ভাঙ্গাগড়া – ইসলামিক প্রেমের উপন্যাস – কাসেম বিন আবুবাকার

০১.

গ্রীষ্মের অপরাহ্ন। বেলা তখন তিনটে। রোদের তেজ কমেনি। লোজন ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। যুবাইদা খানম চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুমাচ্ছেন। শবনমের চোখে ঘুম নেই, তবু ঘুমের ভান করে পড়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে মাথা তুলে মা, মেজভাই ও হোট দুভাই বোনের দিকে তাকিয়ে দেখল, তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ধীরে ধীরে চৌকি থেকে নেমে আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে এসে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চেীধুরীদের বাগানের দিকে ছুট দিল। বাগানটা বেশি দূরে নয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাগানের ভিতরে ঢুকে আতাহারকে দেখতে না পেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল।

আতাহার আগেই এসেছে। শবনমের দেরি দেখে রেগে ছিল। তারপর তাকে আসতে দেখে সাজা দেওয়ার জন্য একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে তার দিকে লক্ষ্য রাখল।

শবনম তাকে খুঁজে না পেয়ে ভাবল, তাহলে আতাহার কি এখনও আসেনি? তারপর একটা গাছের গোড়ায় বসে পথের দিকে চেয়ে রইল।

আতাহার পিছন দিক থেকে পা টিপে টিপে এসে দুহাতে তার দুচোখ চেপে ধরল।

শবনম চমকে উঠে তার হাত ধরে বুঝতে পারল আতাহার। মুখ ভার করে বলল, যাও তোমার সঙ্গে কথা বলব না। আমার ভয় করেনা বুঝি? আসা অবধি তোমাকে না দেখে এমনিতেই ভয় লাগছিল।

আতাহার চোখ ছেড়ে দিয়ে তার পাশে বসে বলল, কিসের ভয় শুনি?

কিসের আবার? এই ভর দুপুরে কেউ কোথাও নেই। তুমি না হয়ে যদি অন্য কেউ হত?

এই সময় কেউ এদিকে ভুলেও আসবে না। আশ পাশের সবাই জানে চৌধুরীদের বাগানে ভূতের আড্ডা।

ভূতেরা যদি আমাকে ধরতে আসত?

 আতাহার হেসে উঠে বলল,আরে দূর, ভূত বলে আবার কিছু আছে না কি?

এক্ষুণি তুমি তো বললে।

লোকেরা বলে, তাই বললাম। আমি ভুত-টুত বিশ্বাস করি না। কতদিন থেকে আমরা এখানে খেলাধুলা করছি, কই কোনোদিন ভূত দেখেছি? ভুত বলে কিছু থাকলে, তারা আমাদেরকে কিছু বলেনি কেন?

তোমার কথা অবশ্য ঠিক। কিন্তু গ্রামের সবাই তবে বলে কেন? তা ছাড়া আম্মার মুখে শুনেছি। ভূতের অত্যাচারে চৌধুরীরা এখানে বাস করতে পারেনি। সবকিছু বেচে দিয়ে ঢাকা চলে গেছে।

আমিও আম্মার মুখে ঐ কথা শুনেছি। তবে আব্বার কাছে শুনেছি, চৌধুরীরা হিন্দু ছিল। তারা ভুত বিশ্বাস করে। আসলে ভূত বলে কিছু নেই। হিন্দুরা জ্বীনকেই ভূত বলে।

জ্বীনেরাও তো মানুষের ক্ষতি করে। শেখ পাড়ার কসিবুড়িকে মাঝে মাঝে জ্বীনে ধরে। তুমিও তো সে কথা জান?

হ্যাঁ জানি! জ্বীন হল আগুনের তৈরি। তাই তারা খুব উগ্র। আর মানুষের মতো তাদের মধ্যেও অনেক জাত আছে। যারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে, তারা ভালো। আর অন্যরা মানুষের ক্ষতি করে। তবে সহজে করে না।

শবনম ভয় পেয়ে বলল, এখানে যদি জ্বীন থাকে?

তা থাকতে পারে? তাতে আমাদের কি?

 তারা যদি আমাদেরকে মেরে ফেলে।

আতাহার হেসে উঠে বলল, তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আল্লাহ যার যতদিন হায়াৎ রেখেছে, তার এক সেকেন্ড আগেও কেউ কাউকে মেরে ফেলতে পারবে না। তবে ভয় দেখাতে পারে। আমার মনে হয়, এখানে আগে জ্বীনেরা থাকলেও এখন নেই। তা না হলে এতদিনে তাদের কিছু না কিছু আলামত আমরা পেতাম।

শবনম ভীতকণ্ঠে বলল, তোমার কথা হয়তো ঠিক। তবু আমার যেন কেমন ভয় ভয় করছে। এখানে থাকতে আর মন চাইছে না।

আতাহার বলল, তুমি বড় ভীতু। ঠিক আছে, এক কাজ করবে, এখানে আসবার আগে অজু করে বিসমিল্লাহর সঙ্গে একবার সূরা এখলাস, সূরা ফালাক সূরা নাস পড়ে দুহাতে তালুতে ফুঁক দিয়ে হাত দুটো সারা শরীরে বুলোবে। এভাবে তিনবার করলে গা বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর আর জ্বীনেরা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

শবনম বলল,সত্যি বলছ?

হ্যাঁ সত্যি বলছি। এ কথা অনেক আগে আম্মা আমাকে বলেছে। আমি আগে রাত্রে ঘুমিয়ে স্বপ্নে ভয় পেয়ে খুব কাঁদতাম। আম্মা তা জানতে পেরে আমাকে বলল, ঘুমোবার আগে অজু করে ঐ তিন সূরা পড়ে গা বন্ধ করে ঘুমোতে। যে দিন থেকে আমি আম্মার কথামত গা বন্ধ করে ঘুমাই, সেদিন থেকে আর ভয়ের স্বপ্ন দেখিনি।

ঠিক আছে, আমিও তাই করব। কিন্তু আম্মার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আর এখানে আসা যাবে না।

কেন?

এখানে এসে তোমার সাথে খেলাধুলা করতে আম্মা নিষেধ করেছে।

কেন?

তা আমি জানি না।

চল এক্ষুনি তোমার আম্মার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, কেন তোমাকে আসতে নিষেধ করেছে। এই কথা বলে শবনমের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল।

দুজনেরই বাড়ি দৌলতখান গ্রামে। তবে এপাড়া ওপাড়া। আতাহার যখন চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ে তখন শবনম দ্বিতীয় শ্রেনীতে। একদিন টিফিনের সময় খেলার মাঠে আতাহার শবনমকে কাঁদতে দেখে তার কাছে এসে বলল, এই মেয়ে তুমি কাঁদছ কেন?

শবনম হেঁচকি তুলতে তুলতে একটা ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ঐ ছেলেটা আমাকে শুধু শুধু মেরেছে।

আতাহার বলল, শুধু শুধু কেউ কাউকে মারে বুঝি? তুমি নিশ্চয় তার সঙ্গে কিছু করেছ?

শবনম বলল, আমাকে খেলতে ডেকেছিল, আমি যাইনি বলে মেরেছে।

আতাহারের বয়স আট নয় বছর হলে কি হবে, বেশ লম্বা। স্বাস্থ্য খুব ভাল। শবনমকে বলল, তুমি এস আমার সাথে তারপর সেই ছেলেটার কাছে এসে বলল, একে মেরেছ কেন?

ঐ ছেলেটার নাম মফিজুর। বড় লোকের ছেলে। বলল, মেরেছি বেশ করেছি, তাতে তোর কি?

আতাহার তাকে একটা ঘুসি মেরে বলল, তুই কি মনে করেছিস ওর কেউ নেই?

মফিজুর মার খেয়ে পাল্টা মারামারি শুরু করল। দুজনে মারামারি করতে করতে মাটিতে পড়ে গেল।

এমন সময় হেড মাস্টার দেখতে পেয়ে বেত নিয়ে এসে দুজনকেই দুচার ঘা লাগিয়ে বললেন, তোমরা স্কুলে কি মারামারি করতে এসেছ? তারপর তাদেরকে যার যার ক্লাসে যেতে বললেন।

তারপর থেকে শবনম আতাহারের সঙ্গে স্কুলে ও বাড়িতে খেলাধুলা করে। আতাহার প্রায় প্রতিদিন শবনমদের বাসায় যায়। শবনমকেও মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এক সঙ্গে খেলাধুলা ও স্কুলে লেখাপড়া করে মানুষ হচ্ছে। কখনো নদীর পাড়ে ছুটোছুটি করে। তবে বেশিরভাগ দিন তারা চৌধুরীদের বাগানে খেলাধুলা করে। এখন আতাহার এইটে আর শবনম সিক্সে পড়ে।

শবনমের সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়ে আতাহার তার মাকে বলল, চাচীআম্মা, আপনি নাকি শবনমকে আমার সঙ্গে খেলতে বারণ করেছেন?

যুবাইদা খানম আতাহারকে চেনেন। তার ফুফু ওনার চাচাতো ভাবি। তা ছাড়া যেদিন স্কুলের একটা ছেলে শবনমকে মেরেছিল এবং সে জন্য আতাহার সেই ছেলেটার সাথে মারামারি করেছিল, তা জানার পর থেকে তাকে বড় স্নেহ করেন। বললেন, না বাবা মানা করিনি। তবে চৌধুরীদের বাগানে যেতে নিষেধ করেছি। ওখানে জ্বীন আছে।

আতাহার বলল, আমরা তো অনেক দিন থেকে ওখানে খেলাধুলা করি, কই একদিনও তো জ্বীন দেখলাম না।

যুবাইদা খানম হেসে উঠে বললেন, পাগল ছেলের কথা শোন, জ্বীনদেরকে কি মানুষ দেখতে পায়? ওরা আগুনের তৈরি। ওদেরকে মানুষ সহসা দেখতে পায় না। তোমরা যখন খেলাধুলা কর, তখন হয়তো জ্বীনেরা সেখানে থাকে না। যেদিন তাদের সামনে পড়ে যাবে, সেদিন তোমাদের ক্ষতি করবে। তোমরা ছেলে মানুষ। তোমাদেরকে একা পেলে মেরে ফেলতে পারে। খবরদার আর কোনোদিন ওখানে খেলতে যাবে না।

আতাহার বলল, ঠিক আছে, আপনি যখন নিষেধ করছেন তখন শবনমকে নিয়ে আর যাব না; কিন্তু আমি একা যাবই। আমি জ্বীন-টীন কাউকে ভয় করি না।

যুবাইদা খানম আতঙ্কিতস্বরে বললেন, না বাবা না, তুমিও যেও না। ওদের সামনে পড়ে গেলে তোমার ক্ষতি করবে।

এমন সময় শবনমের বাবা সাখাওয়াত হোসেন, সেখানে এসে স্ত্রীর শেষ কথা শুনতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে কার সামনে পড়ে গেলে ক্ষতি করবে?

