হ্যাঁ, হবে। জিনার কাছ থেকে একটা খাতা চেয়ে নিয়ে একটা পাতা ছিঁড়ে নিল। তারপর গিয়ে বসল জানালার কাছে, আলো বেশি পাওয়ার জন্যে। ছাপ দিয়ে আঁকতে সুবিধে হবে। একটা ট্রেসিং পেপার আর বলপেন নিয়ে কাজ শুরু করল। আঁকাটা খুব সহজ। কঠিন হলেগে আসল নকশাটার মানে বোঝ। ঘোড়ার ডিম কিছুই বোঝা যায় না।

কয়েক মিনিট পর ট্রেসিং পেপারে আঁকা হয়ে গেল। সেটাকে তখন সাদা কাগজের ওপর রেখে জোরে চাপ দিয়ে রেখাগুলোর ওপর কলম বোলাতে লাগল কিশোর। নিচের কাগজে দাগ পড়ে যাবে। তখন তার ওপর কলম বুলিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে নকশা। বদলাতে হলে ট্রেসিং পেপারেই বদলাতে হবে। যাতে নিচে। ভুল চাপ পড়ে। তা-ই করতে লাগল সে।

হয়েছে। কিছুক্ষণ পর সন্তুষ্ট হয়ে মুখ তুলল কিশোর। চমৎকার! সামনে রেখে দুটো মিলিয়ে দেখেও সহজে ধরা যায় না।

হ্যাঁ, খুব ভাল, উত্তেজিত হয়ে বলল মুসা। দারুণ এঁকেছ। চোরেরা বুঝতেই পারবে না কিছু। আর যখন বুঝবে, দেরি হয়ে যাবে তখন। আমরা সময় পেয়ে যাব। কিছু করার।

সংখ্যা আর লেখাগুলোর ব্যাপারে কি হবে? রবিনের প্রশ্ন।

সংখ্যা আর লেখা? ভুরু কোঁচকাল মুসা।

দেখছ না, লেখা রয়েছে এন এস ই ডব্লিউ। এর মানে নিশ্চয় নর্থ সাউথ ঈস্ট ওয়েস্ট বোঝাতে চেয়েছে। তারপর রয়েছে সংখ্যা।

লেখাও লিখব, কিশোর বলল। কিছু নকশা দেখে, কিছু বানিয়ে বানিয়ে লিখতে শুরু করল সে। যা মাথায় এল।

অবশেষে শেষ হলো কাজ।

ব্যস, বলল সে। এখন শুধু এটা তুলে নেয়ার অপেক্ষা। কাল গিয়ে বসে থাকব। মোটর সাইকেলওলা নিতে এলে সাইকেল নিয়ে অবশ্যই তার পিছু নিতে পারব না। তবে ভাল একটা সূত্র পেয়ে যাব। মোটর সাইকেলের নম্বর। কে জানে, ওই একটা সূত্রই হয়তো ওর দোস্তদের কাছে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে আমাদের। হয়তো দলবল সহ ধরিয়ে দিতেও। সমাধান হবে নীল ভালুক রহস্যের।

.

০৭.

পরদিন সকাল দশটায়ই সৈকতে চলে এল গোয়েন্দারা। লোকটা বলে গেছে বারোটায় আসবে। এর আগে ওর আসার আশা করেও লাভ নেই। কিন্তু বলা যায়। অতি উত্তেজনায় চলেও আসতে পারে। তাই আগেভাগেই চলে এসেছে ওরা।

লুকোছাপার ধার দিয়েও গেল না সে। সহকারীদের নিয়ে সোজা নেমে এল। সৈকতে। কেউ যদি ওদের ওপর নজর রেখে থাকে, রাখুকগে।

প্রাস্টিকের একটা ব্যাগে ভরে নকল নকশাটা নিয়ে এসেছে কিশোর। নির্জন। সৈকত। কাউকে চোখে পড়ল না। আগের দিনের মতই। যে পাথরের নিচে ওটা রাখতে বলেছে, সেটার নিচেই রেখে দিল সে। তারপর সবাইকে নিয়ে ফিরে চলল গোবেল ভিলায়।

