অশরীরী মূর্তিটি ছিল ভয়ঙ্কর। ডাক্তার উরবিনো দেখলেন যে ওটা তার গৃহের শান্তির জন্য একটা বড় হুমকি। তাই তিনি ওটাকে আসতে দেখলেই দ্রুত তার স্ত্রীকে বলতেন, “এ নিয়ে একটুও ভেবো না, সোনা, দোষটা ছিল আমার।” স্ত্রীর আকস্মিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাইতে বেশি ভয় আর তিনি কোন কিছুকে পেতেন না, আর তার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে ওই সিদ্ধান্তগুলি সর্বদাই উৎসারিত হত একটা অপরাধের বোধ থেকে। কিন্তু ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে প্রত্যাখ্যান করার পর তার মধ্যে যে বিভ্রান্তি দেখা দেয় কোন সান্ত্বনাসূচক স্তোক বাক্যে তার নিরসন হয় নি। কয়েক মাস ধরে ফারমিনা ডাজা প্রতিদিন সকাল বেলা বারান্দায় এসে দাঁড়াতো, যে নিঃসঙ্গ ভূতের মতো প্রাণীটি নির্জন ছোট্ট পার্কটির মধ্যে থেকে তাকে দেখতো তার অনুপস্থিতি সে অনুভব করতো। যে গাছটি ছিল তার, অন্ধকারাচ্ছন্ন বেঞ্চে বসে তার কথা ভাবতে ভাবতে যে কবিতা পড়তো, তার অভাব সে সব সময় বোধ করতো। তখন সে জানালা বন্ধ করে দিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলতো, ‘বেচারা!’ যখন অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পক্ষে বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল তখনও, এমনকি সে যেমন ভেবেছিল ফ্লোরেন্টিনো ততখানি নাছোড়বান্দা প্রেমিক ছিল না এটা জানার পর মোহমুক্তির যন্ত্রণা ভোগ করা সত্ত্বেও, তার মন মাঝে মাঝে একটা বিলম্বিত চিঠি, যে চিঠি কখনো আসে নি, পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠতো। কিন্তু যখন তাকে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয় তখন সে একটা বড় সঙ্কটের সামনে পড়ে বশীভূত হয়ে যায়। সে উপলব্ধি করে যে কোন রকম সঙ্গত কারণ ছাড়া ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে প্রত্যাখ্যান করার পর ডাক্তারের প্রস্তাব গ্রহণের কোন সঙ্গত কারণ তার নাই। বস্তুতপক্ষে ফ্লোরেন্টিনোকে যেমন সে ভালোবাসে নি তেমনি ডাক্তারকেও সে ভালোবাসে নি। তাছাড়া ডাক্তার সম্পর্কে সে আরও অনেক কম জানতো, ডাক্তারের চিঠি ফ্লোরেন্টিনোর চিঠির মতো আবেগময় ছিল না, আর ফ্লোরেন্টিনো তার দৃঢ় সঙ্কল্পের যতগুলি প্রাণস্পর্শী প্রমাণ দিয়েছিল ডাক্তার তা দেয় নি। বস্তুতপক্ষে, জুভেনাল উরবিনো কখনোই ভালোবাসার কথা বলে বিয়ের প্রস্তাব করেন নি। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত, তাঁর মতো একজন জঙ্গি ক্যাথলিক ফারমিনা ডাজাকে যা দেয়ার প্রস্তাব করেন তা ছিল একান্ত জাগতিক বস্তু : নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, সুখ, কতিপয় নিকট সংলগ্ন সংখ্যা যার যোগফলের সঙ্গে হয়তো ভালোবাসার সাদৃশ্য আছে, যা হয়তো প্রায় ভালোবাসাই। কিন্তু সেটা ভালোবাসা ছিল না, আর এইসব সন্দেহ ফারমিনার বিভ্রান্তি আরো বাড়িয়ে তোলে, কারণ বাঁচার জন্য যে ভালোবাসাই তার সব চাইতে বেশি প্রয়োজন এ বিষয়েও সে তখনো সুনিশ্চিত হয় নি।

তবে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনের বিরুদ্ধে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল অন্য একটি জিনিস। লোরেঞ্জো ভাজা তাঁর মেয়ের জন্য যেরকম আদর্শ পুরুষ চাইছিলেন তার সঙ্গে ডাক্তারের মাত্রাতিরিক্ত সাদৃশ্য দেখা যায়। তিনি যে একটা পৈতৃক ষড়যন্ত্রের ফসল নন সেটা বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না, যদিও আসলে তিনি তা ছিলেন না। ফারমিনা ডাজা তাঁকে যেদিন তাদের বাড়িতে অনাহূত ভাবে চিকিৎসক হিসাবে এক মুহূর্তের জন্য দেখে সেদিন থেকেই তার মনে ওই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে জন্মে। শেষে, হিল্ডাব্রান্ডার সঙ্গে কথাবার্তা তাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। হিল্ডাব্রান্ডা নিজে ওই ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল, সে এখানে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করল, ভুলে গেল যে লোরেঞ্জে ডাজা সম্ভবত তার এখানে বেড়াতে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন যেন সে ডাক্তারের পক্ষে কিছু প্রভাব খাটাতে পারে। হিল্ডাব্রান্ডা যেদিন টেলিগ্রাফ আপিসে ফ্লোরেন্টিনোর সঙ্গে দেখা করতে যায় সেদিন তার সঙ্গী হতে না পারার জন্য ফারমিনা যে কী কষ্ট পেয়েছিল তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। তার ভীষণ ইচ্ছা করেছিল ওর কাছে সে তার দ্বিধাদ্বন্দ্বের কথা খুলে বলবে, তার সঙ্গে একা আলাপ করবে, তাকে ভালো করে চেনার চেষ্টা করবে, যেন তার একটা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত আরেকটা আরো গুরুতর দ্রুত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে না দেয় সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত হতে পারে : সেটা ছিল বাবার বিরুদ্ধে নিজের ব্যক্তিগত যুদ্ধে তার আত্মসমর্পণের ব্যাপার। কিন্তু তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সে সময়ে তাই করে ছিল। তার পাণি প্রার্থীর সুন্দর মুখশ্রী, কিংবা তার বিপুল ধন সম্পদ কিংবা তার যৌবনদীপ্ত খ্যাতি কিংবা তার আরও নানা গুণাবলীর কথা সে বিন্দুমাত্র বিবেচনা করে নি, বরং একটা সুযোগ তার সামনে থেকে অপসৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল, সে এখন তার একুশতম জন্মদিনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, আর নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণের জন্য ওটাই ছিল তার স্বনির্ধারিত ব্যক্তিগত সময়সীমা। ওই এক মুহূর্তই তার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যথেষ্ট ছিল, ঈশ্বর ও মানুষের বিধান যা ছিল পূর্বদৃষ্ট : যতদিন পর্যন্ত না মৃত্যু তোমাকে তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। আর তখনই তার সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব অপসৃত হয়ে যায়, তার যুক্তি-বুদ্ধি তাকে যেপথ সব চাইতে শোভন-সুন্দর বলে নির্দেশ করলো সে তা কোন রকম অনুতাপ-অনুশোচনা ছাড়াই অনুসরণ করতে সক্ষম হল। কোন অশ্রু বিসর্জন না করে সে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার স্মৃতি তার মন থেকে মুছে ফেললো, পুরোপুরি, এবং তার স্মৃতিতে সে যে জায়গা দখল করে ছিল সেখানে সে ফুটতে দিল রাশি রাশি পপি ফুল। সে শুধু একটি শেষ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, সাধারণের চাইতে গাঢ় ছিল সেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস, বললো, ‘বেচারা!’

তবে মধুচন্দ্রিমা থেকে ফিরে আসার পরই তার মধ্যে সব চাইতে ভীতিপ্রদ সন্দেহগুলি জাগতে শুরু করে। তাদের তোরঙ্গগুলি খোলা হল, আসবাবপত্রের প্যাকিং খোলা হল, এগারোটি বাক্সের জিনিসপত্র বের করা হল। ফারমিনা এইসব নিয়ে এসেছে, এবার সে মাকুই ডি কাসালডুয়েরোর প্রাক্তন প্রাসাদের মালকানী ও অধিশ্বরী হবে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথা মারাত্মক ভাবে ঝিমঝিম করে উঠলো, সে উপলব্ধি করলো যে সে একটা ভুল বাড়িতে বন্দিনী মাত্র, আরো খারাপ যা তা হল তার স্বামী বন্দি নয়। এ বাড়ি ছাড়তে তার ছ’বছর লেগে ছিল, তার জীবনের সব চাইতে খারাপ বছরগুলি। শাশুড়ি ডোনা ব্লাঙ্কার তিক্ততা, ননদদের মানসিক আলস্য ও নিস্পৃহতা, মারা পচে মরবার জন্য মঠের কোনো কুঠুরিতে যায় নি কারণ নিজেদের মধ্যেই তারা ওই কুঠুরি বয়ে নিয়ে চলতো, এই সব কিছু ফারমিনাকে চরম হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করেছিল।

ডাক্তার উরবিনো, বংশ গৌরব রক্ষায় সমর্পিত, স্ত্রীর অনুনয়-অনুরোধে কান দিলেন না, তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ঈশ্বরের প্রজ্ঞায় এবং তার স্ত্রীর নিজেকে সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেবার অপরিসীম ক্ষমতায় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এক সময়ে তার যে-মায়ের ছিল জীবনের মধ্যে আনন্দ লাভের অনন্য ক্ষমতা, যিনি সব চাইতে সন্দিগ্ধ মানুষের মধ্যেও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারতেন, সেই মায়ের অবনতি অবক্ষয় তাঁকে গভীর বেদনা দিল। তিনি ছিলেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, তার সামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় যে মানবিক অনুভূতিশীলতা দেখা যেতো না তাঁর মধ্যে তা উপস্থিত ছিল, চল্লিশ বছর ধরে তিনি তাঁর সামাজিক স্বর্গের প্রাণ ছিলেন, ছিলেন তার দেহ ও আত্মা। কিন্তু বৈধব্য তাঁকে তিক্ত করে তুলেছিল, তাঁকে দেখে মনে হত না যে তিনি সেই আগের মানুষ, এখন শিথিল, কটুভাষী, সারা দুনিয়ার শত্রু। তার অবক্ষয়ের একমাত্র সম্ভাব্য কারণ ছিল স্বামীর প্রতি গভীর তিক্ততা, যিনি কৃষ্ণাঙ্গ জনতার জন্য জেনে শুনে আত্মাহুতি দেন, যখন তার পক্ষে উপযুক্ত আত্মদান হত স্ত্রীর জন্য বেঁচে থাকা। সে যাই হোক, ফারমিনা ডাজার সুখী বিবাহ তাদের মধুচন্দ্রিমা পর্যন্তই স্থায়ী হয়। যে একমাত্র মানুষ তার চূড়ান্ত ধ্বংস প্রতিরোধে ফারমিনাকে সাহায্য করতে পারতেন তিনি তাঁর মায়ের শক্তিমত্তার সামনে ভয়ে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়েন। তার এই মরণ ফাঁদের জন্য ফারমিনা ডাজা তার নির্বোধ ননদদের নয়, তার অর্ধউন্মাদ শাশুড়িকে নয়, সে দায়ী করল তার স্বামীকে। বড় বেশি দেরিতে তার সন্দেহ হল যে লোককে সে বিয়ে করেছে তার পেশাগত কর্তৃত্ব ও জাগতিক মাধুর্যের আড়ালে তিনি আসলে একজন অতিশয় দুর্বল মানুষ, তার ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বংশগৌরবের সামাজিক গুরুভারের চাপে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ একটা হতভাগা।

ফারমিনা তার নবজাত পুত্রের কাছে আশ্রয় নিল। সে যখন অনুভব করলো যে শিশুটি তার দেহ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন তার মধ্যে একটা নিজের নয় এমন একটা জিনিস তাকে ছেড়ে গেল। তারপর ধাত্রী তার গর্ভজাত সন্তান তার সামনে তুলে ধরলো, কাঁচা, চর্বি রক্ত মাখা, নাভির ফিতা গলায় জড়ানো, তাকে দেখে তার মনে বিন্দুমাত্র স্নেহ জেগে ওঠে নি। কিন্তু বিশাল বাড়িটিতে তার নিঃসঙ্গতার মধ্যে সে ওকে চিনতে শেখে, দুজনেই দুজনকে জানতে শেখে এবং গভীর আনন্দের সঙ্গে সে আবিষ্কার করে যে নিজের ছেলেমেয়ে বলেই কেউ তাদের ভালোবাসে না; তাদের লালনপালন করার সময় যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সেজন্যই সে তাদের ভালোবাসে। তার এই দুর্ভাগ্যের সময়ে যা কিছু বা যে কাউকে সে তার ছেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারতো না তাকেই সে ঘৃণা করতো। তার নিঃসঙ্গতা, সমাধি প্রাঙ্গনের বাগান, জানালাবিহীন বিশাল ঘরগুলিতে কোন রকমে সময় কাটানো এই সব তাকে বিষণ্ণ করে রাখতো। পাশের পাগলাগারদ থেকে উন্মাদিনীদের চিৎকার ভেসে আসতো, তার মনে। হত সেও বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাত কাটতে চাইতো না। বাড়িতে এরা রোজ খাবার টেবিলে এম্ব্রয়ডারি করা টেবিল ক্লথের ওপর রুপার থালা-বাসন, কাঁটা চামচ ইত্যাদি সাড়ম্বরে সাজাতো, উপরে ঝুলতে ঝাড়বাতি, এসব দেখে তার খুব লজ্জা বোধ হত। টেবিলের চারপাশে বসে পাঁচজন ছায়ার মতো মানুষ কফি আর কেক খেতো। সন্ধ্যায় মালা জপ, খাবার টেবিলে সবার কৃত্রিম আচার-আচরণ, সে রুপার বাসন-চামচ-পাত্র কেমন করে ধরে তার নিরন্তর সমালোচনা, রাস্তার মেয়ের মতো তার হাঁটাচলা, সার্কাসের মেয়ের মতো তার কাপড়-জামা, এমনকি সে যে রকম গ্রাম্য ভঙ্গিতে স্বামীকে সম্বোধন করে আর বুকের ওপর কাপড় না টেনে দিয়ে সন্তানকে যেভাবে স্তন্যপান করায় তার নিন্দাবাদ তার মনকে ঘৃণায় পূর্ণ করে দিতো। সে যখন বিকাল পাঁচটার চা-য়ে তার প্রথম আমন্ত্রণ জানায় তখন সাম্প্রতিক বিলেতি ফ্যাশান অনুযায়ী পরিবেশিত হয় রাজকীয় ছোট ছোট কেক ও পুষ্পকৃতির মিষ্টি, তারপর বাসি পনীর, চকোলেট আর গোল গোল কাসাভা রুটির পরিবর্তে সে যখন ওই বদ্ধ বাড়িতে ঘামের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য অন্য কিছু পরিবেশন করতে চাইলো তখন ডোনা ব্লাঙ্কা তাতে আপত্তি করলেন। তার স্বপ্নকেও তিনি রেহাই দিলেন না। একদিন সকালে ফারমিনা ডাজা তার গত রাতে দেখা একটা স্বপ্নের কথা বলে, সে দেখেছে বাড়ির ঘরগুলির ভেতর দিয়ে একজন নগ্নদেহ অপরিচিত মানুষ ছাই ছিটাতে ছিটাতে হেঁটে যাচ্ছে, এটুকু বলতেই ডোনা ব্লাঙ্কা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, কোন ভদ্র মেয়ে এ ধরনের স্বপ্ন দেখে না।

সব সময় অন্য একজনের বাড়িতে বাস করছে এই অনুভূতির সঙ্গে আরো দুটি বৃহত্তর দুর্ভাগ্য যুক্ত হল। একটা হল প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বেগুন থাকতো, নানা পদের, নানা রকম রান্নার। ডোনা ব্লাঙ্কা তার মৃত স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধার কারণে এর কোন ব্যত্যয় করতে রাজি হলেন না, আর ফারমিনাও কিছুতেই বেগুন খেতে রাজি হল না। ছেলেবেলা থেকেই সে বেগুনকে ঘেন্না করতো, মুখে দিয়ে দেখার আগে থেকেই, কারণ বেগুন দেখলেই তার মনে হত ওটা বিষের রঙ। কিন্তু এখন তার মনে হল ছেলেবেলার ওই ব্যাপারটা তার পরবর্তী জীবনের জন্য ভালোই হয়েছিল। পাঁচ বছর বয়সের সময় সে যখন বেগুনের সঙ্গে বিষের রঙের কথা বলেছিল তখন তার বাবা তাকে ছ’জনের জন্য রান্না করা এক পাত্র বেগুনের তরকারি জোর করে খাইয়েছিল। তখন তার মনে হয়েছিল সে বুঝি মরে যাচ্ছে, কারণ প্রথমে সে চূর্ণ চূর্ণ বেগুন বমি করে এবং পরে ওই শাস্তির প্রতিষেধক রূপে তাকে এক পেয়ালা ক্যাস্টর অয়েল পান করতে হয়। দুটি জিনিসই তার স্মৃতিতে একটি জোলাপ হয়ে তালগোল পাকিয়ে যায়, যেমন স্বাদের জন্য তেমনি বিষের ভয়ে। এখন মার্কুই ডি কাসালডুয়েরোর প্রাসাদে খাবার টেবিলে তাকে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে হত, যেন ক্যাস্টর অয়েলের বরফশীতল বিবমিষা দিয়ে তাকে ওদের সহৃদয়তার মূল্য পরিশোধ করতে না হয়।

অন্য দুর্ভাগ্যটা ছিল একটা বীণা। একদিন, তিনি কী বোঝাতে চাইছেন সে সম্পর্কে বিশেষ সচেতন থেকে, ডোনা ব্লাঙ্কা বললেন, “যে মেয়ে পিয়ানো বাজাতে জানে না সে যে রুচিশীল এ আমি বিশ্বাস করি না।” কিন্তু তার ওই নির্দেশ তার পুত্রও মেনে নিতে পারে নি, কারণ পিয়ানো বাজানো শিখতে গিয়ে তাকে তার ছেলেবেলায় ক্রীতদাসের মতো দুঃসহ কষ্ট করতে হয়, যদিও বড়ো হয়ে তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞই হন। কিন্তু তাঁর দৃঢ়চেতা পঁচিশ বৎসর বয়সের স্ত্রীকে যে ওই শাস্তি দেয়া যেতে পারে তা তিনি কল্পনাও করতে পারলেন না। তখন তিনি একটা শিশুসুলভ যুক্তি দিয়ে মায়ের কাছ থেকে একটা ছাড় আদায় করলেন। তিনি বললেন যে বীণা হচ্ছে দেবদূতদের যন্ত্র, আর তাই পিয়ানোর জায়গায় বীণা বহাল হল। ভিয়েনা থেকে একটি বীণা আনানো হল, দেখে মনে হল যেন সোনার বীণা, ধ্বনিও নির্গত হয় সোনার মতো, এক সময় এটা নগর জাদুঘরের সব চাইতে মূল্যবান উত্তরাধিকার সূত্রেপ্রাপ্ত বস্তুগুলির অন্যতম বলে বিবেচিত হয়, পরে একটা অগ্নিকাণ্ডে জাদুঘরের সব কিছুর সঙ্গে সেটাও ভস্মীভূত হয়ে যায়। চূড়ান্ত আত্মাহুতি দানের মাধ্যমে বিপর্যয় এড়ানোর প্রয়াসে ফারমিনা ডাজা ওই বিলাসবহুল কারাদণ্ড মাথা পেতে নিয়েছিল। মোমপক্স শহর থেকে আনীত এক প্রবীণ শিক্ষককুলের শিক্ষকের কাছ থেকে সে তালিম নিতে শুরু করে, কিন্তু তিনি দু’সপ্তাহ পরে আকস্মিক মৃত্যুপথে পতিত হন। এরপর ফারমিনা কয়েক বছর ধরে বিদ্যামন্দিরের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে, যদিও তাদের গোর খোদকদের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস তার বাদনের দ্রুত লয়কে প্রায়ই বিকৃত করে তুলতো।

তার বাধ্যতায় সে নিজেই অবাক হল। আসলে যদিও সে নিজের নিভৃততম চিন্তায় কিংবা একদা স্বামীর সঙ্গে প্রেম করার সময়ে পরিচালিত নীরব তর্ক-বিতর্কের সময় কখনো স্বীকার করে নি, তবুও সে অবিশ্বাস্য দ্রুতোর সঙ্গে তার নতুন জগতের সামাজিক প্রথাসমূহ ও সংস্কারাবলীর জালে ধৃত হয়। প্রথম দিকে সে একটা আনুষ্ঠানিক উচ্চারণ দ্বারা তার নিজের চিন্তার স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করতো : “যখন হাওয়া দিচ্ছে তখন নিকুচি করি পাখার।” কিন্তু পরে, তার সযত্নে স্বোপার্জিত অধিকারগুলি সংরক্ষণের স্বার্থে এবং অন্যদের তাচ্ছিল্য কিংবা তাদের সামনে অপ্রস্তুত হওয়া থেকে রক্ষা পাবার জন্য সে নানা অপমান-অবহেলাও স্বেচ্ছায় মেনে নেয়, সে আশা করে যে ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত ডোনা ব্লাঙ্কাকে করুণা করবেন, তিনি সারাক্ষণ তার কাছে যে মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করেন ঈশ্বর তার সে প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন।

ডাক্তার উরবিনো তাঁর নিজের দুর্বলতার সমর্থনে নানা রাশভারি যুক্তির অবতারণা করতেন, সেগুলি চার্চের বিধানের পরপন্থী কিনা সে সম্পর্কেও তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতেন না। স্ত্রীর সঙ্গে তার অসুবিধার মূলে যে এই গৃহের অতিপরিশ্রুত হাওয়া তা তিনি মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি বরং তার দায়দায়িত্ব চাপাতেন বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতির মধ্যে। দুটি মানুষ যারা পরস্পরকে প্রায় চেনেই না, যাদের মধ্যে কোন যোগসূত্র নেই, যাদের চরিত্র আলাদা, বড় হবার পরিবেশ ভিন্ন। রকম, এমনকি যাদের লিঙ্গ পর্যন্ত ভিন্ন, হঠাৎ তাদের একসঙ্গে ঘুমাতে হবে, তাদের অংশ নিতে হবে দুটি নিয়তিতে, ভাগ্য যেখানে সে-দুটিকে পরস্পরের উল্টো দিকে পরিচালিত করছে এটা সফল হবার কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি নাই। তিনি বলতেন, “বিয়ের সমস্যা হল প্রতি রাতে যৌন মিলনের পর তা শেষ হয়, তারপর প্রতি প্রভাতে প্রাতরাশের পূর্বে তাকে পুনর্নির্মিত করতেই হয়।” সব চাইতে ভয়ানক হল তাদের বিয়ে, যেখানে তারা দুজন উঠে এসেছে পরস্পরবিরোধী দুটি শ্রেণী থেকে, তার ওপর সেই শহরে যা এখনো ভাইসরয়দের প্রত্যাগমনের স্বপ্ন দেখে। তাদের একমাত্র বন্ধন হতে পারতো প্রেমের মতো অসম্ভব ও ভঙ্গুর একটা জিনিস, যদি তেমন কিছু থেকে থাকে, আর তাদের ক্ষেত্রে তারা যখন বিয়ে করে তখন তেমন কিছু ছিল না, আর তারা যখন সেটা আবিষ্কারের দোরগোড়ায় তখন নিয়তি তাদেরকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবার চাইতে আর বেশি কিছু করলো না।

বীণা পর্বের সময় তাই ছিল তাদের জীবনের অবস্থা। এক এক সময় আকস্মিক মধুর যুগপৎ সংঘটন ঘটতো, ডাক্তার স্নান করছেন আর সে হঠাৎ বাথরুমে আসতো, বিষাক্ত বেগুন ও তার মাথাখারাপ বোনদের এবং যে-মা তাদের জন্ম দিয়েছেন সেই মা-র নানা যুক্তিতর্ক সত্ত্বেও, ডাক্তারের মধ্যে তখনো যেটুকু ভালোবাসা ছিল তার জোরেই তিনি ওকে তার গায়ে সাবান ঘষে দিতে বলতেন। ইউরোপে তার মনে যে ভালোবাসা জন্মেছিল তার অবশিষ্ট যৎসামান্য যা ছিল তাই দিয়ে সে সাবান ঘষতো, উভয়েই স্মৃতিকে প্রশ্রয় দিতেন, ইচ্ছা না করেও কোমল হতেন, মুখে কিছু না বলেও পরস্পরকে কামনা করতেন, অবশেষে সুগন্ধি সাবানের ফেনার মধ্যে মেঝের উপরেই সঙ্গমে লিপ্ত হতেন, আর কাপড় কাঁচার ঘর থেকে দাসীদের কথা তাদের কানে ভেসে আসতো : “ওদের যে আর ছেলেপুলে হচ্ছে না তার কারণ একটাই, ওরা এখন সহবাস করছে না।“ মাঝে মাঝে কোনো উদ্দাম উৎসব শেষে তারা যখন বাড়ি ফিরে আসতেন তখন দরজার ওপাশে হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকা স্মৃতিবিধুরতা তার এক থাবার আঘাতে তাদের ধরাশায়ী করতো, আর তখন একটা অত্যাশ্চার্য বিস্ফোরণ ঘটতো, আর তখন তারা আবার তাদের মধুচন্দ্রিমার অনবদমিত প্রেমিক-প্রেমিকায় রূপান্তরিত হতেন।

কিন্তু ওই বিরল সময়গুলি ছাড়া বিছানায় যাবার সময় হলেই ওদের দুজনের একজন অপর জনের চাইতে বেশি ক্লান্ত বোধ করতো। ফারমিনা ডাজা বাথরুমে, কিছুই না করে, অনেকক্ষণ কাটাতো, তার সুরভিত কাগজে মুড়ে সিগারেট বানিয়ে চুপচাপ ধূমপান করতো, নিজের বাড়িতে স্বাধীন ও কিশোরী অবস্থায় যে রকম সান্ত্বনাদায়ক ভালোবাসায় ডুবে থাকতো সে রকম অনুভূতি জাগিয়ে তুলতো নিজের মধ্যে, তার নিজের দেহের সে-ই কত্রী তখন। তা না হলে তার মাথা ধরেছে, কিংবা ভীষণ গরম, কিংবা ঘুমের ভান করতো সে, কিংবা তার আবার মাসিক হয়েছে, মাসিক আর মাসিক, সব সময়েই মাসিক এত বেশি যে স্বীকারোক্তি ছাড়াই নিজেকে ভারমুক্ত করে স্বস্তি লাভের উদ্দেশ্যে তিনি একদিন ক্লাসে সাহস করে বলেই ফেলেন যে দশ বছর বিবাহিত জীবনযাপনের পর মেয়েদের এক সপ্তাহে তিনবার পর্যন্ত ঋতুস্রাব হতে পারে।

দুর্ভাগ্যের পর দুর্ভাগ্য জমতে থাকে। ওই ভীষণ খারাপ বছরগুলিতে ফারমিনা ডাজাকে আরেকটা ব্যাপারের মুখোমুখি হতে হয়, আগে হোক বা পরে হোক যা তাকে হতেই হতো। তার পিতার অবিশ্বাস্য ও সর্বদাই রহস্যময় কাজ কারবারের পিছনে আসল সত্যটা কি? প্রাদেশিক গভর্নর একদিন আগে খবর দিয়ে ডাক্তার জুভেনালে উরবিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ও তাকে তার শ্বশুরের বাড়াবাড়ির কথা জানান। একটি বাক্যে তিনি তার সারটি তুলে ধরেন, মানুষের বা ঈশ্বরের এমন কোন আইন নেই যে ওই লোক লঙ্ঘন করে নি।” তার বেশ কিছু গুরুতর কাজ পরিচালিত হয়েছে তাঁর জামাতার মর্যাদা ও সুনামের ছত্রছায়ায়, তিনি বা তার স্ত্রী এসব বিষয়ের কিছুই জানতেন না এটা বিশ্বাস করা কঠিন। ডাক্তার উপলব্ধি করলেন যে এখন যে একমাত্র সম্মান রক্ষা করা দরকার সেটা তার নিজের, কারণ এখনও একমাত্র সেটাই অক্ষুণ্ণ আছে, তাই তিনি তাঁর মর্যাদা ও সুনামের সবটুকু ওজন নিয়ে ব্যাপারটাতে হস্তক্ষেপ করলেন, এবং তাঁর নিজের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে কেলেঙ্কারিটা চাপা দিতে সক্ষম হলেন। প্রথম জাহাজেই লোরেঞ্জে ডাজা এদেশ ছেড়ে চলে গেলেন, আর কখনো তিনি ফিরে আসেন নি। তিনি তার স্বদেশে এমন ভাবে ফিরে গেলেন যেন স্মৃতিবিধুরতার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য মানুষ যেমন মাঝে মাঝে বেড়াতে যায় সেই ভাবে সেখানে যাচ্ছেন। তার ওপর কোন জোর খাটাতে হয় নি। তিনি অবশ্য বার বার বলেছেন যে তিনি নির্দোষ, তার জামাতাকে বিশ্বাস করাতে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, বলেছেন যে তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। মেয়ের জন্য তিনি অশ্রু বিসর্জন করতে করতে বিদায় নেন, তাঁর নাতির জন্য কাঁদেন তিনি, সেই দেশটির জন্যও কাঁদেন যেখানে সন্দেহজনক কাজকর্মের মাধ্যমে তিনি স্বাধীন ও ধনী হন, ক্ষমতাশালী হন এবং বিত্ত ও ক্ষমতার সাহায্যে তার কন্যাকে এক চমৎকার সম্ভ্রান্ত মহিলা করে তোলেন। বুড়ো হয়ে অসুস্থ অবস্থায় তিনি বিদায় নেন, কিন্তু তারপরও তিনি অনেক দিন বেঁচে ছিলেন, তার কুকীর্তির শিকাররা যা আশা করেছিল তার চাইতেও অনেক বেশি দিন। ফারমিনা ডাজা যখন তাঁর মৃত্যু সংবাদ পায় তখন। সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস চাপতে পারে নি, প্রশ্ন এড়াবার জন্য সে কোন রকম শোকের পোশাক পরে নি, কিন্তু বেশ ক’মাস পর্যন্ত সে বাথরুমের দরজা তালাবদ্ধ করে নির্বাক ক্ষোভে প্রচুর কেঁদেছে, নিঃশব্দে ধূমপান করেছে, কেন সে জানে না, যদিও আসলে সে অশ্রু বিসর্জন করেছে তার কথা মনে করে।

