০৫.

এরমধ্যে ফাহমিদার খালাত ভাই মালেক প্রায় সাত বছর পর আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে এল। তাদের বাড়ি টঙ্গিবাড়িতে। টঙ্গিবাড়িতে বি. টি. কলেজ থেকে মালেক আই. এ. পাস করে আমেরিকা চলে গিয়েছিল। সেখানে আরো পড়াশোনা করে চার বছর হল চাকরি করছে। ছ-মাসের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছে। তার মা-বাবার ইচ্ছা ছেলের বিয়ে দেবে। তাই কয়েক দিন পর তার মা জহুরা খানম ছেলেকে বললেন, আমরা তোর বিয়ে দিতে চাই।

মালেক বিয়ে করার উদ্দেশ্য নিয়ে দেশে এসেছে। সে কথা কাউকে দিয়ে মা বাবাকে জানাবে ভেবেছিল। তার আগেই মাকে বলতে শুনে মনে মনে খুব খুশী হল। তবু ডাইরেক্ট মত প্রকাশ না করে বলল, আমার ইচ্ছা ছিল, পরের বারে এসে বিয়ে করার।

জহুরা খানম বললেন, আবার কতদিন পরে আসবি তার ঠিক আছে। এবারে বিয়ে করবি না কেন শুনি? আমরা তোর কথা শুনব না। তোর বাবা বলছিল, কোথায় যেন একটা ভালো মেয়ে দেখে রেখেছে।

মালেক বলল, তোমরা যখন চাচ্ছ তখন আর না করব না। তবে যেখানেই মেয়ে দেখে রাখ না কেন, মেয়েকে ও তার মা-বাবাকে জানিয়ে দিও, বৌ নিয়ে আমি আমেরিকা চলে যাব।

জহুরা খানম বললেন, তাতো বটেই তুই আমেরিকায় থাকবি, আর তোর বৌ এখানে থাকবে, তা কি করে হয়? তোর বৌকে তুই নিয়ে যাবি তাতে কারো অমত থাকবে কেন?

মালেক বলল, তোমাদের মত থাকলে তো চলবে না। মেয়ের মা-বাবা যদি তাদের মেয়েকে অতদূর পাঠাতে না চায়? সে মেয়েও যদি যেতে রাজি না হয়, তখন কি হবে? তার চেয়ে আগে ভাগে জানিয়ে দেয়া ভালো।

জহুরা খানম বললেন, সে ব্যাপারে তোকে ভাবতে হবে না। আমরা মেয়ের মা বাবাকে আগেই সে কথা বলে রেখেছি।

মালেক বলল, তা হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।

জহুরা খানম একটু চিন্তা করে তার বড় বোনের মেয়ে ফাহমিদাকে বৌ করবে বলে যে ঠিক করে রেখেছেন, তা ছেলেকে জানালেন না। কারণ সে যদি অমত করে বসে। তারচেয়ে নিজে আগে দেখে আসুক। ফাহমিদাকে দেখলে মালেক নিশ্চয় পছন্দ করবে। তারপর যা বলার বলা যাবে। বললেন, হ্যাঁরে, কয়েকদিন আলদিবাজারে তোর বড় খালার বাড়ি থেকে তুই বেড়িয়ে আয় না। কিছু দিন আগে আমি ও তোর বাবা গিয়েছিলাম। আমাদের মুখে তুই দেশে আসবি শুনে তোর খালা-খালু বলল, মালেক এলে তাকে আমাদের এখানে বেড়াতে আসতে বলল। কতদিন ছেলেটাকে দেখিনি।

মালেক বলল, যাব না মানে, নিশ্চয় যাব। তুমি না বললেও যেতাম। কতদিন পর দেশে এলাম। সব আত্মীয়দের বাড়ি গিয়ে সবাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসব।

জহুরা খানম বললেন, বেশ তো যাবি।

পরের দিন মালেক গাড়ি নিয়ে আলদিবাজারে ফাহমিদাদের বাড়িতে এল। খালা খালুকে কদমবুসি করে জিজ্ঞেস করল, আপনারা ভালো আছেন?

ওনারা দোয়া করার পর শাকেরা খানম বললেন, আমরা ভালো আছি বাবা। এতদিন পর দেশের কথা মনে পড়ল বুঝি?

সেখানে ফাহমিদা ছিল। সেও কয়েকদিন আগে মায়ের মুখে শুনেছে; মালেক সাত বছর পর দেশে ফিরবে। যখন খালা-খালুর মুখে তাকে বৌ করার কথা বলতে শুনেছিল তখন শামীর কথা ভেবে মালেকের উপর বেশ রাগ হয়েছিল। ভেবেছিল, যে ছেলে এত বছর মা-বাবাকে ছেড়ে বিদেশে থাকে, সে ভালো হতে পারে না। এখন মালেকের সুন্দর ও সুঠাম চেহারা দেখে রাগের পরিবর্তে মনে মনে বেশ পুলকিত হল। ভাবল, যে মেয়ে একে স্বামী হিসেবে পাবে, সে ধন্য হয়ে যাবে। ফাহমিদা এতক্ষণ মালেকের দিকে তাকিয়ে এইসব ভাবছিল।

মালেক তার দিকে তাকাতে চোখে চোখ পড়ে গেল। মালেক তাকে দেখে মনে মনে চমক খেল। ভাবল এত সুন্দরী মেয়ে তা হলে বাংলাদেশে আছে? সাত বছর আগের কিশোরী ফাহমিদা এখন পূর্ণ যুবতী। তার দিক থেকে মালেক চোখ ফেরাতে পারল না।

ফাহমিদা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিল।

শাকেরা খানম ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মালেককে বললেন, তুমি ওকে চিনতে পারছ না? ওতো ফাহমিদা। তারপর ফাহমিদাকে বললেন, কিরে তুই চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন? তুইও চিনতে পারিসনি বুঝি? মালেক তোর ছোট খালার ছেলে। কদমবুসি কর।

ফাহমিদা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে কদমবুসি করল।

মালেক থাক থাক বলে বলল, তোমাকে অনেক ছোট দেখেছিলাম। তাই প্রথমে চিনতে পারিনি, এখন পারছি। তা পড়াশোনা করছ তো?

ফাহমিদা কিছু বলার আগে শাকেরা খানম বললেন, দুবছর আগে আই. এ. পাস করার পর আমরা আর পড়াইনি। আজকাল সমাজের আজে-বাজে ছেলেদের কথা চিন্তা করে পড়া বন্ধ করে দিয়েছি। তারপর মেয়েকে বললেন, যা তোর মালেক ভাইকে চা নাস্তা এনে খাওয়া।

ফাহমিদা চলে যাওয়ার পর শাকেরা খানম স্বামীকে বললেন, তুমি না কোথায় যাবে বলেছিলে? ফেরার সময় কিছু মাংস নিয়ে এস। মাছ আছে। মালেক কি শুধু মাছ দিয়ে ভাত খেতে পারবে?

আবসার উদ্দিন স্ত্রীর ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন। বললেন, হ্যাঁ তাই তো। আমি সে কথা ভুলেই গেছি। কথা শেষ করে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন।

শাকেরা বেগম মালেককে বললেন, তুমি বস, ফাহমিদা নাস্তা নিয়ে আসছে। আমি যাই, তোমার খালুকে আরো কয়েকটি জিনিস আনার কথা বলে পরে আসব।

খালা-খালু চলে যাওয়ার পর মালেক ফাহমিদার কথা ভেবে চিন্তা করতে লাগল, বাবা কেমন মেয়ে পছন্দ করেছে কি জানি। আমার তো মনে হচ্ছে ফাহমিদার চেয়ে সুন্দরী এদেশে নেই। ফাহমিদার কথা মাকে বলতে হবে।

একটু পরে ফাহমিদা চা নাস্তা নিয়ে এসে পরিবেশন করে বলল, নিন শুরু করুন।

মালেক ফাহমিদার রূপ দেখে আগেই মুগ্ধ হয়েছে। এখন তার গলার সুমিষ্ট স্বর শুনে আরো বেশি মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ফাহমিদা লজ্জা পেয়ে বলল, এভাবে কি দেখছেন? নাস্তা খেয়ে নিন।

মালেক বলল, সত্যি বলতে কি, আমেরিকায় অনেক সুন্দরী মেম দেখেছি। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, তাদের থেকে তুমি অনেক বেশি সুন্দরী।

ফাহমিদা ছোটবেলা থেকে সবাইয়ের কাছে রূপের প্রশংসা শুনে এসেছে। কিন্তু এভাবে কেউ বলে নি। আরো বেশি লজ্জা পেয়ে কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, তাই নাকি? আপনিও কিন্তু খুব সুন্দর।

মালেক হো হো করে হেসে উঠে বলল, এর আগে কোনো মেয়ের মুখ থেকে এ কথা শুনিনি। যাকগে, আমি একা খাব নাকি? তোমারটা কই?

ফাহমিদা বলল, আমি একটু আগে খেয়েছি, এখন আর খেতে পারব না।

মালেক বলল, ওসব শুনব না একটু হলেও খেতে হবে। তারপর তার একটা হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে বলল, এখান থেকেই খাও।

ফাহমিদা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অল্প একটু মুখে দিয়ে বলল, এবার আপনি খেয়ে নিন। তারপর হাত ধুয়ে সরে বসল।

মালেক আর কিছু না বলে খেতে লাগল। চা খাবার সময় বলল, তুমি পড়াশোনা ছেড়ে দিলে কেন? ডিগ্রী পর্যন্ত পড়া উচিত ছিল।

আমি তো পড়ার জন্য খুব জিদাজিদী করেছিলাম। মা-বাবা কিছুতেই রাজি হল না।

খালা বলল, গ্রামের আজে-বাজে ছেলেদের ভয়ে তোমার পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে। তুমি আমাদের বাড়িতে থেকে বি. টি. কলেজে পড়তে পারতে?

