১৪.
বিকেল। ইয়ার্ডের পিক-আপটা খারাপ রাস্তা ধরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে ছুটে চলেছে লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলীর দিকে। স্টিয়ারিং ধরেছে রোভার। মেরিচাচীকে অনেক অনুরোধ করে অনুমতি আদায় করেছে কিশোর।
ছটার অনেক আগেই এসে হাজির হয়েছে জামান। এখন বসে আছে রোভার আর কিশোরের পাশে। ট্রাকের পেছনে ভাঁজ করে রাখা ক্যানভাসের ওপর বসেছে। রবিন আর মুসা। সারাক্ষণ তর্ক করছে ওরা, কে অপরাধী তা নিয়ে। একবার বলছে জলিল, একবার হুপার। দুবার এক মত হয়েছে, দুবারই মত পাল্টেছে আবার। এখন আবার শুরু করে দিয়েছে তর্ক। কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না, কাকে অপরাধী বলবে। ম্যানেজার আর খানসামা, দুজনকেই অপরাধী মনে হচ্ছে তাদের কাছে।
শহরতলীর একটা প্রান্তে পৌঁছে থেমে গেল ট্রাক। পাশ দিয়ে বাইরে উঁকি দিল। মুসা আর রবিন। পুরানো একটা থিয়েটার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক সময় বড়সড় রঙচঙে সাইনবোর্ড ছিল, এখনও রয়েছে, তবে আগের সেই জৌলুস নেই। থিয়েটার শব্দটা কোনমতে পড়া যায়। সদর দরজায় একটা নোটিশ: বন্ধ। ঢোকার চেষ্টা করবেন না কেউ।
জামান আর কিশোরকে বেরিয়ে আসতে দেখে লাফ দিয়ে নামল মুসা আর রবিন।
বিল্ডিংটা চিনতে পারছ? মুসাকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।
সামনেটা দেখিনি গতরাতে, মুসার কণ্ঠে সন্দেহ। তবে উঁচু যেন একটু বেশিই মনে হচ্ছে!
এই বিল্ডিংটা নয়! মাথা নাড়ল জামান।
কিন্তু আমাদের ভূত এই ঠিকানাই তো দিয়েছে, হাতের কাগজের টুকরোটা দেখছে কিশোর। টেলিফোনে ঠিকানা জানিয়েছিল একটা ছেলে, লিখে নিয়েছে। এক আট তিন নয় দুই, ক্যামেট স্ট্রীট।—চল, পেছন দিকটা দেখি। দরজায়। প্রশ্নবোধক থাকলে আর কোন সন্দেহ নেই।
বাড়িটার পেছনে চলে এল ওরা। বড় একটা দরজা, ভেতরে নিশ্চয় স্টোররুম। দরজায় নীল রঙে আঁকা কয়েকটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
ওই যে, সেকেণ্ড, তোমার চিহ্ন, আঙুল তুলে দেখাল কিশোর। জায়গা এটাই।
সন্দেহ হচ্ছে! ভুরু কুঁচকে আছে মুসা। ওই চিহ্ন আমি আঁকিনি! জামান, তোমার কি মনে হয়?
আমারও সন্দেহ হচ্ছে, বলল জামান। তবে অন্ধকার ছিল তখন। ভালমত দেখিনি। হয়ত এই বাড়িই।
তাছাড়া উত্তেজিত ছিলে তোমরা, তাড়াহুড়ো ছিল, বলল কিশোর। ভালমত দেখতে পাবার কথাও নয়। এই যে দরজাটা, এটা দিয়ে সহজেই ট্রাক ঢুকতে পারবে। তলায় কয়েক ইঞ্চি ফাঁকও রয়েছে। চল, উঁকি দিয়ে দেখি ভেতরে। কফিনটা চোখে পড়লেই সব সন্দেহের অবসান হয়ে যাবে।
দরজার কাছে এগিয়ে গেল ওরা। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মুসা। মাথা নুইয়ে উঁকি দিল নিচ দিয়ে। ঠিক এই সময় শব্দ তুলে উঠে গেল দরজা। দেখা গেল তিনটে মুখ। হাসিতে উজ্জ্বল।
এই যে, কিশোর হোমস আর তার চেলাচামুণ্ডারা এসে গেছেন, খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে টেরিয়ার ডয়েলের।
সূত্র খুঁজছ, শার্লক হোমস? বলল টেরিয়ারের এক সঙ্গী। দাঁত বের করে হাসছে।
প্রশ্নবোধক চিহ্ন খুঁজছ তো? বলল তৃতীয় ছেলেটা। প্রচুর দেখতে পাবে। শহরতলীর যেখানে খুজবে সেখানেই পাবে। প্রচুর চিহ্ন রয়েছে।
আমার মনে হয়, আর অপেক্ষা করে লাভ নেই, সঙ্গীদেরকে বলল টেরিয়ার। আমাদের যাওয়াই উচিত। মিস্টার গর্দৰ্ভ হোমস আর তার ছাগল-চেলারা দায়িত্ব। নিয়েছে। পরিস্থিতি আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারবে শিগগিরই।
মুঠো পাকিয়ে এগোতে গেল মুসা, খপ করে তার হাত চেপে ধরল কিশোর। ছেড়ে দাও। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবে নাকি? শুঁটকি আরও শুঁটকি হয়ে ফিরে এসেছে। গন্ধে কাক ভিড় জমাবে। ওয়াক, থুহ!
জ্বলে উঠল টেরিয়ারের চোখ। পা বাড়াতে গিয়েও মুসার পেশীবহুল বাহুর দিকে চেয়ে থেমে গেল। ফিরে তাকাল দুই সঙ্গীর দিকে, ওদের সাহায্য পাবে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিরাশ হল। রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা নীল স্পোর্টস কারটার দিকে তাকাচ্ছে ওরা ঘনঘন। ছুটে গিয়ে ওতে উঠে পড়ার তালে আছে। মুসা আমানের সঙ্গে লগতে রাজি নয় কেউই।
তৈরি থেক, শার্লক হোমসেরা, কর্কশ গলায় বলল টেরিয়ার। আবার দেখা করব আমি তোমাদের সঙ্গে। ছুটে বেরিয়ে গেল সে। পেছনে ছুটল তার দুই সঙ্গী।
গাড়ি নিয়ে চলে গেল টেরিয়ার আর তার সঙ্গীরা।
প্রচুর চিহ্ন রয়েছে, টেরিয়ারের সঙ্গীর এই কথাটার মানে প্রথম বুঝতে পারল রবিন। আঙুল তুলে পাশের বাড়ির একটা দরজা দেখিয়ে বলল, দেখ দেখ, নীল প্রশ্নবোধক! তার মানে বন্ধ দরজা এদিকে যে কটা পেয়েছে, সবগুলোতে চিহ্ন এঁকেছে ওরা!
রাগে লাল হয়ে উঠেছে কিশোরের মুখ। শুঁটকি আর তার চেলাদের কাজ! নিশ্চয় কোন একটা ছেলে শুঁটকির কাছেও ফোন করে বলেছিল আমরা কি খুঁজছি। ব্যস, এখানে এসে তৈরি হয়ে বসে ছিল টেরি। তার কোন একটা চেলা ফোনে আমাদেরকে ঠিকানা দিয়েছে এ-বাড়িটার।
খুব একখান গোল দিয়ে গেল আমাদেরকে, হারামজাদারা! গোঁ গোঁ করে উঠল মুসা। খামোকা আটকেছ আমাকে। হাতের ঝাল মিটিয়ে নিতাম! পিটিয়ে তজ্ঞা করে ফেলা উচিত ব্যাটাকে—!
পরিস্থিতি খুব জটিল করে দিয়ে গেছে টেরিয়ার, এতে কোন সন্দেহ নেই। নীল প্রশ্নবোধকের আর কোন মূল্য নেই এ-মুহূর্তে। কোন্ বাড়িটায় যে রয়েছে কফিন, চিহ্ন দেখে বোঝার আর কোন উপায় নেই।
কি করব আমরা এখন? হতাশ কণ্ঠে বলল রবিন। হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাব?
নিশ্চয় না! জোর দিয়ে বলল কিশোর। প্রথমে দেখব, কতগুলো দরজায় প্রশ্নবোধক এঁকেছে শুঁটকি আর চেলারা। তারপর কি করা যায়, পরে বিবেচনা করব। তবে, ভূত-থেকে-ভূতে ব্যবস্থার ভাল দিক বেশি হলেও দুর্বলতা কিছু রয়েছে। এটা নিয়ে ভাবতে হবে, পরে।
ছড়িয়ে পড়ে খুঁজতে শুরু করল ওরা। বেশ কয়েকটা ব্লকে পাওয়া গেল প্রশ্নবোধক। হতাশ হয়ে ট্রাকের কাছে ফিরে এল ওরা, এরপর কি করবে তা নিয়ে ভাবতে বসল।
গাড়ি নিয়ে ঘুরব, বলল কিশোর! হয়ত জামান কিংবা মুসার চোখে পরিচিত কিছু পড়েও যেতে পারে। এতখানি এসে হাল ছেড়ে দেব না কিছুতেই। এটাই আমাদের শেষ সুযোগ। ওয়েব আর মেধু কফিনটা একবার এ-এলাকা থেকে বের করে নিয়ে গেলে, মমি-রহস্য সমাধানের উপায়-আর থাকবে না।
ভারি মন নিয়ে ট্রাকে চড়ল ওরা। ক্যামেট স্ট্রীট ধরে খুব ধীরে এগোল। রোভার।
মার খেয়ে গেলাম আমরা, বিষণ্ণ মুসা। সেটা স্বীকার করে নিলেই তো পারি?