ফারমিনা ও ডাক্তারের তখনকার অবস্থার সব চাইতে উদ্ভট দিক ছিল এই যে তাদের সর্বাপেক্ষা যন্ত্রণাদায়ক ওই সময়ে জনসমক্ষে তাদের দেখে মনে হত এমন সুখী তারা আর কখনো হয় নি। কারণ তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক পরিবেশের যে গোপন বৈরী ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল, ওই সমাজ তাদের মেনে নিতে পারছিল না, তারা ভিন্ন রকম, তারা আধুনিক, তারা ঐতিহ্যকে লঙ্ঘন করছে, ওই বৈরিতার বিরুদ্ধে ডাক্তার ও ফারমিনা এই সময়েই তাদের সব চাইতে বড় বিজয়গুলি অর্জন করছিলেন। ফারমিনা ডাজার পক্ষে এটা বেশ সহজ ছিল। তার নতুন জগতের জীবনে, অপরিচয়জনিত অনিশ্চয়তা কেটে যাবার পর, সে দেখলো যে তুচ্ছ আচার-অনুষ্ঠান ও বাধাধরা গতানুগতিক কথাবার্তার একটা অধিসঞ্চারী সিস্টেম ছাড়া ওটা আর কিছুই নয়, ওই সব দিয়ে এই সমাজে ওরা একে অন্যকে আনন্দ দেয় যেন একে অন্যকে তাদের খুন করতে না হয়। প্রাদেশিক ওই লঘুচিত্ততার প্রধান লক্ষণ ছিল অজানার ভীতি। ফারমিনা আরো সরল ভাবে ব্যাপারটা সংজ্ঞায়িত করে : “জনজীবনের সমস্যা হল আতঙ্ক জয় করার শিক্ষালাভ করা, আর বিবাহিত জীবনের সমস্যা হল একঘেয়েমি জয় করার শিক্ষালাভ করা।” একটা অলৌকিক প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে সে অকস্মাৎ এই সত্যটি আবিষ্কার করে। সোশ্যাল ক্লাবের বিশাল সালোতে প্রবেশ করছিল সে, তার নববধূর দীর্ঘ পোশাকের পিছনের অংশ মাটিতে লুটাচ্ছে, ঘরের ভেতর অজস্র ফুলের মিশ্র গন্ধে বাতাস হাল্কা, সেখানে ওয়ালটজের ঔজ্জ্বল্য, ঘর্মাক্ত কলেবর, ভদ্রলোকদের হৈ চৈ, কেঁপে কেঁপে ওঠা রমণীরা তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, বাইরের জগত থেকে এই যে ঝলমলে হুমকি তাদের মধ্যে এসে পড়লো কোন মন্ত্র দ্বারা তারা এটা দূরীভূত করবে সেকথা ভাবছে, আর তখনই সত্যটা ফারমিনার চোখে ধরা পড়ে। সবে মাত্র তার একুশ বছর পূর্ণ হয়েছে, স্কুলে যাওয়া ছাড়া বাড়ির বাইরে যায় নি বললেই চলে, কিন্তু চারদিকে এক নজর তাকিয়েই সে বুঝলো যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার প্রতি ঘৃণায় আলোড়িত নয়, তারা ভয়ে হতবুদ্ধি ও জড়তাপ্রাপ্ত। ওদের আরো বেশি ভয় পাইয়ে দেবার পরিবর্তে, যা সে ইতিমধ্যেই করছিল, সে ওদের প্রতি অনুকম্পা বশত নিজেকে চিনতে ওদের শেখাতে চাইলো। সে ওদের যেমন চেয়েছে ওরা তার চাইতে ভিন্ন রকম কিছু ছিল না, ঠিক শহরগুলির মতোই, ভালোও নয় খারাপও নয়, মনের মধ্যে সে এগুলি যেমন বানিয়ে নিয়েছে ঠিক তেমনই।

বিরতিহীন বৃষ্টি, বাজে ব্যবসায়ী, ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ানদের হোমারীয় স্থূলতা সত্ত্বেও সে পারীকে মনে রাখবে পৃথিবীর সব চাইতে নগরী নারী রূপে, সেটা কি ছিল বা ছিল না সেজন্য নয়, এই জন্য যে সেটা ছিল তার সব চাইতে সুখী সময়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। আর ডাক্তার উরবিনো তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ওদের অস্ত্র দিয়েই ওদের শ্রদ্ধা আদায় করে নিতেন, শুধু তিনি ওই সব অস্ত্র প্রয়োগ করতেন অধিকতর বুদ্ধিমত্তা ও খুব হিসেব করা গাম্ভীর্যের সঙ্গে। এই দম্পতি ছাড়া এখানে কিছুই হত না। নাগরিক প্রদর্শনী, কবিতা উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোন পরহিতকর কাজের জন্য। লটারির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, দেশপ্রেমমূলক অনুষ্ঠান, প্রথম বেলুনে ভ্রমণ- ওঁদের ছাড়া কিছুই হত না। সব উদ্যোগেই প্রায় সব সময়ই ওঁরাই ছিলেন গোড়া থেকে এবং সর্বাগ্রে। ওই দুর্ভাগ্যপীড়িত সময়ে কেউই তাঁদের চাইতে বেশি সুখী কাউকে কল্পনা করতে পারতো না, তাদের চাইতে বেশি মধুর মিল বিশিষ্ট কোন বিয়ে হতে পারে বলে তারা মনে করতো না।

পারিবারিক প্রাসাদের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে ফারমিনা ডাজা স্বস্তির আশ্রয় পেতো তার নিজের বাড়িতে, যে বাড়ি তার বাবা তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। লোকজনের দৃষ্টি থেকে পালাতে পারলেই সে সংগোপনে ইভাঞ্জেল পার্কে চলে যেতো, কিছু নতুন বন্ধু ও তার স্কুল ও ছবি আঁকার সময়ের পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতো : বিশ্বাসভঙ্গের একটা নিষ্পাপ বিকল্প। একক মা হিসাবে সে ঝঞ্ঝাটবিহীন প্রশান্ত সময়। কাটাতো ওই বাড়িতে, তার বালিকা বয়সের যে সব স্মৃতি তখনো অবশিষ্ট ছিল তাকে সে নিজের চারপাশে জড়িয়ে রাখতো। সুরভিত কাকের বদলে সে রাস্তার বিড়াল তুলে এনে গালা প্রসিডিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পণ করলো। গালা প্লাসিডিয়া বুড়ো হয়ে গেছে, বাতের আক্রমণে আগের মতো দ্রুত নড়াচড়া করতে পারে না, তবু বাড়িটাতে আবার জীবনের স্পন্দন ফিরিয়ে আনতে সে ছিল তৎপর ও ইচ্ছুক। যে সেলাই ঘরে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ফারমিনা ডাজাকে প্রথম দেখে, যেখানে ডাক্তার উরবিনোর নির্দেশে তাকে তার জিভ বের করে দেখাতে হয় যেন তিনি সেখানে তার হৃদয়ের লেখা পড়তে পারেন, ফারমিনা ডাজা সে ঘর খুলে দেয়, সে তাকে রূপান্তরিত করে অতীতের এক পবিত্র পীঠস্থানে। একদিন শীতের এক অপরাহ্নে প্রবল ঝড় আসার উপক্রম হলে সে বারান্দার জানালা বন্ধ করতে গেলে ছোট্ট পার্কের বাদাম গাছের নিচে তার বেঞ্চে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে বসে থাকতে দেখতে পায়, সে তার বাবার স্যুট পরে আছে, গায়ে ঠিক হবার জন্য সেটা বদল করা হয়েছে, কোলের ওপর তার বইটি খোলা অবস্থায় ধরা, কিন্তু ফারমিনা বিভিন্ন সময়ে ঘটনাচক্রে তাকে যে রকম দেখেছিল এখন তাকে সে রকম দেখলো না, তার স্মৃতিতে ফ্লোরেন্টিনোর যে ছবি আঁকা ছিল তার ওই বয়সের রূপটিই সে দেখলো। তার মনে হল স্বপ্নের মতো ওই ছবি বোধ হয় মৃত্যুর অশুভ সঙ্কেত। তার হৃদয় শোকে বিহ্বল হল। সে সাহস করে নিজেকে বললো, বোধ হয় ওর সঙ্গেই সে বেশি সুখী হত, তাকে ভালোবেসে, তার জন্য, সে ওর নিজের যে বাড়ির সংস্কার করেছিল ওকে নিয়ে সে একা ওই বাড়িতেই আসল সুখের সন্ধান পেতো, আর এই সরল উপপ্রমেয়টি তাকে হতাশায় নিমজ্জিত করলো, কারণ সে যে কী চরম অসুখী তা সে এর মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করলো। তখন সে তার শক্তির শেষ বিন্দু জড়ো করে তার স্বামীকে, কোন রকম পাশ না কাটিয়ে, সরাসরি, তার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করলো, তার মুখোমুখি হয়ে তার সঙ্গে তর্ক করতে বাধ্য করলো, যে-স্বর্গ। সে হারিয়েছে তার জন্য সে ক্ষুব্ধ ক্রুদ্ধ চিত্তে অশ্রু বিসর্জন করলো, শেষ মোরগের ডাক পর্যন্ত এসব চলতে থাকলো, তারপর এক সময় তাদের রাজকীয় ভবনের লেস-এর পর্দার ভেতর দিয়ে প্রভাতের আলো ঘরে ঢুকলো, সূর্য উঠলো, তার স্বামী এতো কথার ভারে, অনিদ্রায় চরম ক্লান্ত হয়ে, স্ত্রীর অঝোর চোখের জল থেকে শক্তি সংগ্রহ করে তাঁর জুতার ফিতা বাঁধলেন, কোমরের বেল্ট আঁট করলেন, তাঁর পৌরুষের যেটুকু তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল তা নিজের মধ্যে সংহত করে নিলেন, তারপর স্ত্রীকে বললেন, হ্যাঁ, প্রিয়ে, আমরা ইউরোপে যে ভালোবাসা হারিয়ে রেখে এসেছিলাম আবার আমরা দুজনে মিলে তার খোঁজ করবো, আগামীকাল থেকেই সেটা শুরু হবে এবং সেটা চলবে অনাদিকাল পর্যন্ত। তার সিদ্ধান্ত এতই প্রবল ছিল যে তিনি তার যাবতীয় সম্পত্তির ব্যবস্থাপক ট্রেজারি ব্যাংকের সঙ্গে স্থির করে নিলেন, ওরা অবিলম্বে তাঁর বিশাল পারিবারিক সম্পদের হিসাব মিটিয়ে দেবে, শুরু থেকেই যা ছিল ছড়ানো-ছিটানো, বিভিন্ন ব্যবসায়ে, বিনিয়োগে, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, নানা চুক্তিতে, লোককাহিনীতে যা যতোটা বিশলি বিবেচনা করা হত তিনি জানতেন যে তা আসলে তত বিশাল নয়, তবুও এত বিশাল যে তা নিয়ে ভাবনার কোন দরকার পড়ে না। তিনি তাঁর সব সম্পদ সিলমোহর করা সোনায় রূপান্তরিত করলেন, অল্প অল্প করে তিনি তা তার বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগ করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তার ও তার স্ত্রীর এই রূঢ় নিষ্ঠুর দেশে নিজের বলতে আর কিছুই থাকবে না, এমনকি কবর দেয়ার জন্য এক টুকরা জমিও না।

ওদিকে ফারমিনা ডাজা যাই বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নিক না কেন ফ্লোরেন্টিনোর অস্তিত্ব যথার্থই বিদ্যমান ছিল। ফারমিনাদের ফরাসি সামুদ্রিক জাহাজ যখন যাত্রার জন্য বন্দরে দাঁড়িয়েছিল তখন সে জাহাজ ঘাটে উপস্থিত ছিল, স্বামী-পুত্রসহ সোনালি রঙের ঘোড়াটানা গাড়িতে সে তাকে উঠতে দেখে, সেখান থেকে নামতে দেখে, বিভিন্ন সর্বজনীন উৎসব-অনুষ্ঠানে যেমন সে বহুবার দেখেছে ঠিক তেমনি একেবারে নিখুঁত। ওরা ওদের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিল, বড় হয়ে সে কেমন হবে এখনই তার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল, সে হয়েও ছিল তাই। জুভেনাল উরবিনো তার মাথার টুপি উঁচু করে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বলেছিলেন, ফ্ল্যান্ডার্স জয় করতে চলোম আমরা। ফারমিনা ডাজা তার মাথা নেড়েছিল, আর ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার টুপি খুলে মাথা ঈষৎ নুইয়ে প্রত্যাভিবাদন জানিয়েছিল। অকালে যে তার মাথায় টাকের আক্রমণ হচ্ছে তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুকম্পা বোধ না করে ফারমিনা ডাজা তাকে লক্ষ করেছিল। ওই যে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সে সর্বদা যেমন দেখেছে ঠিক তেমনি, কখনোই দেখে নি এমন একজনের ছায়া মাত্র।

ফ্লোরেন্টিনো আরিজার জন্যও এই সময়টা তার সর্বোত্তম সময়ের একটি ছিল না। তার কাজের চাপ দিন দিন বাড়ছিল, তীব্র হচ্ছিল, গোপন শিকার পর্বের মধ্যে একটা একঘেয়েমি দেখা যাচ্ছিল, সময় কাটছিল নিস্তরঙ্গ নিপ্রাণতার মধ্যে, আর এর মধ্যে দেখা দিল ট্রান্সিটো আরিজার চূড়ান্ত সঙ্কট, সম্পূর্ণ স্মৃতিবিস্মৃত, একেবারে ফাঁকা, ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে তিনি ফ্লোরেন্টিনো আরিজা সব সময় যে আরাম কেদারায় বসে কাগজ বা বই পড়তো সে দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে বলে উঠতেন, তুমি কার ছেলে গো?’ ফ্লোরেন্টিনো সব সময় সত্য উত্তরটিই দিতো কিন্তু তিনি ওকে বাধা দিয়ে বিন্দুমাত্র দেরি না করে আবার বলতেন, “এবার একটা কথা বলো দেখি, বাছা, আমি কে?”।

ভীষণ মোটা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, প্রায় নড়তেই পারতেন না, সারাটা সময় কাটাতেন টুকিটাকির দোকানে, যদিও বিক্রি করাবার মতো সেখানে আর কিছুই ছিল না। সকালে মোরগের প্রথম ডাকের সঙ্গে তিনি উঠে পড়তেন, সাজগোজ করতেন, পরের দিন ভোর না হওয়া পর্যন্ত তিনি এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, রাতে তিনি ঘুমাতেন না বললেই চলে। মাথায় ফুলের মালা জড়িয়ে, ঠোঁটে রঙ লাগিয়ে, মুখে আর বাহুতে পাউডার মেখে যার সঙ্গে তার দেখা হত তাকেই জিজ্ঞাসা করতেন, “এখন বলো তো আমি কে?” প্রতিবেশীরা জানতো যে তিনি সর্বদা একটি উত্তরই প্রত্যাশা করতেন, “আপনি হচ্ছেন ছোট্ট রোশি মার্টিনেজ।” ছোটদের গল্পের বই থেকে এই চরিত্রটি তিনি চুরি করেছিলেন এবং শুধু ওই উত্তরেই তিনি সন্তুষ্ট হতেন। তিনি চেয়ারে বসে দুলতেন, লম্বা গোলাপি পালকের পাখা দিয়ে হাওয়া খেতেন, তারপর এক সময় আবার গোড়া থেকে শুরু করতেন : মাথায় কাগজের ফুলের মালা, চোখের পাতায় বেগুনি রঙ, ঠোঁটে লাল, মুখে মড়ার মতো সাদা রঙ, তারপর যাকে কাছে পেতেন তাকেই জিজ্ঞাসা করতেন, “এখন আমি কে?” তিনি যখন পাড়ার সার্বক্ষণিক হাস্যকৌতুকের পাত্র হয়ে উঠলেন তখন এক রাতে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা পুরনো। টুকিটাকি দোকনটার কাউন্টার ও জিনিসপত্র রাখার দেরাজগুলি টুকরা টুকরা করে খুলে ফেললো, রাস্তার দিকের দরজাটা পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে দিল, তারপর যে জায়গাটা পাওয়া গেল সেখানে মাকে রোশি মার্টিনেজের শোবার ঘরের যে বর্ণনা দিতে সে শুনেছে সে-বর্ণনা অনুযায়ী একটা ঘর সাজিয়ে দিল। এর পর থেকে তিনি আর কখনো জিজ্ঞাসা করেন নি তিনি কে।

কাকা দ্বাদশ লিওর পরামর্শে মায়ের দেখাশোনার জন্য ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এক বয়স্কা মহিলাকে নিযুক্ত করে, কিন্তু ও বেচারী জেগে থাকার চাইতে বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটাতো, তা ছাড়া মাঝে মাঝে মনে হতো সে যে কে তা বোধ হয় সেও ভুলে গেছে। ফলে অফিস থেকে ফিরে মাকে ঘুম না পাড়ানো পর্যন্ত সে বাড়িতেই থাকতে লাগলো। কমার্শিয়াল ক্লাবে সে আর ডোমিনো খেলতে যেতো না। যে সব মেয়ে বন্ধুদের ওখানে যেতে তাদের কাছেও অনেক দিন ধরে আর যায় না। কারণ, অলিম্পিয়া জ্বলেটার সঙ্গে তার ভয়ঙ্কর সাক্ষাতের পর তার মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন ঘটে।

তার মনে হল সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা সেদিন কাকা দ্বাদশ লিওকে সবেমাত্র বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। অক্টোবর মাস, ভীষণ ঝড় শুরু হল, যে রকম ঝড় মাথা ঘুরিয়ে দেয়। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার গাড়ির ভেতর থেকে একটি খুব চটপটে ক্ষীণাঙ্গী মেয়েকে দেখলো, তার পরনে কুচি দেয়া অরগাঞ্জার পোশাক, নববধূর গাউনের মতো। মেয়েটি ভীষণ ভয় পেয়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে ছুটে যাচ্ছে, হাওয়া ওর ছাতা উড়িয়ে নিয়ে গেছে, ওটা ছুটে চলেছে সমুদ্রের দিকে। সে মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে নিজের পথ ছেড়ে ঘুরে গিয়ে তাকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিল। ওদের বাড়িটা ছিল একটা পুরনো রূপান্তরিত আশ্রম। সামনেই সমুদ্র, রাস্তা থেকে বারান্দাটা দেখা যায়, সেখানে অনেকগুলি পায়রার খাঁচা। পথে আসতে আসতে ও ফ্লোরেন্টিনোকে জানায় যে তার বিয়ে হয়েছে এখনও এক বছর পুরো হয় নি, স্বামী বাজারে ছোট ছোট মনোহারী সামগ্রী বিক্রি করে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তাকে তার কোম্পানির জাহাজে অনেকবার দেখেছে, বিক্রির জন্য নানা জিনিসপাতি বোঝাই বাক্স জাহাজ থেকে নামাচ্ছে, আর বেতের একটা ঝুড়িতে এক গাদা পায়রা। নৌযানে চলাচলের সময় অনেক মা তাদের বাচ্চাদের বহন করার জন্য ওই রকম ঝুড়ি ব্যবহার করে। অলিম্পিয়া জ্বলেটাকে দেখে মনে হল সে বোলতা গোত্রভুক্ত, শুধু তার উঁচু নিতম্ব ও ক্ষুদ্র বক্ষের জন্যই নয়, তার তামার তারের মতো চুল, মুখের দাগ, গোল গোল প্রাণবন্ত সাধারণের চাইতে বেশি দূরত্বে স্থাপিত দুটি চোখ, তার সুরেলা কণ্ঠস্বর, সব কিছুই ছিল বোলতার মতো। আর তার ওই সুরেলা গলার কথাবার্তা ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও মজাদার। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে হল সে যতখানি আকর্ষণীয় তার চাইতে বেশি রসালো। ওকে তার বাড়িতে নামিয়ে দেবার পর পরই ফ্লোরেন্টিনো তার কথা ভুলে যায়। তার বাড়িতে সে বাস করতো তার স্বামী, স্বামীর বাবা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে।

কয়েক দিন পর ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ওর স্বামীকে বন্দরে দেখতে পায়, মাল নামাবার পরিবর্তে সে তখন জাহাজে মাল তুলছিলো, জাহাজ নোঙর ওঠাবার সঙ্গে সঙ্গে সে তার কানে অত্যন্ত স্পষ্ট শয়তানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো। সে দিন অপরাহ্নে, কাকা দ্বাদশ লিওকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সে যেন দৈবযোগে অলিম্পিয়া জ্বলেটার বাসভবনের সামনে দিয়ে গেল। সে তাকে দেখতে পেলো বেড়ার ওপাশে, কলকল করা পায়রাগুলিকে খাওয়াচ্ছে। গাড়ি থেকেই ফ্লোরেন্টিনো তাকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞাসা করলো, “কত দাম একটা পায়রার?” ও তাকে চিনতে পারলো, হাসিমাখা গলায় উত্তর দিলো, “এগুলি বিক্রির জন্য নয়।” ফ্লোরেন্টিনো বললো, “তা হলে একটা পেতে হলে আমাকে কি করতে হবে?” পায়রাগুলিকে খাওয়াতে খাওয়াতেই ও জবাব দিল, “হারিয়ে যাওয়া ওকে ঝড়ের মধ্যে পেলে তাকে গাড়ি করে তার খাঁচায় ফিরিয়ে দিতে হবে আপনাকে।” সেদিন ফ্লোরেন্টিনো বাড়িতে ফিরে এলো অলিম্পিয়ায় কাছ থেকে একটা ধন্যবাদ-উপহার নিয়ে : একটা পত্রবাহক পায়রা, পায়ে ধাতুর আংটি পরানো।

পরের দিন বিকালে, ঠিক রাতের খাবার সময়, পায়রা-প্রেমিক উপহার দেয়া পত্রবাহক পায়রাটিকে তার খোপের কাছে দেখতে পেলো। সে প্রথমে ভেবেছিলো ওটা বুঝি পালিয়ে এসেছে, কিন্তু পরে আংটির মধ্যে এক টুকরা কাগজ দেখলো সে, ভালোবাসার ঘোষণা। এই প্রথম ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এসব কাজের একটা লিখিত চিহ্ন রাখলো, তবে নাম সই না করার মতো বিবেচনা বোধ সে দেখিয়েছিল। পর দিন বিকালে সে যখন বাড়িতে ঢুকছিল, সেটা ছিল বুধবার, একটা রাস্তার ছেলে খাঁচায় পোরা আগের পায়রাটি তার হাতে দিয়ে তাকে একটা মুখস্থ করা বার্তা দিল, পায়রা মহিলা আপনাকে এটা পাঠাচ্ছেন, পায়রাটা যেন আবার পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য তিনি আপনাকে খাঁচা তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেছেন, তিনি শেষ বারের মতো এটা ফেরত পাঠাচ্ছেন আর পাঠাবেন না। এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ফ্লোরেন্টিনো ভেবে পেলো না : হয় পায়রাটা তার ওড়ার পথে চিঠি হারিয়ে ফেলেছে, নয় তো পায়রার মালিক সাধু সেজে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিংবা ও পায়রাটা তার কাছে পাঠিয়েছে সে যেন আবার ওটা ওকে ফেরৎ পাঠাতে পারে। তবে পায়রার সঙ্গে একটা উত্তর পাঠালে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হতো।

অনেক চিন্তা ভাবনার পর শনিবার সকালে আরেকটা সইবিহীন চিঠি দিয়ে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আবার পায়রাটা ফেরত পাঠালো। এবার তাকে পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল না। সেদিন বিকালে ওই একই বালক আরেকটা আঁচায় করে পায়রাটা ফেরত নিয়ে এলো, সঙ্গে আনলো একটা বার্তা, পায়রাটা আবার পালিয়ে গিয়েছিল তাই তিনি এবারও ওটা ফেরত পাঠাচ্ছেন, পরশু সেটা ফেরত দিয়েছেন করুণার বশবর্তী হয়ে, কিন্তু আরেকবার যদি ওটা পালিয়ে যায়-তা হলে সত্যিই তিনি আর ওটা ফেরত পাঠাবেন না। ট্রান্সিটো আরিজা অনেক রাত পর্যন্ত পায়রাটাকে নিয়ে খেলা করেন, খাঁচা থেকে ওটাকে বের করে বুকের কাছে ধরে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে ওকে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করেন, আর তখন ফ্লোরেন্টিনো আরিজা লক্ষ করে যে তার পায়ের আংটির মধ্যে একটা ছোট্ট কাজের টুকরা লাগানো আছে, সেখানে মাত্র একটা লাইন লেখা রয়েছে : ‘আমি কোনো বেনামী চিঠি গ্রহণ করি না।‘ ফ্লোরেন্টিনো আরিজা লেখাটা পড়লো, তার হৃদয় আনন্দে তোলপাড় করে উঠলো, যেন এটা তার প্রথম অভিযানের চূড়ান্ত সার্থক পরিণতি। সে রাতে ফ্লোরেন্টিনো এক ফোঁটা ঘুমালো না, অধৈর্য হয়ে সারা রাত সে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। পরদিন খুব ভোরে, আপিসে যাবার আগে, সে আবার পায়রাটা ছেড়ে দিল, সঙ্গে দিল একটা প্রেমপত্র, এবার তার স্পষ্ট সইসহ। তাছাড়া সে আংটার মধ্যে গুঁজে দিল তার বাগানের সব চাইতে তাজা, সব চাইতে লাল, সব চাইতে সুগন্ধী গোলাপটা।

কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ হয় নি। তিন মাস পশ্চাদ্ধাবনের পরও পায়রা-প্রেমিক মহিলা একই উত্তর পাঠাতে থাকে : ‘আমি ওই সব মেয়েদের মতো নই। কিন্তু সে ফ্লোরেন্টিনোর বার্তা গ্রহণ করতে কখনো অস্বীকৃতি জানায় নি, আকস্মিক ঘটনাচক্রের মতো করে ফ্লোরেন্টিনো ওর সঙ্গে সাক্ষাতের যেসব ব্যবস্থা করতো তাও সে রক্ষা করতো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এখন একেবারে এক ভিন্ন মানুষ। যে-প্রেমিক কখনো তার মুখ দেখাতো না, যে লোক ভালোবাসা পাবার জন্য ছিল চরম ব্যগ্র অথচ দেবার বেলায় ভীষণ কৃপণ, যে তার কোনো প্রেয়সীর ভালোবাসার ছাপই তার হৃদয়ে কখনো পড়তে দেয় নি, যে সব সময়ই ছিল অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওঁৎ পেতে থাকা এক শিকারি- এখন সে প্রকাশ্য রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আনন্দউচ্ছল সই করা প্রেমপত্র লিখছে, দুঃসাহসিক উপহার সামগ্রী পাঠাচ্ছে, পায়রা-প্রেমিকের বাড়ির সামনে অবিবেচকের মতো রাতভর দাঁড়িয়ে থাকছে, এমন কি দুবার সে এই কাজটি করেছে যখন মহিলার স্বামী শহরের বাইরে বা বাজারে যান নি। তার একেবারে অল্প বয়সের পর এই প্রথম তার মনে হল যে প্রেমের বর্শা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে।

তাদের প্রথম সাক্ষাতের ছয় মাস পর, অবশেষে, তারা নির্জনে মিলিত হবার সুযোগ পেলো। জাহাজঘাটে একটা নৌযানে রঙ লাগানো হচ্ছিল। তার একটা ক্যাবিনে ওরা দুজন মিলিত হল। সেটা ছিল এক বিস্ময়কর অপরাই। অলিম্পিয়া জ্বলেটা এক চমকিত পায়রা-প্রেমিকের সানন্দ ভালোবাসার অনুভূতি লাভ করলো, একটা গভীর প্রশান্তিতে তার দেহ-মন ভরে যায়, দেহ সম্ভোগের চাইতে ওই প্রশান্তি সে কম উপভোগ করে নি। সে ওই শ্লথগতি প্রশান্তির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দিল। ক্যাবিনটা খুলে ফেলা হয়েছিল, অর্ধেকটা রঙ করা হয়ে গেছে। ওরা দুজন এখান থেকে একটা সুখী বিকালের স্মৃতির সঙ্গে নিয়ে যাবে তারপিন তেলের গন্ধও। একটা আকস্মিক অনুপ্রেরণায় ফ্লোরেন্টিনো আরিজা হাতের কাছে পাওয়া একটা লাল রঙের টিন খুলে তার ভেতরে নিজের তর্জনী ডুবিয়ে সুন্দরী পায়রা-প্রেমিকের তলপেটের নিম্নাংশে দক্ষিণে মুখ করা একটা রক্তের তীর এঁকে দিল, তারপর ওই রঙ দিয়েই লিখলো, এই বিল্লীটা আমার। সেদিন রাতে অলিম্পিয়া জ্বলেটা ওর স্বামীর সামনে নিজের জামা-কাপড় খুললো, তার গায়ের লেখার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল, স্বামী একটি কথাও বললো না, তার শ্বাস-প্রশ্বাসে পর্যন্ত কোন পরিবর্তন দেখা গেল না, অলিম্পিয়া যখন ওর রাত কামিজ পরছিল তখন সে বাথরুমে ঢুকে তার ক্ষুরটা নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো, তারপর এক পোচে ওর গলাটা কেটে ফেললো।

