পেঁচার ডাক — তিন গোয়েন্দা — ভলিউম ৫১
প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৭

০১.

রবিনকে খবরটা দিল দুধওয়ালা। কাল রাতে মিস্টার হুবারের বাড়িতে চোর ঢুকেছিল, শুনেছ খবরটা?

রবিনদের পাশের বাড়ির পরের বাড়িটা হপ্তা দুই আগে ভাড়া নিয়েছে কনি হুবার। একা থাকে।

কি কি নিয়েছে?

জানা যায়নি। মিস্টার হুবার বাড়ি নেই।

কে বলল আপনাকে? উত্তেজিত হয়ে উঠেছে রবিন। ওদের বাড়ির এত কাছে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, আর সে কিছুই জানে না!

সকালে দুধ দিতে গিয়ে দেখি দরজা খোলা। একটা জানালা ভাঙা। মিস্টার হুবারের নাম ধরে ডাকাডাকি করলাম। বেরোলেন না। হলঘরের দরজা দিয়ে উঁকি দিলাম। ভেতরে জিনিসপত্র সব তছনছ হয়ে আছে। সন্দেহ হলো। ঘরে ঢুকে তক্ষুণি পুলিসকে ফোন করলাম।

ওহ! তারমানে ঝামেলা এসে দেখে চলে গেছে সব! ওদের আগেই ফারাম্পারকট এসে সূত্র খুঁজে নিয়ে চলে গেছে ভেবে হতাশ হয়ে পড়ল রবিন।

হ্যাঁ। নোটবুক বের করে কি কি সব টোকাটুকি করল। ভাবসাব দেখে মনে, হলো শার্লক হোমসের বাপ। আমাকে হুকুম দিল যাতে এ খবর কাউকে না বলি। ঝামেলাটা চিরকালই একটা হাঁদারাম। আমাকে ছাগল পেয়েছে আরকি। ওর কথায় আমি মুখ বন্ধ রাখি। আমার সব কাস্টোমারকে বলে দিয়েছি। যা পারে ও করুকগে এখন।

আপনি বাড়ির আশেপাশে কিছু দেখেছেন নাকি?

না। আশেপাশে ঘোরার সময়ই পাইনি। যখনই মনে হলো, বাড়িটাতে কিছু ঘটেছে, পুলিসকে ফোন করলাম। ভেতরে আমার মনে হয় কোন কিছুতে হাত দেয়া হয়নি। তোমরা তো গোয়েন্দাগিরি করো, নিশ্চয় বুঝতে পারছ আমি কিসের কথা বলছি।

মাথা ঝাঁকাল রবিন।

দুধওয়ালা চলে যাওয়ার পর আর দেরি করল না সে। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কিশোরকে খবরটা দেয়ার জন্যে।

কিশোরও আগ্রহী হয়ে উঠল। দুজনে মিলে রওনা হলো মুসাদের বাড়িতে। না না, তিনজনে মিলে। টিটুও চলল কিশোরের সাইকেলের ঝুড়িতে সওয়ার হয়ে। বাড়ি থেকে মুসা আর ফারিহাকে ডেকে নিয়ে চলে এল ওরা কনি হুবারের বাড়িতে।

হুবার ফেরেনি।

 কিশোর বলল, সূত্র খোজো সবাই। পায়ের ছাপ, পোড়া সিগারেটের গোড়া, ড্রেসার, জানালার কাছে হাতের ছাপ-এ সব। যে যা পাবে নোটবুকে লিখে রাখবে।

কিশোরকে ঘুরে আরেকদিকে রওনা হতে দেখে ফারিহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখব।

 জানালার পর্দা টানা। ভেতরে দেখা সম্ভব হলো না।

এক এক করে ছোট বাড়িটার জানালাগুলোয় উঁকি দিতে শুরু করল সে। কিন্তু একটা জানালা দিয়েও ভেতরে তাকানো গেল না।

সামনের দরজাটা বন্ধ। পেছনেরটাতেও তালা দেয়া।

পেছনের ভাঙা জানালাটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। রান্নাঘরের জানালা। চোরই আসুক বা ডাকাত, এদিক দিয়েই ঢুকেছিল।

ভেতরে হাত ঢুকিয়ে পর্দাটা সরাল কিশোর। ঝড় বয়ে গেছে যেন ঘরের মধ্যে। ড্রেসার, টেবিলের প্রতিটি ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আলমারিগুলো খোলা। ওগুলোর জিনিসও সব মাটিতে।

কিছু একটা খোঁজা হয়েছে।

 কি জিনিস?

রান্নাঘর থেকে হঠাৎ একটা শব্দ শোনা গেল। বোঝা গেল না কিসের। কান পাতল সে। আবার শোনা গেল শব্দটা। ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে তাকাল। দুটো জ্বলজ্বলে চোখ তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

মিআও! মিআও! ডাকল চোখের মালিক।

বেড়াল, কিশোর বলল। কি ভয় পেয়েছে দেখো। পেটে মনে হচ্ছে খিদে। খাবার দেয়ার কেউ নেই। বেচারা!।

বাড়ির কোণ ঘুরে এগিয়ে এল অন্যরা। হাতে নোটবুক।

কিশোর বলল, ঘরের মধ্যে একটা বেড়ালের বাচ্চাকে ফেলে দরজা আটকে দিয়ে গেছে। কি করা যায়?

