০৬.

সর্বনাশ! কণ্ঠস্বরে মনে হল মিস ভারনিয়ার গলা চেপে ধরেছে যেন কেউ। হল কি?…আরে! আমার ছবিটা পড়ে গেছে।

 ছুটে গেল তিন গোয়েন্দা। মেঝেতে পড়ে আছে সোনালি ধাতব ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা বড়সড় ছবি। ছবিটা চিৎ করল কিশোর। মিস ভারনিয়ার সুন্দর একটা, ছবি, তরুণী ছিলেন তখন তিনি।

আমার বইয়ের ছবি আঁকত যে শিল্পী, বললেন লেখিকা, সে-ই এই ছবিটা এঁকে দিয়েছিল।

ছবিতে ঘাসের ওপর বসে বই পড়ছেন মিস ভারনিয়া, তাকে ঘিরে বসে আছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল, লেখিকার রত্নদানো, বামন, আর খাটোভূত।

ওপর দিকে তাকাল কিশোর। ছাতের হুক থেকে ঝুলছে একটা সরু শেকল, ওটাতেই ঝোলানো ছিল ছবিটা। কোন কারণে শেকল ছিঁড়ে পড়েছে, ফ্রেমের সঙ্গে লাগানো আছে শেকলের ছেঁড়া একটা অংশ।

ছেঁড়া মাথাটা ভালমত পরীক্ষা করল কিশোর, মুখের ভাব বদলে গেল। মিস ভারনিয়া, শেকলটা ছিঁড়ে পড়েনি। লোহাকাটা করাত দিয়ে কেটে রাখা হয়েছিল। এমনভাবে, যাতে ছবিটা ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বাতাসে বা অন্য কোনভাবে নাড়া লাগলেই খসে পড়ে।

বল কি! রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন লেখিকা। রত্নদানো! নিশ্চয় রত্নদানোর কাজ! যে-রাতে—ও, এখনও আসিনি সে-কথায়।

শেকল জোড়া লাগিয়ে আবার ঝুলিয়ে দিচ্ছি ছবিটা। কাজ করতে করতে আপনার কথা শুনব।—ও হ্যাঁ, প্লয়ার্স আছে?

আছে।

কিশোর আর মুসা শেকল জোড়া লাগাতে বসে গেল। মিস ভারনিয়া তাঁর। কাহিনী বলে গেলেন, নোট নিতে থাকল রবিন।

সে-রাতে ভাঁড়ারে আটকা পড়েছিলেন মিস ভারনিয়া। তাঁর ভাইপো এসে দরজার ছিটকিনি খুলে তাকে উদ্ধার করল। ফুফুর কাহিনী মন দিয়ে শুনল বুব, কিন্তু এক বিন্দু বিশ্বাস করল না। অবশেষে আস্তে করে বলল, কোন চোর-টোর ঢুকেছিল বাড়িতে, সেই দরজা আটকে দিয়েছে…

এক মিনিট, মিস ভারনিয়া, হাত তুলল কিশোর। ছবিটা আবার তুলে দিই, তারপর শুনব বাকিটা।

একটা চেয়ারে উঠে দাঁড়াল মুসা। ছবিটা তার হাতে তুলে দিল কিশোর। রবিন দেখল, হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে কিশোরের মুখ। এই উজ্জ্বলতার কারণ জানে নথি। নিশ্চয় কোন বুদ্ধি এসেছে গোয়েন্দাপ্রধানের মাথায়।

কি হল, কিশোর? কাছে গিয়ে মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রবিন।

শেকল জোড়া লাগিয়ে ছবিটা আবার আগের জায়গায় ঝুলিয়ে দিয়ে চেয়ার থেকে নেমে এল মুসা।

রবিনের দিকে চেয়ে হাসল কিশোর। মনে হয় গোল্ডেন বেল্ট রহস্যের কিনারা করে ফেলেছি, ফিসফিস করে বলল।

তাই। বল, বল! চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল রবিন। কি করে কোন্ পথে চুরি করল?

পরে, এখন বলার সময় না। মিস ভারনিয়ার কথা শেষ হয়নি এখনও, সেটা শুনি আগে।

হতাশ হল রবিন। জানে, এখন আর চাপাচাপি করে লাভ নেই। কিশোরের সময় না হলে সে কিছুই বলবে না। মিস ভারনিয়ার ছবিটার দিকে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করল কি করে চুরি হয়েছে গোল্ডেন বেল্ট, কিছুই বুঝতে না পেরে হাল ছেড়ে দিল। আবার গিয়ে আগের জায়গায় নোট লিখতে বসল।

ওর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে আমাকে রাতে থাকতে বলল বব, আবার শুরু করলেন মিস ভারনিয়া। রাজি হলাম না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল বব, রত্নদানোরা আর এল না। রহস্যজনক শব্দও হল না। শেষে চলে গেল সে। সে রাতে আর কিছুই ঘটল না। পরের রাতে আবার রহস্যময় শব্দ শুনলাম। একবার ভাবলাম, ববকে ফোন করি, কিন্তু আগের রাতে তার হাবভাব যে-রকম দেখেছি, আর ডাকতে ইচ্ছে হল না। পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম নিচের তলায়। লাইব্রেরিতে খুটখাট ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। গিয়ে উঁকি দিলাম। আমার সমস্ত বই মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো, কয়েকটা ছবি খুলে নিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে বইয়ের তূপের ওপর। যত রকমে সম্ভব, আমাকে বিরক্ত করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে যেন রত্নদানোরা। মনে হয়, ওই রাতেই শেকলটা করাত দিয়ে কেটেছে ওরা।

খুব দমে গেলাম। ববকে ফোন করলাম পরদিন সকালে। লাইব্রেরির অবস্থা দেখল সে, কিন্তু রত্নদানোরা করেছে, এটা কিছুতেই বিশ্বাস করল না। কায়দা করে বেশ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দোষটা আমার ওপরই চাপিয়ে দিল। ঘুমের ঘোরে আমি নিজেই নাকি লাইব্রেরিতে ঢুকে এই কাণ্ড করেছি। আমার মাথায় গোলমাল হয়েছে, আকারে-ইঙ্গিতে এ-কথাও বলল। কোন ভাল জায়গায় গিয়ে কদিন ভালমত বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিল। বিরক্ত হয়ে শেষে তাকে বকাটকা দিয়ে বের করে দিলাম। আমি জানি আমি কি করেছি, কি দেখেছি। আমি জানি, ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখিনি। কিন্তু এসবের মানে কি, কিছুই বুঝতে পারছি না! এক হাত দিয়ে আরেক হাত মুচড়ে ধরলেন মিস ভারনিয়া। কি মানে? কেন ঘটছে এসব? আমার ওপর রত্নদানোরা খেপে গেল কেন হঠাৎ?

প্রশ্নগুলোর জবাব মুসা আর রবিনও জানে না। অবিশ্বাস্য এক গাঁজাখুরি গল্প, কিন্তু মিস ভারনিয়া যে মিছে কথা বলছেন না, এটাও ঠিক, অন্তত তাদের তাই মনে হচ্ছে।

প্রশ্নগুলোর জবাব কিশোরেরও জানা নেই। অনেকক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, এখন আমাদের প্রথম কাজ, রত্নদানোর অস্তিত্ব সম্পর্কে শিওর হওয়া। কেন আপনাকে বিরক্ত করছে ওরা, সেটা পরে জানা যাবে।

বেশ, যা ভাল বোঝ কর, হাতের তালু দিয়ে তালু চেপে ধরলেন মিস ভারনিয়া।

ফাঁদ পাততে হবে ব্যাটাদের জন্যে, বলল কিশোর।

ফাঁদ? সামনে ঝুঁকল মুসা। কিসের ফাঁদ?

রত্নদানোদের জন্যে। আজ রাতটা আমরা যে-কেউ একজন এখানে কাটাব, রত্নদানো ধরার চেষ্টা করব।

কে থাকছে?