অনেক দিন পর পলাতক স্বামী যখন ধরা পড়ে শুধু তখনই ফ্লোরেন্টিনো বিষয়টা জানতে পারে। স্বামী খবরের কাগজকে তার অপরাধের কারণটা জানায়, এও বলে যে সে-ই হত্যা করেছে। তার সই করা চিঠির কথা ভেবে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা বহু বছর প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে কাটায়, খুনির কারাবাসের সময়সূচির প্রতি নজর রাখে সে, তবে তারও গলা কাটা যেতে পারে সেই ভয়ে ততটা নয়, জনসাধারণের মধ্যে তার সম্পর্কে যে কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে তার জন্যও ততটা নয়, যতটা তার বিশ্বাস ভঙ্গের কথা জেনে ফারমিনা ডাজা কি ভাববে সেই কথা চিন্তা করে।

তার অপেক্ষমান বছরগুলির একটি দিনে যে-মহিলা তার মায়ের দেখাশোনা করতো সে হঠাৎ অসময়ে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বাজারে প্রত্যাশিত সময়ের চাইতে বেশিক্ষণের জন্য আটকা পড়ে যায়। বাড়িতে এসে সে ট্রান্সিটো আরিজাকে তার দোল-চেয়ারে বসে থাকতে দেখলো, সব সময়ের মতো গালে-ঠোঁটে রঙ মাখানো, সাজসজ্জা করা, চোখ দুটি অসম্ভব উজ্জ্বল, মুখে একটা দুষ্টুমির হাসি, দু’ঘণ্টা পার হয়ে যাবার আগে তার দেখাশোনা করার মহিলা বুঝতেই পারে নি যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর অল্প আগে ট্রান্সিটো আরিজা খাটের নিচে নানা পাত্রে লুকিয়ে রাখা তাঁর সোনাদানা, মণিমুক্তা, নানা পাথর পাড়ার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দেন, ওদের বলেন যে ওরা ইচ্ছা করলে লজেন্সের মতো এগুলি খেয়ে ফেলতে পারে। সব চাইতে মূল্যবান জিনিসগুলি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তাঁকে প্রাক্তন ঈশ্বরের হাত খামারে কবর দেয়, ওটা তখনো কলেরা গোরস্থান’ নামেই পরিচিত ছিল। ফ্লোরেন্টিনো মায়ের কবরের ওপর একটা গোলাপ চারা লাগায়।

সমাধি ক্ষেত্রে কয়েকবার যাওয়ার পর ফ্লোরেন্টিনো আরিজা একদিন আবিষ্কার করলো যে তার মায়ের খুব কাছেই সমাহিত হয়েছে অলিম্পিয়া জ্বলেটা। তার কবরে কোন সামাধি ফলক নেই কিন্তু সিমেন্টের বুকে আঁকি-বুকি করে তার নাম ও তারিখ লেখা হয়েছে। ফ্লোরেন্টিনোর মনে হল ব্যাপারটা লোমহর্ষক, ওর স্বামীর একটা রক্তলোলুপ কৌতুক বিশেষ। ফ্লোরেন্টিনো তার লাগানো গোলাপ গাছে গোলাপ ফোঁটার পর, কেউ কাছে পিঠে না থাকলে অলিম্পিয়ার কবরের ওপর একটা গোলাপ রেখে দিতো, পরে মায়ের গোলাপের ঝাড় থেকে একটা শাখা কেটে নিয়ে এসে সে ওর কবরের ওপর রোপণ করে। দুটি ঝাড়ই এক সময় এত বড় হয়ে ওঠে এবং সেখানে এত ফুল ফুটতে থাকে যে ওদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে বড় কাঁচি ও বাগান পরিচর্যার অন্যান্য হাতিয়ার নিয়ে আসতে হয়। কিন্তু কাজটা তার সাধ্যের বাইরে চলে যায়। কয়েক বছর পরে গোলাপের ঝাড়গুলি বাড়তে বাড়তে জঙ্গলের মতো হয়ে অন্যান্য কবরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তখন থেকে লোকজন মহামারীর নিরলঙ্কার গোরস্থানটিকে গোলাপকুঞ্জের সমাধিক্ষেত্র বলে অভিহিত করতে থাকে। কিন্তু, জনৈক নগরপাল তার বিশেষ প্রজ্ঞায় এক রাতে সমস্ত গোলাপ ঝাড় কেটে ফেলে গোরস্থানের প্রবেশ তোরণে একটা প্রজাতন্ত্রী ফলক বসিয়ে তার নতুন নামকরণ করলেন, ‘সর্বজনীন সমাধিক্ষেত্র।‘

মায়ের মৃত্যুর পর ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আবার ক্ষ্যাপার মতো তার কাজগুলি চালিয়ে যেতে লাগলো- অফিস, তার নিয়মিত রক্ষিতাদের কাছে হিসাব করে পালাক্রমে যাওয়া, কমার্শিয়াল ক্লাবে ডমিনো খেলা, সেই একই ভালোবাসার বই-পুঁথি পড়া আর রবিবার রবিবার সমাধিক্ষেত্র পরিদর্শন করা। এটা ছিল বাঁধাধরা জীবনের হতশ্রী মরিচা, এটাকেই সে ঘৃণা ও ভয় করতা, কিন্তু এটাই তাকে নিজের বয়স সম্পর্কে সচেতনতার হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ডিসেম্বরের এক রবিবার একটা ঘটনা ঘটলো। ইতিমধ্যে কবরের বুকে গজিয়ে ওঠা গোলাপের ঝাড়ের কাছে তার বাগানের কচি হার মেনেছিল। হঠাৎ সদ্যস্থাপিত বৈদ্যুতিক তারের ওপর কয়েকটি সোয়ালো পাখি তার চোখে পড়লো, আর তখনই আকস্মিক তার খেয়াল হল মায়ের মৃত্যুর পর কত দিন পার হয়ে গেছে, অলিম্পিয়া জ্বলেটা খুন হওয়ার পর কত কাল কেটে গেছে, অন্য আরেকটা সুদূর ডিসেম্বরের এক অপরাহ্নে ফারমিনা ডাজা তাকে হ্যাঁ বলেছিল, জানিয়েছিল যে সে তাকে চিরকাল ভালোবাসবে, তার পর থেকে কতো সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত তার আচার-আচরণ দেখে মনে হত যে তার ধারণায় সময় আর সবার জন্য বয়ে যাবে কিন্তু তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে এক জায়গায়। মাত্র গত সপ্তাহে হঠাৎ রাস্তায় তার এক দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়, তার লেখা চিঠির ফলেই ওদের বিয়ে হয়েছিল, ওদের বড় ছেলে ছিল তারই ধর্মপুত্র, কিন্তু সে তাকে চিনতে পারে নি। নিজের বিব্রত অবস্থা লুকাবার জন্য সে গতানুগতিক উক্তি করলো, ‘বাপস, ও যে ইতিমধ্যে একজন পুরোদস্তুর ভদ্রলোক হয়ে গেছে! তার শরীর তাকে প্রথম সতর্ক সঙ্কেতগুলি পাঠাবার পরও সে আগের চালচলনই অব্যাহত রাখে, কারণ তার ছিল প্রায়শ অসুস্থ মানুষের লৌহকঠিন শারীরিক গঠন। ট্রান্সিটো আরিজা। বলতেন, ‘যে একমাত্র রোগে আমার ছেলে ভুগেছে তা হল কলেরা।’ তিনি অবশ্য স্মৃতিভ্রষ্ট হবার অনেক আগেই প্রেম আর কলেরার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন। তবে তিনি ভুল করেছিলেন, তার ছেলে ছয় বার ব্লেনোরহাগিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ছিল, যদিও ডাক্তারের মতে ছয় বার নয়, প্রতি বার পরাভূত হবার পর ওই একই রোগের পুনরাবির্ভাব ঘটে। তাছাড়াও তার ছিল একটা স্ফীত লিমফ গ্ল্যান্ড, চারটা আঁচিল আর কুঁচকির কাছে ছয় বার দেখা দেয়া চর্মরোগ, তবে সে বা অন্য কেউ এগুলিকে রোগ বলে মনে করতো না, এগুলি ছিল শুধু যুদ্ধের উপঢৌকন।

চল্লিশ বৎসর বয়সের সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় অস্পষ্ট ব্যথা বোধ করাতে ফ্লোরেন্টিনো ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার অনেকগুলি পরীক্ষা করাবার পর বললেন, বয়স।’ সে বাড়ি ফিরে আসে, তার মনে হল এসবের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নাই। নিজের অতীতের সঙ্গে তার একটাই সম্পর্ক-সূত্র ছিল, ফারমিনার সঙ্গে যা জড়িত একমাত্র তাই তার জীবনের হিসাব-নিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়। তাই সেদিন বৈদ্যুতিক তারের ওপর সোয়ালো পাখিগুলি দেখার পর একেবারে প্রথম দিকের স্মৃতি থেকে শুরু করে সে তার সমগ্র অতীতের একটা পর্যালোচনা করলো। তার পূর্ব-পরিকল্পনাহীন প্রেম-ভালোবাসা, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার আসনে পৌঁছবার জন্য অসংখ্য চোরাগর্ত এড়ানো, অগণিত ঘটনাবলী যা তার মধ্যে ওই তিক্ত সঙ্কল্পের জন্ম দেয় যে সব কিছু সত্ত্বেও, সকল প্রতিকূলতার মুখে, ফারমিনা ডাজা তার হবে এবং সে ফারমিনা ডাজার, এই সব কিছু সে যখন পর্যালোচনা করলো তখন সে উপলব্ধি করলো যে তার জীবন পার হয়ে যাচ্ছে, আর তার নাড়ি-নক্ষত্র পর্যন্ত কেঁপে উঠলো, বার্ধক্যের প্রথম ধাক্কাতেই যেন ধরাশায়ী না হয় সেজন্য সে গোরস্থানের দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। ‘কিন্তু কী কাণ্ড! ওসব তো ঘটেছিল ত্রিশ বছর আগে’, আতঙ্কিত হয়ে সে বলে উঠলো।

ঠিক তাই। ফারমিনা ডাজার জীবনেরও ত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে, তবে তা ছিল তার জীবনের সব চাইতে আনন্দময় ও উদ্দীপনাপূর্ণ সময়। কাসালডুয়েরো প্রাসাদের বিভীষিকাময় দিনগুলি অতীতের আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। সে বাস করছিলো লা মাঙ্গায় তার নতুন বাড়িতে, আপন নিয়তির একচ্ছত্র কত্রী, সঙ্গে তার স্বামী, তাকে যদি আবার নির্বাচন করতে বলা হত তাহলেও সে পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যে তাকেই বেছে নিতো, তার ছেলে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে মেডিক্যাল স্কুলে আছে, আর তার মেয়ে ওই বয়সে সে নিজে যেমন দেখতে ছিল হুবহু সে রকম, এত এক রকম যে মাঝে মাঝে তার মনে হত সেই বুঝি দ্বিতীয় বার জন্মগ্রহণ করেছে। প্রথম বারের দুর্ভাগ্যজনক ইউরোপ ভ্রমণের পর সে ঠিক করেছিল আর ওখানে যাবে না, কিন্তু সে এর পর আরো তিন বার ইউরোপ ভ্রমণ করে।

ঈশ্বর নিশ্চয়ই কোনো এক জনের প্রার্থনায় কর্ণপাত করেছিলেন। পারীতে দু’বছর কাটাবার পর, ফারমিনা ডাজা ও জুভেনাল উরবিনো যখন সবেমাত্র তাদের ভালোবাসার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে যা অবশিষ্ট ছিল তা খুঁজে পেতে আরম্ভ করেছিল ঠিক তখুনি দুপুর রাতে তারা একটা টেলিগ্রাম পেলো, ডোনা ব্লাঙ্কা ডি উরবিনো মারাত্মক অসুস্থ, আর প্রায় তার পরপরই আরেকটা টেলিগ্রাম এলো তার মৃত্যুসংবাদ নিয়ে। কালবিলম্ব না করে তারা প্রত্যাবর্তন করল। ফারমিনা ডাজা একটা লম্বা ঢোলা কালো পোশাক পরে জাহাজ থেকে নামলো। ওই ঢোলা পোশাকেও তার অবস্থা ঢাকা পড়ে নি। সে আবার গর্ভবতী হয়েছে। সংবাদটা একটা জনপ্রিয় গানের জন্ম দিল, যার মধ্যে বিদ্বেষপরায়ণতার চাইতে বেশি ছিল চটুল দুষ্টামি, ওই গানের ধুয়া সারা বছর ধরে শোনা যায় : ও ওখানে গিয়ে কি করে বলে তোমাদের মনে হয়, আমাদের ভুবনের এই সুন্দরী? যখনই পারী থেকে ফিরে আসে তখনই দেখা যায় জন্মদান করতে সে খুবই প্রস্তুত। গানের কথার স্থূলতা সত্ত্বেও, ডাক্তার উরবিনো যে এসব ব্যাপার খোশ মেজাজে গ্রহণ করতে পারেন তা দেখাবার জন্য তিনি বহু বছর ধরে সোশ্যাল ক্লাবে নাচের সময় ওই গানটি গাইবার অনুরোধ জানাতেন।

মারকুইস ডি কসোলডুয়েরোর অস্তিত্ব বা তাঁর বংশ মর্যাদার পরিচয়বাহী নকশা বা চিত্রের কোন প্রামাণিক লিখিত দলিল পাওয়া যায় নি। কাসালজুয়েরোর মহান প্রাসাদ বেশ শোভন মূল্যে মিউনিসিপাল ট্রেজারির কাছে বিক্রি হল, তারপর যখন এক ডাচ গবেষক এখানেই ক্রিস্টোফার কলম্বাসের প্রকৃত কবর অবস্থিত তা প্রমাণ করার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলেন, এটা ছিল এ জাতীয় পঞ্চম উদ্যোগ, তখন ওই প্রাসাদ অত্যন্ত চড়া মূল্যে আবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। ডাক্তার উরবিনোর বোনেরা কোন রকম আনুষ্ঠানিক ব্রত গ্রহণ না করে সালেসিয়ানদের মঠে নিঃসঙ্গ সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপনের জন্য চলে গেল, আর লা মাঙ্গায় নিজের নতুন বাড়ি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হবার পূর্ব পর্যন্ত ফারমিনা ডাজা বাস করতে থাকে তার বাবার পুরনো বাড়িতে। নতুন বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ হলে সে ওখানে প্রবেশ করলো দৃঢ় পদক্ষেপে, কর্তৃত্বভার নেয়ার জন্য প্রস্তুত, মধুচন্দ্রিমার সময় কেনা যেসব আসবাবপত্র তারা দেশে ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো এবং তাদের পুনর্মিলনী সফরের পর ঘর সাজাবার জন্য তারা যেসব জিনিস কিনেছিল সব সঙ্গে নিয়ে ফারমিনা তার নতুন বাড়িতে ঢুকলো, তারপর প্রথম দিন। থেকেই নানা বিচিত্র পশুপাখি দিয়ে সে তার বাড়ি পূর্ণ করে ফেলতে শুরু করে। ওদের কেনার জন্য সে নিজে আন্টিল থেকে আসা পালতোলা জাহাজে গিয়ে উঠতো। সে তার নতুন করে জিতে নেয়া স্বামীসহ, যে ছেলেকে সে শোভন সুন্দর যথাযথ ভাবে গড়ে তুলেছে সেই ছেলেসহ, তাদের প্রত্যাবর্তনের চার মাস পরে যে মেয়ের জন্ম হয় এবং তারা যার নাম রাখে ওফেলিয়া সেই মেয়েসহ তার গৃহে প্রবেশ করলো। ডাক্তার উরবিনো উপলব্ধি করলেন যে মধুচন্দ্রিমার দিনগুলিতে তিনি তাঁর স্ত্রীকে যে রকম সম্পূর্ণ অধিকার। করতে পেরেছিলেন তা আর সম্ভব হবে না, কারণ তাঁর আকাক্ষিত ভালোবাসা ও শ্রেষ্ঠ সময়টা ফারমিনা এখন দান করছে তার ছেলেমেয়েদের, তবে তারপরও যা অবশিষ্ট ছিল তা নিয়েই বাঁচার ও সুখী হবার শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেছিলেন। তারা দুজন যে সুন্দর সঙ্গতি ও সামঞ্জস্যের গভীর প্রত্যাশী ছিলেন তা একদিন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে তার চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছে গেল। তারা একটা বিশাল আনন্দঘন ভোজ সভায় যোগ দেন। পরিবেশিত একটি খাবার ফারমিনা ডাজার কাছে খুব সুস্বাদু বোধ হয়, খাবারটা কি তা সে বুঝতে পারলো না। প্রথমেই সেটা তার এতো ভালো লাগে যে সে দ্বিতীয়বার একই পরিমাণ আবার তার প্লেটে তুলে নেয়। সুশীল শিষ্টাচার যে তাকে তৃতীয় বার ওই খাবার নেয়ার অনুমতি দেয় না সেজন্য সে দুঃখিত হল, আর তখনই সে জানলো যে-অভাবিত আনন্দের সঙ্গে এই মাত্র যে খাবার সে খেয়েছে তা ছিল বেগুনের তরকারির একটা ঘাট। ফারমিনা ভালো ভাবে তার পরাজয় মেনে নেয় এবং এর পর থেকে তাদের লা মাঙ্গার বাড়িতে বেগুনের নানা রকম রান্না নিয়মিত পরিবেশিত হতে থাকে, কাসালডুয়েরোর প্রাসাদে যে রকম হত প্রায় সেই রকমই ঘন ঘন। খাদ্য তালিকায় বেগুনের অন্তর্ভুক্তি সবাই এতো উপভোগ করে যে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো তাঁর বার্ধক্যের অলস মুহূর্তগুলি মাধুর্যমণ্ডিত করার জন্য প্রায়ই জের দিয়ে বলতেন যে তার আরেকটি কন্যা সন্তান চাই, তা হলে এই গৃহের সব চাইতে প্রিয় শব্দ দিয়ে তিনি তার নাম রাখতে পারবেন : বেগুনি উরবিনো।

এই সময়েই ফারমিনা ডাজা বুঝতে পারে যে জনসাধারণের সামনে প্রকাশ্য জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবন এক রকম নয়। ব্যক্তিজীবন প্রায়শ পরিবর্তনশীল, সেখানে কোন রকম ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। ছোটদের আর বড়দের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায় সেটা নির্ধারণ করা তার পক্ষে সহজ হয় নি। শেষ পর্যন্ত সে ছোটদেরকেই প্রাধান্য দেয়, কারণ তাদের মতামত ছিল অধিকতর নির্ভরযোগ্য। ওই সময় ফারমিনা সবেমাত্র পরিপক্বতার দিকে মোড় নিয়েছে, শেষ পর্যন্ত মোহমুক্তি ঘটেছে তার, অল্প বয়সে ইভাঞ্জেলস পার্কে সে যে রকম হবার স্বপ্ন দেখেছিল সে-রকম সে কখনোই হয় নি। তার পরিবর্তে যা হয়েছে তা নিজের কাছেও স্বীকার করার সাহস তার হত না, সে হয়েছে এক মহামূল্যবান ঝলমলে দাসী। সমাজে সে হয়ে উঠেছে সব চাইতে বেশি ভালোবাসার পাত্রী, সবাই তার জন্য কিছু করতে পারলে কৃতার্ঘ বোধ করে, সবাই তাকে ভীষণ ভয়ও করে, কিন্তু অন্য সব কাজের তুলনায় নিজের গৃহের ব্যবস্থাপনায় সে ছিল অসম্ভব কঠোর ও খুঁতখুঁতে, সেখানে কোন ক্রটি সে ক্ষমা করতে না। সব সময় তার মনে হত যে স্বামী তাকে তার জীবনটা ধার দিয়েছেন। সুখের এক বিশাল সাম্রাজ্যের অবিমিশ্র সম্রাজ্ঞী সে, তার স্বামী সেটা নির্মাণ করেছেন এবং শুধু তার নিজেরই জন্য। সে জানতো যে সব কিছুর উপরে, এই পৃথিবীতে সবার চাইতে বেশি, তাকেই ভালোবাসেন তাঁর স্বামী কিন্তু সেটা তাঁর নিজের জন্য : সে নিয়োজিত আছে তার স্বামীর পূতপবিত্র সেবায়।

তাকে যদি কোনো কিছু বিরক্ত করতো তাহলে সেটা ছিল দৈনন্দিন খাওয়া দাওয়ার অন্তহীন পালা। শুধু যে ঠিক সময়ে খাবার পরিবেশন করতে হবে তাই নয়, পরিবেশিত খাবারকে হতে হবে নিখুঁত এবং তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা ছাড়াই তার যা পছন্দ ঠিক তাই পরিবেশেন করতে হবে। গার্হস্থ্য জীবনের অসংখ্য অর্থহীন নিপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ফারমিনা যদি কখনো তাকে জিজ্ঞাসা করতো তাহলে তিনি খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলতেন, “দিও একটা কিছু।” তাঁর অমায়িক ভঙ্গিতে তিনি সত্যি কথাই বলতেন, সত্যিই তার চাইতে কম স্বৈরাচারী কোনো স্বামীর কথা কল্পনা করা যায় না, কিন্তু খাবার সময় হলে দেখা যেতো যে একটা কিছু হলে চলতো না, তার যা পছন্দ ঠিক তাই টেবিলে থাকা চাই, যেমন ভাবে চান অবিকল তেমন ভাবে। যখন অ্যাসপারাগাসের মৌসুম নয় তখনও তা পরিবেশন করতে হত, দাম যতো চড়াই হোক, যেন তিনি নিজের সুরভিত প্রস্রাবের বাষ্প থেকে আনন্দ লাভ করতে পারেন। ফারমিনা তাকে কোন দোষ দিত না, সে দোষ দিত জীবনকে। তবে ওই জীবনে তাঁর স্বামীই হলেন নিষ্করুণ প্রধান চরিত্র। বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই তিনি তার প্লেট ঠেলে দিয়ে বলতেন, “এটা তৈরি করা হয়েছে। ভালোবাসা ছাড়া।” ওই অঙ্গনে তার মধ্যে অবিশ্বাস্য অনুপ্রেরণার সঞ্চার হত। একবার ক্যামোমিল চায়ে এক চুমুক দিয়েই বলেন, “এর মধ্যে জানালার স্বাদ পাচ্ছি।” তাঁর স্ত্রী ও ভৃত্যকুল অবাক হয়ে যায়, কেউ সেদ্ধ করা জানালা খেয়েছে এমন কথা তারা কখনো শোনে নি, কিন্তু বিষয়টা বুঝবার জন্য তারা যখন ওই চা পান করলো তখন তারা ঠিকই বুঝলো, সত্যিই জানালার স্বাদ পাওয়া যায় তার মধ্যে। তিনি ছিলেন নিখুঁত স্বামী। তিনি মেঝে থেকে কখনো কিছু তুলতেন না, কিংবা কোন দরজা বন্ধ করতেন না। উষার অন্ধকার লগ্নে তার জামার বোতাম নেই দেখলে ফারমিনা তাঁকে বলতে শুনতো, “একটা মানুষের দুজন স্ত্রী থাকা উচিত, একজন ভালোবাসার জন্য, অপরজন জামার বোতাম লাগাবার জন্য। প্রতিদিন কফির পেয়ালায় প্রথম চুমুক দিয়েই, স্যুপের প্রথম চামচ মুখে ঢেলেই, তিনি মর্মান্তিক চিৎকার করে উঠতেন, তাতে অবশ্য এখন আর কেউ ভয় পায় না, চিল্কারের পর তিনি বলতেন, “একদিন আমি যখন বাড়ি ছেড়ে পালাবো তখন বুঝবে যে জিভ পোড়াতে পোড়াতে অতিষ্ঠ হয়ে আমি গৃহ ত্যাগ করেছি।” তিনি আরো বলতেন, জোলাপ নেবার কারণে তিনি যেদিন খেতে পারবেন না সেদিনই বিশেষ রুচিকর ও অগতানুগতিক খাবার তৈরি করা হয়। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস তার স্ত্রী বিশ্বাসঘাতকতা করে এরকম করেন। শেষে, তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও জোলাপ না নিলে ডাক্তার জোলাপ নিতে অস্বীকৃতি জানালেন।

স্বামীর অবুঝপনায় ক্লান্ত-বিরক্ত হয়ে ফারমিনা তার কাছে একটা ভিন্ন ধরনের জন্মদিনের উপহার চাইলেন, ডাক্তার উরবিনো একদিনের জন্য সংসারের যাবতীয় কাজের ভার নেবেন। মজা পেয়ে ডাক্তার সম্মতি জানালেন এবং সত্যি সত্যিই ভোর থেকে গৃহের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। টেবিলে তিনি চমৎকার প্রাতরাশ পরিবেশন করেন, তবে ভুলে যান যে ডিম-ভাজা তার স্ত্রীর সহ্য হয় না, আর ওই বিশেষ কফিটা তিনি পান করেন না। তারপর তিনি জন্মদিনের দ্বিপ্রহরিক আহারের জন্য নির্দেশ দেন, আটজন অতিথি হবে। তিনি বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশ দেন, আর তিনি যে এসব কাজ তার স্ত্রীর চাইতে ভালো ভাবে করতে পারেন তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এত কঠোর প্রয়াস চালান যে দুপুর বারোটার আগেই বিন্দুমাত্র বিব্রত বোধ না করে তিনি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেন। প্রথম মুহূর্ত থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন যে কোথায় কোন জিনিসটা আছে, বিশেষ করে রান্নাঘরে, সে সম্পর্কে তার ক্ষীণতম ধারণা নাই। একটা জিনিস পাবার জন্য ভৃত্যকুল তাকে সব জিনিস ওলট-পাল্ট করতে দিল, কারণ তারাও খেলাটায় অংশ নিচ্ছিল। বেলা দশটা বেজে গেলেও দুপুরের খাবারের ব্যাপারে তখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নি, কারণ বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ তখনো চলছিল, শোবার ঘর গোছানো হয় নি, বাথরুম ঘষা-মাজা এখনো বাকি। তিনি নতুন টয়লেট পেপার দেয়া, বিছানার চাদর বদলানো এবং বাচ্চাদের জন্য কোচোয়নকে গাড়ি আনবার কথা বলতে ভুলে যান। চাকর-দাসীদের কার কি কাজ সে ব্যাপারে তিনি তালগোল পাকিয়ে ফেলেন, বাবুর্চিকে বললেন বিছানা করতে আর শোবার ঘরের পরিচারিকাকে রান্না করতে। বেলা এগারোটার দিকে, অতিথিবর্গের আসবার সময় হয়ে এলে, বাড়ির চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে সজোরে হাসতে হাসতে ফারমিনা ডাজা সংসারের কর্তৃত্বভার আবার নিজের হাতে তুলে নিল, তবে বিজয়ীর ভঙ্গিতে সে হাসে নি, ইচ্ছা হলেও, বরং গার্হস্থ্য অঙ্গনে স্বামীর অসহায়তা দেখে তার প্রতি তার করুণাই হয়। ডাক্তার উরবিনো একটু তিক্ততার সঙ্গেই সব সময় যে কথা বলতেন এখনও তাই বললেন, “তুমি যদি রোগীকে সারাবার চেষ্টা করতে তাহলে তোমার অবস্থা আমার তুলনায় অনেক বেশি খারাপ হত।” তবে এটা একটা দরকারি শিক্ষা হয়েছিল, আর শুধু ডাক্তারের একার জন্যই নয়। কালের যাত্রার মধ্য দিয়ে তারা উভয়েই ভিন্ন পথে একই প্রাজ্ঞ উপসংহারে উপনীত হন : এভাবে ছাড়া অন্য কোন ভাবে একসঙ্গে বাস করা কিংবা ভালোবাসা সম্ভব নয়, আর এ পৃথিবীতে ভালোবাসার চাইতে দুঃসাধ্য আর কিছুই নেই।

তার নতুন জীবনের পূর্ণতার মধ্যে ফারমিনা ডাজা বিভিন্ন সর্বজনীন অনুষ্ঠানে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে দেখতে পেতো। সে তার অবস্থার ক্রমোন্নতি ঘটাবার সঙ্গে সঙ্গে এই দেখার পালা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু ফারমিনা তাকে একাধিকবার এতো স্বাভাবিক দেখে যে নিজের বিক্ষিপ্ত চিত্তের কারণে সে তাকে সম্বোধন করতে পর্যন্ত ভুলে যায়। ফ্লোরেন্টিনোর কথা সে প্রায়ই শুনতো, কারণ যে রকম সতর্ক কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ভাবে সে আর.সি.সি. কোম্পানিতে উন্নতি করে চলেছিল তা ব্যবসা বাণিজ্য মহলে একটা নিরন্তর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। ফারমিনা লক্ষ করলো। যে তার আচার-আচরণের উন্নতি হয়েছে, তার মুখচোরা ভাবকে এখন মনে করা হত এক ধরনের রহস্যময় দূরত্ব, ওজন একটু বেড়েছে কিন্তু সেটা তাকে মানিয়ে যায়, বয়স তার মধ্যে যে ধীরগতি এনে দিয়েছিল সে সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে, আর সে তার মাথাজোড়া টাকের মধ্যেও একটা মর্যাদা মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়। শুধু একটি ক্ষেত্রে সে কাল ও ফ্যাশানকে উপেক্ষা করে চলতে থাকে, এখনো সর্বদা তার পরনে থাকে অনুজ্জ্বল কালো রঙের পোশাক, সময়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ফ্ৰককোট, তার অদ্বিতীয় হ্যাট, তার মায়ের টুকিটাকির দোকান থেকে কেনা ফিদেয়া কবিদের টাই, আর হাতে তার ঢালের মতো ছাতা। ফারমিনা ডাজা তাকে ভিন্ন চোখে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর অবশেষে, যে নিস্তেজ কিশোরকে সে ইভাঞ্জেলস পার্কে হলুদ ঝরা পাতার ঝাপ্টার নিচে বসে তার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখেছিল তার সঙ্গে সে আর বর্তমানের লোকটিকে সম্পৃক্ত করতে পারলো না। তবে সে কখনো তাকে ঔদাসীন্যের সঙ্গে দেখে নি, তার সম্পর্কে কোন ভালো খবর পেলে সে সব সময় খুশিই হয়েছে, তার ফলে তার অপরাধ বোধ খানিকটা প্রশমিত হতো।

