আলো জ্বলবার পর সে অন্যদের উঠে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষা করলো। তার পর সে উঠে দাঁড়ালো, তাড়াহুড়া করল না, বিক্ষিপ্ত চিত্তে তার কোটের বোতাম লাগালো, সব অনুষ্ঠানের সময়ই সে তার কোর্টের বোতামগুলি খুলে রাখতো, তারপর তারা চারজন নিজেদেরকে পরস্পরের এতো কাছাকাছি আবিষ্কার করলো যে তাদের মধ্যে একজন যদি নাও চাইতো তবু তাদের পারস্পরিক সম্ভাষণ বিনিময় না করে কোন উপায় ছিল না। প্রথমে জুভেনাল উরবিনো লিওনা কাসিয়ানিকে সম্ভাষণ করলেন, তিনি তাকে ভালোভাবে চিনতেন। তারপর তিনি তাঁর স্বাভাবিক উদার ভঙ্গিতে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার করমর্দন করলেন। ফারমিনা ডাজা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যের হাসি হাসলো, শুধুই সৌজন্যের তবু সে হাসি ছিল এমন একজনের যে ওদের মাঝে মাঝেই দেখেছে, তারা কে সেকথা যার জানা এবং তাই তাদের একে অন্যের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নাই। লিওনা কাসিয়ানি তার বর্ণসঙ্করীয় মাধুর্য নিয়ে প্রতিসম্ভাষণ করলো, কিন্তু ফ্লোরেন্টিনো আরিজা কি করবে ভেবে পেলো না, ওকে দেখে সে বিমূঢ়-বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল।
ও ভিন্ন এক মানুষ রূপান্তরিত হয়েছে। যে সাংঘাতিক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তার কোন চিহ্ন ওর মুখে নাই, কোন রোগের চিহ্নই নাই, ওর দেহ ওর সুন্দর সময়ের ক্ষীণত্ব ও অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখেছে, তবু এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে বিগত দুটি বছর তার জীবনের কঠিন দশ বছরের চাইতেও বেশি কঠোর ছিল। ছোট করে কাটা চুল তাকে ভালো মানিয়ে ছিল, দুটি গুচ্ছ বাকা হয়ে দু’গালের ওপর পড়েছে, কিন্তু তার রঙ আর এখন মধুর মতো নয়, বরং অ্যালুমিনিয়মের মতো, আর তার দাদি-নানির চশমার আড়ালে তার সুন্দর চোখ দুটি তাদের অর্ধজীবনের উজ্জ্বল আলো হারিয়েছে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা থিয়েটার থেকে প্রস্থানরত ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখলো, স্বামীর বাহু বন্ধন থেকে নিজের হাত খুলে নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে। বাইরের লোকজনের মধ্যে তাকে সাধারণ মেয়েদের মতো চাদর জড়ানো এবং ঘরের চটি পায়ে দেখে সে বিস্মিত হল। কিন্তু সে যখন দেখলো যে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে তাকে সাহায্য করার জন্য তার স্বামীকে তার হাত ধরতে হল তখন সে খুব বিচলিত বোধ করলো। হাত ধরা সত্ত্বেও ফারমিনা ডাজা শেষ সিঁড়িটার উচ্চতা ঠিক মতো আন্দাজ করে নি এবং দরজার কাছে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
বয়সের দুর্বলতা ও স্খলিত পদক্ষেপ সম্পর্কে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তার যুবা বয়সে পার্কে বসে কবিতা পড়ার সময়ও সে প্রায়ই পড়া বন্ধ করে বেশি বয়সের দম্পতিদের রাস্তা পেরুবার সময় একে-অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপারটা লক্ষ করেছে এবং পরবর্তী সময়ে তার নিজের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া চিহ্নিত করতে তার জীবনে এটা বিশেষ শিক্ষাপ্রদ হয়েছে। ডাক্তার জুভেনাল উরবিনের জীবনের ওই পর্যায়ে, ছায়াছবি দেখার ওই রজনীতে, পুরুষদের দেখে মনে হল তারা যেন এক ধরনের শারদীয় যৌবনে প্রস্ফুটিত হয়েছে, তাদের মাথার প্রথম পাকা চুলগুলি তাদের একটা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, তাদের মনে হচ্ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রলুব্ধকারী, বিশেষ করে তরুণীদের চোখে। অন্য দিকে তাদের বিবর্ণ স্ত্রীদের আঁকড়ে ধরতে হচ্ছিল স্বামীদের বাহু, নিজেদের ছায়ার উপরেই তারা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে না যায়। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যেতো যে কোন রকম সতর্ক সঙ্কেত না দিয়েই স্বামীরাই দেহে ও আত্মায় লজ্জাজনক ভাবে জড়িয়ে গেছে, আর তাদের স্ত্রীরা সেরে উঠেছে, এখন তারাই স্বামীদের হাত ধরে পথ দেখাচ্ছে, স্বামীরা যেন করুণার পাত্র অন্ধজন, তাদের পুরুষালি অহঙ্কারে যেন ঘা না লাগে সে জন্য স্ত্রীরা তাদের কানে ফিসফিস করে বলছে, সাবধান, দুটো নয়, তিনটা ধাপ আছে এখানে, রাস্তার মাঝখানে এখানে কাদাজল জমে আছে, ফুটপাতের ওই ছায়াটা একটা ভিক্ষুকের মৃতদেহ, বহু কষ্টে তারা স্বামীদের রাস্তা পার করাচ্ছে, যেন রাস্তা নয়, শেষ জীবননদীর অগভীর জল মাত্র। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আয়নায় নিজেকে এতো বার দেখেছে যে সে আর মৃত্যু ভয়ে কখনো এতোটা ভীত হয় না যতটা হয় লজ্জাজনক ওই বয়সে পৌঁছবার কথা ভেবে যখন একজন মহিলার বাহু আঁকড়ে ধরে তাকে পথ চলতে হবে। সেই দিন, শুধু সেই দিনই, সে বুঝবে যে ফারমিনা ডাজার আশা তাকে ত্যাগ করতে হবে।
ওই সাক্ষাৎ তার ঘুম কেড়ে নিল। লিওনা কাসিয়ানিকে গাড়ি করে তার বাড়ি পৌঁছে দেবার বদলে সে তাকে নিয়ে পুরনো শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালো। খোয়া বাধানো রাস্তায় তাদের পদধ্বনি ঘোড়ার খুরের মতো আওয়াজ তুললো। মাঝে মাঝে কোনো বাড়ির খোলা বারান্দা থেকে প্রেম গুঞ্জনের শব্দ ভেসে আসছে, শোবার ঘরের নিভৃত গোপন কথা একটু একটু শোনা যাচ্ছে, ভালোবাসার ফোঁপানি কান্না কোনো বাড়ির বিশেষ সুতিগুণের জন্য বর্ধিত হয়ে সজোরে কানে এসে বাজছে, আর সরু ঘুমন্ত রাস্তায় পাওয়া যাচ্ছে চাপা ফুলের উষ্ণ সুরভি। আরেক বার ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে তার মনের সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হল যেন লিওনা কাসিয়ানির কাছে সে তার অবদমিত ভালোবাসার কথা প্রকাশ না করে ফেলে। তারা দুজন একসঙ্গে মাপা পায়ে হাঁটলো, তাড়াহুড়া বর্জিত পুরনো প্রেমিক-প্রেমিকার মতো পরস্পরকে ভালোবাসলো, লিওনার মন জুড়ে থাকলো কাবিরিয়ার জাদু, আর ফ্লোরেন্টিনো ভাবতে লাগলো নিজের দুর্ভাগ্যের কথা। শুল্ক ভবন চত্বরের এক বারান্দায় একজন গান গাইছে, তার গানের ধুয়া গোটা অঞ্চলে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে : যখন আমি ভেসে চলেছিলাম সমুদ্রের তরঙ্গরাশির উপর দিয়ে। সেইন্টস অব স্টোন স্ট্রিস্টে লি ওনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে শুভরাত্রি জানাবার আগের মুহূর্তে সে হঠাৎ বলল, আমাকে একটা ব্র্যান্ডি পান করার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে না? অনুরূপ এক পরিস্থিতিতে সে আরেকবার এই একই কথা বলেছিল, সেটা ছিল দশ বছর আগে, আর তখন লিওনা বলেছিল, ‘এই সময়ে যদি তুমি আসো তাহলে তোমাকে চিরদিনের জন্য থেকে যেতে হবে।‘ সে আর ভেতরে ঢোকে নি, কিন্তু আজ ঢুকবে, যদি পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে হয় তবু। কিন্তু আজ লিওনা কাসিয়ানি কোন রকম প্রতিশ্রুতি দান ছাড়াই তাকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানালো।
এই ভাবেই ফ্লোরেন্টিনো আরিজা নিজেকে ভালোবাসার এক পবিত্র আশ্রয়স্থলে আবিষ্কার করলো, যে-ভালোবাসার আগুন জ্বলে উঠবার আগেই নিভে গিয়েছিল। লিওনার বাবা-মা বেঁচে নেই, একমাত্র ভাই কুরাকাও-এ বেশ টাকা-পয়সা করেছে, এই পুরনো পৈতৃক বাড়িতে সে একা বাস করছে। বহু বছর আগে সে যখন লি ওনাকে তার প্রণয়িনী করার আশা ত্যাগ করে নি তখন লিওনার মা-বাবার অনুমতি নিয়ে সে প্রতি রবিবার ওর সঙ্গে দেখা করতে ওর বাসায় যেতো, মাঝে মাঝে অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে থাকতেও। ওই সংসারে তার এতো বেশি অবদান ছিল যে সে ওটাকে প্রায় নিজের বলে বিবেচনা করতে শুরু করেছিল। কিন্তু আজ রাতে ছায়াছবির পর তার মনে হল এই ড্রয়িংরুম যেন তার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। আসবাবপত্রের জায়গা। বদল করা হয়েছে, দেয়ালে নতুন ছবি ঝুলছে, সর্বত্র এত বেশি হৃদয়হীন পরিবর্তন আনা হয়েছে যে মনে হয় সে যে কখনো এখানে থেকেছে সেই স্মৃতি তার মন থেকে নিশ্চিত ভাবে মুছে দেবার ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। বেড়ালটা তাকে চিনতে পারলো না। বিস্মৃতির নিষ্ঠুরতায় মর্মাহত হয়ে সে বলল, বেড়ালটা আমাকে চিনতে পারছে না। গ্লাসে পানীয় মেশাতে মেশাতে লিওনা মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, এজন্য যদি তোমার মন খারাপ লাগে তাহলে শোনো, বেড়ালরা কখনোই কাউকে মনে রাখে না।
ওরা সোফায় হেলান দিয়ে ঘন হয়ে বসলো, নিজেদের কথা বললো, সেই বিকালে কত দিন আগে কে জানে, খচ্চরটানা ট্রলি গাড়িতে পরস্পরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে কে কি ছিল তাই নিয়ে তারা আলাপ করলো। তাদের জীবন কেটেছে, তারপর, দপ্তরের পাশাপাশি দুটি কক্ষে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এই মুহূর্তের আগে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজের কথা ছাড়া আর কোনো বিষয়ে কথা বলে নি। কথা বলতে বলতে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ওর উরুতে হাত রাখলো, তারপর অভিজ্ঞ প্রলুব্ধকারীর কোমল স্পর্শ দিয়ে ওখানে তার হাত বুলাতে লাগলো। ও তাকে বাধা দিলো না, সাড়াও দিলো না, সৌজন্যের খাতিরে একটু কেঁপে পর্যন্ত উঠলো না। শুধু সে যখন আরেকটু অগ্রসর হবার চেষ্টা করলো তখন তার অনুসন্ধানী হাত চেপে ধরে তার করতলে একটি চুমু খেয়ে সে বলল, এই, কী হচ্ছে! আমি অনেক দিন আগেই জেনেছি, আমি যে পুরুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তুমি সে নও।
তখনো তার বয়স খুব অল্প, একদিন একজন বলিষ্ঠ সক্ষম লোক, তার মুখ সে কখনো দেখে নি, অতর্কিতে তাকে জাপ্টে ধরে জাহাজঘাটের মাটিতে ঠেসে ধরে, এক টানে তার কাপড় খুলে ফেলে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে উন্মত্ত সঙ্গমে লিপ্ত হয়। সে শুয়ে ছিলো কাঁকর বালির উপর, শরীর জায়গা-জায়গায় কেটে গেছে, কালশিরে পড়েছে, তবু তার মনে হয়েছিল লোকটি যেন চিরকাল তার সঙ্গে থাকে, সে যেন প্রেমের প্লাবনে ভেসে গিয়ে তার বাহুবন্ধনের মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারে। সে তার মুখ দেখে নি, তার গলা শোনে নি, কিন্তু তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। যে হাজার লোকের ভিড়ের মধ্যেও সে তার গঠন ও আকৃতি ও তার প্রেম করার ধরন দেখে তাকে নির্ভুলভাবে চিনতে পারবে। ওই ঘটনার পর থেকে যে কেউ তার কথা শুনতে রাজি হয়েছে তাকেই সে বলেছে, দেখুন, আপনি যদি কখনো একজন বড়সড়ো শক্তিশালী মানুষের কথা শোনেন যে পনেরোই অক্টোবর তারিখে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটায় একটি অসহায় কালো মেয়েকে জাহাজঘাটায় ধর্ষণ করেছিল তখন সে কোথায় আমার দেখা পাবে তাকে তা বলে দেবেন। সে এতো লোককে এই কথা বলেছে যে এখন আর এ ব্যাপারে তার কোনো আশা নাই, তবু অভ্যাসের বশে সে বলে চলতো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজাও বহুবার এ কাহিনী শুনেছে। রাত দুটো নাগাদ তারা প্রত্যেকে তিন তিনটা ব্র্যান্ডি পান করে ফেলে এবং ফ্লোরেন্টিনো আরিজা উপলব্ধি করে যে, সত্যিই, লিওনা কাসিয়ানি যে লোকটির জন্য অপেক্ষা করছে সে ওই লোক নয়। আর এই উপলব্ধি তাকে আনন্দিত করলো।
বিদায় নেবার সময় সে বলল, ব্র্যাভো, সিংহ কন্যা, আমরা আজ ব্যাঘটিকে সংহার করেছি।