যুবাইদা খানম বললেন, শবনম আর আতাহার চৌধূরীদের বাগানে খেলতে যায়। তাই ওদেরকে জ্বীনের ভয় দেখিয়ে যেতে নিষেধ করলাম।

সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রামে কাস্টমস অফিসে চাকরি করেন। দুই তিন মাস অন্তর বাড়িতে আসেন। এক সপ্তাহ থেকে চলে যান। তাই গ্রামের সবাইকে চেনেন না। স্ত্রীর কথা শুনে বললেন, হ্যাঁ, তুমি ঠিক কথাই বলেছ। চৌধুরীদের বাগানে জ্বীন থাকে। তারপর আতাহারের দিকে চেয়ে বললেন, এই খোকা, তুমি কার ছেলে?

মোজাম্মেল খন্দকারের।

ও তুমি তা হলে খন্দকার বংশের ছেলে? তোমার আব্বা কি জাহাজে চাকরি করেন?

জ্বি?

উনি চট্টগ্রামে থাকেন না?

জ্বি বলে আতাহার বলল, আমি এখন যাই তা হলে?

সাখাওয়াত হোসেন বললেন, হ্যাঁ, আবার এস। আর শোন তোমরা কিন্তু আর চৌধুরীদের বাগানে খেলতে যাবে না।

জ্বি আচ্ছা বলে আতাহার চলে গেল।

আতাহার চলে যাওয়ার পর সাখাওয়াত হোসেন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, বেশ কিছু দিন আগের ঘটনা, বাড়ি আসব বলে আমি একদিন রিয়াজুদ্দিন বাজারে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম। একটা দোকানে সওদাপাতি কিনে পকেটে হাত দিয়ে দেখি টাকা নেই। এ পকেট সে পকেট হাতড়েও পেলাম না। ভাবলাম, বাসে আসার সময় পকেটমার হয়ে গেছে। টাকাটার জন্য যা না দুঃখ হল, দোকানদারের কাছে অপমান হতে হবে ভেবে তার চেয়ে বেশি লজ্জা হতে লাগল। আমার অবস্থা দেখে দোকানদার বললেন, কি ভাই মনে হচ্ছে, টাকা খোয়া গেছে? আমি বললাম, দুটো পাঁচশ টাকার নোট পকেটে নিয়ে বেরিয়েছিলাম, মনে হয় বাসে পকেট মেরে দিয়েছে। আপনি মালগুলো বেঁধে এক সাইডে রেখে দিন, আমি বাসা থেকে টাকা নিয়ে আসি।

আমি যখন সওদার অর্ডার লিখাচ্ছিলাম তখন একজন লোক সদাই করে ব্যাগে ভরছিলেন। তিনি তখনও সেখানে ছিলেন। পকেটমার হয়ে গেছে শুনে আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, কিছু মনে করবেন না, আপনার বাড়ি দৌলতখান না?

আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম, ত্যা কেন বলুন তো?

লোকটি বললেন, আমার বাড়িও দৌলতখান। আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমার নাম মোজাম্মেল খন্দকার। আপনার নামটা ঠিক মনে পড়ছে না।

আমি নাম বলে বললাম, এখানে কাস্টমস অফিসে চাকরি করি। দেশের বাড়িতে কম থাকি। সবাইকে তেমন চিনি না।

লোকটি বললেন, আমি এখানে জাহাজে চাকরি করি, দেশে কম থাকি। তবু কিন্তু আপনাকে দেখেই চিনেছি। তারপর দোকানদারকে বললেন, ওঁর কত টাকার সওদা।

দোকানদার স্লিপ দেখে বললেন, সাড়ে আটশো।

খন্দকার টাকাটা দোকানদারকে দিয়ে আমাকে বললেন, সওদাগুলো নিয়ে নিন ভাই। টাকাটা আমাকে এক সময় দিয়ে দেবেন। তারপর ঠিকানা দিয়ে বললেন, সময় করে একদিন আসবেন।

আমি পরের দিন তার বাসায় গিয়ে টাকাটা দিয়ে আসি।

যুবাইদা খানম বললেন, ওঁকে আমি চিনি। ওঁর বোনকে আমার চাচতো ভাই বিয়ে করেছে।

.

০২.

সাখাওয়াত হোসেনের তিন মেয়ে তিন ছেলে। তাদের মধ্যে সবার বড় খালেদা মেজ সামসুদ্দিন। তারপর নাসির উদ্দিন, শবনম, কলিম উদ্দিন ও সাবার ছোট আসমা। উনি খুব ধর্মভীরু লোক। কাস্টমস অফিসে চাকরি করলেও ঘুষ খান না। সেই জন্যে অফিস স্টাফরা ওঁকে সুফি সাহেব বলে বিদ্রূপ করে। আল্লাহপাকের মেহেরবানীতে সত্যিই উনি সুফি। কিশোর বয়স থেকে লুঙ্গি অথবা পাজামা ও ঝুল পিরান এবং সব সময় মাথায় টুপি পরে থাকতেন। কখনো দাড়ী কামাননি। কোন দামী পোষাক পরেননি। ছাত্র জীবনেও ঐ পোষাকে স্কুল-কলেজে পড়েছেন। সে সময় সহপাঠিরা তাঁকে কাটমোল্লা আবার অনেকে সুফি সাহেব বলেও কটাক্ষ করত। পরবর্তিতে চাকরি জীবনেও ঐ একই পোষাকে অফিস করেছেন এবং এখনও করছেন।

ওঁর স্ত্রী যুবাইদা খানম দৌলতখান গ্রামের ধনী শিক্ষিত ফ্যামিলির একমাত্র মেয়ে। এইচ, এস,সি পাস করার পর বিয়ে হয়। ধনী ও শিক্ষিত ফ্যামিলির মেয়ে হলেও ধর্মীয় অনুশীলনে মানুষ হয়েছেন। তাই ধার্মিক স্বামী পেয়ে তিনি ধন্য। এই এলাকার প্রায় সবাই ধর্মের আইন-কানুন মেনে চলেন। মেয়েরা পর্দা মেনে চলে। স্কুল কলেজে পড়লেও বোরখা বা চাদর ব্যবহার করে। এসবের পিছনে ভারতের অধিবাসী পীরে কামেল হযরত মৌলানা কেরামত আলী জৌনপুরী(রাঃ)–এর বিরাট অবদান রয়েছে। শুধু এই এলাকায় নয়, সারা বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব বঙ্গের) মুসলমানরা বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত মুসলমানরা যখন অজ্ঞতার কারণে বেদাঁতের মধ্যে ডুবে ছিল। তখন তিনি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এসব অঞ্চলে সফর করে ইসলামের দ্বীপশিখা জ্বালাবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। মুসলমানদেরকে বেদাঁতের অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোতে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের পশ্চিম বঙ্গের আরো একজন পীরে কামেলের অবদান রয়েছে। তিনি হলেন, ফুরফুরা শরীফের পীরে আলা হযরত মৌলানা আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ)। আজও উনাদের বংশধরগণ বাংলাদেশ সফর করে মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনি এলেম প্রচার করার জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

বর্তমান জৌনপুরের গদীনশীন পীর এখনো প্রতিবছর রমযান মাসে দৌলতখানে এসে মাসাধিক কাল থেকে ওয়াজ নসীহত করেন। দৌলতখান বাজারের দক্ষিণে বিরাট ঈদগাঁ। উনিই প্রতি বছর ঈদের নামাযের ইমামতি করেন। আশপাশের এবং বহু দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ওঁর পিছনে ঈদের নামায আদায় করে।

 সাখাওয়াত হোসেনের আসল বাড়ি ছিল হাজিপুর গ্রামে। এককালে দৌলতখান গ্রামের প্রায় বার মাইল পূর্বে মেঘনা নদী উত্তর দক্ষিণে প্রবাহিত ছিল। নদী ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বর্তমানে সেই দূরত্ব এক মাইলের মত ঠেকেছে। গত দুবছর ভাঙ্গন বন্ধ রয়েছে। নচেৎ এতদিনে দৌলতখান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেত। গত কয়েক বছরে হাজিপুরসহ এই ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম, সাহেবের হাটের দুই-তৃতীয়াংশ, সঈদপুর গ্রাম ও এই ইউনিয়নের বেশ কিছু অংশ, চৌকির হাট ও পুরো মেঘরা গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মেঘনা নদী পশ্চিম দিকের বহু গ্রাম যেমন গ্রাস করেছে তেমনি পূর্ব দিকে বড় বড় চরের সৃষ্টি করেছে। সেগুলোর নাম চর জহিরুদ্দিন, নলডোগী ও বৈকুণ্ঠপুর ইত্যাদি। এই চরের পূর্ব দিক দিয়েও মেঘনা প্রবাহিত। ওপারে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা। এই সব চরে দৌলতখান, হাজীপুর, সাহেবের হাটের মানুষেরা চাষাবাদ করে। ধান ও রবি ফসল প্রচুর জন্মায়। গরু, মহিষ হাঁস-মুরগি পালন করে। এখানকার উৎপন্ন সবকিছু দেশের বিভিন্ন জায়গায় লঞ্চ,স্টীমার ও গয়না নৌকায় করে পাঠান হয়। নদীর ভাঙ্গন রোধ করার জন্য সরকার দুবার উঁচু করে সুদীর্ঘ ভেড়ীবাঁধ দিয়েছিল। কিন্তু তা নদীগর্ভে চলে যায়। বর্তমানে যে ভেড়ীবাঁধ দেওয়া হয়েছে, তার দুপাশে চর ভাঙ্গা, অনেক গ্রামবাসী ঘোট ঘোট ঘর উঠিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। যারা এককালে। বড় বড় গৃহস্থ ছিল। যাদের বিশ, পঞ্চাশ ও একশো বিঘা ক্ষেতি জমি ছিল, তারা আজ নিঃস্ব হয়ে অভাব অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবন অতিবাহিত করছে। তাদের বেশির ভাগ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিছু সংখ্যক অবস্থাপন্ন লোক নদীর ভাঙ্গন দেখে দূর দূর গ্রামে জমি– জায়গা কিনে রেখেছিল। বাড়ি- ঘর ভেঙ্গে যাওয়ার পর তারা সেখানে এসে বসবাস করছে। আবার অনেকে সবকিছু হারিয়ে দূর গ্রামের আত্নীয়– স্বজনদের সহায়তায় জমি– জায়গা কিনে বাড়িঘর করে বসবাস করছে।

সাখাওয়াত হোসেনের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর দৌলতখান শ্বশুর বাড়িতে এসে বসবাস করছেন। বর্তমানে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী কেউ বেঁচে নেই।