কিন্তু যখন তার মনে হয় যে সে তাকে তার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছে তখনই, অপ্রত্যাশিত মুহর্তে ও স্থানে, সে অকস্মাৎ উদিত হত তার স্মৃতিবিধুরতার এক অশরীরী মূর্তি রূপে। ওই সময় ফারমিনা বার্ধক্যের আগমনের আভাস পেতে শুরু করেছিল। যখনই সে সৃষ্টির আগে বজ্র গর্জন শুনতো তখনই তার মনে হত যে তার জীবনে অপূরণীয় কিছু একটা ঘটে গেছে। সিয়েরা ভিলানুয়েভাতে প্রতিদিন অক্টোবর মাসে বিকাল তিনটার সময় বজ্র গর্জন ধ্বনিত হত, আর সেই শব্দ তার মনে একটা নিঃসঙ্গ পাথুরে আরোগ্যাতীত ক্ষতের জন্ম দিত আর কালের যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে ওই স্মৃতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে। খুব সাম্প্রতিক ঘটনা অল্প ক’দিনের মধ্যে ঝাঁপসা হয়ে যেতো, কিন্তু বহু দিন আগের হিল্ডাব্রান্ডার প্রদেশে তার ঐতিহাসিক ভ্রমণ যাত্রার স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে ছিল, যেন মাত্র গতকালের ঘটনা, তার মধ্যে ছিল স্মৃতিকাতরতার এক অযৌক্তিক স্বচ্ছতা। তার মনে পড়তে পাহাড়ি অঞ্চলে মানোরের কথা, একটিমাত্র সোজা সবুজ রাস্তার কথা, তার শুভ সঙ্কেত দেয়া পাখির কথা, আর সেই ভুতুড়ে বাড়ির কথা যেখানে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে সে দেখতো যে তার রাত কামিজ ট্রো মোরালেসের অন্তহীন অশ্রু জলে ভিজে চুপ চুপ হয়ে গেছে। সে যে খাটে ঘুমাচ্ছিল ওই খাটেই বহু বছর আগে পেট্রা মোরালেস ভালোবাসার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল। তার মনে পড়তে পেয়ারার স্বাদের কথা, ওই স্বাদ সে আর কখনো পায় নি, তার মনে পড়তো বজ্রের সতর্ক করে দেয়া গর্জনের কথা, ওই ধ্বনি। ছিল এতো তীব্র যে বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে তা তালগোল পাকিয়ে যেতো, তার মনে পড়তো সান হুয়ান ডেল সিজারের উজ্জ্বল হলুদ বিকালের কথা, যখন সে তার চঞ্চল কাজিনকুলের সঙ্গে হাঁটতে বেরুততা আর টেলিগ্রাফ আপিসের কাছে এলেই সে কীভাবে দাঁতে দাঁত টিপে থাকতো, তার ভয় হত এই বুঝি তার হৃৎপিণ্ড বক্ষপঞ্জর ভেদ করে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়বে। তার কৈশোরের বেদনা, বারান্দা থেকে দেখা ছোট হতশ্রী পার্কটির দৃশ্য, তপ্ত রজনীতে গার্ডেনিয়া ফুলের রহস্যময় সুরভি, যেদিন তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় সেই ফেব্রুয়ারির অপরাহ্নে দেখা এক বৃদ্ধার আতঙ্ক জাগানিয়া মুখের স্মৃতি সে আর সহ্য করতে পারছিল না। তাকে তার পিতৃদত্ত বাড়িটি বিক্রি করে দিতে হল। কিন্তু সে তার স্মৃতিকে যে পথেই পরিচালিত করুক না কেন, এক সময় সে নিজেকে অনিবার্য ভাবে দেখতো ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মুখোমুখি। তবে এসব যে প্রেম বা অনুশোচনার স্মৃতি নয়, বরং গালের উপর চোখের জলের দাগ রেখে যাওয়া দুঃখের প্রতিমা তা বুঝবার মতো প্রশান্তি তার মধ্যে ছিল। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার বহু অসহায় বলির পতনের মূলে যে অনুকম্পার ফাঁদ ক্রিয়াশীল ছিল নিজের অজান্তেই ফারমিনা ডাজা সেই বিপদের মুখোমুখি হল।

সে তার স্বামীকে আঁকড়ে ধরলো। আর এই সময়ে তারও ফারমিনাকে দরকার হয়ে পড়েছিল সব চাইতে বেশি, বার্ধক্যের কুয়াশার মধ্য দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে একা চলার সময় একটা অসুবিধা সম্পর্কে তিনি সচেতন হলেন, তিনি তাঁর স্ত্রীর চাইতে দশ বছরের বড়, এর চাইতেও বড় অসুবিধা তিনি পুরুষ এবং ওর চাইতে দুর্বল। শেষ ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনযাপনের পর তারা একে অন্যকে এত ভালোভাবে চিনলেন যে তাদের মনে হত তারা বিভক্ত একটি একক সত্তা। ইচ্ছা না থাকলেও তারা পরস্পরের চিন্তাভাবনা এতো পুনঃপুনঃ অনুমান করে ফেলতেন কিংবা লোকজনের সামনে তাদের একজন কিছু বলতে উদ্যত হলে অপরজন আগেই যেরকম নির্ভুল ভাবে তা বলে উঠতেন তাতে ব্যাপারটা রীতিমত অস্বস্তিকর হয়ে পড়তো। তারা উভয়ে একসাথে মিলে দৈনন্দিন অনুপলব্ধি, তাৎক্ষণিক ঘৃণা, পারস্পরিক কদর্যতা এবং দাম্পত্য ষড়যন্ত্রের অবিশ্বাস্য ঝলককে পরাভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সময়েই তারা পরস্পরকে সব চাইতে উত্তম রূপে ভালোবাসেন, দ্রুতো কিংবা আতিশয্য পরিহার করে। এই সময়েই তারা উভয়েই দুঃখ-যন্ত্রণার বিরুদ্ধে তাদের অবিশ্বাস্য বিজয় সম্পর্কে সব চাইতে বেশি সচেতন হন, সব চাইতে বেশি কৃতজ্ঞ বোধ করেন। জীবন, অবশ্যই, এখনো তাদেরকে অন্যান্য মারাত্মক পরীক্ষার মুখোমুখি করবে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, তারা অন্য কূলে পৌঁছে গেছেন।

নতুন শতকের উদ্বোধন উপলক্ষে সর্বজনীন উৎসবমালার জন্য বেশ কয়েকটি নতুন ধরনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল, এর মধ্যে সব চাইতে স্মরণীয় ছিল প্রথম বেলুন ভ্রমণ। এটা ছিল ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোর অসীম উদ্যমী প্রণোদনার ফসল। জাতীয় পতাকার রঙে পাতলা কড়কড়ে রেশমি কাপড়ে নির্মিত বিশাল বেলুনটির উড্ডয়ন বিস্ময়াবিভূত চোখে দেখার জন্য শহরের অর্ধেক মানুষ আর্সেনাল সমুদ্র সৈকতে এসে জড়ো হয়। এই বেলুনে করে, কাকের মতো সোজা উড়ে গেলে প্রায় একশো মাইল দূরে, সান হুয়ান ডি লা সিনেগাতে আজ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আকাশপথের প্রথম ডাক। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোর এবং তাঁর স্ত্রীর, পারীর বিশ্ব মেলার সময়, আকাশে ওড়ার উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা ছিল। তারা দুজন এবার সকলের আগে উপরে উঠে সেলুনের বেতের ঝুড়িতে বসলেন, তারপর উঠলেন বেলুনের পাইলট, আর ছয়জন বিশিষ্ট অতিথি। তারা প্রাদেশিক গভর্নরের কাছ থেকে সান হুয়ান ডি লা সিনেগার পৌর কর্মকর্তাদের কাছে একটা চিঠি নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে আকাশপথে এই প্রথম ডাক নিয়ে যাওয়ার প্রামাণিক দলিল লিপিবদ্ধ আছে। কমার্শিয়াল ডেইলি কাগজের জনৈক সাংবাদিক ডাক্তার উরবিনের কাছে জানতে চাইলো এই দুঃসাহসিক অভিযানে যদি তার মৃত্যু ঘটে তাহলে তার শেষ কথা কি হবে? ডাক্তার একটুও না চিন্তা করে বলেন, আমার মতে একমাত্র আমাদের বাদ দিয়ে উনবিংশ শতাব্দী আর সবার জন্য বিদায় নিচ্ছে। এ উক্তির জন্য ডাক্তার প্রচুর তিরস্কৃত হন।

বেলুন উপরে উঠে যাচ্ছিল, সরল জনতা জাতীয় সঙ্গীত গাইছে, হৈচৈর মাধ্য ফ্লোরেন্টিনোর কানে একটা মন্তব্য এসে পৌঁছলো, এরকম অভিযান কোন মহিলার জন্য উপযুক্ত নয়, বিশেষ করে ফারমিনা ডাজার মতো একজন বয়স্ক মহিলার পক্ষে। ফ্লোরেন্টিনো তার সঙ্গে একমত হল। তবে এর মধ্যে বিপদের তেমন কিছু ছিল না। অন্তত যতখানি বিপজ্জনক তার চাইতে বেশি ছিল মন খারাপ করা। অসম্ভব নীল আকাশের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে কোন ঘটনা ছাড়াই বেলুনটি তার গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা ভালো ভাবে উড়ে যায়, বেশ নিচু দিয়ে, বাতাস ছিল শান্ত ও অনুকূল, প্রথমে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতমালার পাশ দিয়ে, তারপর বিশাল জলাভূমির বিস্তীর্ণ এলাকার উপর দিয়ে।

আকাশ থেকে তাঁরা দেখছিলেন, যেমন ঈশ্বর দেখছিলেন তাঁদের, কার্টাজেনা ডি ইন্ডিয়াস-এর অতি প্রাচীন মহান নগরীর ধ্বংসাবশেষ, বিশ্বের সব চাইতে সুন্দর জায়গা, তিন শতাব্দী ধরে ইংরেজদের অবরোধ ও বোম্বেটেদের নৃশংসতা প্রতিহত করার পর কলেরা মহামারীর ভয়ে এ জায়গার অধিবাসীরা এখান থেকে চলে যায়। উপর থেকে তারা দেখলেন যে নগরীর প্রাচীরগুলি এখনো অক্ষত আছে। তাদের চোখে পড়লো রাস্তার উপরের কাঁটাগুল্ম, ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিখা, মর্মর প্রাসাদ, সোনালি বেদি আর মহামারীর আক্রমণে বর্মের অভ্যন্তরে পচে যাওয়া ভাইসরয়দের মূর্তি।

তাঁরা কাটাকায় হ্রদের পার্শ্বস্থিত ট্রোজাসদের বাসভবনের উপর দিয়ে উড়ে গেলেন। ওই বাড়িগুলি ছিল উন্মাতাল রঙে চিত্রিত, উঠানে খাঁচার মধ্যে ইগুয়ানা, খাবার জন্য তাদের পালন করা হচ্ছে, বাগানে সুগন্ধী আপেল আর চকচকে চিরহরিৎ গুল্ম। চারদিকের চেঁচামেচিতে উত্তেজিত শত শত উলঙ্গ বালক-বালিকা জলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, বাড়ির জানালার ভেতর দিয়ে, ছাদের উপর থেকে, বিস্ময়কর দক্ষতার সঙ্গে চালানো তাদের ডিঙি নৌকা থেকে। বেলুনে বসা তাঁর ঝুড়ি থেকে পালকের টুপি পরা সুন্দরী মহিলা যে সব জিনিস ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছিলেন, কাপড় জামার পুটলি, কাশির জন্য মিষ্টি ওষুধের বোতল, উপকারী খাদ্যদ্রব্য, ওরা সেসব উদ্ধার করার জন্য শ্যাড মাছের মতো জলে ডুব দিয়ে সাঁতার কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।

তারা কালো সমুদ্রের মতো বিস্তীর্ণ কলার বাগানগুলির উপর দিয়ে উড়ে গেলেন, বাগানগুলির নীরবতা মারাত্মক বিষবাষ্পের মতো তাদের কাছে এসে পৌঁছল। ফারমিনা ডাজার তার শৈশবের কথা মনে পড়লো, তার বয়স তখন তিন কিংবা চার বছর, মায়ের হাত ধরে ছায়াচ্ছন্ন বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে, মা নিজেও প্রায় একটি বালিকাই, তাদের চারপাশে মসলিনের পোশাক পরা অন্যান্য মহিলা, তার মায়ের মতোই, মাথায় পাতলা কাপড়ের হ্যাট, হাতে সাদা ছাতা। পাইলট একটা ছোট দূরবীন দিয়ে পৃথিবী দেখছিলেন, তিনি বলে উঠলেন, ‘ওরা মৃত বলে মনে হচ্ছে। তিনি ডাক্তার জুভেনালের হাতে তার দূরবীনটা দিলেন, ডাক্তার দেখলেন চাষ করা জমিতে মোষের গাড়ি, রেলপথের সীমানা-চিহ্ন, ধ্বংসপ্রাপ্ত সেচের নালা, আর যেখানেই তাঁর দৃষ্টি গেল দেখলেন মনুষ্য দেহ। কেউ একজন বলল, বিশাল জলাভূমির গ্রামগুলি কলেরার আক্রমণে শেষ হয়ে যাচ্ছে। নিচের দিকে দেখতে দেখতে ডাক্তার উরবিনো বললেন, তো, এটা নিঃসন্দেহে খুবই বিশেষ এক ধরনের কলেরা, কারণ প্রতিটি মৃতদেহ তার মুক্তি-আঘাত লাভ করেছে তার ঘাড়ের উপর।

অল্প একটু পরে তারা উড়ে গেলেন উদ্বেল ফেনিল সাগরের উপর দিয়ে, তারপর কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই নামলেন একটা চওড়া উষ্ণ সৈকতের উপর, তার ভূপৃষ্ঠ যবক্ষারপূর্ণ, আগুনের মতো জ্বলছে। সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে শুধু সাধারণ ছাতা, সূর্যের দাবদাহ থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র হাতিয়ার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালক বালিকারা বাদ্যের তালে তালে ছোট ছোট পতাকা নাড়ছে, সুন্দরীরা ঝলসানো ফুল আর সোনালি কার্ডবোর্ডের তৈরি মুকুট মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সমৃদ্ধশালী শহর গেইরার ব্যান্ডদল সঙ্গীত পরিবেশন করছে, সে সময় সমগ্র ক্যারিবীয় উপকূল অঞ্চলে ওই ব্যান্ডই ছিল সবার সেরা। ফারমিনা ডাজার অন্তর ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল শুধু আরেকবার তার জন্মস্থান দেখার জন্য, তার সর্বপ্রথম স্মৃতিগুলির মুখোমুখি হবার জন্য, কিন্তু মহামারীর বিপদের আশঙ্কায় কাউকেই ওখানে যাবার অনুমতি দেয়া হল না। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো ঐতিহাসিক চিঠিটা হস্তান্তর করলেন, সে-চিঠি পরে নানা কাগজের মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায়, কখনোই আর তার সন্ধান মেলে নি। গোটা প্রতিনিধি দল বক্তৃতার ভারে ক্লান্ত, গরমে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হবার অবস্থা। এরপর পাইলট যখন বেলুনটা পুনর্বার আকাশে তুলতে পারলেন না তখন ওদেরকে খচ্চরের পিঠে চড়িয়ে পুয়েব্লো ভিয়েজোর জাহাজঘাটে নিয়ে যাওয়া হল, সেখানে জলাভূমি এসে মিশেছে সাগরের সঙ্গে। ফারমিনা ডাজার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে সে যখন খুব ছোট তখন তার মায়ের সাথে বলদটানা গাড়িতে চড়ে এখান দিয়ে গিয়েছিল। একটু বড় হবার পর সে এই গল্প কয়েকবারই তার বাবার কাছে করে, কিন্তু ওর বাবা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে এটা হতেই পারে না, ওর স্মৃতিতে এটা থাকা অসম্ভব। তিনি ওকে বলেন, ওই সফরের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, তুমি যা বলছো তা নির্ভুল, কিন্তু এই ঘটনা ঘটেছিল তোমার জন্মের অন্তত পাঁচ বছর আগে।

তিন দিন পর বেলুনের অভিযাত্রী দল তাঁদের আদিযাত্রা-বন্দরে ফিরে আসেন, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, পথে ঝড় ঝঞ্ঝার কারণে খুব খারাপ রাত কেটেছে তাঁদের, তবে তারা বীরের উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করলেন। ভিড়ের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য ফ্লোরেন্টিনো আরিজাও ছিল, তার চোখে পড়লো ফারমিনা ডাজার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন, কিন্তু সে দিন বিকালেই সে যখন একটা সাইকেল প্রদর্শনীতে তাকে আবার দেখলো তখন তার মধ্যে আর ক্লান্তির কোন চিহ্নই দেখা গেল না। এই প্রদর্শনীর দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন তার স্বামী। ফারমিনা ডাজা একটা নতুন ধরনের অগতানুগতিক দ্বিচক্রযান চালালো, মনে হল কোন সার্কাস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, সামনের চাকা খুব বড়, পেছনের চাকা অতিশয় ছোট, চালককে তা প্রায় কোন অবলম্বনই দিচ্ছিল না। ফারমিনা ডাজার পরনে ছিল ঢোলা পাজামা, প্রান্তদেশ লাল ফিতায় মোড়ানো, এই পোশাক শুধু বয়স্ক মহিলাদের শিষ্টাচার বোধ-কে পীড়িত করলো না, ভদ্রলোকদেরও বিব্রত করলো, কিন্তু তার নৈপুণ্যের প্রতি কেউই উদাসীন থাকতে পারলেন না।

এই স্মৃতি এবং এই রকম আরো বহু ক্ষণস্থায়ী ছবি এত বছর ধরে হঠাৎ নিয়তির খেয়ালখুশি অনুযায়ী তার সামনে এসে উপস্তিত হত, তারপর ওই রকম আকস্মিক ভাবেই মিলিয়ে যেতো, পেছনে রেখে যেত শুধু তার হৃদয়ের এক তীব্র আকুলতা। এই সব একসঙ্গে মিলে তার জীবন-পথকে চিহ্নিত করেছে, কারণ প্রতিবারই ফারমিনা ডাজাকে দেখার সময় তার অতিক্ষীণ ও সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্যে সে কালের যে নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছে তার নিজের শরীরের ক্ষেত্রে তা সে অনুভব করেনি।

এক রাতে সে অভিজাত ঔপনিবেশিক রেস্তোরাঁ ডন সাঙ্কোস ইন-এ খেতে যায়। স্বল্পাহারী ফ্লোরেন্টিনো রেস্তোরাঁর সুদূর একটি কোনায় গিয়ে বসে। একা খেতে হলে সে সর্বদা তাই করতো। হঠাৎ পেছনের দেয়ালের একটা বড় আয়নায় সে এক মুহূর্তের জন্য ফারমিনা ডাজাকে দেখতে পেল, তার স্বামী ও অন্য দুই দম্পতিকে নিয়ে সে একটা টেবিলে বসেছে। সে এমন জায়গায় এবং এমন ভাবে বসেছিল যে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আয়নায় তার প্রতিবিম্বকে দেখলো তার পূর্ণ বিভায় গৌরবোজ্জ্বল। সে ছিল বন্ধনহীন, হেসে হেসে মধুরভাবে সে কথা বলছিল, আতশবাজির মতো তার হাসি ও কথা ফুটছিল, বিশাল অশ্রুবিন্দুর মতো ঝাড়বাতিগুলির নিচে তার সৌন্দর্য অত্যুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। অ্যালিস আরেক বার দর্পণের মধ্য দিয়ে চলে যায়।

নিঃশ্বাস বন্ধ করে সময় নিয়ে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তাকে লক্ষ করলো। সে তাকে খেতে দেখল, লক্ষ করলো যে সে সুরা প্রায় স্পর্শই করলো না, ডন সাঙ্কোদের চতুর্থ প্রজন্মের সঙ্গে সে ঈষৎ হাসি ঠাট্টা করলো। তার নিঃসঙ্গ টেবিল থেকে ফ্লোরেন্টিনো ফারমিনা ডাজার জীবনের একটি মুহূর্তের অংশীদার হল। সবার চোখের আড়ালে বসে সে এক ঘণ্টার বেশি সময় অলস ভাবে ফারমিনার অন্তরঙ্গ নিষিদ্ধ এলাকায় অবস্থান করলো। সময় কাটাবার জন্য সে আরো চার কাপ কফি পান করলো, তারপর তার সঙ্গীদের নিয়ে ওকে রেস্তোরাঁ ত্যাগ করতে দেখলো। সে তার এত কাছ দিয়ে গেল যে অন্যান্যদের প্রসাধনীর নানা সুরভির মধ্য থেকে সে ফারমিনার নিজস্ব সুগন্ধি আলাদা করে চিনতে পারলো।

ওই রাতের পর প্রায় এক বছর ধরে সে রেস্তোরাঁর মালিকের কাছে নিরন্তর ধরণা দেয়, তিনি যা চান সে তাকে তাই দেবে, অর্থ কিংবা কোন অনুগ্রহ, জীবনে যা তাঁর সব চাইতে বেশি কাম্য তাই সে দেবে, তিনি যদি তার কাছে ওই আয়নাটা বিক্রি করেন। কাজটা সহজ হয় নি, কারণ বৃদ্ধ ডন সাঙ্কো প্রচলিত একটি লোককাহিনীতে বিশ্বাস করতেন, এই আয়নার ফ্রেম তৈরি করেছে ভিয়েনার আসবাব নির্মাতারা, এরকম দুটি আয়না আছে, অন্যটির মালিক মেরি আঁতোয়ানেৎ, সেটা কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ তার হদিস জানে না, ডন সাঙ্কোর এই আয়না অতুলনীয় এক জোড়া রত্বের একটি। অবশেষে তিনি যখন আত্মসমর্পণ করেন, তখন ফ্লোরেন্টিনো আরিজা সেটা নিজের বাড়িতে এনে স্থাপন করলো, তার পরম সুন্দর ফ্রেমের জন্য নয়, শুধু এই জন্য যে ওই আয়নার মধ্যে দু’ঘণ্টার জন্য অবস্থান করেছিল তার প্রিয়তমার প্রতিবিম্ব।

ফ্লোরেন্টিনো আরিজা যখনই ফারমিনা ডাজাকে দেখেছে প্রায় সর্বদাই তাকে দেখেছে তার স্বামীর বাহুলগ্না। তারা পথ চলতে নিজেদের স্থানের মধ্য দিয়ে, বিস্ময়কর সাবলীলতার সঙ্গে, অনবদ্য ছন্দ মিলিয়ে, যখন তাকে সম্ভাষণ করার জন্য তারা থামতো শুধু তখনই সেখানে ছেদ পড়তো। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো উষ্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে তার করমর্দন করতেন, কখনো কখনো আলতোভাবে তার পিঠ চাপড়ে দিতেন, কিন্তু ফারমিনা ডাজার আচরণ ছিল আনুষ্ঠানিক ও নৈর্ব্যক্তিক, নিজের কুমারী জীবনে যে তার কোন স্মৃতি আছে সেটা সন্দেহ করার মতো কোনো ভাবভঙ্গি সে কখনো করতো না। তারা দুজন বাস করতো দুটি ভিন্ন জগতে, আর ফ্লোরেন্টিনো আরিজা যখন তাদের দুজনের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল, ফারমিনা ডাজা তখন চেষ্টা করছিল ঠিক তার বিপরীত কাজটি করার জন্য। অনেক দিন পরে তার মনে হল ওর ঔদাসীন্য বোধ হয় ভীরুতার জন্য একটা ঢাল ছাড়া আর কিছু নয়। অকস্মাৎ এই চিন্তাটা তার মনে আসে। সেদিন স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ পোতাশ্রয়ে তাদের প্রথম নতুন ধরনের জাহাজ নির্মিত হবার পর তার নামকরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই প্রথম সরকারি অনুষ্ঠান যেখানে আর. সি. সি. কোম্পানির প্রথম সহ-সভাপতি ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার কাকা দ্বাদশ লিওর প্রতিনিধিত্ব করছিল। তার জন্য তাই এ অনুষ্ঠান একটা বিশেষ গুরুত্বে অভিষিক্ত হয়। শহরের সকল উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি এ অনুষ্ঠানে আসেন। এই সময়েই ফ্লোরেন্টিনোর মনে উপরোক্ত সম্ভাবনার কথা অকস্মাৎ উদিত হয়।

জাহাজের প্রধান অভ্যর্থনা কক্ষে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা অতিথিদের দেখাশোনা করছিলো। জাহাজে তখন নতুন রঙ ও আলকাতরার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এমন সময় জাহাজঘাটা থেকে করতালির শব্দ ভেসে এলো, ব্যান্ড বাজাতে শুরু করলো। বিজয়োল্লাসের বাজনা, আর ফ্লোরেন্টিনো তার স্বপ্নের নারীকে স্বামীর বাহুতে বাহু জড়িয়ে এগিয়ে আসতে দেখলো। ওকে প্রথম দেখার সময় তার বুকে যে শিহরণ। জেগেছিল এখনো সে ওই একই শিহরণ অনুভব করলো। কুচকাওয়াজের পোশাক পরা একটি দল গার্ড বা অনার দিচ্ছে, চারপাশের জানালা থেকে কাগজের লম্বা সরু ফিতা ও ফুলের পাপড়ি তাদের উপর বর্ষিত হচ্ছে, আর তার মধ্য দিয়ে তার পূর্ণবিকশিত অপরূপ রূপ নিয়ে ভিন্ন কোন কালের রানীর মতো দৃঢ় পদক্ষেপে সে। এগিয়ে আসছে। উভয়েই উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনার জবাবে হাত নেড়ে প্রত্যুত্তর দিচ্ছে, কিন্তু উঁচু হিলের পাদুকা, মাথায় ঘণ্টাকৃতি হ্যাট, গলায় উজ্জ্বল বর্ণের পশমের গলবস্ত্র জড়ানো ফারমিনা ডাজাকে এতোই দীপ্তিময় দেখাচ্ছিল যে মনে হল সমস্ত জনতার মধ্যে সে বুঝি একা।

প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের নিয়ে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা জাহাজের সেতুর উপর ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বাজনা আর আতশবাজির উচ্চরোলের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে, জাহাজ থেকে তিন বার ভারি তীক্ষ্ণ ভেঁপুর শব্দ ধ্বনিত হল, সমস্ত জাহাজঘাট বাষ্পে ছেয়ে গেল। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো অভ্যর্থনা-সারিতে দাঁড়ানো। সদস্যদের সম্ভাষণ করলেন, তার বৈশিষ্ট্যময় স্বাভাবিকতার সঙ্গে, যাতে প্রত্যেকেরই মনে হল ডাক্তার বুঝি তাকে বিশেষ মমতার দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি প্রথমে করমর্দন করলেন পুরো ইউনিফর্ম পরা জাহাজের কাপ্তানের সঙ্গে, তারপর সস্ত্রীক গভর্নর ও মেয়রের সঙ্গে, তারপর সামরিক অধিনায়কের সঙ্গে, তিনি অ্যান্ডিস থেকে এখানে নতুন এসেছেন। এই কর্মকর্তাদের পরে দাঁড়িয়েছিল ফ্লোরেন্টিনো আরিজা, তার অনুজ্জ্বল। গাঢ় রঙের পোশাক পরে, এত সব উচ্চ মর্যাদার মানুষের পাশে প্রায় অদৃশ্যমান হয়ে। সামরিক অধিনায়ককে সম্ভাষণ করার পর ফ্লোরেন্টিনো আরিজার প্রসারিত হাতের সামনে দাঁড়িয়ে ফারমিনা ডাজা একটু ইতস্তত করলো বলে মনে হল। সামরিক ব্যক্তিটি তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্যত হয়ে ফারমিনা ডাজার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন তিনি ওকে চেনেন কিনা। ফারমিনা ডাজা হা-ও বলল না, না-ও বললো না, তবে তার হাত বাড়িয়ে দিল ফ্লোরেন্টিনো আরিজার দিকে এবং তাকে একটি রীতিসিদ্ধ হাসি উপহার দিল। ঠিক এই একই ঘটনা আগে আরো দু’বার ঘটেছিল এবং ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এসব পরিস্থিতিতে এমন একটা চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয় যা ছিল যথার্থই ফারমিনার ডাজার যোগ্য। কিন্তু তার মোহান্ধ হবার অপরিসীম ক্ষমতা নিয়ে সেদিন বিকালে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে হল, কে জানে, ওর ওই নির্দয় ঔদাসীন্য হয়তো ওর ভেতরের প্রেমের যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখবার একটা কৌশল মাত্র।