তুমিই থাক।

 দাঁড়াও! হাত তুলল মুসা। আমি টোপ হতে চাই না। রত্নদানো আছে বলে বিশ্বাস করি না, কিন্তু ঝুঁকি নেয়ারও ইচ্ছে নেই আমার।

কিন্তু তুমি থাকলেই ভাল হয়। তোমার গায়ে সিংহের জোর, একবার যদি আঁকড়ে ধরতে পার, রত্নদানোর সাধ্যি নেই ছাড়া পায়। তুমিই থাক, মুসা।

প্রশংসায় গলে গেল মুসা। তবু আমতা আমতা করল, কিন্তু একা…রবিন। থাকলে..

না না, আমি পারব না, তাড়াতাড়ি বলে উঠল রবিন। আজ রাতে আমার খালাম্মা বেড়াতে আসবে। আমাকে থাকতেই হবে বাড়িতে। কাজেই আমি বাদ।

তোমার তো আজ কোন কাজ নেই, কিশোর, বলল মুসা। আগামী কাল রোববার, ইয়ার্ড বন্ধ। কালও কোন কাজ নেই। তুমিই থাক না আমার সঙ্গে?

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। মাথা কাত করল। ঠিক আছে, থাকব। একজনের জায়গায় দুজন, বরং ভালই হবে। মিস ভারনিয়া, আমরা থাকলে। আপনার কোন অসুবিধে হবে?

না না, অসুবিধে কি? খুশিতে উজ্জ্বল হল লেখিকার মুখ। বরং ভালই। লাগবে। সিঁড়ির মাথায় একটা ঘর আছে, ওখানে থাকতে পারবে। তোমাদের খারাপ লাগবে কিনা সেটা বল। সাংঘাতিক কোন বিপদে না আবার পড়ে যাও।

রত্নদানোরা বিপদে ফেলবে বলে মনে হয় না, মাথা নাড়ল কিশোর। এ পর্যন্ত আপনার গায়ে হাত তোলেনি ওরা, দূর থেকেই ভয় দেখানর চেষ্টা করেছে শুধু। আমাদেরও ক্ষতি করবে বলে মনে হয় না। আজ রাতে ওদের একটাকে ধরার চেষ্টা করব! রাতের অন্ধকারে ফিরে এসে অপেক্ষা করব আমরা। বেরোব হৈ হট্টগোল করে, ফিরব চুপে চুপে, যাতে কেউ না দেখে।

ভাল বুদ্ধি! সায় দিলেন মিস ভারনিয়া। তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করব আমি। শুধু একবার বেল বাজাবে, গেটের তালা খুলে দেব।

হৈ-চৈ করে মিস ভারনিয়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। আড়াল থেকে তাদের ওপর কেউ চোখ রেখে থাকলে, সে নিশ্চয় দেখতে পেয়েছে।

গেটের বাইরে এসেই প্রশ্ন করল মুসা, কিশোর, সব কিছুই মহিলার অনুমান নয়ত?

জানি না, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল গোয়েন্দাপ্রধান। হতেও পারে। কিন্তু মহিলার ব্যবহারে মনে হল না, মাথায় কোন গোলমাল আছে। হয়ত সত্যিই রত্নদানোদের দেখেছেন!

দূরর! রত্নদানো থাকলে তো দেখবে?

থাকতেও পারে। লোকে তো বিশ্বাস করে!

লোকে তো ভূতও বিশ্বাস করে।

 জবাব দিল না কিশোর।

রবিন বলল, বিশ্বাস অনেক সময় সত্যিও হয়ে যায়। ১৯৩৮ সালে আফ্রিকার উপকূলে একটা আজব মাছ ধরা পড়েছিল। তার আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ওই মাছ। কোয়েলাকান্থ ওর নাম। একটা দুটো নয়, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোয়েলাকান্থ বেঁচে আছে আজও, ঘুরে বেড়াচ্ছে সাগরের তলায়। তাহলে? লেকচার দেয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে রবিন। ধর, অনেক অনেক বছর আগে হয়ত বামন মানুষেরা পৃথিবীতে রাজত্ব করত। তারপর একদিন এল লম্বা মানুষেরা, ওদের ভয়ে ছোট মানুষেরা গিয়ে। লুকাল মাটির তলায়। অনেকেই মরে গেল, কিন্তু কেউ কেউ মাটির তলায় বাস করাটা রপ্ত করে নিল। ব্যস, টিকে গেল ওরা। হয়ত কোয়েলাকান্থের মতই আজও টিকে আছে ওরা। তাদের নাম রত্নদানো কিংবা বামন কিংবা খাটোভূত হতে দোষ কি?

চমৎকার থিওরি, হাসল কিশোর। দেখা যাক, আজ রাতে রত্নদানো ধরা পড়ে কিনা। পৃথিবী-বিখ্যাত হয়ে যাব আমরা রাতারাতি।

পথে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে কেবল কিশোর।

অধৈর্য হয়ে উঠল মুসা। কী দাঁড়িয়ে আছ চুপচাপ! চল বাড়ি যাই। খিদে পেয়েছে।

তোমার পেটে রাক্ষস ঢুকেছে! সহকারীকে মৃদু ধমক দিল গোয়েন্দাপ্রধান! এস, আগে পুরো ব্লকটা ঘুরে দেখি। পাতাবাহার আর কাঠের বেড়া শুধু ভেতর থেকে দেখেছি, বাইরে থেকে একবার দেখি।

রত্নদানোরা কোন্ পথে বেরোয়, সেটা দেখতে চাইছ? রবিন বলল।

হা। তখন তাড়াহুড়োয় হয়ত চোখ এড়িয়ে গেছে। ভাল করে দেখলে পথটা পেয়েও যেতে পারি।

থিয়েটার-বাড়ির একপাশ থেকে শুরু করল ওরা। খিদের কথাটা আকারে ইঙ্গিতে আরেকবার জানাল মুসা। হেসে ফেলল কিশোর আর রবিন। শিগগিরই বাড়ি যাবে, কথা দিয়ে, কাজ শুরু করল কিশোর।

থিয়েটারের সদর দরজা তক্তা লাগিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। তার ওপর লাগানো হয়েছে কন্ট্রাকটরের সাইনবোর্ড। মোড় ঘুরে সরু গলিপথটায় এসে ঢুকল তিন গোয়েন্দা, মিস ভারনিয়ার বাড়ির পেছন দিয়ে যেটা গেছে সেটাতে। খানিক দূর এগিয়েই একপাশে একটা লোহার গেট পড়ল, থিয়েটার-বাড়ির পেছনের গেট। পাল্লা কয়েক ইঞ্চি ফাঁক হয়ে আছে, তারমানে খোলা। ভেতর থেকে হঠাৎ ভেসে এল মানুষের গলা।

আশ্চর্য তো! গেটের পাল্লায় লাগানো বোর্ডের দিকে চেয়ে আছে কিশোর। নোটিশ ঝুলিয়েছে বন্ধ, অথচ খোলা!

নিশ্চয় ভূতেরা কথা বলছে, বিড়বিড় করে বলল মুসা। নইলে এখানে মরতে আসবে কে? এই সময়?

সঙ্গীদের নিয়ে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল কিশোর। সিঁড়ি, তারপর আরেকটা দরজা। দরজার কপালে লেখা স্টেজডোর। রঙ চটে গেছে, কিন্তু পড়া যায়।

পাথরের সিঁড়িতে বসে পড়ল কিশোর। ভেতর থেকে আর কথা শোনা যায়। কিনা তার অপেক্ষা করছে। একবার খুলছে আবার বাঁধছে জুতোর ফিতে। দুজন মানুষের চাপা গলায় কথা শোনা গেল আবার।

শুনছ… শুরু করেই থেমে গেল মুসা।

শশশশ! ঠোঁটে আঙুল রাখল কিশোর। ফিসফিস করে বলল, গোল্ডেন বেল্ট শব্দটা বুঝতে পেরেছি!

গোল্ডেন বেল্ট! মানে… বলতে গিয়ে বাধা পেল রবিন।

আস্তে! কান খাড়া করে ঘরের ভেতরের কথা বোঝার চেষ্টা করছে কিশোর। মিউজিয়ম শব্দটাও শুনলাম!

ইয়াল্লা! ফিসফিস করল মুসা, চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। কি খুঁজতে এসে কি পেয়ে যাচ্ছি! পুলিশ ডেকে আনব নাকি?