বের করে নিয়ে এসো, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল ফারিহা।

কি করে? মুসার প্রশ্ন। সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ।

এই জানালাটা ভাঙা, দেখাল কিশোর। রুমাল জড়িয়ে নিলে ভাঙা কাঁচের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়া যাবে। ছিটকানি খুলতে পারলে বের করে আনা যাবে বাচ্চাটাকে। এ ভাবেই জানালা খুলেছে চোর।

খোলো না তাহলে, রবিন বলল। ঝামেলা মনে হয় এখন আর আসবে না।

পকেট থেকে বড় একটা সাদা রুমাল বের করল কিশোর। আঙুলে শক্ত করে জড়াল। ভাঙা কাঁচের ফোকর দিয়ে ঢুকিয়ে দিল হাতটা। ছিটকানিটা খুঁজে পেয়ে বলল, পেয়েছি।

শার্সি খোলা এখন অতি সহজ। খুলে ফেলল ওটা।

চৌকাঠে উঠে বসল সে।

 সঙ্গে যাওয়ার জন্যে ঘেউ ঘেউ শুরু করল টিটু।

ধমক দিয়ে কিশোর বলল, এই, থামাও তো পাজিটাকে। ওর চিল্কারে কেউ কি হয়েছে দেখতে এলেই আর ঢুকতে পারব না।

তাড়াতাড়ি সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়ে চুপ করাল টিটুকে।

কিশোর ঢুকে পড়ল ভেতরে। বেড়ালের বাচ্চাটা আলমারির একটা তাকে বসে আছে জড়সড় হয়ে। সে এগোতেই আরও ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই ভয়টা কেটে গেল যখন একবাটি দুধ এনে ওর সামনে রাখল কিশোর। ক্ষুধার্ত ভঙ্গিতে লপাত লপাত করে জিভ দিয়ে চেটে শেষ করে ফেলল দুধটা। তারপর পায়ের কাছে এসে মিউ মিউ করতে লাগল। কিন্তু যেই সে ধরতে গেল, ঘাবড়ে গেল আবার। এক দৌড়ে পালাল। ছুটে চলে গেল দরজা দিয়ে হলঘরে।

আই, পুষি, পুষি। আয়, আয়, ডাকল কিশোর।

 জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মুসা জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?

পালিয়েছে।

তাড়াতাড়ি ধরো না। কেউ চলে এলে মুশকিল হবে।

খুঁজে বের করতে হবে তো আগে ওটাকে। তারপর না ধরা।

হলঘরে ঢুকল কিশোর। ওলটপালট হয়ে আছে জিনিসপত্র। কোট, জুতো, প্যান্ট, শার্ট এ সব জিনিস আলমারি আর একটা চেস্ট অভ ড্রয়ার থেকে বের করে ছড়িয়ে ফেলা হয়েছে মেঝেতে। বাচ্চাটাকে দেখতে পেল না। কোথায় যে গিয়ে লুকিয়েছে ওটা কে জানে। ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে লাগল সে।

নিচে তিনটে ঘর। ওপরে তিনটে। সব কটার জিনিসপত্রের একই অবস্থা। ফায়ারপ্লেসের নিচে কালি পড়ে থাকতে দেখে বোঝা গেল যে-জিনিস খুঁজতে এসেছিল লোকটা, ওটার জন্যে চিমনির মধ্যেও ঢুকেছিল।

একটা বেডরূম থেকে বেরিয়ে আসতেই লাল জিনিসটা চোখে পড়ল ওর। তুলে নিল। দস্তানা। ছোটদের।

বিড়বিড় করল আনমনে, এখানে ছোট বাচ্চা এল কোত্থেকে? হুবার থাকে তো একা।

সন্দেহ হলো–কোনও শিশুকে কিডন্যাপ করে এনে এখানে লুকিয়ে রাখেনি তো হুবার, যার খোঁজে এসেছিল লোকটা?

আপনমনেই মাথা নাড়ল আবার। না, যত ছোট শিশুই হোক, তাকে ড্রয়ার কিংবা চিমনিতে খুজবে না লোকটা।

ছোটদের আর কোন পোশাক আছে কিনা খুঁজতে লাগল কিশোর। কিছুই নেই। যা আছে সব বড়দের, পুরুষ মানুষের।

দস্তানাটা পকেটে রেখে দিল সে। সূত্র। এক জোড়ার একটা। আরেকটা গেল কোথায়?

ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল ওর কাছে। গতরাতে একটা শিশু ছিল এ বাড়িতে। মনে হয় তাড়াহুড়োয় কাপড় পরানো হয়েছে ওকে। একটা দস্তানা ভুলে পরানোই হয়নি। কিংবা ঠিকমত লাগেনি বলে খুলে পড়ে গেছে।

এই সময় কানে এল মুসার চাপা ডাক, কিশোর, জলদি বেরিয়ে এসো। ঝামেলা আসছে!

.

০২.

কিশোর নিচতলায় নামার আগেই কানে এল ফগ্যাম্পারকটের ধমক, ঝামেলা।

এই, তোমরা এখানে কি করছ? যাও, ভাগো!

তারপর শুরু হলো টিটুর চিৎকার, হই-চই। মুচকি হাসল কিশোর। নিশ্চয় এখন ফগের গোড়ালির পেছনে লেগেছে টিটু।

কোনদিক দিয়ে বেরোনো যায় ভাবল কিশোর।

বাড়ির পেছন দিকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে ফগের, পুলিসের কাজে নাক গলাতে এসেছ তোমরা আইনের বিরোধিতা করছ। ভাল চাও তো যাও এখান থেকে। উফ, ঝামেলা!