সে কথাও আমি বলেছিলাম; কিন্তু রাজি হয়নি।

ততক্ষণে মালেকের চা খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। ফাহমিদা নাস্তার প্লেট ও চায়ের কাপ নিয়ে যাওয়ার সময় বলল, এগুলো রেখে আসছি।

দুপুরে খাওয়ার পর মালেক বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফাহমিদার কথা চিন্তা করছিল।

এমন সময় ফাহমিদা রুমে ঢুকে বলল, আম্মা জিজ্ঞেস করতে পাঠাল, এখন আপনার আর কিছু দরকার আছে কিনা।

মালেক উঠে বসে বলল, না আর কোনো কিছু দরকার নেই। তুমি বস, তোমার সঙ্গে গল্প করি। দিনে ঘুমান আমার অভ্যাস নেই।

ফাহমিদা বলল, বসলেন কেন? শুয়ে শুয়ে গল্প করুন। আমি এখানে বসছি বলে একটা চেয়ারে বসল।

মালেক শুয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। খালা একটু বেশি খাইয়ে দিয়েছে। চল, আজ বিকেলে মুন্সীগঞ্জে গিয়ে সিনেমা দেখে আসি।

কবে সিনেমা দেখেছে ফাহমিদার মনে নেই। মালেকের কথা শুনে উফুল্ল হয়ে বলল, আব্বা-আম্মা কি যেতে দেবে?

তুমি রাজি আছ কিনা বল। আমি খালা-খালুকে ম্যানেজ করব।

তা হলে আমি রাজি।

তুমি খালাকে ডেকে নিয়ে এস।

ফাহমিদা মাকে ডাকতে যেতে মালেক খাট থেকে নেমে বাথরুম থেকে এসে জামা প্যান্ট পরতে লাগল।

একটু পরে মেয়ের সঙ্গে শাকেরা খানম এসে তাকে জামা প্যান্ট পরতে দেখে বললেন, তুমি কি এক্ষুনি চলে যাবে না কি? তা হচ্ছে না বাবা। খালার বাড়ি এসেছ, কয়েকদিন বেড়াও। তারপর না হয় যাবে। কতদিন তোমাকে দেখিনি। তোমার খালু শুনলে রাগ করবে।

মালেক বলল, আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি আপনাকে কে বলল? মুন্সীগঞ্জে যাব। আমি তো কয়েকদিন থাকব বলে মাকে বলে এসেছি।

শাকেরা খানম বললেন, তাই বল। আমি শুধু শুধু কি সব বললাম।

মালেক বলল, খালা, আমি বলছিলাম কি, ফাহমিদাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। ওতো মনে হয় কোথাও বড় একটা যায় নি। আমার সাথে গাড়িতে করে ঘুরে আসুক।

শাকেরা খানম শুনে খুব খুশী হলেন। উনি তাই চান। যার সঙ্গে বিয়ে হবে তার সঙ্গে বেড়াতে যেতে কোনো বাধা বলে মনে করলেন না। তার উপর আপন খালাত ভাইবোন। বললেন, বেশ তো বাবা ওকে নিয়ে যাও। তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, যা, তুই কাপড়-চোপড় পরে তৈরী হয়ে আয়। আমি চা করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। খেয়ে দুজন বেড়িয়ে আয়।

ফাহমিদা বলল, আব্বাকে বলতে হবে না?

শাকেরা খানম বললেন, সে এখন ঘুমাচ্ছে। তাকে আমি বলবখন। তোকে যা বললাম তাই কর। কথা শেষ করে তিনি চলে গেলেন।

মালেক ফাহমিদাকে বলল, দেখলে, কিভাবে ম্যানেজ করলাম? এবার যাও তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এস।

রূপসী ফাহমিদা রূপবান মালেককে দেখে শামীর কথা ভুলে গেল। নিজের রুমে গিয়ে মনের মতো সাজল। কমলা রং-এর সালওয়ার কামিজ পরে এবং ঐ রং-এর ওড়নাটা ভাঁজ করে বুকের উপর ঝুলিয়ে মালেকের কাছে এসে বলল, কই, চলুন।

মালেক তাকে দেখে উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলল, হাউ নাইস? সত্যি তোমার রুচিবোধ আছে। গায়ের রং এর সঙ্গে ম্যাচ করে জামা কাপড় পরেছ। তাতে তোমাকে আরো অনেক বেশি সুন্দরী দেখাচ্ছে। আমার চোখ ঝলসে যাচ্ছে। যদি বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীতা কর, তা হলে সিওর, তুমি শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর স্বর্ণপদক পাবে।

মালেকের মুখে তার রূপের প্রশংসা শুনে ফাহমিদার দেহে ও মনে অন্য এক রকমের আনন্দ ও গর্বের অনুভূতির স্রোত বইতে লাগল। লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, আপনি শুধু শুধু বাড়িয়ে বলে লজ্জা দিচ্ছেন।

মালেক এগিয়ে এসে তার চিবুক ধরে মুখটা তুলে বলল, আমি এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না।

ফাহমিদা তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, হয়েছে হয়েছে, অত আর রূপের প্রশংসা করতে হবে না। যাবেন তো চলুন।

মালেক বলল, হ্যাঁ চল।

সেদিন তারা মুন্সীগঞ্জে দর্পনা হলে শক্তি বই দেখল। তারপর একটা হোটেলে ঢুকে চা নাস্তা খেয়ে মার্কেট করতে গেল। মালেক খালার জন্য ব্লাউজের পীসসহ শাড়ি, খালুর জন্য পাজামা পাঞ্জাবীর কাপড় ও ফাহমিদার চয়েস মতো থ্রী পীসের সালওয়ার কামিজ এবং অনেক রকমের প্রসাধনী সামগ্রী কিনল। ফেরার পথে ফাহমিদাকে জিজ্ঞেস করল, জিনিসগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে?

ফাহমিদা মালেককে যত জানছে তত তার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শামীর কথা যে মনে পড়ছে না, তা নয়। তবে তার কথা মনে স্থায়ী হচ্ছে না। কেবলই তার মনে হচ্ছে, কোথায় দরিদ্র শামী আর কোথায় বিত্তবান মালেক? মালেককে দেখে এবং তার কথাবার্তায় আগেই মুগ্ধ হয়েছে। এখন তার খরচের বহর দেখে আরো বেশি মুগ্ধ হল।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে মালেক বলল, কিছু বললে না যে?

ফাহমিদা এতক্ষণ ঐসব ভাবছিল। বলল, সবকিছু তো দামী জিনিস। পছন্দ হবে না কেন? তারপর কপটতার ভান করে বলল, শুধু শুধু এত খরচ করতে গেলেন কেন?

মালেক হেসে উঠে বলল, এ আর কটাকা খরচ করলাম। যদি তোমার সঙ্গে আমার বলে থেমে গিয়ে তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল।

ফাহমিদা লজ্জারাঙা হয়ে বলল, থেমে গেলেন কেন? কথাটা শেষ করুন।

মালেক আর একবার তার লজ্জারাঙা মুখ দেখে এবং তার কথা শুনে ফাহমিদার মনের খবর একটু আন্দাজ করতে পারল। তবু বলল, বললে তুমি মাইণ্ড করতে পার।

ফাহমিদা বলল, মাইণ্ড করব কেন? আপনি বলুন।

তার কথা শুনে মালেকের সাহস বেড়ে গেল। বলল, তোমাকে যদি বিয়ে করতে পারতাম, তা হলে দেখতে, তোমার জন্য কত হাজার হাজার টাকা খরচ করতাম।

মালেকের কথা শুনে ফাহমিদা বুঝতে পারল, সে এখনও তা হলে জানে না, তার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা ঠিক হয়ে আছে। হঠাৎ তার শামীর কথা মনে পড়ল। শামী এখনও ছাত্র। পড়াশোনা শেষ করে কবে সে উপযুক্ত হবে তার কোনো ঠিক নেই। তা ছাড়া তার বাবার কি এমন আছে, যা সে আমার পিছনে খরচ করবে? তার উপর তারা যা গোড়া ধার্মিক? ঘর থেকে মেয়েদের বোরখা ছাড়া বেরোতে দেয় না। শামীর কাছ থেকে শুধু ভালবাসা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। শুধু ভালবাসা নিয়ে কেউ কি সুখী হতে পারে?

ফাহমিদা কিছু বলছে না দেখে মালেক বলল, দেখলে তো, আমার কথা শুনে মাইণ্ড করলে?

মাইণ্ড করেছি বুঝলেন কি করে?

তা না হলে কিছু বলছ না কেন?

আমার মুখ দেখে কি তাই মনে হচ্ছে?

 তা অবশ্য হয় নি। তবু তোমার মুখ থেকে কিছু শোনার আশা করছিলাম।

না মাইণ্ড করি নি। পুরুষরা যত তাড়াতাড়ি বিয়ের কথা বলতে পারে, মেয়েরা তা পারে না। আচ্ছা, আপনি এসেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিয়ের কথা বলে ফেললেন; কিন্তু ভেবেছেন কি, আমি বড় হয়েছি, লেখাপড়া করেছি। আমারও তো পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে?

অফকোর্স। জান, আমেরিকার লোকেরা বেশ আনন্দে আছে। ছেলে মেয়ে যাকে পছন্দ করছে তাকে বিয়ে করছে। কিছুদিন সংসার করার পর কোনো কারণে মনোমালিণ্য হলে ইচ্ছা মত ডিভোর্স নিয়ে আবার পছন্দ মতো বিয়ে করছে। দারুণ ইন্টারেস্টেড ব্যাপার তাই না?