ওই ধারণা সঙ্গে সঙ্গে তার যৌবনদীপ্ত কামনারাশি উদ্দীপিত করে তুললো। ইভাঞ্জেলস পার্কে হাজিরা দেবার দিনগুলিতে সে তার হৃদয়ে যে আকুল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেছিল সেই একই আকাক্ষা নিয়ে সে আবার ফারমিনা ডাজার বাসভবনের চারপাশে নিরন্তর ঘুরতে লাগলো, কিন্তু এবার তার সুপরিকল্পিত প্রয়াস ছিল ও যেন তাকে দেখতে না পায়, শুধু সে ওকে দেখবে, জানবে যে এই পৃথিবীতে ও এখনো বিরাজ করছে। কিন্তু এই ভাবে নিজেকে দৃষ্টির আড়ালে রাখা সহজসাধ্য ছিল না। লা মাঙ্গা জেলা ছিল অর্ধ-পরিত্যক্ত একটি দ্বীপের উপর অবস্থিত, ঐতিহাসিক নগরীটি থেকে একটা সবুজ জলের খাল দ্বারা পৃথক করা, বুনো জাম গাছের ঝোপে ঢাকা জায়গাগুলি ঔপনিবেশিক যুগে রবিবারের প্রেমিক-প্রেমিকাদের নিরাপদ আশ্রয় দিত। সাম্প্রতিককালে স্পেনীয়দের নির্মিত পুরনো লোহার সেতুটি ভেঙে তার জায়গায় একটি ইটের সেতু বানানো হয়েছে, খচ্চরটানা নতুন ট্রলিগাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য রাস্তার দু’পাশে সারি বেঁধে আলো বসানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক কারখানাটির নির্মাণ কাজ চলার সময় তারা যে কষ্টকর পরিস্থিতির শিকার হতে পারে লা মাঙ্গার অধিবাসীরা তা আগে থেকে অনুমান করতে পারে নি। নগরীর প্রথম বৈদ্যুতিক কারখানা বাসভবনের এত কাছে অবস্থিত হবার জন্য তার স্পন্দনকে মনে হত একটা সার্বক্ষণিক ভূমিকম্পের মতো। তার সকল মর্যাদা ও প্রতিপত্তি সত্ত্বেও লোকজনকে অসুবিধার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ডাক্তার উরবিনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারাখানাটি অন্যত্র স্থানান্তর করাতে সক্ষম হলেন না। অবশেষে দৈবশক্তির সঙ্গে যে তার একটা যোগসাজশ আছে তা প্রমাণিত হল, ওই শক্তি তার পক্ষ নিল। একদিন রাতে কারখানার বয়লারটি ভয়ঙ্কর শব্দ করে বিস্ফোরিত হয়ে নতুন ঘরবাড়িগুলির উপর দিয়ে, অর্ধেক শহর অতিক্রম করে, সেন্ট জুলিয়ান হাসপাতালের প্রাক্তণ মঠের বুকে পড়ে তার বৃহত্তম গ্যালারিটি চুরমার করে দিল। বর্তমান বছরের শুরুতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনটি থেকে লোকজন সরে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় কারাগার থেকে যে চারজন বন্দি পালিয়ে গিয়ে ওখানে গির্জার উপাসনা বেদির কাছে আশ্রয় নিয়েছিল তারা বয়লারের আঘাতে মারা যায়।

প্রেমের চমৎকার ঐতিহ্যবাহী সুন্দর শান্ত শহরতলিটি কিন্তু বিলাসবহুল পাড়ায় রূপান্তরিত হবার পর প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকদের জন্য জায়গাটা খুব সুবিধাজনক থাকে নি। রাস্তাগুলি গরমের সময় ধুলায় ভরে যায়, শীতে জলাভূমির মতো হয়ে পড়ে, সারা বছর বিষণ্ণ একটি পরিবেশ বিরাজ করে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়িঘর পল্লব আচ্ছাদিত বাগানের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে, সেখানে সামনের দিকে প্রসারিত পুরনো ধরনের বারান্দার পরিবর্তে বানানো হয়েছে মোজাইকের টালির চত্বর, মনে হয়। গোপন প্রেমিকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য সচেতনভাবে এটা করা হয়েছে। এই সময় পুরনো ভিক্টোরিয়া শকটকে রূপান্তরিত করা এক-ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে বৈকালিক ভ্রমণের রীতি চালু হয়েছিল। লোকজন ঘোড়াগাড়িতে চড়ে বেড়াতে বেরুতো, একটা পাহাড়ের কাছে গিয়ে থামতো, সেখান থেকে দেখতো অক্টোবরের বুকে কাঁপন জাগানো অপরূপ গোধূলিলগ্ন, ওই দৃশ্য এখান থেকে বাতিঘরের চাইতেও ভালো দেখা যেতো। ওরা আরো দেখতে যাজকদের উপকূলে ওৎ পেতে থাকা সতর্ক হাঙ্গরের দলকে, আর বিশাল সাদা বৃহস্পতিবারের সামুদ্রিক জাহাজটিকে, পোতাশ্রয়ের খাল দিয়ে অগ্রসর হবার সময় তাকে এত কাছে মনে হত যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আপিসে সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করার পর এখানে এসে একটা গাড়ি ভাড়া করতো, তবে আর সবার মতো গাড়ির উপরটা গুটিয়ে নামিয়ে না দিয়ে, গ্রীষ্মের মাসগুলিতে তাই ছিল প্রচলিত রীতি, সে আসনের এক অন্ধকার কোনায় গিয়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে লুকিয়ে বসে থাকতো, সর্বদাই একা, আর গাড়ির চালকের মনে যেন কোন কু-ধারণার জন্ম না হয় সেজন্য তাকে অপ্রত্যাশিত সব পথে চলার নির্দেশ দিতো। আসলে গাড়িতে চড়ে এই বেড়ানোতে তার উৎসাহ কেন্দ্রীভূত ছিল পত্রপল্লব আচ্ছাদিত কলা ও আম গাছের আড়ালে আধা-লুকানো গোলাপি মার্বেল পাথরে নির্মিত পার্থিনন ধাচের একটি বাড়ির উপর। বাড়িটা ছিল লুইসিয়ানার তুলা ক্ষেত অঞ্চলে যেসব সুখস্বপ্নঘেরা বৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করা হত তার একটা ব্যর্থ অনুকরণ। বিকাল পাঁচটার সামান্য আগে ফারমিনা ডাজার সন্তানরা বাড়ি ফিরে আসতো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ওদের পারিবারিক গাড়িতে ওদের বাড়ি পৌঁছতে দেখতো, তারপর সে দেখতো ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী দেখার তার নিয়মিত কাজে বেরিয়ে যেতে, কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরও যে-দৃশ্যটি দেখার জন্য তার সমগ্র চিত্ত ব্যাকুল হয়েছিল তার সামান্য কণাও সে দেখতে পেল না।

সেদিন জুন মাসের প্রথম বিধ্বংসী বর্ষণ শুরু হয়। তা সত্ত্বেও ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার নিঃসঙ্গ ভ্রমণে বেরোয়। ঘোড়াটা এক সময় পা পিছলে কাদার মধ্যে পড়ে যায়। ফ্লোরেন্টিনো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লক্ষ করলো যে ঘটনাটা ঘটেছে ফারমিনা ডাজার বাসভবনের ঠিক সামনে। সে গাড়োয়ানকে অস্থির হয়ে তাড়াতাড়ি করতে বললো, খেয়াল করলো না যে তার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তার গোপন উদ্দেশ্য ধরা পড়ে যেতে পারে। ফ্লেরেন্টিনো আরিজা গাড়োয়ানকে চেঁচিয়ে বললো, “দোহাই তোমার, এখানে না, তাড়াতাড়ি অন্য কোথাও চলো।”

তার অস্থিরতায় বিভ্রান্ত হয়ে গোড়োয়ান ঘোড়াকে জোয়ালমুক্ত না করেই ওঠাতে চেষ্টা করলো, যার ফলে গাড়ির অক্ষদণ্ডটি ভেঙে গেল। প্রবল বর্ষণের মধ্যে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা কোন রকমে গাড়ি থেকে বেরিয়ে তার বিব্রতকর অবস্থা সহ্য করতে লাগলো। পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির যাত্রীরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব দিলো। ফ্লোরেন্টিনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সময় উরবিনো পরিবারের একটি ভৃত্য তাকে দেখতে পায়, কাপড় জামা ভিজে চুপচুপ, এক হাঁটু কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, ভৃত্যটি তার জন্য একটি ছাতা নিয়ে এল যেন সে চত্বরে উঠে আশ্রয় নিতে পারে। তার সব চাইতে বেপরোয়া পাগলামির মধ্যেও ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এরকম সৌভাগ্যের কথা স্বপ্নেও ভাবে নি, কিন্তু ফারমিনা ডাজার তাকে এই অবস্থায় দেখার চাইতে সে নিজের মৃত্যু কামনা করলো।

জুভেনাল উরবিনো যখন তার পরিবারবর্গসহ পুরনো শহরে বাস করতেন তখন প্রতি রবিবার সকাল আটটার উপাসনায় যোগ দেবার জন্য তারা বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে ক্যাথিড্রালে যেতেন। তাদের জন্য ওটা যতখানি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল তার চাইতে বেশি ছিল একটা ইহজাগতিক অনুষ্ঠান। তারপর অন্যত্র উঠে যাবার পরও তারা বহু বছর ধরে গাড়িতে করে ওখানে গেছেন এবং মাঝে মধ্যে পার্কের তালগাছগুলির নিচে বসে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প করেছেন। কিন্তু লা মাঙ্গায় যাজকদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মন্দির নির্মিত হবার পর, তাদের নিজস্ব সমুদ্র সৈকত ও সমাধিক্ষেত্র তৈরি হবার পর, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন অনুষ্ঠানের সময় ছাড়া তারা আর ওই ক্যাথিড্রালে যেতেন না। এই পরিবর্তনের কথা ফ্লোরেন্টিনো আরিজা জানতো না। সে রবিবারের পর রবিবার প্যারিস ক্যাফের বারান্দায় বসে তিনটি প্রার্থনার সময়ই ক্যাথিড্রাল থেকে লোকজনের বেরিয়ে আসা লক্ষ করতে থাকে। তারপর তার ভুলটি বুঝবার পর সে নতুন গির্জায় হানা দিল। কয়েক বছর আগেও ওই গির্জায় যাওয়া বেশ কেতাদুরস্ত বলে বিবেচিত হত। ওখানে সে আগস্ট মাসের পর পর চার রবিবারে কাঁটায় কাঁটায় সকাল আটটার সময় তার সন্তানদের নিয়ে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোকে দেখলো কিন্তু ওদের সঙ্গে ফারমিনা ডাজা ছিল না। এক রবিবার সে গির্জা সংলগ্ন নতুন সমাধিক্ষেত্রটি দেখতে যায়, সেখানে লা মাঙ্গার অধিবাসীরা তাদের জন্য জমকালো সমাধিগৃহ নির্মাণ করছিল। যখন বিরাট বিরাট সীবা গাছের ছায়ার নিচে সব চাইতে জমকালো সমাধিগৃহটি তার চোখে পড়লো তখন মুহূর্তের জন্য যেন তার হৃদস্পন্দন থেমে যায়। ওই সমাধিগৃহে বসানো হয়েছে গথিক ধাচের রঙিন কাঁচের জানালা, মার্বেলের দেবদূত আর গোটা পরিবারের জন্য সোনালি অক্ষরে আঁকা সমাধিফলক। সেখানে দেখা গেল, স্বভাবতই, তার স্বামীর নামের পাশে ডানা ফারমিনা ডাজা ডি উরবিনো ডি লা কল-এর নাম এবং একটা প্রচলিত সমাধিলিপি, প্রভুর শান্তি-ছায়ায় এখনো এক সঙ্গে।

ওই বছরের বাকি সময়ে ফারমিনা ডাজা কোন নাগরিক বা সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দিল না, বড় দিনের অনুষ্ঠানেও না, যদিও ওই উৎসব অনুষ্ঠানে সে এবং তার স্বামী সর্বদা সসম্মানে প্রধান ভূমিকা নিত। তবে তার অনুপস্থিতি সব চাইতে বেশি চোখে পড়লে অপেরা মৌসুমের প্রথম রজনীতে। বিরতির সময় ফ্লোরেন্টিনো আরিজা একটা ছোট দলের মধ্যে গিয়ে পড়ে। নাম উচ্চারণ না করলেও ওরা যে ফারমিনা ডাজা সম্পর্কে কথা বলছিল তা সহজেই বোঝা গেল। ওরা বলছিল যে গত জুনে একজন কানার্ড কোম্পানির জাহাজে করে তাকে পানামার দিকে যেতে দেখেছে। সে ছিল রোগাক্রান্ত, মুখে লজ্জাজনক রোগের আক্রমণের ধ্বংসাত্মক চিহ্ন লুকোবার জন্য সে গাঢ় রঙের একটা ওড়না দিয়ে তার মুখ ঢেকে রেখেছিল। একজন মন্তব্য করলো, অত প্রতিপত্তিশালী মহিলাকে কী এমন সাংঘাতিক রোগ আক্রমণ করতে পারে, যার একটি বদমেজাজী উত্তর সে লাভ করে, ‘ওই রকম বিশিষ্ট মহিলা শুধু একটি রোগ দ্বারাই আক্রান্ত হতে পারেন, ক্ষয় রোগ।

ফ্লোরেন্টিনো আরিজা জানতো যে তার দেশের বিত্তশালীরা স্বল্পকালীন রোগে আক্রান্ত হয় না। হয় তারা কোন রকম সতর্ক সঙ্কেত না দিয়ে প্রায় সর্বদাই কোন একটা বড় ধরনের ছুটির দিনের আগে পট করে মরে যায়, যার ফলে শোক পালনের জন্য উৎসব অনুষ্ঠানগুলি বাতিল করে দিতে হয়, নয় তারা দীর্ঘ সময় ধরে চরম বিশ্রী রোগভোগের পর ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তাদের রোগ-ভোগের সময়ের অন্তরঙ্গ খুঁটিনাটি শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের সামনে উদঘাটিত হয়ে পড়ে। পানামায় নির্জন বাস বিত্তশালীদের জন্য প্রায় একটা বাধ্যতামূলক প্রায়শ্চিত্তের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেখানকার অ্যাডভেনটিস্ট হাসপাতালে তারা ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতো। ওই হাসপাতালটি ছিল ডারিয়েনের প্রাগৈতিহাসিক ধারাবর্ষণের মধ্যে একটি সাদা বিশাল গুদাম, যেখানে রোগীরা যে স্বল্প আয়ুষ্কাল তখনো তাদের বাকি ছিল তার হদিস রাখতে পারতো না, যার ক্যানভাসের জানালাবিশিষ্ট নির্জন ঘরে কার্বলিক অ্যাসিডের গন্ধ স্বাস্থ্যের গন্ধ নাকি মৃত্যুর গন্ধ তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারতো না। যারা সুস্থ হয়ে ফিরতো তারা সঙ্গে নিয়ে আসতো চমৎকার উপহার সামগ্রী, উদার হস্তে সেসব বিতরণ করতো এবং তারা যে তখনো বেঁচে আছে ওই রকম অবিবেচনার জন্য এক ধরনের যন্ত্রণাকাতর ব্যাকুলতার সঙ্গে সবার ক্ষমা ভিক্ষা করতো। কেউ কেউ ফিরে আসতো তাদের তলপেটে বর্বরোচিত সেলাইর আঁকিবুকি দাগ নিয়ে, যেন মুচির শন দিয়ে ওই সেলাই করা হয়েছে। লোকজন দেখা করতে এলে তারা তাদের শার্ট উঁচু করে তুলে তাদের দাগ দেখায়, যারা আনন্দের আতিশয্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে তাদের দাগের সঙ্গে নিজেদের সেলাইর দাগের তুলনা করে। যতদিন বেঁচে থাকবে তারা ততদিন ক্লোরোফর্মের প্রভাবাধীন থাকার সময় যেসব স্বর্গীয় দৃশ্য চোখের সামনে দেখেছে বারবার তার বর্ণনা দেবে। পক্ষান্তরে, যারা ফিরে আসে না তারা কী অলৌকিক দৃশ্য দেখেছে তার কথা কেউ জানতে পারে না, সব চাইতে দুঃখের, যারা যক্ষ্মারোগীদের শিবিরে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের রোগের জটিলতার চাইতেও অন্তহীন বৃষ্টি ধারার বিষণ্ণতার কারণে, তাদের কথাও কেউ জানতে পায় না।

তাকে যদি বাধ্য হয়ে একটা কিছু বেছে নিতে হয় তাহলে ফারমিনা ডাজার জন্য সে কোন নিয়তি বেছে নেবে তা ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ঠিক করতে পারলো না। যতই অসহনীয় হোক সে সব চাইতে বেশি চাইলো প্রকৃত অবস্থাটা জানতে, কিন্তু শত চেষ্টা করেও সে তা জানতে পারলো না। সে যা শুনেছে তার সমর্থনে সে কোথাও কোনো ইঙ্গিত পাবে না সেটা তার কাছে অকল্পনীয় মনে হল। নৌযানের জগতে, যা ছিল তার জগত, সব রহস্যেরই সমাধান হয়ে যায়, সেখানে কোনো গোপন কথাই গোপন থাকে না। তথাপি কালো ওড়নায় মুখ ঢাকা ওই রমণী সম্পর্কে কেউ কিছুই শোনে নি। যে শহরে সবাই সব কিছু জেনে ফেলে, ঘটনা ঘটবার আগেই যেখানে অনেক কিছু জনগণের গোচরীভূত হয়ে যায়, বিশেষ করে বিত্তশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, সেখানে এই ঘটনাটি সম্পর্কে কেউ কিছুই জানলো না। ফারমিনা ডাজার উধাও হয়ে যাওয়া সম্পর্কে কেউ কোন ব্যাখ্যা দিতে পারলো না। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা লা মাঙ্গায় পায়চারি করতে থাকলো, যাজকদের গির্জায় ধর্মীয় অনুভূতি ছাড়াই প্রার্থনা-বাণী শুনতে থাকলো, মনের অন্য রকম অবস্থায় সে যেসব নাগরিক উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পর্কে কখনো উৎসাহিত হত না সে সব অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে থাকলো, কিন্তু কালের যাত্রা সে যে গল্প শুনেছে তার বিশ্বাসযোগ্যতাই শুধু বাড়িয়ে তুললো। আর উরবিনোদের সংসারে মায়ের অনুপস্থিতি ছাড়া সব কিছুই মনে হল স্বাভাবিক।

ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যাবার সময় আরো কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে অবহিত হল যা সে আগে জানতো না কিংবা যে সব সম্পর্কে সে আগে কোন খোঁজ নেয় নি। এর মধ্যে একটি হল যে ক্যান্টাব্রিয় গ্রামে লোরেঞ্জা ভাজা জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানেই তার মৃত্যুবরণের কথা। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তাকে বহু বছর ধরে প্যারিস ক্যাফের হৈহল্লাপূর্ণ দাবার লড়াইয়ের টেবিলে দেখেছে, অনর্গল কথা বলতে বলতে তার গলা ভেঙে যেতো, দিন দিনই আরো মোটা ও আরো রুক্ষ হয়ে উঠছিলেন তিনি এবং ওই ভাবেই দুর্ভাগ্যজনক এক বার্ধক্যের চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছিলেন। গত শতাব্দীতে আনিসেট দিয়ে সেই অপ্রীতিকর প্রাতরাশের পর তারা দুজন একটি বাক্যও বিনিময় করে নি, এবং ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে লোরেঞ্জো ভাজা তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য মেয়ের একটা সার্থক বিয়ে দেয়ার কাজটি সম্পন্ন করার পরও তাকে চরম বিদ্বেষের চোখে দেখতো, সেও যেমন তাকে একই রকম বিদ্বেষের চোখে দেখতো। কিন্তু ফারমিনা ডাজার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য জানবার জন্য সে এতই দৃঢ় সঙ্কল্প ছিল যে ওর বাবার কাছ থেকে সব কিছু জানার জন্য সে আবার প্যারিস ক্যাফেতে গিয়ে হানা দিল। ঠিক ওই সময়েই জেরেমিয়া দ্য সাত-আমুর ওখানে একসঙ্গে চল্লিশ জন দাবাড়ুর বিরুদ্ধে তাঁর ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছিলেন। প্যারিস ক্যাফেতেই ফ্লোরেন্টিনো আরিজা অবগত হল যে লোরেঞ্জো ডাজা মারা গেছে, আর সে এতে সর্বান্তঃকরণে খুশি হল, যদিও এর ফলে হয়তো সারা জীবন তাকে বেঁচে থাকতে হবে সত্যটা না জেনেই। অবশেষে, মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের হাসপাতালে যাবার কাহিনীটি সে সত্য বলে গ্রহণ করে। সে তার একমাত্র সান্ত্বনা খুঁজে পায় একটা পুরনো প্রবাদ বাক্যে : ‘অসুস্থ রমণীরা অনন্তকাল বেঁচে থাকে। যেদিন সে বিশেষ হতাশাক্রান্ত হত সেদিন সে নিজেকে এই বলে আশ্বস্ত করতে যে ফারমিনা ডাজার মৃত্যু-সংবাদ, যদি সে মারা যায়, তার কাছে ঠিকই পৌঁছে যাবে, তাকে সে জন্য খোঁজ করতে হবে না।

ওই খবর তার কাছে কখনো পৌঁছে নি, কারণ ফারমিনা ডাজা জীবিত ছিল, সুস্থ ছিল, বিশ্বসংসার কর্তৃক বিস্মৃত হয়ে সে তার কাজিন হিল্ডাব্রান্ডা সাঞ্চেজের সঙ্গে বাস করছিল ফ্লোর দ্য মারিয়া গ্রাম থেকে মাইল দেড়েক দূরে এক খামারবাড়িতে। স্বামীর সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছে কোনো কেলেঙ্কারি না করে সে চলে আসে।

এত বছরের স্থিতিশীল দাম্পত্য জীবনের পর তাদের একমাত্র বড় মাত্রার সঙ্কটের সময় তারা উভয়েই দুই কিশোরের মতো সেই সঙ্কটের মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। তাদের পূর্ণবিকশিত জীবনের প্রশান্তির মধ্যে ব্যাপারটা তাদের হতকিত করে ফেলে, এমন একটা সময়ে যখন তারা মনে করছিল যে তারা বোধ হয় দুর্ভাগ্যের চোরাগুপ্তা আক্রমণের হাত থেকে মুক্ত, সন্তানরা বড় হয়েছে, ভদ্র হয়েছে, ভবিষ্যৎ এখন তাদের দুজনের জন্য প্রস্তুত, তিক্ততা ছাড়া কিভাবে বুড়ো হতে হয় তারা শুধু তার পাঠ গ্রহণ করবে। তাদের দ্বন্দ্ব এমন আকস্মিক ভাবে দেখা দেয় যে তারা উভয়েই ক্যারিবীয় প্রথানুযায়ী চিৎকার, কান্না ও অপরের মধ্যস্থতার সাহায্যে তা নিরসন করার চেষ্টা না করে ইউরোপীয় প্রজ্ঞার সাহায্যে সেটা নিরসন করার চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের মধ্যে এত দোদুলচিত্ততা দেখা গেল, তাদের আনুগত্য কি এখানে না ওখানে তা নিয়ে এত সংশয় ও দ্বিধা উপস্থিত হল যে তারা শেষ পর্যন্ত একটা বালকসুলভ পরিস্থিতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, যার অবস্থান কোথাও ছিল না। অবশেষে ফারমিনা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল, কোথায় যাবে, কেন যাচ্ছে তা সে জানে, কিন্তু তার ক্রোধ ও ক্ষোভ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল, আর ডাক্তার উরবিনো নিজের অপরাধ বোধ দ্বারা প্রতিনিবৃত্ত হয়ে ওকে বাধা দিতে পারলেন না।

প্রকৃতপক্ষে ফারমিনা ডাজা সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে একটা কালো ওড়নায় মুখ ঢেকে মাঝ রাতে জাহাজে করে শহর ত্যাগ করে, তবে কানার্ড লাইনের জাহাজে করে পানামার উদ্দেশে নয়, সে যাত্রা করে একটি নিয়মিত নৌযানে সান হুয়ান ডি লা সিনেগার উদ্দেশে, যে শহরে সে জন্মগ্রহণ করেছিল, যেখানে কৈশোরকাল পর্যন্ত তার জীবন কেটেছিল, যে স্থানটি দেখার জন্য তার ব্যাকুলতা দিন দিন বাড়ছিল এবং কালের যাত্রার মধ্য দিয়ে এখন সেটা সহ্য করা তার পক্ষে ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছিল। স্বামীর ইচ্ছা এবং সে-যুগের প্রথা উপেক্ষা করে সে শুধু বছর পনেরোর এক মেয়েকে সঙ্গী করে যাত্রা করে। ওই মেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল পরিবারের এক পরিচারিকা রূপে, ফারমিনা ডাজার ধর্মকন্যা হিসাবে। তবে ফারমিনাদের কোন অসুবিধা হয়নি। জাহাজের কাপ্তান ও বন্দর-কর্মচারীরা সর্বত্রই তার সফরসূচি পূর্বাহ্নেই পেয়ে যায়। তার হঠকারি সিদ্ধান্তটি নেবার সময় সে ছেলেমেয়েদের বলে যে সে মাস তিনেকের জন্য জায়গা বদলের উদ্দেশে তাদের মাসি হিল্ডাব্রান্ডা সাঞ্চেজের ওখানে যাচ্ছে, যদিও মনে মনে সে ঠিক করেছিল যে আর ফিরে আসবে না। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো স্ত্রীর চারিত্রিক শক্তি সম্পর্কে খুব ভালো ভাবে জানতেন, নিজের মনের বিচলিত অবস্থায় তিনি ফারমিনার সিদ্ধান্তকে তার নানা পাপের জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তি হিসাবে নতমস্তকে গ্রহণ করলেন। কিন্তু জাহাজের বাতিগুলি চোখের আড়ালে অদৃশ্য হবার আগেই তারা উভয়েই তাদের দুর্বলতার জন্য অনুতাপ বোধ করতে থাকে।

ছেলেমেয়ে এবং সাংসারিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পত্রালাপ চললেও প্রায় দু’বছর অতিক্রান্ত হবার আগে তাদের সামনে বিদ্যমান অহঙ্কারের পাহাড় তারা অতিক্রম করতে পারে নি। দ্বিতীয় বছরে ছেলেমেয়েরা তাদের স্কুলের ছুটির সময়টা কাটাতে যায় ফ্লোর ডি মারিয়াতে এবং ফারমিনা ডাজা তখন একটা অসম্ভব কাজ করে, তাকে তার নতুন জীবনে বেশ তপ্ত মনে হয়। অন্তত তার ছেলের চিঠিপত্র থেকে জুভেনাল উরবিনো ওই সিদ্ধান্তেই উপনীত হন। তাছাড়া ওই সময়ে রিওহাচার বিশপ তার একটা যাজকীয় দায়িত্ব পালন উপলক্ষে ওখানে যান। বাহন ছিল তাঁর বিখ্যাত সাদা খচ্চর, সোনার কারুকাজ সংবলিত চমৎকার গদিতে আসীন তিনি। তার পেছন পেছন চলেছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীর দল, অ্যাকর্ডিয়ান বাজানো সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ, খাবার ও তাবিজ বিক্রি করা ফেরিওয়ালারা। তিন দিন ধরে খামারবাড়ি ছিল পঙ্গু ও আশাহীন লোকজনে পূর্ণ তবে প্রকৃতপক্ষে তারা জ্ঞানগর্ভ ধর্মীয় ভাষণ শোনা কিংবা ঢালাও ক্ষমালাভের জন্য সেখানে জড়ো হয় নি, তারা এসেছিল খচ্চরটির কৃপা লাভের আশায়, তারা শুনেছে যে তার প্রভুর দৃষ্টি এড়িয়ে সে নাকি নানা অলৌকিক কাজ করতে পারে। এই বিশপ যখন একজন সাধারণ যাজক ছিলেন সেই সময় থেকেই উরবিনো ডি কল পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে তার প্রায়শ যাতায়াত ছিল। একদিন তিনি সর্বজনীন উৎসবমালা থেকে পালিয়ে হিল্ডাব্রান্ডার খামারবাড়িতে এসে উপস্থিত হন, তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজন করবেন। খাবার সময় তারা শুধু জাগতিক বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন, কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার পর তিনি ফারমিনা ডাজাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে তাঁর কাছে তাকে ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী স্বীকারোক্তি করতে বললেন। ফারমিনা নম্র ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্পষ্ট ভাবে বললো যে অনুতাপ করার মতো তার কিছুই নাই। তার উদ্দেশ্য না থাকলেও, অন্তত সচেতন ভাবে, সে নিশ্চিত জানতো যে তার এই উত্তর যথোচিত জায়গায় ঠিকই পৌঁছে যাবে।

ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো কিছু হতাশাবাদী সুর মিশিয়ে বলতেন যে তাঁর জীবনের ওই তিক্ত দু’বছরের জন্য তিনি দায়ী ছিলেন না, তার জন্য দায়ী ছিল পরিবারের সদস্যদের তাদের কাপড় ছাড়ার পর ওইসব কাপড়ের গন্ধ শোঁকার ফারমিনার অভ্যাসটি। ফারমিনা তার নিজের ছাড়া-কাপড়েরও গন্ধ শুকতো, পরিষ্কার দেখা গেলেও তা ধোয়ার দরকার আছে কিনা সেটা সে পরীক্ষা করে দেখতো। তার অল্প বয়স থেকেই সে এটা করে এসেছে এবং বিয়ের প্রথম রাতে স্বামী তার এই কাজটি লক্ষ করার পূর্ব পর্যন্ত সে এটা নিয়ে মন্তব্য করার কোন প্রয়োজনীয়তাই বোধ করে নি। তার স্বামী জানতেন যে সে দিনে তিনবার বাথরুমের দরজা বন্ধ করে সেখানে ধূমপান করে কিন্তু এটা তার বিশেষ কোন মনোযোগ আকর্ষণ করে নি কারণ তিনি জানতেন যে তার শ্রেণীর মহিলারা ঘরের দরজা বন্ধ করে দল বেঁধে পুরুষদের কথা বলে এবং ধূমপান করে, মাঝে মাঝে দুই লিটার সুরা পর্যন্ত পান করে মাতাল হয়ে ঘরের মেঝেতে তালগোল পাকিয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু সামনে কোন কাপড়-জামা পড়ে থাকতে দেখলেই সেটা নাকের কাছে তুলে নিয়ে শুকবার অভ্যাস তার মনে হল শুধু অসঙ্গত নয়, অস্বাস্থ্যকরও। স্বামীর প্রতিক্রিয়াকে সে ঠাট্টা হিসাবে গ্রহণ করলো, যা নিয়ে সে আলোচনা করতে চাইতো না তাকেই সে ওইভাবে গ্রহণ করতো এবং বলতো যে ঈশ্বর শুধু শোভার জন্য তাকে ওরিওল পাখির চক্ষু দান করেন নি। একদিন সকালে সে যখন বাজারে গিয়েছিল, বাড়ির চাকরবাকররা তার তিন বছরের ছেলেকে কোথাও দেখতে না পেয়ে তার খোঁজে সারা পাড়া সচকিত করে তোলে। বাড়ির কোথাও ছেলেকে পাওয়া গেল না। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্যে ফারমিনা বাড়ি ফিরে এসে একটা শিকারি কুকুরের মতো এদিক ওদিক কয়েকবার শুকলো, তারপর ছেলেকে আবিষ্কার করলো একটা বর্মের মধ্যে নিদ্রিত অবস্থায়। সে যে ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারে একথা কারো মাথাতেই আসে নি। তার বিস্মিত স্বামী যখন জিজ্ঞাসা করলেন সে কেমন করে তাকে খুঁজে পেল, ফারমিনার জবাব ছিল, কোকোর গন্ধ দিয়ে।

সত্যি কথা বলতে গেলে তার এই গন্ধের অনুভূতি শুধু কাপড়-জামা ধোয়া কিংবা ছেলে মেয়েদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেই নয়, তার জীবনের সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে সামাজিক অঙ্গনে, অত্যন্ত সার্থক ভূমিকা পালন করে। জুভেনাল উরবিনো তাঁর সমগ্র বিবাহিত জীবনের আগাগোড়া, বিশেষ করে প্রথম দিকে, এটা লক্ষ করেছেন। ফারমিনা ডাজা এমন একটা পরিবেশে এসে পড়ে যা ছিল তার জন্য তিন শতাব্দীর বৈরী সংস্কারে আচ্ছন্ন, তবু সে তার মধ্য দিয়ে সাবলীল ভাবে এগিয়ে গেছে, চারপাশের তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার ছুরি তাকে স্পর্শ করে নি, কারো সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে নি, ওই জগতকে সে এমন সহজ ভাবে নিজের আয়ত্তে এনে ফেলে যাকে শুধু অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা রূপেই চিহ্নিত করা যায়। এই আতঙ্কজনক ক্ষমতার উৎস হয়তো ছিল যুগ যুগের একটা প্রজ্ঞার মধ্যে, পাথরের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে যেমন থাকে, আর ওই ক্ষমতা। এক অশুভ রবিবারে, উপাসনা অনুষ্ঠানের ঠিক আগে আগে, তার দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হল। ফারমিনা ডাজা নিতান্ত অভ্যাসের বশে স্বামীর গত রাতে পরা পোশাক নাকের কাছে তুলে শুকলো, আর তখনই তার, একটা অস্বাভাবিক অনুভূতি হল, তার স্বামী অন্য একটি পুরুষের সঙ্গে শুয়েছে।

প্রথমে সে কোট এবং ওয়েস্টকোটের গন্ধ নিল, বোতামঘর থেকে ঘড়ির চেইন খুলে নিল, পকেট থেকে পেন্সিলের খাপ, টাকার ব্যাগ, খুচরা পয়সা সব বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখলো, শার্ট থেকে টাইপিন, টোপাজ পাথরের কাফ লিঙ্কস, সোনার কলারের বোতম খুলে নিয়ে শার্টটা শুকলো, তারপর প্যান্ট থেকে এগারোটা চাবিসহ চাবির খাপ ও মুক্তার হাতল দেয়া ছোট পেন্সিলকাটা ছুরি বের করে প্যান্টটা শুকলো এবং সব শেষে সে আন্ডারওয়্যার, মোজা আর নামের আদ্যাক্ষর এম্বয়ডারি করা রুমালটার গন্ধ নিল। এই সবগুলি জিনিসের মধ্যে নিঃসন্দেহে এমন একটা গন্ধ পাওয়া গেল যা তাদের এত বছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যে কখনোই পাওয়া যায় নি, কিন্তু ওই গন্ধকে কিছুতেই সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত করা গেল না, কারণ ওটা কোন ফুল বা কৃত্রিম সুরভি দ্রব্যের গন্ধ ছিল না, বরং এমন একটা গন্ধ ছিল যা একান্তভাবে মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফারমিনা কিছু বলল না, ওই গন্ধ সে রোজ পেল না, কিন্তু এখন সে আর তার স্বামীর জামাকাপড় ধুতে দেবার প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের জন্য কতো না, সে ওকাজটা করতো তার অন্তরাত্মা কুরে কুরে খাওয়া এক অসহনীয় দুশ্চিন্তা নিয়ে।

স্বামীর নিত্য নৈমিত্তিক কাজের মধ্যে তার কাপড়ে ওই গন্ধের উৎস সে কোথায় খুঁজবে ফারমিনা ডাজা বুঝে উঠতে পারলো না। তাঁর সকালের ক্লাস ও দুপুরের খাওয়ার সময়ের মধ্যে এটা হতে পারে না, কারণ কোন সুস্থ মনের মহিলা দিনের ওই সময়ে প্রেমলীলায় লিপ্ত হতে পারেন বলে ফারমিনার মনে হল না, বিশেষ করে একজন দর্শনার্থীর সঙ্গে, যে সময়ে তখনো বাকি পড়ে থাকে ঘরদোর পরিষ্কার করা, বিছানা করা, বাজার করা, রান্না করা, তাছাড়া হয়তো এর সঙ্গে কোন নতুন দুশ্চিন্তাও যুক্ত হয়, সন্তানদের একজনকে স্কুল থেকে সময়ের আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, কেউ তার দিকে পাথর ছুঁড়ে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, আর সকাল এগারোটায় বাড়ি পৌঁছে সে দেখলো যে তার মা এলোমেলো বিছানায় নগ্ন হয়ে শুয়ে আছেন, আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার, তার উপর পড়ে আছেন এক ডাক্তার। ফারমিনা আরো জানতো যে ডাক্তার সঙ্গমে লিপ্ত হতেন শুধু রাতের বেলায়, পরিপূর্ণ অন্ধকারে হলেই সব চাইতে ভালো, শেষ অবলম্বন হিসাবে প্রাতরাশের আগে আগে, পাখিরা যখন সবেমাত্র কূজন করতে শুরু করেছে। তিনি বলতেন, এর পরে, দিনের বেলার যৌন-মিলনের মধ্যে আনন্দের চাইতে কাজের ভাগই ছিল বেশি, কাপড় খোলো, তারপর আবার গায়ে চাপাও। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী দেখার সময় কিংবা তার দাবা খেলা ও ছায়াছবি দেখার রাত থেকে কিছু মুহূর্ত চুরি করে নেয়া সময়ের মধ্যে তাঁর কাপড়ের এই দূষণ ঘটেছে। এই শেষোক্ত সম্ভাবনা প্রমাণ করা ছিল খুব দুরূহ, কারণ সে তার অন্যান্য বন্ধুদের মতো ছিল না, স্বামীর ওপর গোয়েন্দাগিরি করা কিংবা অন্য কাউকে তা করতে বলা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, তার আত্মমর্যাদা ও অহঙ্কারে বাধতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী দেখার সময়টাই ছিল বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য সব চাইতে প্রশস্ত, এবং এটার উপর চোখ রাখাও ছিল সব চাইতে সহজ, কারণ ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো তার সময়সূচি, প্রত্যেক রোগীর বিশদ বিবরণ, প্রাপ্ত অর্থের অঙ্ক প্রভৃতি লিখে রাখতেন। তাদের প্রথম দেখতে যাওয়ার দিন থেকে আরম্ভ করে ক্রসের চিহ্ন ও তাদের আত্মার ত্রাণ কামনায় কিছু উক্তি করে শেষ বিদায় জ্ঞাপন করার পূর্ব পর্যন্ত এই লিখিত বিবরণ তিনি রাখতেন।

পরবর্তী তিন সপ্তাহে ফারমিনা ডাজা কয়েকদিন ধরে স্বামীর জামা-কাপড়ে ওই গন্ধটা পেলো না, তারপর সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে সে আবার ওই গন্ধ পেলো, আগের চাইতেও উগ্র, সে ওই গন্ধ পেলো পর পর কয়েক দিন, যদিও তার মধ্যে একদিন ছিল রবিবার, সেদিন একটা পারিবারিক সম্মিলন ছিল, আর তারা দুজন এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হয় নি। তার চিরাচরিত প্রথা এমনকি তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে এক অপরাহ্নে তার স্বামীর অফিস ঘরে গিয়ে উপস্থিত হল, যেন সে অন্য একজন মানুষ এবং এমন একটা কাজ করলো যা সে কখনো করতো না, সে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে তার স্বামী বিগত কয়েক মাসে রোগী দেখতে যে সব বাড়ি গেছেন এবং তার জটিল নোট রেখেছেন সেগুলি মনোযোগ দিয়ে দেখলো। এই প্রথম সে একা ওই আপিসে গেছে। ঘরময় আলকাতরাজাত তেলতেলে ক্রিওসোটের গন্ধ, অচেনা জানোয়ারদের চামড়ায় বাঁধানো অজস্র বইপত্র, ঝাঁপসা হয়ে যাওয়া স্কুল জীবনের ছবি, সম্মানসূচক ডিগ্রি, গ্রহ-নক্ষত্র দেখার জন্য একটা অ্যাস্ট্রোলেইব যন্ত্র, বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত কারুকাজ করা কয়েকটা ছোরা : একটা গোপন পুণ্যস্থান, তার স্বামীর ব্যক্তিগত জীবনের একমাত্র অংশ যেখানে তার প্রবেশাধিকার নাই, কারণ এখানে ভালোবাসার কোন স্থান ছিল না, তাই যে অল্প কয়েকবার সে এখানে এসেছে। তা ঘটেছে তার স্বামীর সঙ্গে এবং সর্বদাই অল্প সময়ের জন্য। তার মনে হত যে এখানে একা যাবার কোন অধিকার তার নাই, লুকিয়ে কোন কিছু দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আজ সে সেখানেই এসেছে। সত্যটা তাকে আবিষ্কার করতেই হবে। সে প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে এবং কী যে জানবে তা ভেবে চরম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে খুঁজতে লাগলো। তার স্বভাবজ অহঙ্কারের চাইতে প্রবল, এমনকি তার মর্যাদা বোধের চাইতেও প্রবল এক অপ্রতিরোধ্য হাওয়া তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলে : একটা অসম্ভব যন্ত্রণার কুহকজালে সে আচ্ছন্ন হল।

সে কোন রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো না, কারণ তাদের পারস্পরিক বন্ধুবর্গের বাইরে ডাক্তারের রোগীরা ছিল তার একান্ত নিজস্ব ভুবনের অংশ, তারা ছিল পরিচয়হীন মানুষ, তাদের পরিচয় ছিল তাদের চেহারা দিয়ে নয়, তাদের রোগ-যন্ত্রণা দিয়ে, তাদের চোখের রঙ কিংবা হৃদয়ের লুকোচুরি দিয়ে নয়, তাদের যকৃতের আকার, তাদের জিভের ওপর আস্তরণ, তাদের প্রস্রাবে রক্ত-চিনির পরিমাণ, জুরাক্রান্ত রজনীতে তাদের দৃষ্টিভ্রম দিয়ে। ওই লোকগুলি তার স্বামীর ওপর আস্থাশীল ছিল, তারা ভাবতো যে তার কারণেই ওরা বেঁচে আছে, যদিও আসলে তারা বেঁচে ছিল তার স্বামীর স্বার্থেই এবং শেষ পর্যন্ত তারা পরিণত হত মেডিক্যাল ফাইলে তার স্বামীর নিজের হাতে লেখা, একেবারে তলার দিকে, একটি বাক্যে : ‘শান্ত হোন, ঈশ্বর দরজায় দাঁড়িয়ে আপনার প্রতীক্ষা করছে। দু’ঘণ্টা নিষ্ফল পরিশ্রমের পর ফারমিনা ডাজা ডাক্তারের অফিসঘর ত্যাগ করলো, তার মনে হল সে যেন একটা অশোভনতা দ্বারা নিজেকে প্রলুব্ধ হতে দিয়েছে।

কল্পনা তাড়িত হয়ে সে তার স্বামীর মধ্যে নানা পরিবর্তন আবিষ্কার করতে শুরু করলো। তার মনে হল স্বামী যেন এড়িয়ে যেতে সচেষ্ট, খাবার টেবিলে এবং শয্যায় যেন তার ক্ষুধা বা জৈব আকাঙ্ক্ষা নাই, অল্পতেই রাগ করছেন, ব্যঙ্গাত্মক উত্তর দিচ্ছেন, আগে বাড়িতে যেমন একজন প্রশান্ত মানুষ ছিলেন এখন তার পরিবর্তে তিনি যেন একটি খাঁচায় আটকানো সিংহ। তাদের বিয়ের পর এই প্রথম সে তার স্বামীকে দেরিতে ঘরে ফিরতে দেখলে তার সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতে শুরু করলো, সত্যটা বের করবার জন্য তাঁকে মিথ্যা কথা বলতে লাগলো, তারপর স্বামীর কথার মধ্যে স্ববিরোধিতা আবিষ্কার করলে মর্মাহত হতো। এক রাতে ভীষণ চমকে সে ঘুম থেকে জেগে উঠলো, তার মনে হল তার স্বামী যেন তার দিকে চরম ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আছেন। সে ভয়ে শিউরে উঠলো। তার যৌবনে সে একবার ওই রকম ভয় পেয়েছিল, তার মনে হয়েছিল ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার খাটের পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে তাকে এক দৃষ্টিতে দেখছে, কিন্তু সে-দৃষ্টি ছিল প্রেমে পূর্ণ, ঘৃণায় নয়। তাছাড়া, এবার এটা কোন দৃষ্টিবিভ্রম ছিল না, ভোর রাত দু’টার দিকে তার স্বামী সত্যিই বিছানায় উঠে বসে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সে যখন ওঁকে জিজ্ঞাসা করলো, কেন, তখন তিনি ব্যাপারটা অস্বীকার করলেন, আবার বালিশে মাথা রেখে বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখেছে।‘

ওই সময়ে, ওই রাতের পর, একাধিকবার একই রকম ঘটনা ঘটে। ফারমিনা ডাজা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারলো না কোনটা বাস্তব কোনটা মায়া কল্পনা, তার অবধারিত ভাবে মনে হল সে বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছে। শেষে তার খেয়াল হল যে তার স্বামী এবার কর্পাস ক্রাইস্টির বৃহস্পতিবার অথবা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলির কোনো রবিবারেই যিশু খ্রিস্টের শেষ ভোজ উপলক্ষে কমিনিউন অনুষ্ঠানে যোগ দেন নি, ধর্মকর্মের জন্য প্রতি বছর তিনি যে কিছু সময়ের জন্য নিয়মিত নির্জন বাসে যেতেন এবার তা করবার সময়ও তিনি পান নি। ফারমিনা যখন তার আত্মিক স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এরকম অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলো তখন তিনি উত্তর এড়িয়ে গেলেন। এর মধ্যেই ছিল চূড়ান্ত সূত্র, কারণ আট বৎসর বয়সে প্রথম কমিনিউন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর থেকে তিনি কোন গুরুত্বপূর্ণ ভোজ দিবসে কমিনিউনে যোগদান থেকে বিরত থাকেন নি। ফারমিনা বুঝলো যে তার স্বামী একটা মারাত্মক পাপ করেছেন এবং যেহেতু তিনি যাজকের কাছে গিয়ে স্বীকারোক্তি করে তাঁর সাহায্য নিচ্ছেন

অতএব তিনি সেই পাপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সে কখনো কল্পনা করে নি যে প্রেমের সম্পূর্ণ বিপরীত একটা অনুভূতি থেকে সে কখনো এত যন্ত্রণা পাবে, কিন্তু তাই সে পেতে লাগলো। সে সিদ্ধান্ত নিল, যে সাপের বাসাগুলি তার আত্মাকে বিষিয়ে দিচ্ছে সেগুলি পুড়িয়ে না ফেললে সে বাঁচতে পারবে না। আর তাই সে করলো। একদিন বিকালে সে বারান্দায় বসে মোজা রিফু করছিল, স্বামী তাঁর দিবানিদ্রা শেষে নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে একটা বই পড়ছিলেন, হঠাৎ সে তার সেলাই থামিয়ে চশমাটা কপালের উপর ঠেলে দিয়ে, কোন রকম কাঠিন্য ছাড়া, একটা ব্যাখ্যা চাইলো :

‘ডাক্তার।’

ডাক্তার তখন ‘পেঙ্গুইনের দ্বীপ’-এর মধ্যে ডুবে ছিলেন। সে সময় সবাই ওই বইটি পড়ছিলো। তিনি অন্যমনস্ক ভাবে জবাব দিলেন, ‘উঁ।‘ ফারমিনা ছেড়ে দিল না, ‘আমার দিকে তাকাও’, সে বললো।

তিনি তাকালেন, তার পড়ার চশমার ধোয়াশার মধ্য দিয়ে তাকে ভালো দেখতে পেলেন না, কিন্তু চশমা না খুলেই তিনি তার চোখের আগুনে যেন পুড়ে গেলেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে?

ফারমিনা বললো, সেটা তুমি আমার চাইতে ভালো জানো।

আর কিছু বললো না সে। চশমাটা নামিয়ে সে আবার মোজা রিফু করতে থাকলো। ডাক্তার জুভেনাল বুঝলেন যে যন্ত্রণার দীর্ঘ কাল শেষ হতে চলেছে। মুহূর্তটি যেমন হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন তেমন হল না, বুকের মধ্যে ভূমিকম্পের স্পন্দন অনুভব করলেন না তিনি, তার পরিবর্তে এমন একটা আঘাত অনুভব করলেন যা শান্তি এনে দেয়, একটা মুক্তির স্বাদ পেলেন তিনি, আগে হোক বা পরে হোক এটা ঘটতোই, এখন পরের চাইতে আগেই ঘটে গেল এটা : অবশেষে মিস বারবারা লিঞ্চ-এর প্রেতাত্মা তার গৃহে প্রবেশ করলো।

চার মাস আগে মিসেরিকর্ডিয়া হাসপাতালের ক্লিনিকে তার সঙ্গে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। মহিলা তার ডাক পড়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ডাক্তার তাকে দেখামাত্র বুঝলেন যে তার নিয়তিতে এই মাত্র মেরামতের অযোগ্য একটা কিছু ঘটে গেল। সে ছিল দীর্ঘাঙ্গী, শোভন ও রুচিশীল, ত্বকের রঙ ও কোমলতা ঝোলা গুড়ের মতো, চওড়া হাড়ের এক বর্ণসঙ্কর রমণী। সেদিন সকালে তার পরনে ছিল গোল গোল সাদা ফুটকি দেয়া লাল একটা জামা, ওই কাপড়েরই একটা চওড়া প্রান্তের টুপি মাথায়, কপাল ঢেকে প্রায় চোখের পাতা পর্যন্ত টুপির প্রান্তটা নামানো। অন্যান্য মানুষের চাইতে তার যৌনতা মনে হল বেশি প্রকট। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো ক্লিনিকে রোগী দেখতেন না, তবে তার সামনে দিয়ে যখনই যেতেন তখনই তার ভেতরে ঢুকে তার উচ্চতর পর্বের ছাত্রদের মনে করিয়ে দিতেন যে একটা ভালো রোগ নির্ণয়ের চাইতে উত্তম কোন ওষুধ নাই। তাই সেদিন অনির্ধারিত ওই বর্ণ-সঙ্কর রমণীর পরীক্ষাকার্য চলার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করে নিলেন। তার ছাত্ররা যেন তার কোন ভঙ্গি দ্বারা বুঝতে না পারে যে তিনি এক্ষেত্রে একটা বিশেষ উৎসাহ নিচ্ছেন সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকলেন, রোগিনীর দিকে তিনি প্রায় তাকালেনই না, কিন্তু তার নাম ও ঠিকানা তিনি তাঁর স্মৃতিতে গেঁথে নিলেন। সেদিন বিকালে, নির্ধারিত শেষ রোগীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি তাঁর গাড়িকে ওই রমণীর বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। ক্লিনিকে তার অফিস ঘরে মেয়েটি তাকে তার ঠিকানা দিয়েছিল। আর সত্যিই তার বাড়ির সামনের চত্বরে তাকে দেখা গেল, ঠাণ্ডার মধ্যে বসে সে আরাম করছে।

ওটা ছিল একটি আদর্শ অ্যান্টিলীয় বসতবাড়ি। আগাগোড়া হলুদ রঙ করা, টিনের ছাদ পর্যন্ত, জানালায় ক্যানভাসের পর্দা, দোরগোড়ায় কার্নেশন ফুলের কয়েকটা টব, দরজার দু’পাশে ফানগাছ ঝুলছে। বাড়িটাকে মালা ক্রিয়াঞ্জার লবণাক্ত জলাভূমির উপর কাঠের পাইলিং দিয়ে বসানো হয়েছে। ঘরের চাল থেকে ঝুলিয়ে দেয়া খাঁচায় বসে একটা টুপিয়াল গান গাইছে। রাস্তার ওপাশে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়, সেখান থেকে ছেলেমেয়েরা হৈ হুল্লা করতে করতে রাস্তায় ছুটে আসছে, তাই গাড়োয়ানকে তার লাগামের ওপর শক্ত হাত রেখে ঘোড়ার গতিকে আস্তে করতে হল, যেন সেটা চমকে না যায়। এটা ছিল সৌভাগ্যজনক, কারণ মিস বারবারা লিঞ্চ ডাক্তারকে চিনবার সময় পায়। সে হাত নেড়ে তাকে সম্ভাষণ করলো, যেন তারা অনেক দিনের পুরনো বন্ধু, তারপর হৈহল্লা একটু থিতিয়ে এলে তাকে এক পেয়ালা কফি পানের আমন্ত্রণ জানালো। ডাক্তার সানন্দে সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন, যদিও তিনি সাধারণত কফি পান করতেন না। মেয়েটি তার কথা বলতে থাকলো আর ডাক্তার সানন্দে তার কথা শুনে গেলেন। সেদিন সকাল থেকে এই রমণীই তার সারা মন জুড়ে ছিল, বিরতিহীন ভাবে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তাই থাকে। তার বিয়ের অল্প কয়েকদিন পর তার এক বন্ধু ফারমিনার উপস্থিতিতে একটা কথা বলেছিল। আগে হোক কিংবা পরে হোক ডাক্তার একটা তীব্র প্রবল প্রেমের মুখোমুখি হবেন যা তার বিবাহের স্থিতিশীলতা পর্যন্ত বিপন্ন করে ফেলতে পারে। ডাক্তার ভেবেছিলেন যে তিনি নিজেকে ভালো করে চেনেন, তার নৈতিক শিকড়ের শক্তি তার জানা আছে, বন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণী তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ওই কথাই সত্য হয়ে দেখা দিল।

ধর্মতত্ত্বে পি.এইচডি, পাওয়া মিস বারবারা লিঞ্চ ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ শীর্ণকায় প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক রেভারেন্ড জোনাথান বি. লিঞ্চের একমাত্র সন্তান। রেভারেন্ড লিঞ্চ লবণাক্ত জলাভূমিগুলির দারিদ্রপীড়িত বসতিসমূহে একটা খচ্চরের পিঠে চড়ে ধর্মের বাণী প্রচার করে বেড়াতেন। বারবারা ভালো স্প্যানিশ বলতো, বাক্য গঠনে একটু কর্কশতা ছিল, যে সামান্য ভুলচুক হত তা তার আকর্ষণকে আরো বাড়িয়ে দিতো। সামনের ডিসেম্বরে তার বয়স হবে আঠাশ বছর, একজন যাজককে বিয়ে করেছিল সে, ভদ্রলোক তার বাবার ছাত্র ছিল, দু’বছর অসুখী দাম্পত্য জীবন যাপনের পর সে তাকে তালাক দেয় এবং ওই অপরাধ দ্বিতীয় বার করার তার কোন ইচ্ছা নাই। সে বলল, ‘আমার টুপিয়াল ছাড়া আমার আর ভালোবাসার কিছু নাই।‘ তার ওই উক্তির পেছনে যে কোন গোপন অভিসন্ধি থাকতে পারে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো তেমন ভাবেন নি। পক্ষান্তরে, তিনি নিজে বিভ্রান্ত বোধ করলেন, তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, এই যে ঈশ্বর এতোগুলি সুযোগ একত্রিত করে দিচ্ছেন এর মধ্যে কি তার কোন বিভ্রান্তি নেই, এর জন্য নিশ্চয়ই তাকে একটা বড়ো মূল্য দিতে হবে, কিন্তু তিনি অবিলম্বে ওই চিন্তাকে তার মনের বিভ্রান্ত অবস্থাপ্রসূত একটা ধর্মতাত্ত্বিক আগডুম বাগড়ম বলে বাতিল করে দিলেন।

বিদায় নেবার আগের মুহূর্তে ডাক্তার উরবিনো সেদিন সকালের ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পর্কে একটা আকস্মিক মন্তব্য করেন। তিনি জানতেন যে রোগীরা তাদের অসুখ সম্পর্কে আলাপ করার চাইতে আর কোন কিছুতে এতো আনন্দ পায় না। আর সে এতো চমৎকার ভাবে তার অসুখের কথা বলেছিল যে ডাক্তার কথা দিলেন, তাকে আরো ভালো ভাবে পরীক্ষা করার জন্য তিনি আগামীকাল ঠিক চারটার সময় আবার এখানে আসবেন। ওর মুখ শুকিয়ে গেল, সে জানতো যে তার মতো নামিদামি ডাক্তারের ফী দেয়ার ক্ষমতা তার নাই, কিন্তু ডাক্তার ওকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আমাদের এই পেশায় আমরা ধনীদের কাছ থেকে গরিবদের খরচটা আদায় করে নেবার চেষ্টা করি।‘ তারপর তিনি তার নোট বই-এ টুকে নিলেন, ‘মিস বারবারা লিঞ্চ, মালা ক্রিয়াঞ্জা লবণাক্ত জলাভূমি, শনিবার বিকাল চারটা।‘ বেশ কয়েক মাস পরে ফারমিনা ডাজা ওই লেখাটা পড়ে, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিশদ তথ্য, রোগের ক্রমবিবর্তন ইত্যাদি। নামটা তার মনোযোগ আকর্ষণ করে, অকস্মাৎ তার মনে হয় ও বোধ নিউ অর্লিয়ান্সের ফলের জাহাজে করে আসা অসচ্চরিত্র শিল্পীদের একজন, কিন্তু ঠিকানাটা দেখে তার ধারণা হল ও নিশ্চয়ই জ্যামেইকা থেকে এসেছে, একটা কালো মেয়ে এবং সে দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই তার নাম খারিজ করে দিল, কারণ ওই রকম মেয়ে তার স্বামীর পছন্দের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।

শনিবার দিন ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো সাক্ষাতের নির্ধারিত সময়ের দশ মিনিট আগে এসে উপস্থিত হল, মিস লিঞ্চ তখনো তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্য কাপড়জামা পরে তৈরি হয় নি। ডাক্তার উরবিনো প্রচণ্ড স্নায়বিক চাপ অনুভব করছিলেন, পারীতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য হাজিরা দেবার পর তাঁর আর কখনো এরকম অবস্থা হয় নি। বারবারা তার ক্যানভাস খাটে শুয়ে পড়লো, তার পরনে সিল্কের পাতলা একটা অন্তর্বাস জাতীয় পোশাক, তার সৌন্দর্যের যেন কোন সীমা পরিসীমা নাই। তার সব কিছুই ছিল বড়োসড়ো, তীব্র, তার মোহিনী নারীর উরু, তার ধীরে ধীরে আগুন ধরানো ত্বক, তার বিস্ময়কর স্তনযুগল, তার নিখুঁত দন্তপাটি ও স্বচ্ছ মাড়ি, তার সমগ্র দেহ থেকে যেন সুস্বাস্থ্যের একটা ভাপ বিকীর্ণ হচ্ছিল, আর ফারমিনা ডাজা তার স্বামীর কাপড়ে এই মানুষী গন্ধই আবিষ্কার করেছিল। বারবারা জানালো যে সে ক্লিনিকে গিয়েছিল কারণ তার একটা শারীরিক কষ্ট হচ্ছিল, মধুর ভঙ্গিতে সে তাকে অভিহিত করলো ‘প্যাচানো মলাশয়’ বলে। ডাক্তার উরবিনো বললেন যে এ জাতীয় উপসর্গ উপেক্ষা করা অনুচিত। তাই তিনি তার হাত দিয়ে ওর দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদি পরীক্ষা করলেন, যতখানি মনোযোগের সঙ্গে তার চাইতে বেশি ইচ্ছার সঙ্গে এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন যে এই প্রাণীটি বাইরে যেমন সুন্দর ভেতরেও তেমনি, তারপর তিনি সোল্লাসে স্পর্শের আনন্দের মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে দিলেন, তখন তিনি আর বিস্তীর্ণ ক্যারিবীয় উপকূল অঞ্চলের সব চাইতে যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক নন, তিনি শুধু তার প্রচণ্ড বিশৃঙ্খল স্বজ্ঞাতাড়িত যন্ত্রণাকাতর এক বেচারা পুরুষ মানুষ। তার কঠোর পেশা-জীবনে এর আগে মাত্র একবার এই রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল এবং সেটা ছিল তার জীবনের একটা চরম লজ্জা, কারণ তাঁর ক্রুদ্ধ রোগী একঝটকায় তাঁর হাত সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসে বলেছিল, আপনি যা চাইছেন সেটা হয়তো হতে পারে, কিন্তু এভাবে নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মিস লিঞ্চ নিজেকে তাঁর হাতে পুরোপুরি সমর্পণ করল এবং যখন সে সুনিশ্চিত হল যে ডাক্তার আর তার বিজ্ঞানের কথা ভাবছেন না তখন সে বলল, আমার ধারণা ছিল আপনাদের নীতিমালা এসব অনুমোদন করে না।

