তানজিলার বিয়ে হয়েছে জয়নগর থেকে প্রায় সাত আট মাইল দূরে জামতলা গ্রামে। যাতায়াতের জন্য ভালো রাস্তা নেই। তাই কোনো যানবাহন চলাচল করে না। বর্ষাকালের চার মাস ছাড়া শীত ও গ্রীষ্মের সময় অল্প কিছু রিক্সা চলাচল করে। আর গরুর গাড়িতে করে উচ্চ পরিবারের লোকজন ও মেয়েরা যাতায়াত করে। তবে যাদের হাঁটার ক্ষমতা আছে, তারা হেঁটেই যাতায়াত করে। কারণ গ্রামের এবড়ো থেবড়ো মাটির রাস্তায় রিক্সা ও গরুর গাড়ির আঁকুনী খেয়ে মানুষের কোমর ব্যাথা হয়ে যায়। আবার অনেকের মাথা ধরে যায়। কেউ কেউ বমিও করে দেয়। তবে এসব এলাকায় বর্ষাকালে যাতায়াতের খুব সুবিধা। মাঠ ঘাট পানিতে ডুবে গেলে নৌকা করে একেবারে গন্তব্য স্থানে যাওয়া যায়। এখন গ্রীষ্মকাল। তাই ছোট চাচার মুখে যানবাহনের দুরাবস্থার কথা শুনে রিয়াজুল তার সঙ্গে হেঁটে জামতলা রওয়ানা দিল। প্রায় আড়াই ঘন্টা পর ফুফুর বাড়ি এসে পৌঁছাল। এত রাস্তা সে কোনোদিন হাঁটেনি। বেশ কষ্ট অনুভব করল।

আলাপ পরিচয়ের পর রিয়াজুল ফুফা-ফুফুকে কদমবুসি করল।

তানজিলা ভাইপোকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। তারপর চোখ মুখ মুছে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলেন।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সামসুদ্দিন মিয়া সবাইকে নিয়ে জমি রেকর্ড করাবার কথা তুলে রিয়াজুলের মতামত বললেন।

স্ত্রী কিছু বলার আগে আকবর হোসেন বললেন, রিয়াজুল খুব ভালো কথা বলেছে। আমার মনে সেটা করাই সর্বোত্তম।

স্বামী থেমে যেতে তানজিলা বলল, আমিও তোমার সাথে একমত। কিন্তু বড় ভাই যদি রাজি না হন, তখন কি হবে?

কেউ কিছু বলার আগে রিয়াজুল বলে উঠল, আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। আমার যতদূর ধারণা, ইনশাআল্লাহ কোরআন-হাদিসের কথা বলে বড় চাচাকে রাজি করাতে পারব।

সামসুদ্দিন মিয়া বললেন, আল্লাহ তোমার চেষ্টা সফল করুন। তোমার ফুফু জানতে চাচ্ছেন, একান্তই যদি রাজি না হন তা হলে কি করবে?

রিয়াজুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল, তা হলে আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেই মতো আমি ও রফিক হাকিমের কাছে বড় চাচার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব।

সামসুদ্দিন মিয়া বললেন, বেশ তাই হবে।

ফুফুর বাড়ি দু’দিন থেকে পরের দিন দুপুর নাগাদ ফুফু ও রফিককে নিয়ে রিয়াজুল ৬ সামসুদ্দিন মিয়া জয়নগর ফিরে এল।

বিকেলে আসরের নামায পড়ে রিয়াজুল আসমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। পুকুর পাড়ের কাছে এসে আমাকে একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে দেখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

ছয় মাস পর পনের দিনের ছুটি পেয়ে মতি গতকাল রাত নটার সময় এসে আজ আসমাদের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিল। চাচার হাতে দু’শো টাকাও দিয়েছে।