পাগল হয়েছ? গম্ভীর কিশোর। তাহলে শুঁটকি আমাদেরকে আর টিকতে দেবে না রকি বীচে। যেখানে যাব, পেছন থেকে হাততালি দিয়ে হাসবে—ওই যে, একটা গীর্জা। গতরাতে ওটা চোখে পড়েছিল?
নাহ্! মাথা নাড়ল মুসা। তাছাড়া যেটা দিয়ে চলেছি, রাস্তাও এটা নয়। আরও অনেক সরু ছিল, এক্কেবারে এঁদো গলি!
অন্য জায়গায় চেষ্টা করতে হবে তাহলে। রোভার, ডানে ঘুরুন, প্লীজ।
হোকে (ওকে), বলল বিশালদেহী ব্যাভারিয়ান। শাঁই করে ডানে মোড় ঘোরাল ট্রাক। সরু একটা গলি পথে এসে পড়ল।
বড়জোর তিনটা ব্লক পেরিয়েছে ট্রাক, হঠাৎ কিশোরের আস্তিন খামচে ধরল। মুসা। ওই যে, আইসক্রীমের দোকানটা, মনে হচ্ছে গত রাতে ওটার পাশ দিয়ে। ছুটেছিলাম। আঙুল তুলে দেখাল সে কোন-আইসক্রীম চেহারার ছোট বিল্ডিংটা।
রোভার, থামুন, বলল কিশোর।
থেমে গেল ট্রাক। দ্রুত নেমে পড়ল চার কিশোর। আইসক্রীম স্ট্যাণ্ডটার সামনের চত্বরে এসে দাঁড়াল।
গতরাতে এটা দেখেছিলে? মনে পড়ে? জামানকে জিজ্ঞেস করল মুসা।
হ্যাঁ, ওপরে-নিচে মাথা দোলাল জামান। আমি ভেবেছিলাম, মন্দির। অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে চেহারা একেবারে আলাদা।
রবিন হাসল, ক্যালিফোর্নিয়ায় অনেক আজব জিনিসই দেখতে পাবে। কমলা আকৃতির কোন বিল্ডিং দেখলে, বুঝে নেবে ওখানে কমলার রস পাওয়া যায়। এই যে মন্দিরের চেহারা, ওরকম দেখলে বুঝতে হবে আইসক্রীম। আরও অনেক খাবার আছে, যেগুলোর আকৃতির সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হয় বিল্ডিংগুলো। বিজ্ঞাপনও হয়, লোকের বুঝতেও সুবিধে হয়, ওটা কিসের দোকান।
আরও কিছু কথা জানার কৌতূহল হচ্ছিল জামানের, কিন্তু সময় নেই এখন।
আইসক্রীমের দোকানটা শুধু চিনল জামান আর মুসা, আশপাশের আর কিছু চিনতে পারল না। অন্ধকারে, উত্তেজনায় খেয়াল করেনি।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল কিশোর। রবিন, তুমি আর জামান এখানে থাক। ওয়াকি টকি তৈরি রাখ। দরকার হলেই যাতে মেসেজ আদান-প্রদান করতে পার। মুসা, এই গলি, আর আশপাশের সবকটা কানা গলি খোঁজ। চিহ্ন দেখতে পেলেই রেডিওতে জানাবে। আমি যাচ্ছি উল্টোদিকে। খুঁজব। পেয়েও যেতে পারি ঠিক বাড়িটা। পুরো শহরতলীতে চিহ্ন আঁকতে পারেনি পুঁটকি, সেটা সম্ভবও নয়।
ঠিক আছে, দেখি চেষ্টা করে, মাথা কাত করল মুসা।
রোভার এখানেই ট্রাক রাখবে। এটাকেই ঘাঁটি ধরে নিতে হবে আমাদের। যে-ই ফিরে আসি, এখানে চলে আসব। সব সময় যোগাযোগ রাখব ওয়াকি-টকির মাধ্যমে। ঠিক আছে?
সায় জানাল সবাই।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শিগগিরই অন্ধকার নামবে। দুই গলি ধরে দুদিকে রওনা হয়ে গেল মুসা আর কিশোর। ট্রাকের কাছে দাঁড়িয়ে রইল রবিন আর জামান।
কফিনটা যদি খুঁজে না পায় ওরা? বলল জামান। তাহলে মমিটাও পাবে না। চিরদিনের জন্যে হারাব আমরা রা-অরকনকে। কি করে এই দুঃসংবাদ জানাব গিয়ে বাবাকে? না আমি বলতে পারব, না জলিল!
কিশোরের কথা এখনও বিশ্বাস হয়নি জামানের, এখনও বিশ্বাস করছে রা অরকন তাদের পূর্বপুরুষ। ব্যাপারটা নিয়ে চাপাচাপি করল না রবিন। জিজ্ঞেস করল, জলিল কোথায়?
বাসায়ই বোধহয়, জবাব দিল জামান। বলল, ব্যবসার কাজে নাকি ব্যস্ত থাকবে আজ। কয়েকজন কার্পেট-ব্যবসায়ী আসবে। জরুরি আলোচনা আছে তাদের সঙ্গে।
কিসের কার্পেট-ব্যবসায়ী? দুই চোর মেথু আর ওয়েবের সঙ্গে দেখা করবে আসলে জলিল, ধরেই নিল রবিন। এমনিতেই বিষণ্ণ হয়ে আছে জামান। কথাটা জানিয়ে তাকে আরও দুঃখ দিতে ইচ্ছে হল না তার।
রবিন আর জামান কথা বলছে, ততক্ষণে কয়েকটা ব্লক দেখা হয়ে গেছে। কিশোর আর মুসার। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে ওয়াকি-টকির মাধ্যমে। ব্যর্থতার কথা একটু পর পরই জানাচ্ছে একে অন্যকে। ইতিমধ্যে অন্ধকার হয়ে গেছে। চকের দাগ দেখাই যাবে না আর এখন।
পারলে আরও একটা গলি দেখ, সেকেণ্ড, হতাশ কণ্ঠে বলল কিশোর। তারপর ফিরে এস ট্রাকের কাছে। আলোচনা করে ঠিক করব, এরপর কি করা যায়!
বুঝেছি, খুদে স্পীকারে জবাব এল মুসার। আউট।
পরের গলিটা ধরে এগিয়ে চলল কিশোর। এর আগে যে কয়েকটা গুলি দেখেছে, ওটাও ওগুলোর চেয়ে আলাদা নয়। একই রকম দেখতে। ওই রকমই পুরানো ধাঁচের বাড়ি, দোকানপাট-বেশির ভাগই বন্ধ। ব্যবসা নিশ্চয় এদিকে ভাল জমে না। তাই সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে। দোকানদাররা।
গলির প্রায় শেষ মাথায় বড় একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল কিশোর। বড় একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা ট্রাক। পুরানো। নীল শরীর, জায়গায় জায়গায় চটে গেছে রঙ। দরজাটা তুলে দিয়েছে একজন লোক। কাজেই ওটাতে প্রশ্নবোধক আঁকা আছে কিনা, জানার উপায় নেই। দাঁড়িয়ে থেকেও লাভ নেই। ঘুরতে যাবে ঠিক এই সময় কানে এল কথা।
মেথু, ট্রাক ঢোকাও ভেতরে, বলল একজন।
ঢোকাচ্ছি। ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটার গলা শোনা গেল, দরজার কাছ থেকে সর। এই, ওয়েব-হা, সর, আরও।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে আবার কিশোর। মেথু! ওয়েব! ট্রাক। বড় দরজা, বড় বাড়ি। আর কোন সন্দেহ নেই। এ-বাড়িটাই খুঁজছে ওরা।
.
১৫.
ছুটে ট্রাকের পাশে চলে এল কিশোর। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে ট্রাক। হেডলাইট জ্বালেনি। গাঢ় অন্ধকার।
বাঁ পাশে রয়েছে ওয়েব। ট্রাকের ডান থেকে এগোল কিশোর। দরজার ফ্রেম আর ট্রাকের বডির মাঝে মাত্র দুফুট ফাঁক। ওই ফাঁক দিয়েই ভেতরে ঢুকে পড়ল
পুরো শরীরটা ভেতরে ঢুকে গেল ট্রাকের, থেমে দাঁড়াল। কিশোর দাঁড়িয়ে পড়ল ওটার পাশে, অন্ধকারে।
দরজা নামিয়ে দিচ্ছি আমি, শোনা গেল ওয়েবের গলা! তারপর হেডলাইট জ্বালবে। নইলে অন্ধকারে কিছু দেখতে পাব না।
ট্রাকের পাশে উবু হয়ে আছে কিশোর। দ্রুত চিন্তা চলছে মাথায়। কিছু দেখতে পাচ্ছে না। আলো জ্বলে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষাও করতে পারবে না। তাহলে চোরদের চোখে পড়ে যাবে। এর আগেই লুকিয়ে পড়তে হবে কোথাও। কোথায়?