মোজাম্মেল খন্দকারের বাড়ি ছিল আলিপুর গ্রামে। তার একমাত্র বোনের বিয়ে হয়েছিল দৌলতখান গ্রামে। আলিপুর যখন নদীতে বিলীন হয়ে গেল তখন তিনি স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে বোনের বাড়িতে উঠেন। পরে ওঁর দুলাভাইয়ের বাড়ির অনতি দূরে তাদেরই জায়গায় ঘর উঠিয়ে বাস করছেন। এখানে আসার এক বছর পর ওঁর স্ত্রী চার বছরের এক ছেলে রেখে মারা যান। ঐ ছেলের নাম রহিম। মোজাম্মেল খন্দকারের এক চাচাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল বাঠামারা গ্রামে। তার কোন ছেলে মেয়ে হয়নি। উনি রহিমকে মানুষ করার জন্য নিয়ে যান। আল্লাহপাকের কি শান, রহিমকে নিয়ে যাওয়ার দুবছর পর তাদের ঘরে সন্তান জন্মাল। এখন তাদের দুছেলে দুমেয়ে। রহিম তাদের। কাছে থেকে ম্যাট্রিক পাস করে।

মোজাম্মেল খন্দকার চেষ্টা চরিত্র করে বরিশালের পাতারহাটে নির্বাহী অফিসে রহিমকে চাকুরিতে ঢুকিয়ে দেন। রহিম একজনের বাড়িতে লজিং থাকত। তাদের দুটো ছেলেমেয়েকে সকালে ও রাত্রে পড়াতো। মেয়েটা তখন ক্লাস এইটে পড়ত। তার নাম সালেহা। ক্রমে সালেহা ও রহিমের ভালবাসা হয়। সালেহার মা-বাবা জানতে পেরে। তাদের বিয়ে দিয়ে দেন।

পরে মোজাম্মেল খন্দকার জানতে পেরে ছেলের উপর রাগ করে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার এক বছর পর উনি আবার রফিকা বেগমকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে আতাহার। তারপর দুই মেয়ে কুলসুম ও খাদিজা। সর্ব কনিষ্ঠ আনোয়ার। সৎ ছেলে বিয়ে করেছে শুনে রফিকা বেগম স্বামীকে বুঝিয়ে ছেলে- বৌকে বাড়িতে আনেন। মোজাম্মেল খন্দকার ছেলে- বৌকে গ্রহন করলেও বাড়িতে এনে ভিন্ন করে দেন। রহিম। মনে কষ্ট পেয়ে এক বাড়িতে না থেকে পাশে জায়গা কিনে বাড়ি করে সেখানে থাকে।

সালেহা বনেদী ঘরের মেয়ে। শ্বশুর তাদেরকে আলাদা করে দিলেও শ্বশুর শ্বাশুড়ীকে যেমন ভক্তি শ্রদ্ধা করে, তেমনি সৎ ননদ ও দেবরদের আদর যত্ন করে।

ঐ দিন আতাহার শবনমদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে মাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আম্মু, চৌধুরীদের বাগানে কি সত্যি সত্যি জ্বীন আছে?

রফিকা বেগম ছেলের কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ আছে। কিন্তু তুই এখনও ছেলেমানুষ, জ্বীনদের কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?

আতাহার বলল, আমি ও শবনম চৌধুরীদের বাগানে রোজ খেলতে যাই। সে কথা ওর আম্মা জানতে পেরে জ্বীনের কথা বলে ওখানে খেলতে যেতে নিষেধ করে বললেন, জ্বীনেরা মানুষের ক্ষতি করে। তোমরা কোনোদিন ওখানে খেলতে যেওনা।

রফিকা বেগম শবনমকে তাদের বাড়িতে অনেকবার আতাহারের সঙ্গে এসে। খেলাধুলা করতে দেখেছেন। সুন্দর ফুটফুটে শবনমকে তিনি খুব স্নেহ করেন। আদর করে কিছু না কিছু খেতে দেন। আজ ছেলের কথা শুনে বললেন, শবনমের আম্মা ঠিক কথা বলেছেন। আমিও তো তোকে ওখানে যেতে নিষেধ করেছি। তবুও যাস কেন? আর কোনোদিন যাবি না। জ্বীনদের ছোট ছেলেমেয়েদের উপর খুব লোভ। ফাঁক পেলে তুলে নিয়ে কোথায় চলে যায় কেউ বলতে পারে না।

তারপর থেকে আতাহার শবনমকে নিয়ে তাদের বাড়ির পিছনে বাগানে খেলা করে। শবনমের নানা জমি ভরাট করে এখানে সুপারি, নারিকেল, আম ও কাঁঠাল গাছ লাগিয়েছেন। এখন এইসব গাছে প্রচুর ফল হয়। বাগানটাও খুব বড়। এখানে খেলাধুলা করলেও আতাহারের মন চৌধুরীদের বাগানে যাবার জন্য ছটফট করে। এক ছুটির দিনে নাস্তা খেয়ে একা সেখানে গেল। যেখানে তারা খেলা করত, সেখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে বসে ভাবতে লাগল, আজ যদি জ্বীন আসত, তা হলে দেখতাম জ্বীন দেখতে কেমন। হঠাৎ একটা বয়স্ক দাড়ীওয়ালা পাজামা পাঞ্জাবী পরা ও মাথায় টুপি দেওয়া লোককে। বাগানের ভিতর থেকে আসতে দেখে অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল।

লোকটা কলাকোপা সিনিয়র মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। নাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। অত্যন্ত ধার্মিক। উনি জৌনপুর পীর সাহেবের খলিফা। সে জন্য অনেকে ওঁর হাতে বায়াত হয়েছেন। সবার কাছে উনি চৌধুরী হুজুর নামে খ্যাত। ওঁর কোন ছেলেমেয়ে নেই। ওঁরা দুভাই। ছোট ভাইয়ের একটা ছেলেকে পালক নিয়েছেন। সে দাখিল নবমে পড়ে। উনিই বাগানটা কিনেছেন। আজ দৌলতখান বাজারে একটা দরকারে এসেছেন। তাই আসার পথে বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। একটা ছেলেকে এই নির্জন বাগানে বসে থাকতে দেখে তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলে, কে তুমি?

আতাহার সালাম দিয়ে বলল, আমি এই গ্রামের মোজাম্মেল খন্দকারের ছেলে।

চৌধুরী হুজুর সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, এখানে বসে আছ কেন? জান না এখানে জ্বীন থাকে?

জী জানি। জ্বীন দেখব বলেই তো বসে আছি।

 চৌধুরী হুজুর অবাক হয়ে বললেন, জ্বীন কি, তা কি জান?

জী জানি। জ্বীন আগুনের তৈরী। তাদের মধ্যে ভালো মন্দ দুই-ই আছে। যারা মন্দ তারা মানুষের ক্ষতি করে। তবে আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

কেন?

আমি অজু করে তিন স্কুল পড়ে গা বন্ধ করে এসেছি।

চৌধুরী হুজুর তার পাশে একটা গাছের শিকড়ে বসে মৃদু হেসে বললেন, কার কাছে এসব শিখেছ?

আম্মার কাছে।

 তোমার আম্মা জানেন, তুমি এখানে এসেছ?

না। আম্মা এখানে আসতে নিষেধ করেছেন। আমি লুকিয়ে এসেছি।

এটা তুমি ঠিক করোনি। তুমি তো দেখছি খুব ভালো ও বুদ্ধিমান ছেলে। ভালো ছেলেরা আম্মার কথার অবাধ্য হয় না। তুমি হলে কেন?

আমি আম্মা ও আব্বার কথার অবাধ্য হই না। জ্বীন দেখার আমার খুব সখ। তাই আম্মার শুধু এই নিষেধটাই শুনিনি।

চৌধুরী হুজুর বুঝতে পারলেন, ছেলেটা ভবিষ্যৎ জীবনে উন্নতি করবে। তার মাথায় হাত দিয়ে আদর করে বললেন, কতদিন থেকে এখানে আসছ?

আগে আমি ও শবনম এখানে প্রতিদিন খেলাধুলা করতে আসতাম। শবনমের আম্মা জানতে পেরে আমাদেরকে জ্বীনের কথা বলে এখানে আসতে নিষেধ করেন। তারপর থেকে আমরা আর আসিনি। আজ জ্বীন দেখব বলে আমি একা এসেছি।

হুজুর বললেন, শবনম কে?

 আমাদের পাড়ার সাখাওয়াত চাচার মেয়ে। ক্লাস সিক্সে পড়ে।

তুমি কোন ক্লাসে পড়?

ক্লাস এইটে।

 তোমার রোল নাম্বার কত?

এক।

শবনমের রোল নাম্বার জান?

 জি জানি, তারও রোল নাম্বার এক।

খুব ভাল। তা বাবা তোমাকে একটা কথা বলি। তুমি একা একা বা শবনমকে নিয়ে এখানে এস না। জ্বীনেরা ছোট ছেলে-মেয়েদের একা পেলে তাদের ক্ষতি করে। আমি এখানে বাড়ি করার ইচ্ছা করেছি। বাড়ি করার পর আসবে।

এখানে জ্বীন আছে জেনেও বাড়ি করবেন? তারা আপনাদের ক্ষতি করবে না?

জ্বীনেরা নির্জন জায়গায় থাকে। লোকজন দেখলে এখান থেকে চলে যাবে। তা ছাড়া বড়দের তারা ক্ষতি করতে পারে না।

তা হলে কসিবুড়িকে জ্বীনে ধরে কেন?

কসিবুড়ি আবার কে?

 তার বাড়ি আমাদের গ্রামেই।

তাই নাকি? কসিবুড়িকে জ্বীনে ধরে, না তার কোনো অসুখ, তাকে না দেখে। বলতে পারব না।

আমাদের গ্রামের সবাই বলে, কসিবুড়ির সঙ্গে জ্বীন থাকে। প্রতি বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে তার উপর ভর করে। সেই সময় তার বাড়িতে অনেক লোকের ভীড় হয়। তারা যে যার অসুখের কথা বললে, সেই জ্বীন আবার ঔষধ দেয়।

তুমি এসব কথা জানলে কেমন করে?

আম্মার মুখে শুনেছি।

ঠিক আছে, যে দিন কসিবুড়িকে জ্বীনে ধরে সে দিন আমি গিয়ে দেখব তোমার কথা কতটা সত্য। কারণ শোনা কথা বিশ্বাস করতে নেই। আর তুমি এখন ছেলেমানুষ, এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না। এখন চল বাজারে যাই বলে চৌধুরী হুজুর দাঁড়িয়ে পড়লেন।

আতাহারও দাঁড়িয়ে বলল, আমি আপনার সঙ্গে বাজারে যাব কেন?