কে বলল নাক গলাচ্ছি? প্রতিবাদ করল রবিন। পড়শীর বাড়িতে চোর ঢুকেছে শুনলাম, দেখতে এসেছি। এতে নাক গলানোর কি দেখলেন?

জবাব খুঁজে না পেয়ে খানিকক্ষণ আমতা আমতা করল ফগ। তারপর ধমকে উঠল, আবার কৈফিয়ত দেয়া হচ্ছে, না? জলদি সরাও ওই শয়তানটা কুত্তাটাকে! নইলে কিন্তু ভীষণ রেগে যাব বলে দিলাম!

নিশ্চয় গোড়ালি কামড়াতে চাইছে টিটু। ফগের চেহারা কি হয়েছে এখন কল্পনা করে হাসিতে পেট ফেটে যাবার অবস্থা হলো কিশোরের। অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখার সন্যে অস্থির হয়ে উঠল। আবার ভাবল, বেরোবে কোন পথে? ও যে ঘরে ঢুকেছে এটা দেখাতে চায় না ফগকে। তাহলে পেয়ে বসবে সে। নাক গলানোর ছুতোয় ওকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

তোমাদের বড় বিচ্ছুটা কোথায়? আচমকা প্রশ্ন করল ফগ। এতক্ষণে খেয়াল করেছে কিশোর নেই ওখানে। নিজে নিজেই জবাব দিল, জ্বর নাকি? বাড়িতে পড়ে আছে? নিশ্চয় তাই। নইলে ওটারই তো আগে এসে এখানে হাজির হওয়ার কথা। সবার শেষে ধরুল ওকে, তাই না? ভাল হয়েছে। ওরকম শয়তানদের বিছানায় পড়ে থাকাই উচিত। আচ্ছা শিক্ষা হয় তাহলে। এখন যাও সবাই এখান থেকে। ভাগো। নইলে বাড়িতে গিয়ে নালিশ করব। ঝামেলা

বাড়িতে নালিশ করার হুমকিটা কাজে লাগল। মায়ের বকা খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই মুসার। রবিনেরও না। মানে মানে সরে পড়ল তাই। কিশোরকে নিয়ে ভাবল না। ওর ব্যবস্থা ও করে নিতে পারবে। ফাঁকে ফাঁকি দিয়ে সহজেই বেরিয়ে আসতে পারবে ঘর থেকে।

কিন্তু অত সহজে পার পেল না কিশোর। সামনের দরজা খুলে বেরোতে যাবে, এই সময় তালা খোলার শব্দ শুনল। ফগ খুলছে। সরার সময় পেল না। পান্না খুলে গেল। সামনে কিশোরকে দেখে এমন ডলি করল ফগ মনে হলো মাথায় বাজ পড়েছে। হাঁ হয়ে গেল মুখ।

গুড মর্নিং, মিস্টার ফল, মসৃণ গলায় বলল কিশোর। আসুন, ঘরে আসুন।

আচমকা ফেটে পড়ল ফগ, ফগর‍্যাম্পারকট! তুমি এখানে কি করছ? ঝামেলা!

না, কোন ঝামেলা করছি না। বাইরে থেকে শুনলাম একটা বেড়ালছানা খিদেয় কাঁদছে। ওটাকে বাঁচানোর জন্যে ঢুকেছি।

অন্যের বাড়িতে লুকিয়ে ঢোকাটা বেআইনী। এর জন্যে আমি তোমাকে হাজতে ঢোকাতে পারি, জানো?

কিন্তু বেড়ালছানা…।

মিথ্যে বলে পার পাবে না! গর্জে উঠল ফগ। তোমাকে এবার বাগে পেয়েছি আমি, ছাড়ব না। বেড়াল-টেড়াল কিচ্ছু না। আসলে বাড়ি খালি পেয়ে চুরি করতে ঢুকেছিলে তুমি…

ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই মিআউ করে কিশোরের পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল ছানাটা। প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করল ফগকে। কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে হিসিয়ে উঠল।

হেসে বলল কিশোর, দেখলেন তো, মিথ্যে আমি বলিনি। বেড়ালটাই সাক্ষি।

বেড়ালটার দিকে মিটমিট করে তাকিয়ে রইল ফগ। ধমকে উঠল, যাও, এবারের মত ছেড়ে দিলাম। ভাগো ওটাকে নিয়ে। আমার জরুরী কাজ আছে এখানে। আর আসবে না, বলে দিচ্ছি।

বেড়ালের বাচ্চাটাকে নিয়ে সোজা মুসাদের বাড়ি রওনা হলো কিশোর। আশা করল, ওখানেই পাওয়া যাবে সবাইকে।

মুসাদের বাগানের ছাউনিতে অপেক্ষা করছে সবাই। কিশোরের সাড়া পেয়ে ছুটে বেরিয়ে এল টিটু। কোন কুকুরই বেড়াল দেখতে পারে না। টিটুও পারল না। তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিল। ধমক দিয়ে ওকে চুপ করাল কিশোর। বাচ্চাটাকে তুলে দিল ফারিহার হাতে।

ছাউনির ভেতরে একটা বাক্সে ছানাটাকে বসিয়ে দিল ফারিহা, এমন জায়গায় যেখানে টিটু ওর নাগাল পাবে না।

ছাউনিতে ঢুকে একটা বাক্স টেনে সবার মুখোমুখি বসল কিশোর। জিজ্ঞেস করল, বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখেছ তো সবাই?