বেশি ভাবনা-চিন্তার সময় নেই। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল সে মেঝেতে! গড়িয়ে। চলে এল ট্রাকের তলায়। দরজা নামানর প্রচণ্ড শব্দে ঢাকা পড়ে গেল তার গোনর মৃদু আওয়াজ। মুহূর্ত পরেই জ্বলে উঠল হেডলাইট। আলোকিত হয়ে উঠল ঘরের। অনেকখানি। দৃষ্টি সীমাবদ্ধ হয়ে আছে কিশোরের। তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তবে পুরানো আমলের গাড়িটার চাকা আর কফিনের ওপরের ক্যানভাস ঠিকই চোখে। পড়ল।
ঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছে কিশোর। সাহায্য দরকার, সঙ্গে রেডিও আছে, কিন্তু সাহায্য চাইবার উপায় নেই। কথা বললেই শুনে ফেলবে চোরেরা।
চুপচাপ পড়ে আছে কিশোর। হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন বুকের ভেতর। ভয় হচ্ছে, হৃৎপিণ্ডের শব্দ না আবার শুনে ফেলে দুই চোর।
ট্রাক থেকে নেমে এল মেথু। মাত্র ছয় ফুট দূরে দুই জোড়া পা দেখতে পাচ্ছে। কিশোর।
মক্কেল ব্যাটা রাজি হল তাহলে! হাসল মেথু। জানতাম, হবে। কফিনটা, পাওয়ার জন্যে যা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে! কিন্তু এই বাক্স দিয়ে কি করবে ব্যাটা?
ওই ব্যাটাই জানে! বলল ওয়েব। জান তো, কোথায় ডেলিভারি দিতে হবে? হলিউডের বাইরে। একটা খালি গ্যারেজ দেখিয়ে দিয়েছে। ওর ভেতরে ঢুকে যেতে হবে ট্রাক নিয়ে।
তাই নাকি?
আরও আছে। ওর ধারণা, আমাদেরকে অনুসরণ করা হবে। ভয় পাচ্ছে। খুব সতর্ক থাকতে বলেছে আমাদেরকে। যদি দেখে অনুসরণ করা হচ্ছে, তাহলে যেন মাল ডেলিভারি না দিই, এ কথাও বলে দিয়েছে।
ব্যাটার মাথা খারাপ! তীক্ষ্ণ শোনাল মেথুর গলা। কে অনুসরণ করতে আসবে আমাদের? কেউ জানেই না কিছু। আমরা ডেলিভারি দেবই। টাকা ভীষণ দরকার।
আমার কথা শেষ হয়নি এখনও। যদি দেখি অনুসরণ করা হচ্ছে না, তাহলে মাঝপথে থেমে ফোন করে তাকে জানাতে হবে। দরকার মনে করলে, ডেলিভারির ঠিকানা বদল করবে সে।
গরু পেয়েছে আমাদেরকে! এত বদলাবদলি করতে পারব না। তাহলে আরও বেশি টাকা লাগবে।
আসল কথাটা তো শোনাইনি এখনও। ডেলিভারি দেয়ার পর আবার মাল দুটো নিয়ে আসতে হবে ওর ওখান থেকে। নিরাপদ কোন জায়গায় নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে, যাতে কোনরকম চিহ্ন না থাকে। আর সেজন্যে সে আরও এক হাজার ডলার দেবে আমাদেরকে।
আরও এক হা-জা-র! তাহলে জিনিস দুটো চাইছে কেন? পুড়িয়েই যদি ফেলবে?
জানি না। হয়ত কোন কারণে ভয় পেয়ে গেছে। নষ্ট করে ফেলতে চাইছে। এখন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ও থাকতে পারে। যা খুশি করুকগে। আমাদের টাকা। পাওয়া নিয়ে কথা। পেলেই হল। এস, তুলে নিই এটা ট্রাকে।
কফিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল দুই জোড়া পা। আলো পড়েছে ওটার ওপর, দেখতে পাচ্ছে কিশোর। টান দিয়ে ক্যানভাস তুলে ফেলল একজন। আরেকজন ঝুঁকল কফিনটার ওপর।
দাঁড়াও, বলে উঠল ওয়েব। খুলে আগে দেখে নিই। ব্যাটা এত পাগল কেন! নিশ্চয় মূল্যবান কিছু আছে এর ভেতর!
ঢাকনা তুলে ফেলল দুজনে মিলে। বাক্সের ভেতরের চারধার আর তলায় হাত চালিয়ে দেখল।
না, বলল ওয়েব। কিছু নেই। ধর, ট্রাকে তুলে ফেলি।
আবার জায়গামত ঢাকনাটা বসাল ওরা। এক প্রান্ত থেকে ঠেলে নিয়ে এল ট্রাকের পেছনে। তুলতে গিয়ে দেখল, দরজা আর ট্রাকের পেছনে খুব একটা ফাঁক নেই। জায়গা হচ্ছে না, তাই তোলা যাচ্ছে না কফিনটা।
আরও সামনে বাড়াতে হবে ট্রাক, বলল ওয়েব। অল্প একটু বাড়ালেই চলবে।
তুমি বাড়াও। আমি পানি খেয়ে আসি, বলে একদিকে চলে গেল মেথু।
ড্রাইভিং সিটে বসল ওয়েব। গর্জে উঠল ইঞ্জিন। কয়েক ফুট সামনে বাড়াল ট্রাক। কিশোরের ওপর থেকে সরে চলে গেছে।
বেকায়দায় পড়ে গেল কিশোর। রেডিওতে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় নেই। হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে কোণের কোন একটা জিনিসের আড়ালে লুকিয়ে। থাকতে পারে। কিন্তু তাহলে চলে যাবে ট্রাকটা। ওটাকে অনুসরণ করার কোন উপায় থাকবে না। ট্রাকের ভেতরে উঠে বসে থাকতে পারে। কিন্তু কফিনটা তোলার। সময়ই তাকে দেখে ফেলবে চোরেরা।
ভাবনার ঝড় বইছে কিশোরের মাথায়। কোন উপায় দেখছে না। লুকিয়ে থেকে ট্রাকটাকে অনুসরণ করতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে, অথচ চোরদের চোখে পড়া চলবে না, একই সঙ্গে সবগুলো করা অসম্ভব মনে হচ্ছে তার। কাছে। অথচ যেভাবেই হোক করতেই হবে।
তারপর, হঠাই বুঝে গেল কিশোর, কি করতে হবে।
এখনও ফেরেনি মেথু। ড্রাইভিং সিটেই বসে আছে ওয়েব। হামাগুড়ি দিয়ে। কফিনটার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর। আস্তে করে ঢাকনার একদিক ফাঁক করে। বান মাছের মত পিছলে ঢুকে পড়ল ভেতরে। আবার নামিয়ে দিল ঢাকনা। তবে, আগে ফাঁকের মধ্যে একটা পেন্সিল ঢুকিয়ে নিল, মুসা যা করেছিল। বাতাস চলাচল দরকার।
আর কিছুই করার নেই। এখন শুধু চুপচাপ শুয়ে থাকা। দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে রইল কিশোর।
.
ট্রাকের কাছে ফিরে এসেছে মুসা। চতুরে দাঁড়িয়ে আছে রবিন আর জামানের সঙ্গে। সবাই উদ্বিগ্ন। কিশোরের কাছ থেকে শেষ নির্দেশ আসার পর অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে। আর কোন সাড়া নেই। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করছে রবিন আর মুসা। কিন্তু একেবারে নীরব গোয়েন্দাপ্রধান। হল কি? কোন বিপদে পড়ল?
তারপর হঠাৎ করেই কথা বলে উঠল স্পীকার। ফার্স্ট কলিং সেকেণ্ড! ফার্স্ট কলিং সেকেণ্ড! মুসা, শুনতে পাচ্ছ?
সেকেণ্ড বলছি। শুনতে পাচ্ছি, ফাস্ট। কি হয়েছে?
যে ট্রাকটাকে খুঁজছ, ওটা এখন হলিউডের দিকে ছুটছে। ভেসে এল। কিশোরের গলা। নীল, রঙ-চটা, দুই টনী ট্রাক। লাইসেন্স নাম্বার: পি এক্স সাতশো পঁচিশ। এখন সম্ভবত পেইন্টার স্ট্রীট ধরে পশ্চিমে ছুটেছে। শুনতে পেয়েছ?
পেয়েছি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ওরা এখন পেইন্টার স্ট্রীটেই দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরের জোরাল গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে, মাত্র কয়েকটা ব্লক দূরে আছে সে।
এখুনি পিছু নিচ্ছি ওটার, ফাস্ট, বলল মুসা। তুমি কোথায়?