আহা চলই না বলে চৌধুরী হুজুর তার একটা হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন। তারপর দৌলতখান বাজারে একটা মিষ্টির দোকানে এসে মিষ্টির অর্ডার দিয়ে আতাহারকে বললেন, তুমি খুব ভালো ছেলে, তোমাকে আমি মিষ্টি খাওয়াব।

আতাহার কিছুতেই রাজি হল না। বলল আপনি আমাকে মিষ্টি খাওয়াবেন কেন? আপনাকে তো আমি চিনি না।

মিষ্টি দোকানের মালিক হিন্দু। নাম মাখন বাবু। তিনি চৌধুরী হুজুর ও আতাহারকে চেনেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, তুমি ছেলেমানুষ, তাই চৌধুরী হুজুরকে চেন না। তোমার বাবা চেনেন। উনি খুব মানি লোক। তুমি মিষ্টি খাও বাবা।

আতাহার তবুও খেল না। বলল, কারো কাছ থেকে কোনোকিছু খেতে আম্মা-আব্বা নিষেধ করেছেন।

চৌধুরী হুজুর তার কথা শুনে খুব খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বা বাড়িতে আছেন?

জি আছেন।

চৌধুরী হুজুর দোকানদারকে এক কেজি মিষ্টি প্যাকেট করে দিতে বললেন। তারপর প্যাকেটটা নিয়ে আতাহারের সঙ্গে তাদের বাড়ির কাছে এসে বললেন, তোমার আব্বাকে গিয়ে বল, কলাকোপা সিনিয়র মাদ্রাসার একজন শিক্ষক এসেছেন।

মোজাম্মেল খন্দকার তখন বাড়িতেই ছিলেন। আতাহার বাড়ির ভিতরে গিয়ে আব্বাকে কথাটা জানাল।

মোজাম্মেল খন্দকার ছেলেকে সঙ্গে করে বাইরে এসে ওঁনাকে দেখে সালাম দিয়ে ভক্তিগদগদ কণ্ঠে বললেন, হুজুর আপনি? আমার কি সৌভাগ্য? তারপর হাত মোসাফা করে বসবার রুমে এনে বসতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন হুজুর?

চৌধুরী হুজুর সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, আল-হামদুলিল্লাহ,আল্লাহপাকের রহমতে ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন?

আল্লাহপাকের রহমতে ও আপনার নেক দোয়ায় ভালো আছি। আতাহার বুঝতে পারল, আব্বা ওঁকে চেনেন। সে ওঁর দিকে চেয়ে ছিল। চৌধুরী হুজুর তার হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা দিয়ে বললেন, এবার তো আর না করতে পারবে না? যাও ভিতরে গিয়ে খাও।

মোজাম্মেল খন্দকার বললেন, আপনি আতাহারকে চিনলেন কি করে?..

আতাহার ভাবল, উনি যদি বাগানে যাওয়ার কথা এবং মিষ্টি না খাওয়ার কথা বলে দেন, তা হলে আব্বা বকাবকি করবেন। তাই চৌধুরী হুজুর কিছু বলার আগেই ভিতরে চলে গেল।

চৌধুরী হুজুর সব কথা বলে বললেন, আপনি খুব সৌভাগ্যবান। আপনার এই ছেলে খুব ভালো। দোয়া করি, আল্লাহ হায়াতে তৈয়্যেবা দান করুন, নেক বখত করুন। আল্লাহ চাহেতো এই ছেলে একদিন আপনার বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। ওর পড়াশোনার দিকে খুব লক্ষ্য রাখবেন।

মোজাম্মেল খন্দকার বললেন, আপনার দোয়া আল্লাহ কবুল করুক। তারপর সাধ্যমত মেহমানদারী করলেন।

যাওয়ার সময় আব্বার কথামত আতাহার চৌধুরী হুজুরকে কদমবুসি করল। চৌধুরী হুজুর দোয়া করে বললেন, ইনশাআল্লাহ তোমার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে। তখন। চিনতে পারবে তো?

আতাহার লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, জি পারব।

চৌধুরি হুজুর সালাম বিনিময় করে চলে যাওয়ার পর মোজাম্মেল খন্দকার ছেলেকে বললেন, উনি খুব বুজুর্গ লোক। আবার দেখা হলে নিয়ে আসবি। আর উনি যা বলবেন, তাই মেনে চলবি।

জ্বি আচ্ছা বলে আতাহার খেলতে চলে গেল।

.

০৩.

সাখাওয়াত হোসেনের বড় মেয়ে খালেদা যে বছর দৌলতখান সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাস করে, সেই বছরই চরখলিফা থেকে তার বিয়ের সম্বন্ধ আসে।

দৌলতখানের পশ্চিম দিকে চরখলিফা গ্রামের আব্দুল মজিদ বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। সে বি.এ পাস করে দৌলতখান সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। খালেদাকে তার খুব পছন্দ। খালেদা এস. এস. সি পাস করার পর আব্দুল মজিদ মা-বাবাকে নিজের পছন্দের কথা বলে। ওঁরা ছেলের কথামত খালেদাকে এবং তাদের বাড়িঘর সবকিছু দেখে পছন্দ করেন। তারপর কিছু দিনের মধ্যে তাকে বৌ করে ঘরে নিয়ে আসেন।

এখন তাদের দুটি ছেলেমেয়ে। ছেলের বয়স চার, আর মেয়ের বয়স এক বছর। এতদিনে সাখাওয়াত হোসেনের বড় ছেলে সামসুদ্দিন বি.এ পাস করে এক বছর হল। চট্টগ্রামে ফায়ার সার্ভিসে চাকুরি করছে। নাসির উদ্দিন নাইনে, মেজ মেয়ে শবনম এইটে, ছোট ছেলে কলিম উদ্দিন সিক্সে আর ছোট মেয়ে আসমা ফোরে পড়ে।

আতাহার এখন টেনে পড়ছে। শবনমের সঙ্গে আতাহারের সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়েছে। কিন্তু ইদানিং শবনমকে তার মা আতাহারের সঙ্গে মেলামেশা করতে দিচ্ছে না। মেয়ের স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে রাগারাগি করে বলেন, তুই এখন বড় হয়েছিস। আগের মতো আতাহারের সঙ্গে মেলামেশা করলে লোকে মন্দ বলবে। শবনম মায়ের কথা কানে নেয় না। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে আতাহারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফিরে। ফলে প্রতিদিনই তাকে মায়ের বকুনী হজম করতে হয়।

এর মধ্যে আতাহারের বাবা মোজাম্মেল খন্দকার অসুস্থ হয়ে বাড়িতে এলেন। চট্টগ্রামে কোম্পানীর ডাক্তারকে দেখিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ না হওয়াতে বাড়িতে আসেন। এখানকার ডাক্তার বললেন, এ রোগের চিকিৎসা বাড়িতে হবে না। ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার তিন দিন পর মোজাম্মেল খন্দকার মারা গেলেন।

ওঁর মারা যাওয়ার খবর পেয়ে আতাহারদের বাড়ির সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।মোজাম্মেল খন্দকারের মৃত্যুর পর তাদের সংসারে দুর্যোগ নেমে এল। উনি চরফ্যাসনে বেশ কিছু জমি কিনেছিলেন। সেই সময় সার্ভিস থেকে অনেক টাকা তুলেছিলেন। মারা যাওয়ার পর মাত্র বিশ হাজার টাকার পাওনা ছিল। ঐ বিশ হাজার টাকা তুলতে অফিসারদের পেছনে আতাহারকে দশ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। বাকি দশ হাজার টাকা তোলার পিছনে তাকে বেশ কয়েক বার ঢাকা-চট্টগ্রাম ছুটাছুটি করতে হল। তাতে তার লেখাপড়ার অনেক ক্ষতি হল। তারপর ঐ টাকা দিয়ে আব্বার কুলখানি করার পর যা হাতে ছিল, তা থেকে আবার সভাই রহিমকেও দিতে হল।

আতাহার লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কিছু করার চিন্তা ভাবনা করল।

রফিকা বেগম একদিন ছেলেকে ডেকে কষ্ট করে আর একটা বছর পড়াশোনা করে ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা দিতে বললেন।

আতাহার বলল, সংসার কিভাবে চলবে সেই চিন্তায় আমার আর লেখাপড়া করতে মন চায় না। চরফ্যাসনের জমি থেকে যা ধান আসে তাতে ছয় সাত মাসের খোরাকী হয়। তারপর কি খাব। ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়া, বাজার খরচ, কাপড়-চোপড় কিভাবে কেনা হবে ভেবে পাচ্ছি না। তাই ঠিক করেছি, ঢাকা গিয়ে একটি চাকরির চেষ্টা করব।

রফিকা বেগম বললেন, তুই ছেলেমানুষ। তার উপর তোর কোন ডিগ্রী নেই, তোকে কে চাকরি দেবে? তার চেয়ে একটু কষ্ট করে ম্যাট্রিকটা পাস করে নে। তারপর যা করার করবি।

আতাহার বলল, বললাম না, লেখাপড়া করতে আমার আর ভালো লাগে না। তারপর বলল, ঢাকায় বড় মামা আছে, খালা-খালু আছে। তাদেরকে ধরলে ইনশাআল্লাহ একটা কিছু ব্যবস্থা হবেই।

রফিকা বেগম বললেন, তুই যখন আমার কথা শুনবি না তখন তাই কর।

আতাহার অনেক দিন থেকে স্কুলে না গেলেও ছুটির সময় রাস্তায় শবনমের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন দেখা করে। প্রথম যে দিন আতাহার তাকে লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা বলল, সেদিন শবনম তাকে অনেক কথা বুঝিয়ে লেখাপড়া ছাড়তে নিষেধ করল। তারপর আতাহার যখন তার আর্থিক অনটনের কথা বলল তখন শবনম চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলল, আমার একটা কথা রাখবে আতাহার ভাই?

অন্যায় না হলে নিশ্চয় রাখব।

 আমি তোমার কাছে অন্যায় আব্দার করব, ভাবতে পারলে?

আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে মাথা ঠিক নেই। তাই হয়তো হঠাৎ ভুল করে কথাটা বলে ফেলেছি। মনে কষ্ট নিও না। বল কি তোমার আব্দার?

আমার জমানো কিছু টাকা আছে। দুটো আংটি একজোড়া কানের রিং একজোড়া। পার্শি বালি আছে। সে সব তোমাকে দেব। তুমি ঐসব বিক্রি করে এস, এস, সি পরীক্ষাটা অন্তত দাও।

শবনমের কথা শুনে আতাহারের চোখে পানি এসে গেল। ভিজে গলায় বলল, সংসার চলার মত অবস্থা থাকলে তোমার কথা নিশ্চয় রাখতাম। তারপর সেখান থেকে হনহন করে চলে গেল। এরপর থেকে শবনম লেখাপড়ার ব্যাপারে আর কিছু বলেনি।

ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আতাহার চরফ্যাসন গিয়েছিল জমি লাগিয়ে টাকা আনার জন্য। মোজাম্মেল খন্দকার প্রতি বছর চাষের সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সেখানকার জমিতে ধান চাষ করতেন। আতাহারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রায় এক সপ্তাহ থেকে জমি বিলির ব্যবস্থা করে টাকা নিয়ে এসে মায়ের হাতে দিয়ে বলল, এই টাকায় যতটা সম্ভব ধান কিনে ফেলতে হবে।

রফিকা বেগম বললেন, তুই ঠিক কথা বলেছিস। তা না হলে খাব কি?

