মেহমান এল সে-রাতে। অভিযাত্রীরা আশা করেছিল জিভারোরা আসবে, কিন্তু এল। অন্য অতিথি। নরমুণ্ড শিকারীদের চেয়ে এরা কম ভয়ঙ্কর নয়।

শুরুতেই এল সৈনিক পিঁপড়ের খুদে একটা দল। মার্চ করে এগোতে গিয়ে থমকে গেল, মুখ ঘুরিয়ে রওনা হলো মুসার দিকে। কোন কোনও মানুষের দেহে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে, কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে তার গন্ধ। মুসার গায়েও এই জিনিস বেশি।

মাটিতে আর শোয়া গেল না, বাধ্য হয়েই চরার কাছ থেকে ভেতরের দিকে সরে যেতে হলো সবাইকে। গাছে হ্যামক টাঙিয়ে শোয়ার জন্যে।

হ্যামকে শোয়ার পর বড় জোর ঘণ্টাখানেক ঘুম, তারপরই আবার জেগে যেতে হলো। ডান পায়ের আঙুলের মাথায় খুব হালকা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল। মুসা। তাতেই ঘুমটা ভাঙল তার। ছুঁয়ে দেখল আঠা আঠা লাগে।

টর্চ জ্বেলে দেখল, তুরপুন দিয়ে যেন নিখুঁতভাবে করা হয়েছে ছোট্ট একটা ছিদ্র। সেখানে থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।

খাইছে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা, জ্যান্তই খেয়ে ফেলবে নাকি!

দুঃস্বপ্নে মানুষখেকো জংলীরা তাড়া করছিল কিশোরকে, হঠাৎ মিলিয়ে গেল। সব। জেগে উঠে দেখল, ঘামে জবজবে শরীর। তাতে কোন দুঃখ নেই তার, জংলীদের কবল থেকে যে বেঁচেছে এতেই খুশি।

মুসার ক্ষতটা দেখে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল রবিন, হু, কাঁটা ফুটেছিল।

গম্ভীর হয়ে গেছে কিশোর, কাঁটা কই এখানে?

হ্যামক থেকে দুর্বল কণ্ঠে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার আমীন, এই, শুনতে পাচ্ছ তোমরা?

অসংখ্য, অগুনতি ডানার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে।

অন্ধকার সুড়ঙ্গের বাদুড়গুলোর কথা মনে পড়ে গেল কিশোরের। মুসার ক্ষতটার দিকে তাকিয়ে থেকে শঙ্কিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে আপনমনেই বলল, বাদুড়, না তো!

তাতে কি? রুমাল দিয়ে রক্ত মুছছে মুসা। বাদুড়ে কামড়ালে আর কি হয়?

তাতে? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। সাধারণ বাদুড় যদি না হয়? যদি ভ্যাম্পায়ার হয়?

এইবার ভয় পেল মুসা। শিউরে উঠল ভূতের ভয়ে। সাংঘাতিক রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার পিশাচ ড্রাকুলার গল্প সে পড়েছে। রুমালটা পুটুলি বানিয়ে শক্ত করে। ঠেসে ধরল ক্ষতস্থানে। ককিয়ে উঠল, রক্ত বন্ধ হচ্ছে নাতো!

রবিন, আয়োডিনের বোতল বের করতে পারবে? মুসার হাত থেকে রুমাল নিতে নিতে অনুরোধ করল কিশোর।

রুমাল দিয়ে ক্ষতের নিচে আঙুলটা শক্ত করে পেচিয়ে বাধল সে। ঘষে ঘষে আয়োডিন লাগাল।

আবার শুয়ে পড়ল সবাই।

দশ মিনিটও গেল না, চেঁচিয়ে উঠল মুসা। আল্লাহরে, আজ শেষ করে ফেলবে আমাকে।

কম্বল মুড়ি দিয়েই শুয়েছিল মুসা। ঘুমের মধ্যে সরে গেছে কম্বল। নিতম্বের কাছে খানিকটা জায়গার প্যান্ট ছেঁড়া। তুরপুন ফুটিয়ে দেয়া হয়েছে সেখানেই।

রক্ত বন্ধ করে আবার আয়োডিন লাগিয়ে দিল সেখানে কিশোর।

 ডবল ভাঁজ করে কম্বল মুড়ি দিল এবার মুসা।

তার সঙ্গে আর সুবিধে করতে না পেরে অন্যদের দিকে নজর দিল তুরপুনধারীরা।

থাবা দিয়ে ধরার চেষ্টা করলেন মিস্টার আমান। একটাকেও ধরতে পারলেন না। সব পালাল।

ছোট একটা হাতে বোনা জাল বের করল কিশোর। জাল দিয়ে ধরব।

টোপ হচ্ছে কে? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা।

তুমি, কিশোর হাসল।

আমি বাপু এসবে নেই। পারলে তুমি হওগে, তাড়াতাড়ি আবার কম্বলে মুখ ঢাকল সে।

নিজেই টোপ হলো কিশোর। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল রক্তচোষা বাদুড়ের কথা।

নানারকম কথা প্রচলিত আছে রহস্যময় এই প্রাণীটাকে নিয়ে। শোনা যায়, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ভ্যাম্পায়ার। পাখার বাতাসে জাদু করে ঘুম পাড়ায়। শিকারকে। তারপর রক্ত চুষে খেয়ে পালায়।

গল্পটা সত্য কিনা; যাচাই করে দেখার ইচ্ছে কিশোরের। প্রমাণ ছাড়া, যুক্তি ছাড়া কোন কথা মানতে রাজি নয় সে। হাত লম্বা করে ফেলে চুপচাপ পড়ে রয়েছে।

অনেকক্ষণ কিছুই ঘটল না।

তারপর ডানা ঝাপটানোর খুব মৃদু শব্দ কানে এল। কাছে আসছে। হালকা কিছু বুকে এসে নামল বলে মনে হলো কিশোরের। জেগে থেকেই অনুভব করতে পারছে না ঠিকমত, ঘুমের মধ্যে হলে টেরই পেত না।

আর কোন রকম নড়াচড়া নেই।

এসেই যদি থাকে, কিছু করছে না কেন ওটা? নাকি সব তার কল্পনা? কিছুই নামেনি?

কব্জির সামান্য নিচে মৃদু বাতাস লাগল জোরে নিঃশ্বাস ফেলল যেন ওখানে কেউ। ডানার বাতাস? নিশ্চিত হতে পারছে না কিশোর। মুখ ফিরিয়ে দেখতেও পারছে না, নড়লেই যদি উড়ে যায়।

কনুইয়ের দিকে সরে আসছে বাতাসটা। ফুঁ দেয়া হচ্ছে যেন ওখানটায়। বাতাসও হতে পারে।

আরও কিছুক্ষণ কাটল। কনুইয়ের উল্টোদিকে সামান্য একটু জায়গায় ঝিমঝিম শুরু হয়েছে, অসাড় হয়ে আসছে। মনে মনে চমকে গেল কিশোর। ভ্যাম্পায়ার। সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। তবে যেটুকু জেনেছেন, তাজ্জব। করে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। কেউ কেউ বলেন, শিকারের গায়ে এত সাবধানে ছিদ্র করে এই বাদুড়, যে শিকার সেটা টেরই পায় না। আসল ব্যাপারটা তা নয়। যেখানে ছিদ্র করে, তার চারপাশে আগেই লালা লাগিয়ে দেয় ওরা, ফলে সাময়িক ভাবে অবশ হয়ে যায় জায়গাটা। ছিদ্র করার ব্যথা টের পায় না তখন শিকার।

কিশোর কল্পনা করল, ছিদ্র হয়ে গেছে। রক্ত চোয়াতে শুরু করেছে। কিন্তু তবু নড়ল না।

একটু পরেই বুঝতে পারল, কল্পনা নয়, সত্যি। যেটুকু জায়গা অবশ হয়েছে, রক্ত গড়িয়ে তার বাইরে চলে আসতেই টের পাওয়া গেল। তার মানে রক্ত খাওয়া শুরু করেছে বাদুড়টা।

প্রথমবারেই অনেক জ্ঞান হয়েছে, অনেক কিছু জেনেছে। আর বেশি জানার চেষ্টা করল না। রক্ত খেয়ে পেট ভরে গেলে উড়ে যাবে বাদুড়, তার আগেই ধরতে হবে।

মনের আর বাঁ হাতের সমস্ত জোর এক করে জালটা ঘুরিয়ে এনে ফেলল সে। ডান হাতের ওপর। এমন ভাবে চেপে ধরল, যাতে কোন ফাঁক না থাকে, বেরিয়ে যেতে না পারে শিকার। খুব সাবধানে আস্তে করে ডান হাতটা সরিয়ে আনল জালের তলা দিয়ে। তারপর জালের মুখের দড়ি টেনে ফাঁস আটকে বন্ধ করে দিল থলের মুখ বন্ধ করার মত করে।

 টর্চ জ্বালল।

না, কল্পনা নয়, ঠিকই। হাতের ইঞ্চি দুয়েক জায়গা জুড়ে রক্ত। থাকুক, কিছু হবে না। পরে মুছে নিলেই চলবে। জালের ভেতরে কি আছে দেখল।

ছটফট করছে কুৎসিত চেহারার একটা প্রাণী।

ধরেছি! ধরেছি! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।

লাফ দিয়ে হ্যামক থেকে নেমে এল রবিন আর মুসা।

আরে, এ যে দেখছি একেবারে সেই লোকটার চেহারা। ওই ব্যাটাই ভূত হয়ে এল না তো! বলে উঠল মুসা।

কার কথা বলছ? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

রাতে কুইটোতে যে লোকটা আমাদের পিছু নিয়েছিল।

 ভুল বলেনি মুসা, লোকটার সঙ্গে এই জীবটার চেহারার অনেক মিল।

ভ্যাম্পায়ারকে নিয়ে অনেক রোমাঞ্চকর গল্প, পিশাচকাহিনী লেখা হয়েছে। খুব জনপ্রিয় হয়েছে সেগুলো। বাদুডটাকে দেখে সে-সব মনে পড়ছে কিশোরের। সবচেয়ে সাড়া জাগানো ভ্যাম্পায়ারের গল্প ড্রাকুলা। জীবটার চেহারা দেখে মনে হয় না, গল্পগুলোতে বাড়িয়ে বলা হয়েছে কিছু। অন্ধকারের জীব, যেন অন্ধকারে মিশিয়ে রাখার জন্যেই কালো রোমশ চামড়া দিয়েছে ওকে প্রকৃতি। লাল লাল চোখ, ছবিতে দেখা শয়তানের চোখের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভোতা নাক, খাড়া চোখা কান, চূড়ার কাছে কয়েকটা লম্বা রোম। নিচের চোয়াল ঠেলে বেরিয়ে আছে। সামনের দিকে, কুৎসিত, ভীষণ কুৎসিত।

এই, আনো তো দেখি, ডাকলেন মিস্টার আমান। দেখেটেখে বললেন, হু, শয়তান আর বুলডগের মাঝামাঝি চেহারা।