ভালমত বুঝে নিই, তারপর ডাকা যাবে, উঠে গিয়ে দরজায় কান পাতল কিশোর।

 রবিন আর মুসাও এসে দাঁড়াল দরজার কাছে। আবার মিউজিয়ম শব্দটা বলা। হল, এবার শুনল তিনজনেই। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে দরজায় কান পাতল ওরা। পাল্লা ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে শুধু, ঠেলা লাগল, খুলে গেল হাঁ হয়ে। বেশি হেলে ছিল কিশোর, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে। পড়ার আগে মুসার কাপড় খামচে ধরে পতন। রোধের চেষ্টা করল, পারল তো না-ই, মুসার ভারসাম্যও নষ্ট করে দিল। গোয়েন্দা সহকারীও পড়ল, এবং পড়ল রবিনকে নিয়ে।

হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়ানর চেষ্টা করল ওরা। ঠিক এই সময় মুসা আর রবিনের কলার চেপে ধরল ভারি থাবা। চোর! গর্জে উঠল লোকটা। মিস্টার রবার্ট, চোর! কয়েকটা ছেলে ঢুকেছে চুরি করতে।

.

০৭.

 গাঁট্টাগোট্টা একজন লোক। কালো ঘন ভুরু। চোখ মুখ পাকিয়ে রেখেছে। কলার ধরে টেনে তুলল সে রবিন আর মুসাকে। ব্যাটারা! এইবার পেয়েছি! মিস্টার রবার্ট, আরেকটা রয়েছে! জলদি এসে ধরুন!

কিশোর, পালাও! চেঁচিয়ে বলল মুসা। বোরিসকে নিয়ে এস!

পালাল না কিশোর, দাঁড়িয়ে রইল। ভুল করছেন আপনি, নিরীহ গলায় লোকটাকে বলল সে। খালি বাড়িতে কথার আওয়াজ পেয়ে অবাক লাগল, তাই দেখতে এসেছি। আমরাই বরং ভেবেছি, চোর ঢুকেছে।

তাই, না? কড়া চোখে লোকটা তাকাল কিশোরের দিকে। চোর ঢুকেছে ভেবেছ?

যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না, এমনি চেহারা করে দাঁড়িয়ে রইল কিশোর।

আরেকজন এসে দাঁড়াল, রোগা শরীর, পাতলা চুল। আরে, বার্ট, কি করছ? খালি বাড়ি, তাই সন্দেহ হয়েছে ওদের। হতেই পারে।

ওদের ভাবসাব পছন্দ হচ্ছে না আমার, মিস্টার রবার্ট! বার্টের গলায় সন্দেহ।

আচ্ছা দাঁড়াও, আমি কথা বলছি, এগিয়ে এল দ্বিতীয় লোকটা। আমি জন রবার্ট। এই বাড়ির মালিক। ভাঙচুর চলছে, নতুন করে বাড়ি তৈরি করব, তাই মাঝে মাঝে দেখতে আসি। এ হল বার্ট ইঅং, আমার দারোয়ান। তা তোমাদের কেন সন্দেহ হল ভেতরে চোর ঢুকেছে?

গেটে তালা… শুরু করল কিশোর, কিন্তু তার কথার মাঝেই বলে উঠল মুসা, গোল্ডেন বেল্ট শব্দটা কানে এল! সন্দেহ জাগল আমাদের। আরও ভালমত কান পাতলাম, মিউজিয়ম শব্দটাও শুনলাম। ধরেই নিলাম বেল্ট চুরি করে এখানে ঢুকেছে। চোরেরা!

মিস্টার রবার্ট, গম্ভীর গলায় বলল ইঅং। ছেলেগুলোর মাথায় হয় গোলমাল আছে, নইলে চোর। আমি যাই, পুলিশ নিয়ে আসি।

থাম! ধমক দিল রবার্ট। তুমি কি বোঝ?…আচ্ছা, গোল্ডেন বেল্ট…! হঠাৎ কি মনে পড়ে যাওয়ায় হাসল সে। অ-অ, বুঝেছি! মনে পড়েছে। আমি আর বার্ট পরামর্শ করছিলাম থিয়েটারটা ভেঙে ফেলার আগেই গোল্ড অ্যাও গিল্টগুলো সরিয়ে ফেলব। সোনালি রঙ করা কিংবা গিলটি করা অনেক কারুকাজ, অনেক নকশা রয়েছে এখানে, একেবারে মিউজিয়মের মত মনে হয়। গোল্ড অ্যাণ্ড গিল্টকেই তোমরা গোল্ডেন বেল্ট শুনেছ। বুঝতে পারছি, গোল্ডেন বেল্ট চুরির ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছ তোমরা। হাসল সে।

গোমড়া মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ইঅং। খুব বেশি কল্পনা করে বিচ্ছুগুলো।

  তোমার কি? কড়া গলায় বলল রবার্ট। খাও আর ঘুমাও। কল্পনা করবে কখন? কোন কিছু তোমাকে নাড়া দেয় নাকি? এই যে গত কয়েক রাতে কি সব শব্দ হল, ভয়ে পালাল দুজন নাইট গার্ড, কেন কি হল, একবারও ভেবেছ?

শব্দ? আগ্রহী হয়ে উঠল কিশোর। কেমন শব্দ?

কি জানি! ওরা বলল, ভূতে নাকি দরজায় টোকা দেয়, গোঙায়, বলল রবার্ট। আসলে, বাড়িটা পুরানো, ঢুকলে এমনিতেই গা ছমছম করে। অন্ধকারে নানারকম শব্দ হয়। কেন হয় দেখতে চাও? এস আমার সঙ্গে। গোল্ড অ্যাণ্ড গিল্টও দেখতে পাবে। দেখবে?

তিনজনই বলল, দেখবে।

বার্ট, মেইন লাইনটা দিয়ে দাও তো। এস, তোমরা আমার সঙ্গে এস। আগে। আগে অন্ধকার একটা গলি ধরে এগোল রবার্ট। পেছনে অনুসরণ করল ছেলেরা।

অন্ধকারে কিছু একটা রবিনের গাল ছুঁয়ে গেল, চেঁচিয়ে উঠল সে, বাদুড়!

হ্যাঁ, অন্ধকার থেকে ভেসে এল রবার্টের গলা। অনেক বছর খালি পড়ে আছে বাড়িটা। বাদুড় আর ইঁদুরের আড়া! ওরাই রহস্যময় শব্দ করে। একেকটা ইঁদুর যা বড় না, বেড়াল খেয়ে ফেলতে পারবে!

ঢোক গিলল রবিন, চুপ করে রইল। অসংখ্য বাদুড়ের ডানা ঝাঁপটানর শব্দ কানে আসছে। মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ কিচকিচ আওয়াজ হচ্ছে, শিরশির করে ওঠে গা।

হঠাৎ গ ই-ই-চ করে উঠল কিসে যেন। চমকে উঠল ছেলেরা।

ভয় পাচ্ছ? অন্ধকারেই বলল রবার্ট। ও কিছু না। পর্দা টানার জন্যে, নানারকম সিনসিনারির ছবি ঝোলানর জন্যে পুলি আর মোটা দড়ি ব্যবহার হত, ছিঁড়ে গেছে বেশির ভাগই, পুলিতে মরচে পড়েছে। দড়িগুলোতে বাদুড় ঝুললেই টান পড়ে, বিচিত্র শব্দ হয়।…অহ, এতক্ষণে আলো জ্বলল।

মাথার ওপর বিশাল এক ঝাড়বাতি জ্বলে উঠেছে, সবুজ, লাল, হলুদ আর নীল কাঁচের ফানুসগুলোতে বালি যেন লেপটে রয়েছে। এমনিতেই কম পাওয়ারের বাল্ব। ওগুলোর ভেতরে, তার ওপর বালিতে ঢাকা পড়ায় আলো তেমন ছড়াচ্ছে না। অদ্ভুত এক রঙিন আলো-আঁধারির সৃষ্টি হয়েছে হলের ভেতরে। আবছামত দেখা যাচ্ছে। ঘরের জিনিসপত্র। এক প্রান্তে মস্তবড় মঞ্চ। চারপাশে শুধু সিট আর সিট। বিরাট থিয়েটার ছিল এককালে।

হলের দুপাশের দেয়ালে বড় বড় জানালা, তাতে সোনালি সুতোয় নকশা করা লাল মখমলের ভারি পর্দা ঝুলছে। দেয়ালে দেয়ালে নানা রকমের চিত্র, নাইট আর সারাসেনদের লড়াইয়ের দৃশ্য, যোদ্ধাদের পরনে সোনালি বর্ম। ঠিকই বলেছে রবার্ট, গোল্ড অ্যাণ্ড গিল্ট-এর ছড়াছড়ি। হলের ভেতরের পরিবেশও মিউজিয়মের মত।

উনিশশো বিশ সালে তৈরি হয়েছিল এই থিয়েটার, বলল রবার্ট। মূরেরা তৈরি করেছিল। এ-ধরনের জাকজমক তখন পছন্দ করত লোকে। বাইরে থেকে দেখেছ না, কেমন দুর্গদুর্গ লাগে? এটাও তখনকার দর্শকদের পছন্দ ছিল। আজকাল তো এসব জায়গায় লোকে ঢুকতেই চাইবে না, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে!

ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরল রবার্ট। হঠাৎ একটা চেয়ারের হাতলে লাফিয়ে উঠল কালচে-ধূসর রোমশ একটা জীব, ছোটখাট একটা বেড়াল বললেই চলে।

আমাদের একজন বাসিন্দা, ইঁদুরটাকে দেখে হেসে বলল রবার্ট। অনেক বছর ধরে বাস করছে, তাড়াতে বহুত কষ্ট হবে।

আগের ঘরটায় ফিরে এল ওরা। তারপর, মূরিশ থিয়েটারের ভেতর তো দেখলে। বাড়িটা ভাঙা হবে যেদিন, সেদিন এস। সে এক দেখার ব্যাপার। কয়েক হপ্তার মধ্যেই ভাঙব। গুডবাই, অ্য।

 ছেলেরা বাইরে বেরোতেই পেছনে বন্ধ করে দেয়া হল দরজা। ছিটকিনি তুলে দেয়ার শব্দ কানে এল ওদের।

বাপরে বাপ! ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল মুসা। কি একেকখান ইঁদুর! বেড়াল কি, হাতিও খেয়ে ফেলবে! এ-জন্যেই পালিয়েছে নাইট গার্ডরা।

হ্যাঁ, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। রহস্যময় শব্দের ভালই ব্যাখ্যা। গোল্ডেন বেল্ট আর মিউজিয়মের ব্যাপারটাও বেশ ভালই বোঝানো হয়েছে! জিভ আর টাকরার সাহায্যে বিচিত্র শব্দ করল গোয়েন্দাপ্রধান। কিন্তু যাকগে, ওটা আমাদের কাজ নয়। আমরা এসেছি মিস ভারনিয়াকে সাহায্য করতে। চল, দেখাদেখির কাজটা শেষ করে ফেলি।

গলিটা দেখল ওরা, ইটের দেয়াল আর কাঠের বেড়া পরীক্ষা করল, পাতাবাহারের বেড়ার প্রতিটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখল! রত্নদানো বেরোনর কোন পথই নেই।

নাহ, কিছু পাওয়া গেল না! নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করেছে কিশোর। বুঝতে পারছি না!

এখন বোঝা যাবেও না! মুখ বাকাল মুসা। খিদেয় পেট জ্বলছে, বাড়ি যাবে নাকি তাই বল?

হ্যাঁ, এখানে এখন আর কিছু করার নেই। চল, যাই।

গভীর মনোযোগে খবরের কাগজ পড়ছে বোরিস। ছেলেরা গাদাগাদি করে। বসল তার পাশে। কাগজটা ভাজ করে রেখে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল সে।

বড় রাস্তায় এসে উঠল ট্রাক, ছুটে চলল দ্রুতগতিতে।

একটা প্রশ্ন কেবলই খোঁচাচ্ছে রবিনকে। গোল্ডেন বেল্ট কি করে চুরি হয়েছে? কিশোরকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেল রবিন। গভীর চিন্তায় মগ্ন গোয়েন্দাপ্রধান। নিচের ঠোঁটে চিমটি কেটে চলেছে ঘনঘন। এখন তাকে প্রশ্ন। করলেও জবাব পাওয়া যাবে না।

অগত্যা কৌতূহল চেপে চুপ করে রইল রবিন।

.

০৮.

 রকি বীচে পৌঁছুল ট্রাক। স্যালভিজ ইয়ার্ডে ঢুকল।

ট্রাক থেকে সবার আগে নামল মুসা। এক্ষুণি বাড়ি যেতে হবে আমাকে। ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ বাবার জন্মদিন। স্পেশাল খাবার রাঁধবে মা।

ঠিক আটটায় আসবে, বলল কিশোর। বাড়িতে বলে এস, মিস্টার। ক্রিস্টোফারের এক বান্ধবীর বাড়িতে রাতে থাকবে। আগামীকাল সকাল নাগাদ। ফিরবে।

ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল মুসা। ট্রাক থেকে কিশোরকে নামতে দেখে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন মেরিচাচী।

এই যে, কিশোর, এসেছিস, বললেন চাচী। আধঘণ্টা ধরে তোর সঙ্গে দেখা করার জন্যে ছেলেটা বসে আছে।

আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে! কে, চাচী?

নাম বলল মিরো মুচামারু। জাপানী, কিন্তু ভাল ইংরেজি বলে। কত কথা বলল আমাকে। মুক্তার কথা বলল। ট্রেনিং দেয়া ঝিনুক নাকি আছে, মুক্তা ফলানতে। কাজে লাগে ওগুলো। আরও কত কথা! হাসলেন মেরিচাচী।

মনে মনে কিশোর হাসল। ইয়ার্ডের কাজ করার সময় চাচীর এই হাসি কোথায় থাকে, ভেবে অবাক হল সে। কই, চল তো দেখি? রবিন, এস। হাঁটতে হাঁটতে বলল সে, চাচী, আজ রাতে মিস ভারনিয়ার বাড়িতে থাকতে হবে। কি সব শব্দ নাকি রাতে বিরক্ত করে মহিলাকে। আমি আর মুসা আজ রাতে পাহারা দেব। ঠিক করেছি।

তাই নাকি! কিশোরকে অবাক করে দিয়ে এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। চাচী। ঠিক আছে, যাস। বোরিসকে ছেড়ে দিস, সকালে গিয়ে নিয়ে আসবে আবার। কাঁচে ঘেরা অফিসের সামনে এসে ডাক দিলেন তিনি, মিরো, কিশোর এসেছে। এই, রবিন, না খেয়ে যেয়ো না কিন্তু। আধঘণ্টার মধ্যেই হয়ে যাবে। হ্যাঁ রে, কিশোর, মুসাকে দেখছি না?

ওর বাবার জন্মদিন, ভাল রান্নাবান্নার ব্যবস্থা, ও কি আর থাকে? হেসে বলল কিশোর।

পাগল ছেলে! সস্নেহ হাসি ফুটল চাচীর মুখে। ও হ্যাঁ, মিরোকেও ধরে রাখিস। খেয়ে যাবে এখানেই। বাড়ির দিকে রওনা হলেন তিনি।

মেরিচাচীর ডাক শুনে দরজায় বেরিয়ে এল এক কিশোর। লম্বায় রবিনের সমান হবে। পরনে নিখুঁত ছাঁটের নীল সুট, গলায় নীল টাই। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। খাটো করে ছাটা চুল।

এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল মিরো। তুমি নিশ্চয় কিশোর-স্যান? কথায় জাপানী টান স্পষ্ট। আর তুমি রবিন-স্যান? আমি মিরো, টোহা মুচামারুর ছেলে। আমার বাবা সুকিমিচি জুয়েলারস কোম্পানির সিকিউরিটি ইনচার্জ।

হ্যাল্লো, মিরো, জোরে মিরোর হাত ঝাঁকিয়ে দিল কিশোর। গতকাল পরিচয়। হয়েছে তোমার বাবার সঙ্গে।

জানি, লজ্জিত হাসি হাসল মিরো। তোমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেনি। বাবা, এ-ও জানি। কিছু মনে কোরো না, বাবার তখন মাথা ঠিক ছিল না, কি বলতে কি বলে ফেলেছে। তার হয়ে তোমাদের কাছে মাফ চাইতে এসেছি!