শামী একদিন ফাহমিদার সঙ্গে উন্নতশীল দেশের আলোচনা করার সময় সে সব দেশের নারী স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুফল ও কুফল বলেছিল। তখন ফাহমিদা বুঝতে পেরেছিল, নারী স্বাধীনতা মানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা নয়। আমরা বুঝতে পেরেছিল, এই অবাধ মেলামেশার ফলে ঐসব দেশের মানুষ দাম্পত্য জীবনে ভীষণ অসুখী এবং সে সব দেশে বছরে কয়েক লক্ষ অবৈধ সন্তান জন্মাচ্ছে। এখন মালেকের কথা শুনে শামীর কথা মনে পড়ল। বলল, যতই ইন্টারেস্টেড হোক, আমার মনে হয়, এটা ঠিক নয়। কারণ এর ফলে দাম্পত্য জীবন যেমন দীর্ঘস্থায়ী হয় না তেমনি সুখেরও হয় না।

মালেক বলল, তোমার কথা অবশ্য ঠিক। তবে সে সব দেশের লোকেরা ঐসব নিয়ে চিন্তা করে না। তারা ধর্ম-টর্মও তেমন মানে না। সেক্সকে তারা দৈহিক ক্ষুধা মনে করে। সেটা যেভাবেই হোক তারা মিটিয়ে নেয়। তাতে তারা পাপ বোধ করে না। যাকগে, বাদ দাও ওসব কথা। ওদের দেশে যেটা প্রচলন, আমাদের দেশে সেটা অপরাধ।

তাতো বটেই। আপনি কোনটাকে ভালো মনে করেন?

আমার ভালো-মন্দের কি দাম আছে বল। অপরাধরোধ নিজের কাছে। এক জনের কাছে যা ভালো, অন্যজনের কাছে তা মন্দ। তবে ধর্ম যারা মেনে চলে তাদের কথা আলাদা।

আপনি কি ধর্ম বিশ্বাস করেন না?

বিশ্বাস যে একবারে করি না তা নয়। তবে ধর্ম সম্বন্ধে যেমন কিছু জানি না তেমনি মেনেও চলি না। তুমি কি ধর্মের সবকিছু মেনে চল?

আমি আপনার মতো ধর্ম সম্বন্ধে বেশি কিছু না জানলেও কিছু কিছু জানি। সেসব মেনে না চললেও বিশ্বাস করি। আমার মনে হয়, প্রকৃত মানুষের মতো মানুষ হতে। হলে, ধর্মের প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে চরিত্র গঠনের জন্য ধর্মই প্রধান হাতিয়ার।

তুমি তো দেখছি মনিষীদের মতো কথা বলছ। আমার মতে ধর্ম বুড়ো বয়সের ব্যাপার। মানুষ যখন কর্ম ক্ষমতা হারায় তখন বসে শুয়ে ধর্ম কর্ম করবে। যুবক বয়সে ওসব মানায় না। সেই সময় উপার্জন করবে এবং জীবনকে পূর্ণরূপে ভোগ করবে। ভোগ করার জন্যই তো জীবন। যে জীবনে কোনো কিছু ভোগ করতে পারল না, তার জীবনটাই বৃথা।

মালেকের কথা শুনে ফাহমিদার শামীর কথা মনে পড়ল। সে একদিন তাদের তিনজনকে ধর্মকর্ম সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছিল। বলল, আমি আপনার কথা ঠিক মেনে নিতে পারছি না। একজনের কাছে ধর্ম সম্বন্ধে কিছু কথা শুনেছিলাম। সে বলেছিল, যা সত্য ও ন্যায় সেটাই ধর্ম। ধর্মের মধ্যে কোনো মিথ্যা বা অন্যায়ের প্রশ্রয় নেই। ধর্মের জ্ঞান না থাকলে যেমন ন্যায় অন্যায় বিচার করার ক্ষমতা কারো থাকে না, তেমনি অপরাধ বোধের জ্ঞানও জন্মায় না। আর ভোগের মধ্যে নাকি সুখ শান্তি নেই, ত্যাগের মধ্যে আছে। শুধু ভালোভাবে জীবন যাপন করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু ভোগ কর। বাকিটা অন্যকে ভোগ করার জন্য সুযোগ দাও। অতিরিক্ত ভোগ বিলাসে মানুষ নাকি অমানুষ হয়ে যায়। বিবেক-বুদ্ধি, দয়া-মায়া হারিয়ে ফেলে। ভোগ বিলাসের নেশা না কি এমন, যত পাবে তত পাওয়ার নেশা বেড়ে যাবে। আর বুড়ো বয়সে ধর্ম-কর্ম করার কথা যা বললেন, তাও ঠিক নয়। যুবক বয়সটাই সব কিছু করার সময়। সেই বয়সে অন্যায়ের পথে থেকে বুড়ো বয়সে সৎপথে থেকে লাভ কি? তখন তার কর্ম ক্ষমতাই বা কতটুকু থাকবে। তাই সবকিছুর সঙ্গে যুবক বয়সেই ধর্মকর্ম মেনে চলা উচিত।

মালেক বলল, তুমি যার কাছে এইসব কথা শুনেছ, সে নিশ্চয় ধার্মিক। আর ধার্মিকরা নিজেদের ভোগ-বিলাস ও ভালো-মন্দের চেয়ে অন্যের চিন্তা বেশি করে। এসব কথা এখন থাক। পরে এক সময় আলোচনা করা যাবে। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব, উত্তর দেবে তো?

কেন দেব না? উত্তর জানা থাকলে নিশ্চয় দেব।

 আমাকে তোমার কেমন মনে হয়?

কেমন আবার? ভালো।

শুধু ভালো বললে হবে না। আমাকে তোমার পছন্দ কি না বলতে হবে।

যদি বলি অপছন্দ, তা হলে নিশ্চয় দুঃখ পাবেন তাই না? কথাটা ফাহমিদা এমনভাবে বলল, তাতে করে দুজনেই হেসে উঠল।

মালেক বলল, ইয়ার্কি রেখে আসল কথাটা বল।

ফাহমিদা বলল, আমি বুঝি আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি করার জন্য এসেছি?

মালেক বলল, তুমি তো আসনি, আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি। এবার না বললে মনে কষ্ট পাব।

ফাহমিদা কি বলবে ভাবতে লাগল; মালেককে তার খুব ভালো লাগলেও বারবার। শামীর কথা মনে পড়ছে। সেই সাথে এই কথাও মনে পড়ছে, শামীর সঙ্গে মা-বাবা কিছুতেই বিয়ে দেবে না। তা ছাড়া মালেকের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে। এই কথা জানার পর শামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য তার অনুশোচনা হতে লাগল। তাকে ভালবাসলেও বিয়ে করা সম্ভব নয়। কবে সে মানুষের মতো মানুষ হবে, ততদিন মা বাবা কি তার বিয়ে না দিয়ে ছাড়বে?

ফাহমিদা কিছু বলছে না দেখে মালেক বলল, কি ভাবছ? আমাকে কি পছন্দ…

ফাহমিদা তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বলল, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়। এ ব্যাপারে মা-বাবার মতামতই আমার মত।

তবু তোমার নিজস্ব মতটা বললে খুশী হতাম।

আমার কথাতেই আপনার বুঝে নেয়া উচিত ছিল। তুব বলছি, আপনার মতো ছেলেকে সব মেয়েরা পছন্দ করবে।

তুমি খুব বুদ্ধিমতী।

 আপনি আরো বেশি।

 তাই যদি হয়, বুদ্ধি খাটিয়ে তোমাকে বিয়ে করবই।

 সেটা আপনার ইচ্ছা।

 আর তোমার কি ইচ্ছা?

আমার ইচ্ছার কথা বলব না। কারণ আমাকে তো আর বুদ্ধি খরচ করে বিয়ে করতে হচ্ছে না।

মালেক হাসতে হাসতে বলল, না, সত্যি তুমি খুব বুদ্ধিমতী। ভাবছি, বুদ্ধিতে তোমার সাথে কোনো দিন পারব কিনা।

ফাহমিদা আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। তখন তার মনে আবার শামীর কথা ভেসে উঠল। ভাবল, শামী যতই দুঃখ পাক তার সঙ্গে বোঝাঁপড়া করে নিতে হবে। কিভাবে করবে চিন্তা করতে লাগল।

মুন্সীগঞ্জ থেকে আলদিবাজার মাত্র তিন-চার মাইলের পথ। তারা ততক্ষণে বাড়ি পৌঁছে গেল।

শাকেরা খানম মালেকের মার্কেটিং দেখে খুশী হলেন। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ না করে বললেন, শুধু শুধু এতটাকা খরচ করতে গেলে কেন বাবা?

মালেক হাসিমুখে বলল, খালাআম্মা কি যে বলেন, আপনাদের ছেলে বিদেশ থেকে যদি নিয়ে আসত, তা হলে আপনারা কি খুশী হতেন না? মনে হচ্ছে, আমাকে ছেলের মতন মনে করেন না।

শাকেরা খানম তাড়াতাড়ি করে বললেন, না বাবা না, তা নয়। তুমি তো আমাদের নিজেদের ছেলেই। এমনি কথাটা বলছি। তুমি আবার মনে কিছু করো না।

মালেক বলল, মনে কিছু করব কেন? তাই জানি বলে তো এগুলো নিয়ে এলাম। দেখে বলুন, পছন্দ হয়েছে কিনা।

শাকেরা খানম সবকিছু দেখে বললেন, এত দামী জিনিস এনেছো পছন্দ তো হবেই। তা ছাড়া ছেলে দামীই দিক আর অদামীই দিক, মা বাবার কাছে সব কিছুই ভালো। দোয়া করি, আল্লাহ তোমার রুজী রোজগারে কত দিক। তোমার হায়াত দারাজ করুক।

আরো দু দিন থেকে মালেক বাড়ি ফিরে এল।

.

০৬.

এদিকে শামী ফাহমিদার সঙ্গে দেখা করার কোনো উপায় বের করতে না পেরে একদিন জোবেদাদের বাড়িতে এল। তাদের সদরের সামনে জোবেদার ছোট ভাই লিটন কয়েকটা ছেলের সঙ্গে খেলা করছিল। সে শামীকে চেনে। তাকে দেখে খেলা বন্ধ করে তার দিকে এগিয়ে এল।

শামী তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কি? 

লিটন।

 লিটন আবার একটা নাম হল নাকি? ভালো নাম বল।

মোসারফ হোসেন।

বাহ! এইতো বেশ সুন্দর নাম। তুমি জোবেদাকে চেন?

জি চিনি। সে আমার বড় আপা।

ও আচ্ছা, তুমি আমাকে কি চেন?