ডাক্তারের সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল তিনি যেন পুরো জামা কাপড় পরা অবস্থায় কোনো জলাশয় থেকে উঠে এসেছেন। একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ-হাত মুছতে মুছতে তিনি বললেন, আমাদের নীতিমালা মনে করে যে আমরা কাঠের তৈরি।’ বারবারা বললো, আমার ধারণার অর্থ এই নয় যে আপনি ওটা করতে পারবেন না। আমার মতো এক গরিব কালো মেয়েকে এতো বিখ্যাত একজন লোক লক্ষ করেছেন এ কী ভাবা যায়। ডাক্তার বললেন, তোমার কথা না ভেবে আমার একটি মুহূর্তও কাটে নি।’ এই স্বীকারোক্তি ছিল এতোই কাতর ও কম্পমান যে এটা হয়তো অনুকম্পার উদ্রেক করতে পারতো কিন্তু বারবারা হেসে উঠে সে আঘাতটা কাটিয়ে দিল। তার হাসিতে শোবার ঘরটি আলোকিত হয়ে ওঠে। হাসতে হাসতে সে বললো, আপনাকে হাসপাতালে দেখার পর থেকেই আমি তা জানি, ডাক্তার। আমি কালো হতে পারি কিন্তু বোকা নই।’

কাজটা সহজ হয় নি। মিস লিঞ্চ চাইলো তার সম্ভ্রম যেন রক্ষিত হয়, সে চাইলো নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা, ওই ক্রম অনুসারে, আর তার বিশ্বাস এসব তার প্রাপ্য। সে তাকে প্রলুব্ধ করার সুযোগ দিল ডাক্তার উরবিনোকে, কিন্তু তাঁকে তার ভেতরের। খাস-কামরায় ঢুকতে দিল না, এমনকি সে যখন বাড়িতে একা তখনও না। ডাক্তারকে তার নীতিমালা ইচ্ছা মতো লঙ্ঘন করার সুযোগ দিয়ে সে তাকে হাতের স্পর্শ দ্বারা ও বুকে কান লাগিয়ে পরীক্ষা কাজ চালাতে দিল, কিন্তু তার কাপড়-জামা না খুলে। ডাক্তারের দিক থেকে, একবার টোপ গেলার পর তিনি আর ছাড়তে পারলেন না, ব্যাপারটা একটা দৈনন্দিন অভিযান হয়ে দাঁড়ালো। বাস্তব কারণেই মিস লিঞ্চের সঙ্গে এই সম্পর্ক অব্যাহত রাখা ডাক্তারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে কিন্তু এটা বন্ধ করার মতো যথেষ্ট শক্তি তিনি পেলেন না, পরবর্তী সময়ে যেমন আরো অগ্রসর হবার মতো শক্তিও তিনি পান নি। এই পর্যন্তই ছিল শেষ সীমারেখা।

রেভারেন্ড লিঞ্চ অনিয়মিত জীবনযাপন করতেন। তিনি মুহূর্তের তাড়নায় তার খচ্চরে চেপে বেরিয়ে পড়তেন, একদিকে ঝুলিয়ে নিতেন তার বাইবেলগুলি আর ধর্মীয় পুস্তিকাবলী এবং অন্য দিকে কিছু খাদ্যবস্তু, তারপর যখন কেউ তাকে প্রত্যাশা করছে না তখন হঠাৎ করে ফিরে আসতেন। আরেকটা অসুবিধা ছিল রাস্তার ওপাশের বিদ্যালয়টি। ছেলেমেয়েরা তাদের পড়া উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করতে করতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতো এবং সব চাইতে পরিষ্কার ভাবে তারা দেখতে পেতো রাস্তার ওপাশের এই বাড়িটি, সকাল দু’টা থেকে তার দরজা-জানালা হাট করে খোলা; তারা মিস লিঞ্চকে তাঁর পাখির খাঁচাটা ঘরের চালের প্রান্ত থেকে ঝুলিয়ে দিতে দেখতো, পাখিটা যেন ছেলেমেয়েদের ওই আবৃত্তি করা পড়া গলায় তুলে নিতে পারে; তারা দেখতো উজ্জ্বল রঙের একটা পাগড়ি মাথায় জড়িয়ে তিনি তাঁর ঘর-সংসারের কাজ করছেন, তার অসম্ভব সুন্দর ক্যারিবীয় কণ্ঠে তিনিও তাদের পাঠ আবৃত্তি করে চলেছেন; পরে বিকাল বেলায় তারা তাঁকে দেখতো তিনি বারান্দায় বসে গুনগুন করে বাইবেলের স্তুতিগান আবৃত্তি করছেন।

অতএব তাঁদের এমন একটা সময় বেছে নিতে হত যখন স্কুলের ছেলেমেয়েরা ওখানে থাকবে না। এর জন্য মাত্র দুটো সম্ভাবনা খোলা ছিল : দুপুরের খাবার জন্য বিরতির সময়, বারোটা থেকে দুটার মধ্যে, যেটা ছিল আবার ডাক্তারেরও দ্বিপ্রহরিক খাওয়ার সময়, আরেকটা ছিল সন্ধ্যার দিকে, ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি চলে যাবার পরে। এই শেষেরটিই ছিল সব চাইতে ভালো সময়, যদিও বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী দেখা শেষ করে ডাক্তারের হাতে তখন মাত্র অল্প কয়েক মিনিট সময় থাকতো, কারণ ঘরে ফিরে তাকে পরিবারের সঙ্গে নৈশাহারে যোগ দিতে হতো। তৃতীয় আরো একটা সমস্যা ছিল, সেটা ছিল তার নিজের পরিস্থিতি নিয়ে। নিজের গাড়ি ছাড়া ওখানে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, আর তাঁর গাড়িটি ছিল অত্যন্ত সুপরিচিত, আর গাড়িটিকে ওর দোরগোড়ায় অপেক্ষা করে থাকতে হত। তিনি কোচোয়ানকে তাঁর সহায়তাকারী করে নিতে পারতেন, তার সোশ্যাল ক্লাবের অনেক বন্ধু তাই করতো, কিন্তু ওরকম করা ছিল তাঁর প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। বস্তুতপক্ষে, মিস লিঞ্চের ওখানে তার যাওয়াটা খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলে তাঁদের উর্দিপরা পারিবারিক কোচোয়ান একদিন সাহস করে বলেই ফেলে, সে যদি তাকে ওখানে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় এবং পরে আবার এখানে এসে তাকে তুলে নিয়ে যায় তাহলে কি ভালো হয় না, সে ক্ষেত্রে মিস লিঞ্চের বাড়ির সামনে তাঁর গাড়ি এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। ডাক্তার উরবিনো তখন তার স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিহীন কর্কশ ভাষায় ওকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এই প্রথম আমি তোমাকে একটা অনুচিত কথা বলতে শুনলাম, ঠিক আছে, আমি ধরে নেবো যে তুমি কিছু বলো নি।

তাঁর সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। এই শহরের মতো একটা শহরে ডাক্তারের গাড়ি কোন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে অসুখের খবর লুকিয়ে রাখা ছিল অসম্ভব। মাঝে মাঝে, দূরত্ব বেশি না হলে, ডাক্তার নিজেই উদ্যোগী হয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা ভাড়াটে গাড়ি করে রোগীর বাড়ি যেতেন যেন রোগটা সম্পর্কে কেউ অকালে কিংবা বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে কোন ধারণা পোষণ না করে। এসব ছলনায় অবশ্য কোন কাজ হত না। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের ভিত্তিতে ওষুধের দোকান থেকে সত্যটা প্রকাশিত হয়ে পড়তো। রোগীর শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার পবিত্র অধিকার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ডাক্তার উরবিনো, তাই, সঠিক ওষুধের পাশাপাশি বেশ কিছু নকল ওষুধের ব্যবস্থাপত্রও দিতেন। একই ভাবে মিস লিঞ্চের বাড়ির সামনে তাঁর গাড়ির অবস্থান তিনি নানা রকম সত্য উক্তি দ্বারাই ব্যাখ্যা করতে পারতেন, কিন্তু অত দীর্ঘ সময়ের জন্য ওটার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যাপারটার কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হত না।

জগতটা তার জন্য নরক হয়ে উঠলো। তবে এখন প্রাথমিক উন্মত্ততাটা প্রশমিত হয়েছে, ঝুঁকির মাত্রা উভয়েই উপলব্ধি করেছে এবং একটা কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হবার মতো সাহস বা সঙ্কল্প ডাক্তার জুভেনাল উরবিনোর কখনোই ছিল না। কামনার উন্মত্ত মুহূর্তে তিনি সব রকম প্রতিশ্রুতিই দিতেন, কিন্তু সেটা পার হয়ে গেলে তিনি সব কিছুই পেছনে ঠেলে দিতেন পরবর্তী কোন সময়ের জন্য। অন্য দিকে, ওর জন্য তার কামনা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে ওকে হারাবার ভয়ও তার বৃদ্ধি পেলো, ফলে তাঁদের মিলন পর্ব হল আরো দ্রুত এবং আরো সমস্যাসঙ্কুল। ডাক্তারের মাথা থেকে আর সব ভাবনা উবে গেল। অসহনীয় আকুলতা নিয়ে তিনি বিকাল হবার জন্য অপেক্ষা করতেন, প্রতিশ্রুতি দেয়া তাঁর অন্যান্য কাজের কথা তিনি ভুলে যেতেন, ওর কথা ছাড়া আর সবই তিনি ভুলে যেতে লাগলেন, কিন্তু মালা ক্রিয়াঞ্জার লবণাক্ত জলাভূমি অঞ্চলে তাঁর গাড়ি যতোই মিস লিঞ্চের বাড়ির নিকটবর্তী হত ততই তিনি ঈশ্বরের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতেন, একটা অপ্রত্যাশিত কোনো বাধা যেন দেখা দেয়, যার ফলে তাঁর গাড়ি ওইখানে না থেমে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মাঝে মাঝে তিনি এতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ওর ওখানে যেতেন যে মোড় ঘুরে বারান্দায় বসা রেভারেন্ড লিঞ্চকে বই পড়তে দেখলে তিনি রীতিমত খুশি হতেন, ওই যে তার মেয়ে বসবার ঘরে পাড়ার ছেলেমেয়েদের বাইবেলের নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করে মুখস্থ করাচ্ছেন, তখন তিনি স্বস্তি ভরে বাড়ি ফিরে যেতেন, ভাগ্যের উদ্দেশ্যে তিনি আরেকবার স্পর্ধা প্রদর্শন করলেন না, কিন্তু তারপর আবার তার মনে হত তিনি যেন। কামনার জ্বালায় পাগল হয়ে যাচ্ছেন, আবার বিকাল পাঁচটা বাজার জন্য তিনি অধীর হয়ে উঠতেন, আর এমনি চলতো দিনের পর দিন, প্রতিদিন।

তাই, যখন ডাক্তারের গাড়ি ওর বাড়ির সামনে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষক হয়ে উঠলো তখন তাদের প্রেমলীলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো, আর তিন মাস পর ব্যাপারটা রীতিমত হাস্যকর রূপ নিল। তার উত্তেজিত প্রেমিককে দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখা মাত্র মিস লিঞ্চ নিজের শোবার ঘরে চলে যেতো। ডাক্তারকে যেসব দিনে ও প্রত্যাশা করতো সেসব দিনে ও জ্যামেইকা থেকে আনা লাল ফুলের নকশা আঁকা কুঁচি দেয়া একটা চমৎকার লম্বা স্কার্ট পরে থাকতো, কিন্তু নিচে কোনো অন্তর্বাস পরতো না, একেবারে কিছু না, ভাবতো, এই সুবিধাটুকুর ফলে ডাক্তারের ভয়-ভীতি দূর হবে। কিন্তু তাঁকে খুশি করার জন্য ওর সব উদ্যোগ ডাক্তার নষ্ট করে ফেলতেন। ঘর্মাক্ত কলেবর, ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, তিনি ওর পেছন পেছন শোবার ঘরে এসে প্রবেশ করতেন, তারপর সব কিছু ছুঁড়ে ফেলতেন মেঝের উপর, তাঁর হাতের লাঠি, তার ডাক্তারি ব্যাগ, তাঁর পানামা হ্যাট, তারপর হাঁটুর নিচ পর্যন্ত প্যান্ট নামিয়ে তিনি ভয়-তাড়িত সঙ্গম ক্রিয়াটুকু সমাধা করতেন, তখনো উধ্বাঙ্গে কোট চাপানো, তার বোতাম আটকানো যেন কোন বাধার সৃষ্টি না করতে পারে, ওয়েস্টকোটে ঘড়ির সোনার চেইনটাও লাগানো, পায়ে জুতো পরা, সব ধরা-চূড়া ঠিক আছে, আনন্দ লাভের চাইতে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাবার জন্যই যেন তিনি বেশি উদগ্রীব। আর বারবারা লিঞ্চ নিজেকে আবিষ্কার করতে ঝোলানো অবস্থায়, সে তার নিঃসঙ্গতার সুড়ঙ্গের প্রবেশ পথেও ঠিক মত পৌঁছায় নি, আর ডাক্তার এরই মধ্যে তার প্যান্টের বোতাম লাগিয়ে ফেলেছেন, তাঁকে দেখাচ্ছে ভীষণ ক্লান্ত, যেন জীবন মরণের মধ্যবর্তী রেখায় দাঁড়িয়ে তিনি পরিপূর্ণ ভালোবাসার স্বাদ গ্রহণ করেছেন, যদিও আসলে তিনি একটা দৈহিক ক্রিয়ার বেশি কিছুই সম্পন্ন করেন নি, যা প্রেমের কৃতিত্বের একটা অংশ মাত্র। কিন্তু তিনি ঠিক সময়ে শেষ করেছেন, একটা রুটিন ভিজেটে গিয়ে রোগীকে সময় মতো ইঞ্জেকশন দিতে পারবেন। তারপর তিনি বাড়ি ফিরতেন, তার দুর্বলতার জন্য চরম লজ্জিত, মৃত্যুর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠতেন, নিজেকে অভিশাপ দিতেন কেন তাঁর এই সাহসটুকু হচ্ছে না, কেন তিনি ফারমিনা ডাজাকে ডেকে বলতে পারছেন না, এসো, আমার প্যান্ট খুলে নিয়ে আমার পাছায় আগুনের ঘঁাকা দাও!

তিনি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলেন, প্রার্থনা করতে লাগলেনু বিশ্বাস ছাড়া, শয্যায় শুয়ে থেকে দিবানিদ্রার ভান করলেন, বই পড়লেন, আর তাঁর স্ত্রী শুতে আসার আগে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে সংসারের কাজ শেষ করতে থাকলো। বইয়ের উপর ঢুলতে ঢুলতে তিনি ডুবে যেতে শুরু করতেন মিস লিঞ্চের অবধারিত বনাঞ্চলের জলাভূমিতে, অরণ্যের একটা ফাঁকা জায়গার মতো তার শায়িত পরিমণ্ডলে, তার নিজের মরণ-শয্যায়, আর এর পর তিনি আগামীকাল পাঁচটা বাজার পাঁচ মিনিট আগের অপরাহ্নের কথা ছাড়া আর কোন কিছুর কথাই ভাবতে পারলেন না, ও তার জন্য তার বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করছে, ওর পরনে জ্যামাইকা থেকে আনা ওই পাগলী-স্কার্ট ছাড়া আর কিছু নেই, আর ওই স্কার্টের নিচে ওর কালো গুল্মের ক্ষুদ্র স্তূপটি ছাড়া আর কিছুই নেই, শুধু একটা নারকীয় বৃত্ত।

গত কয়েক বছরে তিনি তার নিজের শরীরের বোঝা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। উপসর্গগুলি তিনি চিনতে পারলেন। পাঠ্যপুস্তকে তিনি এসব সম্পর্কে পড়েছেন, বাস্তব জীবনে তিনি এগুলির প্রমাণ পেয়েছেন। যে বয়স্ক রোগীদের কোনো গুরুতর অসুখের পূর্ব-ইতিহাস নাই তারা হঠাৎ এমন সব নিখুঁত লক্ষণের কথা বলতো, যা মনে হত একবারে সরাসরি চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক থেকে তুলে আনা, অথচ পরে দেখা যেতো যে সবটাই কাল্পনিক। লা সলপেট্রিয়ারে পড়াশুনা করার সময় তার শিশুরোগের প্রফেসর বিশেষ জ্ঞানার্জনের সব চাইতে সৎ ক্ষেত্র হিসাবে শিশুচিকিৎসার কথা বলেছিলেন, কারণ শিশুরা সত্যিকার অসুস্থ হলেই শুধু অসুস্থ হয়, গতানুগতিক বর্ণনা দিয়ে তারা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারে না, প্রকৃত অসুখের প্রত্যক্ষ উপসর্গের কথাই তারা বলে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, একটা বয়সের পর, রোগ না থাকলেও রোগের উপসর্গের কথা বলে, তার চাইতেও খারাপ, যৌন রোগের উপসর্গের কথা বলে যখন প্রকৃতপক্ষে তারা বেশ গুরুতর রোগে আক্রান্ত। তিনি তাদের রোগ প্রশমনের ওষুধ দিয়ে আশ্বস্ত করতেন, সময় নিয়ে তাদের শেখাতেন তারা যেন রোগযন্ত্রণা অনুভব না করে, যেন বার্ধক্যের জঞ্জাল স্কুপে নিক্ষিপ্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত তাদের রোগ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো কখনো ভাবেন নি যে তাঁর বয়সের একজন চিকিৎসক সত্যিকার অসুস্থ না হয়েও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ওই রকম একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি জয় করতে পারবেন না। তার চাইতেও যা খারাপ, সত্যিকার অসুস্থ হবার পরও, শুধুমাত্র কিছু বৈজ্ঞানিক সংস্কারে বাঁধা পড়ে, ওই অসুস্থতার কথা বিশ্বাস করবেন না। তাঁর বয়স যখন চল্লিশ তখন তিনি একদিন ক্লাসে কিছুটা কৌতুক করে কিছুটা আন্তরিক ভাবে বলেছিলেন যে, জীবনে তাঁর একটা জিনিসই দরকার, একজন মানুষ যে তাঁকে বুঝবে।’ কিন্তু এখন, নিজেকে মিস লিঞ্চের গোলকধাঁধায় বন্দি দেখার পর, তিনি আর কৌতুক করছিলেন না।

তাঁর বয়োবৃদ্ধ রোগীদের সকল প্রকৃত অথবা কাল্পনিক উপসর্গ তাঁর নিজের শরীরে দেখা দিল। তিনি তার যকৃতকে এত স্পষ্ট ভাবে অনুভব করলেন যে স্পর্শ না করেই তিনি তার আকার বলে দিতে পারলেন। তিনি তার মূত্রগ্রন্থীর মধ্যে তন্দ্রামগ্ন মার্জারের ঘড়ঘড় শব্দ অনুভব করলেন। তিনি তাঁর ক্ষুদ্র কোষগুলির মধ্যে নানা বর্ণের ঔজ্জ্বল্য অনুভব করলেন। তিনি তাঁর ধমনীর মধ্যে অনুভব করলেন রক্তের গুঞ্জন। মাঝে মাঝে খুব ভোরে তার ঘুম ভেঙে যেতো, তখন তিনি জল থেকে ডাঙায় ভোলা মাছের মতো হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতেন। তাঁর হৃৎপিণ্ডে জল জমে গিয়েছিল বলে মনে হল। এক মুহূর্তের জন্য যেন তার স্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার মনে হল বাচ্চাদের ব্যান্ডের মতো তার লয়-তাল বদলে গেছে, একবার, দ্বিতীয় বার, তারপর ঈশ্বরের অপার কৃপায়, তিনি অনুভব করলেন যে সেটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তিনি তার রোগীদের যেসব রোগ প্রশমনকারী ওষুধ দিতেন নিজের ক্ষেত্রে তা না করে ভয়ে প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। তিনি সত্য কথাটিই বলেছিলেন, তার এই আটান্ন বছরেও, জীবনে তার যা দরকার তা হল একজন মানুষ যে তাকে বুঝবে। তাই তিনি ফারমিনা ডাজার দিকে মুখ ফেরালেন, যে মানুষটি তাকে সব চাইতে বেশি ভালোবাসে, যাকে তিনি এ জগতে সবার চাইতে বেশি ভালোবাসেন এবং যার সঙ্গে তিনি এই মাত্র তার বিবেককে অস্বস্তিমুক্ত করেছেন।

সেদিন বিকালে ফারমিনা ডাজা যখন তাকে তার বই পড়া বন্ধ করে তার দিকে তাকাতে বলে তখনই ব্যাপারটা ঘটে। এই প্রথম বারের মতো তার মনে হল তার নারকীয় বৃত্তটা আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু কেমন করে হল তা তিনি বুঝতে পারলেন না। ফারমিনা ডাজা যে শুধু গন্ধ এঁকে এটা জানতে পেরেছেন তা তাঁর কাছে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য মনে হল না। তবে বহুদিন ধরেই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এই শহরের অবস্থান খুব ভালো জায়গায় ছিল না। বাড়িতে টেলিফোন স্থাপনের অল্প দিনের মধ্যেই গুজব ছড়ানো বেনামি বার্তার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বিয়ে, যা মজবুত ও স্থিতিশীল বলে মনে করা গিয়েছিল, ধ্বংস হয়ে যায়। অনেককটি আতঙ্কিত পরিবার হয় তাদের সংযোগ কেটে দেন কিংবা বহু বছর যাবৎ বাড়িতে টেলিফোন আনলেন না। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো তাঁর স্ত্রীকে ভালো করে জানতেন, তার আত্মমর্যাদা বোধ তাকে এই ধরনের টেলিফোন বার্তাকে কোন পাত্তাই দিতে দেবে না। আর কেউ যে স্বনামে এই খবর দিতে সাহস করবে তা তিনি কল্পনা করতে পারলেন না। কিন্তু পুরনো দিনের একটা পন্থা সম্পর্কে তার ভয় হল। অজ্ঞাত কেউ দরজার নিচ দিয়ে একটা চিঠি ঢুকিয়ে দিতে পারে, এই পদ্ধতিতে পত্রদাতা ও পত্রগ্রহণকারী উভয়ের, নামহীনতাই সুরক্ষিত হয়, তাছাড়া এর সুপ্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে একজন মনে করতে পারে যে এর মধ্যে হয়তো বিধিলিপির রূপরেখার একটা অধিবিদ্যামূলক যোগসূত্র আছে।

তার সংসারে ঈর্ষার কোন জায়গা ছিল না। ত্রিশ বছরের শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবনে তিনি প্রায়ই সকলের সামনে গর্ব করে বলতেন, তিনি হলেন ওই সুইডিশ দেশলাই কাঠির মতো, শুধু তার নিজের বাক্সে ঘষেই তাকে জ্বালানো যায়। আর একথা এই ঘটনার আগ পর্যন্ত সত্যই ছিল। এখন, তাঁর স্ত্রীর মতো অহঙ্কার, মর্যাদাবোধ এবং চারিত্রিক শক্তির অধিকারী এক রমণী বিশ্বাস ভঙ্গের স্পষ্ট প্রমাণ পাবার পর কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা তিনি জানতেন না। তাই ওর দিকে একবার তাকিয়েই তিনি তাঁর চোখ নামিয়ে নিলেন, নিজের বিব্রত ভাব গোপন করার প্রয়াস পেলেন, ভান করলেন যেন তিনি আল্কা দ্বীপের মধুর আঁকাবাঁকা নদীর মধ্যে হারিয়ে গেছেন। ফারমিনা ডাজা আর কোন কথা বললো না, মোজা রিফু করা শেষ করে সব কিছু, বিশেষ কোন শৃঙ্খলা না মেনে, তার সেলাইর ঝুড়িতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, রাতের খাবারের নির্দেশ দেবার জন্য রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, তারপর শোবার ঘরে ঢুকলো।

তখন ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো বিকাল পাঁচটায় মিস লিঞ্চের বাসায় না যাবার প্রশংসনীয় সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। অনন্ত প্রেমের প্রতিশ্রুতি, শুধু তারই জন্য একটি বিচক্ষণ ভবন যেখানে কোন অপ্রত্যাশিত বাধা ছাড়াই তিনি তার সঙ্গে থাকতে পারবেন, যতদিন তারা বাঁচবেন তাড়াহুড়াবর্জিত সুখ আস্বাদন করবেন ততদিন, প্রেমের অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে যা কিছুর প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন সব চিরদিনের জন্য বাতিল হয়ে গেল। মিস লিঞ্চ তাঁর কাছ থেকে শেষ যে জিনিসটা পায় তা হল ওষুধের দোকানের কাগজে মোড়া ছোট একটা বাক্সের ভেতর একটা পান্নার টায়রা, কোন বার্তা, কোন মন্তব্য, লিখিত কোন কিছু ছাড়াই তার কোচোয়ান মিস লিঞ্চের হাতে সেটা তুলে দেয়। ডাক্তার উরবিনের সঙ্গে তার আর কোন দিন দেখা হয় নি, আকস্মিক ভাবেও নয়। এক ঈশ্বর জানেন এই বীরোচিত সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে কী মূল্য দিতে হয়, এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবার জন্য তালাবদ্ধ শৌচাগারে বসে তাকে কত তিক্ত অশ্রু বিসর্জন করতে হয়। সেদিন বিকাল পাঁচটায় ওর কাছে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি তাঁর যাজকের কাছে তার পাপকর্মের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করলেন এবং পরের রবিবার গির্জায় গিয়ে কমিনিউন নিলেন।

ওই রাতে তাঁর দাবি-ত্যাগের পর শয্যাগ্রহণের পূর্বে কাপড়-জামা ছাড়ার সময় তিনি ফারমিনা ডাজার কাছে, প্রার্থনা সঙ্গীতের সুরে, তার যাবতীয় কষ্টের কথা আউড়ে গেলেন, ভোরের দিকে তাঁর অনিদ্রা, ছুরির খোঁচার মত শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আকস্মিক ব্যথা, বিকালে তাঁর কেঁদে ওঠার ইচ্ছা, গোপন প্রেমের নানা সাংকেতিক উপসর্গ, তিনি সব এমন ভাবে বলে গেলেন যেন এসব ছিল বার্ধক্যের দুঃখযন্ত্রণা। এসব কথা কাউকে না কাউকে তাঁর বলতেই হত, না হলে তিনি মরে যেতেন, নয়তো তাকে সত্য কথাটা বলে দিতে হত, আর তাই উপরের কথাগুলি বলার পর তিনি যে স্বস্তি পেলেন তা গার্হস্থ্য প্রেমের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে একটা পবিত্রতা অর্জন করল। ফারমিনা খুব মনোযোগের সঙ্গে তার কথা শুনলো কিন্তু তাঁর দিকে তাকালো না, একটি কথাও বলল না, স্বামীর পরিত্যক্ত কাপড়-জামা একটা একটা করে তুলে নিল, তার গন্ধ শুকলো, কোন ভাবভঙ্গি দ্বারা তার ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিল না, তারপর কাপড়-জামাগুলি গোল্লা পাকিয়ে ময়লা কাপড়ের বেতের ঝুড়িটায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। সে গন্ধটা পেল না, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, আজকের পরে আগামীকাল আছে। তাঁদের শোবার ঘরের বেদীর সামনে হাঁটু মুড়ে প্রার্থনা করার আগে, যেমন বেদনার্ত তেমনি আন্তরিক একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তারপর তার যন্ত্রণার তালিকা শেষ করলেন এই বলে, আমার মনে হয় আমি মরতে চলেছি। ফারমিনা বলল, তার চোখের পাতা একটুও কাঁপলো না, সেটাই সব চাইতে ভালো হবে, তাহলে আমরা উভয়েই কিছু শান্তি পাবো।

কয়েক বছর আগে গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়ে এক সঙ্কটজনক মুহূর্তে ডাক্তার তাঁর মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বললে ফারমিনা এই একই রকম নিষ্ঠুর উত্তর দিয়েছিল। ডাক্তার উরবিনো তখন ভেবেছিলেন যে এর মূলে রয়েছে মেয়েদের স্বাভাবিক কঠিন হৃদয়, যা পৃথিবীকে সূর্যের চারপাশে অব্যাহত ভাবে ঘুরতে দেয়, কারণ তখন তাঁর জানা ছিল না যে নিজের অন্তরের ভীতিকে প্রতিরোধ করার জন্য সে সর্বদা একটা ক্রোধের দেয়াল তৈরি করে রাখতে এবং এক্ষেত্রে এটা ছিল চূড়ান্ত ভীতি, তাঁকে হারাবার ভয়।