ওই রাতে শুধু এই জিনিসটিই শেষ হয় নি। যক্ষ্মা রোগীদের চত্বর সম্পর্কিত কুৎসিৎ মিথ্যা তার ঘুম হরণ করে নিয়েছিল, কারণ তা তার মনে একটা অকল্পনীয় ধারণা সঞ্চারিত করেছিল, ফারমিনা ডাজা মরণশীল এবং স্বামীর আগেই সে মারা যেতে পারে। কিন্তু সেদিন থিয়েটারের দরজার কাছে তাকে হুমড়ি খেতে দেখে ফ্লোরেন্টিনো নিজের ইচ্ছাশক্তিতে সেই অতল খাদের দিকে আরেক পা অগ্রসর হল, তার মনে হল ফারমিনা ডাজা নয়, সেই হয়তো আগে মারা যাবে। তার এই পূর্বানুভূতি ছিল ভয়াবহ, কারণ তা ছিল বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বছরের পর বছরের নিশ্চল প্রতীক্ষা, সৌভাগ্যের অন্তহীন প্রত্যাশা, এসব সে পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্তু দিগবলয়ে এখন সে নানা কাল্পনিক ব্যাধির অনতিক্রম্য সমুদ্র আর নিঘুম রাতে বিন্দু বিন্দু করে প্রস্রাব ত্যাগ আর উষার মৃদু আলোয় প্রতিদিন নিশ্চিত মৃত্যুবরণ ছাড়া আর কিছুই দেখতো না। তার মনে হল দিনের প্রতিটি মুহূর্ত, যারা এক সময় ছিল তার মিত্র এবং পরীক্ষিত সহযোগী, তারা এখন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেছে। কয়েক বছর আগে সে একদিন একটা বিপজ্জনক গোপন মিলন স্থলে গিয়েছিল, কি যে ঘটতে পারে সেই আতঙ্কে তার হৃদয় ছিল ভারাক্রান্ত, সে গিয়ে দেখলো যে বাড়ির দরজায় তালা দেয়া নাই, কজাগুলি অতি সম্প্রতি তেল দিয়ে মসৃণ করে রাখা হয়েছে। যেন সে নিঃশব্দে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার অনুতাপ বোধ হল, এক ভদ্র বিবাহিতা রমণীর শয্যায় সে যদি মারা যায় তাহলে ভদ্রমহিলার অপূরণীয় ক্ষতি। হবে। সেক্ষেত্রে যে রমণীকে সে এই ধরণীতে সব চাইতে বেশি ভালোবাসে, যার জন্য সে মোহভঙ্গের একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস না ফেলেও এক শতাব্দী অতিক্রম করে পরবর্তী শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, সেই রমণী যে তার হাত ধরে চাঁদের সমাধি-ঢিবি ও বাত্যা-তাড়িত পপি ফুল আকীর্ণ রাস্তা পার করে তাকে নিরাপদে মৃত্যুর অপর তীরে পৌঁছে দেবার সুযোগ নাও পেতে পারে, এরকম ভাবনা তার মনে জেগে ওঠা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত ছিল।
সত্য কথা হল তার সময়ের মানদণ্ডে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছিল। বয়স ছাপ্পান্ন হয়েছে, শরীর সুসংরক্ষিত, জীবন তার বিবেচনায় ভালোই কেটেছে, কারণ ওই জীবন ছিল প্রেমে পরিপূর্ণ। কিন্তু ওই যুগে নিজেকে তরুণ দেখিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ সহ্য করার মত সাহস তার এ বয়সে হত না, আর বিগত শতাব্দীতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জন্য আজো সে গোপনে কাঁদে একথা স্বীকার করার মতো সাহসও তার ছিল না। তরুণ হবার জন্য সময়টা ছিল খারাপ। প্রতি বয়সেরই কাপড়-জামার একটা বিশেষ ঢং থাকে, কিন্তু বার্ধক্যের ঢংটি কৈশোর অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় আর চলতে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। বয়সের চাইতেও ব্যাপারটা ছিল সামাজিক মর্যাদার। তরুণরা পোশাক পরতো তাদের পিতামহদের মতো, সময়ের আগেই চশমা লাগিয়ে তারা নিজেদের অধিকতর শ্রদ্ধাভাজন করে তুলতো, আর বয়স ত্রিশ বছর পেরুলেই তারা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতো। মেয়েদের জন্য ছিল মাত্র দুটি বয়স : বিয়ে করার বয়স, যা বাইশের উপর যেতো না, আর স্থায়ী কুমারিত্বের বয়স। অন্যরা, বিবাহিতা মহিলারা, জননীরা, বিধবারা, পিতামহী, মাতামহীরা, তারা ছিল ভিন্ন একটা জাতি, তারা ক’বছর বেঁচেছে তা দিয়ে তাদের বয়সের হিসাব রাখতো না, মৃত্যুবরণ করার পূর্বে আরো ক’বছর তাদের হাতে আছে সেটা দিয়ে তারা তাদের বয়সের হিসাব করতো।
পক্ষান্তরে, ফ্লোরেন্টিনো আরিজা বার্ধক্যের ছলনাময় ফাঁদগুলির মুখোমুখি হত বন্য হঠকারিতার সঙ্গে, যদিও সে জানতো যে বালক বয়স থেকেই তাকে দেখাতো একজন বুড়ো মানুষের মতো, তাই ছিল তার নিয়তি। প্রথমে এর পেছনে ছিল প্রয়োজনের বাধ্যবাধকতা। তার বাবা নিজের যেসব কাপড়-জামা ফেলে দেবার সিদ্ধান্ত নিতেন ট্রান্সিটো আরিজা সেগুলির সেলাই খুলে ফেলে তার জন্য নতুন করে সেলাই করে দিতেন। তাই সে যেসব ফ্ৰককোট পরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতো সেখানে বসবার পর তার কোটের প্রান্তদেশ মাটিতে লুটাতো, আর সে মাথায় দিতো যাজকীয় টুপি, ছোট করার জন্য ভেতর দিকে তুলা গুঁজে দিলেও তার প্রান্তদেশ তার কান ঢেকে নিচে নেমে আসতো। ক্ষীণদৃষ্টির জন্য পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে চশমা পরতো, তার মাথার চুল ছিল তার মায়ের চুলের মতো, রুক্ষ, স্পষ্ট বোঝা যেতো না। সৌভাগ্যবশত বিভিন্ন ভাবে আরোপিত অনেকগুলি গৃহযুদ্ধের ফলে সরকারি কর্মকাণ্ডে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয় এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে আগে যে উচ্চ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছিল তা শিথিল করতে হয়, যার ফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে নানা পটভূমি ও সামাজিক অবস্থানের শিক্ষার্থীরা এসে একটা তালগোল পাকানো অবস্থা সৃষ্টি করে। অনেকে সরাসরি অবরুদ্ধ স্থান থেকে ক্লাসে এসে হাজির হত, তাদের শরীরে তখনো বারুদের গন্ধ, পরনে বিদ্রোহী অফিসারদের ইউনিফর্ম, ওই সব অফিসার সিদ্ধান্তহীন যুদ্ধে বন্দুকের মুখে বন্দি হয়েছিল, আর এই ছাত্ররা স্পষ্ট দৃশ্যমান ভাবে তাদের অস্ত্র কোমরে সেঁটে রাখতো। খেলার মাঠে মতপার্থক্য ঘটলে তারা একে অন্যকে গুলি করতো, পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে শিক্ষককে ভয় প্রদর্শন করতো এবং একবার এদেরই একজন, লা সাল অ্যাকাডেমির তৃতীয় বর্ষের একটি ছাত্র, জনৈক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা দানের ক্লাসে ব্রাদার হুয়ান এরেমিটার একটি উক্তির জন্য তাকে গুলি করে হত্যা করে। ব্রাদার এরেমিটা বলেছিলেন যে ঈশ্বর হলেন রক্ষণশীল দলের একজন পূর্ণ সদস্য।
অন্যদিকে, ক্ষয়িষ্ণু নামিদামি পরিবারের ছেলেরা পরতো পুরনো ঢং-এর যুবরাজদের মতো কাপড়-জামা, আর খুব গরিব ছেলেরা ক্লাসে আসতো খালি পায়ে। এত বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ভূত এতসব অদ্ভুত পরিবেশে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা যে অন্যতম অদ্ভুত একটি ছাত্র ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নাই, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো অতটা অদ্ভুত সে ছিল না। একদিন রাস্তায় তাকে উদ্দেশ করে কে একজন চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘কুশ্রী আর গরিব হলে একজন শুধু আরো বেশি চাইতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা এর চাইতে রূঢ় কোনো কথা শোনে নি। যাই হোক, প্রয়োজনের তাগিদে তাকে যে পোশাক পরতে হয়, তখন এবং তার বাকি জীবন ধরে, সে পোশাকই ছিল তার রহস্যময় স্বভাব এবং গম্ভীর চরিত্রের জন্য সব চাইতে বেশি মানানসই। যখন আর.সি.সি.তে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি ঘটলো তখন সে রীতিমত দর্জি দিয়ে তার পোশাক বানালো, ঠিক তার বাবার মতো করে। বাবাকে তার মনে পড়ে একজন বুড়ো মানুষ হিসাবে। তিনি মারা গিয়েছিলেন যিশু খ্রিস্টের পরম পূজনীয় তেত্রিশ বৎসর বয়সে। তাই ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে সর্বদাই তার বয়সের চাইতে বুড়ো দেখাতো। বস্তুতপক্ষে, তার এক মুখ পাতলা স্বল্পকালীন প্রণয়িনী, ব্রিজিটা জ্বলেটা, তাকে প্রথম দিনই বলেছিল যে কাপড় জামা পরা অবস্থার চাইতে নগ্ন মূর্তিতেই সে তাকে দেখতে বেশি ভালোবাসে, কারণ তখন তাকে বিশ বৎসরের কম বয়েসী দেখায়। কিন্তু এর প্রতিকার তার জানা ছিল না, কারণ প্রথমত, তার ব্যক্তিগত রুচি তাকে অন্য কোন রকম পোশাক পরতে দেয় নি, দ্বিতীয়ত, বিশ বৎসরের একজন যুবককে কিভাবে আরো অল্প বয়সের দেখানো যাবে তা সে জানতো না, যদি না সে দেরাজ খুলে তার হাফ-প্যান্ট ও নাবিকদের টুপিটা বের করে আবার তা ব্যবহার করতো। অন্যদিকে, তার সময়ে বার্ধক্যের যে ধারণা প্রচলিত ছিল তার হাত থেকে সে মুক্তি পেল না, আর তাই সেদিন থিয়েটারের দরজার কাছে ফারমিনা ডাজাকে হুমড়ি খেতে দেখে সে যে বজ্রপাতের মতো তীব্র ভয়ে বিচলিত হয়ে উঠবে তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। তার মনে হল, মরণ, হারামির বাচ্চা, তার ভালোবাসার প্রচণ্ড যুদ্ধে নিশ্চিত বিজয় অর্জন করতে যাচ্ছে।
এ পর্যন্ত সর্বশক্তি দিয়ে সে তার সব চাইতে বড় যে যুদ্ধ চালিয়েছিল তা ছিল তার টাক মাথার বিরুদ্ধে, আর ওই যুদ্ধে সে বরণ করেছিল শোচনীয় পরাজয়। প্রথম যেদিন সে তার চিরুনিতে কয়েকটা চুল পেঁচিয়ে থাকতে দেখলো তখনই সে বুঝলো সে এক নারকীয় যন্ত্রণার মধ্যে পতিত হয়েছে, সে যে কী যন্ত্রণা তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো বোঝার সাধ্য নাই। অনেক বছর ধরে সে সংগ্রাম করে যায়। ওই বিপর্যয়ের হাত থেকে তার মাথার প্রতিটি ইঞ্চি বাঁচাবার জন্য এমন কোন তেল বা ক্রিম নেই যা সে ব্যবহার করে দেখে নি। সে একবার কোথাও শুনেছিল যে চুলের বেড়ে ওঠার সঙ্গে ফসল কাটার চক্রের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে, তাই সে ব্রিস্টল অ্যালমানাকে প্রকাশিত যাবতীয় কৃষি বিষয়ক তথ্য মুখস্থ করে ফেলেছিল। সারা জীবন সে যে সম্পূর্ণ টেকো নাপিতের কাছে চুল কাটিয়েছে তাকে ত্যাগ করে সে এক বিদেশী নবাগত নাপিতের কাছে যেতে শুরু করে। এই নতুন নরসুন্দর চুল কাটতো শুধু চাঁদের চতুর্থ দিনে। এই নতুন নরসুন্দর তার উর্বর হাতের প্রমাণ যখন সবে রাখতে শুরু করে তখন খবর পাওয়া গেল যে শিক্ষানবিশদের ধর্ষণ করায় অভিযোগে অ্যান্টিলীয় পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। হাতকড়া পরিয়ে তাকে একদিন নিয়ে যাওয়া হয়।
ততদিনে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ক্যারিবীয় অঞ্চলের খবরের কাগজগুলিতে টাক সম্পর্কে যে সব বিজ্ঞাপন বেরুতো, যেখানে একই লোকের পাশাপাশি দুটি ছবি মুদ্রিত হত, প্রথমটিতে মাথায় তরমুজের মতো টাক, দ্বিতীয়টিতে সিংহের মতো কেশরাশি, অব্যর্থ প্রতিষেধক মাখার আগে ও পরে, সেই সব বিজ্ঞাপন কেটে রেখেছিল। ছয় বছরে সে ওই রকম একশো বাহাত্তরটি তেল ও ক্রিম পরীক্ষা করে দেখে, উপরন্তু বোতলের গায়ে যে সব সৌজন্যমূলক বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা লেখা থাকতো তার সুযোগ সে গ্রহণ করে, এর ফলে সে অর্জন করলো শুধু তার মাথার ত্বকে একটা চুলকানি, বিশ্রী গন্ধ ছড়ানো একটা চর্মরোগ, যাকে মার্টিনিকের চিকিৎসকরা বোরিয়ালিস দাদ নাম দেয়, কারণ তার ওই একজিমা অন্ধকারের মধ্যে একটা মৃদু আলো ছড়াতো। শেষ উপায় হিসাবে সে সাধারণ বাজারে ইন্ডিয়ানরা যেসব লতাপাতা ফেরি করে বেড়াতো তার আশ্রয় নিল, লেখক চত্বরে যেসব প্রাচ্যদেশীয় ঐন্দ্রজালিক ওষুধ বিক্রি হত তাও ব্যবহার করে দেখলো, তারপর যখন সে বুঝলো যে তাকে ভীষণ ভাবে ঠকানো হয়েছে ততদিনে তার মাথা একজন সন্তের মুড়ানো মাথায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে যখন হাজার বছরের গৃহযুদ্ধের ফলে দেশ রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত তখন এক ইতালীয় এই শহরে এসে উপস্থিত হয়, সে ব্যক্তিগত ভাবে টেকো মাথাদের জন্য সত্যিকার মানুষের চুল দিয়ে পরচুলা বানিয়ে দিতো। দাম নিতো আকাশ ছোঁয়া, তিন মাস ব্যবহারের পর তার কোনো দায়-দায়িত্বও প্রস্তুতকারক নিতো না, তবু সঙ্গতিপন্ন কোনো টাকমাথাওয়ালাই এই প্রলোভনের সামনে নতিস্বীকার না করে পারে নি। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ছিল প্রথম দিকের একজন। সে হুবহু তার চুলের মতো দেখতে একটা পরচুলা মাথায় চাপিয়ে পরীক্ষা করলো, নিজের প্রকৃত চুলের সঙ্গে সে ওটার এতো বেশি মিল লক্ষ করলো যে তার মনে হল তার মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই পরচুলার চুলও বোধ হয় খাড়া হয়ে উঠবে, কিন্তু এক মৃত ব্যক্তির চুল নিজের মাথায় ধারণ করার ব্যাপারটা সে মেনে নিতে পারলো না। তার দ্রুত বর্ধমান টাকের মধ্যে সে একটা সান্তুনাই খুঁজে পেল, তার চুল পেকে যাচ্ছে এটা তাকে দেখতে হবে। না। একদিন এক দিলদরিয়া মাতাল তাকে তার দপ্তর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি উৎসাহের সঙ্গে জাহাজঘাটের ওপর তাকে আলিঙ্গন করলো, তারপর কুলিদের হাস্যরোলের মাঝে তার টুপিটা খুলে নিয়ে সে তার মাথার ওপর একটা সশব্দ চুম্বন দিলো। তারপর চিৎকার করে সে বললো, চুলহীন বিস্ময়!