হঠাৎ বিকট ভঙ্গিতে হাঁ করে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল জীবটা। বেরিয়ে পড়ল। লম্বা চোখা জিভ, টকটকে লাল, তাতে রক্ত লেগে রয়েছে। দাঁত মাত্র কয়েকটা, ছোট ছোট কিন্তু ধারাল। ওপরের পাটিতে দুই দিকে দুটো শ্বদন্ত-সরু, চোখা, একেবারে যেন ড্রাকুলা ছবিতে দেখা ড্রাকুলার দাঁত, যেগুলো দিয়ে মানুষের গলা ফুটো করে রক্ত খায় ভূতটা।

 বাদুড়টার মুখে রক্তের পাশাপাশি চটচটে পিচ্ছিল এক ধরনের পদার্থ লেগে রয়েছে। নিশ্চয় তার দেহ-কারখানায় তৈরি কোন সাংঘাতিক ক্রিয়াশীল অবশকারী পদার্থ মিশে আছে ওই লালায়। যা লাগলে দেহ তো অবশ হয়ই, রক্তও বেরিয়ে জমাট বাঁধতে পারে না।

 হাতের দিকে তাকাল আবার কিশোর। জমাট বাঁধছে না রক্ত। টুইয়ে চুঁইয়ে ফোঁটা ফোঁটা এখনও বেরোচ্ছে।

খুব খারাপ এটা, বিশেষ করে ছোট ছোট প্রাণীর জন্যে। ভ্যাম্পায়ারের কামড়ে। মরে না প্রাণীগুলো। বাদুড় রক্তও খায় খুব সামান্য, ওটুকু রক্ত শরীর থেকে গেলে। কিছুই হওয়ার কথা নয়। মরে অন্য কারণে। রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না, ক্ষত দিয়ে অনবরত বেরোতে থাকে বলে। রক্তক্ষরণে মারা যায় তার শিকার।

জোরে ডানা ঝাপটে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল বাদুড়টা। কিন্তু শক্ত জাল। একটা সুতোও ছিঁড়তে পারল না, পারবেও না।

ফলখেকো বিশাল বাদুড়ের তুলনায় এটা অনেক ছোট। ওগুলোর ডানা ছড়ালে হয় তিন ফুট, এটা বারো ইঞ্চি হবে কিনা সন্দেহ। আর শরীরটা এত্তটুকুন, এই ইঞ্চি চারেক। শয়তানীর বেলায়ও এর সঙ্গে ফলখেকো বাদুড়ের কোন তুলনা হয় না।

নিয়ে যেতে পারলে পুরো পাঁচ হাজার ডলার, হাতের পাঁচ আঙুল দেখাল। কিশোর। যে কোন চিড়িয়াখানাই দেবে। কিন্তু বাঁচিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই হবে মুশকিল।

হ্যাঁ, মুশকিলটা হবে খাওয়া নিয়ে, বলল রবিন। খাওয়াবে কি?

 হেসে মুসার দিকে তাকাল কিশোর।

দুই হাত নাড়তে নাড়তে পিছিয়ে গেল মুসা, খবরদার, আমার দিকে চেয়ে! আমি রক্ত দিতে পারব না।

হেসে ফেলল সবাই।

সে পরে দেখা যাবে। জালটা মুসার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল কিশোর, ধরো এটা। রক্ত বন্ধ করি আগে। থামে তো না আর। রবিন, আয়োডিন…

বোতল আনার জন্যে রওনা হয়ে গেল রবিন।

ভ্যাম্পায়ার তো ধরা পড়ল, সমস্যা হলো খাওয়াবে কি সেটা নিয়ে।

 মিস্টার আমান পরামর্শ দিলেন, উষ্ণ রক্তের কোন প্রাণী শিকার করে আনার জন্যে।

সকালে নাস্তা সেরে শিকারে চলল তাই কিশোর আর মুসা। মিস্টার আমান। দূর্বল, হ্যামকে শুয়ে রইলেন। ক্যাম্প পাহারায় রইল রবিন।

কিশোর শটগান নিয়েছে।

মুসা নিয়েছে তার বাবার পয়েন্ট টু-টু মসবার্গ রাইফেল। টেলিস্কোপ। লাগানো। পনেরো গুলির ম্যাগাজিন। হাইস্পিড লং-রেঞ্জ রাইফেল বুলেট ভরা আছে তাতে। হালকা, কিন্তু বেশ শক্তিশালী অস্ত্র। এটা দিয়ে কলোরাডোতে পুমার মত জানোয়ার মেরেছেন মিস্টার আমান।

পুমা যখন মরেছে, মুসার আশা টিগ্রেও মরবে।

আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর পছন্দসই একটা জানোয়ারের দেখা পাওয়া গেল। কিশোর জানাল, ওটা ইঁদুর-গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় প্রাণী ক্যাপিবারা। বড়গুলো। আকারে ভেড়ার সমান হয়। তবে এটা অনেক ছোট, বোধহয় বাচ্চা।

একটা ঝোপে লুকিয়ে নিশানা করল মুসা। টিপে দিল ট্রিগার।

বাজ পড়ল যেন। রাইফেলের আওয়াজ সামান্যই, এত জোরে হয় না। তাহলে কে করল ওই শব্দ? মুসার ধারণা হলো ক্যাপিবারাটাই গর্জন করেছে। লুটিয়ে পড়ল ওটা।

দু-জনকেই চমকে দিয়ে ঝড় উঠল যেন ক্যাপিবারার পেছনের একটা ঝোপে। লাফিয়ে বেরিয়ে এল একটা হলদে জানোয়ার, গায়ে কালো কালো গোল ছাপ। টিগ্নে! ওটাই গর্জন করেছে। ঝোঁপের আড়ালে থেকে নিশানা করছিল। ক্যাপিবারাটাকে। গোলমাল হয়ে গেছে দেখে গর্জন করে বেরিয়ে এক লাফে গিয়ে ঢুকল আরেকটা ঝোপে।

আরিব্বাবা, কতবড় দানব! ক্ষিপ্রতা কি! শক্তিও নিশ্চয় তেমনি। পয়েন্ট টু-টু দিয়ে টিগ্রে মারার চিন্তা বাদ দিল মুসা। ক্যাপিবারাটাকে মারার আগে যে জাগুয়ারটাকে দেখেনি, গুলি করে বিপদে পড়েনি সে জন্যে বার বার ধন্যবাদ দিল। ভাগ্যকে। এই খেলনা দিয়ে ওই দানব ঠেকাতে পারত না।

টিগ্রে চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ নড়ল না দুজনে। তারপর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে সাবধানে বেরোল। পা টিপে টিপে চলল শিকারের দিকে।

ঘাসের ওপর পড়ে রয়েছে ক্যাপিবারা। অনড়।

এদিক ওদিক চেয়ে জানোয়ারটাকে তুলল মুসা। শটগানে এল জি ভরে পাহারা দিচ্ছে কিশোর।

ক্যাপিবারা নিয়ে দু-জনে দিল ছুট। এক দৌড়ে চলে এল ক্যাম্পে।

তারের জাল, খুব সরু লোহার শিক, আর খাঁচা বানানোর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা হয়েছে। ইতিমধ্যে একটা খচা প্রায় বানিয়ে ফেলেছে রবিন।

মুসা আর কিশোরও হাত লাগাল।

খাঁচা তৈরি করে তার ভেতরে ভ্যাম্পায়ারকে রাখা হলো।

এর একটা নাম রাখা দরকার, প্রস্তাব দিল রবিন।

ইবলিস, বলে উঠল মুসা।

শুনতে ভাল্লাগে না, কিশোর বলল।

তাহলে কি? ভুরু নাচাল রবিন।

রক্তচোষা?

হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভাল। ইংরেজি ব্লড সাকারের চেয়ে ভাল।

ক্যাপিবারাটাকে ভরে দেয়া হলো রক্তচোষার খাঁচায়। ঘিরে এল তিন। গোয়েন্দা। কৌতূহলী চোখে দেখছে।

নড়লও, না রক্তচোষা। খাঁচার কোণে উল্টো হয়ে চুপচাপ ঝুলে রইল।

নিচের ঠোঁটে বার দুই চিমটি কাটল কিশোর। বড় বেশি আলো খাঁচার ভেতর। একটা কম্বল দিয়ে ওপরটা ঢেকে দিল সে। ছায়া তৈরি করল ভেতরে।

আগের মতই ঝুলে রইল রক্তচোষা। তারপর নড়তে শুরু করল। খাঁচার জালে নখ আটকে ঝুলে ঝুলে এগোল। খুব সতর্ক। ক্যাপিবারাটার ওপরে এসে ঝুলে রইল এক মুহূর্ত। তারপর আলগোছে ছেড়ে দিল নখ। হালকা পালকের মত পড়ল ওটার ওপর। গুলির ক্ষতের কাছে রক্ত জমে আছে। আস্তে করে ওটার কাছে গিয়ে অনেকটা মাকড়সার মত জাপটে ধরল চামড়া, চেটে চেটে খেতে শুরু করল রক্ত।

হাসি ফুটল কিশোরের মুখে। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি। বেশির ভাগ লোকের ধারণা, ভ্যাম্পায়ার চুষে রক্ত খায়। কেউ কেউ অন্য কথা বলে, চেটে খায়। তাই তো করছে দেখা যাচ্ছে। কুৎসিত মুখ থেকে ফুলিঙ্গের মত ছিটকে বেরোচ্ছে যেন। নীলচে-লাল জীবটা। ঢুকছে-বেরোচ্ছে, ঢুকছে-বেরোচ্ছে, সেকেণ্ডে চারবারের কম না, অনুমান করল কিশোর। বেড়াল আর কুকুর যেমন করে তরল খাবার খায়। তেমনি করে খাচ্ছে ওটা, তবে অনেক দ্রুত।

ওর নাম রক্তচাটা হওয়া উচিত, বলল সে।

অন্য দুজনের আপত্তি নেই।

মালপত্র গুছিয়ে আবার ক্যানূ ভাসাল ওরা।

সেদিন আরেকটা জীব ধরা পড়ল।

 দুপুরে খাওয়ার জন্যে নৌকা থামিয়ে নেমেছিল ওরা।

মুসা দেখল জীবটাকে। মাথার ওপর গাছে বসে চেয়ে রয়েছে ওদের দিকে খুদে, লেজ বাদ দিলে ইঞ্চি তিনেক হবে। কয়েক আউন্স ওজন। নরম, সোনালি রোমে ঢাকা শরীর, চোখের চারপাশ আর মুখটা বাদে। সেখানটা সাদা, যেন চুরি করে র্টিন থেকে ময়দা, খেতে গিয়ে ময়দা লাগিয়েছে।

ইশারায় কিশোর আর রবিনকে দেখাল সে। বাবাকেও দেখাল।

পিগমি মারমোসেট, ফিসফিসিয়ে বললেন মিস্টার আমান। ধরতে পারো। কিনা দেখো। ভাল টাকা পাওয়া যাবে।

বসেই আছে জীবটা। বাতাসে ডাল দুলছে, আঁকড়ে ধরে ওটাও দুলছে ধীরে ধীরে।

ব্যাগ খুলে ডার্টগান বের করল কিশোর। ডার্ট ভরল।

আগের জায়গাতেই রয়েছে মারমোসেট। অন্যান্য বানরের মতই কৌতূহলী, মানুষের কাজকর্ম দেখছে। তবে আর সব জাতভাইয়ের মত বানর নয়, দুষ্টুমি নেই, লাফালাফি নেই, শান্ত-সুবোধ-লক্ষ্মী ছেলে।