শামী যেদিন প্রথমবার তাদের বাড়িতে এসেছিল সেদিন চলে যাওয়ার পর লিটন জোবেদাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বড় আপা, উনি কে? জোবেদা বলেছিল, উনি শামী ভাই, উত্তর পাড়ায় বাড়ি। তারপর তাকে আরো দুতিনবার আসতে দেখেছে।

এখন শামীর কথা শুনে বলল, আপনাকে চিনব না কেন? আপনি তো শামী ভাই। আগেও কয়েকবার আপার কাছে এসেছেন।

শামী এত ছোট ছেলের কথা শুনে অবাক হল। মৃদু হেসে বলল, তোমার আপাকে। একটু ডেকে দাও তো।

লিটন ছুটে বাড়ির ভিতরে জোবেদার কাছে গিয়ে বলল, বড় আপা, শামী ভাই এসেছে, তোমাকে ডাকছে।

জোবেদা ছোট ভাইয়ের একটা হাত ধরে বলল, বড়দের সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে হলে আপনি করে বলতে হয় বুঝলি? বলবে শামী ভাই এসেছেন, তোমাকে ডাকছেন।

লিটন মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে সাথীদের কাছে চলে গেল।

জোবেদা হাতের কাজ ফেলে সদরে এসে দেখল, শামী দাঁড়িয়ে আছে। সালাম দিয়ে বলল, শামী ভাই যে, কেমন আছেন? আসুন, ভিতরে এসে বসুন।

শামী সালামের উত্তর দিয়ে ভিতরে এসে বসে বলল, আমি এক রকম আছি। তুমি কেমন আছ বল।

জোবেদা বলল, মেয়েদের ভালো থাকা আর না থাকা একই কথা। পড়াশোনা বন্ধ করে মা বাবার সংসারে খেটে মরছি। কিছুদিন পর স্বামীর সংসারে গিয়ে আবার সারাজীবন খেটে মরতে হবে। এই তো মেয়েদের জীবন, তাই না শামী ভাই?

শামী তার কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে বলল, কি ব্যাপার? তোমার আবার কি হল? এ রকম করে কোনো দিন বলনি তো?

জোবেদা হেসে উঠে বলল, না শামী ভাই, আমার কিছু হয় নি। কথাটা হঠাৎ মনে এল, তাই বলে ফেললাম।

শামী বলল, তাই বল। আমি মনে করেছিলাম, কোনো কিছু আবার হল কিনা। যাক, এখন আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।

শামী ভাই কি কাজ করতে বলবে তা জোবেদা অনুমান করতে পারল। তবু বলল, বলুন কি কাজ, সাধ্যমত চেষ্টা করব।

শামী বলল, ফাহমিদাকে একটু ডেকে নিয়ে আসতে হবে।

জোবেদা হেসে উঠে বলল, ঠিক আছে, চা করে নিয়ে আসি, চা খান। ততক্ষণে আমি ফাহমিদাকে এনে হাজির করব। তারপর সে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

একটু পরে জোবেদা এক কাপ চা ও একবাটি সর্ষের তেল মাখান মুড়ি এবং এক গ্লাস পানি এনে টেবিলের উপর রেখে বলল, আপনি খান, আমি যাব আর আসব। কথা শেষ করে বেরিয়ে গেল।

শামী চা মুড়ি খেতে খেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল।

জোবেদা ফাহমিদাদের বাড়িতে গিয়ে তাকে বলল, তোকে এক্ষুনি আমার সঙ্গে যেতে হবে।

কোথায়?

কোথায় আবার, আমাদের বাড়িতে।

কেন?

 শামী ভাই তোর সাথে দেখা করতে এসেছেন।

শামীর কথা শুনে ফাহমিদা একবার চমকে উঠে চুপ করে রইল।

কিরে, শামী ভাইয়ের বথা শুনে চমকে উঠলি কেন? আর চুপ করেই বা রয়েছিস কেন? প্রেমিকের খবর প্রেমিকার কাছে নিয়ে এলাম পুরস্কার দিবি না?

পুরস্কার পরে দেব। শামী এসে ভালই হয়েছে। তার সঙ্গে আজ ফাইন্যাল বোঝাঁপড়া করে নিতে হবে।

তুই এভাবে কথা বলছিস কেন? শামী ভাইকে দেখে মনে হল, তোকে দেখার জন্য পাগল হয়ে রয়েছে। তোদের মধ্যে কি কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে?

তোর কথাটা কিছুটা সত্য। আব্বা-আম্মা আমার খালাত ভাই মালেকের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য সব ঠিকঠাক করে ফেলেছে। মালেক শামীর চেয়ে সব দিক থেকে শ্রেয়। তাদের বাড়ি গাড়ি আছে। মালেক আমেরিকায় চাকরি করে। বিয়ে করে আমাকে সেখানে নিয়ে চলে যাবে। সূর্যের সামনে চাঁদ যেমন, মালেকের পাশে শামী তেমন। জেনে শুনে শামীর জন্য মালেককে হারাতে পারব না। তা ছাড়া আব্বার মতের বাইরে কিছু করার। ক্ষমতা আমার নেই। তাই সে কথা শামীকে জানিয়ে আজ আমি মুক্ত হয়ে যাব।

ফাহমিদার কথা শুনে জোবেদা যেন আকাশ থেকে পড়ল! সামলে নিয়ে বলল, তা হলে এতদিন তুই শামী ভাইকে ভালবাসলি কেন? তিনি যে তোকে ভীষণ ভালবাসেন, তোকে না পেলে বাঁচবেন না, আর বাঁচলেও পাগল হয়ে যাবেন, সে কথা তুইতো কতবার আমাকে বলেছিস। আর তুইও তো তাকে ভীষণ ভালবাসিস। আমিও তোদের দুজনের গভীর ভালবাসার কথা জানি। এতবড় বিশ্বাসঘাতকা করতে পারবি? তোর কাছে গাড়ি বাড়ি আমেরিকা বড় হল? এত বছরের ভালবাসার কোনো মূল্য নেই। তোর মতো সার্থপর মেয়ে জীবনে আর কাউকে দেখি নি।

ফাহমিদা বলল, তোর মনে যা চায় তা বলতে পারিস। কিন্তু আমি কিছুতেই শামীকে গ্রহণ করতে পারব না। আজ থেকে তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। সে কথা তাকে জানিয়ে দেব। শামীব কি আছে? কি দিয়ে সে আমাকে সুখী করবে?

জোবেদা বলল, তুই যে এত নির্দয় তা জানতাম না। যাই হোক চল, তোর কথা তুই তার সামনে বলবি।

তারপর তারা শামীর কাছে এল।

ফাহমিদাকে দেখে শামী সালাম দিল।

ফাহমিদা সালামের উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল।

তাই দেখে জোবেদা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, শামী ভাই আপনারা কথা বলুন। আমি কিছুক্ষণ পরে আসছি। এই কথা বলে সে রুমের বাইরে এসে দরজার আড়ালে দাঁড়াল।

জোবেদা চলে যাওয়ার পর শামী বলল, এতদিন তোমার কোনো খবর না পেয়ে কি ভাবে দিন কেটেছে, তা আল্লাহ জানেন। তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছি। তোমাকে সালাম দিলাম, তার উত্তরও দিলে না। এখন আবার চুপ করে রয়েছ। হেতুটা কি বলবে? তবু যখন ফাহমিদা কোনো কথা বলল না তখন আবার বলল, তোমার কাছে আমি কোনো অপরাধ করেছি বলে মনে হয়নি। যদি অজান্তে করেও থাকি, তা হলে ক্ষমা চাইছি। তবু চুপ করে থেক না। মুখ তুলে আমার দিকে চাও, প্লীজ। কি কারণে তুমি আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছ বল ফাহমিদা বল।

আজ ফাহমিদার কাছে শামীর কথাগুলো অসহ্য মনে হতে লাগল। মুখ তুলে শামীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তোমার বকবকানি থামাও। এইসব শোনার জন্য আমি আসিনি। যে জন্য এসেছি তা বলছি শোন, তোমাকে আমি আগে ভালবাসতাম। তাই তখন তোমার সঙ্গে কিছুদিন প্রেম প্রেম খেলেছি। এখন আর তোমাকে ভালবাসি না। তাই তোমার সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ করিনি। আজও আসতাম না। এই কথা বলার জন্য এসেছি। এখন থেকে তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। আর জেনে নাও, কিছু দিনের মধ্যে আমার খালাত ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে হবে। সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করা আকাশ কুসুম ভাবার নামান্তর। আমার কথা শুনে তুমি হয়তো দুঃখ পাচ্ছ; তা অবশ্য পাবারই কথা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছ কি, তুমি আমার উপযুক্ত কি না? তুমি একদিন বলেছিলে, উপযুক্ত হয়ে আমাকে বিয়ে করবে। কবে উপযুক্ত হবে? ততদিনে যে আমি বুড়ী হয়ে যাব, সেকথাও কি কখনও ভেবেছ? তুমি না ভাবলেও আমি ভেবেছি। তাই অনেক চিন্তা ভাবনা করে আব্বা-আম্মার নির্বাচিত পাত্রকে বিয়ে করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর সে কথা তোমাকে জানান উচিত মনে করে জানালাম।

