রাস। লজ্জায়, ব্যথায়, অনুতাপে সে দগ্ধ হয়ে যাচ্চে। কিন্তু এক্ষেত্রে তোমাকে একটু কঠিন হতে হবে। সে এসে ক্ষমা চাইলেই যে ভুলে যাবে সে হবে না। শাস্তি তার পূর্ণ হওয়া চাই। অন্ততঃ একটা দিনও এই দুঃখ সে ভোগ করুক এই আমার অনুরোধ।

বিজয়া। বিলাসবাবু কি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন?

রাস। না, সে আমি বলব না,—সে কিছু নয়—ও-কথা শুনে তোমার কাজ নেই।

বিজয়া। কালীপদ?

[কালীপদ প্রবেশ করিল]

কালীপদ। আজ্ঞে—

বিজয়া। বিলাসবাবু আফিসঘরে আছেন, একবার তাঁকে ডেকে আনো।

কালীপদ। সে আজ্ঞে—

[কালীপদ চলিয়া গেল

রাস। (সস্নেহ মৃদু ভর্ৎসনার সুরে) ছি মা! শুনে পারলে না থাকতে? এখুনি ডেকে পাঠালে? (হাসিয়া দয়ালের প্রতি) ঠিক এই ভয়টিই করেছিলুম দয়ালবাবু। সে ব্যথা পাচ্চে শুনলে বিজয়া সইতে পারবে না—তাই বলতে চাইনি—কি করে হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—কিন্তু আমি বাধা দেব কি করে? মা যে আমার করুণাময়ী! এ যে সংসারে সবাই জেনেছে। আসুন দয়ালবাবু—

দয়াল। চলুন যাই।

[কালীপদ প্রবেশ করিল]

কালীপদ। ছোটবাবু বাড়ি চলে গেছেন, তাঁকে ডেকে আনতে লোক গেল।

রাস। লোক গেল? আজ তাকে না ডাকলেই ভালো হতো মা। কিন্তু—ওঃ! গোলেমালে একটা মস্ত কাজ যে আমরা ভুলে যাচ্ছি। দয়ালবাবু, আজ যে বছরের প্রথম দিন! আমাদের যে অনেক দিনের কল্পনা আজকের শুভদিনে বিশেষ করে মাকে আমরা আশীর্বাদ করব! তবে, ভালোই হয়েছে, আমরা না চাইতেই বিলাসকে ডেকে আনতে লোক গেছে। এ-ও সেই করুণাময়ের নির্দেশ। আসুন দয়ালবাবু, আর বিলম্ব করব না—সামান্য আয়োজন সম্পূর্ণ করে নিই—বিলাস এসে পড়লেই আমরা ফিরে এসে বিজয়াকে আমাদের সমস্ত কল্যাণ-কামনা উজাড় করে ঢেলে দিয়ে যাব। আসুন।

[উভয়ের প্রস্থান। বিজয়া যাইবার পূর্বে টেবিলের চিঠিপত্রগুলা গুছাইয়া
রাখিতেছিল, কালীপদ মুখ বাড়াইয়া বলিল]

কালীপদ। মা, ডাক্তারসাহেব—
[বলিয়াই অদৃশ্য হইল। নরেন প্রবেশ করিয়া
hat ও ছড়িটা একপাশে রাখিতে রাখিতে]

নরেন। নমস্কার! পথ থেকে ফিরে এলুম, ভাবলুম, যে বদ্‌রাগী লোক আপনি, না এলে হয়ত ভয়ানক রাগ করবেন।

বিজয়া। ভয়ানক রেগে আপনার করতে পারি কি?

নরেন। কি করতে পারেন সেটা ত প্রশ্ন নয়, কি না করতে পারেন সেটাই আসল কথা। কিন্তু বাঃ! আমার ওষুধে দেখছি চমৎকার ফল হয়েছে।

বিজয়া। আপনার ওষুধে কি করে জানলেন? আমাকে দেখে, না কারো কাছে শুনে!

নরেন। শুনে। কেন, আপনি কি দয়ালবাবুর কাছে শোনেন নি যে আমার ওষুধ খেতে পর্যন্ত হয় না, শুধু প্রেস্‌ক্রিপশনটার ওপর চোখ বুলিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিলেও অর্ধেক কাজ হয়! হাঃ—হাঃ—হাঃ—

বিজয়া। (হাসিয়া ফেলিয়া) তাই বুঝি বাকী অর্ধেকটা সারাবার জন্যে পথ থেকে ফিরে এলেন? কিন্তু ওদিকে নলিনী বেচারা যে আপনার অপেক্ষা করে পথ চেয়ে রইল?

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়