ফিরে আসার সময় আসমাও পুকুর পাড় এসে মতির কাছ থেকে ঢাকার গল্প শুনছিল। একসময় আসমা কয়েকদিন আগে বালিয়াকান্দি থেকে ফেরার সময় যে বিপদে পড়েছিল এবং কিভাবে বিপদ থেকে উদ্ধার পেল, তা বলল।

মতি খুব রেগে গিয়ে বলল, চেয়ারম্যানের ছেলে বলে ইহসান বারবার অপকীর্তি করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। তবে যিনি তোমাকে রক্ষা করেছেন, তার জায়গায় আমি হলে তাকে খুন করে ফেলতাম। আল্লাহ যদি সেদিন দেন, তা হলে আমি ওর হাত দুটো ভেঙ্গে দেব। তারপর বলল, যিনি তোমাকে উদ্ধার করেছিলেন তার পরিচয় বল, আমি তার সঙ্গে দেখা করব।

আসমা রিয়াজুলের পরিচয় বলল। তারপর আব্বার সঙ্গে তার যেসব কথাবার্তা হয়েছে, সেসব বলে বলল, চিকিৎসার জন্য আব্বাকে একহাজার টাকাও দিয়েছেন।

মতি খুব অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি? তা হলে তো তিনি খুব ধার্মিক?

শুধু ধার্মিক নন, উচ্চ শিক্ষিতও।

উচ্চ শিক্ষিত ও ধার্মিক মানুষের মন খুব উদার হয়। আমি আজই তার সঙ্গে দেখা করব।

মতি ভাই, ভাবছি এ বছর পুকুরটা বিলি করব। তুমি খদ্দের দেখ।

 ঠিক আছে দেখব, এবার আসি। তারপর সালাম বিনিময় করে মতি চলে গেল।

রিয়াজুল এতক্ষন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। মতি এগিয়ে এলে সালাম দিল।

সালামের উত্তর দিয়ে মতি বলল, আপনাকে তো চিনতে পারছি না?

আমি রিয়াজুল। মিয়া বাড়ির ছেলে। আমার বাবার নাম মরহুম সালাউদ্দিন মিয়া। ছোট বেলা থেকে ঢাকায় খালার কাছে মানুষ হয়েছি। কয়েকদিন হল এসেছি। আপনি?

মতি বুঝতে পারল, এর কথাই আসমা বলেছে। বলল, আমি এই গ্রামেরই ছেলে। ঢাকায় চাকরি করি। কাল এসেছি। মোসারেফ হোসেন আমার দূর সম্পর্কের চাচা হন। উনাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আপনার কথা কিছুক্ষণ আগে আসমার কাছে শুনলাম। আপনি তাকে পাষণ্ড চেয়ারম্যানের ছেলের হাত থেকে কয়েকদিন আগে রক্ষা করেছেন ও মোসারেফ চাচার চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেছেন তা-ও শুনেছি। দেখা হয়ে ভালই হল। নচেৎ আমি নিজেই আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতাম। এখন আসি, পরে আবার দেখা হবে। তারপর সালাম বিনিময় করে চলে গেল।

রিয়াজুল আসমাদের উঠোনে এসে আসমার নাম ধরে ডাকল।

আসমা ঘরে এসে আব্বা ও আম্মাকে এবছর পুকুর বিলি করার কথা বলছি। তার নাম ধরে কেউ ডাকছে শুনে মাকে বলল, তুমি এখান থেকে যাও, কে যেন আব্বার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। তারপর বাইরে এসে রিয়াজুলকে দেখে সালাম দিয়ে বলল, আপনি?

রিয়াজুল সালামের উত্তর দিয়ে বলল, কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?

বারে, বিশ্বাস হবে না কেন? কিছুক্ষণ আগে আব্বা আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। বললেন, ছেলেটা তিন চারদিন এল না কেন বলতে পারিস?

তুমি কী বললে?