পরের দিন আতাহার বিকেলে শবনমের সঙ্গে দেখা করে বলল, দুএক দিনের মধ্যে আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি। সেখানে চাকরির চেষ্টা করব।

শবনম ছলছল চোখে চলল, তুমি এই কদিন আসনি কেন?

 চরফ্যাসন গিয়েছিলাম জমির বন্দোবস্ত করতে।

 আমাকে বলে গেলে না কেন?

রাতে মা বলল, তুই ঢাকায় চলে যাবি বলছিস, কাল সকালে চরফ্যাসন গিয়ে জমি লাগিয়ে টাকা নিয়ে আয়। পরের দিন সকালেই রওয়ানা দিই। তাই তোমাকে কথাটা জানাবার সুযোগ পাইনি।

শবনম চোখ মুছে ভিজে গলায় বলল, এই কদিন তোমাকে না দেখে আমি অস্থির ছিলাম। ঢাকায় গেলে থাকব কি করে?

আতাহার ভিজে গলায় বলল, তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমারও খুব কষ্ট হবে। তবু না গিয়ে উপায় নেই। তোমাকে তো আমাদের সংসারের সব কথা বলেছি। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে দেখে আবার বলল, কাঁদছ কেন? আমি তোমাকে স্কুলের ঠিকানায় প্রতি মাসে চিঠি দেব। তুমিও দেবে। আর দোয়া করো, আল্লাহ যেন আমার ও তোমার মনস্কামনা পূরণ করে। তারপর চোখ মুছে দিয়ে বলল, এবার হাসি মুখে আমাকে বিদায় দাও। যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে আর হয়তো দেখা হবে না।

শবনম বলল, শুনেছি ঢাকার মেয়েরা খুব বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করে। তাদেরকে দেখে আমার কথা ভুলে যাবে না তো?

আতাহার মিষ্টি ধমকের স্বরে বলল, ছিঃ শবনম, একথা বলতে পারলে? আমরা দুজনে সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি। তখন থেকেই আমরা একে অপরকে ভালবেসেছি। ইনশাআল্লাহ যতদিন বাঁচব ততদিন সেই ভালবাসায় কোন চিড় ধরবে না। আল্লাহ ছাড়া আমার কাছ থেকে তোমাকে কেউ বিছিন্ন করতে পারবে না। তুমি শুধু দোয়া কর, আমি যেন স্বাবলম্বী হয়ে তোমার উপযুক্ত হতে পারি।

শবনম বলল, দোয়া তো নিশ্চয় করব। ওয়াদা কর, আমাকে তুমি ভুলে যাবে না।

আতাহার মৃদু হেসে বলল, করলাম। তুমিও কর।

শবনম তার পায়ে হাত দিয়ে ছালাম করে বলল, করলাম।

আতাহার ভিজে গলায় বলল, হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে ওয়াদা পূরণ করার এবং সবর করার তওফিক দাও। তারপর বলল, তোমাকে যেতে বলতে মন চাইছে না। তবু বলছি এবার বাড়ি যাও। তোমার মেজ ভাই নাসির উদ্দন আসছে। তারপর সালাম বিনিময় করে আল্লাহ হাফেজ বলে যার যার পথে চলে গেল।

নাসির উদ্দিন ও আতাহার ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে পড়েছে। দুজনের মধ্যে বেশ সখ্যতা। কিন্তু নাসির উদ্দিন শবনম ও আতাহারের সম্পর্কের কথা জানে না। আতাহার ভেবে রেখেছে আগে স্বাবলম্বী হয়ে, তারপর জানাবে। এখন শবনমের সঙ্গে রাস্তায় কথা বলতে দেখে কিছু মনে করতে পারে ভেবে আতাহার অন্য পথ ধরল।

পরের দিন এগারটায় আতাহার ঢাকা রওয়ানা দিল। এর আগে কয়েকবার সে ঢাকা এসেছে। আতাহারের তিন মামা। বড় মামা হামিদ ঢাকায় সরকারী অফিসে চাকরি করেন। তিনি ঢাকায় ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। আর তার মেজ খালাও ঢাকায় থাকেন। খালু একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। আতাহার মামার বাসায় এসে উঠল। তারপর মামাকে চাকরির কথা বলল।

হামিদ বললেন, তুই এখনো ছেলেমানুষ, কে তোকে চাকরি দেবে। অন্তত ম্যাট্রিকটা পাস করলে কিছু একটা করা যেত। কত বি, এ, এম, এ,পাস ছেলে চাকরি পাচ্ছে না। যাক, কিছুদিন থাক, চেষ্টা করে দেখি যদি কোথাও লাগাতে পারি।

মামাদের বাসা থেকে খালাদের বাসা বেশি দূরে নয়। আতাহার খালুকেও চাকরির কথা বলল।

তার খালুর নাম হাবিব। তিনিও ঐ একই কথা বললেন। প্রায় ছয়মাস মামা ও খালুর বাসায় থেকে চাকরির চেষ্টা করতে লাগল। অবশেষে একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে আটশো টাকা বেতনের চাকরি পেল। চাকরিটা খালুই ঠিক করে দেন। এর মধ্যে সে একবারও বাড়ি যায়নি। তবে মাকে ও শবনমকে চিঠি দিয়েছে। শবনমও প্রতি চিঠির উত্তর দিয়েছে।

আতাহার মামাদের বাসায় থেকে চাকরি করছে। তাই তার খরচ নেই। বেতনের টাকা থেকে সামান্য কিছু মামীর কাছে জমা রেখে বাকীটা মনি অর্ডার করে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। চাকরি পাওয়ার ছমাস পর সাত দিনের ছুটিতে প্রায় একবছর পর বাড়িতে রওয়ানা দিল।

ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় ভোলার লঞ্চ ছাড়ে। পরের দিন সকাল আটটায় পৌঁছে। লঞ্চ থেকে নেমে প্রায় দশ বার মাইল বাসে করে দৌলতখান আসতে হয়। আতাহার যখন বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল তখন বেলা দশটা। মাকে সালাম দিয়ে কদমবুসি করে বলল, কেমন আছ আম্মা?

রফিকা বেগম আজ একবছর পর ছেলেকে দেখে চোখের পানি রাখতে পারলেন না। জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেয়ে দোয়া করে বললেন, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি বাবা। তুই কেমন ছিলি? মাকে ছেড়ে এতদিন থাকতে তোর কষ্ট হয়নি?

আতাহার বলল, হয়নি আবার; কিন্তু আম্মা নতুন চাকরি, বেতনও কম। ঘন ঘন আসার টাকা কোথায়?

রফিকা বেগম বললেন, হ্যাঁরে তুই যে তোর মামাদের বাসায় থাকিস, তোর মামী বিরক্ত হয় না তো?

না আম্মা, মামীর মত মেয়ে আজকাল দেখা যায় না। আমাকে নিজের ছেলের মত দেখে। মামা-মামী তোমাকে সালাম জানিয়েছে।

রফিকা বেগম ওয়ালাইকুম আসোলাম বলে বললেন, তুই তাদেরকে খুব মেনে চলবি। তাদের ছেলেমেয়েদের আদর করবি।

আতাহার হেসে উঠে বলল, সে কথা তোমাকে বলে দিতে হবে না। মামার দুটো ছেলে। আমি যতক্ষণ বাসায় থাকি, তারা সব সময় আমার কাছেই থাকে।

তা হারে, আমি যে গত চিঠিতে তোর মামা-মামীকে আসতে বলেছিলাম, তার কি হল কিছু শুনেছিস?

মামীর আসার খুব ইচ্ছা। মামা বললেন, এখন অফিস থেকে ছুটি দেবে না। পরে আসবেন।

তোর খালা-খালু কেমন আছে? তাদের কাছে যাতায়াত করিস তো?

কি যে বল আম্মা, যাব না কেন? মামাদের বাসা থেকে খালাদের বাসা পাঁচ মিনিটের রাস্তা। প্রায় প্রত্যেক দিনই যাই। মাঝে মাঝে সেখানে খাওয়া-দাওয়া করি।

এবার জামা কাপড় খুলে গোসল করে নে। আমি মুড়ি আর নারকেল এনে দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমা। লঞ্চে কি আর ঘুম হয়েছে? রান্না করে তোকে জাগিয়ে খেতে দেব।

নদীতে বাস্তভিটে ভেঙ্গে যাওয়ার পর মোজাম্মেল খন্দকার যখন বোনের বাড়িতে এসে উঠেন, তার অনেক আগেই দুলাভাই মারা যান। বোনের একছেলে দুই মেয়ে। ছেলে ঢাকায় চাকরি করে এবং সেখানে বাড়ি করে ফ্যামিলি নিয়ে থাকে। বড় মেয়েও ঢাকায় থাকে। তার স্বামী ব্যবসা করে। ছোট মেয়ের বিয়ে তজুমদ্দিন গ্রামে দিয়েছেন। জামাই দৌলতখান বি. ডি. ও অফিসে কেরানীর চাকরি করে। তজুমদ্দিন দৌলতখান থেকে প্রায় দশ-এগার মাইল দক্ষিণে। তাই মেসে থেকে চাকরি করতো। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে থাকে। ঐ মেয়ের নাম রমিসা। আর জামাইয়ের নাম মনসুর। রমিসা যেমন মুখরা ও হিংসুটে, মনসুর তেমনি রাগি ও বদমেজাজী। সামান্য ব্যাপার নিয়ে প্রায়। প্রতিদিনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয়। আর সেই কলহ পাড়া-পড়শী সবাই শুনে। প্রথম প্রথম তারা বিরক্ত হলেও পরে গা-সওয়া হয়ে গেছে। রমিসার মা শাইমা বেগম মেয়ে জামাইয়ের কলহ সহ্য করতে না পেরে বাস্তুর একদিকে কিছু অংশ মেয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে বললেন, তোমরা ওখানে ঘর করে নিজেদের সংসার নিয়ে থাক।

মনসুর ধার-দেনা করে এবং স্ত্রীর দ্বারা শ্বাশুড়ীর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে একটা চৌচালা টিনের ঘর করে সেখানে বাস করছে।

যতদিন মামা শ্বশুর, মানে মোজাম্মেল খন্দকার বেঁচেছিলেন, ততদিন তদের সঙ্গে বেশ সদ্ভাব ছিল। মোজাম্মেল খন্দকার মারা যাওয়ার পর তারা তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে ভিটে থেকে সরাবার ষড়যন্ত্র করল। সেই জন্য কারণে অকারণে তাদের সঙ্গে ঝগড়া। করতে শুরু করল। রমিসা এমন কথাও মামীকে বলতে লাগল, আমার মায়ের জায়গা ছেড়ে তোমরা চলে যাও।

এইসব ব্যাপার দেখে শুনে শাইমা বেগম মেয়েকে রাগারাগি করে বললেন, আমার জায়গায় আমি ভাইকে থাকতে দিয়েছি। তাতে তোদের কি? তোরা ওদেরকে তাড়াতে চাস কেন? ভাইকে আল্লাহ দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছে। চার-চারটে এতিম ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাবি যাবে কোথায়? আমি ভাইপোদের নামে ঐ জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেব। দেখি তুই আর জামাই কেমন করে ওদেরকে তাড়াতে পারিস। ছোট ছোট মামাতো ভাইবোনদের জন্য তোর মায়া হয় না। লোকজন শুনলেই বা বলবে কি?