নাও, মারো, ডার্টগানটা মুসার দিকে বাড়িয়ে দিল কিশোর। গোয়েন্দা সহকারীর নিশানার ওপর এখন অগাধ আস্থা তার।

তুমিই মারো, মুসা বলল।

অনেকক্ষণ লাগিয়ে ভালমত সই করল কিশোর। ট্রিগার টিপল। ভেবেছিল লাগবে না। কিন্তু লাগল।

পাখির মত কিচির মিচির করে উঠল বানরটা। সুচের মত জিনিসটা ধরে টানাটানি শুরু করল। মুখে বিরক্তি। যেন বলছে, আহ, কি জ্বালাতন! মানুষের। জালায় একটু শান্তিতে বসার জো নেই।

ক্রিয়া শুরু করেছে ঘুমের ওষুধ। টলে উঠল বানরটা। মাথা উল্টে দিল, ডাল থেকে ছুটে গেল আঙুল, খসে পড়তে শুরু করল। পেছনে সোজা হয়ে রইল লেজটা।

এতই হালকা, প্রায় নিঃশব্দে ঘাসের ওপর পড়ল জীবটা। দৌড়ে গিয়ে তুলে নিল মুসা।

ঘুম ভাঙতে বেশি সময় নিল না। চোখ মেলল মারমোসেট। চোখের ঘোলাটে তারা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হলো। লেজের সোনালি রোম ফুলে উঠল কাঠবেড়ালীর লেজের মত। কিচমিচ শুরু করল। বিচিত্র ভঙ্গিতে মুখের ভেতর থেকে বেরোচ্ছে। অদ্ভুত সাদা জিভ। গাল দিচ্ছে যেন মানুষের বাচ্চা মানুষ, জীবনে আর বানর হবি না তোরা। একেবারে বখে গেছিস।

হেসে আদর করে ওটার মাথায় হাত বোলাল কিশোর, কেমন লাগছে, ময়দাখেকো?

ব্যস, নাম একটা হয়ে গেল মারসোসেটেরও।

ওই খেকো-টেকো বাদ দাও, প্রতিবাদ করল মুসা। খালি ময়দা।

 মুচকি হাসল কিশোর। ঠিক আছে, তাই সই।

রবিন কিছু বলল না। জানে, বলে লাভ নেই। একবার মুসা বলে যখন ফেলেছে, আর পাল্টাবে না। নাম রাখার ব্যাপারে মুসার কিছু জেদ আছে। ভুল করে পুরুষ ভেবে একবার একটা কবুতরের নাম রেখে ফেলেছিল টম। যখন জানা গেল ওটা মেয়ে, তারপরও ওটার নাম টমই রইল, কিছুতেই পাল্টাতে রাজি হলো না সে।

পৃথিবীর সবচেয়ে খুদে বানর, বিড়বিড় করল রবিন। হ্যাপেইল পিগমেইয়াস।

কি বললে? ভুরু কুঁচকে তাকাল মুসা।

 ওটার ল্যাটিন নাম। বৈজ্ঞানিক…

চুলোয় যাক ল্যাটিন। বাংলা অনেক সোজা, ময়দা। ওই হ্যাপেল-ফ্যাপেল মুখে আসবে না আমার।

আবার ভাসল ক্যানূ।

গুণ আর রূপ দিয়ে দেখতে দেখতে সবাইকে আপন করে নিল ময়দা। পাখির মত কিচমিচ করে বড় বড় লাফ মারে। একবার এর ওপর গিয়ে পড়ে, একবার ওর ওপর। কিন্তু এত হালকা সে, কারও কোন অসুবিধে হয় না।

ওর সবচেয়ে আনন্দ, কিকামুর সঙ্গে খেলা করা। ভিজে যাওয়ার পর নষ্ট হওয়ার ভয়ে বস্তা থেকে খুলে ফেলা হয়েছে ওকে। নৌকায় একটা খুটি বেধে তাতে ওর চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। লম্বা কালো চুলে ঝুলে ঝুলে যেন বাতাস খায় মহাবীর। তার চুল নাড়াচাড়া করতে খুব ভালবাসে বানরটা।

নাকুর সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে ময়দার। রক্তচাটাকে দু-চোখে দেখতে পারে না। খানিক পর পরই লাফ দিয়ে গিয়ে তার খাঁচার ওপর উঠে কয়েকটা করে গাল দিয়ে আসে।

দুধের অভাবে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়েই যেন ঘাস খাওয়া শুরু করেছে নাকু। তার খাবার নিয়ে আর দুশ্চিন্তা নেই কারও।

বিকেলের দিকে রোদ যেন আগুন হয়ে উঠল। আর নৌকায় থাকতে পারল না নাকু। লাফিয়ে পড়ল পানিতে। কেউ কিছু বলল না। নৌকায় বাধা রয়েছে তার। গলার লম্বা দড়ি। ক্যানূর পাশে-পাশে সাঁতরে চলল।

গম্ভীর হয়ে ব্যাপারটা দেখল কিছুক্ষণ ময়দা। তারও গরম লাগছে কিনা যেন বোঝার চেষ্টা করল। তারপর দিল লাফ। পানিতে পড়েই বুঝল, মহাভুল হয়ে গেছে। এই জায়গা তার জন্যে নয়। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে উঠল নাকুর নাকে, তারপর পিঠে, সেখান থেকে লাফ দিয়ে এসে একেবারে মুসার কোলে।

গা ঝাড়া দিয়ে রোম থেকে পানি ঝাড়ল ময়দা। ঠাণ্ডা কমছে না দেখে হামাগুড়ি। দিয়ে ঢুকে গেল মুসার শার্টের ভেতরে। গায়ে গা ঠেকিয়ে রইল, উষ্ণতা খুঁজছে। এই দুটো ছেলে পেলে, নৌকার তলায় শুয়ে থেকে হাসিমুখে বললেন মিস্টার আমান।

দুটো না, তিনটে, শুধরে দিল রবিন। বাদুড়টা বাদ কেন?

 দূর! মুখ বাকাল মুসা, ওই ইবলিসের বাপ হতে যায় কে?

 হেসে ফেলল সবাই।

.

১০.

আমাজন! আমাজন! চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

অনেক বড় একটা মোড় ঘুরেই বিশাল জলরাশিতে ঝাঁপ দিল ক্যানূ। মোহনায় পৌঁছে গেছে। পাক খেয়ে খেয়ে বইছে বাদামী স্রোত। কোথাও ঢেউ উটের পিঠের মত কুঁজো, কোথাও ফুলে ফুলে উঠছে সিংহের কেশরের মত। দেখেই অনুমান করা যায় স্রোতের প্রচণ্ডতা।

ম্যাপে আঁকা রহস্যময় বিন্দু রেখা ধরে পাঁচ দিন চলেছে ওরা। নতুন একটা ম্যাপ যখন তৈরি হবে, ওই বিন্দুগুলো আর থাকবে না, পুরোপুরি রেখা হয়ে যাবে। মাঝখানে কিছু সময় বাদে, ম্যাপ আঁকা চালিয়ে গেছে কিশোর। যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্যে কাগজটা যত্ন করে একটা ওয়াটারপ্রুফ বোতলে ঢুকিয়ে সেটা আবার ঢুকিয়েছে ওষুধের বাক্সে।

আমাজন, পৃথিবীর বৃহত্তম নদী।

মিস্টার আমান উত্তেজিত, ছেলেরা উত্তেজিত। ক্যানূর অন্য আরোহীদের মাঝেও উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে-নদী দেখে নয় হয়তো, নৌকা বড় বেশি দোল খাচ্ছে বলেই।

তাপিরের বাচ্চা গোঁ গোঁ করল, মারমোসেট কিচমিচ করল, এমন কি তন্দ্রালু ভ্যাম্পায়ারও কর্কশ চিৎকার করে উঠল খাঁচার অন্ধকার কোণ থেকে। একমাত্র কিকামু নির্বিকার। আধবোজা চোখ মেলল না। লম্বা চুলে ঝুলে থেকে ঢেউয়ের। তালে তালে খালি মাথা দোলাচ্ছে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে।

সত্যিই এটা আমাজন! বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা।

হ্যাঁ-না দুটোই বলা যায়, মুখ খুলল কিশোর। তবে হ্যাঁ বলাই ঠিক। আমেরিকান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির ম্যাপ খুলে দেখো। দেখবে, এখান থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত পুরোটার নামই আছে। যেমন এই অংশটার নাম ম্যারানন, ম্যারানন নদী এসে মিশেছে বলে। পরের অংশটার নাম সলিমোজ। আসলে, সবটাই আমাজন।

তা, ভেলাটা বানাচ্ছি কখন? জিজ্ঞেস করল রবিন।

সরু প্যাসটাজায় ইনডিয়ান ক্যানূ উপযুক্ত জিনিস, সন্দেহ নেই, কিন্তু এই বিশাল পানিতে ওটা মোটেই নিরাপদ নয়। তাছাড়া ছোট্ট ক্যানূতে জানোয়ার। রাখার অসুবিধে, জায়গাই নেই। দরকার, বড়সড় একটা ভেলা।

ভেলার নামও বাছাই করে ফেলেছে রবিন : নূহ নবীর বজরা। আল্লাহর আদেশে মস্ত এক বজরা বানিয়ে নাকি তাতে সব রকমের প্রাণী তুলেছিলেন তিনি। ভেসে থেকেছিলেন ভয়াবহ বন্যায়।

আলাপ-আলোচনার পর নাম ঠিক হলো শুধু বজরা।

যত তাড়াতাড়ি পারো, বানিয়ে ফেলো, দুর্বল কণ্ঠে বললেন মিস্টার আমান। ক্যানূতে থাকা আর ঠিক না।

মাইলখানেক দূরে নদীর অপর পাড় থেকে বয়ে আসছে বিশুদ্ধ হাওয়া। এক পাড় থেকে আরেক পাড়ের দূরত্ব এত বেশি, স্রোত না থাকলে নদীটাকে হদ বলেই মনে হত। এপাড়ে গাছে গাছে যেন বুনোফুলের মেলা বসেছে। মাটির কাছাকাছি। অগভীর পানিতে ডুবছে-ভাসছে অসংখ্য জলমুরগী। ক্যান্‌ ওগুলোর কাছাকাছি হলেই কক কক করে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁক বেঁধে।

শটগানের দিকে হাত বাড়াল মুসা। কিন্তু বাধা দিলেন মিস্টার আমান। নৌকা। দুলছে। নিশানা ঠিক হবে না।

গাছে ফুল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে পাখি। নানা জাতের, নানা রঙের, নানা রকম আজব তাদের ডাক। জায়গাটা পাখির স্বর্গ। তীরে পানির ধারে এক আজব পাখি দেখা গেল। এক জাতের সারস, নাম তার জ্যাবিরু স্টর্ক। প্রায় মানুষের সমান লম্বা। তীর ধরে হাঁটছে গভীর রাজকীয় চালে।