আরে দূর, কি যে বল? তাড়াতাড়ি বলল রবিন। যা অবস্থা ছিল তখন, মাথার ঠিক থাকে নাকি মানুষের? এতবড় দায়িত্ব, এত টাকার ব্যাপার। তাছাড়া আমাদের বয়েস কম, রত্নচোরের পেছনে লাগতে পারব বলে ভাবেননি আর কি। এখন বললেও অবশ্য কেসটা আর নিতে পারব না। অন্য একটা কাজ নিয়ে। ফেলেছি, রত্নদানো ধরার কাজ।

রত্নদানো! বড় বড় হয়ে গেল মিরোর চোখ। ওই যে বামন মানুষেরা, যারা সুড়ঙ্গে বাস করে, আর মাটির তলায় গুপ্তধন খুঁজে বেড়ায়? জাপানেও ওদের কথা জানে লোক। খবরদার, বেশি কাছাকাছি যেয়ো না! ভয়ঙ্কর জীব ওরা। বিপদে ফেলে দেবে।

বিপদে ফেলুক আর যা-ই করুক, আজ রাতে একটাকে ধরার চেষ্টা করব, কিশোর বলল। দাঁড়িয়ে কেন, চল বসি। চা খাবে?

খেয়েছি, আবার অফিসে ঢুকল মিরো কিশোরের পিছু পিছু।

আচ্ছা, আমাদের নাম জানলে কি করে? বসতে বসতে বলল কিশোর। ঠিকানা পেলে কোথায়?

পকেট থেকে একটা কার্ড বের করল মিরো। দলে মুচড়ে গিয়েছিল কার্ডটা, টেনেটুনে আবার ঠিক করা হয়েছে। মিউজিয়মে কুড়িয়ে পেয়েছি এটা। আর ঠিকানা? এ-শহরে তো তোমরা পরিচিত। প্রথম যে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে-ই বলে দিল।

কপাল ভাল, শুঁটকির পাল্লায় পড়নি, হেসে বলল রবিন।

শুঁটকি? মিরো অবাক।

একটা ছেলে, আমাদের দেখতে পারে না, প্রসঙ্গটা চাপা দিয়ে দিল কিশোর। হ্যাঁ, মিরো, গোল্ডেন বেল্ট খুঁজে পাওয়া গেছে?

না, কিশোর-স্যান, হতাশভাবে মাথা নাড়ল মিরো। এত খুঁজল পুলিশ আর আমাদের গার্ডরা, লাভ হল না। খুব মুষড়ে পড়েছে বাবা। তার নাকের ডগা দিয়ে বেল্ট চুরি করে নিয়ে গেল চোর, কিছুই করতে পারল না, এই দুঃখেই কাতর হয়ে পড়েছে। বেল্টটা না পাওয়া গেলে তার চাকরি থাকবে না, লজ্জা তো আছেই।

কিছু একটা বলা দরকার, কিন্তু কথা খুঁজে পেল না রবিন।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হঠাৎ বলল, যা যা জেনেছ, সব খুলে বল তো মিরো।

নতুন তেমন কিছুই জানার নেই, খবরের কাগজে প্রায় সবই জেনেছে কিশোর। আবার সে-সবই শুনল মিরোর মুখে। কোন্ পথে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গোল্ডেন বেল্ট, জানা যায়নি। রেইনবোঁ জুয়েলস না নিয়ে কেন বেল্টটা নিল, এটাও একটা বড় রহস্য। পুরানো কথা সব।

আমার ধারণা, গার্ডদের কেউই চুরি করেছে, বলল রবিন।

মনে হয় না, মাথা নাড়ল মিরো। অনেক বেছে, দেখে শুনে তবে নেয়া হয়েছে গার্ড। প্রত্যেকেই বিশ্বাসী। তবু সবার সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলেছে বাবা। কাউকেই সন্দেহ হয়নি তার।

আচ্ছা, মিস্টার মার্চের খবর কি? জিজ্ঞেস করল কিশোর। তার সম্পর্কে কি জেনেছে পুলিশ।

মিরো জানাল, পুলিশের দৃঢ় ধারণা ছিল, বেল্ট চুরির সঙ্গে মার্চও জড়িত। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে তারা। প্রশ্ন, তাহলে মিউজিয়মে সেই অভিনয় কেন করল মার্চ? স্রেফ টাকার জন্যে। চুরির আগের দিন নাকি ফোনে এক মহিলা যোগাযোগ করেছে তার সঙ্গে (মহিলাকে চেনে না অভিনেতা, দেখেনি), বলেছে ছোট্ট একটা অভিনয়ের জন্যে পঞ্চাশ ডলার দেয়া হবে মার্চকে। লোভ দেখিয়েছে, এতে টাকা তো পাবেই অভিনেতা, তার নামও ছড়িয়ে পড়বে হলিউডে। পত্রিকায় ছবি ছাপা হবে তার নাম ছাপা হবে। এরপর নাকি একটা ছবি করবে। মহিলার স্বামী, ছবির নাম হবে দ্য গ্রেট মিউজিয়ম রবারি। সেই ছবিতে অভিনয়ের। সুযোগ দেয়া হবে মার্চকে। ব্যস, মজে গেল অভিনেতা। রাজি হয়ে গেল মিউজিয়মে। ছোট্ট অভিনয়টুকু করতে। সেদিনই ডাকে তার কাছে এল ছোট্ট একটা প্যাকেট, তাতে একটা নকল পাথর, আর একটা খামে পঞ্চাশ ডলার।

যা ভেবেছি, বলল কিশোর। বেল্ট চুরির সঙ্গে জড়িত নয় টোড মার্চ। কি। করে কোন্ পথে বেল্টটা নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এখনও বুঝতে পারছে না পুলিশ, না?

না, পারছে না।

যদি বলি, বেল্টটা এখনও মিউজিয়মেই রয়েছে, বোম ফাটাল যেন কিশোর।

 মিউজিয়মে! চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

কিন্তু মিউজিয়মের তো কোথাও খোঁজা বাদ নেই! প্রতিবাদ করল মিরো। বেল্ট লুকানর আর জায়গা কোথায়, কিশোর-স্যান?

আজ আরেকটা কেস নিয়ে কাজ করতে করতে হঠাৎ বুঝে গেলাম কোথায় আছে গোল্ডেন বেল্ট। আমার ধারণা— নাটকীয়ভাবে চুপ করল কিশোর।

রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে রবিন আর মিরো।

 রবিন, কিশোর বলল। মিস ভারনিয়ার বাড়িতে যে ছবিটা পড়ে গিয়েছিল…

হ্যাঁ। বল।

বড়সড় ভারি ছবি, যেন রবিন দেখেনি, তাকে ছবিটা কেমন বোঝাচ্ছে কিশোর, ধরে তুললাম। প্রায় আড়াই ইঞ্চি মত মোটা ফ্রেম, ছবির পেছনে জায়গা রয়েছে অন্তত দুই ইঞ্চি। ওই রকম ফ্রেম কিংবা তার চেয়েও বড় অনেক ফ্রেমে বাঁধাই ছবি ঝোলানো রয়েছে মিউজিয়মে। তারমানে…

তারমানে, চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ছবির পেছনের ওই খালি জায়গায় গোল্ডেন বেল্ট লুকিয়ে রাখা হয়েছে! অন্ধকারে বেল্টটা তুলে নিয়ে ওখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে চোর!

চোরেরা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, বলল কিশোর। মিস্টার মার্চকে ফোন করেছিল যে মহিলা, চোরের সঙ্গে সে-ও নিশ্চয় জড়িত।

আর শোনার অপেক্ষা করল না মিরো, লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। সারা মিউজিয়ম খুঁজেছে ওরা, কিন্তু ছবির পেছনে খুঁজে দেখার কথা মনে আসেনি কারও! এখুনি গিয়ে বাবাকে বলছি।

উত্তেজনা কমার অপেক্ষায় থাকবে চোর, মিরোর কথা যেন শোনেইনি কিশোর। তল্পিতল্পা গুছিয়ে একদিন সুকিমিচি কোম্পানি চলে যাবে, তখন সময় বুঝে গিয়ে বেল্টটা নিয়ে আসবে। ও হ্যাঁ, তোমার বাবাকে বল, ব্যালকনিতে ঝোলানো ছবিও যাতে বাদ না দেয়।

কিন্তু ব্যালকনিতে ওঠার পথ তো বন্ধু!