গতরাতে তোমরা যেখানে ছিলে, জবাব এল।
কফিনের ভেতরে? চেঁচিয়ে উঠল মুসা।
এবং ডালাটা দড়ি দিয়ে বাধা, বলল কিশোর। বেরোতে পারব না। তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগের আর কোন উপায় নেই, রেডিও ছাড়া। ট্রাকটাকে চোখের আড়াল করবে না কিছুতেই। তোমাদের সাহায্য দরকার হবে আমার শিগগিরই।
পেছনে লেগে থাকব, বলেই ঘুরল মুসা। দ্রুত নির্দেশ দিল সঙ্গীদেরকে।
তাড়াহুড়ো করে ট্রাকে উঠে পড়ল তিনজনে। কি করতে হবে, রোভারকে বলল। মুসা।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়েই বনবন স্টিয়ারিং ঘোরাল বিশালদেহী ব্যাভারিয়ান। উল্টো দিকে নাক ঘুরে গেল ট্রাকের। তীব্র গতিতে পেরিয়ে এল কয়েকটা ব্লক। দেখা পেল নীল ট্রাকের। মিলে গেল লাইসেন্স নাম্বার। সন্দেহ নেই, ওটাতেই আছে কিশোর পাশা। আধ ব্লক মত পেছনে সরে এল রোভার। ওই দূরত্ব রেখেই অনুসরণ করে চলল। এখানে রাস্তায় আলো আছে ভালই, নীল ট্রাকটাকে চোখে চোখে রাখতে অসুবিধা হচ্ছে না।
তোমার আধ ব্লক পেছনে রয়েছি, ফার্স্ট, ওয়াকি-টকিতে জানাল মুসা। ঠিক কোথায় যাচ্ছে ট্রাকটা, জান?
জানি না, জবাব এল কিশোরের। তবে হলিউডের বাইরে কোন একটা গ্যারেজে। কোন ধরনের গ্যারেজ তা-ও বলতে পারব না।
সিনেমা দেখছি যেন! উত্তেজিত হয়ে উঠছে জামান। তবে আরও বেশি রোমাঞ্চকর! কিন্তু কিশোরের কি হবে? যদি হারিয়ে ফেলি আমরা ট্রাকটাকে?
ট্রাকটাকে চোখের আড়াল করা যাবে না কিছুতেই, বিড়বিড় করল রবিন।
বেশ কয়েক মাইল পেরিয়ে এল ওরা। নীল ট্রাকটা এখনও আধ ব্লক দূরে। হঠাৎ গতি বেড়ে গেল ওটার? কোনরকম সন্দেহ হয়েছে? অনুসরণ করা হচ্ছে, বুঝতে পেরেছে?
অনেক দেরিতে বুঝল ওরা কারণটা। সামনে রেল লাইন। ট্রেন আসছে। ব্যারিয়ার পড়তে শুরু করেছে রেলগেটে। শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে চলে গেল নীল ট্রাক। আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যারিয়ার ওপরে থাকতে থাকতে পৌঁছতে পারল না রোভার। আটকা পড়ে গেল এপাশে।
ফার্স্ট! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। আমরা আটকা পড়ে গেছি। মালগাড়ি। মাইলখানেকের কম হবে না লম্বায়! চলেছেও খুব ধীরে ধীরে। তোমাদেরকে বোধহয় হারালাম। শুনতে পাচ্ছ?
পাচ্ছি! শোনা গেল কিশোরের গলা। সেকেণ্ড! উত্তেজিত হয়ে উঠেছে সে। মোড় নিয়েছে ট্রাক! দিক-টিক কিছু বলতে পারব না! কোন রাস্তা দিয়ে যে চলেছি… মৃদু হতে হতে মিলিয়ে গেল কথা।
ফাস্ট। চেঁচিয়ে বলল মুসা। তোমার গলা শুনতে পাচ্ছি না! মনে হয় রেঞ্জ বেড়ে গেছে! কিশোর?
কোন জবাব নেই।
আরেকবার চেষ্টা করল মুসা। জবাব পেল না। দুটো ট্রাকের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে, বুঝতে পারল। ওয়াকি-টকির রেঞ্জের মধ্যে নেই কিশোর।
.
১৬.
উৎকন্ঠিত হয়ে অপেক্ষা করল কিশোর কয়েক মিনিট। স্পীকারে আসছে না মুসার গলা। নিশ্চয় রেঞ্জের বাইরে পড়ে গেছে। কল্পনা করতে পারছে ও, ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে আসছে রোভার। চারজোড়া চোখ উদ্বিগ্ন হয়ে খুঁজছে নীল ট্রাকটাকে। কিন্তু অন্ধকারে, লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশৃঙ্খল পথে এটাকে খুঁজে পাওয়া ওদের জন্যে কঠিন।
আবার মেসেজ পাঠানর চেষ্টা করল কিশোর। ফার্স্ট কলিং সেকেণ্ড! শুনতে পাচ্ছ? আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এল জবাব। কিন্তু মুসা নয়। একটা অচেনা গলা। অন্য কোন কিশোরের। হ্যাল্লো, কে বলছ? এসব ফার্স্ট সেকেন্দ্রে মানে কি? কোন রকম খেলায় মেতেছ? তাহলে আমাকেও অংশী নাও।
শোন, দ্রুত বলল কিশোর। খেলা নয়, এটা ভয়ানক বিপদ। আমার হয়ে পুলিশকে মেসেজ দিতে পারবে?
পুলিশ? কেন?
দ্রুত ভাবনা চলেছে কিশোরের মাথায়। সত্যি কথা বললে বিশ্বাস করতে পারবে না ছেলেটা। রসিকতা ধরে নিতে পারে। হুশিয়ার হয়ে কথা বলতে হবে। তাই। একটা ট্রাকের পেছনে রয়েছি, আটকে গেছি। চালক আর তার সঙ্গী জানে না। বেরোতে চাই আমি। পুলিশকে ডাক। ওরা ট্রাকটা থামিয়ে আমাকে বের করে নিক। সে বুঝে গেছে, এখন বাইরের সাহায্য অবশ্যই দরকার। একমাত্র পুলিশের কাছ থেকেই পাওয়া যাবে সেটা।
ঠিক আছে, জানাচ্ছি পুলিশকে জবাব দিল ছেলেটা। লুকিয়ে গাড়ি চড়তে গিয়েছিলে, এখন পড়েছ আটকা এই তো?—জলদি কথা বল! নইলে শিগগিরই রেঞ্জের বাইরে চলে যাবে! গাড়িটার কি রঙ? নাম্বার কত?
বলছি, ভাল করে শোন, চেঁচিয়ে বলল কিশোর। নীল ট্রাক, দুই টনী। নাম্বার…
কিছুই শুনতে পাচ্ছি না! শোনা গেল ছেলেটার গলা। আরও জোরে বল!
আমি শুনতে পাচ্ছি, বলল কিশোর। শুনছ? শুনছ?
হ্যাল্লো! হাল্লো! শোনা গেল ছেলেটার গলা। চিৎকার করে কথা বলছে। চুপ হয়ে গেলে কেন! যন্ত্রে গোলমাল!নাকি ট্রান্সমিটিং রেঞ্জের বাইরে চলে গেছ— মৃদু থেকে মৃদুতর হয়ে মিলিয়ে গেল তার গলা।
হতাশ হয়ে পড়ল কিশোর। এবার কি করবে? ওয়াকি-টকিটা শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল। মুক্তি পাওয়ার কোন একটা উপায় বের করতে হবে। কিন্তু কোন বুদ্ধি এল না মাথায়। দড়ি দিয়ে শক্ত করে কফিনের সঙ্গে ঢাকনাটা বেঁধে রেখেছে মেথু আর ওয়েব।
ফাঁক আছে, বাতাস চলাচল করছে যথেষ্ট, সেদিক থেকে কোন ভয় নেই। ভয় পাচ্ছে ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ট্রাক থামলে, মেথু আর ওয়েব কফিনের ঢাকনা খোলার পর কি ঘটবে ভেবে, ঢোঁক গিলল সে। ঘাতে শুরু করল। কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছে, তিন দুবৃত্ত ঘিরে দাঁড়িয়েছে কফিনটা। অবাক চোখে চেয়ে আছে তার। ॥ দিকে। তার সাক্ষীতে তিনজনই জেলে যাবে। এবং সেখানে কিছুতেই যেতে চাইবে না ওরা। সুতরাং একটাই কাজ করবে ওরা। নিশ্চিহ্ন করে দেবে সাক্ষীকে। এছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই তাদের জন্যে।
চিন্তার মোড় ঘোরাল কিশোর। কি করে ওদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে? যদি ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে দৌড় দেয়? অবাক হয়ে যাবে ওরা! কয়েক মুহূর্ত দেরি করে ফেলবে সক্রিয় হয়ে উঠতে। এই সুযোগে কি পালিয়ে যেতে পারবে?
মনে হয় না!–ভাবছে কিশোর। ওরা তিনজন। যেদিকেই ছোটার চেষ্টা করুক সে, কারও না কারও হাতে ধরা পড়বেই।…আচ্ছা, তার চাচা-চাচী কি কাঁদবে তার জন্যে? মন খারাপ করবে? মেরিচাচী নিশ্চয় কাঁদবে, এতে কোন সন্দেহ নেই তার। চাচাও কাঁদবে গোপনে। আর তার বন্ধুরা? মুসা আর রবিন?