সেদিন রাতে, আটচল্লিশ বছর বয়সে, যে কয়েক গাছা কোমল চুল তার কপালের দু’পাশে ও ঘাড়ের কাছে তখনো অবশিষ্ট ছিল তা কেটে ফেলে সে তার নির্ভেজাল টেকোত্বের নিয়তিকে সর্বান্তঃকরণে মেনে নিয়েছিল। প্রতি দিন সকালে স্নানের পূর্বে সে শুধু তার গালেই সাবান মাখাতো না, মাথার যেসব জায়গায় খোঁচা খোঁচা চুল উঠতে শুরু করেছে সেখানেও সাবান ঘষতো, তারপর একটা নাপিতের ক্ষুর দিয়ে তার গোটা মাথা এমন মসৃণভাবে কামিয়ে ফেলতো যে মনে হত কোনো শিশুর পশ্চাদদেশ। তখন পর্যন্ত সে আপিসেও তার মাথার টুপি নামিয়ে রাখতো না, তার টাক মাথা তার মধ্যে একটা অশোভন নগ্নতার অনুভূতি এনে দিতো। কিন্তু যখন সে তার টেকোত্বকে সমগ্র অন্তর দিয়ে গ্রহণ করলো তখন সে তার মধ্যে নানা পুরুষালী গুণ আরোপ করলো। আগেও সে এসব কথা শুনেছিল কিন্তু তখন ভাবতো ওসব বুঝি টেকো বৃদ্ধদের মায়া কল্পনা। আরো পরে সে তার ডান দিকের সিথি থেকে তার লম্বা চুলগুলি মাথা ঢেকে টেনে আড়াতে শুরু করে এবং এ অভ্যাস সে কখনো ত্যাগ করে নি। কিন্তু এটা সত্ত্বেও সে তার টুপি পরতে থাকে, সর্বদা ওই একই শেষকৃত্যানুষ্ঠানের ভঙ্গিতে। পরে যখন শোলার টুপি চালু হয় তখনো সে তার নিজস্ব ঢং-এর টুপি বিসর্জন দেয় নি।
অন্য দিকে, তার দাঁত খোয়ানোর ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন রকম। তার মূলে কোন স্বাভাবিক বিপর্যয় ছিল না। এক ভ্রাম্যমাণ দাঁতের ডাক্তার তার দাঁতের সামান্য সংক্রমণ সারাবার জন্য চরম পন্থা গ্রহণ করে আর তার অদক্ষ চিকিৎসার পরিণতিতেই তার ওই দুর্ভোগ ঘটে। দাঁতের উপর তুরপুনের ব্যবহারকে ফ্লোরেন্টিনো ভীষণ ভয় করতো, তাই সে কোনো দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতো না। শেষে ব্যথা অসহ্য হয়ে ওঠে। এক রাতে পাশের ঘরে শোয়া তার কাতরানি শুনে ভয় পেয়ে যান। বিস্মৃতির কুয়াশায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া পুত্রের অনেক দিন আগের কাতরানির কথা মায়ের মনে পড়লো, কিন্তু কোথায় প্রেম তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে তা দেখার জন্য তিনি যখন ওর হাঁ করা মুখের ভেতর দৃষ্টিপাত করলেন তখন দেখলেন যে ওর মুখের মধ্যে ঘা হয়ে গেছে।
কাকা দ্বাদশ লিও ওকে ডাক্তার ফ্রান্সিস অ্যাডোনের কাছে পাঠালেন, এক কৃষ্ণাঙ্গ দৈত্য, একটা ব্যাগে তার দন্ত চিকিৎসার সব জিনিসপত্র নিয়ে সে নৌযানগুলিতে নিয়মিত সফর করতো, যেন কোনো ভ্রাম্যমাণ পণ্য বিক্রেতা। নদীর কিনারের গ্রামগুলিতে সে ছিল এক আতঙ্ক বিশেষ। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মুখের ভেতর এক নজর তাকিয়েই সে সিদ্ধান্ত নিল যে তাকে ভবিষ্যতের আরো দুর্ভাগ্য থেকে স্থায়ীভাবে বাঁচাবার জন্য মাঢ়ির দাঁতসহ তার সব ভালো দাঁতগুলিও তুলে ফেলতে হবে। টাকের ক্ষেত্রের বিপরীতে দাঁতের এই চরম চিকিৎসায় সে ভীত হল না, তবে অনুভূতি বিলোপ না করে কাজটা করলে যে রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারে সেই স্বাভাবিক ভয় তো ছিলই। নকল দাঁতের ধারণাও তাকে বিচলিত করলো না। প্রথমত, ছেলেবেলার এক পরম প্রিয় স্মৃতি তার মনে গেঁথে ছিল। একবার মেলাতে সে এক জাদুকরকে দেখেছিল, জাদুকর তার উপরের ও নিচের দু’পাটি দাঁত খুলে সামনের টেবিলের উপর রাখার পর দাঁতের পাটি দুটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করে কথা বলেছিল। দ্বিতীয়ত, ছেলেবেলা থেকে সে দাঁতের ব্যথায় এত কষ্ট পেয়ে এসেছে, প্রেম তাকে যে নিষ্ঠুর যন্ত্রণা দিয়েছে প্রায় সেই রকম, সে কষ্টের হাত থেকে সে এবার পুরোপুরি মুক্তি পাবে। এটাকে তার টাকের মতো মনে হল না। বার্ধক্য এখানে কোনো চোরাগুপ্তা অন্যায় আঘাত পাচ্ছে না। তাছাড়া তার মনে হল গন্ধকজারিত তেতো নিঃশ্বাস সত্ত্বেও তার নকল দাঁতের হাসি তার চেহারার উন্নতি সাধন করবে। অতএব কোনো বাধা না দিয়ে সে ডাক্তার অ্যাডোনের তাতানো সাড়াশির সামনে নিজেকে সমর্পণ করলো। অতঃপর, রোগমুক্তির পর স্বাস্থ্যের ক্রমোন্নতির সময়টা সে সহ্য করলো একটা মালটানা খচ্চরের চরম ঔদাসীন্য নিয়ে।
কাকা দ্বাদশ লি ও অস্ত্রোপচারের সমস্ত খুঁটিনাটি এতো মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ করলেন যে মনে হল যেন তার নিজের মাংসের ওপরই অস্ত্র চালানো হচ্ছে। নকল দাঁত সম্পর্কে তাঁর অনন্য উৎসাহের পেছনে একটা কারণ ছিল। ম্যাগডালেনা নদীপথে তাঁর প্রথম যাতায়াতের সময় তাঁর অসামান্য সঙ্গীত প্রীতির ফলে একটা ঘটনা ঘটে। সে রাত ছিল পূর্ণিমার রাত। জাহাজ গামারা বন্দরের প্রবেশমুখে পৌঁছলে লিও একজন জার্মান সারভেয়ারের সঙ্গে একটা বাজি ধরলেন, কাপ্তানের ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা ইতালীয় রোমান্টিক গান গেয়ে তিনি অরণ্যের প্রাণীদের জাগিয়ে তুলতে পারেন। তিনি বাজিটা প্রায় হারতে বসেছিলেন। নদীর অন্ধকারের মধ্যে জলাভূমি থেকে ভেসে এলো সারসদের পাখা ঝাঁপটানির শব্দ, জলের বুকে কুমিরের বলে কেউ বিশ্বাস করতো না, তার চার পুত্রই এক এক করে মারা যায়, ঠিক সেই সময়ে যখন তারা ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে শুরু করেছিল। আর তার কন্যার নদীভিত্তিক কোনো পেশার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না, তার কাছে পঞ্চাশ মিটার উঁচু ভবনে বসে হাডসন নদীতে নৌযান চলাচল অবলোকন করাই ছিল বেশি আনন্দদায়ক। এ সময় একটা গল্প চালু হয়। পর পর যে আকস্মিক ঘটনাগুলি ঘটে তার পেছনে কোনো না কোনো ভাবে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার অশুভ চেহারা ও তার ভ্যাম্পায়ারের ছাতার একটা ভূমিকা ছিল কেউ কেউ এটা বিশ্বাসও করতো।
যখন ডাক্তারের নির্দেশে কাকা অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন তখন ফ্লোরেন্টিনো আরিজা স্বেচ্ছায় তার রবিবাসরীয় প্রেম কিছু পরিমাণে বিসর্জন দিল। সে তার কাকার সঙ্গে তাঁর নির্জন গ্রামের আবাস স্থলে যেতে শুরু করলো, তাদের যানবাহন হল নগরীর একেবারে প্রথম মোটর গাড়িগুলির একটি। ওটা স্টার্ট দিতে হত সামনের হাতল ঘুরিয়ে আর তার পশ্চাদমুখী ধাক্কা ছিল এতো শক্তিশালী যে প্রথম ড্রাইভারের কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়ে যায়। কাকা-ভাইপো ঘণ্টার পর ঘন্টা আলাপ করতো। বৃদ্ধ কাকা শুয়ে থাকতেন সিল্কের সুতায় তাঁর নামাঙ্কিত দোলনা-শয্যায়, সব কিছু থেকে দূরে, সমুদ্রের দিকে পিঠ রেখে, ক্রীতদাসদের পুরনো উপবনাঞ্চলে; চিরহরিৎ গুল্মের গন্ধে ভরপুর বারান্দা থেকে অপরাহ বেলায় দেখা যেতো সিয়েরার তুষারাচ্ছাদিত পর্বতমালার শৃঙ্গগুলি। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ও তার কাকা নদীপথে নৌ চলাচলের বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আলাপ করতে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো না এবং এখনো এই মন্থর অপরাতুগুলিতে, মৃত্যু যখন অদৃশ্য অতিথি হিসাবে সর্বদা উপস্থিত থাকতো, ওই একই অবস্থা বিরাজ করছিলো। কাকা দ্বাদশ লিওর একটা সার্বক্ষণিক চিন্তা ছিল, নদীপথে নৌ চলাচল ব্যবস্থা যেন কখনো ইউরোপীয় কর্পোরেশনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী দেশের অভ্যন্তরীল নয়া-উদ্যোক্তাদের হাতে চলে না যায়। তিনি বলতেন, “এ ব্যবসা সব সময় উপকূলাঞ্চলীয় মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। এটা যদি দেশের মধ্যাঞ্চলের মানুষের করায়ত্ত হয় তাহলে তারা আবার তা জার্মানদের হাতে তুলে দেবে।’ তার এই চিন্তা ছিল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক না হলেও তিনি তাঁর এই মন্তব্য পুনরুচ্চারণ করতে ভালোবাসতেন : আমার বয়স প্রায় একশো বছর হল, আমি সব কিছু বদলে যেতে দেখেছি, এমনকি মহাবিশ্বে তারার অবস্থান পর্যন্ত, কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত এদেশে কোন কিছু বদলাতে দেখি নি। ওরা এখানে তিন মাস অন্তর অন্তর নতুন শাসনতন্ত্র রচনা করে, নতুন আইন বানায়, কিন্তু আমরা এখনো বাস করছি ঔপনিবেশিক যুগে।
তার মেসন ধর্মভাইরা সব অশুভ-অকল্যাণের দায়দায়িত্ব ফেডারালবাদের ওপর চাপিয়ে দিলে তিনি সর্বদা উত্তর দিতেন, ‘সহস্র দিবসের সংগ্রাম তেইশ বছর আগে ‘৭৬-এর যুদ্ধের সময়েই পরাজয় বরণ করে নিয়েছিল।’ রাজনীতির প্রতি ফ্লোরেন্টিনো আরিজার ঔদাসীন্য ছিল চরম পর্যায়ের। সে এই সব ঘন ঘন ক্রমবর্ধমান বিরক্তিকর বক্তৃতা শুনতো যেভাবে একজন মানুষ সমুদ্রের ধ্বনি শোনে সেই ভাবে। কিন্তু কোম্পানির কোনো কর্মসূচির কথা উঠলেই সে হয়ে উঠতো এক প্রচণ্ড তার্কিক। তার মত ছিল কাকার মতের বিপরীত। তার বিবেচনায় নদীপথে নৌ চলাচল ব্যবস্থার, যা সব সময়েই ছিল বিপর্যয়ের প্রান্তসীমায়, যাবতীয় বাধাবিপত্তি একটিমাত্র কাজের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব। জাতীয় কংগ্রেস ক্যারিবীয় নদী কোম্পানিকে নিরানব্বই বছর একদিনের জন্য যে একচেটিয়া নৌযানের অধিকার দিয়েছে তা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলেই সব সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। তার কাকা আপত্তি জানিয়ে বললেন, আমার নামের মিতা লিওনা তার অপদার্থ নৈরাজ্যিক তত্ত্বাবলী দিয়ে তোমার মাথায় এই ধারণা ঢুকিয়েছে। কিন্তু এই কথাটা ছিল শুধু অর্ধসত্য। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার চিন্তাধারার ভিত্তি ছিল জার্মান কমোডোর জোহান বি. এলবার্স-এর অভিজ্ঞতা, যার মহৎ বুদ্ধিমত্তা মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত উচ্চাশার জন্য বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার কাকা অবশ্য মনে করতেন যে এলবার্সের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার কারণে তিনি ব্যর্থ হন নি, তিনি ব্যর্থ হন তাঁর অবাস্তব অঙ্গীকারসমূহের জন্য। তিনি এদেশের সমস্ত ভূগোলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে টেনে নিয়েছিলেন : এর নদীর নাব্যতা রক্ষা করা, বন্দরের স্থাপনাসমূহ, ভূমিতে প্রবেশপথ, যাতায়াত ব্যবস্থা সব কিছুর কর্তৃত্বভার তিনি নিজের হাতে গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া, ফ্লোরেন্টিনো আরিজার কাকা বলতেন, প্রেসিডেন্ট সাইমন বলিভারের তীব্র বিরোধিতা কোনো হাসির ব্যাপার ছিল না।
তাঁর বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সহযোগীরা এই মতদ্বৈধতাকে দেখতো বিয়ের ব্যাপারে তর্কবিতর্কের মতো, যেখানে দু’পক্ষের যুক্তিই ছিল যথার্থ। বৃদ্ধের একগুঁয়েমি তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হত, এই জন্য নয় যে তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন, আগের মতো আর স্বপ্নচারী নেই, বরং এই জন্য যে তিনি এবং তার ভাইরা, কারো সহায়তা ছাড়াই, সেই বীরত্বময় যুগে সারা বিশ্বের শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিলেন তার ফসল তিনি এই ভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন না। আর তাই, তিনি যখন তার সমস্ত অধিকারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন যেন আইনগত সময় অতিক্রান্ত হবার আগে সেখানে কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে তখন কেউ তাকে বাধা দিত না। কিন্তু অকস্মাৎ, যখন ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার সমস্ত হাতিয়ার সমর্পণ করে দিয়েছিল, তখন এক চিন্তাবিধুর অপরাত্নে কাকা দ্বাদশ লিও তার শতবর্ষের সকল অধিকার ত্যাগ করতে রাজি হলেন, শুধু একটা সম্মানজনক শর্ত আরোপ করলেন তিনি, এটা তার মৃত্যুর পূর্বে ঘটবে না।
এটা ছিল তার শেষ কাজ। এর পর তিনি আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আলাপ করেন নি, কাউকে এসব সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে পরামর্শও করতে দেন নি, তাকে করুণা করতে পারে এমন কাউকে তার সামনে আসা থেকে বিরত রাখতে তিনি সম্ভাব্য সব কিছু করেন। একটা ভিয়েনার দোল-চেয়ারে বসে তিনি আস্তে আস্তে দুলতেন, পরিচারক তার পাশের টেবিলে সর্বদা রেখে যেতো এক পট গরম কালো কফি, আর বোরিক অ্যাসিড দেয়া এক গ্লাস জলে দু’ পাটি নকল দাঁত, যা তিনি কোনো দর্শনার্থী না এলে এখন আর পরতেন না, ওই ভাবে বসে তিনি তার বারান্দা থেকে নিরন্তর বরফঢাকা সিয়েরা পবর্তমালা দেখতে দেখতে তার দিনগুলি কাটিয়ে দিতেন। খুব অল্পসংখ্যক বন্ধুবান্ধবদের তিনি দেখা দিতেন, আর তিনি তাদের কাছে সুদূর অতীতের কথাই শুধু বলতেন, নদীপথে নৌ চলাচলেরও আগের কথা। কিন্তু এখনো তার আলাপের একটা নতুন বিষয় অবশিষ্ট ছিল : ফ্লোরেন্টিনো আরিজা বিয়ে করুক তার ওই ইচ্ছার কথা।
তিনি বলতেন, আমার বয়স যদি পঞ্চাশ বছর কম হত তাহলে আমি আমার নামের মিতা লিওনাকে বিয়ে করতাম। ওর চাইতে ভালো স্ত্রীর কথা আমি কল্পনা করতে পারি না।”
তার এতো বছরের শ্রম শেষ মুহূর্তে এই অদৃষ্টপূর্ব পরিস্থিতিতে ব্যর্থ হয়ে যাবে সে আশঙ্কায় ফ্লোরেন্টিনো আরিজার বুক কেঁপে উঠলো। সে বরং সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে দেবে, মৃত্যুবরণ করবে, তবু ফারমিনা ডাজার সামনে সে হার মানবে না। সৌভাগ্যবশত কাকা দ্বাদশ লিও ও ব্যাপারে আর পীড়াপীড়ি করলেন না। তার বিরানব্বই বৎসর বয়সে তিনি তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রকে একমাত্র উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে কোম্পানি থেকে অবসর নিলেন।
ছয় মাস পরে, সর্বসম্মতিক্রমে, ফ্লোরেন্টিনো আরিজা কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেকটারস-এর সভাপতি এবং জেনারেল ম্যানেজার পদে অভিষিক্ত হল। কার্যভার গ্রহণ করার দিন, শ্যাম্পেন পানের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন-পালার পর, তাঁর দোল চেয়ার থেকে উঠে না দাঁড়াবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে অবসর গ্রহণ করা বৃদ্ধ সিংহ একটা সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন, যা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা মৃত্যু পরবর্তী শোকবাণীর মতো। তিনি বললেন, তাঁর জীবনের শুরু ও শেষ হয় দু’টি দৈব নিয়ন্ত্রিত ঘটনার মাধ্যমে। প্রথম, মুক্তিদাতা যখন তুরবাকো গ্রামে মৃত্যুর অভিমুখে তার দুর্ভাগ্যপীড়িত ভ্রমণ করছিলেন তখন তিনি তাকে কোলে করে নিয়ে যান। দ্বিতীয়, নিয়তির বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি কোম্পানির জন্য একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী খুঁজে পেয়েছেন। অবশেষে, নাটকটাকে অনাটকীয় করে তোলার জন্য তিনি উপসংহারে বললেন, এই জীবন থেকে আমি শুধু একটা ব্যর্থতার অনুভূতি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, অসংখ্য শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর আমি আমার নিজেরটায় গাইতে পারলাম না।
বলাই বাহুল্য যে তিনি টোস্কা অপেরার একটা গান দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি টানেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল তখনও অটল। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মন আর্দ্র হয়ে ওঠে, কিন্তু তার প্রকাশ ঘটে শুধু ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সময় কণ্ঠস্বরের ঈষৎ কাপুনির মধ্যে। ঠিক এই ভাবেই সে তার জীবনে যা কিছু করেছে, যা কিছু ভেবেছে, যত উপরে উঠেছে, সব কিছুরই মূলে ছিল তার তীব্র দৃঢ় সঙ্কল্প, ফারমিনা ডাজার ছায়ায় তার নিয়তিকে সাফল্যমণ্ডিত করার মুহূর্তে সে জীবিত থাকবে, তার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
তবে সে রাতে তার জন্য লিওনা কাসিয়ানি যে পার্টি দেয় সেখানে শুধু ফারমিনা ডাজার স্মৃতিই তার সঙ্গী হয় নি। তার সঙ্গী হয়েছিল আরো অনেকের স্মৃতি : যারা সমাধিক্ষেত্রে ঘুমিয়ে আছে, তার লাগানো গোলাপ গাছগুলির মধ্য থেকে যারা তার কথা ভাবছে; যারা এখনো সেইসব বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে যেখানে একদা তাদের স্বামীরা মাথা রেখেছিলো, চাঁদের আলোয় যাদের মাথায় দেখা যাচ্ছে সোনালি শিং। একজনকে না পেয়ে সে ওদের সবাইকে একই সঙ্গে একই সময়ে পেতে চেয়েছিল, যখনই তার বুকের মধ্যে ভয় জেগে উঠতো তখনই সে এই চাহিদা অনুভব করতো। তার সব চাইতে কঠিন সময়েও, সব চাইতে খারাপ মুহূর্তেও, সে তার এতো বছরের অসংখ্য প্রেমিকাদের সঙ্গে, যতো দুর্বলই হোক, একটা যোগসূত্র রক্ষা করে এসেছে, সে তাদের সবার জীবন সম্পর্কে সর্বদা খোঁজখবর রেখেছে।
