[ব্যগ্রপদে রাসবিহারীর প্রবেশ। তাঁহার পিছনে দয়াল, হাতে রৌপ্যপাত্রে ফুল, চন্দন ও একজোড়া মোটা সোনার বালা। তাঁহার পিছনে দুইজন ভৃত্যের হাতে ফুল, মালা ইত্যাদি এবং তাহাদের পিছনে কর্মচারীর দল। বিজয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল]
রাস। মা বিজয়া, আজ যে নব–বৎসরের প্রথম দিন সে কথা কি তোমার স্মরণ আছে?
বিজয়া। একটু পূর্বেই আপনি বলে গেলেন, নইলে ছিল না।
রাস। (মৃদু হাসিয়া) তুমি ভুলতে পার, কিন্তু আমি ভুলি কি করে? এই যে আমার ধ্যান–জ্ঞান। বনমালী বেঁচে থাকলে আজকের দিনে তিনি কি করতেন মনে পড়ে মা?
বিজয়া। পড়ে বৈ কি। আজকের দিনে বিশেষ করে তিনি আমাকে আশীর্বাদ করতেন।
রাস। বনমালী নেই, কিন্তু আমি আজ আছি। ভেবেছিলাম এই কর্তব্য প্রভাতেই নিষ্পন্ন করব, তোমাদের স্বাস্থ্য, আয়ু, নির্বিঘ্ন–জীবন ভগবানের শ্রীচরণে প্রসাদ ভিক্ষা করে নেব, কিন্তু নানা কারণে তাতে বাধা পড়ল। কিন্তু বাধা ত সত্যি নয়, সে মিথ্যে। তাকে স্বীকার করে নিতে পারিনে ত মা! জানি আজ তোমার মন চঞ্চল, তবু দয়ালকে বললাম, ভাই, আজকের এই পুণ্যদিনটিকে আমি ব্যর্থ যেতে দিতে পারব না, তুমি আয়োজন কর। আয়োজন যত অকিঞ্চনই হোক,—কিন্তু নিজেই যে আমি বড় অকিঞ্চন মা! দয়াল বললেন, সময় কৈ? বেলা যে যায়। সজোরে বললুম, যায়নি বেলা—আছে সময়। কোন বিঘ্নই আজ আমি মানব না। আয়োজনের স্বল্পতায় কি আসে–যায় দয়াল, আড়ম্বরে বাইরের লোককেই শুধু ভোলানো যায়, কিন্তু এ যে বিজয়া! মা যে বুঝবেই এ তার পিতৃকল্প কাকাবাবুর অন্তরের শুভ–কামনা। লোক ছুটল আমার বাড়িতে, বাগানে ছুটল মালী ফুল তুলতে—মাঙ্গলিক যা– কিছু সংগৃহীত হতে বিলম্ব ঘটল না। মুকুট-মালা না-ই বা হলো—এ যে কাকাবাবুর আশীর্বাদ! কিন্তু বিলাস এল না কেন? তখনি স্মরণ হলো সে আসবে কি করে? সে সাহস তার কৈ? ভাবলাম ভালই হয়েছে যে সে লজ্জায় লুকিয়ে আছে। এমনিই হয় মা,—অপরাধের দণ্ড এমনি করেই আসে। জগদীশ্বর! (একমুহূর্ত পরে) তখন কাছারিঘরে ডাক দিয়ে বললাম, তোমরা কে কে আছ এসো আমাদের সঙ্গে। আজকের দিনে তোমাদের কাছেও বিজয়ার চিরদিনের কল্যাণ–ভিক্ষা করে আমি নিতে চাই। এসো ত মা আমার কাছে। (এই বলিয়া তিনি নিজেই অগ্রসর হইয়া গেলেন। বিজয়া উদ্ভ্রান্ত–মুখে এতক্ষণ নীরবে চাহিয়াছিল, এইবার ঘাড় হেঁট করিল। রাসবিহারী তাহার কপালে চন্দনের ফোঁটা দিলেন, মাথায় ফুল ছড়াইয়া দিতে দিতে ) সংসারে আনন্দ লাভ কর, স্বাস্থ্য–আয়ু–সম্পদ লাভ কর, ব্রহ্মপদে অবিচলিত শ্রদ্ধা–ভক্তি–বিশ্বাস লাভ কর, আজকের পুণ্যদিনে এই তোমার কাকাবাবুর আশীর্বাদ মা।
[বিজয়া দুই হাত জোড় করিয়া নিজের ললাট স্পর্শ করিয়া নমস্কার
করিল। অনেকের হাতেই ফুল ছিল তাহারা ছড়াইয়া দিল]
রাস। দেখি মা তোমার হাত–দুটি—(এই বলিয়া বিজয়ার হাত টানিয়া লইয়া একে একে সেই সোনার বালা–দুটি পরাইয়া দিলেন) টাকার মূল্যে এ–বালার দাম নয় মা, এ তোমার—(দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া) এ আমার বিলাসের জননীর হাতের ভূষণ। চেয়ে দেখ মা কত ক্ষয়ে গেছে। মৃত্যুকালে তিনি বলেছিলেন এ যেন না কখনো নষ্ট করি, এ যেন শুধু আজকের দিনের জন্যেই—
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 54
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 291