ভাবতে ভাবতে গলার কাছে কি যেন দলামত একটা উঠে এল কিশোরের। এই সুন্দর পৃথিবীতে আর বেশিক্ষণ আয়ু নেই তার ঠিক এই সময় ছিন্ন হয়ে গেল। চিন্তাসূত্র। থেমে গেছে ট্রাক। উত্তেজিত হয়ে পড়ল কিশোর। ধক করে উঠেছে বুকের ভেতর। এসে গেছে সময়। যে-কোন মুহূর্তে উঠে এসে কফিন নামিয়ে নেবে মেখু আর ওয়েব।
কিন্তু এল না ওরা। মিনিট পাঁচেক পর আবার চলতে শুরু করল ট্রাক। মনে পড়ে গেল কিশোরের, অর্ধেক পথ এসে মক্কেলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার কথা দুই চোরের। নতুন নির্দেশ থাকলে, জেনে নেবে।
আবার নানারকম ভাবনা এসে ভিড় করল কিশোরের মনে। অতীতের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে, অনেক সুখের মুহূর্ত। অনেক কিছুই ভাবল সে, কিন্তু মুক্তির কোন উপায় বের করতে পারল না। সময়ের হিসেব রাখতে পারেনি কিশোর। আবার কতক্ষণ পর থামল ট্রাক, বলতে পারবে না।
লোহার দরজা উঠে যাওয়ার আওয়াজ শোনা গেল। উত্তেজিত হয়ে উঠেছে আবার কিশোর। টান টান হয়ে গেছে স্নায়ু। চলে গেছে বিষণ্ণ ভাবটা। শুয়ে শুয়ে কাপুরুষের মত মরবে না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবে। তবে, প্রথমে দৌড়ে পালানর চেষ্টা করবে।
ট্রাকের দরজা খুলে গেল। ভারি পায়ের শব্দ। উঠে এসেছে মেথু আর ওয়েব। নড়ে উঠল কফিন।
অদ্ভুত একটা কাণ্ড, জান! শোনা গেল ওয়েবের গলা। স্টোররুমে যখন ঠেলেছিলাম, একেবারে হালকা মনে হয়েছিল কফিনটা। যখন তুলতে গেলাম ট্রীকে, বেজায় ভারি। এখনও তাই!
অন্য সময় হলে, খুব একচোট হেসে নিত কিশোর। ওয়েবের বিস্মিত চেহারা সহজেই কল্পনা করতে পারছে। কফিনটার ওজন অন্তত একশো পাউণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে সে। এই ওজন অবাক করবেই ওয়েব কিংবা মেথুকে। সামনে ভয়ানক বিপদ, তাই হাসতে পারল না কিশোর।
ধরাধরি করে নামানো হল কফিনটা।
শোনা গেল তৃতীয় আরেকটা গলা। গ্যারেজের ভেতরে নিয়ে এস, জলদি! চাপী কণ্ঠস্বর, কিন্তু কেমন যেন পরিচিত মনে হল কিশোরের। এর আগে কোথাও শুনেছে! কোথায়?
আবার শূন্যে উঠল কফিন। খানিক পরেই ধপ করে নামানো হল আবার। সিমেন্টের মেঝেতে নামিয়েছে।
গুড, বলল তৃতীয় কণ্ঠ। মুখে রুমাল চেপে আছে নাকি! এমন চাপা কেন? মিনিট দশেকের জন্যে বাইরে যাও তোমরা। তারপর এসে নিয়ে যাবে মমি আর কফিন। আজই নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে।
আগে টাকা, তারপর রেব, গোঁয়ারের মত বলে উঠল ওয়েব। টাকা দাও, নইলে ছুঁতেও দেব না এটা।–
ঠিক আছে, ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি বলল তৃতীয় কণ্ঠ। অর্ধেক পাবে এখন। পোড়াতে নিয়ে যাওয়ার আগে দেব বাকিটা।
খসখস আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয় দড়ি খুলছে ওয়েব কিংবা মেথু। কফিনটাও নড়ে উঠল একবার।
আরে, দড়ি নিচ্ছ কোথায়? বলল মেথু। এখানেই থাক। আবার বেঁধে নিতে হবে না কফিনটা?
চল, টাকা নেবে, বলল তৃতীয় কন্ঠ। আহ্, জলদি এস!
দরজা নামানর শব্দ শুনল কিশোর। তার নীরবতা। ঘরে আর কেউ নেই, বোঝাই যাচ্ছে। আস্তে করে ঢাকনা তুলে উঁকি দিল সে। আবছা অন্ধকার। কাঁচের বদ্ধ শার্সি দিয়ে বাইরের আলো এসে পড়েছে ম্লান হয়ে। একটা গ্যারেজ, প্রাইভেট গ্যারেজ। ঘরে আর কেউ নেই। সাবধানে কোনরকম আওয়াজ না করে বেরিয়ে এল সে। জায়গামত নামিয়ে দিল আবার কফিনের ঢাকনা। ঠিক এই সময় আবার দরজা। উঠতে শুরু করল।
তড়াক করে লাফিয়ে এসে দরজার পাশে দেয়ালের গায়ে সেঁটে দাঁড়াল। কিশোর। অর্ধেক উঠেই থেমে গেল দরজা। ঘরে এসে ঢুকল এক লোক। টেনে আবার নামিয়ে দিল দরজা। উজ্জ্বল আলো থেকে এসেছে, বোধহয় সেজন্যেই আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরকে দেখতে পেল না সে। ঘুরে এগিয়ে গেল। কফিনের দিকে। হাতের তালু ডলছে।
অবশেষে পেলাম! বিড়বিড় করে বলল লোকটা কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে। এতগুলো বছর পর! পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে আলো ফেলল কফিনটার ওপর। খুব বেশি সতর্ক, তাই গ্যারেজের আলো জ্বালছে না।
উবু হয়ে ঢাকনা তুলে নামিয়ে রাখল কাত করে, কফিনের গায়ে ঠেস দিয়ে। ঝুঁকে হাত বোলাতে শুরু করল কফিনের ভেতরের দেয়ালে। অনুভবে বোঝার চেষ্টা করছে কিছু।
স্প্রিঙের মত লাফিয়ে উঠল যেন কিশোর। দুই লাফে পৌঁছে গেল লোকটার পেছনে। জোরে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তাকে কফিনের ভেতর। ঠেলে ভেতরে। ঢুকিয়ে দিল পা দুটো। ঢাকনাটা তুলেই বসিয়ে দিল জায়গামত। তারপর চড়ে বসল। ওটার ওপর। মূল অপরাধীকে আটকে ফেলেছে। এরপর কি করবে? কতক্ষণ রাখতে পারবে আটকে?
ভেতর থেকে ধাক্কা দিতে শুরু করেছে লোকটা। চেঁচাচ্ছে। তবে খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না চিৎকার। ঢাকনা বন্ধ, বাতাস চলাচল কতে পারছে না। গ্যারেজের দরজা নামানো। কিশোরই শুনতে পাচ্ছে না ভালমত, বাইরে থেকে শুনতে পাবে না মেখু কিংবা ওয়েব।
ঢাকনাসুদ্ধ কিশোরকে ঠেলে ফেলে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে লোকটা। একবার ফাঁক হয়ে যাচ্ছে ঢাকনা, চেপে আবার নামিয়ে দিচ্ছে কিশোর। ঘামছে দরদর করে। খুব বেশিক্ষণ এভাবে আটকে রাখতে পারবে না, বুঝতে পারছে। ছুটে গিয়ে দরজা তুলতে সময় লেগে যাবে। ততক্ষণে বেরিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলবে লোকটা। বাইরে নিশ্চয় পাহারায় রয়েছে দুই চোর। ওরাও মক্কেলের সাহায্যে ছুটে আসবে। সুতরাং ঢাকনায় চেপে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। তবে সেটাও নিরাপদ নয়। দশ মিনিট পর এসে কফিনটা নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আসবে মেথু আর ওয়েব। তারমানে, খামোকাই কষ্ট করছে কিশোর। ঠেকাতে পারবে না ওদেরকে শেষ অবধি।
.
১৭.
হঠাৎ বাইরে শোনা গেল অনেক মানুষের গলা। চিৎকার। হুশিয়ারি। গাড়ির হর্নের শব্দ। আরও চেঁচামেচি। ধুপধাপ শব্দ। মারামারি করছে যেন কারা!
বাইরের দিকে খেয়াল করতে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে অসতর্ক হয়ে পড়ল। কিশোর। এই সুযোগে এক জোর ধাক্কায় ঢাকনাসহ কাত করে প্রায় ফেলেই দিয়েছিল তাকে লোকটা। তাড়াতাড়ি সামলে নিল কিশোর। চাপ বাড়াল আবার ঢাকনাটায়। ঠিক এই সময় ঘট-ঘটাং আওয়াজ তুলে উঠে গেল দরজা।
কে ওখানে! অন্ধকারে শোনা, একটা পরিচিত কণ্ঠ। আলোর সুইচ খুঁজে পেল লোকটা। জ্বলে উঠল আলো। দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী ব্যাভারিয়ান। রোভার।
হঠাৎ করেই কফিনের তলায় ঠেলাঠেলি থামিয়ে দিয়েছে বন্দী। মিটমিট করে দরজার দিকে তাকাচ্ছে কিশোর। রোভারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মুসা, রবিন, জামান, প্রফেসর বেনজামিন আর জলিল। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সবাই তার দিকে।
অবশেষে কথা ফুটল রোভারের, কিশোর, তুমি হোকে?
হোকে, মাথা নাড়াল কিলোর। তার কথার ধরনে হেসে ফেলল সবাই, এমনকি রোভারও। জিজ্ঞেস করল কিশোর, তোমরা এলে কি করে? চোর দুটো কোথায়?
জবাবটা দিল রবিন। তোমাদের ট্রাকটাকে হারিয়ে ফেললাম… তার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রচণ্ড ঠেলা লাগল কফিনের ঢাকনায়। প্রায় পড়ে যেতে যেতে আবার সামলে নিল কিশোর। বিস্মিত চোখে কফিনের দিকে চেয়ে বলল রবিন, ভেতরে কি!