কিন্তু বাগানের ভেতরে ঢুকে গেটটাও বন্ধ করতে পারল না মুসা, জলদি চলো বলে চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। শুরু হলো তার পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশ। দৌড়ে বাগান পেরিয়ে, বাড়ির পাশ দিয়ে ঘুরে চলে এল পেছনের গেটের কাছে। সেটা দিয়ে বেরোলে আরেকটা সরু গলিপথ পড়ে, দুপাশে উঁচু বালির পাড়। পথটা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে একেবারে পাড়ের কিনারে এসে না দাঁড়ালে দেখা যায় না।

বেশ ঘুরে গেছে পথটা। তবু ওটা দিয়ে সৈকতে যাওয়ার রাস্তায় উঠতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগল না।

লুকাব কোথায়? জানতে চাইল রবিন।

বাস স্টপেজের পাশে ছোট একটা ছাউনি আছে, রাস্তা দিয়ে কিছুদূর গেলেই পড়ে। সেটা দেখাল কিশোর। ওটার পেছনে। কাল এখানটাতেই কোথাও মোটর সাইকেল ফেলে গিয়েছিল লোকটা।

রাফিকে শান্ত থাকতে বলল সে। বুঝতে পারল কুকুরটা। নীরবে চলল ওদের সাথে সাথে। এ রকম খেলা তার জন্যে নতুন নয়, আগেও বহুবার খেলেছে। ব্যাপারটা ভালই লাগে তার। শিক্ষিত কুকুর সে। কিশোরের আদেশ একটুও অমান্য করল না।

অনেকক্ষণ কিছুই ঘটল না। বারোটার বাস এল। থামল না। সোজা চলে গেল গোবেল বীচের দিকে। এই ছাউনিটায় এমনিতে থামে না বাস। কেউ যদি নামতে চায়, তাহলে শুধু থামে। আজ এখানকার কোন যাত্রী নেই। ফলে থামল না।

এবার সতর্ক থাকতে হবে, মুসা বলল। বারোটা বাজে। যে কোন সময় এসে হাজির হতে পারে লোকটা।

হ্যাঁ, মাথা দোলাল জিনা।

ওই যে, হাত তুলল মুসা। একটা মোটর সাইকেল আসছে।

কিন্তু থামল না মোটর সাইকেলটা। চলে গেল। কয়েক মিনিট পর গেল একটা কোচ। তারপর একটা লার। এবং তারপর…

চুপ! নোড়ো না! একটানে জিনাকে ছাউনির আড়ালে নিয়ে এল কিশোর। ওই লোকই!

ছাউনির পেছনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে ওরা। পারলে দেয়ালের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে ফেলতে চায়। শোনা যাচ্ছে মোটর সাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ। বাড়ছে… বাড়ছে…থেমে গেল। উঁকি দিতে ভয় পাচ্ছে গোয়েন্দারা। যদি লোকটা দেখে ফেলে? শেষে আর থাকতে পারল না মুসা, মাথা বের করে দিল একপাশ দিয়ে।

হ্যাঁ, মোটর সাইকেল! ফিসফিসিয়ে বলল সে। পথের অন্যপাশে রেখেছে। সৈকতের কিনারে। ওপরে। চলো, দেখি কি করে।

সাবধানে রাস্তা পেরোল ওরা। কোন শব্দ করছে না। রাস্তাটা পেরিয়েই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল কিশোর। হামাগুড়ি দিয়ে এগোল। এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে চলে এল ঢালের কিনারে।

গলা বাড়িয়ে তাকাতেই দেখল, নেমে গেছে লোকটা। পাথরের দিকে এগোচ্ছে।

নকশাটা তুলতে যাচ্ছে, জানাল কিশোর। জলদি করতে হবে। সময় নেই।

সরে চলে এল চারজনেই। দ্রুত হাতে মোটর সাইকেলের নম্বর লিখতে শুরু করল রবিন। মুসা আর রাফি চুপ করে দেখছে। ক্যারিয়ার বক্স খুঁজছে কিশোর আর জিনা। আশা করছে এমন কোন কিছু পেয়ে যাবে, যেটা চোরকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করবে।

ভাগ্য ওদের পক্ষে। একটা চিঠি পেল জিনা। তাতে নাম-ঠিকানা লেখা রয়েছে। কে পাঠিয়েছে সেটা লেখা থাকলে ভাল হত! বিড়বিড় করল কিশোর। ঠিকানাটা পড়ে ফেলেছে। মিস্টার ডন হারভে। মিডলটন। জায়গাটা গোবেল বীচের কাছেই।

যেখানে পেয়েছিল খামটা আবার সেখানে রেখে দিল জিনা। একেবারে সময়মত।

চাপা ঘাউ করে উঠেছে রাফি। লোক আসছে, বুঝিয়ে দিল।

আসছে! রাফির পর পরই বলে উঠল রবিন। সৈকতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ফিরে আসছে লোকটা!