 বললাম, হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন।

মাহমুদা বিবি মেয়ে বলা সত্ত্বেও রিয়াজুলকে দেখার জন্য কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলেন। প্রথম দিন তার মুখ দেখেননি। রিয়াজুলের গুণগান আসমা ও স্বামীর মুখে শুনে আজ না দেখে থাকতে পারলেন না।

আসমা মাকে আব্বার রুম থেকে বেরোতে দেখেনি। মাকে বেরোবার সময় দিয়ে রিয়াজুলের সঙ্গে বাইরেই কথা বলছিল। তবু যখন মাকে রুম থেকে বেরোতে দেখল না তখন রিয়াজুলকে বলল, একটু অপেক্ষা করুন, আসছি। তারপর আব্বার রুমে গিয়ে মাকে বলল, তুমি এখনো রয়েছ?

মাহমুদা বিবি ঘোমটা টেনে পাশের রুমে চলে গেলেন।

আসমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রিয়াজুলকে আসতে বলল।

 রিয়াজুল রুমে ঢুকে সালাম দিয়ে বলল, চাচা কেমন আছেন?

মোসারেফ হোসেন সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, আল্লাহর রহমতে একরকম আছি। তা তুমি কয়েকদিন আসনি কেন বাবা?

ছোট চাচার সঙ্গে ফুফুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। আজ দুপুরের দিকে ফিরেছি।

তাই বল, আমি মনে করেছিলাম তোমার কোনো কিছু হল কিনা। তারপর বললেন, তোমার ফুফু খুব ভালো। তার স্বামী আকবর হোসেনও খুব ভালো। এখানে এলেই আমাকে দেখতে আসেন। জান বাবা, তোমার ফুফুর ঘটকালি আমিই করেছিলাম। তা ওরা সবাই ভালো আছে তো?

জ্বি ভালো আছেন। ফুফু ও ওঁর বড় ছেলে রফিক আমাদের সঙ্গে এসেছেন।

তাই নাকি! তানজিলাকে বলো আমাকে যেন একবার দেখা দিয়ে যায়।

জ্বি বলব। তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, আমি একটা আবদার করব, বলুন রাখবেন?

মোসারেফ হোসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার আবদার রাখার মতো ক্ষমতা আমার কী আছে বাবা? তবু তুমি বল, রাখার মতো হলে নিশ্চয় রাখব।

রিয়াজুল আসমাকে বলল, চাচি আম্মাকে এখানে নিয়ে এস।

আসমা জানে আম্মা রিয়াজুলের সামনে আসবে না। তাই ইতস্ততঃ করতে লাগল।

রিয়াজুল বলল, কই নিয়ে এস।

মোসারেফ হোসেন মেয়ের ইতস্তত করার কারণ বুঝতে পেরে বললেন, কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর মাকে নিয়ে আয়।

আসমা বাইরে এসে দেখল, মা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে এসে ফিস ফিস করে বলল, আব্বা যেতে বললেন। তুমি ঘোমটা দিয়ে চল। তা হলে কোনো গোনাহ হবে না।

মাহমুদা বিবি লম্বা ঘোমটা দিয়ে ভিতরে এসে স্বামীর পায়ের দিকে দাঁড়ালেন।

রিয়াজুল সালাম দিয়ে প্রথমে মোসারেফ হোসেনকে ও পরে মাহমুদা বিবিকে কদমবুসি করে ভিজে গলায় বলল, আমি মা-বাবা কি জিনিস জানি না। ছোট বেলা থেকে খালা খালুকে মা-বাবা জেনে এসেছি। এমন কি এখানে আসার কিছুদিন আগে পর্যন্ত নিজের মা-বাবার কথা জানতাম না। এখানে এসে ছোট চাচার কাছে আপনাদের পরিচয় পেয়ে মনে হয়েছে আল্লাহ মা-বাবাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিলেও আপনাদেরকে আমার মা-বাবা করে রেখেছেন। আমাকে কী আপনারা ছেলে হিসাবে গ্রহণ করবেন না?