তাতে কি? একটা দড়ি হলেই উঠে যাওয়া যায় ওখানে। লুকানর সবচেয়ে ভাল জায়গা সারা মিউজিয়মে।

থ্যাঙ্ক ইউ, কিশোর-স্যান! জ্বলজ্বল করছে মিরোর চোখ। তোমার অনুমান ঠিকই হবে! আমি যাই, বাবাকে গিয়ে বলি।

আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, হাত তুলল কিশোর। চাচী খেয়ে যেতে বলেছে।

আজ না, ভাই, আরেকদিন। আমি চলি, আর দাঁড়াল না মিরো। প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল ইয়ার্ড থেকে।

কিশোরের দিকে চেয়ে হাসল রবিন। গোল্ডেন বেল্ট রহস্য ভেদ হয়ে গেল। আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাড়িয়ে দিল তো, এখন লজ্জা পাবেন মিস্টার মুচামারু।

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। আরও একটা ব্যাপার হতে পারে, আপনমনেই বলল সে। কিন্তু—নাহ্, সেটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেল্টটা বের করে নিয়ে যাওয়া হয়নি, তারমানে ভেতরেই আছে এখনও। তাহলে ছবির পেছনে ছাড়া লুকিয়ে রাখার আর জায়গা কোথায়?

আছে, ছবির পেছনেই, বলল রবিন।

কাল সকালেই জানা যাবে, নিশ্চিত হতে পারছে না যেন কিশোর। এখন চল, খেয়ে নিই। তুমি খেয়ে বাড়ি চলে যাও, আমাকে কিছু জিনিসপত্র গোছাতে হবে। রত্নদানো ধরতে দরকার হবে। মুসা এলে তাকে নিয়ে মিস ভারনিয়ার। বাড়িতে চলে যাব। কি হল না হল সকালে ফোনে জানাব তোমাকে। ফোনের কাছাকাছি থেক। আমি ফোন করলে পরে বোরিসকে নিয়ে আমাদের আনতে। যেয়ো।

ঠিক আছে, মাথা কাত করল রবিন। আচ্ছা, সত্যিই কি রত্নদানো আছে? নাকি ওসব মহিলার অতিকল্পনা? হয়ত ববের কথাই ঠিক, নিশিডাকে পায় তাকে।

অসম্ভব নয়। ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত সব কাণ্ড করে বসে মানুষ। এক ভদ্রলোকের কথা জানি, কয়েকটা মুক্তো নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকত। খালি ভাবত, গেল বুঝি চুরি হয়ে। শেষে, এক রাতে উঠে সেফ থেকে মুক্তোগুলো বের করে লুকিয়ে রাখল আরেক জায়গায়, ঘুমের ঘোরে। সকালে উঠে সেফে ওগুলো না দেখে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। রাতে নিজেই যে সরিয়েছে, কিছুতেই মনে করতে পারল না। আরেক রাতে ঘুমের ঘোরেই মুক্তোগুলো বের করে এনে সেফে আগের জায়গায়। রেখে দিল আবার। এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, মিস ভারনিয়াও তেমন কিছু করে থাকতে পারেন। আজ রাতেই সেটা বুঝব। যদি সত্যিই, রবিনের দিকে চেয়ে হাসল গোয়েন্দাপ্রধান, রত্নদানো আসে, তিন গোয়েন্দার ফাঁদে ধরা পড়তেই হবে তাকে।

.

০৯.

খুব ব্যস্ত রত্নদানোরা, গাঁইতি দিয়ে সমানে মাটি কুপিয়ে চলেছে, সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় রয়েছে খুদে মানুষগুলো, আবছা দেখতে পাচ্ছে রবিন। দ্রুত মনস্থির করে নিয়ে পা টিপে টিপে ওদের দিকে এগোল সে। কেবলই মনে হচ্ছে, ইস, মুসা আর কিশোর যদি থাকত সঙ্গে! সুড়ঙ্গের বেশি গভীরে যেতে সাহস হচ্ছে না তার, কিন্তু এতখানি এসে ফিরেও যেতে চাইছে না।

বুকের ভেতরে জোরে জোরে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা, রবিনের ভয় হচ্ছে, রত্নদানোদের কানে চলে যাবে ধুকপুক শব্দ। কিন্তু থামল না সে। হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। রত্নদানোরা তার দিকে পেছন করে মাটি খোঁড়ায় ব্যস্ত।

শুকনো সুড়ঙ্গ, গাঁইতির ঘায়ে ধুলো উড়ছে, নাকে মুখে ঢুকে যাচ্ছে। হাঁচি পেল রবিনের। চেপেচুপে রাখার চেষ্টা করল, পারল না, হ্যাচচো করে উঠল।

ধীরগতি ছায়াছবির মত যেন ধীরে ধীরে ঘুরল সবকটা রত্নদানো, কোপ মারার। ভঙ্গিতে তুলে ধরেছে গাঁইতি।

ছোটার চেষ্টা করল রবিন। কিন্তু আঠা দিয়ে তার হাত-পা মাটিতে সেঁটে দেয়া হয়েছে যেন, এক চুল নড়াতে পারল না। চেঁচানর চেষ্টা করল, কিন্তু আওয়াজ বেরোল না গলা দিয়ে।

লাল টকটকে চোখ মেলে নীরবে চেয়ে আছে রত্নদানোরা। এই সময়ে রবিনের কানে এল একটা শব্দ। গায়ে মোলায়েম স্পর্শ। আবার ছুটে পালানর চেষ্টা করল। সে, এবারেও ব্যর্থ হল।

কাঁধ চেপে ধরল শক্ত আঙুল, জোরে ঝাঁকুনি দিল। ডাক শোনা গেল, রবিন! এই, রবিন! এমন করছিস কেন?

ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়ে গেল রত্নদানোরা। মিলিয়ে গেল সুড়ঙ্গ। নড়েচড়ে উঠল রবিন, চেঁচাল, ছেড়ে দাও! আমাকে ছেড়ে দাও!

এই, রবিন, ওঠ, চোখ মেল!

আস্তে করে চোখ মেলল রবিন। পাশে দাঁড়িয়ে তার মা।

দুঃস্বপ্ন দেখছিলি? মা বললেন। ঘুমের মধ্যে এমন সব শব্দ করছিলি, যেন গলা টিপে ধরেছে কেউ। ওঠ, বারান্দায় খানিক হেঁটে আয়।

হ্যাঁ, মা, একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। জাগিয়ে দিয়ে ভাল করেছ। মা, কিশোর ফোন করেছিল?

কিশোর? এত রাতে ও ফোন করতে যাবে কেন? যা, বারান্দা থেকে হেঁটে এসে শুয়ে পড়। রাতদুপুর এখন।

হাঁটতে হবে না।

 তাহলে আবার তো দুঃস্বপ্ন দেখবি।

দেখব না, পাশ ফিরে কোলবালিশটা টেনে নিল রবিন।

মুসা আর কিশোরের কথা ভাবল, ওরা এখন কি করছে?

.

লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলীর দিকে ছুটে চলেছে ট্রাক। বোরিস চালাচ্ছে। পাশে বসেছে কিশোর আর মুসা।

রত্নদানো ধরার জন্যে কি কি যন্ত্রপাতি এনেছে, মুসাকে এক এক করে দেখাচ্ছে কিশোর। এই যে ক্যামেরা, স্পেশাল ক্যামেরা, দশ সেকেণ্ডেই ছবি তৈরি হয়ে যায়। ভাঙা অবস্থায় কিনেছিলাম একটা ছেলের কাছ থেকে, টুকটাক যন্ত্র লাগিয়ে সারিয়ে নিয়েছি। চমৎকার কাজ দেয় এখন। এই যে, ফ্ল্যাশগানও রয়েছে। রত্নদানো এলেই টুক করে ছবি তুলে নেব আগে। ক্যামেরাটা রেখে ব্যাগ থেকে দুজোড়া দস্তানা বের করল। ওগুলোর তালুর কাছে চামড়া লাগানো। দানো ব্যাটাদের আঁকড়ে ধরার জন্যে, পিছলে ছুটে যেতে পারবে না। ব্যাটাদের হাতে লম্বা চোখা নখ থাকার কথা, খামছি দিলেও এই দস্তানার জন্যে লাগাতে পারবে না।

সেরেছে! চোখ বড় বড় হয়ে গেছে মুসার। রত্নদানো আসবে, ধরেই নিয়েছ মনে হচ্ছে?