ফাহমিদার কথা শুনে শামীর মনে হল, তার মাথায় বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হল। সে মুক ও বধির হয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। ফাহমিদা এরকম কথা বলবে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মনে হল, সে স্বপ্ন দেখছে না তো? এক হাত দিয়ে অন্য হাতে চিমটি কেটে বুঝতে পারল, স্বপ্ন নয় বাস্তব। কিছুক্ষণ চুপ চাপ বসে থেকে নিজেকে সামলে নিল। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বলল, এতদিন সেকথা জানালে না কেন? আমি তো অনেক আগে তোমার মতামত জানার জন্য সুদীর্ঘ একটা পত্র দিয়েছিলাম। সেদিন তুমি কি উত্তর দিয়েছিলে, আর আজ আবার এসব কি বলছ, তা কি একবারও ভেবে দেখেছ? তোমার খালাত ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথা নিশ্চয় অনেক আগে হয়েছে। তারপরও তোমার নিখুৎ অভিনয়ের জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু কেন এমন করলে ফাহমিদা? আমাকে গাছে তুলে মই কেড়ে নিলে কেন? তুমি নিশ্চয় জান, তোমাকে পাওয়ার জন্য নির্ঘাৎ মৃত্যু জেনেও আমি গাছ থেকে লাফ দিতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করব না? তবু এমন কাজ করতে পারলে? তোমাকে নিয়ে কলেজে ও বন্ধু মহলে কত রকমের কথা হয়েছে। তোমার জন্য অনেকের কাছ থেকে অনেক অপমান। সহ্য করেছি। তবু আমি সেসব গায়ে মাখিনি। তোমার ভালবাসার পানিতে অবগাহন করে ধুয়ে মুছে ফেলেছি। তোমার খালাত ভাইকে যখন থেকে ভাল লাগল তখন যদি জানাতে, তা হলে আজ ডেকে পাঠাতাম না। যাই হোক, এতদিনে আল্লাহ তোমাকে। সুমতি দান করেছেন, সেজন্য তার দরবারে জানাচ্ছি শতকোটি শুকরিয়া। দোয়া করি, তিনি যেন তোমাকে প্রত্যেকটা কাজ করার পূর্বে চিন্তা করার তওফিক দান করেন। বিদায় লগ্নে একটা কথা বলে যাই, যেদিন থেকে তোমাকে ভালবেসেছিলাম সেদিন তোমাকে যে কথা বলেছিলাম, আজ আবার সেই কথাই বলছি; আমার ভালবাসার মধ্যে কোনো মোহ বা সার্থ নেই। যদি থাকত, তা হলে সে সব পূরণ করার সুযোগ অনেক পেয়েছিলাম। তোমার মন একাধিক হতে পারে। সেই জন্য তুমি একাধিক লোককে ভালবাসতে পার। কিন্তু আমার মন একটা। সেই মন সম্পূর্ণরূপে তোমাকেই দান। করেছি। অন্য মেয়েকে দেয়ার মতো আমার আর মন নেই। তুমি আমাকে বিদায় দিলে ভালো কথা কিন্তু আমি তোমাকে বিদায় দিতে পারব না। তোমার জন্য আমার মনের দুয়ার চিরকাল ভোলা থাকবে। আমার জীবদ্দশায় তুমি যে কোনো সময় আমার কাছে এলে, আমি তোমাকে সানন্দে গ্রহণ করব। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু জীবনে আর কোনো দিন এই ভগ্নহৃদয় নিয়ে তোমার কাছে ভালবাসার দাবি করব না। আল্লাহ যেন তোমাকে সুখ শান্তি দান করেন এবং তোমার সার্বিক সফলতা দান করেন, সেই কামনা করে বিদায় নিচ্ছি। আসি, আল্লাহ হাফেজ বলে শামী হন হন করে সেখান থেকে বেরিয়ে এল। তার মাথায় তখন তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কি করে সে বাড়ি পর্যন্ত এল, তা সে বুঝতে পারল না। নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে চোখের পানিতে বালিস ভিজাতে লাগল।

ফাহমদিার এহেন কঠোর কথা এবং শামীর করুন কথাগুলো শুনে জোবেদার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। শামী চলে যাওয়ার পর চোখ মুখ মুছে ঘরে ঢুকে ফাহমিদাকে বলল, আমি দরজার আড়াল থেকে তোদের সব কথা শুনেছি। তুই এত নিষ্ঠুর? তোর মন এত পাষাণ? সরলমনা শামী ভাইকে এই রকম কঠোর আঘাত করতে পারলি? তারমতো ভালো ছেলে আমি আর দ্বিতীয় দেখি নি। মনে করেছিলাম, শামী ভাই হয়তো তোর কাছে কোনো অন্যায় করেছে। কিন্তু এখন বুঝলাম, আমার ধারণা ভুল। তোর মনে যদি এই ছিল, তবে কেন আগে তাকে জানাস নি? কেন তার সঙ্গে এতদিন প্রেমের খেলা খেলে বিষাক্ত ছোবল মারলি? শামী ভাই কি তোর বিষাক্ত ছোবল সহ্য করতে পারবে? তুই পাষাণী। তুই মেয়েদের মধ্যে কলংকিনী। আজ থেকে তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এক্ষুনি তুই এখান থেকে চলে যা। আর কোনোদিন আসবি না। তারপর সে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

ফাহমিদা বলল, ঠিক আছে, আজ থেকে তোর সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই। আর তোদের বাড়িতে আসারও প্রত্যাশী আমি নই। তবে যাবার আগে একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না, বলি শামীর জন্য তোর এত দরদ কেন? তার কি হবে না হবে, তা নিয়ে তোর এত মাথা ব্যথা কেন? এত কান্নাকাটিই বা করছিস কেন? তা হলে কি বুঝবো, তুই তাকে ভালবাসিস? যদি তাই হয়, তা হলে তো তোর খুশী হবার কথা। আমি সরে গিয়ে তোর লাইন ক্লিয়ার করে দিলাম।

জোবেদা কান্না থামিয়ে কর্কশকণ্ঠে বলল, তোর মুখে আর ভালবাসার কথা শোভা পায় না। অমন কথা তোর মুখে আনা উচিতও হয় না। তারপর স্বর পাল্টে বলল, শামী ভাই তোকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালবেসেছিলেন। আর তুইও তাকে গরিব জেনে ভালবেসেছিলি। তোর খালাত ভাইকে দেখে মুগ্ধ হয়ে এবং তার অনেক টাকা পয়সা আছে জেনে শামী ভাইয়ের সঙ্গে তুই বেঈমানী করলি। এখন আবার নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছিস। শামী ভাই তোকে ছাড়লেও আল্লাহ ছাড়বে না। তিনি ন্যায় বিচারক। বেঈমানী করার ফল তোকে একদিন না একদিন ভোগ করতেই হবে। তোর কথা শুনে বলতে বাধ্য হচ্ছি, শামী ভাই যদি তার জুতোর ধুলোর একটা কণার মত আমাকে ভালবাসত, তা হলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করতাম। তুই যে কত বড় ভুল করলি, তা একদিন বুঝতে পারবি।

ফাহমিদা রাগের সঙ্গে বলল, শামীকে যদি তাই ভাবিস, তা হলে এবার প্রেম নিবেদন করে তার ভগ্নহৃদয় জোড়া লাগাবার চেষ্টা কর।

জোবেদাও রাগের সাথে বলল, তোকে আর দালালী করতে হবে না। তোর মুখ আমি আর দেখতে চাই না। তুই এই মুহূর্তে চলে যা। এই কথা বলে সে নিজেই সেখান থেকে চলে গেল।

ফাহমিদা রাগে ও অপমানে ফুলতে ফুলতে বাড়ি চলে গেল।

এদিকে শামী বাড়িতে এসে সেই যে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছিল, শুধু নামায পড়ার সময় ছাড়া সারাদিন আর উঠল না। খাওয়া-দাওয়াও করল না।

তার মা মাসুমা বিবি ছেলেকে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে দেখে কয়েকবার এসে জিজ্ঞেস করেও একটা কথা বলাতে পারেন নি। কিছু খাওয়াতেও পারেন নি। এভাবে দুদিন কেটে যাওয়ার পর মাসুমা বিবি ছোট দেওরের ছেলে জাহিদকে বললেন, তোর ভাইয়ার বন্ধু রায়হানকে ডেকে নিয়ে আয়। বলবি আমি ডেকেছি।

জাহেদের বয়স দশ এগার। ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে রায়হানকে চিনে। তাদের বাড়িতে গিয়ে তাকে সালাম দিয়ে বলল, চাচি আম্মা আপনাকে আমার সাথে যেতে বলেছে।

রায়হান সালামের উত্তর দিয়ে বলল, কেন ডেকেছে বলতে পার? তোমাদের বাড়ির সব খবর ভালো তো?

জাহেদ বলল, সবাই ভালো আছে। তবে শামী ভাই আজ তিন দিন বিছানা ছেড়ে উঠে নাই। কিছু খায়ও না। শুধু শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। চাচি আম্মা কত করে জিজ্ঞেস করেছে, কি হয়েছে বল। শামী ভাই কোনো কথাই বলছে না।

রায়হান বুঝতে পারল, নিশ্চয় ফাহমিদা তার ভালবাসা ফিরিয়ে দিয়েছে। বলল, একটু অপেক্ষা কর, আমি হাত পা ধুয়ে গায়ে জামা দিয়ে আসি। সে তখন বাগানে কামলাকে নিয়ে কাজ করছিল। তারপর কামলাকে বলল, তুমি কাজ কর, আমি একটু উত্তর পাড়ায় যাচ্ছি।

কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে এসে রায়হান জাহেদকে নিয়ে তাদের বাড়ি রওয়ানা দিল।

বাড়িতে পৌঁছাবার পর জাহেদ তাকে বৈঠকখানায় বসতে বলে ভিতরে গিয়ে চাচি আম্মাকে বলল, ভাইয়ার বন্ধু এসেছে।

মাসুমা বিবি বৈঠকখানায় এলেন।

রায়হান দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বলল, আমাকে ডেকেছেন কেন চাচি আম্মা?

মাসুমা বিবি বললেন, গত তিন দিন থেকে শামী শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। কোনো কিছু খাওয়া দাওয়াও করেনি। আমি কত করে বললাম, কি হয়েছে বল। তা যদি একটা রা করল। তুমি ওকে জিজ্ঞেস করত বাবা, কি জন্যে সে এরকম করছে। তোমার চাচাও বাড়িতে নেই। কি যে করব, কিছু ভেবে ঠিক করতে পারছি না।

রায়হান বলল, আমাকে আরো আগে খবর দিলেন না কেন? ঠিক আছে, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সবকিছু ব্যবস্থা করছি। শামী এখন কোথায়?