রিয়াজুলের কথা শুনে মোসারেফ হোসেন ও মাহমুদফা বিবি অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। আর আসমা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সালেহা পাশের রুমে ছিল। বুবু যখন রিয়াজুলের সঙ্গে কথা বলছিল তখন জানালা দিয়ে তাকে দেখছিল। রিয়াজুল ঘরে ঢুকে যেতে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। মা রুমে ঢুকলেও সে ঢুকেনি। সেও রিয়াজুলের কথা শুনে ভীষণ অবাক হল।

রিয়াজুল চোখ মুছে বলল, আপনারা কিছু বলছেন না কেন?

মোসারেফ হোসেন কান্না সামলাতে পারলেন না। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, কি আর বলব বাবা, আমাদের বড় ছেলেকে আল্লাহ তুলে নিয়ে তোমাকে পাঠিয়েছেন। শুধু ছেলে হিসাবে নয় আল্লাহর দান হিসাবেও গ্রহণ করব। এযে আমাদের কতবড় ভাগ্য তা আল্লাহপাকই জানেন। তারপর আসমাকে বললেন, সালেহা ও জাহিদকে ডেকে নিয়ে আয়।

আসমা রুমের বাইরে এসে সালেহাকে দেখে বলল, জাহিদ কোথায়?

সালেহা বলল, বোধ হয় খেলতে গেছে।

তুই আমার সঙ্গে আয় বলে আসমা তাকে নিয়ে রুমে ঢুকে আব্বার দিকে তাকিয়ে বলল, জাহিদ খেলতে গেছে।

মোসারেফ হোসেন বললেন, রিয়াজুল তোদের বড় ভাইয়ের মতো, সালাম কর।

আসমা ও সালেহা একে একে সালাম করল।

রিয়াজুল মাথায় হাত ছুঁয়ে চুমো খেয়ে বলল, তোমাদের বড় ভাইয়ের হক আদায় করার তওফিক আল্লাহ আমাকে যেন দেন। তারপর আসমাকে জিজ্ঞেস করল, সালেহা কী আর স্কুলে যায় না?

না।

সামনেই জানুয়ারী মাস। সেই সময় ওকে স্কুলে ভর্তি করে দিও। টাকার জন্য চিন্তা করে না। আবার জিজ্ঞেস করল, চাচাকে কোন্ ডাক্তার চিকিৎসা করছেন?

ডাক্তারের নাম বলে আসমা বলল, টাকার অভাবে প্রায় একবছর চিকিৎসা বন্ধ। টাকা হাতে এলে মাঝে মাঝে আগের প্রেসক্রিপসানের ঔষধ নিয়ে আসি।

ঠিক আছে, আমি ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে যা করার করব। প্রয়োজন হলে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। তারপর মাহমুদা বিবির দিকে তাকিয়ে বলল, চাচি আম্মা আপনারা দোওয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমার মনের বাসনা পূরণ করেন।

মাহমুদা বিবি সবকিছু শুনে ঘোমটার ভিতর চোখের পানি ফেলছিলেন। চোখ মুছে বললেন, আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তার দরবারে জানাই হাজার হাজার শুকরিয়া। তিনি তোমাকে হায়াতে তৈয়েবা দান করুন। তোমার মনের নেক মকসুদ পূরণ করুন। তোমাকে সুখি করুন।

রিয়াজুল বলল, এখন আসি মাগরিবের সময় হয়ে আসছে।

 মোসারেফ হোসেন বললেন, একটু চা খেয়ে গেলে হত না বাবা?

না চাচা, নামাযের দেরি হয়ে যাবে। তারপর সালাম বিনিময় করে আসমাকে বলল, তুমি আমার সঙ্গে এস।

পুকুর পাড়ে এসে বলল, আমি যখন আসি তখন যে ছেলেটার সঙ্গে তুমি কথা বলছিলে তার সঙ্গে পরিচয় হল। কে হয় তোমাদের?