হ্যাঁ, কি? রবিনের কথার প্রতিধ্বনি করলেন যেন প্রফেসর। গোল্ড-রিম চশমার কাঁচের ওপাশে গোল গোল হয়ে উঠছে তার চোখ।
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল কিশোর। নাটের গুরু। দুই মাস আগে যে এই খেল শুরু করেছিল। সেই জ্যোতিষ, যে গিয়েছিল লিবিয়ায় জামানদের বাড়িতে। বিশ্বাস করিয়েছিল, রা-অরকন তাদের পূর্বপুরুষ। মমিসহ কফিনটা চুরির প্রেরণা জুগিয়েছে জামান আর জলিলকে।
জ্যোতিষ! সেই জ্যোতিষ! চেঁচিয়ে উঠল জামান। কি বলছ, কিছুই বুঝতে পারছি না!
অসম্ভব! জলিলও চেঁচিয়ে উঠল। এ হতেই পারে না! ওই জ্যোতিষ রয়ে/ গেছে লিবিয়ায়!
নিজের চোখেই দেখতে পাবেন কোথায় রয়ে গেছে, জলিলের দিকে চেয়ে বলল কিশোর। পালানর চেষ্টা করলে রুখবেন আপনাদের জ্যোতিষকে।
আস্তে করে ঢাকনার ওপর থেকে নেমে এল কিশোর। সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা দিয়ে খুলে গেল ডালা, কাত হয়ে পড়ল একপাশে। প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকটা। চেহারা ফেকাসে। চোখে শূন্য দৃষ্টি।
জ্যোতিষ! চেঁচিয়ে উঠল জামান। ও জ্যোতিষ নয়। সে লোকটা বুড়ো ছিল! চুলদাড়ি সব সাদা! এক চোখ কানা! কুঁজো! এ তো রীতিমত জোয়ান!
ছদ্মবেশে গিয়েছিল তোমাদের বাড়িতে, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর।
হাঁ হয়ে গেছেন যেন প্রফেসর, মুসা আর রবিন। বোকার মত চেয়ে আছে কফিনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে।
উইলসন! বিড়বিড় করলেন অবশেষে প্রফেসর।
হ্যাঁ, উইলসন, জবাব দিল কিশোর। জামানদের প্রিয় জ্যোতিষ। মিসেস চ্যানেলের বেড়ালচোর। মমিচোর! কফিনচোর।
ও চোর! উইলসন চোর! বিশ্বাস করতে পারছেন না যেন প্রফেসর বেনজামিন। কিন্তু সে কেন চোর হবে? এসব কেন চুরি করতে যাবে?
হ্যাঁ, প্রফেসর, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা কাত করলেন উইলসন। ছেলেটা ঠিকই বলেছে। আমি চোর। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই অপেক্ষা করে আছি মমি আর। কফিনটার জন্যে। কিন্তু লাভ কিছুই হল না। হাতে পেয়েও হারালাম দশ লক্ষ ডলার! কে জানে, বিশ কিংবা তিরিশ লক্ষও হতে পারে!
হ্যা! সামনে বাড়ল জলিল। কঠোর চোখে চেয়ে আছে উইলসনের দিকে। ও-ই সেই জ্যোতিষ! গলার স্বর, কথা বলার ধরন! …এখন চিনতে পারছি! এই লোকই গিয়েছিল আমার মনিবের বাড়িতে। বুঝিয়েছে, রা-অরকন তাদের পূর্বপুরুষ। ঠকিয়েছে ওঁদেরকে। লোকটা একটা ভণ্ড, শয়তান, মিথ্যুক! থুথু ছিটিয়ে দিল সে উইলসনের মুখে।
পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে ফেলল উইলসন। করুণ হয়ে উঠেছে। চেহারা, কেঁদে ফেলবে যেন। এসব আমার পাওনা! কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মুখ তুললেন। প্রফেসর, শুনতে চান, কেন মমি আর কফিনটার জন্যে চোর হয়েছি আমি?।
নিশ্চয়! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন প্রফেসর, ইচ্ছে করলেই, যখন খুশি আমার ওখানে গিয়ে মমিটা নিয়ে পরীক্ষা চালাতে পারতে তুমি। চুরি করতে গেলে কেন?
হাত তুলল কিশোর। এক মিনিট। আগে আমার একটা কথার জবাব দিন। মেথু আর ওয়েবকে ধরা হয়েছে?
বাইরে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছি ব্যাটাদের, জবাব দিল রোভার।
ছুটতে পারবে না তো?
মাথা নাড়ল রোভার।
উইলসনের দিকে ফিরল কিশোর। আপনার কথা এবার বলুন।
আসলে, মমিটা মোটেই চাইনি আমি, কফিন থেকে নেমে এল উইলসন। আমার দরকার ছিল এই কাঠের বাক্সটা। প্রফেসর, রা-অরকনের মমিটা যেদিন আবিষ্কার করলেন, আমার বাবা ছিল আপনার সঙ্গে।
ছিল, মাথা নাড়লেন প্রফেসর। খুব ভাল মানুষ ছিল। কায়রোর বাজারে খুন। হল বেচারা!
সেদিন আরও একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন বাবা, বলল উইলসন। যা আপনি জানেন না। জানানো হয়নি আপনাকে। সমাধি মন্দিরে বসে কফিনটা পরীক্ষা করছিল বাবা। গোপন একটা কুঠুরি পেয়ে গেল কফিনে, হঠাৎ করেই। ছোট একটা কাঠের টুকরো দিয়ে বন্ধ ছিল কুঠুরির মুখ। ওটার ভেতরে আছে…দাঁড়ান, দেখাচ্ছি। যন্ত্রপাতির বাক্স খুলে ছোট একটা করাত বের করে নিয়ে এল ভাষাবিদ। একপাশে কাত করে ফেলল কফিনটা। একটা জায়গায় করাত বসাতে যাবে, হা হা। করে উঠলেন প্রফেসর বেনজামিন।
না না, ওকাজ কোরো না! চেঁচিয়ে বললেন প্রফেসর। কফিনটা খুব মূল্যবান অ্যানটিক, তুমিই বলেছ!
ভেতের যা আছে, তার তুলনায় কিছু না, মলিন হাসি ফুটল উইলসনের। ঠোঁটে। তাছাড়া, এক টুকরো কাঠ আপনার দরকার এটা থেকে, কার্বন টেস্টের জন্যে। কাঠের টুকরোটা শক্ত আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছিল বাবা। করাত দিয়ে না কেটে ওটা খোলা যাবে না। সত্যি বলছি, কাটা ছাড়া খোলা গেলে এটা চুরি করার। দরকার হত না। আপনার বাড়িতেই কোন এক ফাঁকে খুলে ভেতরের জিনিসগুলো নিয়ে চলে আসতে পারতাম। কফিনে করাত বসিয়ে চালাতে শুরু করল ভাষাবিদ। কাজ করতে করতেই বলল, আমার বাবা একটা চিঠি লিখেছিল আমার কাছে। তাতে লেখা ছিল সব কথা। তার মৃত্যুর পরে ওই চিঠি এসে হাতে পৌঁছে আমার। আমি তখন কলেজে পড়ছি। তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম মিশরে। কিন্তু তখন কায়রো জাদুঘরে মমিসহ কফিনটা জমা দিয়ে ফেলেছেন আপনি। আমার আর কিছুই করার। থাকল না। অপেক্ষা করে রইলাম, বছরের পর বছর। তারপর, মাস দুই আগে খবর। পেলাম, কায়রো জাদুঘর থেকে আপনার নামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মমিটা। সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গেলাম মিশরে। অনেক খুঁজে বের করলাম এক সম্ভ্রান্ত, ধনী লিবিয়ান পরিবারকে, যারা নিজেদেরকে ফারাওয়ের বংশধর বলে দাবি করে। জ্যোতিষের ছদ্মবেশে গিয়ে একদিন হাজির হলাম তাদের বাড়িতে। সহজেই বিশ্বাস করিয়ে ফেললাম, রা-অরকন তাদের পূর্বপুরুষ। বোঝালাম, যে করেই হোক, মমিটা আমেরিকান প্রফেসরের কাছ থেকে তাদের ফিরিয়ে নেয়া উচিত। আমি চেয়েছিলাম, মিস্টার জামান লোক পাঠাক আপনার কাছে মমিটা নেয়ার জন্যে। ওরা এলে আপনি ফিরিয়ে দেবেন, খুব ভাল করেই জানি; তারপর তোক দিয়ে চুরি করাতাম ওটা, আপনি কিংবা পুলিশ ভাবত, লিবিয়ান ওই ব্যবসায়ীই চুরি করিয়েছে মমিটা। সব দোষ তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ত। আমি থেকে যেতাম আড়ালে। হয়ত বিশ্বাস করবেন না প্রফেসর, চুরি করতে খুব খারাপ লাগছিল আমার। তাই সেটা না করে যাতে কাজ হাসিল হয়ে যায়, সেজন্যে অনেক ভেবে আরেক উপায় বের করেছিলাম। মমিটাকে কথা বলিয়েছি। ভেবেছি, ভয় পেয়ে আপনি ওটা ফেলে দেবেন, কিংবা কিছু একটা করবেন। আমি কফিনটা থেকে জিনিসগুলো হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ পাব। অথবা, প্রাচীন ভাষা বুঝতে না পেরে আমাকে ডাকবেন। ডেকেছেনও। কিন্তু আমি আপনাকে মমিটা আমার বাড়িতে আনতে দিতে রাজি করাতে পারলাম না। তাহলেও চুরির দরকার পড়ত না। জিনিসগুলো খুলে নিয়ে আবার আপনার জিনিস আপনাকে ফেরত দিতাম। কিন্তু সেটাও হল না। আপনি কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি হলেন না মমি। কি আর করব? বেপরোয়া হয়ে
চুরি করেছ! ধমকে উঠলেন প্রফেসর বেনজামিন। খুব ভাল কাজ করেছ! বাপের নাম রেখেছ! গাধা কোথাকার! তোমার বাপও ছিল একটা গাধা! আমাকে সব কথা খুলে বললেই পারত! তুমি না জানতে পার, কিন্তু তোমার বাপ তো জানত, টাকার কাঙাল আমি কখনও ছিলাম না, এখনও নই।
মুখ নিচু করে করাত চালাচ্ছে উইলসন। খুলে আনল ছোট একটা টুকরো। একটা ফোকরের মুখ বেরিয়ে পড়ল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল সে।
সবকটা চোখ উইলসনের হাতের দিকে। ফোকর থেকে কি বের হয়ে আসে দেখার জন্যে উদগ্রীব।
হাত বের করে আনল উইলসন। একটা কাপড়ের পুটুলি, ছোট। সাবধানে পুটুলিটা খুলল মেঝেতে রেখে। কাপড় সরাল। আলোয় জ্বলে উঠল যেন তরল আগুন। লাল, নীল, কমলা, সবুজ।
রত্ন! কথা আটকে গেছে প্রফেসরের। সামলে নিয়ে বললেন, ফারাওয়ের রত্ন! দশ লক্ষ বলছ! কিছু জান না! ওগুলোর অ্যানটিক মূল্যই ত্রিশ-চল্লিশ লক্ষ ডলার! তার ওপর রয়েছে পাথরের দাম!