মুসা, ফারিহা, রবিন, তিনজনেই মাথা ঝাঁকাল।

সূত্র পেয়েছ?

একপাতা কাগজ বের করল রবিন। বলল, খুব বেশি কিছু না। এই যে, রিপোর্ট।

কাগজটা দেখল না কিশোর। মুখেই বলো। শুনি।

বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখেছি আমরা সবাই। কোনদিক দিয়ে চোর এসেছে, দেখেছি। সামনের গেট দিয়ে ঢোকেনি। বাগানের পেছনের দেয়াল টপকে এসেছে।

কি করে বুঝলে?

জুতোর ছাপ পেয়েছি। গম্ভীর হয়ে বসে গেছে মাটিতে। ওপর থেকে লাফিয়ে পড়লেই কেবল ওরকম দাগ পড়ার কথা।

হতে পারে। বলে যাও।

ওই একই জুতোর ছাপ এগিয়ে গেছে একটা ঝোঁপের ধার পর্যন্ত। ভেতরে লুকিয়ে বসেছিল। বুঝলাম, কারণ অনেকগুলো ছাপ দেখেছি ওখানে। ওখানে বসে নিশ্চয় বাড়ির দিকে চোখ রেখেছিল লোকটা।

ছাপের নকশা একে এনেছ?

নিশ্চয়ই, মুসা বলল। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। অনেক বড় পা লোকটার। এগারো নম্বর সাইজ। এই দেখো। নাইকি কোম্পানির জুতো। সোলের তলার নকশা আমার জুতোর মতই। একই জুতো। আমারটার সাইজ ওর। চেয়ে অনেক ছোট।

আর কি পেলে?

পকেট থেকে একটা সিগারেটের গোড়া বের করে দিল রবিন। এটা। মাটিতে পাতার নিচে পড়ে ছিল। সেজন্যেই ফগ দেখতে পায়নি।

ফগ ওখানে গিয়েছে কি করে জানলে?

অনেক জায়গায় ওর জুতোর ছাপ দেখেছি। সারা বাড়িতেই ঘুরেছে। ওর পা বিশাল। চোরটার চেয়েও বড়। দেখতে দেখতে মুখস্থ হয়ে গেছে। না চেনার কোন কারণ নেই। যাই হোক, আমার ধারণা, এ রকম সিগারেটের গোড়া আরও ছিল ওখানে। সে পেয়ে নিয়ে গেছে। এটা পাতার নিচে ছিল বলে দেখতে পায়নি।

তুমি পেলে কি করে?

আমি না। টিটু পেয়েছে। পাতার কাছে দাঁড়িয়ে গন্ধ শুঁকতে লাগল।

হাসল কিশোর। ও তো দেখি বড় গোয়েন্দা হয়ে গেছে।

 নিজের নাম শুনে কান খাড়া করে ফেলেছে টিটু।

ওর দিকে তাকিয়ে কিশোর বলল, ওস্তাদ হয়ে যাচ্ছিস তুই।

প্রশংসা বুঝতে পারল টিটু। লেজ নাড়তে লাগল।

 রবিনের দিকে ফিরল কিশোর, হ্যাঁ, আর কিছু?

ঝোঁপের ভেতর থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়েছে পায়ের ছাপ। ভাঙা জানালার নিচে গিয়ে থেমেছে। সুতরাং ওই জুতোর ছাপের মালিকই যে জানালা ভেঙে ঘরে ঢুকেছে, এটা অনুমান করতে অসুবিধে হয় না। একটা ইটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখেছি জানালার নিচে। ওটা দিয়ে বাড়ি মেরেই কাঁচ ভেঙেছে সভবত।

ভাঙতে পারে, মাথা দোলাল কিশোর। এ ভাবে ভাঙলে শব্দ হবেই। কেউ শুনে থাকতে পারে। ঠিক আছে, খোঁজ নেয়া যাবে। বলো, আর কি পেয়েছ?

পায়ের ছাপ আরও আছে। তবে ওগুলো এমন সব জায়গায়, চোরের বলে মনে হলো না। সাইজেও মেলে না।

কোন্ কোন্ জায়গায়?

সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে ফুলের বেড় মাড়িয়ে পেছন দিকে চলে গেছে। আর ফিরে আসেনি। সামনের গেটের দিকেও যায়নি।

তারমানে কোন কারণে পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আর কেউ তো ও বাড়িতে থাকে না, সুতরাং এই ছাপগুলো কনি হুবারের হওয়ারই সম্ভাবনা।

ব্যস, এইই, কাগজটা ভাঁজ করে আবার পকেটে রেখে দিল রবিন।

.

০৩.

 নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করল কিশোর। এর অর্থ গভীর ভাবনা চলেছে তার মগজে। সূত্রগুলো নিয়ে ভাবছে।

এই সময় ওপরের বাক্সে নড়েচড়ে উঠল বেড়ালছানাটা। সেদিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করল টিটু।

বিরক্ত হয়ে ধমক লাগাল কিশোর, আহ্, বড় বেশি বিরক্ত করিস! ও তোর কি করল যে ওকে.ধমকাচ্ছিস?