রমিসাও মায়ের উপর রেগে গিয়ে বলল, নিজের মেয়ের ছেলেমেয়ের চেয়ে ভাইয়ের ছেলেমেয়ের উপর তোমার দরদ যখন বেশি তখন তারাই তোমাকে দেখুক। আমরা আর তোমাকে দেখব না।

রমিসাকে পেটে ধরলে কি হবে, ছোটবেলা থেকে মুখরা ও ঝগড়াটে বলে শাইমা বেগম তাকে শাসন করেও ঠিক করতে পারেননি। তাই বরাবর তার প্রতি অসন্তুষ্ট। এখন মেয়ের কথা শুনে বললেন, তোরা আমাকে কি এমন দেখিস? জামাইটা শুধু মাঝে মধ্যে বাজার করে দেয়। আর যা কিছু করে আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা। অসুখে বিসুখে তোরা আমাকে দেখিস? ভাবি না দেখলে কবেই আমার কবরে ঘাস ফুটে যেত।

এরকম ঝগড়া প্রায়ই মা-মেয়ের মধ্যে হয়। এর মধ্যে আতাহার ঢাকা থেকে বাড়িতে এল। আতাহার যখন বাড়িতে থাকত তখন প্রায় বাজার থেকে ফুফুর জন্য ফল পাকাড়ি কিনে আনত। ফুফুর খোঁজ-খবর নিত। এবারে ঢাকা থেকে আসার সময় অনেক কিছু এনেছে। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার সময় শাইমা বেগম বললেন, রমিসা ও তার স্বামী তোদেরকে এখান থেকে তুলে দিতে চায় সে কথা তোর মা হয়তো তোকে বলেছে। আমার কথা হল, আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন ওরা কিছু করতে পারবে না। কিন্তু মরে যাওয়ার পর তোরা এখানে টিকতে পারবি না। তাই ভেবেছি, তোদের দুভাইয়ের নামে বাস্তুটা রেজিস্ট্রী দেব। তুই সেই ব্যবস্থা কর।

আতাহার বলল, ফুফু, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। আম্মা বলছিল, সরকারী টিউব ওয়েল ওদের ঘরের কাছে বলে কুলসুম ও খাদিজাকে পানি নিতে দেয় না। বলে এদিকে এলে হাত-পা ভেঙ্গে দেব।

শাইমা বেগম বললেন, আমি সবকিছু জানি, আমাকে কিছু বলা লাগবে না। নিজের চোখে দেখে ও কানে শুনে তোকে রেজিস্ট্রী করার কথা বললাম। জেনে রাখ, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। নিজের পেটের মেয়ে হলে কি হবে, পেটে হিংসা গিজগিজ করছে। জামাইটাও একই রকম। শিক্ষিত ছেলে দেখে মেয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, শিক্ষিত ছেলে নিশ্চয় মেয়েমানুষের স্বভাব চরিত্র পাল্টাতে পারবে। ওমা, ভবলাম কি? আর হল কি? দুজনেই কাঁটায় কাঁটায়। আর একটা কথা তোকে বলি, কথাটা তোর ফুফার কাছে শুনেছিলাম। মৌলানা কেরামত আলী জৌনপুরীর(রঃ) লেখা মেফতাহুল জান্নাত কেতাবে আছে, আগুন যেমন কাঠকে পুড়িয়ে ফেলে, হিংসা তেমনি মানুষের সব নেকীকে নষ্ট করে দেয়। তারপর শাইমা বেগম কিছুক্ষন স্বামীর স্মৃতিচারন করে ভিজে গলায় বললেন, খবরদার কোনোদিন অন্যের প্রতি হিংসা করবি না। এবারে কয়েকদিন থেকে জায়গাটা রেজিস্ট্রী করে নে। আমার বয়স হয়েছে, কবে বলতে কবে আল্লাহ আমাকে তুলে নেয় তার ঠিক কি?

আতাহার বলল, ঠিক আছে ফুফু, আমি সেই ব্যবস্থা করছি।

আসাঅব্দি শবনমকে দেখার জন্য আতাহারের মন ছটফট করছে। আজ শুক্রবার স্কুল বন্ধ। পথে দেখা হবে না। একবার চিন্তা করল, কাল স্কুল ছুটির পর পথে দেখা করবে। কিন্তু মনকে বোধ মানাতে পারল না। মসজিদে আসরের নামায পড়তে গেল। নাসির উদ্দিনও নামায পড়তে এসেছিল। নামাযের পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে নাসির উদ্দিন প্রথমে আতাহারকে দেখতে পেয়ে সালাম দিয়ে বলল, কি রে কখন এলি?

আতাহার সালামের জওয়াব দিয়ে বলল, এই তো আজ সকালে। কেমন আছিস বল।

আল্লাহর রহমতে ভালো। তুই?

আমিও তাই। তারপর তার সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করল, এর সঙ্গে ওদের বাড়িতে গেলে শবনমের সঙ্গে দেখা হবে।

নাসির উদ্দিন বলল, কিরে চুপ করে আছিস কেন?

আতাহার শবনমের কথা চিন্তা করতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলা সামলে নিয়ে বলল, এ বছর তোদের সবার রেজাল্ট কেমন হল?

ভালো, সবাই পাস করেছি।

আতাহার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার তকদিরে আর লেখাপড়া হল না। তোরা ভালো রেজাল্ট করেছিস শুনে মনে একটু শান্তি পেলাম। তারপর বলল, চল চাচী-আম্মার সঙ্গে দেখা করে আসি।

শবনম উঠোন ঝাড় দিচ্ছিল। মেজ ভাইয়ের সাথে আতাহারকে দেখে তার মন আনন্দে ছলকে উঠল। ঝাড়টা একপাশে রেখে সালাম দিয়ে বলল, আতাহার ভাই কবে এলে?

আতাহার সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আজ দশটা-এগারোটার দিকে।

নাসির উদ্দিন শবনমকে বলল, যা, আম্মাকে গিয়ে বল, আতাহার এসেছে। আর আমাদের জন্য কিছু নাস্তা নিয়ে আয়। তারপর আতাহারকে বলল, আয় আমরা পড়ার ঘরে বসি।

শবনম মায়ের কাছে গিয়ে আতাহার আসার কথা বলে বলল, মেজভাইয়া নাস্তা দিতে বলল।

যুবাইদা খানম বললেন, ছেলেটা অনেক দিন আসেনি। টিনে মুড়ি আছে তেল মাখিয়ে দিয়ে আয়, আমি চা করি।

শবনম একটা প্লেটে মুড়িতে তেল মাখিয়ে একজগ পানি ও একটা গ্লাস নিয়ে এসে বলল, এগুলো ততক্ষণ খাও, আম্মা চা বানাচ্ছে একটু পরে আসবে। তারপর সে চলে গেল।

দুবন্ধুতে মুড়ি খেতে খেতে গল্প করতে লাগল।

 কিছুক্ষণ পরে শবনম দুকাপ চা নিয়ে এসে তাদেরকে দিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল।

শবনম আসার একটু পরে যুবাইদা খানম এলেন।

ততক্ষণ ওদের চা খাওয়া হয়ে গেছে। আতাহার সালাম দিয়ে বলল, চাচী আম্মা কেমন আছেন?

যুবাইদা খানম সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। বাবা। তোমার কথা নাসির উদ্দিনের কাছে শুনেছি। ঢাকায় চাকরি করছ, তাও শুনেছি। এর আগে দেশে আসনি?

না-চাচী-আম্মা, একবছর পর আসলাম।

তোমরা গল্প কর আমি যাই বলে তিনি চলে গেলেন।

শবনম ও আসমা বাড়ির ভিতরের দিকের রুমে পড়ে। আর নাসিরউদ্দিন ও কলিম উদ্দিন বারান্দার রুমে পড়ে। দুটো রুমের মাঝখানে জানালা আছে। মা আসার পর শবনম পড়ার রুমে গিয়ে জানালার পর্দা ফাঁক করে আতাহারের দিকে চেয়েছিল। আসমা ও কলিম উদ্দিন সকালে ভবানীপুর নানার বাড়ি গেছে। নাসির উদ্দিন খাটে বসেছে। তার পিছন দিকে জানালা। আতাহার চেয়ারে বসেছে। তার মুখ জানালার দিকে।

শবনম চলে যেতে আতাহারের মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ জানালায় তাকে দেখে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

শবনম এই রুমে এসে খাতায় কিছু লিখে রেখেছিল। আতাহার তার দিকে তাকাতে সেটা দেখাল।

আতাহার পড়ল-কাল বেলা তিনটের সময় চৌধুরীদের বাগানে আসবে। লেখাটা পড়ে আতাহারের অশান্ত মন শান্ত হল। সে এই কথাটাই বলার জন্য অপেক্ষা করছিল। চোখের ঈশারায় সম্মতি জানিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর নাসির উদ্দিনকে বলল, এবার আসি?

নাসির উদ্দিন বলল, কয়েকদিন আছিস তো?

এক সপ্তাহ আছি। তারপর সালাম বিনিময় করে চলে গেল।

.

০৪.

পরের দিন যোহরের নামায পড়ে আতাহার খাওয়া-দাওয়া করল। তারপর কিছুক্ষণ। রেস্ট নিয়ে আড়াইটার সময় ঘর থেক বের হল।

রফিকা বেগম দেখতে পেয়ে বললেন, এত রোদে কোথায় যাবি?