মোড় নিল ক্যানূ। মস্ত এক বাক পেরিয়ে এল। তেরছা ভাবে ঝাঁপ দিয়ে এসে। পড়ল যেন ঢেউ, আরোহীদের ভিজিয়ে দিল। স্রোতও এলোমেলো। খানিক দূরে। সরু একটা খাল ঢুকে গেছে ডাঙার ভেতরে। শেষ মাথায় ছোট একটা প্রাকৃতিক পুকুর। খালে নৌকা ঢুকিয়ে দিল মুসা। চলে এল পুকুরের নিথর পানিতে।

এক চিলতে বেলাভূমি রয়েছে পুকুরের পাড়ে। ঝকঝকে মসৃণ বালি। ঘ্যাচ করে তাতে নৌকার আধখানা তুলে দিয়ে লাফিয়ে নামল তিন গোয়েন্দা। দানবীয় এক সিবা গাছের শেকড়ে বাধল দড়ি। এত বড় গাছ সচরাচর দেখা যায় না। প্রায়। এক একর জুড়ে রয়েছে। তলায় ছোট ঘাস ছাড়া আর কিছু জন্মানোর সাহস পায়নি। সুন্দর ছায়াঢাকা একটা পার্কের মত।

ক্যাম্প করার জন্যে তো বটেই, ভেলা বানানোর জন্যেও খুব চমৎকার জায়গা। মালমসলারও অভাব নেই। পুকুরের পাড়ে রয়েছে ঘন বাশবন, আছে লিয়ানা লতা।

ভেলা বানাতে দুই দিন লাগল। পাকা লম্বা বাশ কেটে শক্ত লতা দিয়ে বাঁধা। হলো। ওরকম কয়েকটা ভেলা নদীতে ভেসে যেতে দেখেছে গত দু-দিনে। ইনডিয়ানদের জলযান। আমাজনে এই ধরনের ভেলা বেশ চালু জিনিস।

সব ভেলায়ই তো ঘর দেখলাম, মুসা বলল। আমরাও একটা বানিয়ে নিই।

বাঁশ দিয়েই তৈরি হলো ঘরের খুঁটি, চালার কাঠামো। বেড়া হলো নল খাগড়ায়, তালপাতার ছাউনি। বাঁশের ভেলায় ভাসমান এক মজার কুটির।

বেশ বড় করে বানিয়েছে ভেলা। বড় জানোয়ার কিছুই ধরা হয়নি, জায়গার অভাব আর পরিবহনের অসুবিধের জন্যে, এবার ধরবে।

প্রথমেই ধরা পড়ল এক মস্ত ইগুয়ানা, ছয় ফুট লম্বা।

নিচু গাছের ডালে শুয়েছিল ওটা। একটা পাখিকে নিশানা করতে গিয়ে চোখে পড়ল মুসার। মাত্র বারো-তেরো ফুট দূরে।

তাজ্জব হয়ে গেল মুসা। সিনেমায় দেখা এক প্রাগৈতিহাসিক দানবের প্রতিমূর্তি যেন সবুজ শরীর, লেজে বাদামী ডোরা, পেচিয়ে রয়েছে। পিঠে কয়েক সারি। কাটা, এদিক ওদিক মুখ করে আছে। থুতনির নিচেও এক গুচ্ছ কাটা।

ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল মুসা, তারপর ক্যাম্পের দিকে দিল দৌড়।

কি ব্যাপার? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

বললে বিশ্বাস করবে না, ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। ডাইনোসর। গাছের ডালে।

ডাইনোসর? ঠিক দেখেছ?

মাথা ঝাঁকাল মুসা।

 চলো তো, দেখি, রবিন আর কিশোর দু-জনেই আগ্রহী হলো।

 নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা।

আগের জায়গায়ই রয়েছে জীবটা। টেরই পায়নি যেন। বোধহয় গভীর ঘুমে অচেতন।

ইগুয়ানা! কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব খাদে নামিয়ে বলল কিশোর। ধরতে পারলে কাজ হয়।

কিন্তু ধরি কি করে? রবিন বলল।

চলো, বাবাকে জিজ্ঞেস করি, মুসা বলল।

গলায় ফাঁস আটকাতে হবে, শুনে বললেন মিস্টার আমান।

ফাঁস? কাছে যেতে দেবে? গাল চুলকালো মুসা। তা হয়তো দেবে, তবে ফাঁস পরাতে দেবে না সহজে।

তাহলে? কিশোরের প্রশ্ন।

কাছে গিয়ে গান গাইতে হবে। আর পিঠ চুলকাতে হবে, নির্বিকার কণ্ঠে জবাব দিলেন মিস্টার আমান।

মারছে! আড়চোখে বাবার দিকে তাকাল মুসা। বিষের ক্রিয়া নয় তো? গোলমাল দেখা দিয়েছে মাথায়? গানের কি বুঝবে ওটা?

কি বুঝবে জানি না, তবে ইনডিয়ানরা ওভাবেই ধরে, বললেন মিস্টার। আমান।

ঠিক, মনে পড়ল রবিনের। আমিও শুনেছি… মানে, বইতে পড়েছি। সুরের ওপর নাকি বিশেষ মোহ আছে ইগুয়ানার, গায়ে হাত বোলানো পছন্দ করে।

হাত নয়, লাঠি, বললেন মিস্টার আমান। লম্বা দেখে একটা লাঠি নিয়ে যাও। খুব আস্তে আস্তে বাড়ি দেবে…আমারই যেতে ইচ্ছে করছে…

না না, তুমি শুয়ে থাকো, তাড়াতাড়ি বাধা দিল মুসা।

ভাল অভিনেতা কিশোর, কিন্তু গলা সাধায় একেবারে আনাড়ি। তবু তাকেই গান গাইতে হলো। দড়ির ফাঁস নিয়েছে মূসা, রবিনের হাতে লাঠি।

হেঁড়ে গলায় গান ধরল গোয়েন্দাপ্রধান। মানুষ, জানোয়ার কোন কিছুকেই আকৃষ্ট করার কথা নয় সে গান, তবু দেখা যাক ইগুয়ানার বেলায় কি ঘটে।

দূরে দাঁড়িয়ে জীবটার খসখসে চামড়ায় আলতো খোঁচা দিল রবিন। খুব আস্তে বাড়ি মারল কয়েকবার।

ফাঁস হাতে দাঁড়িয়ে আছে মুসা, উত্তেজনায় কাঁপছে।

নড়ল ইগুয়ানা। চোখ মেলল। মুখ ফিরিয়ে তাকাল অভিযাত্রীদের দিকে। প্রতিটি নড়াচড়ায় কুঁড়েমির লক্ষণ। হাঁ করে হাই তুলল। নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, চোয়াল। আঁতকে উঠল মুসা। সারি সারি ধারাল দাঁত।

গান থেমে গেল কিশোরের।

শক্ত কামড় দেয়, হুঁশিয়ার করল রবিন। তবে খারাপ ব্যবহার না করলে কিছু বলবে না। কিশোর, থামলে কেন? গাও। বাড়ি মারা থামাল না সে। মুলা, তাড়াহুড়ো করো না। ঘাবড়ে দিও না ওকে। লেজ খসে গেলে কোন চিড়িয়াখানাই নেবে না।

ভুরু কুঁচকে গেল মুসার। লেজ খসে যাবে?

হ্যাঁ, টিকটিকির মত।…ওভাবে না, ওভাবে ফাঁস পরাতে পারবে না।

একটা লাঠিতে বেঁধে নাও। তারপর আস্তে করে গলিয়ে দাও ওর মুখের ওপর দিয়ে।…ওকি কিশোর, গান থামাও কেন? গাও গাও।

মুখ ব্যথা হয়ে গেল যে।

 চলে যাবে তো। গাও।

লাঠি জোগাড় করে আনল মূসা। গান আর লাঠির বাড়ি সমানে চলছে। লাঠির মাথায় ফাঁসটা ঝুলিয়ে আস্তে সামনে বাড়িয়ে দিল সে। ইগুয়ানা নড়লেই থেমে যাচ্ছে তার হাত, ওটা স্থির হলেই আবার ধীরে ধীরে সামনে বাড়াচ্ছে।

ফাঁস গলার কাছাকাছি নিয়ে সাবধানে টেনে আটকে দিল মুসা। লাঠি ফেলে। চেঁচিয়ে উঠল, দিয়েছি আটকে! আর পালাতে পারবে না।

চুপ! বলল কিশোর। টানাটানি কোরো না! লেজ খসাবে!

দু-জনে মিলে খুব নরম হাতে দড়ি ধরে টান দিল।

গ্যাঁট হয়ে রইল ইগুয়ানা। দড়িতে টান বাড়ছে। মাথা ঘোরাতে শুরু করল, সে। এত কুড়ে, নড়তেই চাইছে না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাছ বেয়ে নেমে এল মাটিতে। পেছনে লেজের খানিক ওপরে বাড়ি মেরেই চলেছে রবিন।

চাপাচাপি করল না ওরা, কিন্তু দড়িতে ঢিলও দিল না। টেনেটুনে ক্যাম্পের কাছে নিয়ে এল ইগুয়ানাটাকে ভেলায় তুলতে হবে।

কাজটা অনেকখানি সহজ করে দিল ইগুয়ানা। মুসা ভেলায় উঠে টানছে। অনেক সহ্য করেছে এতক্ষণ ইগুয়ানা, আর করল না। পায়ে কামড় বসাতে ছুটে গেল। লাফ দিয়ে সরে গেল মূসা। ততক্ষণে শরীরের বেশির ভাগটাই ভেলায় উঠে গেছে জীবটার। বাকিটুকু তুলতে বিশেষ কষ্ট হলো না ছেলেদের।

ভেলা থেকে মাটিতে নেমে বসে পড়ল মুসা। যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে। ধরলাম তো। খাওয়াব কি?