চুপ হয়ে গেল টিটু।

এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকাল কিশোর, যা বোঝা যাচ্ছে, ইবারের বাড়ি থেকে কেউ কোন জিনিস চুরি করে নিতে এসেছিল কাল রাতে।

কিন্তু নিজের বাড়ি থেকে হুবার ওভাবে পালাল কেন? মুসার প্রশ্ন।

তর্জনী তুলে নাড়ল কিশোর, তাড়াহুড়ো কোরো না। আসছি সেসব প্রশ্নে। হা, যা বলছিলাম। কাল রাতে একটা লোক হুবারের বাড়িতে ঢুকে ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে রইল। ও ভেবেছিল ওই সময় হুবার ঘুমিয়ে আছে। অসচেতন অবস্থায় পেয়ে যাবে ওকে। ঘুম থেকে ডেকে তুলে পিস্তল দেখিয়ে হুমকি দেবে। আদায় করে নেবে। যেটা নিতে এসেছে।

কিন্তু কোন কারণে হুবারকে চমকে দিতে পারেনি লোকটা। হতে পারে কাঁচ ভাঙার শব্দে জেগে গিয়েছিল হুবার। বিপদের গন্ধ পেয়েছিল। সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পাল্লাটা খোলা রেখেই অন্ধকারে পাগলের মত ছুটে পালিয়েছে…

কাল রাতে চাঁদ ছিল, মনে করিয়ে দিল ফারিহা। অন্ধকার ছিল না।

তা ঠিক, থ্যাংক ইউ। জ্যোৎস্নার মধ্যে পাগলের মত ছুটে পালিয়েছে। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে লোকটা যে জিনিস নিতে এসেছিল সেটা। তারপর লোকটা ঘরে ঢুকে যখন দেখল পাখি পালিয়েছে, জিনিসটার জন্যে সারা ঘর তছনছ করে ফেলল।

জিনিসটা কি?

এখনও জানি না। তবে খুব বড় কিংবা ভারী কিছু নয়। তাহলে নিয়ে ছুটে পালাতে পারত না।

কি জিনিস অনুমানও করতে পারো না? জিজ্ঞেস করল ফারিহা। কিশোরের বুদ্ধির ওপর ওর বড় বেশি আস্থা। তার ধারণা, ঠিকই অনুমান করে ফেলতে পারবে কিশোর।

ঘরে ঢুকে একটা জিনিস পেয়েছি, পকেট থেকে লাল দস্তানাটা বের করল কিশোর।

জিনিসটার দিকে তাকিয়ে রইল সবাই। টিটু এগিয়ে এসে শুঁকতে লাগল।

ফারিহা বলে উঠল, এ তো পুতুলের দস্তানা! নাকি কোন বাচ্চার?

প্রথমে ভেবেছিলাম হুবার কোন শিশুকে কিডন্যাপ করে এনেছে। পরে বাদ দিয়েছি সম্ভাবনাটা। বাড়িতে এমন কিছু পেলাম না যাতে বোঝা যায় ওখানে কয়েকদিন একটা বাচ্চাকে রাখা হয়েছিল। শুধুই এই দস্তানাটা।

দস্তানাটা নেড়েচেড়ে দেখল রবিন। ঝকঝকে পরিষ্কার। বছর দুয়েকের কারও হাতে লাগবে বড়জোর। ফারিহা, তোমার বড় পুতুলটা কোথায়? ওই যে, পাঁচ বছরের জন্মদিনে পেয়েছিলে?

বাক্সে ভরে রেখে দিয়েছে, মুসা বলল। ও আর এখন পুতুল নিয়ে খেলে না।

আনব? উঠে দাঁড়াল ফারিহা।

নিয়ে এসো, কিশোর বলল। ফারিহা বেরিয়ে গেলে মুসা আর রবিনের দিকে ফিরল, চুরি করে ঢুকেছিল যে লোকটা তার পায়ের ছাপ একে এনেছ তোমরা। কিন্তু হুবারের ছাপ আনলে না কেন?

হাসল মুসা। গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, এনেছি। তোমাকে দেখাতে ভুলে গিয়েছি। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ভাঁজ খুলল। ছাপগুলো ছোট। কেমন চ্যাপ্টা আর অস্পষ্ট।

নীরবে ছবিটা দেখল কিশোর। বেডরূম স্লিপার পরেই পালিয়েছে হুবার। দেখো, গোড়ালি নেই। জুতো পরারই যখন সময় পায়নি, আমার ধারণা, কাপড় বদলানোরও সময় পায়নি। তারমানে অতিরিক্ত তাড়াহুড়া।

হ্যাঁ, ছাপ দেখে আমারও মনে হয়েছে স্লিপার, একমত হলো মুসা।

পুতুল নিয়ে ঢুকল ফারিহা। অনেক বড়।

ওটার হাতে দস্তানাটা পরানোর চেষ্টা করল কিশোর। আপনমনে বলল, যদি কোন শিশুরও হয়ে থাকে এটা, সে তোমার এই পুতুলটার চেয়ে বড় নয়, ফারিহা। বুঝতে পারছি না, এই দস্তানটা ফেলে গেল কিভাবে লোকটা? জিনিসটা আবার পকেটে রেখে দিল সে। থাকগে, পরে ভেবে দেখব।

কাজের মেয়েটাকে দিয়ে মুসা আর ফারিহাকে ডেকে পাঠালেন মুসার আম্মা। দুপুরের খাওয়ার সময় হয়েছে।

উঠে দাঁড়াল কিশোর। আমরাও বাড়ি যাই। রবিন, যাবে না?

মাথা ঝাঁকাল রবিন।

 মুসা জানতে চাইল, আমাদের মীটিং আবার কখন বসছে?