আর তাই সে রাতে তার মনে পড়লো রোসাাকে, একেবারে প্রথম নারী, যে তার কৌমার্যের পুরস্কারটি ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যার স্মৃতি আজো তার মনে প্রথম দিনের মতোই বেদনা জাগিয়ে তোলে। চোখ বন্ধ করলেই সে ওর মসলিনের পোশাক পরা আর সিল্কের ফিতা লাগানো টুপি মাথায় চেহারা স্পষ্ট দেখতে পায়, জাহাজের ডেকে বসে তার ছেলের খাঁচায় দোল দিচ্ছে। তার জীবনের বিগত বছরগুলিতে সে বহুবার ওর খোঁজে বেরিয়ে পড়তে চেয়েছে, ও কোথায় জানে না, তার শেষ নাম কি তাও জানে না, তাকেই সে খুঁজছে কিনা তাও জানে না, তবু তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে অর্কিড়কুঞ্জের মধ্যে সে তাকে কোথাও না কোথাও খুঁজে পাবেই। কিন্তু প্রত্যেক বারই, শেষ মুহূর্তে কোনো বাস্তব অসুবিধা কিংবা তার নিজেরই ইচ্ছাশক্তির অসময়োচিত ব্যর্থতার জন্য, জাহাজের সিঁড়ি যখন টেনে তুলে ফেলা হচ্ছে তখন সে তার যাত্রা স্থগিত করে দেয়, আর এমন একটা কারণে যার সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে অবধারিত রূপে ফারমিনা ডাজা জড়িত ছিল।
তার মনে পড়লো বিধবা নাজারেতের কথা, একমাত্র তার সঙ্গেই সে জানালার সরণীতে তার মায়ের গৃহের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করেছিল, যদিও সে নয়, তার মা-ই তাকে ডেকে এনেছিলেন। অন্যদের চাইতে তাকেই সে বেশি বুঝতো, কারণ বিছানায় তার মন্থরতা সত্ত্বেও তার মধ্য থেকে মমতার এতো উজ্জ্বল বিচ্ছুরণ ঘটতো যে ফারমিনা ডাজার অভাব সে অনেকখানি পূরণ করেছিল। কিন্তু তার স্বভাবচরিত্র ছিল গলির বেড়ালের মতো, তার মমত্বের শক্তির চাইতেও অদম্য, যার অর্থ ওরা দুজনই হয়ে উঠল বিশ্বাসভঙ্গকারী। তবু প্রায় ত্রিশ বছর ধরে ওরা মাঝে মাঝেই পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, কারণ তাদের ছিল বন্ধুকধারীদের শ্লোক : ‘অবিশ্বস্ত কিন্তু আনুগত্যহীন নয়। একমাত্র বিধবা নাজায়েতের ক্ষেত্রেই ফ্লোরেন্টিনো আরিজা দায়িত্ব নিয়েছিল। সে যখন শুনলো যে ও মারা গেছে এবং নিঃস্বদের মতো তার কবর দেয়া হচ্ছে তখন ও নিজের খরচে তাকে সমাহিত করার ব্যবস্থা করে, আর তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে শোক করার জন্য সেই ছিল একমাত্র ব্যক্তি।
আর যেসব বিধবাদের সঙ্গে সে প্রেম করেছিল তাদের কথাও তার মনে পড়লো। যারা এখনো বেঁচে আছে তাদের মধ্যে সব চাইতে বেশি বয়সের হল প্রুডেনসিয়া পিটার, সকলের কাছে সে পরিচিত ছিল দু’জনের বিধবা বলে, কারণ দুই স্বামীর মৃত্যুর পরও সে জীবিত ছিল। তার কথা মনে পড়লো ফ্লোরেন্টিনো আরিজার। অন্য প্রুডেনসিয়ার কথাও তার মনে পড়লো, আরেলানোর মহাপ্রেমিক বিধবা, যে পটপট করে তার কাপড়ের বোতামগুলি ছিঁড়ে ফেলতো, যেন আবার সেগুলি সেলাই করে যথাস্থানে লাগিয়ে দেবার সময়টুকু ফ্লোরেন্টিনোকে ওখানে কাটাতে হয়। আরো ছিল। জোসেফা, জুনিগার বিধবা, তার প্রেমে এমন পাগল যে ওর বাগানের ফুল কাটার কাঁচি দিয়ে তার লিঙ্গ কর্তন করতে সে প্রস্তুত ছিল, যেন তার না হলে সে অন্য কারোও কখনো হতে না পারে।
এঞ্জেলেস আলফারোর কথাও তার মনে পড়লো, সবার চাইতে স্বল্পক্ষণস্থায়ী, সবার চাইতে বেশি ভালোবাসার পাত্রী, যে ছ’মাসের জন্য সঙ্গীত বিদ্যালয়ে এসেছিল চেল্লো-বেহালা-বীণা ইত্যাদির বাদন শিক্ষাদানের জন্য। ফ্লোরেন্টিনোকে নিয়ে সে তার বাড়ির ছাদে অনেক চন্দ্রালোকিত রাত কাটিয়েছে, জন্মের সময় যে রকম সম্পূর্ণ নিরাভরণ ছিল ঠিক সেই রকম অবস্থায়, অদ্ভুত সুন্দর চেল্লো বাজাতো, আর তার সোনালি উরু দুটির মধ্যে ওই ধ্বনি যেন একটা মানবিক কণ্ঠ লাভ করতো। প্রথম চাঁদনি রাত থেকেই তাদের তীব্র প্রেমের অনভিজ্ঞতার দরুন উভয়েরই বুক ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু ও যেভাবে এসেছিল সে ভাবেই একদিন চলে গেল, এক সামুদ্রিক জাহাজে, বিস্মৃতির পতাকা উড়িয়ে, তার কোমল যৌনতা ও পাপী চেল্লা নিয়ে। চন্দ্রালোকিত ছাদে যা পড়ে রইলো তা হল একটি পতপত করা বিদায়কালীন সাদা রুমাল, দূর দিগন্তে একটা বিষণ্ণ নিঃসঙ্গ পায়রার মতো। সে যেন ছিল কবিতা উৎসবে পরিবেশিত এক পঙক্তি কবিতা। তার সঙ্গে থেকে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা একটা জিনিস শিখেছিলো, যদিও না উপলব্ধি করেই এ অভিজ্ঞতা তার ইতিমধ্যে কয়েকবার লাভ হয়েছিল : তুমি একই সময়ে কয়েকজনের সঙ্গে প্রেমে করতে পারো, প্রত্যেকের সঙ্গে একই রকম বেদনা বোধে আক্রান্ত হতে পারো এবং কারো সঙ্গেই তোমার বিশ্বাসঘাতকতা করার দরকার হয় না। জাহাজঘাটার জনতার মধ্যে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্য প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ক্রোধে সে আপন মনে বলে উঠলো, “তোমার বুকের মধ্যে একটা বেশ্যালয়ের চাইতেও বেশি জায়গা আছে।’ এঞ্জেলেসের সঙ্গে বিচ্ছেদের বেদনায় সে অনর্গল অশ্রু বিসর্জন করলো। কিন্তু ওর জাহাজটা চক্রবালের ওপারে অদৃশ্য হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের মধ্যেকার সমস্ত জায়গা আবার অধিকার করে নিলো ফারমিনা ডাজার স্মৃতি।
তার মনে পড়লো অ্যান্ড্রিয়া ভারোনের কথাও। গত সপ্তাহে সে ওর বাড়ির বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো, কিন্তু বাথরুমের গোলাপি আলো তাকে সতর্ক করে জানিয়ে দেয় যে এখন সে ঢুকতে পারবে না, তার আগে আরেক জন ওখানে গিয়ে হাজির হয়েছে। আরেকজন : পুরুষ অথবা নারী, কারণ প্রেমের পাগলামির ক্ষেত্রে এই ধরনের খুঁটিনাটি নিয়ে অ্যান্ড্রিয়া ভারোনের কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। ফ্লোরেন্টিনোর তালিকায় যারা ছিল তার মধ্যে একমাত্র সে-ই দেহের বিনিময়ে জীবিকা অর্জন করতো, তবে সে ওটা করতো নিজের খুশিমতো, তার ব্যবসা দেখার জন্য তার কোনো ম্যানেজার ছিল না। ওই সময়ে প্রচ্ছন্ন বারাঙ্গণী হিসাবে তার খ্যাতি কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছেছিলো, আর সে যথার্থই যোগ্য হয়ে উঠেছিলো তার অন্য নামটির, আমাদের প্রত্যেকেরই ভদ্রমহোদয়া।’ সে রাজ্যপাল ও রণতরীর প্রধানদের পাগল করে তুলেছিলো, বিখ্যাত যোদ্ধা ও লেখকরা, যদিও তারা যতোটা ভাবতেন ততটা বিখ্যাত তারা ছিলেন না, অবশ্য কেউ কেউ ছিলেন, তারা ওর কাঁধে মুখ গুঁজে চোখের জল ফেলতেন। আর প্রেসিডেন্ট রাফায়েল রেয়েস, নগরীতে তার ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যে, ওর সঙ্গে দ্রুত আধ ঘণ্টা সময় কাটান এবং আইন মন্ত্রণালয়ে ওর উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য ওকে একটা পেনশন প্রদান করেন, যদিও সেখানে সে তার জীবনের একদিনের জন্যও কোনো কাজ করে নি। তার দেহের মাধ্যমে যতটুকু আনন্দ সে দিতে পারতো তা সে সানন্দে বিতরণ করতো। সবাই তার অশোভন কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে সম্যক অবহিত থাকলেও কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ আনতো না, কারণ তার কুকর্মের খ্যাতনামা সহযোগীগণ যেমন নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতেন তেমনি তার সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতেন, তারা জানতেন যে কোনো কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশ হলে ওর চাইতে তাঁদেরই ক্ষতি হবে বেশি। তার ক্ষেত্রেই ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ভালোবাসার জন্য অর্থ না প্রদানের তার পবিত্র নীতি ভঙ্গ করে, আর অ্যাড্রিয়া ভারোন-ও পয়সা ছাড়া দেহ দান না করায় তার নীতি ভঙ্গ করে শুধু ফ্লোরেন্টিনো আরিজার জন্যই। তাকে উপভোগ করতে চাইলে তার স্বামীকেও পয়সা দিতে হত। ফ্লোরেটিনো আরিজা ও অ্যান্ড্রিয়া ভেরোনা একটা ব্যবস্থায় সম্মত হল, তারা প্রতীকী মূল্য হিসাবে এক পেসো আদান-প্রদান করবে, তবে অ্যান্ড্রিয়া তা নিজের হাতে গ্রহণ করতো না, আর আরিজাও তা ওর হাতে তুলে দিতো না। তারা উভয়ে একটা খেলনা ব্যাংকে ওই পয়সা ফেলে দিতে এবং যথেষ্ট অর্থ সঞ্চিত হবার পর তারা একদিন লেখকদের চত্বরে গিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা একটা সুন্দর জিনিস কিনলো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত সঙ্কটের সময় তাকে এনিমা নিতে হত। এর মধ্যে যে একটা বৈশিষ্ট্যময় ইন্দ্রিয়পরায়ণতা আছে তা অ্যান্ড্রিয়া ভেরোনাই তাকে বুঝিয়ে দেয়। এবং তারপর তারা দুজনে একসঙ্গে এনিমা নিয়ে তাদের উন্মত্ত অপরাহুগুলিতে তাদের প্রেমের মধ্যে আরো নতুন প্রেম সৃষ্টি করার প্রয়াস পেতো।
তার এতগুলি বিপজ্জনক মিলন পর্বের মধ্যে সে যে মাত্র একটি নারীর কাছ থেকে এক বিন্দু তিক্ততার স্বাদ পেয়েছিলো সেটাকে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার সৌভাগ্য বলে বিবেচনা করতো। ওই নারী ছিল বঙ্কিম দেহধারিণী সারা নরিয়েগা, যার শেষ দিনগুলি কাটে ডিভাইন কোপার্ডেস পাগলাগারদে। সেখানে সে এমন অসম্ভব অশ্লীল জরাগ্রস্ত কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করে যে তাকে আলাদা করে রাখতে হয়, নইলে সে অন্য পাগলিনীদের আরো পাগল করে দিতো। তবে, আর.সি.সি.র পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আর কাউকে দিয়ে ফারমিনা ডাজার স্থান পূরণের চেষ্টা করার মতো বিশেষ সময় বা ইচ্ছা ফ্লোরেন্টিনো আরিজার ছিল না। ধীরে ধীরে সে একটা নিয়মের মধ্যে চলে আসে, সে শুধু তাদের ওখানে যেতো যারা ইতিমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে তাদের সঙ্গে শুতো, যতক্ষণ তার ভালো লাগতো, যতক্ষণ তার পক্ষে সম্ভব হতো, যত দিন তারা বেঁচে থাকতো। যে পেন্টেকস্ট রবিবার জুভেনাল উরবিনো যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার জন্য অবশিষ্ট ছিল একজন, মাত্র একজন, যার বয়স সবে চৌদ্দ পূর্ণ হয়েছে এবং তখন পর্যন্ত তাকে প্রেমে পাগল করে দেবার মত যা কারো কাছে ছিল না তার সব কিছুই ছিল ওই মেয়ের মধ্যে।
ওর নাম ছিল আমেরিকা ভিসুনা। পুয়ের্টো পাৰ্ডির জেলেদের গ্রাম থেকে দু’বছর আগে সে এখানে এসেছিল। তার পরিবার তাকে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার হেফাজতে দিয়ে যায় তার অভিভাবক এবং রক্ত সূত্রে স্বীকৃত আত্মীয় রূপে। সে এখানে আসে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য, একটা সরকারি বৃত্তি নিয়ে, সঙ্গে আনে পুতুলের বাক্সের মত ছোট্ট একটা টিনের ট্রাঙ্ক। যে মুহূর্তে সে তার উঁচু সাদা জুতা ও সোনালি বেণী নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে আসে সে মুহূর্তেই ফ্লোরেন্টিনোর একটা ভয়ঙ্কর পূর্ববোধ হয়, তারা দুজন বহু রবিবার দুপুরের খাওয়ার পর একসঙ্গে বৈকালিক নিদ্রা যাবে। সে তখনো একটি শিশু, শব্দটার সকল অর্থে, দাঁতে তার জড়ানো, হাঁটুতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘর্ষণের দাগ, কিন্তু শিগগিরই সে যে কী ধরনের রমণী হয়ে উঠবে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা ওকে দেখামাত্র সেটা বুঝেছিল। সে তাকে তার সাহচর্য দিল, তার যত্ন নিল, একটি মন্থর বছর জুড়ে, শনিবার সার্কাসে নিয়ে গেল, রবিবার পার্কে আইসক্রিম খাওয়ালো, ছেলেমিভরা দীর্ঘ অপরাহ্র কাটালো তার সঙ্গে, এই ভাবে তার আস্থা ও মমত্ব অর্জন করলো, সে ওর হাত ধরে ওকে চালিত করলো, একজন স্নেহপ্রবণ পিতামহের মত, তার প্রচ্ছন্ন বধ্যভূমির দিকে। ওর দিক থেকে ব্যাপারটা ছিল তাৎক্ষণিক, স্বর্গের দ্বার যেন তার জন্য খুলে গেল। সে আকস্মিক ভাবে প্রস্ফুটিত হল একটি ফুলের মত, সুখের সমুদ্রে সে ভাসতে লাগলো, এর মধ্যে সে তার পড়াশোনার জন্যও প্রেরণা পেলো। সে ক্লাসে প্রথম হতে লাগলো যেন শনি-রবিবার বাইরে যাবার সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত হতে না হয়। আর ফ্লোরেন্টিনো আরিজার দিক থেকে এটা ছিল তার বার্ধক্যের উপসাগরে সব চাইতে সুন্দর সুরক্ষিত খাড়ি। এত বছরের হিসেব করা প্রেমের পর এই নিষ্পাপ সারল্যের মৃদু আনন্দের মধ্যে সে লাভ করলো একটা বলকারক বিকৃতির মাধুর্য।
তাদের মধ্যে বিরাজ করতো সম্পূর্ণ মতৈক্য। ও যা ছিল সে রকমই আচরণ করতো, একজন ভক্তিভাজন বৃদ্ধের কাছ থেকে, যিনি কোনো কিছুতেই চমকিত বা বিচলিত হতেন না, জীবন সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণে প্রস্তুত, আর ফ্লোরেন্টিনো ও ইচ্ছাকৃত ভাবে আচরণ করতো এক অতিবৃদ্ধ জরাগ্রস্ত প্রেমিকের মতো, বাস্তব জীবনে যে অবস্থাকে সে সবচাইতে বেশি ভয় করতো। তরুণ ফারমিনা ডাজার সঙ্গে ওর বেশ মিল ছিল, ভাসাভাসা নয়, ওদের বয়স, স্কুলের ইউনিফর্ম, চুল, পোষমানা হাঁটার ভঙ্গি, এমনকি ওদের অহঙ্কারী ও অনিশ্চিত ব্যবহারের চাইতেও অন্য কোথাও, কিন্তু এসব সত্ত্বেও সে কখনো ওকে ফারমিনা ডাজার সঙ্গে এক করে দেখে নি। তাছাড়া স্থান পূরণের যে ধারণা তাকে এতোদিন সার্থক ভাবে এক ভিক্ষুকের মতো প্রেমিকে পরিণত করেছিল তা এখন তার মন থেকে সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়ে গিয়েছিলো। সে ওকে পছন্দ করতো ও যা সেই জন্যই, সে ওকে ভালোবাসতে শুরু করলো ও যা সেই জন্যই, একটা প্রদোষকালীন উন্মাতাল উল্লাসের সঙ্গে সে ওর মধ্যে হারিয়ে গেল। একমাত্র ওর ক্ষেত্রেই সে আকস্মিক গর্ভ সঞ্চারের বিরুদ্ধে কঠোর সাবধানতা অবলম্বন করে। বার ছয়েক মিলিত হবার পর তাদের দুজনের কারো জন্যই রবিবারের অপরাহুগুলি ছাড়া আর কোনো স্বপ্নের অস্তিত্ব রইলো না।
বোর্ডিং স্কুল থেকে ওকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার অধিকার দেয়া হয়েছিল একমাত্র ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে। তাই সে ক্যারিবীয় রিভার কোম্পানির ছয় সিলিন্ডারের হাডসন গাড়িতে ওকে তুলে নিতো আর, বিকালের রোদ খুব চড়া না হলে, হুড ফেলে দিয়ে সমুদ্র সৈকত দিয়ে গাড়ি চালাতো। ফ্লোরেন্টিনোর মাথায় তার অনুজ্জ্বল হ্যাট, আর ওর মাথায় ওর স্কুল-ইউনিফর্মের নাবিকদের মতো টুপি, দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে যেন বাতাস ওটা উড়িয়ে না নিয়ে যায়, আর খিল খিল করে ও হেসে ভেঙে পড়ছে। কে একজন ওকে বলেছিল ও যেন তার অভিভাবকের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সময় না কাটায়, সে মুখ দিয়েছে এমন কোনো খাবার না খায়, নিজের মুখ তার মুখের খুব কাছে যেন কখনো না নেয়, কারণ বার্ধক্য হল সংক্রামক, কিন্তু ও সেসব কথাকে কোনো পাত্তা দেয় নি। লোকে ওদের সম্পর্কে কি ভাবে না ভাবে সে সম্পর্কে ওরা ছিল পরম উদাসীন, ওদের পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা ছিল সর্বজনবিদিত, তার চাইতেও বড় কথা, ওদের বয়সের বিরাট ব্যবধান ওদেরকে সব সন্দেহের উর্ধ্বে স্থাপন করেছিল।
সেদিন পেন্টেস্টের রবিবারে যখন বিকাল চারটার সময় গির্জার ঘণ্টাগুলি বেজে ওঠে তখন ওরা সবেমাত্র ওদের প্রেম পর্ব শেষ করেছে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার তোলপাড় করে ওঠা বুককে সে কোনো রকমে শান্ত করলো। তার যুবা বয়সের সময় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মূল্যের মধ্যেই ঘণ্টা বাজানোর কাজটা অন্তর্ভুক্ত থাকতো, শুধুমাত্র দীন জীবিকাহীনদের জন্য সে ব্যবস্থা করা হতো না। কিন্তু বিগত যুদ্ধের পর, শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্নে রক্ষণশীল শাসকরা ঔপনিবেশিক প্রথাসমূহ দৃঢ়ভাবে চালু করলেন, আর তখন শেষকৃত্যের খরচ এতো বেড়ে গেল যে অতিবিত্তশালী পরিবার ছাড়া তখন আর কারো পক্ষে উপরোক্ত আয়োজন করা সম্ভব হতো না। আর্চ বিশপ দান্তে দি লুনা যখন মারা গেলেন তখন সারা প্রদেশের গির্জার ঘণ্টাগুলি বিরতিহীন ভাবে বেজেছিল নয় দিন ও নয় রাত ধরে, আর ওই সময় জনগণের কষ্ট এতো চরমে পৌঁছেছিল যে তার উত্তরসূরি বিধান করে দেন যে মৃত্যুবরণ করা একমাত্র সর্বোচ্চ খ্যাতিমান ব্যক্তিদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময়েই গির্জা ঘণ্টা বাজাবে। তাই ওই পেন্টাকস্ট রবিবার বিকাল চারটায় ক্যাথিড্রালের ঘণ্টাধ্বনি শুনে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে হয়েছিলো তার হারানো অতীত থেকে বুঝি কোনো প্রেতাত্মা তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সে কল্পনাও করে নি যে এটা ছিল সেই ঘণ্টাধ্বনি যার জন্য সে কতো বছর ধরে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করে আছে, বহু আগের এক রবিবারে যখন সে ছয় মাসের গর্ভবতী ফারমিনা ডাজাকে হাই ম্যাস-এর পর বেরিয়ে আসতে দেখেছিল সেই তখন থেকে।