সবই খায় ব্যাটা, কিশোর বলল, নরম পাতা, ফল, পাখি, ছোট জানোয়ার, সব।

তারমানে ইগুয়ানার খাবারের জন্যে ভাবতে হবে না।

সেদিনই আরেকটা প্রাণী ধরা পড়ল। ইগুয়ানার মতই ছয় ফুট লম্বা, তবে লেজ থেকে মুখ নয়, পায়ের আঙুল থেকে চাদি পর্যন্ত। বড়শি দিয়ে অনেকগুলো মাছ ধরে জমিয়েছে মুসা, সেগুলোর গন্ধেই পায়ে পায়ে এসে হাজির হয়েছে। জাবিরু স্টর্ক, মুসার ভাষায় লম্বু বগা, অর্থাৎ বক।

পাখিটাকে এগোতে দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল মুসা। মাছগুলো যেখানে। আছে রেখে উঠে চলে এল।

লম্বা লম্বা পায়ে যেন রনপা-য় ভর করে এগিয়ে এল বিরাট পাখিটা। মাথা কাত করে গম্ভীর চোখে তাকাল মাছের ঝুড়ির দিকে। জ্যাবিরুর চেহারায় একটা ঋষি ঋষি ভাব আছে, প্রায়ই ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকে–যদিও এই ধ্যানের বেশির ভাগটাই মাঝের ভাবনায়-তাই একে দার্শনিক পাখি বলে অনেকে।

 না, কিছু না, মাছ কেমন পড়েছে দেখছি শুধু এরকম চেহারা করে মাছগুলো দেখল পাখিটা। নদী থেকে ধরার চেয়ে এখান থেকে খেয়ে ফেলা যে অনেক সহজ, বুঝতে বিন্দুমাত্র সময় লাগল না।

সত্যিই একটা রাজকীয় পাখি, ভাবল মুসা। দুধের মত সাদা পালকে ঢাকা শরীর। মাথাটা কুচকুচে কালো। লম্বা গলায় লাল রঙের আঙটি। পাখা সামান্য তুলে রেখেছে, লড়াইয়ের আগে কুস্তিগীররা যেমন বাহু তুলে রাখে অনেকটা তেমনি। মুসা আন্দাজ করল, ওটার এক ডানার মাথা থেকে আরেক ডানার মাথা সাত ফুটের কম হবে না। মানসচক্ষে দেখতে পেল, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সারসটা লস অ্যাঞ্জেলেস চিড়িয়াখানায় হেঁটে বেড়াচ্ছে রাজকীয় চালে, আর তাকে দেখার জন্যে ভিড় জমিয়েছে অসংখ্য দর্শক।

হঠাৎ পেছন দিকে বাকা হয়ে গেল রনপা পা। ঝুড়িতে ঠোকর মেরে বসল সারসরাজ। দেখে যতখানি চালাক মনে হয় পাখিটাকে, আসলে তা নয়। বোকাই বলা যায়। নইলে দেখা নেই, শোনা নেই, ফেলে রাখা খাবারে এভাবে ঠোকর মারে কেউ? কত রকম বিপদের ভয় আছে।

দেখতে দেখতে খালি হয়ে গেল মাছের ঝুড়ি। মুসার ইচ্ছে ছিল, ফাঁস ছুঁড়ে ধরবে। কিন্তু সে এগোনোর আগেই মাছ খতম। খাওয়া শেষ, আর এখানে থাকার কোন কারণ নেই। ডানা মেলে উড়ে গেল জীবন্ত এরোপ্লেন।

 আফসোস করল না মুসা। পাখিটার স্বভাব-চরিত্র দেখে তার যা মনে হয়েছে, অত্যন্ত লোভী, আবার আসবে। এত সহজ খাবারের আশা সহজে ছাড়তে পারবে।

আরও কিছু মাছ ধরে ঝুড়ি ভরল মুসা। ফেলে রাখল ওখানেই। ফাঁস টুডে লকে ধরা যাবে না, বুঝে গেছে। জাল পাতল। ঝুড়ির চার পাশে আট ফুট উঁচু চারটে সরু খুঁটি পেতে তার ওপর বিছিয়ে রাখল জাল। একটা দড়ি বাঁধল জালে, এমন ভাবে, যাতে দূর থেকে ওই দড়ি টেনেই জালটা ফেলতে পারে। সিবা গাছটার অনেক শেকড় আর ঝুড়ি আছে। দড়িটা নিয়ে গেল ওগুলোর কাছে। আড়ালে লুকিয়ে বসে রইল।

এই আসে এই আসে করতে করতে দিনই ফুরিয়ে গেল। পাটে বসল টকটকে লাল সূর্য। বগাটার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে মুসা, এই সময় আকাশে দেখা দিল। ছড়ানো ডানা। শা করে উড়ে এসে ঝুড়ির বিশ ফুট দূরে নামল লঘুমান।

আরি! ঝুপড়ি এল কোত্থেকে!ভাবল যেন সারসটা। আগে তো এটা ছিল না। ওখানে? ভাবনা দরকার। আচ্ছা, দেখি ধ্যানে বসে। আশ্চর্য কৌশলে এক পায়ের। ওপর ভারি শরীরের ভর রেখে, লম্বা ঠোঁটের আগা বুকের ফোলানো পালকে গুঁজে ধ্যানমগ্ন হলো সে।

 কিন্তু সামনে লোভনীয় খাবার থাকলে ধ্যান আর কতক্ষণ? যখন দেখল, ঝুডিও নড়ে না, ঝুপড়িটাও না, চুলোয় যাক ধ্যান বলে যেন ঠোঁট সোজা করল সে। পলকে বেরিয়ে এল আরেক পা। রনপা-য় ভর দিয়ে এগোল।

একটা মুহূর্ত দ্বিধা করল ঝুপড়ির কাছে এসে, তারপর ঢুকে পড়ল ভেতরে। খ্যাচাং করে মাছের ঝুড়িতে ঢুকে গেল চোখা ঠোঁট।

মুসাও মারল দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান। ঝুপ করে জালের চারদিক খুলে ছড়িয়ে। পড়ল নিচে। উড়তে গেল সারস, এবং দ্বিতীয় ভুলটা করল। জড়িয়ে পড়ল জালে।

আঙুল, ভানার মাথা, ঠোঁট, ঢুকে গেল জালের খোপে। ছুটাতে গিয়ে আরও জড়াল। ছোঁড়া বালিশের তুলোর মত বাতাসে উড়তে থাকল সাদা পালক।

থামল না পাখিটা। যেভাবে ঝাপটা-ঝাঁপটি করছে, জাল ছিঁড়তে দেরি হবে না।

কিশোর আর রবিনও এসে দাঁড়িয়েছে।

দূরে বসে দেখছেন মিস্টার আমান। বললেন, জলদি পা বাঁধো।

 ছুটে গিয়ে দড়ির বাণ্ডিল নিয়ে এল মুসা।

কিশোর আর রবিন এগোল তাকে সাহায্য করতে।

প্রথমেই পেটে সারসের জঘন্য লাথি খেল রবিন। বাঁশ দিয়ে তার পেটে খোঁচা মারা হলো যেন। আউফ করে পেট চেপে ধরল।

লাথি খেয়ে তার জেদ গেল বেড়ে। যে পায়ে লাথি মেরেছে, সারসের সেই পাটা দু-হাতে চেপে ধরল।

দড়ির এক মাথায় গিঁট দিয়ে ফাঁস বানিয়ে ফেলেছে কিশোর। সেটা সারসের পায়ে পরিয়ে টেনে আটকে দিল মুসা।

জাল ছিঁড়ছে। ঝাড়া দিয়ে রবিনের হাত থেকে পা ছুটিয়ে নিয়ে লাফিয়ে শূন্যে উঠল সারস।

সড়াৎ করে মুসার হাত থেকে অনেকখানি দড়ি চলে গেল। জ্বালা করে উঠল। হাত, চামড়া ছিলে গেছে। কিন্তু দড়ি ছাড়ল না।

রবিনও দড়ি চেপে ধরল।

ক্ষণিকের জন্যে মনে হলো ওদের, সিন্দবাদ নাবিকের রুক পাখির মত উড়িয়ে নিয়ে যাবে লম্বু বগা! আঙুল ঢিল করে দড়ি ছাড়তে লাগল।

শাঁই শাঁই করে উড়ে গেল সারস। পঞ্চাশ ফুট উঠে শেষ হয়ে গেল দড়ি, ঝটকা দিয়ে টানটান হয়ে গেল।

ইতিমধ্যে দড়ির অন্য মাথাটা নিয়ে গিয়ে ভেলার একটা খুঁটিতে বেঁধে ফেলেছে। কিশোর। উঁচুতে আর উঠতে না পেরে চক্কর দিয়ে উড়তে লাগল পাখিটা। ভয় আর বিস্ময় ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে দিচ্ছে না যেন তাকে।

কিন্তু খানিক পরেই ভয়-ডর সব চলে গেল। অবাক হয়ে যেন ভাবল সারস, আমি না জ্যাবিরু? এত ভয় পাওয়া কি আমার সাজে? দ্রুত নামতে শুরু করল সে। ভেলা আলো করে জুড়ে বসল। গম্ভীর ভঙ্গিতে একবার এদিক একবার ওদিক তাকিয়ে আশপাশের সবাইকে তুচ্ছজ্ঞান করল। যেন বলল, ভয় আমি পাইনি, তোমাদেরকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। যাকগে, অনেক হয়েছে। এবার খানিক ধ্যানমগ্ন হই। খবরদার, আমাকে বিরক্ত করবে না।

বেশবাস ঠিক করল সে। ঝাড়া দিয়ে আলগা পালক ঝড়িয়ে ফেলল, ঠোঁট দিয়ে ডলে সমান করল এলোমেলো হয়ে থাকা পালক। একটা পা গুটিয়ে লুকিয়ে ফেলল ডানার তলায়। তারপর আরেক পায়ে ভর রেখে দাঁড়িয়ে ঠোঁট গুজল বুকের পালকে। ধ্যানমগ্ন হলেন দার্শনিক।

পরদিন সকালে আমাজনে বজরা ভাসাল অভিযাত্রীরা।

 কিশোর সাজল ক্যাপ্টেন, মূসা ফার্স্ট মেট, আর রবিন স্টুয়ার্ড। মিস্টার আমানের দুর্বলতা কাটছে না চিন্তিত হয়ে পড়েছে ছেলেরা। বিষের ক্রিয়া কাটেনি যে এটা পরিষ্কার। তাকে নিয়ে কি করবে বুঝতে পারছে না ওরা।

সাগরে চলেছে স্রোত, ভেলাও চলেছে সেদিকে।

বিচিত্র সব যাত্রী ও তাপিরছানা, ভ্যাম্পায়ার, পুঁচকে বানর মারমোসেট, দানব। ইগুয়ানা, দার্শনিক জ্যাবিরু, চারজন হোমো স্যাপিয়েনস (মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম), আর মহাবীর কিকামুর মমি করা শুকনো মাথা।

নাকু এখন ঘাসই খায়, কচি পাতাও খায়। রক্তচাটা বেশ ঝামেলা করে, গরম রক্ত না হলে তার চলে না। ফলে দিনে অন্তত একবার তীরে নেমে ছোট জানোয়ার। শিকার করতে হয় মুসাকে। জাতভাই অন্য বানরের মত শজি আর ফল ভালবাসে না ময়দা, পোকামাকড় আর ছোট গিরগিটি না পেলে মুখ ভার করে রাখে। ডাইনোসরকে (ইগুয়ানাটার নাম) নিয়ে ভাবনা নেই। পাতা, ফল মাংস সবই খায়। আর লম্বুর জন্যে তো রোজই ঈদ। মাছের অভাব নেই নদীতে। ভেলার কিনারে দাঁড়িয়ে নিজেও ধরে, বড়শি ফেলে মুসাও ধরে দেয়।

দিনে চলে, রাতে ভেলা তীরে ভিড়িয়ে কোন গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেধে তারপর ঘুমায় অভিযাত্রীরা। মাঝেসাঝে দু-একটা ভেলা দূর দিয়ে চলে যেতে দেখে। ইনডিয়ানদের ভেলা। নদীর পাড়ে কোন গ্রাম চোখে পড়ে না, খালি জঙ্গল। কোথা থেকে আসে ইনডিয়ানরা, কোথায় যায় ওরাই জানে। অভিযাত্রীদের দিকে ফিরেও তাকায় না।

মিস্টার আমানের অবস্থা আরও খারাপ হলো। উঠতেই পারেন না এখন।

এই সময় একদিন সকালে দেখা গেল শহর।

.

১১.