আসমা থতমত খেয়ে কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। সামলে নিয়ে বলল, দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই, মতি। আত্মীয়দের মধ্যে ও-ই আমাদের খোঁজ-খবর নেয়। মাস ছয়েক আগে চাকরী পেয়ে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। কাল এসে আমাদের খবর নিতে আজ এসেছিল।

মতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা জানার জন্য জিজ্ঞেস করল, অতক্ষণ ধরে কি কথা বলছিলে?

এই পুকুরটা এ বছর বিলি করব। তাই গ্রাহক দেখার কথা বলছিলাম।

তা আর করো না। যা করার আমিই করব ইনশাআল্লাহ। তারপর বলল, চাচা-চাচি যখন ছেলে বলে গ্রহণ করেছেন তখন তোমরাও নিশ্চয় বড় ভাই হিসাবে গ্রহণ করবে?

আমি তো সেই প্রথম দিনেই করেছি।

তা হলে ভাইয়া বলে ডাকনি কেন?

লজ্জায়, তবে আব্বা আজ ভাঙ্গিয়ে দিয়েছেন।

এমন সময় জাহিদকে পাশ কেটে চলে যেতে দেখে আসমা বলল, এই জাহিদ শোন।

মাহমুদা বিবি ছেলেমেয়েদের আদব কায়দা শিক্ষা দিয়ে মানুষ করেছেন। বড়দের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিতে শিখিয়েছেন। বড়রা যখন কথা বলবে তখন ছোটদের সেখানে থাকা নিষেধ করেছেন। তাই বড় বুবুকে একজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। বড় বুবুর কথা শুনে দাঁড়িয়ে রিয়াজুলের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল।

রিয়াজুল সালামের উত্তর দিয়ে বলল, তুমিই তা হলে জাহিদ? খেলতে গিয়েছিলে বুঝি?

জ্বি।

ঠিক আছে যাও।

জাহিদ যেতে উদ্যত হলে আসমা বলল, ইনি আমাদের বড় ভাই, কদমবুসি কর।

জাহিদ অবাক হয়ে একবার রিয়াজুলের দিকে আর একবার আসমার দিকে তাকাতে লাগল।

কিরে কদমবুসি করতে বললাম না?

জাহিদ কদমবুসি করতে এগিয়ে এলে রিয়াজুল বসে তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেয়ে বলল, থাক তোমাকে আর কদমবুসি করতে হবে না। কোন ক্লাশে পড়?

সিক্সে।

রোল নাম্বার কত?

দুই।

আরো ভালো করে পড়াশোনা করবে, তা হলে এক নাম্বারে এসে পড়বে।

 জ্বি করব।

এমন সময় আজান শুনে জিজ্ঞেস করল, তুমি নামায পড়তে জান?

জ্বি জানি। কোরআনও পড়তে জানি। আম্মা শিখিয়েছেন।

তা হলে যাও কাপড় পাল্টে এস, মসজিদে যাবে।

 আপনি যান, আমি ঘরে পড়ব।

কেন?

আমার একটা লুঙ্গি, তার অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। তাই বড় বুবু ঘরে পড়তে বলেছে।

ঠিক আছে তুমি যাও, আমি তোমার বড় বুবুকে লুঙ্গি কিনে দিতে বলব।

জাহিদ আর কিছু না বলে চলে গেল।

জাহিদের কথায় আসমা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ছিল। রিয়াজুল বুঝতে পেরে বলল, আল্লাহর কী কুদরত দেখ আসমা, কারো আট দশটা জামা কাপড়, আবার কারো পরার উপযুক্ত একটাও নেই। কেউ উদ্বৃত্ত খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে, আবার কেউ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।

আসমা বলল, আযান হয়ে গেছে, নামাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে না?