আতাহার বলল, কাল রাতে তোমাকে ফুফুর জমি রেজিস্ট্রী দেওয়ার কথা বললাম না? সে ব্যাপারে উকিলের সঙ্গে দেখা করতে যাব। তার আগে আর একজনের সঙ্গে দেখা করব। কথা শেষ করে বেরিয়ে গেল।

শবনমকে দেখার জন্য তার মন ছটফট করছিল। তাই সময়ের আগেই বেরিয়ে পড়েছে। ওর সঙ্গে দেখা করে তারপর উকিলের কাছে যাবে।

টিফিনের পর ফোর্থ ক্লাস সোয়া দুটোই শেষ হতে শবনম শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে ছুটি নিয়ে যখন চৌধুরীদের বাগানে এল তখন পুরো আড়াইটা।

দৌলতখান বাজার থেকে যে রাস্তাটা গুপ্তগঞ্জ বাজারের দিকে গেছে সেই রাস্তার পাশে চৌধুরীদের বাগান। চৌধুরী হুজুর এর মধ্যে বাগানের উত্তর দিকের গাছপালা কেটে দুটা টিনসেড বাড়ি করেছেন। ওনার ইচ্ছা শেষ বয়সে এখানেই আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করে কাটাবেন। বাগান ও বাড়ি দেখাশুনা করার জন্য আলমাস নামের একজন তোক রেখেছেন। সে স্ত্রী ও দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে এখানে থাকে। চৌধুরী হুজুরই তাদের সংসারের খরচ চালান। মাত্র মাস দুয়েক আগে বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। বাড়ি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর একদিন এসে দেখে শুনে আলমাসকে রাখার ব্যবস্থা করেন। তারপর ফিরে যাওয়ার সময় তাকে বললেন, আতাহার ও শবনম নামে দুটো ছেলেমেয়ে যদি এখানে আসে তা হলে তাদের আদর যত্ম করবে।

 আজ তিন চার বছর হতে চলল, শবনম চৌধুরীদের বাগানে আসেনি। কিছুদিন আগে মেজ ভাইয়ের মুখে যখন শুনল, যারা বাগানটা কিনেছে তারা নাকি সেখানে বাড়ি করেছে। এখন ভাবল, আতাহার ভাই যে বলেছিল, ওখানে জ্বীন নেই, তার কথা ঠিক। জ্বীন থাকলে সেখানে বাড়ি ঘর করে লোকজন আছে কি করে? আজ স্কুল থেকে চৌধুরীদের বাগানে আসার সময় সেই সব কথা শবনমের মনে পড়ল। ভাবল, যারা। ওখানে বাস করছে, আজ আতাহার ভাইকে নিয়ে তাদের সাথে আলাপ করবে।

শবনম কাছে এসে দেখল, বাগানের একপাশের গাছপালা কেটে ছয় সাত হাত চওড়া রাস্তা করা হয়েছে। রাস্তার শেষ মাথায় দুটো টিনসেড ঘর। শবনম ঐ রাস্তা দিয়ে না গিয়ে যেখানে তারা আগে খেলাধূলা করত, সেদিকে যেতে যেতে আতাহারকে আসতে দেখে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল।

আতাহারও তাকে দেখতে পেয়েছে। কাছে এসে সালাম দিয়ে বলল, চল, আমাদের পুরোনো জায়গায় গিয়ে বসি।

শবনম সালামের জওয়াব দিয়ে বলল, তাই চল। তারপর যেতে যেতে অভিমান। ভরা কণ্ঠে বলল, তোমার জান পাথরের মত শক্ত। নচেৎ এক বছর কি করে ছিলে?

আতাহার বলল, আর তোমার বুঝি খুব নরম, যা নাকি বিরহের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে?

শবনম দাঁড়িয়ে পড়ে তার মুখের দিকে চেয়ে ভিজে গলায় বলল, সে কথা আল্লাহকে মালুম। তোমার চিঠি পেতে দেরি হলে কত রাত যে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি, তা যদি জানতে তা হলে ….. বলে থেমে গেল। কান্নায় তখন তার গলা ধরে এল, আর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

আতাহার বলল, তা আমি জানি শবনম। কথাটা একটু রসিকতা করেই বলেছি। বলাটা যে ঠিক হয়নি, তা বুঝতে পারলাম। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে দিয়ে বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে; আর কখনো বলব না। চল আমাদের পুরোনো জায়গাতে বসে দুজনে দুজনকে প্রাণভরে দেখব। কিন্তু কাঁদতে পারবে না। বলে দিচ্ছি। এতদিন পর এসে তোমার হাসি মুখ দেখতে চাই।

শবনম যেতে যেতে বলল, তুমি আবার চলে যাবে মনে হলে যে শুধু কান্না পাচ্ছে?

আতাহার বলল, আমি ওসব শুনতে চাই না। তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমারও মনে যে কি যন্ত্রনা হয়, তা আল্লাহপাক জানেন। কিন্তু তকদিরের লিখন কি খন্ডাতে পারব? পারব না। তাই সবর করে থাকি। তুমিও থাকবে।

কথা বলতে বলতে তারা তাদের সেই পুরোনো জায়গায় এসে দেখল, সেখানে নানা রকম ঘাস জন্মেছে। আতাহার ঘাস পরিষ্কার করে দুজনের বসার জায়গা করে বসে বলল, তোমার কথাই ঠিক, তোমাকে এতদিন পরে দেখে যতটা আনন্দ পাচ্ছি, কয়েকদিন পরে ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবে আরো বেশি কষ্ট পাচ্ছি।

শবনম কোনো কথা না বলে তার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

তাই দেখে আতাহারের চোখেও পানি এসে গেল। সামলে নিয়ে চোখ মুছে বলল, আবার কাঁদছ? একটু আগে না নিষেধ করলাম।

শবনম একটা বড় চাদর গায়ে দিয়ে স্কুলে যায়। চাদরের আঁচলে চোখ মুছে বলল, তোমার চোখেও তো পানি দেখলাম। তুমি ছেলে হয়ে যদি সামলাতে না পার, তবে আমি মেয়ে হয়ে কি করে পারব?

ঠিক আছে, এখন থেকে কেউ আর কাঁদব না। এবার তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট বল।

তোমার চিন্তায় ভালো করে পড়াশুনা করতে পারিনি; তবুও সেকেন্ড হয়েছি।

আলহামদুলিল্লাহ বলে আতাহার বলল, আমি দোয়া করছি সামনের বছর ইনশাআল্লাহ আরো ভাল রেজাল্ট হবে। কি হবে না?

শবনম বলল, তুমি দোয়া করলে ইনশাআল্লাহ হবে। এবার তোমার চাকরির কথা বল।

চাকরিটা ভালো; কিন্তু বেতন মাত্র আটশো টাকা। তবে সামনের মাসে দুশো টাকা বাড়বে। মামা খালাদের বাসায় থাকি বলে পুরো টাকাটা বাঁচে। নচেৎ কিছুই বাঁচাতে পারতাম না। তুমি দোয়া করো, আমার সাহেব খুব ভালো মানুষ। তাকে একটা ভালো চাকরির কথা বলেছি। উনি আশ্বাস দিয়েছেন।

শবনম বলল, আল্লাহ যেন তোমার মকসুদ পূরণ করেন।

আলমাস ঘরের দাওয়ায় বিছানা পেতে ঘুমাচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে বদনা নিয়ে ছোট প্রাকৃতিক কাজ সারবে বলে বাগানের ভিতরে গেল। তখন তার কানে এল কাছা-কাছি কারা যেন কথা বলছে। ভাবল, তা হলে কেউ কি সুপারি বা নারিকেল চুরি করতে এসেছে? প্রাকৃতিক কাজ সেরে আস্তে আস্তে যে দিক থেকে কথা বলার শব্দ আসছিল, সেদিকে এগোল। কিছুটা এসে দুজন তরুণ-তরুণীকে মুখোমুখি বসে কথা বলতে দেখে খুব অবাক হল। ভাবল, কে এরা? এই সময় এমন নির্জন জায়গায় বসে কথা বলছে? হঠাৎ চৌধুরী সাহেবের কথা মনে পড়তে কাছে এসে গলা খ্যাকারী দিয়ে বলল, কে তোমরা? এখানে কি করছ? তোমাদের কি ভয় ডর নেই?

আলমাসের কথা শুনে শবনম ভয় পেলেও আতাহার পেল না। সালাম দিয়ে বলল, আমরা এই গ্রামেরই ছেলেমেয়ে। আপনি কে?

আলমাস সালামের উত্তর দিয়ে বলল, এই বাগানের মালিক চৌধুরী হুজুর আমাকে এখানে রেখেছেন সবকিছু দেখাশুনা করার জন্য।

তার কথা শুনে শবনমের ভয় কেটে গেল। আতাহারের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে এই বাগানের মালিকের বাড়ি তৈরীর কথা বলল।

শবনমের কথা শুনে আতাহার আলমাসকে জিজ্ঞেস করল, চৌধুরী হুজুর কি এখানে আছেন?

আলমাস ভাবল, এদের কথাই হয়তো চৌধুরী হুজুর বলে গেছেন। বলল, না উনি নেই। তারপর তাদের নাম জিজ্ঞেস করল?

আতাহার নিজের ও শবনমের নাম বলল।

আলমাসের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, তোমরা আমার সঙ্গে এস।

আতাহার বলল, কেন?

সে কথা পরে বলব, আগে এসতো আমার সঙ্গে।

আতাহার শবনমকে বলল, চলল চৌধুরী হুজুরের বাড়ি দেখে আসি।

শবনম এটাই চাচ্ছিল। তাই কোন প্রতিবাদ না করে তাদের সাথে যেতে লাগল।

আলমাস তাদেরকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, চৌধুরী হুজুর মাস দুয়েক আগে বাড়ি তৈরী হয়ে যাওয়ার পর একদিন এসেছিলেন। যাওয়ার সময় আমাকে তোমাদের নাম বলে বললেন, তোমরা এলে তোমাদেরকে যেন খাতির যত্ন করি।

আতাহার জিজ্ঞেস করল, উনি আবার কবে আসবেন?

তা বলতে পারব না। হুজুরের যখন মর্জি হবে তখন আসবেন। ততক্ষণে তারা। বাড়ির কাছে এসে গেছে। আলমাস স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটু জোরেই বলল, কইগো ইউসুফের মা, একটা পাটি এনে দাওয়ায় বিছিয়ে দাও; মেহমান এসেছে।

আলমাসের স্ত্রী জয়তুন ঘরের ভিতর ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুমিয়েছিল। একটু আগে জেগেছে। স্বামীর কথা শুনে মনে করল, তাদের কোনো আত্মীয় হয়তো এসেছে। তাড়াতাড়ি করে উঠে ভালো করে গায়ে মাথায় কাপড় দিয়ে একটা খেজুর চাটাই নিয়ে বেরিয়ে এসে আতাহার ও শবনমকে দেখে অবাক হল। তারপর চাটাই বিছিয়ে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলল, এরা কারা?

সে কথা পরে বলব, আগে জগে করে পানি এনে দাও এরা হাত মুখ ধুয়ে নিক। খুব গরম পড়েছে, এদেরকে পাখা দিয়ে বাতাস কর। আমি ডাব পেড়ে নিয়ে আসি। তারপর ওদের দুজনের দিকে চেয়ে বলল, তোমরা মুখহাত ধুয়ে বস, আমি ডাব পেড়ে এক্ষুণী আসছি। কথা শেষ করে চলে গেল।

শবনম খুব অবাক হয়ে আতাহারের দিকে চেয়ে বলল, কি ব্যাপার বলতো?