খুদে শহর, কিন্তু দীর্ঘ দিন শুধু জঙ্গল দেখে দেখে ওটাকেই নিউইয়র্ক নগরী বলে মনে হলো ওদের। শহরটার নাম হকিটোজ।

তাদের যাত্রাপথে এটাই শেষ শহর। সামনে একটানা গহীন অরণ্য, নদীর দুই তীরেই।

জেটিতে ভিড়ে একটা খুঁটিতে ভেলা বাধল ওরা। শতশত ছোটবড় নৌকা। রয়েছে ঘাটে। প্রায় সবাই মাল নিয়ে এসেছে। খালাস করা হচ্ছে রবার, তামাক, তুলা, কাঠ, নানা রকমের বাদাম।

সীমান্ত শহর। বেশির ভাগই কলকারখানা। কাঠের মিল, জাহাজ আর নৌকা মেরামতের ডকইয়ার্ড, সুতার কল, যন্ত্রপাতি মেরামতের কারখানা আছে। আর আছে মদ চোলাইয়ের বিশাল কারখানা-আখের রস থেকে রাম তৈরি করে। কাস্টমস আছে, মিউনিসিপ্যালিটি আছে, একটা সিনেমা হলও আছে। বিকেলের দিকে শহর ঘুরতে গিয়ে ছেলেরা দেখল, তাতে চলছে অনেক পুরানো একটা ছবি। কয়েক বছর আগেই রকি বীচে দেখে ফেলেছে ওটা ওরী।

ভেলায় ফিরে দেখল, নির্জীব হয়ে পড়ে আছেন মিস্টার আমান। ছেলেদের সাড়া পেয়ে চোখ মেললেন। বললেন, আমাদের বোধহয় বাড়িই ফিরে যেতে হবে।

কেন যেতে হবে, বলতে হলো না, বুঝল ছেলেরা। হাসপাতাল ছাড়া ভাল হবেন না মিস্টার আমান।

মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবারে প্লেন ছাড়ে ইকিটোজ থেকে। কাল সকালেই একটা ছাড়বে। যেতে হলে কালই যাওয়া দরকার।

মাঝরাত পর্যন্ত গুজগুজ ফিসফাস করল ছেলেরা।

ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ছেলেদের ডেকে তুললেন মিস্টার আমান। তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে টিকেট কাটতে যেতে বললেন।

খেতে খেতে মুসা বলল, বাবা, একটা টিকেট কাটলেই চলবে।

 মানে? ভুরু কুঁচকে তাকালেন মিস্টার আমান। রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে চেহারা। অনেকগুলো ভাজ পড়ল কপালে।

বাবার জন্যে কষ্ট হলো মুসার। আমরা থেকে যাই। শেষ করেই যাই কাজটা।

না, পারবে না। তোমরা সবাই ছেলেমানুষ।

কেন পারব না, আংকেল? কিশোর বলল, আমরা তো চালিয়ে এসেছি। এযাবত। পারব না কেন? কয়েকজন লোক ভাড়া করে নেব শুধু।

হাসলেন মিস্টার আমান। শুকনো ঠোঁটে দুর্বল দেখাল হাসিটা। কিন্তু সামনে গভীর জঙ্গল

তাতে কি? মুসা জিজ্ঞেস করল, যা পেরিয়ে এসেছি, তার চেয়ে বেশি বিপদ হবে? বাবা, ভেবে দেখো, তোমার জমানো টাকা প্রায় সব খরচ করেছ এই অভিযানের পেছনে। কাজ শেষ করে যেতে না পারলে ফকির হয়ে যাবে। অতগুলো টাকা জমাতে কত বছর সময় লাগবে আবার? শোধ করবে কিভাবে? যে কটা জানোয়ার ধরেছি, বিক্রি করে ধারই শোধ করতে পারবে না।

সবই বুঝি। কিন্তু তোমরা ছেলেমানুষ।

ছেলে ছেলে করছ কেন? এতখানি যখন আসতে পেরেছি বাকিটাও যেতে পারব, দৃঢ়কণ্ঠে বলল মুসা।

কিন্তু কিশোরের চাচী আর তোমার মাকে কি বলল? রবিনের বাবা-মাকে হয়তো বোঝাতে পারব…

কি আর বলবে? মা বকবক করবে, তুমি চুপ করে থাকবে।

হ্যাঁ, হাসল কিশোর। আমরা ঠিকমত ফিরে গেলেই তো হলো। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। আর মেরিচাচীর বকা আপাতত আপনাকে খেতে হবে না। চাচার ঘুম হারাম করে দেবে। দিকগে, আপনার কি? তাছাড়া এখনই আপনাকে পাচ্ছে। কোথায় ওরা? আপনি তো থাকবেন হাসপাতালে।

ঝকঝকে সাদা দাঁত বেরিয়ে পড়ল মিস্টার আমানের। হাসিটা অবিকল মুসার মত। বাপ-ছেলে দু-জনেই একরকম করে হাসে। গভীর ষড়যন্ত্র! হাহ হা…কিন্তু দেখো ছেলেরা, আমাকে কথা দিতে হবে, জ্যান্ত ফিরে যাবে তোমরা। যদি তা না পারো, আমাকে খামোকা ফেরত পাঠিও না। হাসপাতাল থেকে হয়তো বেঁচে ফিরব, কিন্তু আমি শিওর, তারপর খুন করা হবে আমাকে।

হাসল সবাই।

.

সেদিন সকালের প্লেনেই চলে গেলেন মিস্টার আমান।

.

১২.

চেয়েই রইল ছেলেরা। দিগন্তে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল প্লেনটা।

ফিরে তাকাল ওরা পরস্পরের দিকে। বিষণ্ণ। বড় একা লাগছে। ভীষণ অরণ্যের বিরুদ্ধে ওরা তিন কিশোর। খানিক আগে মিস্টার আমানকে বলা বড় বড় কথাগুলো এখন অর্থহীন মনে হচ্ছে ওদের।

কিছু হবে না, বলল কিশোর, নিজেকেই সান্তনা দিচ্ছে। মুশিকারীদের সামনে না পড়লেই হলো। কয়েকটা জন্তুজানোয়ার ধরা তো। পারব। আমাজনের অনেকখানি চেনা হয়ে গেছে আমাদের।

ঘাটে ফিরে এল ওরা।

আগের জায়গায়ই বাঁধা রয়েছে ভেলাটা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। কেন যেন মনে হচ্ছিল তার, জায়গামত পাবে না ওটা।

ওরা ভেলার দিকে যেতেই এগিয়ে এল একজন পুলিশ।

উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে আর হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশ আর পর্তুগীজ শিখে ফেলেছে এতদিনে কিশোর। লোকটার কথার তুবড়ি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারল তা হলো, ওদের অনুপস্থিতিতে নৌকা করে কয়েকজন লোক এসে ভেলার দড়ি খুলতে শুরু করেছিল।

 লোকগুলোর হাবভাবে সন্দেহ হয়েছিল পুলিশ কনস্টেবলের, চ্যালেঞ্জ করেছিল। নৌকার একজন জবাব দিয়েছে, সে ভেলার একজন মালিক। এখানে সুবিধে হচ্ছে না, নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে চায়। সন্দেহ আরও বেড়েছে পুলিশম্যানের। তর্কাতর্কি করেছে। শেষে সাফ বলে দিয়েছে, অন্য মালিকরাও আসুক, তারপর ভেলার দড়ি খুলতে দেবে।

অপেক্ষা করতে রাজি হয়নি লোকটা। পরে আসবে বলে নৌকা নিয়ে চলে গেছে।

লোকটার চেহারার বর্ণনা চাইল কিশোর।

কনস্টেবল যা বলল, তাতে বোঝা গেল, লোকটা বিশালদেহী, খারাপ চেহারা এবং নো জেন্টলম্যান। ইংরেজির টানে স্প্যানিশ বলে।

কনস্টেবলের হাতে একটা ডলার গুঁজে দিল কিশোর। খুশিতে ময়লা দাঁত সব বেড়িয়ে পড়ল লোকটার।

মুসা আর রবিনকে ভেলা পাহারায় রেখে থানায় গেল কিশোর ডায়রি করাতে।

থানার লোকেরা হেসেই উড়িয়ে দিল।

ভুল করেছে আরকি, বলল চীফ। যাও তুমি, আবার কোন গোলমাল হলে এসে বলো।

পরিষ্কার বুঝল কিশোর, আবার কিছু হলে তাদেরকেই সামলাতে হবে, পুলিশের সাহায্য পাওয়ার আশা নেই। ইউ এস কনসালের সঙ্গে দেখা করল সে। খুলে বলল সব।

শুধু চেহারার ওই বর্ণনা দিয়ে এখানে ধরা যাবে না কাউকে, কনসাল বললেন। ওরকম চেহারার অনেক আছে। দেখো, তোমরা যদি খুঁজে বের করতে। পারো। কিন্তু তাহলেও কিছু করার নেই। ওর বিরুদ্ধে কোন কিছু খাড়া করতে পারবে না, কোন প্রমাণ নেই তোমাদের হাতে। দড়ি খুলতে এসেছিল, কনস্টেবল। মানা করায় চলে গেছে। জেলে যাওয়ার মত কিছুই করেনি সে। কোন অ্যাকশন না। নিয়ে ঠিকই করেছে পুলিশ। ধরলেও আবার ছেড়ে দিতে হত। সেক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া হয়ে যেত তোমাদের ভিলেন।

ঠিকই বলেছেন কনসাল। কিশোর জিজ্ঞেস করল, তাহলে আপনার পরামর্শ কি?

বলব? মিস্টার আমানের পথ ধরো। প্লেনে চড়ে সোজা বাড়ি চলে যাও। বুঝতে পারছি, তোমাদের শত্রু আছে এখানে। জানোয়ারগুলোর অনেক দাম। চোর-ডাকাতের চোখ তো পড়বেই। এখানে ওদের অভাবও নেই। গলাকাটা। ডাকাত অনেক আছে। ইকিটোজে যতক্ষণ আছ, আইনের সাহায্য পাবে, সে ব্যবস্থা করতে পারব। কিন্তু জঙ্গলে পুলিশ যাবে না। সেখানে একটাই আইন ও হয়। মারো, নয় মরো। সেটা অভিজ্ঞ পুরষমানুষের কাজ, তোমরা ছেলেমানুষ, টিকতে পারবে না।

ছেলেমানুষ শুনতে শুনতে কান পচে গেছে কিশোরের। মনে মনে রেগে গেল। পেয়েছে কি বুড়োরা? বয়েস কম হতে পারে, কিন্তু যে কোন বড়মানুষের চেয়ে কম কি ওরা? আর শিখতে শিখতেই ছেলেরা বড় হয়, অনভিজ্ঞরা অভিজ্ঞ হয়।

অনেক ধন্যবাদ, গম্ভীর হয়ে বলল কিশোর। কারও সাহায্য পাই আর না পাই, কাজ চালিয়ে যাব আমরা, কেউ ঠেকাতে পারবে না। আজতক পারেনি কেউ।

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন কনসাল। হাসি ফুটল ধীরে ধীরে। খুব জেদি ছেলে। ওরকম মনোবল থাকা ভাল। গুড লাক।

কনসালের অফিস থেকে বেরোল কিশোর।

জেটিতে পৌঁছে দেখল ভেলায় টহল দিচ্ছে রবিন আর মুসা। দুজনের হাতেই রাইফেল। মূসার কোমরের ডান পাশে ঝোলানো খাপে ভরা পিস্তল, তার বাবার কোল্ট :৪৫, বাঁ পাশে বিরাট ছুরি। রবিনের কোমরে শুধু ছুরি। ভেলার কাছে খালি এসে দেখো, দেখাব মজা!-এমনি ভাবভঙ্গি।

আসলে ভয়ে কাতর হয়ে আছে দু-জনে। কিশোরকে দেখে হাঁপ ছাড়ল।

কাজ হলো? জিজ্ঞেস করল মুসা।

না। যা করার আমাদেরই করতে হবে।

সে-ভয়ই করছি। পারব?