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখান থেকে সরে এল ওরা। এমন কিছু করল না যেটা অস্বাভাবিক লাগে।

গোবেল ভিলায় ফিরে এসে আবার মাথা ঘামাতে বসল।

তেমন কিছুই পেলাম না, জিনা বলল। মাঝে মাঝে হতাশার কথা শোনানো। তার স্বভাব। তবে ঠিকই করে। সব সময় আশার কথা শোনালে অনেক সময়। খারাপ হয়।

কে বলল! কথাটা পছন্দ হলো না কিশোরের। অনেক পেয়েছি। এত যে পাব। সেটাই আশা করিনি। মোটর সাইকেলের নম্বর বড়জোর ওটার মালিকের সন্ধান দিত আমাদের। কিন্তু এখন ওই খামের ঠিকানা তার নাম-ধামও জানিয়ে দিল।

খুশি হতে পারল না জিনা। মাথা নাড়ল। কি করে জানছি ওটা ওরই নাম? সে ডন হারভে না-ও হতে পারে। হয়তো চুরি করেছে মোটর সাইকেলটা। কিংবা, চেয়ে এনেছে। চিঠিটা হয়তো মোটর সাইকেলের আসল মালিকের।

অযৌক্তিক কথা বলেনি জিনা। তবু মানতে পারল না কিশোর। জিনা, এত হতাশার কথা বলো কেন! তোমার বরং বলা উচিত মোটর সাইকেল আর ওই খামের নাম-ঠিকানা লোকটারই।

বেশ, না হয় বললাম। তাতে কি?

তাতে আলোচনাটা চালিয়ে যেতে পারি আমরা। অনুমান করে। ভুল হতেই পারে। হলে হবে। তখন আবার নতুন উপায় বের করব। আগেই না না করে সব কিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে বসে থাকলে তো আর কাজ হবে না।

কিশোর ঠিকই বলেছে, জিনার দিকে তাকিয়ে বলল মুসা।

হ্যাঁ, আলোচনা চালানোই উচিত, রবিন বলল। দেখাই যাক না কিছু বেরোয় কিনা।

কিন্তু সেটা আর হলো না। খাবারের ডাক পড়ল। ডাকতে এলেন কেরিআন্টি। ডাইনিং রুমে যেতে হলো ওদের।

যাবার আগে কিশোর বলল, আজ বিকেলে মিডলটনে যাব আমরা। গোবেল বীচের কাছে হয়ে থাকলে বেশি সময় লাগবে না যেতে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে। ওতে কিছু হবে না। অল্পস্বল্প বৃষ্টিতে ভিজে অভ্যেস আছে আমাদের, কি বলো?

অল্পস্বল্প কেন, মুষলধারে নামলেও অ্যাডভেঞ্চারের এই পর্যায়ে গোয়েন্দাদেরকে থামাতে পারত না বৃষ্টি। সেটা বুঝেই যেন বিকেলের শুরুতেই থেমে গেল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ততক্ষণে মিডলটনের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। রাফি খুশি হলো বৃষ্টি থেমে যাওয়ায়। শরীর ভেজাতে ভাল লাগে না তার, বিশেষ করে এই আবহাওয়ায়। সাঁতার কাটাটা অবশ্য আরেক রকম মজা, তাতে কিছু মনে করে না সে।

মিডলটনের বাইরে সাইকেল রেখে হেঁটে গাঁয়ের ভেতর ঢুকল ওরা। ঢোকার মুখেই বিশাল এক অ্যালসেশিয়ানের সঙ্গে দেখা, এদিকেই আসছে। কাছে এসে বেশ গুরুগম্ভীর চালে রাফির শরীর কল কুকুরটা। মুরুব্বিয়ানা দেখিয়ে বলল, গারররর!