তাহলে বুঝতেই পারছেন, কেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম, দীর্ঘশ্বাস ফেলল উইলসন। প্রফেসর, আমার বাবা এই পাথরের জন্যেই খুন হয়েছিল। তিন-চারটে পাথর বের করে নিয়েছিল। ওগুলোর মূল্য জানার চেষ্টা করেছিল কায়রো বাজারের এক জুয়েলারির দোকানে গিয়ে পড়ে গেল বদ লোকের চোখে। এরকম কিছু একটা ঘটতে পারে আগেই অনুমান করেছিল বাবা। তবু কৌতূহল দমন করতে পারেনি। বাজারে যাবে, এটাও চিঠিতে লিখেছিল।
অথচ গাধাটা আমাকে বলেনি, বলে উঠলেন প্রফেসর। তাহলে টতে দিতাম না কিছুতেই। কপালে লেখা ছিল অপমৃত্যু, কি আর হবে ৩ খলে! থামলেন। চোখ মিটমিট করে তাকালেন উইলসনের দিকে। যা হওয়ার তো হয়েছে। রা-অরকনের মমিটা কি করেছ?
ওখানে, গ্যারেজের পেছন দিকটা দেখিয়ে বলল উইলসন। চট দিয়ে ঢেকে রেখেছি।
যাক! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন প্রফেসর। আমার গবেষণা– থেমে গেলেন তিনি। উইলসনের দিকে তাকালেন। ওসব কথা এখন থাক। তোমার কথা আগে শুনি। অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে তোমাকে। প্রথমেই শুনতে চাই, মমিটাকে কি করে কথা বলিয়েছ?
দুই কাঁধ ঝুলে পড়েছে উইলসনের। জীবনের সব আশা-ভরসাই নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে যেন তার। রত্নের পুটুলিটা আবার বেঁধে প্রফেসরের হাতে দিয়ে বলল, এখানে গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকবেন আর কত? চলুন, ঘরে চলুন। বসবেন।
.
১৮.
মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিস। মস্ত ডেস্কের ওপাশে বসে আছেন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক। হাতে ক্লিপে আটকানো এক গাদা টাইপ করা কাগজ। পড়ছেন। গভীর মনোযোগে।
পড়া শেষ করে কাগজগুলো ডেস্কে রাখলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। মুখ। তুললেন, চমৎকার! খুব উত্তেজনা গেছে কয়েকটা দিন তোমাদের!
শুধু উত্তেজনা? মুসার মনে পড়ে গেল কফিনে আটকে থাকা মুহূর্তগুলোর কথা। কিশোরেরও মনে পড়ল। তবে ওসব নিয়ে বেশি ভাবতে চাইল না আর। যা হওয়ার হয়ে গেছে। অবশেষে ভালয় ভালয়ই তো শেষ হয়েছে সব।
হ্যাঁ, স্যার, বলল কিশোর। তাহলে কাহিনীটা নিয়ে ছবি করছেন?
নিশ্চয়, মাথা নাড়লেন চিত্রপরিচালক। এ-তো রীতিমত ভাল কাহিনী। আচ্ছা, কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও তো এবার।
কোন কথা কি বাদ গেছে, স্যার? ভুরু কুঁচকে গেছে রবিনের। কারণ লেখার ভার ছিল তার ওপর।
এই দুয়েকটা ব্যাপার, বললেন চিত্রপরিচালক। তবে, সেটাকে ভুল বলা চলে না। তুমি তো গল্প লেখনি, রিপোর্ট লিখেছ। যাই হোক এগুলো জানার জন্যে খুব কৌতূহল হচ্ছে।
বলুন, স্যার, বলল রবিন।
মিশরের আরও দুএকজন রাজাকে অতি সাধারণ মানুষের মত কবর দেয়া হয়েছে, হাতের দশ আঙুলের মাথা একত্র করে একটা পিরামিড বানালেন যেন পরিচালক। তাঁদের সঙ্গে গোপনে দিয়ে দেয়া হয়েছে অনেক মূল্যবান রত্ন। বোধহয় পরকালের পাথেয় হিসেবে। কিন্তু কথা হল, তাদেরকে ওভাবে সাধারণ মানুষের মত কবর দেয়া হল কেন? হয়ত কবর-চোরদের ভয়ে। তবে এসব ব্যাপারে এখনও শিওর নন বিজ্ঞানীরা। রা-অরকনকেও নিশ্চয় তেমনি কোন কারণে সাধারণভাবে কবর দেয়া হয়েছিল।
প্রফেসর বেনজামিনের তাই ধারণা, বলল রবিন।
কিন্তু সেটা আমাদের আলোচ্য নয়, বললেন পরিচালক। ওসব প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বিজ্ঞানীরাই মাথা ঘামাক। আমরা আমাদের কথা বলি। মিসেস চ্যানেলের বেড়ালটা কে চুরি করেছিল, এটা এখন পরিষ্কার। উইলসন কাউকে দিয়ে করিয়েছিল। মমি চুরি করেছে মেখু আর ওয়েব। কখন করল?
আমি, কিশোর আর প্রফেসর বেনজামিন টেপটা নিয়ে গিয়েছিলাম উইলসনের বাড়িতে, বলল রবিন। যখন কথা বলছিলাম উইলসনের সঙ্গে, তখন একবার কলিং বেল বেজে উঠেছিল আমরা থাকতেই। মমিটা নিয়ে ফিরে এসেছিল মেথু আর ওয়েব। কফিনটা আনেনি বলে সে সময়ই ধমক-ধামক মেরেছিল ওদেরকে ভাষাবিদ। আবার পাঠিয়েছিল কফিনটা চুরি করতে।
আনুবিস সেজে হুপারকে ভয় দেখিয়েছিল কে? নিশ্চয় মেথু কিংবা ওয়েব?
ওয়েব, স্যার। ভয় দেখিয়েই কাবু করে ফেলেছিল বেচারাকে। ওকে সামনে রেখে কিছুতেই চুরি করতে পারত না ওরা। ওদের বর্ণনা, ট্রাকের বর্ণনা ওরা বাড়ি থেকে বেরোনর সঙ্গে সঙ্গে ফোনে পুলিশকে জানিয়ে দিত খানসামা। ভয় পেয়েও বেহুশ না হলে হয়ত পিটিয়ে বেহুশ করত।
হ্যাঁ, সেটা বুঝেছি। বুঝতে পারছি না, নীল ট্রাকটাকে হারিয়ে ফেলেও এত তাড়াতাড়ি, ঠিক সময়ে গিয়ে কি করে হাজির হল উইলসনের বাড়িতে?