আতাহার মৃদু হেসে বলল, পরে সব বলব, এখন বসি এস।

একটু পরে জয়তুন জগে করে পানি এনে বলল, তোমরা মুখ হাত ধুয়ে নাও।

ওরা হাতমুখ ধুয়ে বসার পর জয়তুন হাত পাখা দিয়ে তাদেরকে বাতাস করতে লাগল।

আতাহার তার হাত থেকে পাখাটা নিয়ে বলল, আপনাকে বাতাস করতে হবে না। তারপর জিজ্ঞেস করল, চাচী, আপনাদের গ্রামের নাম কি।

জয়তুন বলল, হুজুরের গ্রামেই আমাদের বাড়ি। ইউসুফের আব্বা ও আমি হুজুরের বাড়িতে কাজ কাম করতাম। এখানে বাড়ি করার পর হুজুর আমাদেরকে এখানে এনে রেখেছেন। তোমরা কোন গ্রামের ছেলেমেয়ে?

এবার শবনম বলল, আমাদের বাড়ি এই গ্রামেই।

তোমরা দুজন কি ভাইবোন?

 শবনম কি বলবে ঠিক করতে না পেরে চুপ করে রইল।

আতাহার বলল, হা; তবে চাচাতো।

এমন সময় আলমাস বড় বড় দুটো ডাব এনে স্ত্রীর দিকে চেয়ে বলল, কাটারীটা দাও। জয়তুন কাটারি এনে দিলে আলমাস ডাব কেটে জগে ঢেলে ওদেরকে গ্লাসে করে খেতে বলল। তারপর স্ত্রীর দিকে চেয়ে বলল, একটা বাসনে করে মুড়ি নিয়ে এস, আমি ডাব ফেড়ে শাস বের করছি।

নাস্তা পানি করতে করতে আসরের নামাযের আযান হয়ে গেল।

আতাহার বলল, এবার আমরা আসি চাচা?

 আলমাস বলল, আবার এস।

আতাহার বলল, আসব; তবে কবে আসব তা আল্লাহপাক জানেন।

কেন? তোমরা তো এই গ্রামেরই ছেলেমেয়ে, যখনই মন চাইবে চলে আসবে।

মন চাইলেই কি সব কিছু করা যায় চাচা? আমি ঢাকায় থাকি। এক বছর পর এসেছি। এক সপ্তাহ পর চলে যাব। আল্লাহপাক আবার কবে নিয়ে আসবেন, তা তিনিই জানেন।

আলমাস তার কথার মধ্যে বেদনার সুর শুনতে পেল। বলল, ঢাকা থেকে যখন ফিরবে তখন তো আসবেই। এখন যে কদিন আছ, রোজ আসতে পারবে না?

তাও আল্লাহপাকের মর্জি। তারপর আতাহার শবনমের দিকে চেয়ে বলল, কি পারবে?

শবনম বলল, তুমিই তো এক্ষুণী আল্লাহপাকের মর্জির কথা বললে, তবে তুমি বললে ইনশাআল্লাহ পারব।

আতাহার এবার আলমাসের দিকে চেয়ে বলল, ইনশাআল্লাহ চেষ্টা করব, কিন্তু রোজ রোজ মেহমানী করতে পারবেন না। আমাদেরকে যেখানে বসে বসে গল্প করতে দেখেছেন, সেখানে আমরা ছোট বেলায় প্রতিদিন খেলাধুলা করেছি। লুকোচুরি খেলেছি। যে কদিন থাকব সে কদিন আল্লাহ রাজি থাকলে হয় তো ঐখানেই আসব। আর চলে যাওয়ার সময় আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাব।

আলমাস বলল, তাই এস বাবা।

আতাহার ও শবনম তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এল। আসার সময় শবনম বলল, আলমাসের এরূপ করার কারণটা এবার বল।

আতাহার তাকে চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে কিভাবে পরিচয় হয়েছিল এবং তার পরের ঘটনা বলে বলল, উনি খুব বুজুর্গ লোক।

শবনম জিজ্ঞেস করল বুজুর্গ লোক কাকে বলে?

যারা খুব জ্ঞানী, পরহেজগার, মোত্তাকী এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আইন মোতাবেক সব কিছু মেনে চলেন এবং মানুষকেও সেই পথে চালাবার চেষ্টা করেন, তাদেরকে পীর বা বুজুর্গ লোক বলে।

তাই বলো, আমি তো আলমাস চাচার ব্যবহার দেখে এতক্ষণ খুব অবাক হয়েছি। কিন্তু চৌধুরী হুজুর তাকে আমাদের খাতির যত্ন করতে বলেছেন কেন, ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমিও ঠিক পারিনি, তবে শুনেছি পীরদের অনেক কাজ-কাম সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। ওসব কথা এখন থাক, কাল কখন আসবে বল।

প্রতিদিন তো মিথ্যে বলে স্কুল থেকে ছুটি নিতে পারব না। আজ শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে চার পিরিয়ডের পর ছুটি নিয়ে এসেছি। কাল থেকে ছুটির পর আসব।

সেটাই ভাল। ততক্ষণে তারা শবনমদের বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে। আতাহার দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, এবার তুমি যাও। ইনশাআল্লাহ কাল আবার দেখা হবে।

এরপরের দিনগুলো আতাহারের ব্যস্ততার মধ্যে স্বপ্নের মতো কেটে গেল। বাস্তুজমিটা ফুফুর কাছ থেকে রেজিস্ট্রি করে নিতে উকিলের কাছে ও কোর্টে ছুটাছুটি করতে হয়েছে। ছুটিও শেষ কাল দশটার দিকে ঢাকা রওয়ানা দিবে। আজ শেষবারের মতো শবনমের সঙ্গে দেখা করবে বলে সময়ের আগে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে অপেক্ষা করতে লাগল।

শেষ পিরিয়ডের শিক্ষক না থাকায় শবনমদের এক পিরিয়ড আগে ছুটি হয়ে গেল। সে পাড়ার মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্য রাস্তা হয়ে চৌধুরীদের বাগানে এল। অবশ্য এরকম চালাকি সে বরাবরই করেছে। আসার সময় চিন্তা করেছিল, এত তাড়াতাড়ি কি আতাহার ভাই আসবে? কিন্তু এসে যখন তাকে দেখল তখন মনটা খুশিতে ভরে গেল। কাছে এসে সালাম দিয়ে বলল, আজ এক পিরিয়ড আগে ছুটি হয়েছে। ভাবলাম, তোমার জন্য পৌনে এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। আর তুমি কিনা আমার আগে এসে গেছ।

আতাহার সালামের জওয়াব দিয়ে বলল, আমার মন বলল, তুমি হয়তো আজ তাড়াতাড়ি আসবে। তাই সময়ের আগে চলে এলাম। এস, বস।

শবনম তার সামনে বসে বই-খাতা কোলের উপর রেখে বলল, আর কদিন থাকবে?

আতাহার কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, পরশু অফিস করতে হবে। তাই ইনশাআল্লাহ কাল সকাল দশটার দিকে রওয়ানা দেব ভেবেছি।

আতাহারের কথা শুনে শবনমের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। কোনো কথা বলতে পারল না।

তার অবস্থা দেখে আতাহারের চোখেও পানি এসে গেল। ভিজে গলায় বলল, কোন দিক দিয়ে যে সাতদিন চলে গেল, বুঝতে পারলাম না। মনে হচ্ছে যেন, এই কদিনের ঘটনাগুলো স্বপ্ন।

শবনম প্রথমে চাদর দিয়ে নিজের চোখ মুছল, তারপর আতাহারের চোখ মুছে দেওয়ার সময় বলল, শুনেছি, আনন্দের দিনগুলো নাকি স্বপ্নের মত চলে যায়।

আতাহার তার দুটো হাত ধরে নিজের গালে চেপে ধরে ভিজে গলায় বলল, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে দোয়া করো, আল্লাহ যেন আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন না করেন, আমাদের দুজনকে যেন স্বামী-স্ত্রী রূপে কবুল করেন। কেন কি জানি মনে হচ্ছে, আবার হয়তো তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হবে না।

শবনম চোখের পানি রোধ করতে পারল না। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, এই দোয়া আমি সব সময় করি। আব্বা-আম্মার মুখে শুনেছি, ঈমানদার বান্দা-বান্দীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। আমার পূর্ণ একিন আছে, আল্লাহ আমাদেরকে নিরাশ করবেন না। তারপর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আতাহারের দুটো হাত নিজের গালে চেপে ধরে বলল, আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। তিনি তোমাকে হেফাজত করবেন এবং কামিয়াব করবেন।

আতাহার বলল, আমিও তোমাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। তিনি তোমাকেও কামিয়াব করবেন।

শবনম আমিন বলে বলল, চল এবার ফেরা যাক।

আতাহার ও শবনম এই কদিন চৌধুরীদের বাগানে প্রতিদিন এলেও সময়ের অভাবে মাত্র আর একদিন আলমাস ও তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে।

আলমাস প্রথম দিন তাদেরকে খাতির যত্ম করলেও দুজনের সম্পর্কের কথা বুঝতে পারেনি। তারা চলে যাবার পর স্ত্রীর কাছে শুনেছে, ওরা একে অপরকে ভালবাসে। কিন্তু। আজ আড়াল থেকে তাদের সবকিছু দেখে শুনে জানতে পারল ওরা একে অপরকে কি দারুন ভালবাসে। হঠাৎ চৌধুরী হুজুরের কথা মনে পড়তে ভাবল, উনি বুঝি ব্যাপারটা জানেন এবং ওদেরকে খুব স্নেহ করেন। তাই খাতির যত্ন করতে বলেছেন। ওদেরকে চলে যেতে দেখে এগিয়ে এসে বলল, আমাদের সঙ্গে দেখা না করে চলে যাচ্ছ যে?

আতাহার সালাম দিয়ে বলল, আজ আমাদের মন ভালো নেই চাচা। তাই ভুলে গেছি। চলুন চাচির সঙ্গে দেখা করে আসি।

দেরি হয়ে যাবার আপত্তি সত্ত্বেও আলমাস ও জয়তুন শুনল না। তারা নাস্তা বানিয়ে খাইয়ে তবে বিদায় দিল। বিদায় দেওয়ার সময় আলমাস আতাহারকে বলল, ঢাকা থেকে এলে কিন্তু মা শবনমকে নিয়ে আসবে।

তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় এসে আতাহার শবনমকে বলল, তুমি যাও, আমি বাজার হয়ে ঘুরে যাব।

শবনম সালাম জানিয়ে আল্লাহ হাফেজ বলে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর চোখের পানি এসে গেছে বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল।

আতাহার সালামের জওয়াব দিয়ে আল্লাহ হাফেজ বলে তার চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। একসময় তার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ল। শবনম চোখের আড়াল হয়ে যেতে চোখ মুছে বাজারের পথ ধরল।

পরের দিন আতাহার দশটার সময় খাওয়া দাওয়া করে ভারাক্রান্ত মনে ঢাকায় রওয়ানা দিল।

Super User