প্রায়ান্ধকারের মধ্যে সে বলে উঠলো, যাচ্ছেলে! ক্যাথিড্রালের ঘণ্টা বাজাচ্ছে যখন তখন নিশ্চয়ই হোমরা চোমরা কেউ পটল তুলেছে।
আমেরিকা ভিসুনা, সম্পূর্ণ নগ্ন, এই মাত্র তার ঘুম ভেঙেছে। সে বলল, “নিশ্চয়ই পেন্টেস্টের জন্য।’ ধর্মীয় ব্যাপারে ফারমিনা ডাজার কোনো বিশেষ জ্ঞানই ছিল না। তার জার্মান শিক্ষকের সঙ্গে গির্জার বাদক দলের একজন হয়ে বেহালা বাজাবার জন্য সেই যে গির্জায় গিয়েছিল তার পর সে আর ওখানে ম্যাস-এ যোগদান করে নি, প্রার্থনায় উপস্থিত থাকে নি। ওই জার্মান ভদ্রলোকই তাকে টেলিগ্রাফ বিজ্ঞানে শিক্ষিত করে তুলেছিলো। তার যে কি হল সে সম্পর্কে ফ্লোরেন্টিনো কোনো নির্ভরযোগ্য খবর সংগ্রহ করতে পারে নি। কিন্তু আজ এই ঘণ্টাধ্বনি যে পেন্টেকস্টের জন্য নয় সে বিষয়ে তার কোন সন্দেহ ছিল না। আজ যে নগরীতে জনসাধারণের একটা শোক অনুষ্ঠান আছে তা সুনিশ্চিত। আজ সকালে ক্যারিবীয় শরণার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল তার বাসায় এসেছিল, তারা তাকে জানায় যে জেরেমিয়া দ্য সাত আমুরকে তার আলোকচিত্র স্টুডিওতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। জেরেমিয়া তার অন্তরঙ্গ বন্ধু না হলেও ফ্লোরেন্টিনো আরো অনেক শরণার্থীর ঘনিষ্ঠ জন ছিল, তারা তাকে তাদের নানা অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে, সর্বদা আমন্ত্রণ জানাতো। কিন্তু আজকের গির্জার ঘণ্টাধ্বনি যে জেরেমিয়া দ্য সাত-আমুরের জন্য নয় সে বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিল। জেরেমিয়া ছিল ধর্মের ক্ষেত্রে একজন জঙ্গি অবিশ্বাসী, একজন অঙ্গীকৃত নৈরাজ্যবাদী,, তাছাড়া সে মৃত্যুবরণ করেছে আত্মহননের মাধ্যমে। ফ্লোরেন্টিনো বললো, না, এ ঘণ্টা ধ্বনি অন্তত কোনো গভর্নরের জন্য।
আমেরিকা ভিসুনার যে বয়স তা মৃত্যুর কথা ভাবার বয়স নয়। অযত্নে টানা জানালার পর্দার মধ্য দিয়ে বাইরের আলো তার শরীরে আলো-ছায়ার ছবি সাজিয়েছে। তারা দুপুরের খাবার পর প্রেম করেছে, এখন দিবানিদ্রার শেষে দুজনে একসঙ্গে শুয়ে আছে, দুজনই নগ্নদেহ, উপরে পাখা ঘুরছে, বাইরে উত্তপ্ত টিনের ছাদে কয়েকটা শকুন হাঁটার সময় শিলা বৃষ্টির মতো যে রকম শব্দ করছে তাতেও পাখার গুনগুন ধ্বনি চাপা পড়ে নি। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার দীর্ঘ জীবনে আরো অনেক মেয়েকে যেভাবে ভালোবেসেছে, আমেরিকা ভিসুনাকেও সেই ভাবেই উপভোগ করেছে, কিন্তু এক্ষেত্রে জড়িয়ে ছিল একটা গভীর যন্ত্রণার বোধ যা অন্য কারো ক্ষেত্রেই সে অনুভব করে নি, কারণ তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করার আগেই সে মৃত্যুবরণ করবে।
তাদের এই ঘরটি ছিল জাহাজের ক্যাবিনের মতো, দেয়ালগুলি কাঠের, কয়েক পোচ রঙ দেয়া হয়েছে তাদের গায়ে, জাহাজে যেমন দেয়া হয়। তবে অপরাহ চারটার সময় খাটের উপরে বৈদ্যুতিক পাখা চলতে থাকলেও গরম ছিল নদীপথে চলাচল করা জাহাজের ক্যাবিনের চাইতে বেশি, কারণ এখানে টিনের ছাদ থেকে উত্তাপ ভেতরে সঞ্চারিত হত। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার আর.সি.সি.র আপিসের পেছনে এই ঘরটি বানিয়ে নিয়েছিলো একটিমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে, তার বৃদ্ধ বয়সের প্রেমের জন্য এখানে সে একটা সুন্দর আশ্রয়স্থল খুঁজে পাবে, তাই এটা ডাঙায় একটা ক্যাবিনের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক শোবার ঘর ছিল না। সাধারণ দিনগুলিতে এখানে ঘুমানো ছিল। বেশ শক্ত, চারদিকে কুলিদের হৈচৈ, নদীবন্দরে ক্রেনের সাহায্যে মাল নামানো উঠানোর শব্দ, আর ঘাটে দাঁড়ানো জাহাজগুলির বিকট ভে-র আওয়াজ। কিন্তু আমেরিকা ভেসুনার জন্য রবিবারগুলি ছিল স্বর্গসদৃশ।
তারা ঠিক করেছিল যে পেন্টেস্টের দিন সান্ধ্যকালীন প্রার্থনার পাঁচ মিনিট আগে স্কুলে ফিরে যাবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা দুজন একসঙ্গে থাকবে, কিন্তু গির্জার ঘণ্টাধ্বনি ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলো, তাকে সাত-আমুরের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে, তাই সে সাধারণ সময়ের চাইতে একটু বেশি তাড়াতাড়ি করে তার কাপড়-জামা পরে নিলো। তবে প্রথমে, সব সময় যেমন করতো, সে ওর চুল এক বেণী করে বেঁধে দিলো, প্রেম করার আগে সে-ই নিজের হাতে ওই বেণী খুলে দিতো, তারপর সে ওকে টেবিলের উপর বসিয়ে ওর স্কুলের জুতার ফিতা ফুলের মতো করে বেঁধে দিতো, এ কাজটা ও কখনোই ভালো করে করতে পারতো না। সে ওকে সাহায্য করতো কোনো রকম বিরক্তি বোধ না করে, আর মেয়েটিও ওকে সাহায্য করার জন্য ফ্লোরেন্টিনোকে সাহায্য করতো, যেন এ ছিল। একটা কর্তব্যকর্ম। ওদের প্রথম কয়েকটি সাক্ষাতের পরই ওরা পরস্পরের বয়সের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়, তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে স্বামী-স্ত্রীর মতো একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক, যে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের কাছে সারা জীবন এতো জিনিস গোপন রেখেছে যে এখন আর তাদের পরস্পরকে বলার কিছুই অবশিষ্ট নাই। ছুটির দিন বলে অফিসগুলি ছিল বন্ধ এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। জনশূন্য জাহাজঘাটে মাত্র একটি জাহাজ দাঁড়িয়ে ছিলো, তার বয়লারগুলি ঠাণ্ডা। গুমোট আবহাওয়া বছরের প্রথম বর্ষণের আভাস দিচ্ছিল, কিন্তু পোতাশ্রয়ে রবিবারের নৈঃশব্দ এবং বাতাসের স্বচ্ছতা দেখে মাসটিকে তত কঠোর হবে বলে মনে হল না। এখানে বাইরের পৃথিবী ছিল ছায়াচ্ছন্ন ক্যাবিনটির চাইতে অধিকতর কর্কশ, ঘণ্টাধ্বনি ছড়িয়ে দিচ্ছিল আরো বেশি শোক, যদিও কার জন্য এ ধ্বনি তারা কেউ তখনো তা জানে না। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আর তরুণীটি সল্টপিটারের চত্বরে নেমে গেল, স্পেনীয়রা এ জায়গাকে কৃষ্ণাঙ্গদের বন্দর রূপে ব্যবহার করতো। এখনো এখানে পড়ে আছে ওজন করার জিনিসপত্র, আর দাস ব্যবসায়ের মরচেপড়া শৃঙ্খল ও অন্যান্য মালমশলা গুদামগুলির পাশের ছায়ায় তাদের জন্য তাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে ঢুকে আসন গ্রহণ করার আগে ওরা স্টিয়ারিং-এর চাকায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া ড্রাইভারকে জাগালো না। তারপর গাড়ি তার দিয়ে ঘেরা গুদামগুলির পেছন দিয়ে ঘুরে লাস অ্যানিমাস উপসাগরের পুরনো বাজার এলাকা অতিক্রম করলো, সেখানে অর্ধনগ্ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষরা বল খেলছিলো। তারা উত্তপ্ত ধুলোর মেঘ সৃষ্টি করে নদী বন্দরের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিলো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা নিশ্চিত ছিল যে এই মৃত্যুউত্তর সম্মান জেরোমিয়া দ্য সাত-আমুরের জন্য হতে পারে না, কিন্তু বিরতিহীন ঘণ্টাধ্বনি তাকে অত্যন্ত সন্দিহান করে তুললো। সে ড্রাইভারের পিঠে হাত রেখে তার কানের কাছে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কার জন্য ঘণ্টা বাজছে। ড্রাইভার বললো, ছুঁচোলো দাড়িওয়ালা ডাক্তার সাহেবের জন্য, কি যেন নাম ওঁর?
তিনি যে কে তা নিয়ে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে চিন্তা করতে হল না, কিন্তু ড্রাইভার যখন তাকে ওঁর মৃত্যুর ঘটনাটা বললো তখন তার আশা তাৎক্ষণিক ভাবে অন্তর্হিত হয়ে গেল, কারণ সে যা শুনলো সেটা সে বিশ্বাস করতে পারলো না। একটা মানুষ যেভাবে মৃত্যুবরণ করে অন্য কোনো কিছু দিয়ে তাকে তার চাইতে ভালো ভাবে চেনা যায় না, আর সে যে মানুষটির কথা ভাবছে তার সঙ্গে এরকম মৃত্যুর কোনো মিল ছিল না। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও মানুষটা তিনিই ছিলেন, শহরের সব চাইতে বয়োবৃদ্ধ, সব চাইতে গুণান্বিত চিকিৎসক, শহরের শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের অন্যতম, তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, একাশি বৎসর বয়সে, একটা তোতা পাখিকে ধরতে গিয়ে, আমগাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙে।
ফারমিনা ডাজার বিয়ের পর থেকে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা যা কিছু করেছে তা ছিল এই আকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যখন ওই ঘটনাটা ঘটলো তখন তার বিনিদ্র রজনীগুলিতে সে যে আনন্দের শিহরণ অনুভব করবে বলে প্রায়ই ভেবেছিল তা সে অনুভব করলো না। তার পরিবর্তে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক তাকে আক্রমণ করলো : তার এক অদ্ভুত অনুভূতি হল, তার জন্যও তো এই রকম মৃত্যুঘণ্টা বাজতে পারতো। তাদের গাড়ি খোয়া বাঁধানো রাস্তায় ধাক্কা খেতে খেতে চলছিলো, তার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আমেরিকা ভিসুনা ভয় পেলো, সে তাকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে। ফ্লোরেন্টিনো নিজের বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতে ওর হাত চেপে ধরে, নিঃশ্বাস ফেলে বললো, সোনা মেয়ে, তোমাকে সে কথা শোনাতে গেলে আমার আরো পঞ্চাশ বছর লাগবে।
সে জেরেমিয়া দ্য স্যাঁৎ-আমুরের শেষকৃত্যের কথা ভুলে গেল। আমেরিকাকে তার স্কুলের দোরগোড়ায় নামিয়ে দিয়ে সে দ্রুত প্রতিশ্রুতি দিল যে আগামী শনিবার সে ওকে তুলে নেবার জন্য আবার আসবে, তারপর ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল তাকে ডাক্তার জুভেনাল উরবিনের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য। বাড়ির সামনে সে দেখতে পেলো অনেককটা মোটর গাড়ি, চারপাশের রাস্তায় অনেকগুলি ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ি, বাড়ির বাইরে কৌতূহলী জনতার ভিড়। ডাক্তার লাসিডাস অলিভেল্লার অতিথিরা যখন। দুঃসংবাদটা পান তখন তাদের আনন্দ উৎসব তুঙ্গে পৌঁছে ছিল, তারা সঙ্গে সঙ্গে এখানে ছুটে আসেন। ভিড়ের জন্য বাড়ির ভেতরে নড়াচড়া করা কষ্টকর ছিল, কিন্তু ফ্লোরেন্টিনো আরিজা কোনোক্রমে প্রধান শয়নকক্ষে গিয়ে পৌঁছলো, দরজার সামনে যারা দাঁড়িয়েছিলো তাদের মাথার উপর দিয়ে নিজের পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে সে ভেতরে তাকালো, সে জুভেনাল উরবিনোকে তাদের দাম্পত্য শয্যায় শুয়ে থাকতে দেখলো, তার কথা শোনার পর থেকেই সে যাকে ওখানে মৃত্যুর অমর্যাদার মধ্যে ডুবে থাকতে দেখার আশা করে এসেছে। কাঠমিস্ত্রি এই মাত্র শবাধারের জন্য তার মাপ নিয়েছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারমিনা ডাজা, অন্তর্মুখীন এবং হতোদ্যম, তার পরনে এখনো কোনো নববিবাহিতা ঠাকুরমার মতো একটা পোশাক, পার্টির জন্য সেদিন সে যা পরেছিল।
ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার যৌবনের দিনগুলি থেকে আজ পর্যন্ত তার এই হঠকারি ভালোবাসার জন্য সে কি কি করেছে তার সব কিছু, যাবতীয় খুঁটিনাটিসহ, এই মুহূর্তে ওখানে দাঁড়িয়ে একবার কল্পনা করে নিলো। তার জন্য সে খ্যাতি ও বিত্ত অর্জন করেছে, কোন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে তা নিয়ে বিশেষ ভাবে নি; তার জন্য সে নিজের স্বাস্থ্য ও চেহারার এমন কঠোর যত্ন নিয়েছে যা সমসাময়িক অনেক পুরুষের কাছে খুব পুরুষোচিত বলে মনে হয় নি; সে এই দিনটির জন্য যে ভাবে অপেক্ষা করেছে এ পৃথিবীতে কোনো জিনিসের জন্য আর কেউ এভাবে অপেক্ষা করতে পারতো না, আর এই অপেক্ষাকালীন সময়ে সে এক মুহূর্তের জন্যও নিরুৎসাহিত বোধ করে নি। মৃত্যু যে শেষ পর্যন্ত তার পক্ষালম্বন করেছে এই প্রমাণ তাকে ফারমিনা ডাজার বৈধব্যের প্রথম রাতেই তার কাছে তার চিরন্তন বিশ্বস্ততা ও অন্তহীন ভালোবাসার শপথ পুনর্ব্যক্ত করার সাহস যোগালো।
কাজটা যে সুচিন্তিত হয় নি, সঙ্গত হয় নি, নিজের বিবেকের এই অভিযোগ সে অস্বীকার করতে পারলো না কিন্তু সে দ্রুত এ কাজটি করে কারণ তার ভয় ছিল সে হয়তো আর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাবে না। সে আরেকটু কম নিষ্ঠুর ভাবে কাজটা করতে পারলে খুশি হত, কিভাবে করবে তা নিয়ে সে অনেক ভেবেছিলো, কিন্তু নিয়তি তাকে কোনো সুযোগ দিল না। নিজের বিপর্যস্ত মনের অবস্থা এবং ওকে যে অনুরূপ বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে ফেলে রেখে গেল সে কথা ভাবতে ভাবতে সে শোকাচ্ছন্ন। বাড়িটি থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু এটা প্রতিহত করার কোনো উপায় সে খুঁজে পায়। নি। তার মনে হল এই বর্বরোচিত রাত তাদের উভয়ের নিয়তির ওপর এক অনপেনয় দাগ কেটে রেখে গেল চিরদিনের জন্য।
এরপর দু’সপ্তাহ ধরে একটি পুরো রাতও সে ঘুমিয়ে কাটাতে পারে নি। সে হতাশ চিত্তে আপন মনে ভাবলো, তাকে ছাড়া ফারমিনা ডাজার কি হবে, কি চিন্তা করবে সে, তার জীবনের বাকি বছরগুলিতে, তার হাতে সে যে ভয়ঙ্কর বোঝা চাপিয়ে দিয়ে এসেছে তা কিভাবে বহন করবে। তার কোষ্ঠকাঠিন্য সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছাল, পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেল, এনিমার চাইতে কম সুখকর চিকিৎসার শরণাপন্ন হতে হল তাকে। বার্ধক্যের কষ্টগুলি সে তার সমসাময়িকদের চাইতে ভালো ভাবে সহ্য করতে পারতো, কারণ যৌবনকাল থেকেই সে এসবে অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু এখন ওই সব কষ্ট তাকে একযোগে আক্রমণ করলো। এক সপ্তাহ বাড়িতে কাটাবার পর বুধবার সে যখন আপিসে এলো তখন লিওনা কাসিয়ানি তার দুর্বল বিবর্ণ অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হল, কিন্তু ফ্লোরেন্টিনো তাকে আশ্বস্ত করে বললো যে ও কিছু না, সব সময় যেমন হয় তাই, অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত হয়েছে সে। তার বুকের রক্তাক্ত ক্ষত থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসতে উদ্যত সত্যটিকে চেপে রাখার জন্য তাকে আরো একবার তার জিভ কামড়ে ধরে রাখতে হয়। বৃষ্টির জন্য বাইরে রোদে গিয়ে বসে একা একা ভাববার সময় সে পেল না। সে আরো একটি অবাস্তব সপ্তাহ কাটিয়ে দিল, কোনো কাজে মনোসংযোগ করতে পারলো না, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারলো না, ঘুমের অবস্থা হল আরো খারাপ, সে একটা গোপন ইঙ্গিতের জন্য প্রতীক্ষা করে রইলো যা তাকে মুক্তির পথ দেখাবে। কিন্তু শুক্রবার দিন এক অযৌক্তিক প্রশান্তিতে তার মন ভরে গেল, সে এটাকে ধরে নিল একটা অশুভ সঙ্কেত বলে, আর নতুন কিছু ঘটবে না, সারা জীবন সে যা কিছু করেছে সব ব্যর্থ হয়ে যাবে, আর সে এই জীবনের ভার বইতে পারবে না, সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সোমবার দিন সে যখন জানালার সরণীতে তার বাড়িতে ফিরলো তখন সে দরজার ঠিক ওপাশে কাদাজলের মধ্যে একটা চিঠিকে ভাসতে দেখেলো, সে সঙ্গে সঙ্গে ভেজা খামের উপর উদ্ধত হাতের লেখাটা চিনতে পারলো, যে হস্তাক্ষর তার জীবনের এতো পরিবর্তনের মধ্যেও বদলায় নি, ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে হল সে যেন শুকনো গার্ডেনিয়া ফুলের নৈশকালীন সুরভির আভাস পাচ্ছে, কারণ প্রথম ধাক্কার পর তার হৃদয় তাকে সব কিছু বলে দিল : এক মুহূর্তের বিরাম ছাড়া অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সে যে চিঠিটার জন্য অপেক্ষা করছিল এটা হল সেই চিঠি।
.