কিন্তু আজ রাতে ফারমিনা ডাজা সর্বান্তঃকরণে তাঁর মৃত্যু কামনা করলো এবং এই নিশ্চিতি তাঁকে ভীতিবিহ্বল করে তুললো। একটু পরে অন্ধকারের মধ্যে তিনি তার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনলেন, ফারমিনা বালিশ কামড়ে ধরে কাঁদছে যেন শব্দটা তার কানে না যায়। তিনি বিভ্রান্ত বোধ করলেন, কারণ তিনি জানতেন যে দেহ বা আত্মার কোন যন্ত্রণায় ফারমিনা কখনো কাঁদতো না। সে কাদতো শুধু রাগে, বিশেষ করে তার উৎস যদি হত কোন শাস্তিযোগ্য অপরাধের ভীতি, আর তখন তার কান্না যত বাড়তে রাগও তত বাড়তো, কারণ কান্নার দুর্বলতাকে সে কখনো ক্ষমা করতে পারতো না। তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতে সাহস করলেন না। তিনি জানতেন যে তা হবে বর্শাবিদ্ধ বাঘকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো। তাকে এটা বলবার সাহসও তার হল না যে সেদিন বিকালেই তার কান্নার কারণ অপসারিত হয়েছে, শেকড়শুদ্ধ চিরদিনের জন্য তা উপড়ে ফেলা হয়েছে, তার স্মৃতি থেকে পর্যন্ত।

কয়েক মিনিটের জন্য তিনি ক্লান্তির কাছে হার মানলেন। যখন জাগলেন তখন দেখলেন যে ফারমিনা খাটের পাশের আলোটা জ্বালিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে, তার দু’চোখ খোলা, কান্না বন্ধ। তার ঘুমের মধ্যে চূড়ান্ত একটা কিছু তার ভেতরে ঘটে গেছে। এত বছর ধরে যে গাদ তার জীবনের তলদেশে জমা হচ্ছিল তা এখন ঈর্ষার দহনে নাড়া খেয়ে উপরে ভেসে উঠেছে। মুহূর্তের মধ্যে এটা তার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। তার মুখের বলিরেখা, তার বিবর্ণ ওষ্ঠ, তার চুলের ধূসরতা দেখে তিনি একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেন, তিনি ঝুঁকি নিয়ে তাকে ঘুমাতে চেষ্টা করতে বললেন, রাত দুটা বেজে গেছে। এবার সে কথা বলল, এখনো তার দিকে না তাকিয়ে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে এখন রাগের কোন চিহ্ন নেই, প্রায় কোমল কণ্ঠে সে বলল, “ও কে সেটা জানবার আমার একটা অধিকার আছে। তখন তিনি তাকে সব কিছু জানালেন। তাঁর মনে হল তাঁর কাঁধ থেকে যেন পৃথিবীর ভার নেমে যাচ্ছে, কারণ তাঁর স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল যে ফারমিনা সব কিছু জানে, এখন শুধু বিশদ খুঁটিনাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে। কিন্তু আসলে ফারমিনা কিছুই জানতো না। ডাক্তারের কথা শুনতে শুনতে সে আবার কাঁদতে শুরু করল, আগের মতো মৃদু ফোপানি নয়, এখন তার গাল বেয়ে ঝরতে লাগলো প্রচুর লবনাক্ত চোখের জল, সেই জল যেন তার রাতকামিজ জ্বালিয়ে দিল, আগুন ধরিয়ে দিল তার জীবনে, কারণ সে ব্যাকুল হয়ে স্বামীর কাছ থেকে যা আশা করেছিল তিনি তা করলেন না। ফারমিনা ভেবেছিল তিনি সব কিছু অস্বীকার করবেন, নিজের প্রাণের নামে শপথ নিয়ে বলবেন যে এসব সর্বৈব মিথ্যা, এই মিথ্যা অভিযোগের জন্য ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠবেন এবং এই সমাজ যা একটা মানুষের সম্মানকে ধুলায় লুটিয়ে দেয় তাকে চরম অভিশাপ দেবেন এবং তার বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গের যাবতীয় জোরালো প্রমাণ উপস্থিত করা হলেও অচঞ্চল থাকবেন তিনি। কিন্তু ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো যখন বললেন যে সেদিন বিকালে তিনি তাঁর যাজকের কাছে স্বীকারোক্তি করেছেন, তখন ফারমিনার মনে হল সে বোধ হয় রাগে পাগল হয়ে যাবে। ধর্মীয় বিদ্যালয়ে ছাত্রী থাকার সময় থেকেই তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে গির্জার নারী পুরুষদের মধ্যে ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত কোন পুণ্যবোধ নেই। এটা তাদের সংসারে একটা বেসুরো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তবে কোন রকম বিপর্যয় ছাড়াই তারা এটা উপেক্ষা করতে সক্ষম হন। কিন্তু তার স্বামী যখন তার ধর্মযাজকের কাছে এমন একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেন যা শুধু তাঁর নিজের একার ব্যাপার নয়, ফারমিনারও, তখন সেটা তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে বলল, “তুমি এর চাইতে কথাটা বাজারের কোন সাপুড়েকে বলতে পারতে।’

তার মনে হল সব কিছুই শেষ হয়ে গেছে। তার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে তার স্বামী ধর্মযাজকের কাছে তার অনুশোচনামূলক স্বীকারোক্তি শেষ করার আগেই তার সম্ভ্রমের বিষয়টি বাজারে গুজবের বিষয় হয়ে উঠেছিল। স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা তার মধ্যে যে লজ্জা, ক্রোধ এবং অবিচারের বোধের জন্ম দিয়েছিল তার চাইতেও বেশি দুঃসহ মনে হল তার চরম অপমানিত হবার অনুভূতি। আর কী জঘন্য, কী জঘন্য, একটা কালো মেয়ের সঙ্গে। স্বামী তাকে সংশোধন করে দিলেন, ‘বর্ণসঙ্কর মেয়ের সঙ্গে। কিন্তু ততক্ষণে নিখুঁত হবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। ফারমিনা বললো, “সমান খারাপ। এখন আমি বুঝতে পারছি, ওই গন্ধ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ রমণীর গন্ধ।’ _ এই ঘটনা ঘটে এক সোমবার। শুক্রবার দিন সকাল সাতটায় সান হুয়ান ডি লা সিনেগাগামী নিয়মিত জাহাজে ফারমিনা ডাজা একটা মাত্র ট্রাঙ্ক নিয়ে যাত্রা করে। সে তার মুখ ঢেকে রেখেছিল একটা চাদর দিয়ে, তার নিজের বা স্বামী সম্পর্কে প্রশ্ন এড়াতে। সঙ্গী হয় তার ধর্মকন্যা। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো জাহাজঘাটে আসেন নি। এই পদক্ষেপের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তিন দিন ধরে তারা আলোচনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অবশেষে ঠিক হয় যে ফারমিনা ডাজা ফ্লোর ডি মারিয়াতে তার কাজিন হিল্ডাব্রান্ডা সাঞ্চেজের খামার বাড়িতে যাবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে যতদিন দরকার ততদিন ওখানে থাকে। ছেলেমেয়েরা তার এই সফরের আসল কারণ জানলো না, তারা মনে করলো মা অনেকবার যে পরিকল্পিত ভ্রমণ পিছিয়ে দিয়েছিলেন এবার তা বাস্তবায়িত করছেন। অনেক দিন ধরে তারাও চেয়েছে যে তিনি যেন এই সফরে যান। ডাক্তার উরবিনো এমন দক্ষতার সঙ্গে সব ব্যবস্থা করলেন যে তাঁর দুরাচারী বন্ধুরাও এনিয়ে কোন বিদ্বেষপূর্ণ ধারণার কথা প্রচার করতে পারল না। ফ্লোরিন্টোনো আরিজা যে ফারমিনা ডাজার উধাও হয়ে যাওয়া সম্পর্কে কোন সূত্র খুঁজে পেল না তার কারণ এই নয় যে অনুসন্ধান করার উপায় বা সঙ্গতি তার ছিল না, বরং এই কারণে যে সত্যিই কোন সূত্র ছিল না। ডাক্তারের ধারণা ছিল রাগ পড়ে গেলেই তার স্ত্রী ফিরে আসবে, কিন্তু ফারমিনা বিদায় নেয় এই নিশ্চিত ধারণা নিয়ে যে তার এই রাগ কখনো পড়বে না।

তবে ফারমিনা ডাজা অল্পদিনের মধ্যেই উপলব্ধি করল যে তার এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে তার ক্ষোভের চাইতেও বেশি ক্রিয়াশীল ছিল তার স্মৃতিকাতরতা। তাদের মধুচন্দ্রিমার পর সে একাধিকবার ইউরোপে গেছে, আনন্দ উপভোগের পরও প্রতিবারই তার হাতে অঢেল সময় থেকেছে। পৃথিবীকে সে চিনেছে, নতুন ভাবে বাঁচতে ও ভাবতে সে শিখেছে, কিন্তু বেলুনে ওই অসম্পূর্ণ ভ্রমণের পর সে আর কখনো হুয়ান ডি লা সিনেগাতে ফিরে যায় নি। তার মনে হল, যত দেরিতেই হোক হিল্ডাব্রান্ডার প্রদেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সে একটা মুক্তির স্বাদ পাবে। তার বৈবাহিক জীবনের বিপর্যয়ের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক ছিল না, অনেক আগে থেকেই তার মনে এই ধারণা জন্মে। কৈশোরে সে যেসব জায়গায় হরহামেশা ঘুরে বেড়াতো আবার সে তা দেখতে পাবে এই চিন্তাই তার দুঃখ-যন্ত্রণার মধ্যে সান্ত্বনার প্রলেপ বুলিয়ে দিল।

সান হুয়ান ডি লা সিনেগাতে অবতরণের পর সে তার চরিত্রের বিশাল শক্তির সাহায্যে, আমূল পরিবর্তন সত্ত্বেও, শহরটাকে চিনতে পারলো। শহরের সামরিক ও বেসামরিক শাসনকর্তা পূর্বাহ্নেই তার আগমনের খবর পেয়েছিলেন। তিনি সরকারি ভিক্টোরিয়া গাড়িতে করে ফারমিনা ডাজাকে শহর ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানালেন। ইতিমধ্যে সান পেড্রো আলেজাড্রিনোগামী রেলগাড়িটি যাত্রার জন্য তৈরি হবে। ফারমিনা ওখানে যেতে চেয়েছে, সবাই যে বলে যে দি লিবারেটর একটা শিশুর মতো ছোট শয্যায় শুয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন সেটা সত্য কিনা সে তা দেখতে চায়। ফারমিনা। ডাজা বেলা দু’টার নিদ্রাতুর অপরাহে তার নিজের শহরকে আবার দেখলো। রাস্তাগুলি দেখালো কাদাজলে পূর্ণ সমুদ্র সৈকতের মতো। সে দেখলো পর্তুগিজদের বিরাট বিরাট ভবনগুলি, প্রবেশপথে বংশমর্যাদাসূচক নকশা আঁকা, জানালায় জালের মতো ব্রোঞ্জের শার্সি, ভেতর থেকে ভেসে আসছে মৃদু কুণ্ঠিত পিয়ানো অনুশীলনের শব্দ, তার সদ্য বিবাহিত মা বিত্তশালী পরিবারের মেয়েদের যা শেখাতেন ঠিক সেই রকম, সালোর প্রায়ান্ধকার পরিবেশে তার হুবহু পুনারাবৃত্তি চলছিলো। ফারমিনা দেখলো শহরের নির্জন খোলা চত্বর, সোডিয়াম নাইট্রেট আকীর্ণ উত্তপ্ত এবড়ো-খেবড়ো ভূমিতে কোন গাছ-গাছালি বেড়ে উঠছে না, সারি বেঁধে ঘোড়ার গাড়িগুলি দাঁড়িয়ে আছে, মাথার ঢাকনি তোলা, শবযাত্রার মতো, ঘোড়াগুলি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। তার চোখে পড়লো সান পেড্রো আলেজাড্রিনোগামী হলুদ ট্রেনটি। তারপর নগরীর বৃহত্তম গির্জার পার্শ্ববর্তী, রাস্তার মোড়ে, সবচাইতে সুন্দর ও সব চাইতে সুন্দর বাড়িটি সে দেখতে পেল। সে দেখল সবুজাভ পাথরের খিলানে ঢাকা বাড়ির প্রবেশ পথ, তার বিশাল মঠের দরজা, বাড়ির শোবার ঘরের জানালা, যে ঘরে বহু বছর পরে একদিন আলভেরো জন্মগ্রহণ করেছিল, তারপর সে দেখলো যে আর কিছু মনে করবার মতো স্মৃতিশক্তি তার নাই। তবে পিসী এস্কোলাস্টিকার কথা তার মনে পড়লো, তার খোঁজে সে স্বর্গ-মর্ত্য তোলপাড় করে ফেলেছিল কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, আর তার কথা মনে পড়ায় তার স্মৃতিতে জেগে উঠলো ফ্লোরেন্টিনো আরিজার ছবি, কেতাবী পোশাক পরা, ছোট পার্কটিতে বাদাম গাছের নিচে কবিতার বই হাতে বসে আছে। ঠিক একই ভাবে তার নিজের একাডেমির নিরানন্দ দিনগুলির কথাও তার মনে পড়লো। সে এখন গাড়িতে করে অনেকক্ষণ ঘুরলো, নিজেদের পুরনো পারিবারিক বাসগৃহটি সে চিনতে পারলো না, ওটা যেখানে ছিল বলে তার মনে হল সেখানে সে দেখলো একটা শুয়োরের খোয়াড় আর মোড় ঘুরতেই সে যে রাস্তায় এসে পড়লো সেখানে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারবনিতাদের ঘর। দুনিয়ার তাবৎ জায়গা থেকে বেশ্যার দল এখানে এসে জড়ো হয়েছে, দোরগোড়ায় তারা এখন দিবানিদ্রারত, ডাকে তাদের জন্য কোন চিঠি আসে। কিনা তার প্রতীক্ষায় তারা বসে আছে। এটা এখন আর তার সেই শহর নাই।

গাড়িতে ঘুরতে বেরুবার পর ফারমিনা ডাজা তার মুখের নিম্নাংশ চাঁদরে ঢেকে রেখেছিল, এই অচেনা শহরে কেউ তাকে চিনে ফেলে সে-ভয়ে নয়, এই জন্য যে রেল স্টেশন থেকে শুরু করে সমাধিক্ষেত্র পর্যন্ত সর্বত্র সে দেখতে পেল গরমে ফুলে ওঠা মৃতদেহের পর মৃতদেহ। সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা তাকে জানাল, কলেরা। ফারমিনা ডাজা বুঝতে পেরেছিল, মৃতদেহগুলির মুখের কাছে সে সাদা ফেনার গোল্লা দেখতে পায়, কিন্তু বেলুন ভ্রমণের সময় সে তাদের ঘাড়ে যে সদয় আঘাতের চিহ্ন দেখেছিল এক্ষেত্রে তা দেখলো না। সঙ্গের অফিসার বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য। ঈশ্বরও তাঁর পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেন।

সান হুয়ান ডি লা সিনেগা থেকে সান পেড্রো আলেজানড্রিনোর কলা বাগানের দূরত্ব ছিল সাতাশ মাইল মাত্র, কিন্তু হলুদ ট্রেনটি এই দূরত্ব অতিক্রম করতে পুরো দিনটি নিল, কারণ তার ইঞ্জিনিয়ার ছিল এই বাড়ির নিয়মিত যাত্রীদের একান্ত বন্ধু। যাত্রীরা অনবরতই তাকে গাড়িটা একটু দাঁড় করাতে অনুরোধ করছিল, তারা কলা কোম্পানির গলফের মাঠে নেমে একটু পায়চারি করে পায়ের জড়তা ভাঙ্গবে, পুরুষরা পাহাড় থেকে ধেয়ে আসা স্বচ্ছ শীতল নদীর জলে কাপড়জামা খুলে একটু স্নান করে নেবে, ক্ষিদে পেলে তারা ট্রেন থামিয়ে হৈ হৈ করে নেমে পড়ে পাশের চারণ ক্ষেতে ঘুরে বেড়ানো গরুর দুধ দোহন করবে। এই চললো সারা পথ। ফারমিনা ডাজা যতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছলো ততক্ষণে সে রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। সামলে নিয়ে সে গভীর বিস্ময়ে হোমারীয় তেঁতুলগুলি দেখলো, এই গাছে দোলনা-শয্যা খাঁটিয়ে মুমূর্ষ ত্রাণকর্তা, এদেশের লিবারেটর, মৃত্যুবরণ করেন, ওরা যেমন বলে ঠিক সেই রকম, আর তার শয্যাটি ওই রকম মহান এক ব্যক্তির জন্যই যে মাত্রাতিরিক্ত ছোট ছিল তাই নয়, সাত মাসের শিশুর জন্যও তা ছিল বড় বেশি ছোট। তবে আরেকজন দর্শনার্থী, মনে হল সে বেশ খোঁজখবর রাখে, বলল যে এটা একটা নকল স্মৃতিচিহ্ন, আসলে তার দেশের জনককে ওরা মৃত্যুবরণ করার জন্য মেঝের উপর ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। বাড়ি ছাড়ার পর থেকে ফারমিনা ডাজা যা দেখেছে ও শুনেছে তাতে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই তার ব্যাকুলতা সত্ত্বেও সে তার আগের সফরের স্মৃতি থেকে বর্তমান সফরের বাকি সময়টুকুতে কোন আনন্দ লাভে সক্ষম হল না। তার স্মৃতিবিধুরতামণ্ডিত গ্রামগুলি এড়িয়ে গেল সে। এই ভাবে মোহভঙ্গের হাত থেকে সে নিজেকে রক্ষা করলো, আগের স্মৃতিই সে ধরে রাখতে পারলো। তার মোহমুক্তিকে পাশ কাটিয়ে সে শুনতে পেলো অ্যাকর্ডিয়ানের শব্দ, মোরগ-লড়াই-এর চারপাশে দাঁড়ানো লোকজনের চিৎকার, বন্দুকের গুলির আওয়াজ যা কোন যুদ্ধ জয়ের সঙ্কেত হতে পারে, আবার এর উৎস কোন আনন্দ উৎসবও হতে পারে, তারপর আশ্রয় নেবার মতো সব কিছু যখন শেষ হয়ে গেল তখন একটা গ্রামের মধ্য দিয়ে যাবার সময় সে চাদর দিয়ে তার মুখ ঢেকে রাখলো যেন এক সময় এই গ্রাম যেমন ছিল তার স্মৃতি সে তার মনের মধ্যে ধরে রাখতে পারে।

এই ভাবে অতীতকে বার বার এড়িয়ে, এক রাতে সে হিল্ডাব্রান্ডার খামার বাড়িতে এসে পৌঁছল। সে যখন তাকে দরজার সামনে তার জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো তখন তার মূৰ্ছা যাবার উপক্রম হয়। মোটা ও বয়স্ক এক মহিলা, তাকে ঘিরে আছে তার দুরন্ত সন্তানরা, এদের বাবা সে ব্যক্তি নয় যাকে হিল্ডাব্রান্ডা কোন আশা না থাকলেও এখনো ভালোবাসে। হিল্ডাব্রান্ডার স্বামী এক সৈনিক, পেনসনের টাকায় সংসার চালাচ্ছে, সে হিল্ডাব্রান্ডাকে ভালোবাসে পাগলের মতো। তার ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের আড়ালে হিল্ডাব্রান্ডা কিন্তু আগের মানুষটিই আছে। মাত্র অল্প কয়েক দিনের গ্রামীণ জীবনযাপন ও মধুর স্মৃতির ফলে ফারমিনা ডাজা তার প্রথম মানসিক ধাক্কা সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠে, তবে সে খামার ছেড়ে বাইরে বেরুতো না। শুধু রবিবার রবিবার গির্জায় ম্যাস-এ যোগ দিতে যেতো, সঙ্গে চলতো তার বহুকাল আগের ষড়যন্ত্রকারীদের নাতি-নাতনীবৃন্দ, সুন্দর চমকপ্রদ ঘোড়ার পিঠে আসীন কাউবয়রা, চমৎকার সাজ পোশাক পরা তরুণীরা, এই বয়সে তাদের মা-রা যেমন ছিল ঠিক সেই রকম দেখতে, তারা চলেছে গরুর গাড়িতে চড়ে, উপত্যকার শেষ প্রান্তে মিশন চার্চে পৌঁছা পর্যন্ত তারা গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে সারাটা পথ গান করতো। ফারমিনা ডাজা শুধু ফ্লোর ডি মারিয়া গ্রামের ভেতর দিয়ে গেল, গত সফরের সময় সে এই গ্রামের ভেতর দিয়ে যায় নি। তার মনে হয়েছিল এই গ্রাম তার ভালো লাগবে না, কিন্তু এবার যখন সে গ্রামটা দেখলো তখন সে মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য কিংবা গ্রামটিরও দুর্ভাগ্য হল এই যে পরবর্তী সময়ে গ্রামটি বাস্তবে যেমন ছিল সেটা সে কখনোই মনে করতে পারে নি, আগে সে তার যে রূপটি কল্পনা করেছিল সেটাই তার স্মৃতিতে আঁকা হয়ে থাকে।

রিওহাচার বিশপের কাছ থেকে একটা প্রতিবেদন পাওয়ার পর ডক্টর জুভেনাল উরবিনো তার স্ত্রীকে আনবার জন্য সান হুয়ান ডি লা সিনেগা যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। বিশপের ধারণায় ফারমিনা যে এখানে এত দীর্ঘকাল থাকছেন তার কারণ তার ফিরে যাবার অনিচ্ছা নয়, তার কারণ তিনি তাঁর অহঙ্কারকে পরাজিত করার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। অতএব ফারমিনাকে খবর না দিয়ে, হিল্ডাব্রান্ডার সঙ্গে পত্রের আদান-প্রদান করে, ডাক্তার সেখানে গেলেন। হিল্ডাবান্ডার চিঠিতে সে জানায় যে তার স্ত্রী বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে আছেন। সকাল এগারোটায় তিনি যখন উপস্থিত হন ফারমিনা ডাজা তখন রান্নাঘরে বেগুনের একটা সুস্বাদু তরকারি রান্না করছিল। ওই সময় সে শুনতে পেল দারোয়ানদের চেঁচামেচি, ঘোড়ার হেষাধ্বনি, আকাশ পানে ছোঁড়া বন্দুকের গুলির শব্দ, আঙিনায় একটা দৃঢ় পদক্ষেপের আওয়াজ আর তারপর তার পুরুষ মানুষটার কণ্ঠস্বর : নিমন্ত্রিত হবার আগেই ঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হওয়াটা বেশি ভালো।

ফারমিনা ডাজার মনে হল সে খুশিতে মরে যাবে। সে অসচেতন ভাবে ভালো করে তার হাত ধুলো আর বিড়বিড় করে বললো, তোমাকে ধন্যবাদ, ঈশ্বর, তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি কী ভালো, তার খেয়াল হল কে দুপুরে খেতে আসছে তাকে সে সম্পর্কে কিছু না বলে হিল্ডাব্রান্ডা তাকে ভালো করে বেগুনের একটা ভালো পদ রান্না করতে বলেছে, আর এই হতচ্ছাড়া বেগুনের জন্য এখনো তার স্নান করা হয় নি, তার মনে হল তাকে বিশ্রী দেখাচ্ছে, একটা বুড়ির মতো, রোদে পুড়ে তার মুখের রঙ জ্বলে গেছে, তাকে এই চেহারার দেখতে পেয়ে ডাক্তার ভাববেন, না এলেই ভালো হত। যতটা ভালো ভাবে পারা যায় সে তার অ্যানে হাত দুটি মুছে নিল, চেহারাটা যথাসাধ্য ঠিকঠাক করলো, তারপর যে অহঙ্কার নিয়ে সে জন্মেছে তার সবটুকু নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে সে তার উথালপাতাল করা অন্তরকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। তারপর সে তার মধুর হরিণীর চলনে তার পুরুষ মানুষটার মুখোমুখি হবার জন্য এগিয়ে গেল, মাথা উঁচু, চোখ দুটি উজ্জ্বল, যুদ্ধের জন্য তার নাসিকা প্রস্তুত, গৃহে প্রত্যাবর্তনের বিপুল স্বস্তির কথা ভেবে নিয়তির প্রতি কৃতজ্ঞ, কিন্তু তিনি তাকে যতটা নমনীয় হবে বলে ভাবছেন অবশ্যই সে ওরকম হবে না, সে নিঃসন্দেহে সানন্দে তাঁর সঙ্গে ফিরে যাবে, কিন্তু তিনি তাকে যে যন্ত্রণা দিয়েছেন, যেভাবে তার জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেজন্য তার নীরবতা দিয়ে সে তার স্বামীকে উপযুক্ত মূল্য দিতে বাধ্য করবে এ বিষয়ে সে ছিল সঙ্কল্পবদ্ধ।

ফারমিনা ডাজা উধাও হয়ে যাবার প্রায় দু’বছর পর একদিন একটা অসম্ভব আকস্মিক যোগাযোগ ঘটলো। এ জাতীয় ঘটনাকে ট্রান্সিটো আরিজা ঈশ্বরের একটা কৌতুক বলে অভিহিত করতেন। ততদিনে এখানে ছায়াছবির প্রচলন হয়েছে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এর মধ্যে তেমন বিশেষ কিছু দেখে নি, কিন্তু লিওনা কাসিয়ানি একদিন তাকে কাবিরিয়া’র উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে নিয়ে যায়, সে আপত্তি করে নি। কবি গেব্রিয়েল দাসিও কাবিরিয়ার সংলাপ রচনা করেছিলেন, সেজন্যই ওটা বিখ্যাত হয়। ডন গ্যালিলিওর বিশাল খোলা উঠানে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ভিড় করে আসতো, তবে কোন কোন রাতে পর্দায় নির্বাক প্রেমের দৃশ্য দেখার চাইতে তারা বেশি মুগ্ধ হয়ে দেখতো নক্ষত্রখচিত আকাশের সৌন্দর্য। আজ লিওনা কাসিয়ানি জটিল কাহিনীটা তন্ময় হয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে অনুসরণ করছিল, কিন্তু নাটকটির বিরক্তিকর একঘেয়েমি ফ্লোরেন্টিনো আরিজার চোখে ঘুম এনে দেয়, তার মাথা চুলে ঢুলে পড়তে থাকে। এমন সময় তার পেছনের আসন থেকে একটি কণ্ঠ তার মনোভাবের প্রতিধ্বনি করে উঠলো, ‘হা ঈশ্বর, এ যে দুঃখ-যন্ত্রণার চাইতেও দীর্ঘতর!

সে শুধু এটুকুই বললো, হয়তো অন্ধকারের মধ্যে তার কণ্ঠস্বরের অনুরণন তাকে একটু অবদমিত করেছিল। নির্বাক ছায়াছবি চলাকালে তখনো এখানে তার সঙ্গে পিয়ানো বাদনের প্রথা চালু হয় নি। অন্ধকারের মধ্যে শুধু শোনা যেতে বৃষ্টিপাতের মতো প্রোজেক্টরের মর্মরধ্বনি। চরমতম পরিস্থিতিতে না পড়লে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ঈশ্বরের কথা ভাবতো না, কিন্তু এখন সে সারা অন্তর দিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। একশো বিশ ফুট মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলেও সে ওই ঈষৎ শুষ্ক কণ্ঠস্বর নির্ভুল ভাবে চিনতে পারতো। বহু যুগ আগে এক অপরাহে হলুদ পাতার ঘূর্ণির মধ্যে নির্জন একটি পার্কে সে এই কণ্ঠস্বর শুনেছিল, এখন যাও, আমি না বলা পর্যন্ত আর এখানে ফিরে আসবে না, তখন থেকে সেই ওই কণ্ঠস্বর তার বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ফ্লোরেন্টিনো বুঝতে পারছিল যে ও তার ঠিক পেছনের আসনে বসে আছে, তার অবশ্যম্ভাবী স্বামীর পাশে, সে অনুভব করলো ওর উষ্ণ নিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ, আর সে ওর স্বাস্থ্যকর নিঃশ্বাস দ্বারা পরিশ্রুত বাতাস নিজের বুকে ভালোবাসার সঙ্গে টেনে নিল। নিকট অতীতের বিষণ কয়েক মাস ধরে সে ভেবেছে মৃত্যুর কীট ফারমিনা ডাজাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, কিন্তু এখন সে ওর ওই চিত্র কল্পনা করার পরিবর্তে স্মরণ করলো তার উজ্জ্বল আনন্দিত বয়সের ছবি, মিনার্ভার মতো পোশাকের নিচে তার পেট বর্তুলাকার হয়ে উঠেছে, তার প্রথম সন্তান সেখানে বেড়ে উঠছে। ছবির পর্দায় নানা ঐতিহাসিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, ফ্লোরেন্টিনো নিজেকে তা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে, তার কল্পনায় ওকে দেখার জন্য তার মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাবার কোন প্রয়োজন নাই। তার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অতীতের যে কাঠবাদামের গন্ধ তার কাছে ভেসে ভেসে আসছে তা তাকে গভীর আনন্দ দিল। চলচ্চিত্রে মেয়েদের কি ভাবে প্রেমে পড়া উচিত, যেন বাস্তব জীবনের যন্ত্রণা থেকে তারা রেহাই পেতে পারে, এ সম্পর্কে ও কি ভাবে সেটা জানতে ফ্লোরেন্টিনোর খুব কৌতূহল হল। চলচ্চিত্রটি শেষ হবার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা সানন্দ বিদ্যুৎ ঝলকের মত তার খেয়াল হল যে তার পরম ভালোবাসার মানুষটির এতো কাছে এতো দীর্ঘ সময় সে ইতিপূর্বে কখনো কাটায় নি।

<

Super User