 দেখা যাক পারি কিনা। আগে থেকেই কেঁচো হয়ে গিয়ে লাভ নেই।

যাত্রার জন্যে তৈরি হতে লাগল ওরা।

নদীর উজানে ভেলা দিয়ে মোটামুটি কাজ চলেছে। কিন্তু ভাটিতে যেখানে স্রোত বেশি, ঝড়তুফানেরও ভয়, সেখানে এই জিনিস টিকবে না। ভাল, বড় নৌকা। দরকার। জাগুয়ার কিংবা অ্যানাকোণ্ডার মত বড় ভারি জীব রাখতে হলে অনেক বেশি জায়গা প্রয়োজন। আর বড় নৌকা চালানোর জন্যে মাল্লাও লাগবে।

সেই পুলিশ কনস্টেবলকে আবার দেখা গেল জেটির কাছে। বোধহয় আবার। ডিউটি পড়েছে এদিকে। মুসা আর রবিনকে ভেলায় রেখে তীরে উঠল কিশোর। পুলিশম্যানকে ভেলার দিকে নজর রাখতে বলে চলল ডকইয়ার্ডের অফিসে, নৌকা কিনতে।

ম্যানেজার লোক খুব ভাল সহজেই বোঝানো গেল তাকে, কি জিনিস চায় কিশোর। একটা নৌকা দেখাল।

নৌকা বা জাহাজের ব্যাপারে বাস্তব ধারণা প্রায় নেই কিশোরের, শুধু বই পড়ে যা জেনেছে। তবু দেখেই বুঝল, এই জিনিসই তাদের দরকার।

নৌকাটা পঞ্চাশ ফুট লম্বা। খুবই মজবুত। এর স্থানীয় নাম ব্যাটালাও। সামনের গলইয়ের কাছে কিছুটা বাদ দিয়ে পুরো নৌকার ওপরেই ছাত, ঘরের। মত। একে বলে টলডো। বাংলাদেশী বজরার ছবি দেখেছে কিশোর, এই নৌকাটাও অনেকটা বজরার মতই। তাই এর নাম রাখল বড় বজরা।

বেশ চওড়া বড় বজরা, পেটের কাছে প্রায় দশ ফুট। পেছনে হালের কাছে। একটা উঁচু মঞ্চ। ওখানে দাঁড়িয়ে হাল ধরে মাঝি। আশপাশ তো বটেই, ছাতের। ওপর দিয়ে সামনের দিকেও নজর রাখা যায় ওখানে থেকে। চারটে দাড়ের ব্যবস্থা। রয়েছে, একসঙ্গে দাঁড় টানতে পারবে চারজন মাল্লা। বাড়তি পাটাতনমত রয়েছে। নৌকার দুই ধারে। ওগুলো থাকাতে অল্প পানিতে লগি বেয়ে যাওয়া যাবে।

নৌকাটা কিনল কিশোর পঁচিশ ফুট লম্বা আরেকটা ছোট নৌকা কিনল, ওটার। স্থানীয় নাম মনট্যারিয়া। সে নাম দিল ছোট বজরা। বড় বজরার মত এর ওপরেও টলডো রয়েছে। হালকা বলে বড়টার চেয়ে জোরে ছুটতে পারে।

ডকইয়ার্ডের ম্যানেজারই মান্না জোগাড় করে দিল। ছয় জন। নৌকা বাইবে। ওরা, জানোয়ার ধরায়ও সাহায্য করবে। পাঁচজন ইনডিয়ান, আর অন্য লোকটা ক্যাবোক্লো-ইনডিয়ান ও পর্তুগীজের মিশ্র রক্ত; তার নাম জিবা।

ভেলার আর দরকার নেই, কিন্তু ক্যানূটা ফেলল না কিশোর। ওটাতে করেই এতদূর এসেছে। কাজের জিনিস। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। দুই বজরার সঙ্গে। বেঁধে নিল ওটাও।

সামনে দীর্ঘ যাত্রা। তিন গোয়েন্দা উত্তেজিত। ভেলার পাশে বজরা বেঁধে ওগুলোতে মাল আর জানোয়ার তুলতে শুরু করল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আলো থাকতে থাকতেই কাজ শেষ করতে চায় কিশোর। পরদিন খুব ভোরে উঠে রওনা দেবে।

ঘাটে অনেক দর্শক জমেছে। জানোয়ার তোলা দেখছে ওরা, মাঝেসাঝে দু একটা পরামর্শও দিচ্ছে। পিরের বাচ্চা, বানর আর বাদুড় তোলাটা কিছুই না। ঝামেলা করল ইগুয়ানা। নড়তে চায় না। ওটাকে বেশি চাপাচাপিও করা যায় না, লেজ খসে যায় যদি?

যা-ই হোক, তোলা গেল অবশেষে।

হাঁকডাকে জ্যাবিরু গেল ঘাবড়ে। উড়ে গেল ওটা। পায়ে বাধা পঞ্চাশ ফুট দড়িতে হ্যাঁচকা টান লাগতেই ওপরে উঠা থামিয়ে চক্কর দিয়ে উড়তে শুরু করল। দড়ি ধরে ধীরে ধীরে টেনে নামিয়ে আনা হলো ওটাকে।

কাজ প্রায় শেষ, ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল বিশালদেহী এক লোক। ভেলায় এসে উঠল।

দেখামাত্র চিনল ওকে কিশোর আর মুসা। অন্ধকার হয়ে গেছে। আরও ভালমত দেখার জন্যে লোকটার মুখে টর্চের আলো ফেলল কিশোর। না, কোন ভুল নেই। সেই লোকটাই। চোখা কান। কুৎসিত নিষ্ঠুর চেহারা।

হাল্লো, বলল কিশোর। আপনাকে কোথাও দেখেছি মনে হয়?

হ্যাঁ। কুইটোতে। গির্জা খুঁজছিলাম।

মোম নিশ্চয় জেলেছেন?

মিছে কথা বলেছি। আসলে তোমাদের পিছুই নিয়েছিলাম।

আজ ভেলার দড়ি কে খুলতে এসেছিল? আপনি?

ভুল করেছিলাম। আমাদের ভেলা ভেবেছিলাম।

নিশ্চয়, টিটকারির ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। তা আপনার নামই তো। জানা হলো না এখনও।

হাসল লোকটা। নাম? নাম জেনে আর কি হবে? বন্ধু বলে ডাকতে পারো। দাঁত বের করে হাসল আবার লোকটা। সরু চোখা দাঁত, ওপরের পাটিতে দুদিকের দুটো দাঁতের মাথা এত চোখা ও লম্বা, শ্বদন্ত বলেই ভুল হয়।

হু, মাথা দোলাল আবার কিশোর। নাম একটা আমিই দিই আপনার। ভ্যাম্পায়ার। সংক্ষেপে ভ্যাম্প। তা কি করতে পারি আপনার জন্যে?

দেখো, কণ্ঠস্বর বদলে গেল লোকটার, হাসি হাসি ভাবটা আর নেই, গোলমাল করতে চাই না। একটা চুক্তিতে আসা যাক।

কার তরফ থেকে? মার্শ গ্যাম্বল? অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ল কিশোর। ওই লোকটাই লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জানোয়ার ব্যবসায়ী।

চমকে উঠল ভ্যাম্প, চোখে বিস্ময়। কার কথা বলছ?

ভালমতই জানেন, কার কথা বলছি। আপনার মত আরেকটা ভ্যাম্প। নিজের মুরোদ নেই, জানোয়ার ধরার জন্যে লোক রেখেছে। বোঝাই যাচ্ছে, ঠকায় ওদেরকে, ফলে পছন্দসই জানোয়ার পায় না। এখন আরও একটা ব্যাপার পরিষ্কার হলো, অন্যের জিনিস ছিনিয়ে নেয়। ডাকাত পোষে সে জন্যে।

জুলে উঠল ভ্যাম্পের চোখ। দেখো, কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার, ছিনিয়ে নেব বলিনি আমি…

না, চুরি করতে এসেছিলেন আরকি দুপুরবেলা।

বেশি ফ্যাঁচফ্যাঁচ কোরো না, ছেলে। যা বলছি, শোনো। জানোয়ারগুলো বিক্রি করে দাও আমার কাছে।

কত দেবেন?

এক হাজার ডলার।

মুচকি হাসল কিশোর। জবাব দিল না।

 দু-হাজার?

দশ হাজারেও না। বিশ হাজার দিতে যে কেউ রাজি হবে।

আর একটা আধলাও দেবো না। দুই, ব্যস।

পথ দেখতে পারেন তাহলে।

পস্তাবে, খোকা, এই বলে দিলাম। ভাল চাও তো দিয়ে দাও।

শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এল মুসা। আরেক পাশ থেকে রবিনও এগোল, হাতে শটগান।

ব্যাটাকে পানিতে ফেলে দেব? কিশোরের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা।

ভ্যাম্পের লাল চোখ টকটকে হয়ে গেল। ইঁদুরের বাচ্চারা, দেখাব… রাগে কথা ফুটছে না। দাঁড়া, দেখাব তোদের মজা! সোজা আঙুলে ঘি যখন উঠল না,

থাবা দিয়ে রবিনের হাত থেকে শটগানটা ছিনিয়ে নিল মুসা। নামো। নইলে খোঁড়া হয়ে যাবে জন্মের মত।

দুপদাপ করে নেমে গেল ভ্যাম্প। জনতার ভিড় ঠেলে হারিয়ে গেল ওপাশে।

নিচুস্বরে রবিন বলল, আবার আসবে। সকালের আগেই।

আমিও তাই ভাবছি, কিশোর বলল। রাতেই আসবে। কিংবা আমাদের পিছু নেবে সকালে।

কি করব তাহলে? মুসার প্রশ্ন।

উপায় একটাই?

কী?

এগিয়ে থাকো। ভিড় সরে গেলেই নৌকা ছাড়ব। রাতের মধ্যেই এগিয়ে থাকব। অনেকখানি। ভ্যাম্প রওনা হতে হতে অর্ধেক দিনের পথ এগিয়ে যাব আমরা।

কিন্তু আমরা যখন জানোয়ার ধরব, ওই সময় আবার এগিয়ে আসবে, রবিন বলল।

হারিয়ে যাব আমরা। খুঁজে পাবে না, বলল কিশোর।

মানে?

নদীটা কয়েক মাইল চওড়া, মাঝে ছোট-বড় অনেক দ্বীপ আছে। অসংখ্য খাল আছে ওগুলোর ভেতরে ভেতরে। কোটা দিয়ে আমরা ঢুকেছি, কোন দিকে গেছি, কি করে জানবে?