রাফি বুঝতে পারল তার ভাষা। কুকুরটা বলেছে, এই আজব কুত্তাটা আমাদের গায়ে কি করছে? সে একই সুরে জবাব দিল, ঘাউ! ঘাউ! ঘাউ! অর্থাৎ, আমাকে পছন্দ না করতে পারলে শুনে রাখো, তোমাকেও আমি পারছি না!

গারর! খেঁকিয়ে উঠল অ্যালসেশিয়ান। শয়তান কোথাকার!

রাফিও কম যায় না। রেগে গিয়ে কুকুরের ভাষায় গালাগাল শুরু করে দিল। হাবভাবে মনে হলো চ্যালেঞ্জ করে বসেছে বড় অ্যালসেশিয়ানটাকে।

গাররর! ধাড়িটাও কি আর কম যায়।

কেউ বাধা দেয়ার আগেই বেধে গেল ঝগড়া। ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা আরেকটার ওপর। রাস্তার কাদার ওপরই গড়াগড়ি শুরু করল দুটো কুকুর। কামড়াকামড়ি, চেঁচামেচি, খামচা-খামচি এবং এই জাতীয় যত রকম ব্যাপার আছে। কোনটাই বাদ রাখছে না।

শোরগোল শুনে বেশ কিছু গ্রামবাসী বেরিয়ে এল ঘরের দরজায়। জিনা লজ্জায় পড়ে গেছে। রাফিকে এখানে আনতে চাপাচাপি করায়। যতটা ভদ্রভাবে আর নীরবে সম্ভব গ্রামে ঢুকে খোঁজখবর করে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তা আর হলো না।

রাফিকে সরে আসার জন্যে চেঁচিয়ে গলা ফাটাচ্ছে কিশোর। কে শোনে কার। কথা। লড়াইয়ে মশগুল এখন দুই কুত্তা। কে কাকে পরাজিত করবে, সেই চেষ্টা। এখন কি আর শোনার সময় আছে নাকি। লোকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। হাসাহাসি করছে। কথা বলছে জোরে জোরে। এ রকম একটা লড়াই দেখতে পেয়ে যেন খুশিই হয়েছে। বাজি ধরতে আরম্ভ করে দিয়েছে।

পঞ্চাশ পেন্স, বলল একজন। বড় কুত্তাটার ওপর। ওটা ভারী বেশি। জোরও বেশি।

ছোটটাও কম না, আরেকজন বলল। বয়েস আরেকটু বাড়লে বাঘের বাচ্চা হবে!

এখন তো ছোট। পারবে না, বলল তৃতীয় আরেকজন। আর ওটা টাইগার। ডেভির কুকুর। ছোটটাকে খুনই করে ফেলবে।

না না! চিৎকার করে উঠল জিনা। লোকগুলোর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছে।

আমি ছোটটার ওপর পঞ্চাশ পেন্স! বলল অন্য আরেকজন লোক। করছে কি। দেখো! এত মার খেয়েও গলার কামড় ছাড়ছে না! এ রকম কিছুক্ষণ থাকতে পারলেই টাইগারের বারোটা বাজবে!

ওই যে, ডেভি আসছে, একটা ছেলে বলল।

লম্বা, শক্তিশালী একজন মানুষ এগিয়ে এল। করছেটা কি দেখো! চিৎকার করে বলল সে। এ রকম কাণ্ড তো করেনি কখনও! এই টাইগার! টাইগার! ছাড়, ছাড় বলছি! সামান্যতম দ্বিধা করল না লোকটা। উন্মত্ত, লড়াইয়ের একেবারে মধ্যিখানে গিয়ে দাঁড়াল। দুহাতে দুটো কুকুরের ঘাড় চেপে ধরে জোর করে টেনে ছাড়াল।

ঝাঁকি দিয়ে তার হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করছে কুকুর দুটো। আবার গিয়ে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে। ছাড়ল না লোকটা। রেগে উঠে বলল, রক্ত বেশি গরম হয়েছে? পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলব। সর, যা!

তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল জিনা। রাফির কলার ধরে টেনে সরিয়ে নিল। বড় কুকুরটাকে নিয়ে চলে যেতে লাগল ডেভি। টাইগারের যাবার ইচ্ছে নেই। বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে, আর রাফিকে ধমক মারছে।

রাফির কতটা ক্ষতি হয়েছে দেখতে বসল জিনা। যতটা ভয় পেয়েছিল ততটা জখম হয়নি। একটা কান থেকে রক্ত পড়ছে। গলার কাছে কিছু আঁচড়, বোম উঠে গেছে। আরও কয়েক জায়গায় নখের আর দাঁতের দাগ রয়েছে। কোন কোনটা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।

ভেবো না, মুসা বলল জিনাকে। ঠিক হয়ে যাবে। কিছু হয়নি।

কানটা তো ছিঁড়েছে! দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে জিনা। মুসার মত কিছু হয়নি বলে উড়িয়ে দিতে পারছে না।

ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে, কিশোরও চিন্তিত। অষুধ-টষুধ লাগানো দরকার। এ গায়ে ওষুধের দোকান আছে? জিনার দিকে তাকাল সে।

কুকুরের লড়াই দেখার জন্যে দুটো ছেলে বেরিয়ে এসেছিল। তারা এগিয়ে এল। গোয়েন্দাদের দিকে। আন্তরিক হাসি হেসে দুজনের মাঝে বড়টা জিজ্ঞেস করল, কিছু দরকার? দারুণ একটা কুত্তা তোমাদের! এত বড় অ্যালসেশিয়ানটাকে যে মার মারল! বয়েসকালে সত্যিই বাঘের বাচ্চা হবে! অ, আমার নাম রবি। এ আমার ভাই টেড। কাছেই আমাদের বাড়ি। রাফির ছেঁড়া কানের দিকে তাকিয়ে বলল, এক কাজ করো না। চলে এসো আমাদের বাড়িতে। স্পিরিট-টিরিট দিয়ে মুছে ওষুধ লাগিয়ে দেব।

কথাটা মন্দ না। ভেবে দেখল কিশোর। রাজি হয়ে গেল সে।

রবি আর টেডের বাবা-মা বাড়িতে নেই। তবে যা দরকার সেগুলো পেতে বাবা-মাকে দরকার হলো না। বাথরূমের ওষুধ রাখার বাক্সেই পাওয়া গেল সব। লড়াইয়ের সময় যে রাফি এতটা সাহসের পরিচয় দিয়েছে, ওষুধ লাগানোর সময় সে-ই একেবারে ভীতুর ডিম হয়ে গেল। কিছুতেই জখমে স্পিরিট লাগাতে দেয় না।

অনেক কায়দা-কসরৎ করে তারপর লাগাতে হলো। সময় লেগে গেল বেশি।

আসল কাজের সুযোগ মিলল এতক্ষণে, যা করতে এসেছিল ওরা। তদন্তটা ওবাড়ি থেকেই শুরু করল। নব পরিচিত বন্ধুদের জিজ্ঞেস করল মোটর সাইকেলওয়ালা লোকটার কথা। প্রশ্ন করল বেশ চালাকির সঙ্গে, যাতে ছেলে দুটো কিছু সন্দেহ করতে না পারে।

গ্রামটা কিন্তু খুব সুন্দর, মুসা বলল। লোকজনও ভালই মনে হচ্ছে।

ঠিক, তার সঙ্গে সুর মেলাল কিশোর। মনটন বেশ ভাল। ডেভি রাগ করল না। নিজের কুকুরটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল।

এখানকার একটা লোককে অবশ্য পছন্দ হয়নি আমার, জিনা বলল। ছেলে দুটোর দিকে তাকাল। চেনো নাকি তাকে? মোটর সাইকেল আছে। আরেকটু হলেই চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছিল আমাকে। অল্প বয়েসী। এই তেইশ-চব্বিশ হবে। ওর মুখ দেখতে পাইনি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা প্যাকেট পড়ে গেল। নাম-ঠিকানা লেখা। ভাবছি ওটা ফিরিয়ে দেব। নামটা হলো কি যেন…ও, ইয়ে, ডন হারভে।

ডন হারভে! চেঁচিয়ে উঠল টেড। ঠিকই আছে। তাকে তোমাদের ভাল লাগেনি, লাগার কথাও নয়। তোমাদের আর দোষ দেব কি, আমরাও দেখতে পারি না! ভীষণ পাজি লোক!

<

Super User