বিকেল সাড়ে তিনটায়। অবশ্য যদি তোমার আম্মা তোমাদেরকে জোর করে শুইয়ে না রাখেন। হয়তো বলতে পারেন–সবে জ্বর থেকে উঠলে, রেস্ট নাও।

তোমাকেও তো তোমার চাচী আটকে রাখতে পারেন?

 পারবে না। পালিয়ে আসব।

 তাহলে আমরাও পালিয়ে আসব, বুক ফুলিয়ে বলল ফারিহা।

ওপর থেকে মিউ করে জানান দিল বেড়ালের বাচ্চাটা, আমার কথা ভুলে গেলে নাকি?

খউ খউ করে উঠল টিটু, যেন বলতে চাইল, আরে না, সবাই ভুললেও আমি ভুলিনি!

রবিন জিজ্ঞেস করল, এটার কি হবে?

কিছুই হবে না। আমি ওকে পুষব, ফারিহা বলল।

যদি মা আবার বকাবকি শুরু না করে, বলল মুসা।

মুসার আম্মা যে জন্তু-জানোয়ার দেখতে পানেন না, এ কথা সবাই জানে। রবিন বলল, করলে আর কি করব। আমি বাড়ি নিয়ে যাব। একটা বাচ্চাকে না খাইয়ে রেখে মেরে তো আর ফেলা যায় না।

.

০৪.

 বিকেলে আবার মীটিং বসল মুসাদের ছাউনিতে। মুসার আম্মা কিংবা মেরিচাচী কেউই বাধা দেননি। ফলে বাধ্য হয়ে শুয়ে থাকা লাগেনি ওদের। বেঁচেছে।

আলোচনা শুরু করল কিশোর, লোকটা কিভাবে কাল হবারের বাড়িতে ঢুকেছিল, জানি আমরা। কিন্তু কি করে বেরিয়ে গিয়েছিল, জানি না। কেউ কিছু অনুমান করতে পারো?

পারি, জবাব দিল মুসা, সোজা সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে চলে গেছে।

একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, চাঁদনী রাতে প্রচুর ছোটাছুটি করেছে দুজন লোক। একজন বেরিয়েছে সামনে দিয়ে, আরেকজন পেছন দিয়ে দেয়াল টপকে। সামনের দরজা খোলা রেখে গেছে কোন একজন। বাতাসে খুলে আর বন্ধ হয়ে বাড়ি লেগে শব্দ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভবনা আছে জেনেও সেই শব্দ কারও কানে যাওয়ার সভাবনাও বাদ দেয়া যায় না। এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, কার কানে গেছে সেই শব্দ।

কিভাবে? প্রশ্ন তুলল মুসা। জনে জনে গিয়ে তো আর জিজ্ঞেস করা যাবে না–এই মিয়া, তোমরা কি রাতের বেলা বিরাট পাওয়ালা এক লোক, আর নাইটগাউন পরা একজনকে লুকোচুরি খেলতে দেখেই? লোকে হাসবে না?

উপায় নেই, শান্তকণ্ঠে জবাব দিল কিশোর। জিজ্ঞেস না করলে জানব কি করে তবে তুমি যে ভাবে কলছ ওভাবে করব না। জিজ্ঞেসও করব বেছে বেছে।

কি জিজ্ঞেস করবে?

বলব আমার এক আঙ্কেল পম আছে, রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে হাঁটে। কাল রাতে বেরিয়ে গিয়েছিল। কোথায় গিয়েছিল, বলতে পারছে না। কেউ কি অচেনা কোন লোককে রাস্তায় হাঁটতে দেখেছ? কিংবা কোথাও যেতে দেখেছ তাকে?

তোমার আবার আসে পম এল কোত্থেকে?  

আছে। প্রয়োজনে শুধু পম নয়, আরেকজন আয়েস কমও এসে যাবে আমার। যার শখ, রাতের বেলা জোনাকি ধরা। কাল রাতে সেও বেরিয়েছিল জোনাকি ধরতে। তাকেও কেউ দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করব।

হাঁ হয়ে গেছে মুসা। তোমার এই আঙ্কেল পম আর বমের কথা তো কোনদিন আমাদের।

বলব কি? আমিও কি ছাই ওদের নাম শুনেছি নাকি? এইমাত্র বানিয়ে নিলাম। উদ্ভট কাণ্ডকারখানা করে তো দুজনেই। রাত দুপুরে যা খুশি করতে পারে। ওদের স্বভাবের কথা ব্যাখ্যা করে জিজ্ঞেস করলে লোকে আর হাসবে না।

হাসতে লাগল ফারিহা। নাম কি বানিয়েছ দুইধান, আহাহা! পম। বম। একজনকে নিশিতে পায়, আরেকজনের জোনাকি ধরার শখ। আসে কোধেকে তোমার মাথায় এ সব বুদ্ধি! হি-হি-হি-হি! হা-হা-হাহ!

মুসা আর রবিনও হাসছে।

মুসা বলল, তা তো বুঝলাম। কিন্তু জিজ্ঞেস করবে কাদের? সারা গায়েব সবাইকে করতে গেলে তো কয়েক মাস লেগে যাবে শুধু একটা প্রশ্নের জবাব। জানতেই।

সারা গাঁয়ের মানুষকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছে কে?

তাহলে?

নিশাচরদের জিজ্ঞেস করব।

এই তো শুরু হলো রহস্য করে কথা বলা!