তাদের সমাধিক্ষেত্রে শবদাহ করার জন্য কোন অগ্নিচুল্লি স্থাপনের অনুমতি দেয় নি, ক্যাথলিকদের বাইরে অন্য ধর্মালম্বনকারীদের জন্যও নয়, যদিও ওই রকম একটা ব্যবস্থার সুবিধার কথা ডাক্তার জুভেনাল উরবিনো ছাড়া আর কারো মনে উদিত হতো না। ফারমিনা ডাজা তার স্বামীর আতঙ্কের কথা ভুলে যায় নি, তাই প্রথম দিকের ওই চরম বিভ্রান্তিকর সময়ের মধ্যেও সে কাঠমিস্ত্রিকে বলে দিয়েছিল, শবাধারের একপাশে যেন একটু ফাঁক রাখা হয় যাতে তার স্বামী একটু সান্ত্বনা পেতে পারেন।
কিন্তু ওই ধ্বংসযজ্ঞ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অল্প কালের মধ্যেই ফারমিনা ডাজা উপলব্ধি করলো যে তার মৃত স্বামীর স্মৃতিকে আগুন মুছে ফেলতে পারবে না, কালের অগ্রযাত্রাও না : তার চাইতেও খারাপ : তার স্বামীর মধ্যে তার বহু ভালো যে সব জিনিস সে ভালোবাসতো শুধু তার অভাবই সে বোধ করতে লাগলো না, যে সব জিনিস তাকে খুব বিরক্ত করতো, যেমন ভোর বেলা ঘুম থেকে ওঠার পর তিনি যে সব আওয়াজ করতেন, তার অভাবও সে অনুভব করতে লাগলো। এইসব স্মৃতি তাকে তার কণ্টকাকীর্ণ শোকের জলাভূমি অতিক্রম করতে সাহায্য করলো। সর্বোপরি, সে তার জীবন তার নিজের মতো করেই যাপন করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, সে মনে করতে লাগলো তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন নি। সে জানতো যে প্রতিদিন প্রভাতে ঘুম থেকে ওঠার ব্যাপারটা কষ্টকর হয়েই থাকবে, কিন্তু সে এটাও জানতো যে ওই কষ্ট ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে।
বস্তুতপক্ষে তিন সপ্তাহ পরে সে প্রথম আলো দেখতে শুরু করে। কিন্তু সে আলো বৃহত্তর ও উজ্জ্বলতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে উপলব্ধি করলো যে তার জীবনে এক অশুভ অপছায়া আছে যে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দেয় না। এটা সেই করুণ অপছায়া নয় যে ইভাঞ্জেলস পার্কে তাকে তাড়না করে বেড়াতো, বার্ধক্যে পৌঁছবার পর সে ওই প্রাণীটি সম্পর্কে এক ধরনের মমত্ব অনুভব করতে শুরু করেছিলো, এটা অন্য একটা ঘৃণ্য প্রাণী, তার পরনে জল্লাদের ফ্রক-কোট, বুকের কাছে টুপি চেপে ধরা, যার চরম বিবেচনাহীন ঔদ্ধত্য তাকে এতই বিচলিত করেছিল যে ওর কথা না ভেবে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। আঠারো বছর বয়সের সময় ফ্লোরেন্টিনোকে প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে সে তার মধ্যে একটা প্রচণ্ড ঘৃণার বীজ রোপণ করেছে যা ক্রমান্বয়ে শুধু বেড়ে উঠতে থাকবে। সে সর্বদা ওই ঘৃণার কথা ভেবেছে, অপছায়াটা কাছে এলেই সে বাতাসে তার উপস্থিতি টের পেয়েছে, তাকে দেখামাত্র সে ভীত বিচলিত হয়েছে, কখনোই তার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে ব্যবহার করতে পারে নি। যে দিন রাতে তার জন্য ভালোবাসার কথা সে আবার উচ্চারণ করে, বাড়িতে তখনো তার মৃত স্বামীর জন্য আনা ফুলের গন্ধ ম ম করছে, তখন সে বিশ্বাস না করে পারে নি যে তার ওই ঔদ্ধত্য ছিল একটা প্রথম পদক্ষেপ, এর পর প্রতিশোধ নেবার জন্য তার যে আর কী অশুভ পরিকল্পনা আছে তা শুধু ঈশ্বরই জানেন।
ফ্লোরেন্টিনো আরিজার নাছোড় স্মৃতি তার ক্রোধ আরো প্রজ্বলিত করলো। শেষকৃত্যের পর সে যখন সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগে ওঠে তখন শুধু একটা ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে সে তার মন থেকে ওকে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়, কিন্তু তার ক্রোধ বার বার ফিরে আসতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে বুঝতে পারলো যে ওকে ভুলে যাবার ইচ্ছাই হচ্ছে ওকে স্মরণ করবার সব চাইতে বড় উৎসাহদাতা। তখন, স্মৃতিবিধুরতার কাছে পরাজয় বরণ করে, সে এই প্রথম বারের মতো সাহস ভরে তার অবাস্তব প্রেমের অলীক দিনগুলির কথা স্মরণ করলো। সে মনে করতে চেষ্টা করলো ছোট পার্কটি তখন কেমন দেখতে ছিল, মলিন বাদাম গাছগুলি কেমন ছিল, কেমন ছিল ওই বেঞ্চটা যেখানে বসে ও তাকে ভালোবাসতো, কারণ ওগুলির কিছুই আর এখন তাদের পূর্ব রূপে বিরাজমান ছিল না। ওরা সব কিছু পাল্টে দিয়েছে, গাছগুলি কেটে ফেলেছে, হলুদ পাতার কার্পেট আর নাই, মুণ্ডুহীন বীরের মূর্তির জায়গায় অন্য এক মূর্তি স্থাপিত হয়েছে, তার পরনে পুরো সামরিক পোশাক, কিন্তু কোনো নাম নাই, তারিখ নাই, বর্ণনা নাই, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক জমকালো স্তম্ভমূলের ওপর, আর ওরা সেখানে স্থাপন করেছে এই জেলার বৈদ্যুতিক কন্ট্রোলসমূহ। ফারমিনা ডাজার বাড়ি কয়েক বছর আগের প্রাদেশিক সরকারের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল, বাড়িটি এখন প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তখন কেমন দেখতে ছিল তা কল্পনা করা তার পক্ষে সহজ ছিল না। আর ওই অল্পভাষী বালক, বৃষ্টির মধ্যে এতো অসহায়, সেই যে ওই কীটদষ্ট জীর্ণ বৃদ্ধ, তার পরিস্থিতির কথা কিছুমাত্র বিবেচনা না করে, তার শোকের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না দেখিয়ে, তার আগুনের মতো অপমানকর উক্তি দ্বারা তার আত্মাকে ঝলসে দিয়েছিল, একথা বিশ্বাস করা তার জন্য ছিল আরো কঠিন। ওই অপমানের ফলে এখনো তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
ফারমিনা ডাজা ফ্লোর ডি মারিয়াতে তার খালাতো বোন হিল্ডাব্রান্ডা সাঞ্চেজের খামারে গিয়েছিল মিস লিঞ্চ জনিত দুর্ভাগ্যের ধকল থেকে তার শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য। এবার বুড়ো, মোটা, পরিতৃপ্ত হিল্ডাব্রান্ডা তার এখানে এলো কয়েকদিন বেড়াবার জন্য, তার সঙ্গে আসে তার বড় ছেলে, সেও বাবার মতোই সেনাবাহিনীতে এক কর্নেল ছিল কিন্তু সান হুয়ান ডি লা সিনেগার কলাক্ষেতের শ্রমিকদের হত্যাযজ্ঞের সময় তার ঘৃণ্য আচরণের জন্য তার বাবা তাকে ত্যাগ করে। হিল্ডাব্রান্ডা আর ফারমিনা ডাজা স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুরনো দিনের কথা বলে কাটিয়ে দিতে, প্রথম যখন তাদের দেখা হয় সেই দিনগুলির স্মৃতিচারণ করতো তারা। হিল্ডাব্রান্ডা গতবার যখন এখানে আসে তখন তাকে আরো বেশি স্মৃতিকাতর দেখায়, বার্ধক্যের ভারে আরো বেশি পীড়িত। তাদের স্মৃতিচারণায় আরেকটু তীক্ষ্ণতা যুক্ত করার জন্য হিল্ডাব্রান্ডা ও ফারমিনা বহু দিন আগে প্রাচীন যুগের মহিলাদের সাজে সেজে বেলজিয়ান আলোকচিত্রশিল্পীকে দিয়ে যে ফোটো তুলিয়েছিলো সেটা সঙ্গে নিয়ে আসে। সেদিন বিকালে জুভেনাল উরবিনো একটা বাজে পরিস্থিতি থেকে একগুয়ে ফারমিনা ডাজাকে উদ্ধার করেছিলেন। ফারমিনা ডাজার কাছে ছবির কপিটা হারিয়ে গিয়েছিলো, হিল্ডাব্রান্ডার কপিও প্রায় মুছে যায়, তবু সেই সব মায়াবী দিনের মোহমুক্ত কুয়াশার মধ্য দিয়েও তারা তাদের দুজনকে চিনতে পারলো, যৌবনদীপ্ত এবং সুন্দরী, যে রকম তারা আর কখনো কোনো দিন হবে না।
হিল্ডাব্রাল্ডার পক্ষে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার কথা না বলা ছিল অসম্ভব, কারণ সে সবসময় ওর নিয়তিকে তার নিজের নিয়তির মতো করে দেখেছে। তার প্রথম টেলিগ্রাম পাঠাবার দিনটির কথা যখন তার মনে পড়ে তখনই তার স্মৃতিতে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার কথা জেগে ওঠে। বিস্মৃতির কোলে নির্বাসিত ছোট্ট বিষণ্ণ পাখিটির কথা সে তার হৃদয় থেকে কখনোই মুছে ফেলতে পারে নি। পক্ষান্তরে, ফারমিনা ডাজা ওকে প্রায়ই দেখেছে কিন্তু কখনো তার সঙ্গে তার কথা হয় নি এবং ফ্লোরেন্টিনোই যে তার প্রথম প্রেমিক এটা সে কল্পনা করতে পারে নি। সে সব সময়ই তার সম্পর্কে নানা খবর পেয়েছে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সব মানুষের খবরই যেমন, আগে হোক কিংবা পরে হোক, তার কাছে এসে পৌঁছতো। লোকে বলতো যে তার ব্যতিক্রমী অভ্যাসের জন্য সে বিয়ে করে নি, কিন্তু ফারমিনা ডাজা ওসব কথায় কান দেয় নি, অংশতঃ এই কারণে যে সে কখনো গুজবে কান দিতো না, তাছাড়া সন্দেহের উর্ধে যে সব মানুষ তাদের সম্পর্কেই এ জাতীয় কথা প্রচার করা হয়। অন্য দিকে এতো চমকপ্রদভাবে, সম্মানের সঙ্গে, জীবনে উন্নতি করার পর কেন সে আধ্যাত্মিক ঢং-এর পোশাক পরবে, বিরল লোশান গায়ে মাখবে, রহস্যজনক ভাবে চলাফেরা করবে এটা ফারমিনা ডাজার কাছে অদ্ভুত মনে হল। সে যে ওই একই ব্যক্তি ফারমিনা ডাজা তা বিশ্বাস করতে পারলো না, হিল্ডাব্রান্ডা যখন নিঃশ্বাস ফেলে বলতো, বেচারা! কী কষ্টই না ও পেয়েছে! তখন ফারমিনা ডাজা সর্বদাই অবাক হয়ে যেতো। কারণ সে দীর্ঘকাল ধরে তার মধ্যে কোনো শোকের চিহ্ন দেখে নি, সে ছায়া অপসৃত হয়ে গিয়েছিলো।
তথাপি, ফ্লোর ডি মারিয়া থেকে ফেরার পরই সেদিন রাতে মুভি থিয়েটারে ওর সঙ্গে যখন তার দেখা হয় তখন তার বুকের মধ্যে কিছু একটা ঘটে যায়। ওর সঙ্গে যে একটি মেয়ে আছে আর সে যে কৃষ্ণাঙ্গিনী তাতে সে বিস্মিত হয় নি। ওর শরীর স্বাস্থ্য যে এতো ভালো আছে, ও যে এতো পরিপূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে চলাফেরা করছে তাই তাকে বিস্মিত করে, তার একথা মনে হল না যে তার নিজের ব্যক্তিগত জীবনে মিস লিঞ্চের বিপর্যয়কারী বিস্ফোরণের পর হয়তো সে-ই বদলে গেছে, ফ্লোরেন্টিনো আরিজা নয়। এর পর থেকে এবং পরবর্তী পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে, সে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে অধিকতর সদয় দৃষ্টিতে দেখেছে। মৃত স্বামীর জন্য জেগে থাকার রাতে সেখানে ওর উপস্থিতি তার কাছে শুধু যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হল না, সে এটাকে দেখলো বিদ্বেষের একটা স্বাভাবিক সমাপ্তি রূপে, ক্ষমা করবার এবং ভুলে যাবার একটা নিদর্শন হিসাবে। আর তাই ও যখন তার ভালোবাসার নাটকীয় পুনরুচ্চারণ করলো, তার দিক থেকে যে ভালোবাসার অস্তিত্ব কখনোই ছিল না এবং এমন এক বয়সে যখন ফ্লোরেন্টিনো আরিজার এবং তার জীবনের কাছ থেকে আর কিছু পাওয়ার আশা নাই, তখন সে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলো।
প্রথম ধাক্কার পর স্বামীর প্রতীকী শবদাহের শেষেও তার মারাত্মক ক্রোধ অব্যাহত থাকে। যখন সে তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হল তখন তা আরো বৃদ্ধি পেলো, আরো ব্যাপক হল। তার চাইতেও খারাপ; তার মনের যে সব স্থানে সে তার স্বামীর স্মৃতিকে প্রশান্ত আশ্রয় দিয়েছিল সে সব স্থান এখন ধীরে কিন্তু অপ্রতিহত ভাবে অধিকার করে নিচ্ছিলো পপি ফুলের ক্ষেত, একদা যেখানে সে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার স্মৃতিকে কবর দিয়েছিল। না চাইলেও সে ওর কথা ভাবতে লাগলো, যত ভাবলো তত বেশি ক্রুদ্ধ হল, যত ক্রুদ্ধ হল তত বেশি করে ওর ভাবনা তার মনকে অধিকার করলো, শেষে অবস্থা এমন অসহনীয় হল যে সে তার কথা নিজের মনের মধ্যে চেপে রাখতে পারলো না। তখন সে তার মৃত স্বামীর টেবিলে বসে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে তীব্র অপমান ও বিশ্রী অভিযোগ ভরা তিন পৃষ্ঠার এক অযৌক্তিক চিঠি লিখলো। আর ওই চিঠি তার দীর্ঘ জীবনে সচেতন ভাবে হীনতম কাজ করার সান্ত্বনা এনে দিলো তাকে।
