রাস। এ ভালোই হলো যে দুজনের সঙ্গে একত্রেই দেখা হলো। আরও আগেই আসতে পারতাম কিন্তু বিলাসের হঠাৎ সর্দিগর্মির মত হয়ে—মাথায়-মুখে জল দিয়ে, বাতাস করে সে একটু সুস্থ হলে তবে আসতে পারলাম—তার মুখে সবই শুনতে পেলাম দয়ালবাবু। (দয়াল কি একটা বলিবার চেষ্টা করিতেই হাত নাড়িয়া তাঁহাকে বাধা দিয়া) না না না—তার দোষ-স্খালনের চেষ্টা করবেন না দয়ালবাবু। যে আপনার মত সাধু ভগবৎ-প্রাণ ব্যক্তিকেও অসম্মান করতে পারে তার সপক্ষে কিছুই বলবার নেই। আপনার কর্মে শৈথিল্য প্রকাশ পেয়েছে,—কিন্তু তাতে কি? সাহেবরা বিলাসের কর্তব্যনিষ্ঠা, তার কর্মময় জীবনের শত প্রশংসা করুক, কিন্তু আমরা ত সাহেব নয়, কর্মই ত আমাদের জীবনের সবখানি অধিকার করে নেই! কিন্তু ও শাস্তি পেলে কার কাছে? দেখেছেন দয়ালবাবু করুণাময়ের করুণা—ও শাস্তি পেলে তারই কাছে যে তার ধর্মসঙ্গিনী, আত্মা যাদের পৃথক নয়! দীর্ঘজীবী হও মা, এই ত চাই! এই ত তোমার কাছে আশা করি! (ক্ষণকাল পরে) কিন্তু এই কথাটা আমি কোনমতে ভেবে পাইনে বিজয়া, বিলাস আমার মত খোলাভোলা সংসার-উদাসী লোকের ছেলে হয়ে এতবড় কর্মপটু পাকা বিষয়ী হয়ে উঠল কি করে? কি যে তাঁর খেলা, কি যে সংসারের রহস্য কিছুই বোঝবার জো নেই মা!
দয়াল। তাঁর দোষ নেই রাসবিহারীবাবু, আমারই ভারী অন্যায় হয়ে গেছে। এই তরুণ বয়সেই কি যে তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, কি যে তাঁর চিত্তের দৃঢ়তা তা বলতে পারিনে। আমাকে তিনি উচিত কথাই বলেছেন।
রাস। উচিত কথা? এবার আমি সত্যিই দুঃখ পাব দয়ালবাবু। আপনি ভক্তিমান, জ্ঞানবান, কিন্তু বয়সে আমি বড়। এ আমি জানি, সংসারে অত্যন্ত বস্তুটা কিছুরই ভালো নয়। এও জানি, বিলাসের কর্ম-অন্ত প্রাণ, এখানে সে অন্ধ, কিন্তু তাই বলে কি মানীর মান রাখতেও হবে না? না না, আমি বুড়োমানুষ, সে তেজও নেই, জোরও নেই—এ আমি ভালো বলতে পারব না। নিজের ছেলে বলে ত এ-মুখ দিয়ে মিথ্যে বার হবে না দয়ালবাবু!
দয়াল। সাধু! সাধু!
রাস। এ ভালই হয়েছে মা। আমি অপার আনন্দ লাভ করেচি যে, বিলাস তার সর্বোত্তম শিক্ষাটি আজ তোমার হাত থেকেই পাবার সুযোগ পেলে। কিন্তু কি ভ্রম দেখেছেন দয়ালবাবু, আনন্দে এমনি আত্মহারা হয়েছি যে, আমার মাকেই বোঝাতে যাচ্চি। যেন আমার চেয়ে তিনি তার কম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষিণী। আজ এত আনন্দ ত শুধু এইজন্যেই যে তোমার কাজ তুমি নিজের হাতে করেচ। তার সমস্ত শুভ যে শুধু তোমার হাতেই নির্ভর করচে। তার শক্তি, তোমার বুদ্ধি। সে ভার বহন করে চলবে, তুমি পথ দেখাবে। জগদীশ্বর! (চোখ তুলিয়া) ইস! চারটে বাজে যে! অনেক কাজ এখনো বাকী, আসি মা বিজয়া! আসি দয়ালবাবু। (প্রস্থানোদ্যম)
দয়াল। চলুন আমিও যাই।
রাস। কিন্তু আসল কথাটাই যে এখনো বলা হয়নি। (ফিরিয়া আসিয়া উপবেশন করিলেন) তোমার এই বুড়ো কাকাবাবুর একটি অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে। বলো রাখবে?
বিজয়া। বলুন, কি?
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 48
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 380