ও হ্যাঁ যাচ্ছি। তারপর আসি বলে সালাম বিনিময় করে চলে গেল।

আসমা ঘাট থেকে অযু করে ঘরে এস নামাযে দাঁড়াল।

মোসারেফ হোসেনের বারান্দাসহ টিনসেড দুই রুমের ঘর। একটায় স্বামী স্ত্রী থাকেন। অন্যটায় আসমা দুই ভাই-বোনকে নিয়ে ঘুমায়। বারান্দায় অর্ধেকটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে আসমা একটা রুম করেছে। সেখানে সে সকালে ও দুপুরের পর স্কুলের কয়েকটা ছেলে মেয়েকে প্রাইভেট পড়ায়।

রাত্রে ঘুমাবার সময় জাহিদ বলল, বড় বুবু, তখন যাকে বড় ভাই বলে কদমবুসি করতে বললে, সে কে? কই তাকে তো আগে কখনও দেখিনি?

আসমা বলল, মিয়া বাড়ির যে ছেলেটা তোর সঙ্গে পড়ে উনি তার বাবার মেজ চাচার ছেলে। ওঁর মা-বাবা ওঁকে খুব ছোট রেখে মারা গেছেন। সেই থেকে ঢাকায় খালার কাছে ছিলেন। কয়েকদিন হল এসেছেন। ওঁর বাবার সঙ্গে আব্বার বন্ধুত্ব ছিল। এখানে এসে সে কথা জানতে পেরে আমাদেরকে আপন করে নিয়েছেন। ওঁর সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিবি। কোনো রকম বেয়াদবি করবি না : তারপর সালেহার উদ্দেশ্য করে বলল, তুইও তাই করবি। তোকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিতে বলেছেন।

জাহিদ বলল, আমরা ওঁকে কি বলে ডাকব?

 ভাইয়া বলে ডাকব।

উনি তোমাকে আমার লুঙ্গি কিনে দিতে বলেছেন?

হ্যাঁ বলেছেন। কাল মনোয়ার চাচাকে টাকা দেব, লুঙ্গি এনে দেবে।

.

০৬.

পরের দিন সকালে রিয়াজুল ফুফুকে নিয়ে বড় চাচাদের বাড়িতে গেল। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর নূরুদ্দিন মিয়া তানজিলার সঙ্গে তার স্বামীর বাড়ির খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে লাগলেন।

একসময় রিয়াজুল বলল, বড় চাচা আমি কিছু আলাপ করতে চাই।

রিয়াজুল আসার পর থেকে নুরুদ্দিন মিয়া এরকমই আশা করেছিলেন। বললেন, বেশ তো কি আলাপ করতে চাও বল।

আমি আমার মরহুম আব্বার অংশের সম্পত্তি পেতে চাই।

বাবার সম্পত্তি নেবে, ভালো কথা। আমি সামসুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ করে ব্যবস্থা করে দেব।

ছোট চাচার কাছে জানলাম, আব্বার সম্পত্তি আপনারা দু’ভাই নাকি ভাগ করে নিয়ে ভোগ দখল করছেন?

হ্যাঁ ঠিকই জেনেছ।

এত বছরের ফসলি জমির ফসল আপনারা নিশ্চয় বিক্রি করেছেন? সেই সব টাকা দেবেন না?

জমিতে ফসল তো আপনা-আপনি হয় না, প্রচুর খরচ করতে হয়।

তাতো হবেই। আপনারা খরচ করে চাষ করেছেন সেজন্যে ফসলের অর্ধেক পাবেন। বাকি অর্ধেক তো আমার পাওনা।

ঠিক আছে, এ ব্যাপারেও সামসুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ করব।

এবার তানজিলা বলল, বড় ভাই, আমিও আমার অংশের সম্পত্তি পেতে চাই।

নূরুদ্দিন মিয়া রেগে উঠে বললেন, কেন? তোর আবার কিসের অভাব? আকবর হোসেন তোকে কি খোর-পোষ দিচ্ছে না?