ফ্লোরেন্টিনো আরিজার জন্যও ওই ক’সপ্তাহ ছিল পরম যন্ত্রণার। সে রাতে ফারমিনা ডাজার কাছে নিজের ভালোবাসার কথা পুনব্যক্ত করার পর সে অপরাহের প্রবল বৃষ্টিপাতে বিপর্যস্ত রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়ায়, নিজেকে প্রশ্ন করে, অর্ধশতাব্দী ধরে সে যে বাঘের আক্রমণ প্রতিহত করেছে এখন তাকে বধ করার পর তার চামড়া নিয়ে সে কি করবে। ভয়ঙ্কর বর্ষণের জন্য শহরে জরুরি অবস্থা বিরাজ করছিলো। কোনো কোনো বাড়িতে অর্ধউলঙ্গ মেয়ে-পুরুষ বন্যার জলে ভেসে যাওয়া জিনিসপত্রের মধ্য থেকে যা কিছু সম্ভব তুলে নেয়ার চেষ্টা করছিলো। ফ্লোরেন্টিনো আরিজার মনে হয়েছিলো প্রত্যেকের বিপর্যয়ের সঙ্গে তার নিজের বিপর্যয়ের যেন কোনো একটা যোগ আছে। কিন্তু বাতাস ছিল শান্ত আর ক্যারিবীয় আকাশে নক্ষত্ররাজি ছিল আপন আপন স্থানে নীরব নিস্পন্দ। অনেক কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ একটা নীরবতা নেমে এলে ফ্লোরেন্টিনো আরিজার কানে অনেকদিন আগের একটা চেনা কণ্ঠস্বর এসে বাজলো, বহু বছর আগে ঠিক এই সময়ে রাস্তার ঠিক এই মোড়ে লিওনা কাসিয়ানি আর সে একটি লোককে গান গাইতে শুনেছিল, ‘আমি সেতুর উপর থেকে ফিরে এসেছি অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে।’ ওই রাতে গানটি, কোনো না কোনো ভাবে, শুধু তার একার জন্য, মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছিলো।
সে ট্রান্সিটো আরিজার অভাব গভীর ভাবে অনুভব করলো। সে ব্যাকুল হল তাঁর প্রাজ্ঞ কথাবার্তার জন্য, কাগজের ফুলের মুকুট শোভিত তাঁর নকল রানীর মাথার জন্য। এটা সে পরিহার করতে পারলো না। যখনই সে কোনো বিপর্যয়ের কিনারে এসে পৌঁছেছে তখনই তার প্রয়োজন হয়েছে কোনো নারীর সাহায্য। তাই, হাতের কাছে কাদের পাওয়া যেতে পারে সেকথা ভাবতে ভাবতে সে যখন আমেরিকা ভিসুনার হোস্টেলের দীর্ঘ জানালার সারিতে একটা আলো দেখলো তখন তার ইচ্ছা হয়েছিল, পিতামহের উন্মত্ততা নিয়ে, এই রাত দুটোর সময় ঘুমে কাদা হয়ে থাকা একগাদা কাপড় জড়ানো, তখনো গায়ে দোলনার হুটোপুটির গন্ধ মাখা, ওই মেয়েকে নিয়ে সে কোথাও উধাও হয়ে যায়। বহু কষ্টে সে তার সে-ইচ্ছা দমন করেছিলো।
শহরের অপর প্রান্তে ছিল লিওনা কাসিয়ানি, একা এবং মুক্ত এবং যে স্নেহ-দয়া মায়া তার প্রয়োজন তা দেখাতে প্রস্তুত, রাত দু’টা কি তিনটায় কি যে কোনো সময়ে এবং যে কোনো অবস্থায়। তার নিদ্রাহীন রাতগুলির নিষ্ফলা পোড়ো জমিতে এই প্রথম সে তার দরজায় করাঘাত করবে না, কিন্তু সে জানতো যে লিওনা অতিশয় বুদ্ধিমতী এবং তাকে কারণটা না বলে তার কাছে ছুটে গিয়ে তার কোলে মুখ গুঁজে অশ্রু বিসর্জন করা সম্ভব নয়। নির্জন শহরের রাস্তায় ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে সে অনেক চিন্তার পর ঠিক করলো, এখন তার জন্য সর্বোত্তম হল ‘দুজনের বিধবা’, বয়সে তার চাইতে ছোট, প্রুডেনসিয়া পিটারের কাছে যাওয়া। তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয় গত শতকে, পরবর্তী সময়ে তাদের যে আর দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছিল না তার একটাই কারণ ছিল, প্রায় অন্ধ এবং বার্ধক্যের অক্রমণে বিধ্বস্ত প্রুডেনসিয়া তার ওই চেহারা কাউকে দেখাতে দিতে রাজি ছিল না। তার কথা মনে হওয়া মাত্র ফ্লোরেন্টিনো আরিজা জানালার সরণীতে। ফিরে এসে একটা বাজারের থলির মধ্যে দুবোতল পোর্ট সুরা এবং এক শিশি আচার ভর্তি করে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা হল, সে এখনো তার পুরনো বাসায় আছে। কিনা, সে একা আছে কিনা, সে বেঁচে আছে কিনা কিছু না জেনেই।
ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার সঙ্কেত হিসাবে ওর দরজায় আঁচড় কাটার শব্দ করতো, ওই ভাবেই সে তার পরিচিতির জানান দিত, তখনো তারা নিজেদের তরুণ বলেই মনে করতো যদিও তারা আসলে তেমন ছিলো না আর। প্রুডেনসিয়া ওই সঙ্কেতের কথা ভোলে নি। আঁচড়ানোর শব্দ শুনে কোনো প্রশ্ন না করে সে তার দরজা খুলে দিয়েছিলো। রাস্তা ছিল অন্ধকার, তার কালো স্যুট, অনমনীয় হ্যাট, বাহুতে ঝোলানো বাদুড়ের ছাতা নিয়ে তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না, জোরালো আলো ছাড়া তাকে দেখা প্রুডেনসিয়ার পক্ষে ছিল প্রায় অসম্ভব, কিন্তু তার চশমার ধাতুর ফ্রেমের উপর পড়া রাস্তার বাতির আভায় সে তাকে চিনতে পারলো। তাকে দেখাচ্ছিল একটা খুনির মতো, যার হাতে এখনো রক্ত লেগে আছে। সে বলল, “এক বেচারা এতিমের জন্য নিরাপদ আশ্রয় চাই।’
একটা কিছু বলার জন্যই ওই কথাটাই তার তখন মনে আসে। ওকে শেষ বার দেখার পর ও যে ইতিমধ্যে এতো বুড়ো হয়ে গেছে তা দেখে সে অবাক হল। সে বুঝলো যে প্রুডেনসিয়াও নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে একই কথা ভাবছে। কিন্তু সে নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দিলো যে অল্পক্ষণের মধ্যেই, প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলেই, জীবন তাদের যে সব আঘাত দিয়েছে তা তারা ক্রমেই কম দেখতে পাবে এবং তখন, প্রথম সাক্ষাতের সময় তারা যেমন তরুণ ছিল আবার তারা নিজেদের সেই রকম তরুণ বলে অনুভব করবে।
প্রুডেনসিয়াল বললো, ‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি যেন কোনো শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যাচ্ছো।’
কথাটা ছিলো যথার্থ। প্রায় সকল নগরবাসীর মতো সেও এগারোটা থেকে তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আর্চবিশপ ডি লুনার মৃত্যুর পর এযাবৎকালীন সব চাইতে বড় ও সব চাইতে জমকালো শোক শোভাযাত্রা দেখছিলো। মাটি কাঁপিয়ে দেয়া কামানের বজ্রগর্জনে, মার্চ করা বাদকদলের বেসুরের বাজনায় আর গতকাল থেকে অব্যাহত ভাবে বেজে চলা সবগুলির গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি ছাপিয়ে আজ এই শোকগীতির ডামাডোলে তার দিবান্দ্রিা ভেঙে গিয়েছিলো। তার বারান্দা থেকে সে দেখতে পায় পুরো ধরাচূড়া পরা অশ্বারোহী সেনাদল, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের লোকজন, অদৃশ্য আমলাতন্ত্রের কালো বিরাট মোটরগাড়ির বহর, পালকের শিরাভরণ ও সোনালি ঝালরে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়িগুলি, একটা ঐতিহাসিক কামান বসানো কামানবাহী গাড়ির উপরে পতাকায় মোড়া হলুদ শবাধাবটি, আর সব শেষে কয়েকটি হুড় নামানো ভিক্টোরিয়া গাড়ি, যেগুলি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো সমাধির উপর বিছিয়ে দেবার জন্য অনেকগুলি ফুলের মালা। এরা প্রুডেনসিয়া পিটারের বারান্দা ছাড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে, মধ্যাহ্নের সামান্য পরেই, শুরু হয় তুমুল বর্ষণ, আর তার প্রচণ্ডতায় একটা বিশৃঙ্খল হুড়াহুড়ির মধ্যে শোক শোভাযাত্রা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
প্রুডেনসিয়া বললো, কী উদ্ভট ভাবে মারা গেল!
ফ্লোরেন্টিনো বললো, ‘হাস্যকরতা সম্পর্কে মৃত্যুর কোনো বোধ নাই’, তারপর বেদনাভরা গলায় যোগ করলো, বিশেষ করে আমাদের মতো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে।
ওরা বসেছিলো সামনের বারান্দায়, মুখের সামনে উন্মুক্ত সাগর, তারা তাকিয়েছিলো অর্ধাকাশ জুড়ে বিরাজিত গোল চাঁদের দিকে, দিকচক্রাবাল রেখায় চলমান জাহাজের আলোকমালার দিকে, তারা উপভোগ করলো ঝড়ের পরের কোমল সুরভিত বাতাস। প্রুডেনসিয়া পিটার রান্নাঘরে গিয়ে দেশী রুটি কেটে কয়েকটা টুকরা নিয়ে এলো, তার ওপর আচার মাখিয়ে তারা তা খেলো, আর পান করলো পোর্ট সুরা। প্রুডেনসিয়ার নিঃসন্তান বিধবার জীবনযাপন কালে তারা দুজন অনেক রাত এই ভাবে কাটিয়েছিল। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার দেখা পায় এমন একটা সময়ে যখন যেকোন লোক তার সঙ্গ কামনা করলেই সে তাকে স্বাগত জানাতো, তাকে যদি ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া করতে হত তবুও, আর এই সময়ে তারা দুজন এমন একটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে যা সম্ভবপর বলে মনে হয় নি।
যদিও ও কখনো বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত দেয় নি তবু ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে বিয়ে করার জন্য সে শয়তানের কাছে তার আত্মা পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে পারতো। সে জানতো তার কৃপণতা, তার অকালবৃদ্ধের চেহারা, তার পাগলের মতো শৃঙ্খলা বোধ, কিছুই না দিয়ে সব কিছু চাইবার ব্যগ্রতা প্রভৃতির সামনে নতিস্বীকার করা সহজ হবে না, কিন্তু এই সব কিছু সত্ত্বেও ওর চাইতে ভালো সঙ্গী আর কেউ হতে পারতো না, কারণ এ পৃথিবীতে তার চাইতে ভালোবাসার বেশি প্রয়োজন আর কোনো মানুষের ছিল না। কিন্তু তার মত এতো পলায়নপরও কেউ ছিল না, তাই, তার দিক থেকে, ওদের ভালোবাসা একটা বিন্দুর পর আর অগ্রসর হয় নি। ফারমিনা ডাজার জন্য তাকে মুক্ত থাকতে হবে, তার এই সিদ্ধান্তে বাধা হতে পারে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছবার আগেই ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে থামতে হত। তবু প্রুডেনসিয়া পিটারের সঙ্গে তার সম্পর্ক বহু বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এক ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যানের সঙ্গে সে প্রুডেনসিয়ার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়, ওই ভদ্রলোক তিন মাস বাড়িতে থাকতেন, পরের তিন মাস ঘুরে বেড়াতেন। প্রুডেনসিয়ার বিয়ের পরও তার সঙ্গে ফ্লোরেন্টিনোর সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। প্রুডেনসিয়ার এক মেয়ে ও চার ছেলে হয়, সে জোর দিয়ে ফ্লোরেন্টিনো আরিজাকে জানায় যে একটি সন্তান তার।
ওরা দুজন কথা বলে চলে, সময়ের কোনো হিসাব না রেখে। তাদের যৌবনকালের বহু নিদ্রাহীন রাত তারা এই ভাবে গল্প করে কাটিয়েছে, আর এখন তো এই বৃদ্ধ বয়সে নিদ্রাহীনতা তাদের সামান্য ক্ষতিই করতে পারবে। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা প্রায় কখনোই দু’গ্লাসের বেশি সুরাপান করতো না, কিন্তু আজ তিন গ্লাসের পরও তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো অসুবিধা দেখা গেল না। দরদর করে সে ঘামছিলো, ‘দুজনের বিধবা’ তাকে তার কোট খুলে ফেলতে বললো, গেঞ্জি, প্যান্ট, ইচ্ছা করলে সব সে খুলে ফেলতে পারে, কিসের ভাবনা তাদের, তারা দুজন তো পরস্পরকে জামা-কাপড় পরা অবস্থার চাইতে নিরাভরণ অবস্থাতেই বেশি দেখেছে। ফ্লোরেন্টিনো রাজি হল কিন্তু বললো যে সে ক্ষেত্রে প্রুডেনসিয়াকেও তা করতে হবে, কিন্তু প্রুডেনসিয়া সম্মত হল না, কিছুকাল আগে সে তার পোশাকের আলমারির আয়নায় নিজেকে দেখেছিল, আর তখনই সে অকস্মাৎ উপলব্ধি করে যে আর কারো সামনেই, কখনোই, সে নিরাভরণ অবস্থায় নিজেকে দেখাতে পারবে না, ফ্লোরেন্টিনোর সামনে নয়, কারো সামনেই নয়।
চার গ্লাস সুরা পান করেও ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার চিত্তের অস্থিরতা দমন করতে ব্যর্থ হল, বারবার সে একই বিষয় নিয়ে বিশদ ভাবে কথা বলে চললো : অতীত, অতীতের মধুর সব স্মৃতি নিয়ে। তাকে স্বস্তি দেবে অতীতের মধ্যে ওই রকম একটা গোপন পথ খুঁজে পাবার জন্য সে মরীয়া হয়ে উঠেছিল। কারণ ওটাই তার দরকার ছিল, তাহলেই তার মুখের মধ্য দিয়ে তার আত্মা অন্তর্হিত হয়ে যাবে। সে যখন দিকচক্রবালে ঊষার প্রথম আলো ফুটতে দেখলো তখন সে একটা পরোক্ষ পথে অগ্রসর হল। হঠাৎ করেই সে যেন ওকে একটা প্রশ্ন করলো, “শোনো, তোমার বয়সের একজন বিধবাকে, তুমি যেমন আছে তেমন অবস্থাতে, কেউ যদি বিয়ের প্রস্তাব করে তাহলে তুমি কি করবে?” তার কথা শুনে সে তার কুঞ্চিত বৃদ্ধার মুখ নিয়ে হেসে উঠলো, তারপর পাল্টা প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি বিধবা উরবিনোর কথা বলছো?’