আগে থেকেই তৈরি থাকা ভাল। টর্চ এনেছি, আর এই যে দড়ি, নাইলনের, ভীষণ শক্ত। দানো ব্যাটাদের ধরে বাঁধলে ছিঁড়তে পারবে না।

দড়ি আর দস্তানা রেখে একটা ওয়াকি-টকি বের করল কিশোর। রেঞ্জ কম। যন্ত্রটার, কিন্তু দরকারের সময় খুব কাজে লাগে। যোগাযোগ রাখায় খুব সুবিধে। ওটা রেখে টেপ-রেকর্ডার বের করে দেখাল মুসাকে। রত্নদানোরা কোনরকম শব্দ। করলে, সেটা রেকর্ড করবে।

যন্ত্রপাতির ব্যাগটার দিকে চেয়ে আপনমনেই মাথা নাড়ল কিশোর। সবই এনেছি। আর কিছু বাকি নেই। ও হ্যাঁ, মুসা, চক এনেছ?

পকেট থেকে নীল চক বের করে দেখাল মুসা। কিশোর এনেছে সাদা চক।

না, আর কিছু বাকি নেই, খুশি হয়ে বলল কিশোর। টুথব্রাশ এনেছ?

পাশে রাখা ছোট হ্যাণ্ডব্যাগটা দেখাল মুসা। পাজামাও এনেছি। রাতে থাকব, ওসব তো দরকার।

পাজামা লাগবে না। রাতে তো আর ঘুমাচ্ছি না। কাপড়চোপড় সব পরে বসে থাকব, রত্নদানো এলেই যেন ছুটে গিয়ে খপ করে ধরতে পারি।

আর চুপ থাকতে পারল না বোরিস। দানো ধরার জন্যে তৈরিই হয়ে এসেছ একেবারে! সাবধান, খুব খারাপ জীব ওরা। বিকেলে রোভারের সঙ্গেও আলাপ করেছি, ও আমার সঙ্গে একমত। রত্নদানোরা খারাপ, বিশেষ করে ব্ল্যাক ফরেস্টেরগুলো তো একেকটা সাক্ষাৎ ইবলিস। ওদের চোখের দিকে সরাসরি। তাকিও না, পাথর হয়ে যাবে!

এতই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলল বোরিস, অস্বস্তি বোধ করতে লাগল মুসা। রত্নদানো বাস্তবে নেই, এতক্ষণ যে ধারণাটা ছিল, সেটা বদলে গেল মুহূর্তে। বোরিস বলছে, রত্নদানো আছে, রোভারও বিশ্বাস করে, মিস ভারনিয়া নাকি। দেখেছেন, এমনকি রবিনও দেখেছে। এতগুলো লোক,

কিশোরের কথায় মুসার ভাবনায় ছেদ পড়ল। কিন্তু, বোরিস, মিস ভারনিয়াকে সাহায্য করব কথা দিয়ে ফেলেছি আমরা। এখনও জানি না, সত্যি রত্নদানোরাই বিরক্ত করছে তাকে, নাকি অন্য কিছু। তাছাড়া, কি ধরনের রহস্য নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে তিন গোয়েন্দা…

যে কোন ধরনের উদ্ভট রহস্য… বলতে বলতে থেমে গেল মুসা। এই রত্নদানোর ব্যাপারটা উটের চেয়েও উদ্ভট হয়ে যাচ্ছে না তো?

.

১০.

মিস ভারনিয়ার আঙিনা অন্ধকার। নির্জন ব্যাংক আর পোডড়া থিয়েটার-বাড়িটাকে যেন গিলে ফেলেছে গাঢ় অন্ধকার। সরু বাড়ির একটা ঘরে আলো জ্বলছে, তার মানে অপেক্ষা করছেন লেখিকা, জেগে আছেন গোয়েন্দাদের অপেক্ষায়।

ট্রাক থেকে নেমে এল কিশোর আর মুসা।

জানালার বাইরে মুখ বের করল উদ্বিগ্ন বোরিস। কিশোর, আবার বলছি, রত্নদানো ধরার চেষ্টা কোরো না। ব্ল্যাক ফরেস্টে অনেক পুরানো গুঁড়ি আর পাথর দেখেছি, এক সময় ওরা জ্যান্ত মানুষ ছিল। রত্নদানোরা ওদের ওই অবস্থা করেছে। খবরদার, ওদের চোখে চোখে চেও না কিছুতেই!

গাঢ় বিশ্বাস বোরিসের। মুসার ভাল লাগছে না ব্যাপারটা। অস্বস্তি বোধ বাড়ছে। অবচেতন মন হুঁশিয়ার করে দিল, সামনে রাতটা ভাল যাবে না।

বোরিসকে বিদায় জানাল কিশোর। কথা দিল, হুশিয়ার থাকবে, যাতে তাকে পাথর না বানাতে পারে রত্নদানোরা। বলল, সকালে রবিনের কাছে ফোন করবে, তখন যেন তাকে সহ ট্রাক নিয়ে চলে আসে।

বেড়ার ধার ঘেঁষে গেটের দিকে এগোল দুই গোয়েন্দা। আড়াল থেকে কেউ তাদের ওপর চোখ রাখছে না তো? কি জানি! এত অন্ধকার, প্রায় কিছুই দেখা যায় না।

হাতড়ে হাতড়ে গেটের পাশে লাগানো বেলপুশটা বের করে একবার টিপল কিশোর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গুঞ্জন উঠল গেটের মেকানিজমে। খুলে গেল পাল্লা, দুই গোয়েন্দা আঙিনায় ঢুকে পড়তেই আবার বন্ধ হয়ে গেল।

থমকে দাঁড়িয়ে কান পাতল কিশোর। অবাক লাগছে মুসার, এত সাবধানতা কেন? বিপদ সত্যি আশা করছে গোয়েন্দাপ্রধান? নাকি অযথাই অতিরিক্ত নাটকীয়। করে তুলছে পরিস্থিতিকে। কিন্তু তেমন স্বভাব তো নয় কিশোরের! ভয় পেল মুসা।

অন্ধকার আঙিনা। নিঃশব্দে কিশোরের পেছনে এগোল মুসা। সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠল। দরজার পাল্লা ভেজানো, ঠেলা দিতেই খুলে গেল, ভেতরে ঢুকে পড়ল দুজন।

শুকনো, ফেকাসে মুখে দুই গোয়েন্দাকে স্বাগত জানালেন মিস ভারনিয়া। হাঁপ ছেড়ে বললেন, তোমরা এসে পড়েছ, ভাল হয়েছে। জীবনে এই প্রথম এত নার্ভাস ফীল করছি। যা ঘটেছে, এর চেয়ে বেশি কিছু ঘটলে আর থাকব না এ-বাড়িতে, এবার ঠিক পালাব। রবার্টের কাছে বাড়ি বেচে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব।

এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই, মিস ভারনিয়া, কোমল গলায় বলল কিশোর। আমরা তো আছি।

কেমন এক ধরনের কাঁপা হাসি ফুটল লেখিকার ঠোঁটে। রাত বেশি হয়নি। মাঝরাতের আগে ওরা আসে না। এতক্ষণ কি করবে? বসে বসে টেলিভিশন দেখ।

বরং একটু ঘুমিয়ে নিই, বলল কিশোর। এই সাড়ে এগারোটা নাগাদ উঠে পড়ব। তাজা শরীর নিয়ে খুব আরামে পাহারা দিতে পারব বাকি রাতটা।

আরাম! আশ্চর্য! বিড়বিড় করল মুসা।

সহকারীর কথায় কান না দিয়ে বলল কিশোর, টেবিল ঘড়ি আছে আপনার? অ্যালার্ম ক্লক?