হাজার দিলেও আমি আমার হক সম্পত্তি পেতে চাই।

এখন সম্পত্তি নিয়ে নিলে ভবিষ্যতে যদি তেমন কোনো বিপদে পড়িস, তখন কোথায় যাবি?

ভবিষ্যতের কথা আল্লাহ জানেন। আর সত্যিই যদি আমার ভাগ্যে তেমন কিছু ঘটে, তা হলে মনে রাখবেন, না খেতে পেয়ে মরে গেলেও আপনার কাছে এসে হাত পাতব না।

নূরুদ্দিন মিয়া রাগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, তুই যে সম্পত্তির দাবি করছিস, আকবর হোসেন জানে?

হা জানে।

জানতাম আকবর হোসেনের দীল ও দৌলত দু’টোই আছে। এখন জানলাম, দৌলত থাকলেও দীল নেই। তার দীল এত ছোট, কখনো ভাবিনি।

আল্লাহ তাকে দল-দৌলত দু’টোই দিয়েছেন। সে এই সম্পত্তি আশা করেনি। কিন্তু আমি আমার হক সম্পত্তি ছাড়ব কেন? আর আপনারাই বা দিতে চাচ্ছেন না কেন?

নূরুদ্দিন আরো রেগে গিয়ে বললেন, আমি কী বলেছি দেব না?

বড় চাচাকে রেগে যেতে দেখে রিয়াজুল বলল, বেয়াদবি নেবেন না, আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই।