আরি, সহজ করেই তো বললাম। নিশাচর মানুষদের চেনো না? চৌকিদার, চৌকিদার।

ওহ, জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। তাই বলো। ঠিক বলেছ। পড়লে ওদের চোখেই পড়তে পারে। রাতভর পাহারা দেয়। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই বলবে কেন?

বলবে, কারণ পম আর কম আমার চাচা।

তোমার চাচা। আমাদের তো নয়।

আমিই জিজ্ঞেস করব তাহলে। দিনের বেলা ওদের সাথে কথাই বলা যাবে না। সারারাত পাহারা দিয়ে দিনে ক্লান্ত হয়ে ঘুমায়। মেজাজ থাকে খারাপ। কথা জিজ্ঞেস করতে গেলে রেগে উঠতে পারে। তাই রাতেই দেখা করব। তখন তোমরা যেতে চাইলেও যেতে পারবে না। তোমাকে আর ফারিহাকে তো বেরোতে দেবেন না আন্টি, ভাল করেই জানি। জ্বর থেকে সরে উঠলে, ঠাণ্ডা লাগার ভয়েই বেরোতে দেবেন না। রবিনকেও বেরোতে দেবেন না ওর আম্মা। সে-ও জ্বর থেকে উঠেছে। বাকি রইলাম আমি আর টিটু। অতএব আমরাই বেরোব।

মেরিচাচী যদি বেরোতে না দেন?

চাচী আজ বাড়ি থাকবে না। রাতে একটা পার্টিতে চলে যাচ্ছে চাচা-চাচী দুজনেই। অতএব আমি ফ্রী।

 সত্যি, তোমার স্বাধীনতা দেখলে হিংসেই হয়! মুখ বিকৃত করে ফেলল মুসা, আমার মাটা যে কি! খালি পদে পদে বাগড়া!

রবিনের দিকে তাকাল কিশোর, রবিন, তোমাদের বাড়ি আর বারের বাড়ির মাঝখানের বাড়িটা কার?

কিটিদের।

বয়স?

আমাদেরই মত। কিছুটা বেশি হতে পারে।

করে কি?

স্কুলে পড়ে। পাখি দেখার শখ।

খাতির আছে তোমার সঙ্গে? নাহ, তেমন একটা নেই। দেখা হলে কেমন আছো, ভাল; বই নিয়ে দুচারটে কথা, এই পর্যন্ত। সে-ও বইয়ের পাগল। মাঝেমধ্যে আমার কাছে বই নিতে আসে। কেন?

যেহেতু হুবারের পাশের বাড়িতেই থাকে, তাকে গিয়েও জিজ্ঞেস করতে পারো গতরাতে কোন শব্দ শুনেছে কিনা, যেটা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। একটা ছুতো করে চলে যেতে পারবে না?

মাথা কাত করল রবিন। আজই পারব। একটা পাখির বই হাতে করে নিয়ে যাব। লোভে চকচক করতে থাকবে ওর চোখ, আমি জানি। পড়ার জন্যে পাগল হয়ে যাবে। দেব, তবে তার আগে কথা আদায় করে নেব যতটা পারা যায়।

চুটুস করে চুটকি বাজাল কিশোর, ভাল বুদ্ধি! ঠিক আছে, তাই কোরো। জেনে এসে আমাকে ফোন করে জানিয়ো।

.

০৫.

 বাড়ি ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। তাড়াহুড়া করে একটা বই বের করে নিয়ে পাশের বাড়িতে রওনা হলো রবিন। পাওয়া গেল কিটিকে। সে নিজেই দরজা খুলে দিল। অবাক হলো রবিনকে দেখে। আরি, কি ব্যাপার, তুমি! আজ সূর্য পশ্চিম দিকে উঠল নাকি? এসো, এসো।

সূর্য ঠিক দিকেই উঠেছে, হাতের বইটা দেখাল রবিন। সেদিন বাবা কিনে এনে দিল এটা। ভাবলাম, তোমার তো পাখি খু। পছন্দ, হয়তো পড়তে ইনটারেসটেড হবে।

লোভী ছেলে রসগোল্লার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকায় ঠিক সেই দৃষ্টি দেখা গেল কিটির চোখে। এসো, এসো, ঘরে এসো। আম্মা-আব্বা কেউ নেই বাড়িতে। চুটিয়ে গল্প করা যাবে। হাত বাড়াল, দেখি, বইটা?

ঘরে ঢুকেই বই খুলে বসল কিটি। ভঙ্গি দেখে মনে হলো চুটিয়ে গল্প করা বাদ দিয়ে এখন এই অবস্থায় যদি তাকে ফেলে যায় রবিন, তাহলেই খুশি হবে বেশি।

রবিন সেটা বুঝল। কিভাবে কথা শুরু করা যায় ভাবতে লাগল। সুযোগটা কিটিই তাকে করে দিল। বইয়ের একটা পাতা খুলে চিৎকার করে উঠল, আরে, পেঁচা? আর কি একখান ছবি দিয়েছে দেখো। দারুণ! র্দান্ত! ওই শোনো, পেঁচা ডাকছে। যেন বুঝতে পেরেছে আমি এখন ওর ছবি দেখছি। শুনতে পাচ্ছ?

কান পাতল রবিন। ডাকটা শুনতে পেল সে-ও! আজই প্রথম শুনলে? না কাল রাতেও শুনেছ?