মুসা, তুমি বল, বলল কিশোর।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, সোজা হয়ে বসল মুসা। নীল ট্রাকটাকে হারিয়ে ফেললাম। আমরা তখন ধরে নিয়েছি, জলিলই অপরাধী। ওকে ধরতে হলে, আগে প্রফেসর বেনজামিনের বাড়িতে যেতে হবে। তিনি রিগো অ্যাণ্ড কোম্পানিতে খোঁজ নিয়ে জলিলের বাসার ঠিকানা জানতে পারবেন। তাই করা হল। জলিলের বাড়িতে গিয়ে দেখি, তিনজন কার্পেট ব্যবসায়ীকে সে বিদায় জানাচ্ছে। আমাদের মুখে নীল ট্রাক আর মেথু-ওয়েবের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল। বুঝলাম, সে কিছু জানে না। অপরাধী সে নয়। তখন এমন অবস্থা, পুলিশকে জানানো ছাড়া আর উপায় নেই। কিন্তু প্রফেসর তখনও পুলিশকে জানাতে দ্বিধা করছেন। অবশেষে ঠিক করলেন, উইলসনের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। সময়ে-অসময়ে কোন বিপদ কিংবা। বেকায়দায় পড়লেই পরামর্শ নিতে যেতেন প্রফেসর তার কাছে। আগে যেতেন। ভাষাবিদের বাবার কাছে। যাই হোক, গেলাম…
এবং গিয়েই দেখলে নীল ট্রাকটা, মৃদু হাসলেন পরিচালক। নিশ্চয় খুব চমকে গিয়েছিলে।
মেথু আর ওয়েবকে ধরে খুব পিট্টি দিয়েছে, স্যার, ওরা, হেসে বলল কিশোর। পিটুনি খেয়ে ওরা বলেছে, কফিনটা গ্যারেজে আছে। পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ওদেরকে। আগেও অনেক অপরাধ করেছে, রেকর্ড রয়েছে। পুলিশের খাতায়। প্রমাণের অভাবে ধরতে পারছিল না এতদিন। এখন তো প্রচুর। চোরাই মালসহ ওদের আস্তানাটাই পাওয়া গেছে। থামল সে। তারপর বলল, প্রফেসর উইলসনের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কোন অভিযোগ করেননি প্রফেসর বেনজামিন। কাজেই বেঁচে গেছেন তিনি। মিডল ঈস্টে চলে গেছেন প্রাচীন ভাষার ওপর গবেষণা করতে।
রত্নগুলো?
কায়রো মিউজিয়মে দান করে দিয়েছেন প্রফেসর বেনজামিন, প্রফেসর উইলসনেরও সায় রয়েছে এতে। তবে তাকে একেবারে খালি হাতে বিদায় করেনি। মিউজিয়ম। গবেষণা আর মিশরে তার থাকার সমস্ত খরচ বহন করবে ওরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি তো রয়েছেই। মোটা বেতন পাচ্ছেন ওখান থেকে, পেতেই থাকবেন। ওরাও এটাকে একটা মিশন হিসেবে ধরে নিয়েছে। মিশনের খরচ বেঁচে যাওয়ায় বরং খুশিই বিশ্ববিদ্যালয়।
গুড, কিশোরের দিকে সরাসরি তাকালেন পরিচালক। আসল রহস্যটাই জানা হল না এখনও। মমিটাকে কি করে কথা বলিয়েছে উইলসন?।
ও, ওটা? হাসি গোপন করল কিশোর। ভেন্ট্রিলোকুইজম, স্যার। রবিনের। বাবা ঠিকই বলেছিলেন।
ভুরুজোড়া কাছাকাছি চলে এল পরিচালকের। ইয়ং ম্যান, সিনেমা ব্যবসায়ে। অনেক বছর ধরে আছি। আমি জানি, ঠিক কতখানি দূর থেকে কথা ছুঁড়ে দিতে পারে ভেন্ট্রিলোকুইস্টরা। মনে হবে পুতুলের মুখ দিয়েই কথা বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সেজন্যে ওটার খুব কাছাকাছি থাকতে হয় তাদের। দূর থেকে মোটেও সম্ভব না।
চাওয়া-চাওয়ি করল মুসা আর রবিন। তারা জানত, অনেক দূর থেকে কথা ছুঁড়ে দিতে পারে ভেন্ট্রিলোকুইস্টরা।
কিন্তু, স্যার, বলল কিশোর। প্রফেসর উইলসন পেরেছেন। তবে ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ছিলেন তিনি সব সময়। সেজন্যেই প্রথমে তাকে সন্দেহ করতে পারিনি। তবে করা উচিত ছিল। কারণ, কাছাকাছি তিনিই ছিলেন একমাত্র লোক যিনি মিশরের প্রাচীন ভাষা জানেন। কিন্তু বেড়ালের পায়ে রঙ করা হয়েছে, এটা জানার আগে তার কথা খেয়ালই করিনি। বেড়ালটা ছদ্মবেশী। সন্দেহ হল, জ্যোতিষও ছদ্মবেশী। প্রথমেই মনে এল, প্রফেসর বেনজামিন ছাড়া আর কে। সবচেয়ে বেশি জানে রা-অরকন সম্পর্কে? প্রফেসর উইলসন। প্রাচীন মিশরীয় ভাষা জানেন। ধ্যানে বসার অভিনয় করে অনর্গল বলে যেতে পারা কিছুই না তার জন্যে।
ঠিকই ভেবেছ, বললেন পরিচালক। কিন্তু এসব তো শুনতে চাই না। আমার। প্রশ্ন এটা নয়।
আসছি, স্যার, সে কথায়, মাথা নাড়ল কিশোর। প্রফেসর উইলসন ভাষাবিদ। অনেক ধরনের মাইক্রোফোন, টেপ-প্লেয়ার আর রেকর্ডার ব্যবহার করতে হয়। আপনি নিশ্চয় জানেন, স্যার, আজকাল একধরনের প্যারা-বলিক মাইক্রোফোন বেরিয়েছে, যার সাহায্যে শত শত ফুট দূরের শব্দও রেকর্ড করা যায়।
জানি, উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে পরিচালকের চেহারা। বলে যাও।
এ-ও জানেন, স্যার, একধরনের স্পীকার আছে, ডিরেকশন্যাল স্পীকার, যার সাহায্যে শব্দকে ইয়ে, কি বলব।—জমাট করে ফেলা যায় বলি— হ্যাঁ, জমাট করে ফেলে শত শত ফুট দূরে চালান করে দেয়া যায়। ওই ধরনের মাইক্রোফোন আর স্পীকার আছে প্রফেসর উইলসনের বাড়িতে। প্রফেসর বেনজামিনের বাড়ি থেকে সরাসরি তিনশো ফুট দূরে তাঁর বাড়ি। চুপ করল কিশোর।
বল, বল, বলে যাও, তোমার কথা শেষ কর, তাগাদা দিলেন পরিচালক।
প্রাচীন আরবী ভাষায় কিছু কথা টেপে রেকর্ড করেছিলেন প্রফেসর উইলসন। টেলিস্কোপ আছে তার। প্রফেসর বেনজামিন কাজ করেন জানালা খুলে। সুতরাং কখন তিনি কাজ করছেন, দেখতে অসুবিধা হত না ভাষাবিদের, কথা ছুঁড়ে দিতে পারতেন মেশিনের সাহায্যে। স্পীকার ফোকাস করে লাইন দেয়াই ছিল প্লেয়ারের সঙ্গে। ক্যাসেটটা ভরে শুধু প্লে বাটনটা টিপে দিতেন। বাস শুরু হয়ে যেত মমির কথা বলা। সকালে চলে যেতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাজে। ফিরতেন দুপুরের পর। তাই, মমিটা যখনই কথা বলেছে, বলেছে বিকেলে, অর্থাৎ দুপুরের পর যে-কোন এক সময়। এবং বলেছে শুধু প্রফেসর বেনজামিনের উপস্থিতিতেই। কারণ শুধু তাকেই ভয় পাওয়ার দরকার ছিল উইলসনের। আমার সামনে কথা বলেছে, তারা দূর থেকে আমার ছদ্মবেশ ধরতে পারেননি ভাষাবিদ। কিন্তু যখন কফিনে আটকে গেল আমার, খুলে রয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে কথা থামিয়ে দিল মমি। হাল কিশোর।
হুমম!, ওপরে-নিচে মাথা দোলালেন পরিচালক। আনুবিসের মুখের বিচিত্র ভাষাও তাহলে তারই কাজ!
হ্যাঁ, স্যার, বলল কিশোর। আসলে ওয়েব যখন আনুবিস সেজে হুপারের সামনে আসছে, তার মুখে ভাষা ছুঁড়ে দিয়েছে ভাষাবিদের মেশিন। ব্যাপারটার নাম দিয়েছি আমি, উইলসনস-ভেন্ট্রিলোকুইজম।
প্রতিভা আছে লোকটার! স্বীকার করলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। তবে আবার কোন কুকর্মে জড়িয়ে না পড়লেই হল!
আর করবে বলে মনে হয় না, স্যার। যা লজ্জা পেয়েছে!
হু। তবে লোভ বড় ভয়ানক জিনিস!…যাই হোক, আমরা আশা করব, এরপর থেকে তার বিজ্ঞান সাধনা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে উইলসন।
নীরবতা।
তাহলে। নড়েচড়ে উঠল কিশোর, আমরা তাহলে আজ উঠি, স্যার?
আচ্ছা।…হা, ভাল কথা। জামান আর তার ম্যানেজার তো নিশ্চয় লিবিয়ায় ফিরে গেছে?
হ্যাঁ, স্যার, উঠে দাঁড়িয়েছে কিশোর। তাদের কোম্পানির সবচেয়ে ভাল একটা কার্পেট পাঠাবে বলেছে, তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টারের জন্যে।
ভেরি গুড, পরিচালকও উঠে দাঁড়ালেন। রকি, বীচের ওদিকে একটা কাজ আছে আমার। যেতে হবে এখনি। চল, তোমাদেরকে একটা লিফট দিই।
থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ! প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল তিন গোয়েন্দা।