মেয়েদের ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা সব সময় একটা বিষয় ভুলে যেতো, যেটা ভোলা তার উচিত হত না, বিশেষ করে প্রুডেনসিয়া পিটারের মতো মেয়েদের ক্ষেত্রে : তাদের কেউ কোনো প্রশ্ন করলে তারা সব সময়ই প্রশ্নের চাইতে বেশি মনোযোগ দেয়। প্রশ্নের আড়ালে লুকানো অর্থের দিকে। প্রুডেনসিয়ার মর্মান্তিক লক্ষ্যভেদে আতঙ্কিত হয়ে সে পিছু হটে বললো, আমি তোমার কথা বলছিলাম। ও আবার হেসে উঠে বললো, ‘যাও, তোমার ওই হতচ্ছাড়ি মায়ের সঙ্গে গিয়ে ঠাট্টা-তামাশা কর। ঈশ্বর তাকে শান্তি দিন। তারপর ও কি সত্যি সত্যি বলতে চায় সেকথা তাকে খুলে বলতে বললো। সে জানতো যে ও, কিংবা যে কোনো মানুষ, এতো বছর একে অন্যকে না দেখার পর শুধু সুরা পান আর আচার সহযোগে দেশি রুটি খাবার জন্য রাত তিনটার সময় তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতো না। সে বললো, এক সঙ্গে কাঁদবার জন্যই শুধু কেউ এটা করে।
ফ্লোরেন্টিনো বললো, একবারের জন্য হলেও এবার তুমি ভুল করেছে। আজ আমি এখানে এসেছি গান গাইবার জন্য।
তাহলে গীওয়া যাক, সে বললো।
আর বলেই সে গাইতে শুরু করলো, সুন্দর গলা, তখনকার দিনের একটা জনপ্রিয় গান ধরলো সে : রামোনা, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। যামিনী শেষ হয়ে গিয়েছিল। যে নারী বহুবার প্রমাণ দিয়েছে যে চাঁদের কালো দিকটা তারা জানা সে নারীর সঙ্গে নিষিদ্ধ খেলায় অবতীর্ণ হতে ওর সাহস হল না। সে বেরিয়ে এলো ভিন্ন এক নগরীতে, তার যৌবনের এক সড়ক, জুন মাসের শেষ ডালিয়ার সুরভিতে সুবাসিত এই নগরী, সকাল পাঁচটার উপাসনা শেষে ছায়ার মতো বিধবা নারীরা সারি বেঁধে চলেছে। কিন্তু এখন ওরা নয়, সে রাস্তা পার হয়ে অন্য পাশে চলে গেল, যে অশ্রু সে রোধ করতে পারছিলো না তা যেন ওরা না দেখতে পায়, এ তার মধ্যযামিনীর অশ্রু নয়, অন্য অশ্রু, যা সে তার বুকের মধ্যে চেপে রেখে আসছে একান্ন বছর নয় মাস চার দিন ধরে।
সে সময়ের সব হিসাব হারিয়ে ফেলেছিল। সে যখন একটা বড় ঝলমলে জানালার সামনে জেগে উঠলো তখন সে যে কোথায় তা বুঝতে পারলো না। সে আমেরিকা ভিসুনার গলা শুনতে পেলো, ও বাগানে কাজের মেয়েদের সঙ্গে বল খেলছে। ওই শব্দ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। সে শুয়ে আছে তার মায়ের বিছানায়। সে তার বিছানা আগের মতোই রেখেছিলো, নিজের নিঃসঙ্গতায় খুব খারাপ লাগতে শুরু করলে সে এই বিছানায় ঘুমতো, এতে তার একাকিত্ব একটু কমতো। খাটের এক মাথায় ছিলো ডন সাঙ্কোর সরাই থেকে আনা বিরাট দর্পণটি, ঘুম থেকে জেগে ওদিকে তাকানো মাত্রই সে তার গভীরে প্রতিবিম্বিত দেখতে পেতো ফারমিনা ডাজাকে। সে বুঝলো যে আজ শনিবার, কারণ তার ড্রাইভার প্রতি শনিবার আমেরিকা। ভিসুনাকে তার বোডিং স্কুল থেকে ফ্লোরেন্টিনোর বাড়িতে নিয়ে আসতো। সে উপলব্ধি করলো যে নিজের অজান্তেই সে ঘুমিয়েছে, ঘুমাতে পারছে না ওই স্বপ্ন দেখতে দেখতে, আর তার স্বপ্নকে বিঘ্নিত করেছে ফারমিনা ডাজার ক্রুদ্ধ মুখ। সে স্নান করলো, এর পর কি করবে চিন্তা করলো, খুব ধীরে ধীরে তার সব চাইতে ভালো পোশাক পরলো, কোলোন মাখলো, সাদা গোঁফের প্রান্তদেশ মোম দিয়ে ছুঁচলো করলো, শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, দোতলার হলঘর থেকে ইউনিফর্ম পরা সুন্দরী বালিকাটিকে দেখলো, অপরূপ ভঙ্গি করে বল ধরছে, ওই ভঙ্গি কতো শনিবার তার বুকের মধ্যে কাপন ধরিয়েছে, কিন্তু আজ সকালে তা তাকে একটুও চঞ্চল করলো না। সে ওকে তার সঙ্গে যেতে ইঙ্গিত করলো, তারপর গাড়িতে ওঠার আগে ওকে বললো, যদিও তার দরকার ছিল না, “আজ আমরা আমাদের নিয়মিত কাজগুলি করবো না। সে ওকে আমেরিকান আইসক্রিম বিপণীতে নিয়ে গেল। তখন ওখানে, মসৃণ ছাদ থেকে ঝোলানো পাখার লম্বা লম্বা ব্লেডের নিচে বসে, অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের সঙ্গে আইসক্রিম খাচ্ছেন। আমেরিকা ভিসুনা বড় এক গ্লাস নানা স্তর বিশিষ্ট আইসক্রিম অর্ডার দিল, একেক স্তরের একেক রঙ, তার প্রিয় ডিশ, এই সময়ের খুব জনপ্রিয় আইসক্রিম, তার মায়াবী আভার জন্য। ফ্লোরেন্টিনো আরিজা কালো কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে, কোনো কথা না বলে, ওকে লক্ষ করলো। সে একটা লম্বা হাতলের চামচ দিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে যেন তলা পর্যন্ত খেতে পারে। তাকে লক্ষ করতে করতেই, কোনো রকম সতর্কতা সঙ্কেত না দিয়ে, ফ্লোরেন্টিনো আরিজা বললো, “আমি বিয়ে করছি।
ও একটা অনিশ্চয়তার ঝিলিক দিয়ে তার চোখের দিকে তাকালো, ওর চামচ শূন্যে ধরা, তারপরই সামলে নিয়ে হাসলো, বললো, যাঃ! মিছে কথা! বুড়ো মানুষরা বিয়ে করে না।
সেদিন তারা দুজন পার্কে পুতুল নাচ দেখলো, জাহাজঘাটে ভাজা মাছের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দুপুরের খাওয়া খেলো, শহরে সদ্য আগত সার্কাসের জায়গায় গিয়ে খাঁচায় আটকানো প্রাণীগুলি দেখলো, মুক্তাঙ্গনের স্টল থেকে নানা রকম লজেন্স, টফি, চকোলেট কিনলো, ও স্কুলে ফিরবার সময় সঙ্গে নিয়ে যাবে, গাড়ির হুড নামিয়ে দিয়ে শহরে কয়েকবার চক্কর খেলো, তারপর শেষ বিকালে গির্জায় যখন সান্ধ্যকালীন উপাসনার ঘণ্টাধ্বনি হল তখন এক হারে ঝরে পড়া প্রবল বর্ষণের মধ্যে ফ্লোরেন্টিনো ওকে ওর বোর্ডিং স্কুলে নামিয়ে দিলো। আজ সারাদিন সে ওকে একটা বিষয়ে অভ্যস্ত হবার সময় ও সুযোগ দিল, ফ্লোরেন্টিনো আরিজা আর ওর প্রেমিক নয়, শুধু ওর অভিভাবক। রবিবার সে ওর জন্য তার গাড়ি পাঠিয়ে দিলো, যেন ইচ্ছা করলে ও তার বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যেতে পারে, কিন্তু সে নিজে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলো না, কারণ গত সপ্তাহে সে ওদের দুজনের বয়স সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠেছিলো। সে রাতে সে স্থির করলো, ফারমিনা ডাজাকে সে একটা চিঠি লিখবে, তার ক্ষমা প্রার্থনা করে, ওই চিঠির একমাত্র উদ্দেশ্য হবে শুধু এটুকু বোঝানো যে সে হাল ছেড়ে দেয় নি, আগামী দিনের জন্য শুধু একটু পিছিয়ে দিলো। তারপর, সোমবার, ঠিক তিন সপ্তাহের অসম্ভব যন্ত্রণা ভোগের পর, বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপ হয়ে, বাড়িতে ঢুকেই সে ওর চিঠিটা পেলো।
তখন রাত আটটা। কাজের মেয়ে দুটি শুয়ে পড়েছে। ওরা হলঘরের আলোটা জ্বালিয়ে রেখেছে যেন সে সহজে তার শোবার ঘরে হেঁটে যেতে পারে। সে জানতো যে তার বাহুল্যবর্জিত নিতান্ত সাদামাটা খাবার টেবিলে সাজানো থাকবে। অনেক দিন অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়ার পর আজ তার কিছুটা ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছিল কিন্তু এখন ওই চিঠি তাকে প্রচণ্ড আবেগতাড়িত করলো, তার ক্ষুধা সম্পূর্ণ উবে গেল। তার হাত এতো কাঁপতে থাকে যে শোবার ঘরে মাথার উপর দিকের বাতিটা সে জ্বালাতে পারছিলো না। বৃষ্টিতে ভেজা চিঠিটা সে বিছানার উপর রাখলো, রাতের টেবিলের উপরে আলোটা জ্বালালো, একটা প্রশান্তির ভান করে সে এসব করলো, নিজেকে শান্ত করার এটাই ছিল তার চিরাচরিত পন্থা। সে তার ভেজা কোট খুলে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে দিলো, তার ভেস্ট খুললো, সযত্নে সেটা ভাঁজ করে কোটের উপর রাখলো, তার কালো সরু টাই খুললো, তার সেলুলয়েডের কলার খুললো যা আজকাল খুব কমই কেউ ব্যবহার করে, কোমর পর্যন্ত সে তার শার্টের বোতামগুলি খুললো, তার কোমরের বেল্ট শিথিল করলো যেন আরেকটু আরাম করে নিঃশ্বাস নিতে পারে এবং সব শেষে সে তার মাথার টুপিটা খুলে শুকাবার জন্য জানালার পাশে রেখে দিলো। তারপরই সে কাঁপতে শুরু করলো কারণ কোথায় চিঠিটা রেখেছে তা সে মনে করতে পারলো না। তার স্নায়বিক উত্তেজনা এতো প্রবল হয়ে ওঠে যে চিঠিটা যখন পেলো তখন সে অবাক হয়ে গেলো। খামটা খুলবার আগে সে তার রুমাল দিয়ে ওটা শুকিয়ে নিলো, সযত্নে, যেন কালি লেপ্টে না যায়, ওই খামের উপর তার নাম লেখা আছে, আর তখনই তার মনে হল এই গোপন ব্যাপারটা এখন আর দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অন্তত তিনজন এর কথা জানে। যে লোকই এ চিঠি এখানে দিয়ে গিয়ে থাকে সে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছে যে বিধবা উরবিনো স্বামীর মৃত্যুর মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই তার নিজস্ব ভুবনের বাইরের একটি মানুষের কাছে চিঠি লিখেছে এবং তা এমন জরুরি ছিল যে সে ওই চিঠি সাধারণ ডাকে পাঠায় নি এবং সে এ ব্যাপারে এমন গোপনীয়তা অবলম্বন করেছে যে চিঠিটা কারো হাতে না দিয়ে দরজার তলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে, যেন এটা কোনো বেনামি পত্র। তাকে খামটা ছিঁড়তে হল না, কারণ বৃষ্টিতে ভিজে আঠা গলে গিয়েছিল, কিন্তু ভেতরের চিঠি ছিল শুষ্ক; ঘন করে লেখা তিন পৃষ্ঠা, সম্বোধনহীন, সই-এর জায়গায় তার বিবাহিত নামের আদ্যাক্ষরগুলি।
সে বিছানায় বসলো, তারপর যত দ্রুত সম্ভব একবার চিঠিটা পড়লো, বিষয়বস্তুর চাইতে চিঠির সুর তার বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করলো, আর দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় পৌঁছবার আগেই সে বুঝলো যে এটা যথার্থই তার প্রত্যাশিত অপমানজনক পত্রই। সে চিঠিটা ভাঁজ না করে, বিছানার পাশের বাতি যেখানে আলো ফেলেছিলো সেখানে রাখলো, তার জুতা ও ভেজা মোজা খুললো, দরজার কাছে গিয়ে সুইচ টিপে উপরের বাতিটা নিভিয়ে দিলো, তারপর তার শ্যাময় চামড়ার আভরণ দিয়ে তার গোঁফ জোড়ার প্রান্তদেশ ঢেকে, প্যান্ট এবং শার্ট না খুলে বিছানায় শুয়ে পড়লো, মাথা রাখলো দুটো বৃহাদাকার বালিশের উপর যার গায়ে সে পড়ার সময় তার পিঠ হেলান দিতো। তখন সে চিঠিটা আবার পড়লো, এবার প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, চিঠির মধ্যে গোপন কোনো উদ্দেশ্য থাকলে তা যেন কিছুতেই তার দৃষ্টি এড়িয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখলো, তারপর সে চিঠিটা চার বার পড়লো, অবশেষে লিখিত শব্দের ভারে সে এতোই মুহ্যমান হয়ে পড়ে যে কথাগুলি অর্থহীন হয়ে উঠতে শুরু করে। অবশেষে সে চিঠিটা, খাম ছাড়াই, তার রাতের টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে, মাথার পেছনে দু’হাত দিয়ে চিৎ হয়ে শুলো, চোখের পলক না ফেলে চার ঘণ্টা ওই ভাবে শুয়ে থাকলো, নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন ফেললো না, একজন মৃত ব্যক্তির চাইতেও বেশি মৃত, দর্পণের যে জায়গায় ও ছিলো সে জায়গাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। ঠিক রাত বারোটায় সে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে এক থর্মের্স কালো কফি বানালো, অপরিশোধিত তেলের মতো ঘন, সেটা নিয়ে তার ঘরে ফিরলো, তার রাতের টেবিলে সব সময় বোরিক অ্যাসিড মেশানো যে এক গ্লাস জল ঠিক করা থাকতো তার মধ্যে নিজের নকল দাঁত রেখে দিলো, তারপর মর্মর মূর্তির মতো আবার তার আধশোয়া অবস্থায় ফিরে গেলো, শুধু কফিপানের মুহূর্তে সে তার ওই অবস্থান পরিবর্তন করলো। সকাল ছ’টায় পরিচারিকা নতুন এক থর্মেস কফি নিয়ে আসা পর্যন্ত সে ওই ভাবেই রাত কাটিয়ে দিলো।
ততক্ষণে ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তার পরবর্তী পদক্ষেপগুলির একটা কী হবে তা ঠিক করে ফেলেছিলো। আসলে, অপমানগুলি তাকে বিশেষ কষ্ট দেয় নি। ফারমিনা ডাজার স্বভাব ও তার পরিস্থিতির গুরুত্বের বিবেচনায় ও যেসব অন্যায় অভিযোগ করেছে তার চাইতে আরো খারাপ কিছু করতে পারতো, তাই সে সব খণ্ডন করার জন্য সে বিশেষ চিন্তিত হল না। চিঠিটা, শুধু চিঠিটাই, তার সকল মনোযোগ আকর্ষণ করলো, এটা তাকে সুযোগ দিলো, এমনকি অধিকার দিলো, উত্তর প্রদানের। তার চাইতেও বেশি : এটা একটা উত্তর দাবি করলো। অতএব সে জীবনকে যেখানে চেয়েছিলো জীবন এখন সেই খানে এসে দাঁড়িয়েছে। বাকি সব কিছু নির্ভর করছে তার ওপর। সে নিশ্চিত জানতো যে তার অর্ধশতাব্দীর বেশি ব্যক্তিগত নরক তাকে আরো অনেক মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, কিন্তু সে এখন আগের চাইতে বেশি উদ্যম, বেশি দুঃখ, বেশি ভালোবাসা নিয়ে তার মুখোমুখি হবে, কারণ এ হবে তার শেষ প্রয়াস।
ফারমিনা ডাজার চিঠি পাবার পাঁচ দিন পর সে যখন তার আপিসে গেল তখন তার মনে হল সে যেন টাইপ রাইটারগুলির কোলাহলবর্জিত এক আকস্মিক ও অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্যে ভাসছে। ওই শব্দ, বৃষ্টির ধ্বনির মতো, নীরবতার চাইতেও কানে কম বাজতো। শব্দটা যখন আবার শুরু হল ফ্লোরেন্টিনো আরিজা তখন লিওনা কাসিমনির দপ্তরে গেল, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে তাকে দেখলো তার নিজস্ব টাইপ রাইটারের সামনে বসা, তার আঙ্গুলের চাপে সেটা এমনভাবে সাড়া দিচ্ছিল যেন সেটা একটা মানুষ। লিওনা টের পেলো যে কেউ তাকে দেখছে, কিন্তু অনুচ্ছেদটি শেষ না করা পর্যন্ত সে টাইপ করা বন্ধ করলো না। তার মুখে লেগে থাকে তার ওই ভয়ঙ্কর সূর্যের মতো হাসি।
ফ্লোরেন্টিনো আরিজা জিজ্ঞাসা করলো, ‘ওগো আমার আত্মার সিংহকন্যা, আমাকে একটা কথা বলো, তুমি যদি ওই যন্ত্রে লেখা একটা প্রেমপত্র পেতে তা হলে তোমার কি রকম লাগতো?’
ও এখন আর কোনো কিছুতে অবাক হতো না, কিন্তু এ প্রশ্ন শুনে ও সত্যিই অবাক হলো।
‘কী কাণ্ড!’ ও উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলো, ‘এটা আমার কখনো মনেই হয় নি।‘ ওই কারণেই সে আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ফ্লোরেন্টিনো আরিজাও এই মুহূর্তটির আগে এ বিষয়ে কখনো কিছু ভাবে নি, কিন্তু এখন কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সে ঝুঁকিটা নেবার সিদ্ধান্ত নিলো। সে আপিসের একটা টাইপ রাইটার বাড়ি নিয়ে গেল, তার অধস্তন কর্মচারীরা খোশমেজাজে ঠাট্টা করলো, বুড়ো কুকুরকে নতুন খেলা শেখানো যায় না। নতুন যে কোনো বিষয়ে পরম উৎসাহী লিওনা কাসিয়ানি বললো যে সে তার বাড়ি গিয়ে তাকে টাইপ করা শেখাতে রাজি আছে। কিন্তু বহুকাল আগে লোটারিও থুগুট যখন তাকে স্বরলিপির সাহায্যে বেহালা বাজানো শেখাতে চেয়েছিলো তখন সে তাকে সাবধান করে বলেছিল যে বাজাতে শুরু করতে তার পাঁচ বছর লাগবে, তারপর পেশাদার অর্কেস্ট্রা দলে বাজাবার উপযুক্ত হতে আরো পাঁচ বছর লাগবে, তারপর ভালো করে বাজাবার জন্য জীবনের বাকি সময় প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে অনুশীলন করতে হবে, তখন থেকেই সে নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিরোধী হয়ে উঠেছিল। তবু সে তার মাকে রাজি করায়, মা এক অন্ধ বেহালা বাদকের কাছ থেকে তার বেহালা কিনে ওকে দেয় এবং লোটারিও থুগুট তাকে যে পাঁচটি মূল নীতির কথা বলেছিল তার সাহায্যে সে এতোটাই পারদর্শিতা অর্জন করে যে এক বছর পুরো না হতেই সে সাহস করে ক্যাথিড্রালের গানের দলের সঙ্গে বেহালা বাজায়, আর নিঃসদের সমাধিক্ষেত্র থেকে বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে ফারমিনা ডাজাকে সেরেনাদ করতে সমর্থ হয়। সেই সময় থেকেই সে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধমে কিছু আয়ত্ত করার বিরোধী হয়ে ওঠে। বিশ বছর বয়সের সময় যদি সে বেহালা বাদনের মতো একটা কঠিন কাজ ওই ভাবে শিখতে পারে তাহলে ছিয়াত্তর বছর বয়সে টাইপ রাইটারের মতো এক আঙ্গুলের একটা যন্ত্র কেন সে আয়ত্ত করতে পারবে না?
<