মাসুমা বিবি বললেন, তিন দিন পর আজ অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নাস্তা খাইয়েছি। তুমি আসবার একটু আগে বেরিয়ে গেল। বোধ হয় আম বাগানে গেছে। তারপর জাহেদকে বললেন, যাতে বাবা রায়হানকে আম বাগানে নিয়ে যা।

শামীদের একটা বড় আম বাগান আছে। সেখানে অনেক পদের আম গাছ। শামীর সঙ্গে রায়হান কতদিন সেই আমবাগানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে গল্প করেছে। মাসুমা বিবির কথা শুনে বলল, জাহেদকে যেতে হবে না, আমি একাই তার কাছে যাচ্ছি। তারপর সে যেতে উদ্যত হল।

মাসুমা বিবি বললেন, একটু বস, আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। খেয়ে তারপর যেও।

রায়হান যেতে যেতে বলল, মাফ করবেন চাচি আম্মা, আমি কিছুক্ষণ আগে চা নাস্তা খেয়েছি। আগে শামীর সঙ্গে দেখা করি, তারপর না হয় খাব।

রায়হান আম বাগানে এসে দেখল, শামী একটা আম গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। আর তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই দুতিন দিনে তার চেহারা শুকিয়ে গেছে। চোখ দুটো কোঠরে ঢুকে গেছে। কাছে এসে সালাম দিয়ে তার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, কিরে, এখানে বসে কাঁদছিস কেন? তোর এরকম অবস্থা হল কি করে?

শামী চমকে উঠে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিয়ে রায়হানকে জড়িয়ে ভিজে গলায় বলল, হেরে গেলাম দোস্ত হেরে গেলাম। আমি জীবনে হার কি জিনিস জানি না। কিন্তু ফাহমিদার কাছে হেরে গেলাম। তারপর ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

রায়হান যা বুঝার বুঝে গেল। বলল, তুই শিক্ষিত ছেলে হয়ে একটা মেয়ের কাছে হেরে গিয়ে কাঁদছিস, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। এটাকে তুই হার বলছিস কেন? তুই পুরুষ ছেলে। এক ফাহমিদার কাছে হেরে গেছিস তো কি হয়েছে? অমন কত ফাহমিদা তোকে পাওয়ার জন্য হাঁ করে রয়েছে। তোর মতো ছেলে আমাদের গ্রামে আর একটা আছে কিনা সন্দেহ। এখন কান্না থামা। কি হয়েছে বল।

শামী সামলে নিয়ে রায়হানকে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুখ মুছল। তারপর সেদিন ফাহমিদার সাথে যেসব কথোপকথন হয়েছিল বলল।

রায়হান অনেক দিন আগেই জানত, ফাহমিদা একদিন না একদিন এরকম কথা বলবেই। তাই এখন শামীর কাছে তার কথা শুনে একফুও অবাক হল না। বলল, তুই এত লেখাপড়া করলি আর এটা জানিস না, মেয়েরা সুখের পায়রা? পায়রা যেমন স্বচ্ছল ও সুখী বাড়িতে বাস করে, মেয়েরাও তেমনি স্বচ্ছল ও সুখী বাড়িতে বাস করতে চায়। সেই বাড়িতে যখন অভাব-অনটন আসে পায়রা তখন অন্য সুখী বাড়িতে চলে যায়। মেয়েরাও সংসারে অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট এলে স্বামী ও স্বামীর বাড়ির সকলের সঙ্গে সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাটি করে। অনেকে বাপের বাড়ি গিয়ে আর আসতে চায় না। তাই জেনেশুনে কোনো মেয়ে গরিব ছেলেকে বিয়ে করতে চায় না। অবশ্য সব মেয়েরা যে এরকম তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরকম দেখা যায়। সাহমিদা ঐ ধরনের মেয়ে। আল্লাহ যা করেন সবার ভালোর জন্য করেন। ফাহমিদাকে পেলে তুই সারা জীবন অশান্তি পেতিস। তাই হয়তো আল্লাহ তার মন পরিবর্তন করে দিয়েছেন। যাই হোক, যা হয়েছে ভালই হয়েছে, এবার তাকে তুই ভুলে যা। যে মেয়ে এতদিন তোর সাথে ভালবাসা করে আজ তার খালাত ভাইকে ভালবাসে, সে যে একটা জঘন্য ধরনের মেয়ে তা তুই বুঝতে পারছিস না কেন? তার জন্য আবার কান্নাকাটি করছিস। আমি হলে অমন মেয়েকে মন থেকে আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দিতাম। খারাপ মেয়ে ভেবে তাকে তোর ভুলে যাওয়া উচিত। সে যদি তোকে ভালবেসেও অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে পারে, তবে তুই অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে পারবি না কেন? তুইও একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে কর।

শামী কাতর স্বরে বলল, ফাহমিদা অন্যকে বিয়ে করে সুখী হোক তাই আমি চাই। সে দুঃখ পেলে আমি আরো বেশি দুঃখ পাব। তুই ঐসব কথা আর বলবি না।

রায়হান বুঝতে পারল শামীর প্রেম পবিত্র। তাই ফাহমিদা বেঈমানী করলেও তাকে সুখী দেখতে চায়। বলল, তাই যদি হয়, তা হলে তুই এরকম করছিস কেন?

শামী বলল, ওকে গভীরভাবে ভালবাসতাম। তাই আঘাতটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। সেই ক্ষতের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না।

রায়হান বলল, তুইও তো হাদিস কালাম জানিস। আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে পরীক্ষা করেন। যদি বান্দা সেই পরীক্ষায় ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে পাশ করতে পারে, তা হলে তাকে প্রিয় বান্দাদের মধ্যে সামিল করে নেন। তুই আল্লাহর কাছে ধৈর্য ধরার ক্ষমতা চা। চল, ঘরে চল। গোসল করে খাওয়া দাওয়া করবি। চাচি আম্মা বললেন, তুই নাকি এই কদিন খাওয়া দাওয়া না করে শুধু শুয়ে শুয়ে কেঁদেছিস?

শামী বলল, বললাম না আঘাতে খুব কাহিল হয়ে পড়েছি? তাই সামলাতে পারছি না। একটু আগে নাস্তা খেয়েছি। পরে গোসল করে ভাত খাব। তুই এখন যা। পরে আবার আসিস।

রায়হান আর কিছু বলল না। ফিরে এসে শামীর মাকে বলল, চাচি আম্মা, আমি শামীকে অনেক বুঝিয়েছি। মনে হয় এবার ঠিক হয়ে যাবে। এখন আসি, পরে আবার আসব।

মাসুমা বিবি বললেন, তুমি একটু বস। তোমার জন্য চা করে রেখেছি, নিয়ে আসি। তারপর চা নিয়ে এসে রায়হানকে খেতে দিয়ে বললেন, ওর কি হয়েছে তোমাকে বলেছে?

রায়হান চিন্তা করল, ব্যাপারটা ওনাদের জানান উচিত। জানার পর চিন্তা ভাবনা করে কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন। কিভাবে কথাটা বলবে চিন্তা করতে লাগল।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে মাসুমা বিবি বললেন, যদি বলে থাকে, তা হলে নিশ্চিন্তে বলতে পার। আমাকে তো কিছুই বলছে না।

রায়হান বলল, শামী প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকে একটা মেয়েকে ভালবাসত। মেয়েটিও ওকে ভালবাসত। সেই মেয়েটি এখন তার খালাত ভাইকে ভালবাসে এবং তাদের বিয়ের কথাবার্তাও পাকা হয়ে গেছে। তিন চারদিন আগে মেয়েটি সেকথা শামীকে জানিয়েছে। তাই শামী মনে ভীষণ আঘাত পেয়ে এরকম করছে।

মাসুমা বিবি খুব অবাক হয়ে বললেন, কই, আমরা তো কিছুই বুঝতে পারিনি? তুমি কি মেয়েটিকে চেনো?

রায়হান বলল, জি চিনি। দক্ষিণ পাড়ার আবসার উদ্দিনের মেয়ে। নাম ফাহমিদা। দুবছর আগে আই.এ. পাস করে আর পড়ে নি।

মাসুমা বিবি বললেন, আবসার উদ্দিন খুব ধনী তোক। তার মেয়ের সঙ্গে জেনেশুনে শামী ভালবাসা করতে গেল কেন? তা ছাড়া ওদের ফ্যামিলির কেউ নামায রোযা করে না। তারা অন্য সমাজের মানুষ। শামীর মতো ছেলে এত বড় ভুল করতে পারল? ওদের কাছে প্রেম ভালবাসার কোনো মূল্য নেই। ওরা শুধু বুঝে টাকা। টাকাকেই মনুষত্বের মাপকাঠি মনে করে। ওর আব্বা কিছুতেই ও বাড়ির মেয়েকে বৌ করতে রাজি হতেন না। আল্লাহ যা করেন ভালই করেন। তুমি শামীকে বলল, আমরা ভালো মেয়ে দেখে তার বিয়ে দেব। সে যেন ঐ মেয়েকে ভুলে যায়। ঐ মেয়ের জন্য আবার এত কান্নাকাটি? আমি আজই তোমার চাচাকে চিঠি লিখে বাড়ি আসতে বলব। যতশিঘী পারি ওর বিয়ে দেব।

 রায়হান বলল, আপনি খুব ভালো কথা বলেছেন। এখন আমি আসি, কামলা নিয়ে বাগানে কাজ করছিলাম। যাই, দেখি কি করছে। কাল পরশু আবার আসব।