রবিনের দিকে তাকাল কিটি। মাথা ঝাঁকাল। শুনেছি। জ্যোৎস্নায় ডানা ভাসিয়ে এসে বসল আমার জানালায়। মনে হলো যেন ওর সঙ্গে গিয়ে ইঁদুর ধরার দাওয়াত দিতে এসেছে আমাকে। কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে গেল। ওরা ডাকে খুব জোরে, কিন্তু ওড়ার সময় কোন শব্দ হয় না। ছায়ার মত ভেসে চলে যায়।

শব্দ করলে কি আর ইঁদুর বসে থাকত ধরা পড়ার জন্যে। ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ শুনলেই পালাত। আচ্ছা, যাই হোক, কটার সময় ডেকেছিল পেঁচাটা, মনে আছে?

অবাক হলো কিটি। কেন, তুমিও ওর ডাক শুনেছ নাকি? জবাবের অপেক্ষায় না থেকে চোখ আধবোজা করে ভাবতে লাগল, ডাকটা শুনেছি শুতে যাওয়ার ঠিক আগে। তখন বাজে দশটা। সাড়ে বারোটায় ঘুম ভেঙে গেল ওদের ডাকাডাকিতে। ওই সময়ই একটাকে দেখলাম জানালায় এসে বসতে। আস্তে করে বিছানা থেকে উঠে গেলাম ভালমত দেখার জন্যে।

তোমার বেডরূম কোনদিকে? আমাদের বাড়ির দিকে?

না, মিস্টার হুবারের। কাল রাতে চোর ঢুকেছিল ও বাড়িতে, জানো বোধহয়। কখন যে ঢুকল কে জানে। সাড়ে বারোটায় যখন জানালা দিয়ে তাকালাম, তখনও দেখি নিচতলায় আলো জ্বলছে। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করেন মিস্টার হবার। মাঝে মাঝে জানালার পর্দা টানা থাকে না। ওই সময় দেখেছি টেবিলের সামনে বসে কি যেন করছেন। কাল রাতে রেডিও চালানো ছিল তার। শব্দ শুনেছি।

সাড়ে বারোটার পর আর কোন পেঁচা ডাকতে শোননি? সারারাতই তো শোনার কথা। চাঁদের আলো ছিল। নিশ্চয় ইঁদুর ধরেছে।

শুনেছি। পেঁচারা জ্যোৎস্না খুব ভালবাসে। অনেক রাতে আরেকবার ঘুম ভেঙে গেল আরেকটা শব্দে। কিসের শব্দ বুঝলাম না। আলো জ্বেলে ঘড়ি দেখলাম। সোয়া তিনটে বাজে। কয়েকটা বাদামী পেঁচা আর কয়েকটা ছোট পেঁচা ডাকাডাকি শুরু করল। ঝগড়া বাধিয়েছে মনে হলো।

ওই সময়ও কি হুবারের বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখেছ?

দেখেছি। মজার ব্যাপার কি জানো, আলোটা দেখেছি রান্নাঘরে। ইলেকট্রিক আলো নয়। টর্চ কিংবা মোমবাতিটাতি হবে।

মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠছে রবিন, কিন্তু সেটা বুঝতে দিল না কিটিকে। রান্নাঘরে আলো জ্বেলেছে নিয়ে সেই লোকটা, যে জানালা ভেঙে ঢুকেছে।

কিসের শব্দে ঘুম ভাঙল, বুঝতে পারনি? ভেবে দেখো তো, কাঁচ ভাঙার শব্দ কিনা?

তা হতে পারে, ভুরু কুঁচকে রবিনের দিকে তাকাল কিটি। চোর ঢোকার কথা ভাবছ নাকি তুমি? শোনো, কাঁচ ভাঙার শব্দই নি, আর যেটাই নি, আমার তাতে কোন আগ্রহ নেই। রান্নাঘরে কিসের আলো দেখেছি তা নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই। তা ছাড়া ঠিক ঠিক দেখেছি কিনা তাও বলতে পারব না। ঘুমের ঘোরে ভুলও দেখে থাকতে পারি।

অনেক কথা বলে ফেলেছে কেবল রবিনের কাছ থেকে টা পড়তে পাওয়ার কৃতজ্ঞতায়! আর নয়। বইয়ের পাতায় মুখ নামাল খাবার কিট।

আর কথা বলতে চায় না ও, বুঝল রবিন। উঠে দাঁড়াল। অনেক জেনেছে। এতটা জানতে পারবে আশা করেনি।

গুডবাই, কিটি।

গুড-বাই, বই থেকে মুখ না তুনেই জবাব দিল ফিটি। বইটা কবে ফেরত দেবে না দেবে কিছুই বলল না।

রবিনও কিছু জিজ্ঞেস করল না। দরজার দিকে হাঁটা দিল।

বাড়ি ফিরেই ফোন করল কিশোরকে। সব কথা জানাল।

বাহ্, অনেক কথা জেনে এসেছ তো, খুশি হলো কিশোর। বোঝা যাচ্ছে, জানালার কাঁচ ভেঙে রাত তিনটের পর লোকটা ঢুকেছিল হুবারের রান্নাঘরে, এবং তারপরে ছুটে পালিয়েছে হুবার। হয়তো সঙ্গে করে নিয়ে গেছে সেই জিনিসটা, যেটার জন্যে লোকটা এসেছিল।

আরও দুচারটা কথা বলে, রবিনকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দিল কিশোর। চৌকিদারদের সঙ্গে কথা বলার জন্যে বেরোতে হবে তাকে।

Super User