নরেন। তা বটে। দয়ালবাবুর স্ত্রীকে গিয়ে একবার দেখে আসতে হবে। কিন্তু আমাকে নিয়ে আচ্ছা কাণ্ড করলেন ত বিলাসবাবুর সঙ্গে! ছি ছি ছি ছি—হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—
বিজয়া। এর মধ্যে বললে কে আপনাকে?
নরেন। দয়ালবাবু। এইমাত্র নীচে তাঁর সঙ্গে দেখা—ছি ছি ছি—আপনার ভারী অন্যায়! ভারী অন্যায়! হাঃ হাঃ হাঃ—
বিজয়া। অন্যায় আমার, কিন্তু আপনি এত খুশী হয়ে উঠলেন কেন?
নরেন। (গম্ভীর হইয়া) খুশী হয়ে উঠলুম? একেবারে না। অবশ্য এ কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারিনে যে শুনেই প্রথমে একটু আমোদ বোধ করেছিলুম, কিন্তু তারপরে বাস্তবিক দুঃখিত হয়েছি। আপনার মত বিলাসবাবুর মেজাজটাও তেমন ভাল নয়—ভবিষ্যতে আপনারা যে দিনরাত লাঠালাঠি করবেন!
বিজয়া। আপনি ত তাই চান।
নরেন। (জিভ কাটিয়া সলজ্জে) না না না না—ছি ছি, ও-কথা বলবেন না। সত্যিই আমি শুনে বড় ক্ষুণ্ণ হয়েছি। তাঁর মেজাজটা ভালো নয় বটে, কিন্তু আপনি নিজেও যে অসহিষ্ণু হয়ে কতকগুলো অপমানের কথা বলে ফেলবেন সে-ও ভারী অন্যায়। ভেবে দেখুন দিকি কথাটা প্রকাশ পেলে ভবিষ্যতে কি রকম লজ্জার কারণ হবে? বিশেষ করে আমার জন্যে আপনাদের মধ্যে এরূপ একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়—
বিজয়া। তাই আহ্লাদে হাসি চাপতে পাচ্চেন না?
নরেন। (গম্ভীরমুখে) ছি ছি, কেন আপনি বার বার এ-রকম মনে করচেন? বিশ্বাস করুন যথার্থ-ই আমি বড় দুঃখিত হয়েছি। কিন্তু তখন আমি আপনাদের সম্বন্ধে কিছুই জানতুম না। জ্বরের ঘোরে কি সামান্য একটা কথা আপনি বললেন তাতেই এত! প্রথমে আমি ত হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলুম বিলাসবাবুর উগ্রতা দেখে, তারপরে বাইরে এনে রাসবিহারীবাবু আমাকে যা বুঝিয়ে বললেন তারও সঙ্কেত ঐ ঈর্ষা, এবং মিস নলিনীও স্পষ্ট বললেন ঈর্ষা, আর দয়ালবাবুও তাতেই যেন সায় দিলেন। শুনে লজ্জায় মরে যাই, অথচ সত্যি বলচি আপনাকে, এত লোকের মধ্যে আমার মত একটা নগণ্য লোককে বিলাসবাবুর ঈর্ষা করার কি আছে আমি ত আজও ভেবে পেলুম না। (ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া) আপনারা ত আবশ্যক হলে সকলের সঙ্গে কথা কন, এতে এমনি কি দোষ তিনি দেখতে পেলেন? যাই হোক, আপনারা আমাকে মাপ করবেন—আর ঐ বাংলায় কি যে বলে—অভি—অভিনন্দন—আমিও আপনাকে তাই জানিয়ে যাচ্ছি, আপনারা সুখী হোন।
বিজয়া। (মুখ ফিরাইয়া) অভিনন্দন আজ না জানিয়ে বরঞ্চ সেইদিনই আশীর্বাদ করবেন।
নরেন। সেদিন? কিন্তু ততদিন পারব থাকতে?
বিজয়া। না, সে হবে না। রাসবিহারীবাবুকে কথা দিয়েছেন, আপনাকে থাকতেই হবে।
নরেন। কথা দিইনি বটে, কিন্তু দিতেই ইচ্ছে করে। যদি থাকি আসবই। (বিজয়া অলক্ষ্যে চোখ মুছিয়া ফেলিল) ভাল কথা। আমার আর একটা ক্ষমা চাইবার আছে। সেদিন কালীপদকে দিয়ে হঠাৎ microscope-টা পাঠিয়েছিলেন কেন?
বিজয়া। আপনার জিনিস আপনি নিজেই ত ফিরে চেয়েছিলেন।
নরেন। তা বটে, কিন্তু দামের কথাটা ত বলে পাঠান নি? তা হলে ত—
বিজয়া। আমার ভুল হয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি আপনি ত আমাকে কম দেননি!
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 50
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 188