আছে।

সিঁড়ির মাথায় ছোট ঘরটা দুই গোয়েন্দাকে দেখিয়ে দিলেন মিস ভারনিয়া। দুটো বিছানা করে রেখেছেন। টেবিলে ব্যাগ রেখে শুধু জুতো খুলে সটান বিছানায় শুয়ে পড়ল কিশোর।

মুসাও শুলল। খানিকক্ষণ গড়াগড়ি করে এক সময় সে-ও ঘুমিয়ে পড়ল। তার মনে হল, চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠেছে হতচ্ছাড়া ঘড়ির বেল।

কটা বাজল? চোখ না খুলেই বিড়বিড় করল মুসা।

সাড়ে এগারো, চাপা গলায় বলল কিশোর। মিস ভারনিয়া শুয়ে পড়েছেন। বোধহয়। তুমি আরও খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে পার। আমি পাহারায় থাকছি।

পাহারা! বিড়বিড় করল আবার মুসা, কয়েক সেকেণ্ডেই ঘুমিয়ে পড়ল।

রবিনের মতই দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করল মুসা। স্বপ্নের মাঝেই কানে এল জানালায় টোকার শব্দ।

ঘুম ভেঙে গেল মুসার, পলকে পুরো সজাগ। টোকার শব্দ হচ্ছে এখনও। তালে তালে একটা বিশেষ ছন্দে এক…তিন—দুই-তিন—এক। কোনরকম সঙ্কেত? নাকি জাদু করছে রত্নদানোরা…

বিছানায় সোজা হয়ে বসল মুসা। চোখ জানালার দিকে। গতি বেড়ে গেছে। হৃদযন্ত্রের, গলার কাছে ঠেলে উঠতে চাইছে কি যেন।

জানালায় উঁকি দিল একটা মুখ! _ খুদে একটা মুখ, লাল চোখ, রোমশ কান, সারকাসের ক্লাউনের মত চোখা লম্বা নাক। ছোট ছোট ঠোঁট সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে চোখা দত্ত, ভেঙচি কাটছে যেন।

হঠাৎ ঘরে যেন বিদ্যুৎ চমকে উঠল, লাফিয়ে খাট থেকে নামল মুসা। চোখের পলকে নেই হয়ে গেল মুখটা।

তুলেছি! অন্ধকার কোণ থেকে চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। মুসা, তুলে ফেলেছি!

ওই ব্যাটা রত্নদানো, কোন সন্দেহ নেই! মুসাও চেঁচিয়ে বলল।

ছবি তুলে ফেলেছি। এখন ধরতে হবে ব্যাটাকে!

জানালার কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। চোখ মিটমিট করে তাকাল নিচে আঙিনার দিকে। কৃষ্ণপক্ষের একফালি চাঁদের ঘোলাটে আলোয় দেখা গেল, চারটে খুদে মূর্তি পাগলের মত নাচানাচি করছে। নাচছে কুদছে, এ-ওর ঘাড়ে পড়ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে। উল্লাসে ফেটে পড়ছে, যেন সারকাসের কয়েকটা ক্লাউন।

.

ফ্ল্যাশগানের আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল, ধীরে ধীরে আবার আবছা অন্ধকার সয়ে এল দুই গোয়েন্দার চোখে। মূর্তিগুলোকে আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এখন। দানোদের মুখের সাদা রঙও দেখতে পাচ্ছে। পরনে চামড়ার পোশাক, পায়ে চোখা জুতো।

কিশোর, ফিসফিস করে বলল মুসা। আঙিনায় খেলা জুড়েছে কেন ব্যাটারা?

খুব সহজ কারণ, জুতোর ফিতে বাধছে গোয়েন্দাপ্রধান। আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চায়।

ভয়? তা দেখাতে পেরেছে, অন্তত আমাকে তো বটেই। কিন্তু কেন? সুড়ঙ্গ খোঁড়া বাদ দিয়ে মানুষের পেছনে লেগেছে কেন?

ওদের ভাড়া করে আনা হয়েছে। কাজটা বোধহয় মিস ভারনিয়ার ভাইপোর।

বব! জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে হাত থেমে গেল মুসার। কেন?

ভয় পেয়ে যাতে বাড়িটা বিক্রি করে দেন মিস ভারনিয়া। পটিয়েপাটিয়ে ফুফুর কাছ থেকে তখন প্রচুর নগদ টাকা আদায় করে নিতে পারবে বব।

ঠিক, ঠিক বলেছ কিশোর। এখন বুঝতে পারছি সব ববের শয়তানি!

এবং সেটা প্রমাণ করা দরকার। অন্তত একটা দানোকে ধরতেই হবে।

ব্যাগ থেকে দড়ির বাণ্ডিল বের করে কোমরে ঝোলাল কিশোর। একজোড়া দস্তানা মুসাকে দিয়ে আরেক জোড়া নিজে পরল। ক্যামেরা ঝুলিয়ে নিল কাঁধে। যার যার কোমরের বেল্টে ঝুলিয়ে টর্চ নিল দুটো, হাত মুক্ত রাখল।

কিন্তু জানালায় উঁকি দিল কি করে রত্নদানো? প্রশ্ন করল মুসা। দোতলার জানালা—

ভালমত ভাব, বুঝে যাবে। এখন চল যাই। মিস ভারনিয়া হয়ত ঘুমিয়ে আছেন, তাঁকে ডাকার দরকার নেই। চেঁচামেচি শুরু করলে দানোরা পালাবে।

নিচতলার বারান্দায় বেরিয়ে এল দুজুনে। ছায়ার মত নিঃশব্দে চলে এল বাড়ির এক কোণে। দেয়ালের সঙ্গে প্রায় লেপটে থেকে মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিল।

উঠনে এখনও লাফালাফি করছে চার দানো।

ধর, মুসার হাতে দড়ির এক প্রান্ত খুঁজে দিল কিশোর। আরেক মাথা নিজের কব্জিতে পেঁচিয়ে বাধল। দড়ি টান টান করে ধরে দৌড় দেবে, যার গায়েই দড়ি বাঁধুক পেঁচিয়ে ফেলবে সঙ্গে সঙ্গে। দাও দৌড়!

একসঙ্গে দৌড় দিল দুজনে। একটা ঝোঁপের ধার দিয়ে যাওয়ার সময় ডালে আটকে গেল হঠাৎ কিশোরের কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরার বেল্ট, খাপসহ ছিঁড়ে পড়ে গেল ক্যামেরা, কিন্তু থামল না সে।

ছেলেদেরকে আসতে দেখল রত্নদানোরা। তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে উঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দৌড় দিল দেয়ালের ছায়ার দিকে।

থেম না, মুসা! চেঁচিয়ে বলল কিশোর। একটাকে অন্তত ধরা চাই!

একটা খুদে মূর্তির কাঁধ খামচে ধরল মুসা, কিন্তু ধরে রাখতে পারল না, ঝট করে বসে পড়েছে দানোটা। তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে। কিশোরও ছুটে এসে হোঁচট খেয়ে পড়ল মুসার গায়ের ওপর। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল আবার দুজনেই। চকিতের জন্যে দেখল, থিয়েটার-বাড়ির দিকে ছুটে পালাচ্ছে দানাগুলো।

গেট! হাঁপাচ্ছে কিশোর। খোলা!

বাড়িতে ঢুকে পড়েছে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। কিশোর, জলদি এস!

মুসা, দাঁড়াও! ডাকল কিশোর। একটা ব্যাপার… আর কিছু বলার আগেই হাতের কবজিতে হ্যাঁচকা টান পড়ল, বাধ্য হয়েই তাকেও মুসার পিছু নিতে হল।

থিয়েটারে আগুন লাগলে কিংবা অন্য কোনরকম জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হলে, বেরোনর জন্যে একটা ইমার্জেন্সী ডোর রাখা হয়েছিল, সেটা এখন খোলা। সেদিক দিয়েই ভেতরে ঢুকেছে দানোরা। মুসাও ঢুকে পড়ল সেই দরজা দিয়ে।

 মুসার সঙ্গে তাল রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে কিশোর। গতি কমাতেও পারছে না, তাহলে টানের চোটে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়তে হবে। মুসার পেছনে বাড়ির ভেতরের গাঢ় অন্ধকারে ঢুকে পড়ল সে-ও। পেছনে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। দরজা। আটকা পড়ল দুই গোয়েন্দা। মুহূর্ত পরেই চারপাশ থেকে আক্রান্ত হল ওরা। চোখা তীক্ষ্ণ অনেকগুলো নখ খামচে ধরল ওদেরকে।

Super User