মাসুমা বিবি বললেন, হ্যাঁ বাবা তাই এস। এসে শামীকে বিয়ে করার জন্য বুঝিয়ে বলে।

রায়হান বলল, আজও বুঝিয়েছি। আবার এসে বোঝাব। তারপর সালাম দিয়ে চলে গেল।

শামী নাস্তা খেয়ে সেই যে আমবাগানে গিয়ে বসেছিল, একেবারে জোহরের আযানের সময় বাড়িতে এল। তারপর গোসল করে মসজিদে নামায পড়তে গেল। নামাযের পর কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করল, হে রহমানুর রহিম, তোমার দয়া ব্যতীত কোনো মানুষ একটা নিঃশ্বাসও নিতে পারে না। তুমি যেমন দয়ার সাগর তেমনি প্রেমের সাগর। দুনিয়ার সাগরের কিনারা আছে। কিন্তু তোমার প্রেমের সাগরের কোনো কিনারা নেই। তুমি মানুষের মধ্যেও সেই প্রেমের কিঞ্চিতের বঞ্চিত দান করেছ। তাই মা-বাপ তার সন্তানকে ভালবাসে, সন্তানও তার মা বাপকে ভালবাসে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, ভাই বোনের মধ্যে, বন্ধু-বান্ধবীর মধ্যে, এমনিক সমস্ত মানব-মানবীর মধ্যেও তুমি প্রেমের বীজ বুনে দিয়েছ। যারা সেই প্রেমকে অস্বীকার করে অথবা অন্যায় পথে ব্যবহার করে, তারা মানুষ নামের অযোগ্য। তুমি সমস্ত জীবের মনের কথা জান। আমি ফাহমিদাকে ভালবেসেছিলাম। তাতে আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল কিনা, তাও তুমি জান। কারণ তুমি সর্বজ্ঞ। তবু আমাকে তুমি এতবড় শাস্তি দিলে কেন? আমার তো কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না; তবু কেন এরকম করলে? যদি ফাহমিদাকে আমার জোড়া করে পয়দা না করে থাক, তবে কেন তার প্রতি প্রেমের বীজ আমার মনে অংকুরিত করে দিলে? আর এটাই যদি আমার তকদিরের লিখন হয়, তা হলে সবকিছু সহ্য করার তওফিক আমাকে দাও। নচেৎ আমাকে দুনিয়া থেকে তুলে নাও। আমি নাদান, নালায়েক বান্দা, কিভাবে তোমাকে ডাকতে হয় জানি না। কিন্তু তোমার প্রেরিত শ্রেষ্ঠ রাসুল (সঃ)-এর উম্মত। সেই রাসুল (সঃ)-এর উপর শতকোটি দরূদ ও সালাম পেশ করে বলছি, তারই তোফায়েলে আমার জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দিয়ে আমার দোয়া কবুল কর। আমিন! সুম্মা আমিন।

শামী মোনাজাতের পর কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল।

মাসুমা বিবি জাহেদকে মসজিদ থেকে নামায পড়ে ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, শামী নামায পড়তে গিয়েছিল তাকে দেখেছ?

জাহেদ বলল, আমি যখন আসি তখনও শামী ভাই নামায পড়ছিল।

এই কথা শুনে মাসুমা বিবি নামায পড়ার জন্য পুকুর ঘাটে অযু করতে গেলেন। নামায পড়ার পরও যখন শামী এল না তখন জাহেদকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, যাও তো বাবা শামী আসছে না কেন একটু দেখে এস।

জাহেদ ফিরে এসে বলল, শামী ভাই কুরআন তেলাওয়াত করছে।

মাসুমা বিবি বললেন, তুমি তাকে ডাক নি?

 জাহেদ বলল, জি ডেকেছি। বলল, তুই যা আমি একটু পরে আসছি।

মাসুমা বিবি বললেন, তুমি আর একবার যাও বাবা। গিয়ে বলবে, আমি তার জন্যে ভাত বেড়ে বসে আছি।

জাহেদ মসজিদে গিয়ে দেখল, শামী ঘুমাচ্ছে। কয়েকবার শামী ভাই শামী ভাই বলে ডেকে সাড়া না পেয়ে গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে জাগাতে চেষ্টা করল।

শামীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখল, জাহেদ ডাকছে।

তাকে তাকাতে দেখে জাহেদ বলল, চাচি আম্মা তোমাকে ডাকছে। ভাত বেড়ে তোমার জন্য বসে আছে।

শামী বলল, তুই আম্মাকে ভাত খেয়ে নিতে বল, আমার ক্ষিধে নেই আমি ভাত খাব না।

জাহেদ ফিরে এসে চাচি আম্মাকে সেকথা জানাল।

মাসুমা বিবি বললেন, ঠিক আছে, তুমি ঘরে যাও। ওনার তখন ইচ্ছা হল, নিজে গিয়ে শামীকে ডেকে আনার। সমজিদটা একটু দূরে। তাই ইচ্ছা হলেও গেলেন না। এই কদিন ছেলে খাইনি বলে, তিনিও একরকম না খেয়ে আছেন। আজ সকালে নাস্তা খেয়েছে বলে নিজেও খেয়েছেন। এখন আবার ছেলে খেল না বলে তিনিও খেতে পারলেন না। একগ্লাস পানি খেয়ে এক খিলি পান সেজে মুখে দিয়ে স্বামীর কাছে চিঠি লিখতে বসলেন।

আব্দুস সাত্তার স্ত্রীর চিঠি পেয়ে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এলেন। চিঠি পড়ে তিনি ছেলের উপর খুব রেগে গিয়েছিলেন। তখন ভেবেছিলেন, বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে ভীষণ রাগারাগি করবেন। কিন্তু আসার পর তার অবস্থা দেখে কিছুই বলতে পারলেন না। বরং খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

শামী সব সময় শুয়ে থাকে। মসজিদে নামায পড়তেও সব ওয়াক্তে যায় না। ঘরেই পড়ে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। জোর করে কিছু খাওয়ালে বমি হয়ে যায়।

আব্দুস সাত্তার মুন্সীগঞ্জ থেকে একজন বড় ডাক্তার নিয়ে এলেন।

ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, না খেয়ে খেয়ে স্টোমাক খুব গরম হয়ে গেছে। তাই কিছু খেলে বমি হয়ে যাচ্ছে। বমি বন্ধের ও অন্যান্য ওষুধের প্রেসক্রিপশান করে বললেন, এগুলো এনে খাওয়ান। আর সেই সঙ্গে সব কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করুন। বাই দা বাই, রুগীর দুর্বলতা ছাড়া অন্য কোনো অসুখ নেই। মনে হচ্ছে, খুব বড় মানষিক আঘাত পেয়েছে। আপনারা সেই আঘাতের কারণ খোঁজ করে তার প্রতিকার করুন। নচেৎ রুগীকে যতই ওষুধ খাওয়ান না কেন কোনো কাজ হবে না। এভাবে বেশি দিন চললে রুগীকে বাঁচান মুশকিল হবে। তারপর তিনি চলে গেলেন।

ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মাসুমা বিবি চোখের পানি ফেলতে ফেলতে স্বামীকে বললেন, যা হোক কিছু কর। শামীর কিছু হলে আমি বাঁচন না।

আব্দুস সাত্তার চিন্তিত মুখে বললেন, সবর কর শামীর মা, সবর কর। সবকিছু আল্লাহপাকের ইচ্ছা। তিনি বিপদে সবর করতে বলেছেন।

মাসুমা বিবি বললেন, তা আমিও জানি। কিন্তু মন যে বোধ মানছে না। আমার অমন তরতাজা ছেলে এই কদিনে কি অবস্থা হয়েছে দেখতে পাচ্ছ না? বিছানার সাথে লেগে গেছে। তুমি যা হোক কিছু ব্যবস্থা কর।

আব্দুস সাত্তার বললেন, আমাকে কি তুমি আবসার উদ্দিনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে বলছ?

মাসুমা বিবি বললেন, হ্যাঁ, তাই বলছি। এছাড়া শামীকে বাঁচাবার আর কোনো উপায় নেই। ডাক্তারও তো সেই রকম ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন। তারা যা কাবিন করতে বলবে, রাজি হয়ে যেও। তাতে যদি আমাদের সব জমি জায়গা চলে যায়, তবু অরাজি হয়ো না।

আব্দুস সাত্তার বললেন, কিন্তু তুমি তো বললে, ওনার মেয়ের বিয়ে ওনার শালীর ছেলের সঙ্গে ঠিক হয়ে গেছে। তারা খুব বড় লোক। ছেলে আমেরিকায় চাকরি করে। তারা যদি আমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়? না না, আমি তাদের কাছে যেতে পারব না। তাতে আমাদের তকদীরে যা আছে হবে।

মাসুমা বিবি বললেন, তবু তুমি যাও। যেখানে ছেলের জীবন মরণ নিয়ে সমস্যা সেখানে মান সম্মানের কথা ভাবলে চলবে না। মান সম্মান কি আমাদের ছেলের জান বাঁচাবে? আল্লাহ না করুন শামীর কিছু হলে তুমি নিজের বিবেকের কাছে কি জবাব দেবে? আর তুমি সহ্য করবেই বা কি করে? তাই বলছি তুমি গিয়ে প্রস্তাব দাও। তারপর যা হবার হবে। তবু তো আমরা নিজেদেরকে বোধ দিতে পারব। এই সব বলার সময় মাসুমা বিবির চোখ থেকে পানি পড়ছিল।

আব্দুস সাত্তার স্ত্রীর করুন অবস্থা দেখে এবং তার কাতরোক্তি শুনে বললেন, চিন্তা ভাবনা করে দেখি।

স্বামীর কথা শুনে মাসুমা বিবি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তুমি একবার রায়হান এর কাছে যাও। তাকে ডেকে নিয়ে এসে শামীকে বুঝাতে বল, তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দেব।

আব্দুস সাত্তার রায়হানকে গ্রামের ছেলে হিসেবে এবং ছেলের বন্ধু হিসেবে ভালভাবে চেনেন। বললেন, তাই যাই তাকে ডেকে নিয়ে আসি।

.

ঐ দিন রায়হান শামীদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে জোবেদার কাছে গেল।

জোবেদা তাকে দেখে সালাম বিনিময় করে বলল, রায়হান ভাই যে, কেমন। আছেন?

রায়হান ফাহমিদার বান্ধবী জোবেদা ও রাহেলাকে ভালোভাবেই চিনে। রাহেলার চেয়ে জোবেদা দেখতে শুনতে অনেক ভাল। রায়হান জানে ফাহমিদার সঙ্গে জোবেদার বেশি ভাব, তাই তার কাছে ফাহমিদার সব কথা জানার জন্য এসেছে। জোবেদার কথা শুনে বলল, আল্লাহপাকের রহমতে একরকম ভালো আছি। কিন্তু শামীর অবস্থা খুবই খারাপ। সেদিন ফাহমিদা শামীকে কি বলেছিল? যে জন্যে সে আজ শয্যাশায়ী। না খেয়ে খেয়ে বিছানার সঙ্গে লেগে গেছে। তার মা-বাবা চিকিৎসা করিয়েও কিছু করতে পারছে না। তোমাদের বাড়িতেইতো ওদের দুজনার সেদিন কথা হয়েছিল? তুমি কি সে সব জান?