হ্যাঁ, তা ঠিক, মেনে নিল রবিন

 জিবাকে ডেকে বলল কিশোর, এক ঘণ্টার মধ্যেই রওনা দেবে। লোকজন যেন তৈরি রাখে।

না না, সিনর, প্রবল আপত্তি জানাল জিবা। সকালের আগে যাওয়া যাবে না।

আজ রাতে ঠিক দশটায় বজরা ছাড়ব, সিদ্ধান্তে অটল রইল কিশোর।

বিপদে পড়বে, সিনর। রাতে যাওয়া যাবে না।

 কিশোর বুঝল, অহমে লাগছে লোকটার। বয়স্ক, এদিককার নদী-বন সম্পর্কে। অভিজ্ঞ তাকে কিনা আদেশ দিচ্ছে এক পুঁচকে ছেলে। মানবে কেন?

কিন্তু জিবাকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার, কে মনিব। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা গুণলো কিশোর। বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এই নাও।

কি?

বিকেলে যে কাজ করেছ, তার টাকা। নিয়ে বিদেয় হও।

হাঁ হয়ে গেল জিবা। বলে কি ছেলেটা? আমাকে ছাড়া যেতে পারবে না। এই নদীর কিচ্ছু চেনো না তুমি।

পারব পারব, হাসল কিশোর। তোমাকে ছাড়া এতখানি যখন আসতে পেরেছি, যেতেও পারব।

টাকা নিল না জিবা। গোমড়ামুখে বলল, রাত দশটায়ই রওনা দেব, সিনর।

ভেরি গুড। টাকাটা আবার মানিব্যাগে রেখে দিল কিশোর।

জানোয়ার তোলা শেষ। দেখার আর কিছু নেই, একে একে চলে গেল সবাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই একেবারে জনশূন্য হয়ে গেল ঘাট।

নিঃশব্দে নোঙর তুলল তিনটে নৌকা। ভেসে পড়ল আমাজনের ষোতে। পেছনে পড়ে থাকল ভেলাটা, শূন্য, রিক্ত।

ভ্যাম্প মিয়া ভেলা চেয়েছিল, হেসে বলল মুসা। নিয়ে যাক এখন।

মঞ্চে হাল ধরে দাঁড়িয়েছে জিবা। দাঁড় বাইছে চারজন ইনডিয়ান। একজনকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গা নিল কিশোর। অধীনস্থদের বোঝানো দরকার, মনিবেরা কাজের লোক।

ছোট বজরায় গিয়ে দু-জন মান্নার সঙ্গে দাঁড় টানায় যোগ দিল মুসা। রবিন গেল কফি বানাতে।

বড় বজরাটায় টলডোর ভেতরে রাখা হয়েছে জানোয়ারগুলোকে। খাঁচার ছাত থেকে চুপচাপ ঝুলে রয়েছে রক্তচাটা। বসে বসে ঝিমুচ্ছে ময়দা, নৌকা জোরে দুললেই মৃদু কিচকিচ করে উঠছে। খানিক পর পরই এসে দরজার বাইরে নাক বের। করছে না, নৌকার দুলুনী ভাল লাগছে না তার। ভীতু ঘোড়ার বাচ্চার মত চি চি করে প্রতিবাদ জানিয়ে ফিরে যাচ্ছে আবার নিজের ঘাসপাতার বিছানায়। কুঁড়ের। বাদশাহ ডাইনোসর একেবারে চুপ, পাটাতনে শুয়ে গভীর নিদ্রায় অচেতন। এক পায়ে ভর রেখে ঘরের কোণে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে লম্বু দার্শনিক, দুনিয়ার আর কোন খেয়ালই যেন নেই তার।  মাস্তুলে ঝুলছে চুলে বাধা কিকামু। তারার দিকে চেয়ে মাথা নাড়ছে যেন আপনমনে।

আবছা অন্ধকার আকাশ থেকে যেন ঝুলে রয়েছে কৃষ্ণপক্ষের একটুকরো ক্ষয় চাঁদ, ক্লান্ত, বিষণ্ণ। ভুতুড়ে হলদে আলো ছড়াচ্ছে, আঁধার তো কাটছেই না, কেমন। যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। চাঁদের দিকে তাকাতে সাহস করছে না মুসা, গা ছমছম করে। কিশোর দাঁড় টানায় এত ব্যস্ত, তাকানোর সময়ই নেই।

পাশের বন থেকে ভেসে এল রক্ত-জমাট-করা ভয়াক গর্জন। না, টিগ্রে নয়। শুনে মনে হয় মরণযুদ্ধে মেতেছে একপাল ভয়াল নেকড়ে, কিংবা ভীষণ সিংহ। কিন্তু কিশোর জানে, নেকড়েও নয়, সিংহও নয়, ওটা এক জাতের বানরের ডাক। নিশার ফুরফুরে বাতাসে মাতোয়ারা হয়ে দরাজ গলায় গান ধরেছে গুটি কয়েক হাওলার। মাংকি। সাধারণ কুকুরের চেয়ে বড় নয়, অথচ গলায় এত জোর, তিন মাইল দূর থেকেও শোনা যায় চিৎকার।

মানুষের স্নায়ুর ওপর খুব খারাপ প্রতিক্রিয়া করে ওই শব্দ। একজন নেচারালিস্ট-এর কথা মনে পড়ল কিশোরের। তিনি লিখেছেন :

ডাকটা প্রথম যেদিন শুনলাম, মনে হলো, বনের ভেতরে মরিয়া হয়ে লড়াইয়ে মেতেছে আমাজনের সমস্ত জাগুয়ার।

 তার বিশ্বাস, হিংস্রতার দিক দিয়ে বেবুনের পরেই হাওলার মাংকি। এমনিতে মানুষকে ভয় করে, কিন্তু আক্রান্ত হলে ভয়ানক হয়ে ওঠে ওরা। চোয়ালে অসাধারণ জোর। একবার নাকি এক ভ্রমণকারীর শটগানের নল কামড় দিয়ে চ্যাপ্টা করে দিয়েছিল একটা হাওলার।

হাওলারের গর্জন থামলে কানে আসে হাজারো; লাখো ব্যাঙের কোলাহল। এরই মাঝে খুব আবছা শোনা যায় নিঃসঙ্গ কুমিরের কান্নার মত ডাক, শিংওলা পেঁচার তীক্ষ্ণ কর্কশ চিৎকার, পিরের হেষারব, পেকারির ঘোৎ-ঘোৎ। আরও নানা রকম অজানা জীবের বিচিত্র সব ডাকও শোনা যাচ্ছে।

সব কিছুকে ছাপিয়ে মাঝে মাঝে কেশে উঠছে, কিংবা ধমক দিচ্ছে জাগুয়ার। ক্ষণিকের জন্যে চুপ হয়ে যাচ্ছে সবাই। খানিক পরে আবার শুরু করছে হট্টগোল।

বাতাসের বেগ বাড়ল। পাল তোলার নির্দেশ দিল কিশোর।

প্রতিবাদ জানাল জিবা। অন্ধকার নদীর বাঁকে বাঁকে ঘাপটি মেরে আছে বিপদ, কালো পাথরের চোখা চাঙর, বালির ডুবোচরা, ভেসে যাওয়া কাঠের গুঁড়ি।

ওসব জানা আছে কিশোরের। ওগুলোতে লাগলে কি সর্বনাশ হবে, তা-ও বুঝতে পারছে। কিন্তু ভ্যাম্পের কাছ থেকে সরে যেতে হলে ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই।

ফুলে উঠল পাল। সেই সঙ্গে দাঁড় বাওয়া চলছে। তারওপর ভাটিয়াল স্রোত। তরতর করে ছুটে চলল নৌ-বহর।

দু-বার ঘষা লাগল বালির চরায়। আটকে যেতে যেতে, কোনমতে পার হয়ে এল নৌকা। একবার ধাক্কা লাগল বিরাট এক গাছের গুঁড়ির সঙ্গে। কিন্তু চোখের। পলকে জীবন্ত হয়ে উঠল গুঁড়িটা, কান্নার মত ডাক দিয়ে পানিতে আলোড়ন তুলে, ডুবে গেল।

ঘোলাটে জ্যোৎস্নার, চেয়ে তারার আলোই যেন বেশি।

সাদার্ন ক্রসের গায়ে বুঝি শিশির জমেছে। ভেজা বাতাস কনকনে ঠাণ্ডা।

মাঝরাতের দিকে কমতে কমতে একেবারে থেমে গেল বনের চিৎকার, ভোর রাতে শুরু হলো আবার। ঘড়ির দরকার হয় না। ওই শব্দ শুনলেই বুঝতে হবে, ভোরের আর মাত্র আধঘণ্টা বাকি।

উঠতি সুর্যের সোনা-রোদে যেন জ্বলে উঠল বুনো ফুলের স্তবক। সবুজ বন সোনালি, নদীর ঘোলা পানিও সোনালি, তরল সোনা গুলে দেয়া হয়েছে যেন সব কিছুতে। পাখির কলরবে বনভূমি মুখর। ঝলমলে রঙিন ডানা মেলে উত্তরে উড়ে চলেছে এক ঝাঁক শুনবিল।

রোদ চড়ল। গাছের মাথা থেকে নামতে নামতে গোড়ায় পৌঁছল। দুটো দ্বীপের। মাঝের খাল দিয়ে চলল নৌবহর। দু-দিকেই ঘন বন। পাল নামিয়ে ফেলা হলো। দাঁড় বাওয়াও বন্ধ। তোতের টানে আপন গতিতে ভেসে চলল তিনটে নৌকা।

নাস্তা করতে বসল যাত্রীরা। মানুষের জন্যে কফি, ম্যানডিওকার তৈরি মোটা রুটি আর শুকনো গরুর মাংস। জানোয়ারগুলোরও খিদে পেয়েছে, একেকটার জন্যে একেক রকম খাবারের ব্যবস্থা হলো।

সারা রাত চলেছে, বিশ্রাম দরকার। আমার নির্দেশ দিল কিশোর।

মোড় নিয়ে একটা দ্বীপের ভেতর ঢুকে গেছে সরু একটা উপখাল। তার মধ্যেও ঢুকল নৌবহর। বড় বড় কতগুলো বাদাম গাছের নিচে নোঙর ফেলল।

তীরের কাছে ঘুমাচ্ছে বিশাল এক কুমির। এতই গভীর ঘুম, গেল না ওটা, কয়েক হাত সরে জায়গা করে দিল শুধু নৌকাগুলোকে। চোখ আর নাকের দু-দিক ইলেকট্রিক বালবের মত ফোলা, ভেসে রয়েছে পানির ওপরে, বাকি শরীর পানির নিচে। লম্বা থুতনি বালিতে ঠেকানো।

পরিশ্রমে মাল্লারা সবাই ক্লান্ত, তিন গোয়েন্দারও শরীর ভেঙে আসছে। চোখে ঘুম।

পিঁপড়ে, জোঁক আর পোকামাকড়ের ভয়ে তীরে নামল না জিবা ও তিনজন ইনডিয়ান, ক্যানূর তলায় শুয়ে নাক ডাকাতে শুরু করল।

অন্যেরা শুলো খালপাড়ের নরম বালিতে। শোয়া মাত্রই ঘুম, কিন্তু মুসা জেগে রইল। কুমিরটাকে দেখে দুষ্টবুদ্ধি মাথাচাড়া দিয়েছে তার।

<

Super User