জোবেদা ও রায়হানকে ভালভাবে চিনে, সে যে শামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু তাও জানে। বলল, হ্যাঁ জানি। তারপর ফাহমিদা ও শামীর মধ্যে যেসব কথাবার্তা হয়েছিল সব বলল। শেষে আরো বলল, ফাহমিদা যে এরকম করবে তা আমি কল্পনাও করতে পারি নি। সেদিন শামী ভাই চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে এই ব্যাপার নিয়ে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে চিরজীবনের মতো সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।

রায়হান বলল, শামীর জন্য খুব দুঃখ হয়। সে ফাহমিদাকে এত বেশি ভালবেসেছে যে, তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বেশি দিন বাঁচবে না।

জোবেদাও মনের অজান্তে অনেকদিন থেকে শামীকে ভালবাসে। শামীও ফাহমিদা দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালবাসে জেনে এতদিন নিজেকে কঠোরভাবে সংযত করে রেখেছিল, আজ আর পারল না। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, রায়হান ভাই, আপনি জেনে রাখুন, শামী ভাইয়ের কিছু হলে আমিও আপনার থেকে কম দুঃখ পাব না। আর ফাহমিদার বিচার আল্লাহ করবেন। তারপর সে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

রায়হান বুঝতে পারল, জোবেদাও শামীকে গভীরভাবে ভালবাসে। কিন্তু তা কাউকে জানতে দেয় নি। তার কথা শুনে রায়হানের চোখেও পানি এসে গেল। চোখ মুছে ফিরে আসার সময় চিন্তা করল, যেমন করে হোক জোবেদার সঙ্গে শামীর বিয়ে দিতে হবে।

পরেরদিন রায়হান শামীর কাছে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য যাবে বলে ঠিক করেছিল। কিন্তু রাতে খবর এল মামার খুব অসুখ। তাই সকালে মাকে সঙ্গে করে মামার বাড়ি মিরকাদিতে যেতে হল। কয়েকদিন থেকে মামার অবস্থা একটু ভালো হওয়ার পর মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল।

আব্দুস সাত্তার রায়হানদের বাড়িতে এলে রায়হান সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছেন চাচা? কবে এলেন?

আব্দুস সাত্তার বললেন, আল্লাহপাকের রহমতে ভালো আছি। তিন চার দিন হল এসেছি। শামীর ব্যাপারে কথা বলব বলে এলাম। তোমার চাচি আম্মা বলেছিল, তুমি দুই একদিনের মধ্যে যাবে, দেরি দেখে খোঁজ নিতে এসেছি।

রাযহান মামার অসুখের কথা বলে বলল, গতকাল ফিরেছি। আজ আপনি না এলেও যেতাম। আসুন সদরে এসে বসুন। তারপর ওনাকে সদরে বসিয়ে চা বিস্কুট দিয়ে বলল, শামী এখন কেমন আছে?

আব্দুস সাত্তার চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে খেতে বললেন, আগে যা দেখে এসেছিলে তার চেয়ে আরো খারাপ। তুমি গিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিয়ের জন্য রাজি করাও।

রায়হান বলল, সে কথা আনপাকে বলতে হবে না। সেদিন তাকে বিয়ে করার কথা বলে অনেক বুঝিয়েছি। মেয়েও আমি দেখে রেখেছি। পুবপাড়ার কায়েস চাচার মেয়ে জোবেদা। কায়েস চাচাঁদের সব কিছুতো আপনি জানেন, জোবেদাকেও আপনি। দেখেছেন। শামী ও জোবেদা দুজন দুজনকে চেনে। আমার মনে হয়, আপনাকে নিয়ে আমি প্রস্তাব দিলে কায়েস চাচা রাজি হয়ে যাবেন।

আব্দুস সাত্তার বললেন, তুমি ঠিক কথা বলেছ। আমি ওদের সবাইকে চিনি, তবে তোমার চাচি আমাকে আবসার উদ্দিনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে বলেছিল। এ ব্যাপারে তুমি কি বল?

রায়হান বলল, না না, এটা ঠিক হবে না। কারণ উনিতো রাজি হবেনই না, প্রস্তাব দিতে গেলে বরং আপনি অপমানিত হবেন।

আব্দুস সাত্তার বললেন, সেকথা আমারও মনে হয়েছে। এখন তুমি আমার সঙ্গে চল। প্রথমে শামীকে রাজি করাও, তারপর আমরা কায়েসের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাব।

ততক্ষণ আব্দুস সাত্তারের চা খাওয়া হয়ে গেছে। রায়হান কাপ পিরিচ নিয়ে ভিতরে যাওয়ার সময় বলল, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি এগুলো রেখে আসি। একটু পরে ফিরে এসে ওনার সঙ্গে রওয়ানা হল।

বাড়িতে এসে রায়হান শামীকে দেখে চমকে উঠল। এই কদিনের ব্যবধানে তাকে চেনাই যায় না। তার মনে হল, শামী যেন মৃত্যুর দোর গোড়ায় পৌঁছে গেছে।

রায়হানের চোখ দুটো আপনা থেকে পানিতে ভরে উঠল। ভিজে গলায় বলল, শামী, তুই নিজের সর্বনাশ নিজেই করছিস? সেদিন তোকে অত করে বললাম, ফাহমিদাকে মন থেকে মুছে ফেল। সে তার খালাতো ভাইকে বিয়ে করে সুখে থাকবে আর তুই তার জন্যে নিজের জীবন শেষ করতে চলেছিস। তাকে ভালবাসিস সেটা ভালো কথা; কিন্তু তাকে না পেয়ে মৃত্যুপথের যাত্রী হওয়া কি মানুষের কাজ হচ্ছে? একটা মেয়ে যা সহজে করতে পারল, তুই পুরুষ হয়ে তা পারছিস না কেন? আমার কথা শোন, আমি তোর আব্বার সঙ্গে কথা বলেছি, জোবেদার সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। তোর কোনো কথা শুনব না। ঐ দিন এখান থেকে ফিরে গিয়ে ফাহমিদার সঙ্গে তোর কি কথা হয়েছিল ভালো করে জানার জন্য আমি জোবেদার কাছে গিয়েছিলাম। তার কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম সে তোকে ভীষণ ভালবাসে। তোর অসুখের কথা শুনে ঝর ঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, শামী ভাইয়ের কিছু হলে সে ভীষণ দুঃখ পাবে।

শামী ম্লান হেসে বলল, জোবেদা যে ভালবাসে তা আমাকে না বললেও আমি জানি। কিন্তু আমার এই হৃদয়ে ফাহমিদা এমনভাবে গেঁথে আছে, তাকে যেমন ভুলতে পারব না তেমনি অন্য কোনো মেয়েকে এ হৃদয়ে স্থান দিতে পারব না। তাতে যদি আমার মৃত্যু হয়, তবুও সম্ভব নয়। তুই আমাকে আর কখনও বিয়ের কথা বলবি না। তার চেয়ে বিষ এনে দে, তাতে বরং খুশী হব।

রায়হান কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তোকে বন্ধুত্বের দাবিতে আল্লাহপাকের কসম দিয়ে বলছি, বিয়ের ব্যপারে আমাকে পিড়াপিড়ী করবি না, দোহাই। লাগে তোকে।

এরপর রায়হান আর কিছু বলতে পারল না। শামীর কাছ থেকে বেরিয়ে এসে তার মা-বাবাকে বলল, আমি শামীকে বিয়ে করার জন্য কিছুতেই রাজি করাতে পারলাম না। তারপর তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও কসম দেয়ার কথা বলে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি চলে গেল।

মাসুমা বিবি ও আব্দুস সাত্তার ছেলের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

যত দিন যেতে লাগল শামীর শরীর তত ভেঙ্গে পড়তে লাগল। এখন সে আর বিছানা ছেড়ে উঠতেও পারে না। আব্দুস সাত্তার হেকেমী, কবিরাজি, ডাক্তারী কোনো চিকিৎসাই করাতে বাকি রাখলেন না। এমনকি ঢাকার এক পীর সাহেবের কাছ থেকে তাবিজ তদবির করালেন, কুরআন খতম দিলেন, খতমে ইউনুস করালেন। কিন্তু কোনো। কিছুতেই শামীর শারীরিক কোনো পরিবর্তন হলো না। বরং দিন দিন সে কাহিল হয়ে পড়তে লাগল। ফাহমিদার সেদিনের কথাগুলো তাকে এত বেশি আঘাত করেছে, যা সে সহ্য করতে পারছে না। তাই কোনো এক আরবী কৰি তার এক কবিতায় লিখেছেন

যারা হাতো সেনানে লা মাত্তেইয়ামো
ওয়ালা ইয়ালতামো মাজারাহাল লেসানে

অর্থাৎ মানুষের মুখের কোনো কোনো কথা এই রকম বিষাক্ত ও পীড়াদায়ক যে, ধনুকের তীরের চেয়েও মারাত্মক। কারণ ধনুকের তীর কোনো প্রাণীর শরীরে আঘাত করলে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং বেদনা অনুভব হয়। আবার ওষুধের মাধ্যমে তা ভালো করা যায়। কিন্তু মানুষের মুখের দ্বারা মানুষের মনে যে আঘাত লেগে ক্ষতের ও বেদনার সৃষ্টি হয়, তার কোনো ওষুধ নেই। আমরণ রুগীকে পীড়া দিতে থাকে।

কবির এই মূল্যবান কথা সত্য না মিথ্যা শামী এবং ফাহমিদা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আব্দুস সাত্তার যখন ছেলের সব রকমের চিকিৎসা করিয়ে দেখলেন, তার অসুখ ভালো না হয়ে দিন দিন বাড়ছে তখন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। সেখানে তার চিকিৎসা চলতে লাগল।

Super User