নূরুদ্দিন মিয়া গম্ভীর স্বরে বললেন, বল কী বলবে।

রিয়াজুল বলল, আল্লাহ কোরআন পাকে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়েদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক ছেলে যা পাবে, এক মেয়ে পাবে তার অর্ধেক। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইয়েরা বোনদেরকে তাদের ন্যায্য সম্পত্তি থেকে নানান ছুতায় বঞ্চিত করে। এটা যে আল্লাহর আইনকে অমান্য করা হল, তা চিন্তা করে না। যারা একজনের হক সম্পত্তি না-হক করে ভোগ দখল করে, তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। এটাও কোরআন হাদিসের কথা। ইসলামের বিধান হল, বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলেরা যখন সম্পত্তি ভাগ করে নেবে তখন মেয়েদের অংশও তাদের দিয়ে দিতে হবে। তবে কেউ যদি না নিয়ে স্বেচ্ছায় ভাইদের দিয়ে দেয়, তাতেও কোনো নিষেধ নেই। তবু তাদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়াই ভালো। কারণ ভবিষ্যতে বোনের ছেলে মেয়েরা মায়ের সম্পত্তি দাবি করতে পারে। তা ছাড়া আজকাল পুরুষরা মেয়েদেরকে মুল্যায়ন করছে না। তাদের প্রতি কর্তব্য আদায়ও করছে না। যার ফলে দিনের পর দিন সমাজে মেয়েদের মূল্য অনেক কমে যাচ্ছে। তারা পুরুষদের কাছ থেকে ন্যায্য অধিকার না পেয়ে তা আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে শ্লোগান দিচ্ছে, বিভিন্ন সভা সমিতি করছে। আবার অনেক এন.জি.ও.দের খপ্পরে পড়ে বেপর্দা হয়ে শালীনতা হারাচ্ছে। তাদেরকে অনুকরণ অনুসরণ করে ধর্মান্তরিতও হচ্ছে। একরকম পুরুষরাই তাদেরকে ঐ পথে যেতে বাধ্য করছে। মেয়েরা যদি তাদের ন্যায্য অধিকার তার স্বামীদের ও ভাইদের তথা পরিবারের সবার কাছ থেকে পেত, তা হলে তারা পথে নামত না। এবং ইসলামকে পরিত্যাগ করে এন.জি.ও.দের পাল্লায় পড়ত না। শ্বশুর মারা যাওয়ার পর শালা-সম্বন্ধীরা বোনেদের হক দিচ্ছে না। তাই জামাই বা জামাই-এর বাবা-ভাইয়েরা বিয়ের সময় মোটা যৌতুক দাবি করছে। সব থেকে বড় অপরাধ পুরুষরা করছে, তারা মেয়েদেরকে তাদের অধিকার সম্বন্ধে অজ্ঞ করে রেখে বাদী-দাসীর মতো খাটাচ্ছে। তারা যে, পুরুষের অর্ধেক, তা স্বীকার না করে তাদের প্রতি ইতর প্রাণীর মতো ব্যবহার করছে। এর জন্য পুরুষদেরকে কাল কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর কাছে জওয়াবদিহি করতে হবে। আমরা মুসলমান হয়েও ইসলামের তথা কোরআন-হাদিসের বিধান মতো ভাইয়েরা বোনেদের ন্যায্য সম্পত্তি না দিয়ে, স্বামীরা স্ত্রীদেরকে তাদের দেনমোহরের টাকা না দিয়ে জঘন্যতর অপরাধ করছি। যারা আল্লাহ, কবর ও হাসরকে বিশ্বাস করে ও ভয় করে, তারা কোনোদিন এইরূপ জঘন্য অপরাধ করতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেথ ইজ ইমপেন্ডিং ওভার আওয়ার হেড। অর্থাৎ মৃত্যু আমাদের মাথার উপর ঝুলছে। যে কোনো সময়ে ফাঁসির রশির মতো গলায় চেপে ধরবে। তা সত্বেও আমরা মৃত্যু ভুলে, আল্লাহ ও তার রাসুল (দঃ) এর বাণী ভুলে দুনিয়াদারীর মোহে হাবুডুবু খাচ্ছি। দুনিয়াদারীর জন্য আমরা যে কোনো জঘন্যতর অপরাধ করাছ। অথচ শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলে তার এক কানাকড়িও মূল্য থাকবে না। আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, ফুফুর অংশ মতো সম্পত্তি তাকে দিয়ে দিন। আর একটা কথা, শুনলাম জমির রেকর্ড হচ্ছে। আপনারা দাদাজীর সম্পত্তি শুধু দু’ভাইয়ের নামে রেকর্ড করাচ্ছেন। আমার মরহুম আব্বার নাম ও ফুফুর নামে করাচ্ছেন না, এই কথাটা কী সত্য?

নূরুদ্দিন মিয়া খুব রেগে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, কার কাছে শুনেছ?

মাফ করবেন, বলতে পারব না। কথাটা সত্য কিনা জানতে চাই।

নূরুদ্দিন মিয়া প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছেন, সামসুদ্দিন এদের পিছনে আছে। আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমার বাবার সম্পত্তি তুমি পাবে, আর তানজিলাও তার সম্পত্তি পাবে। রেকর্ড নিয়ে তোমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে।

শুধু সম্পত্তি পেলে তো হবে না, রেকর্ড থাকতে হবে। নচেৎ ভবিষ্যতে বংশধরদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হবে।

তুমি ছেলে মানুষ। বিষয় সম্পত্তির জটিলতা বুঝবে না। ভবিষ্যতের যে বিবাদের কথা বললে, সব সম্পত্তিতে সবাইয়ের নাম লেখালে ভবিষ্যতে সেই বিবাদ আরো বেশি হবে। আমি আর এ ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাই না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, তোমরা তোমাদের অংশ মতো সম্পত্তি পেয়ে যাবে।

বেয়াদবি নেবেন না, আমি ও ফুফু কিন্তু রেকর্ডে নাম লেখাতে চাই।

নূরুদ্দিন মিয়া রাগে ফেটে পড়লেন, ও…. তা হলে তোমরা ফুফু ভাতিজাতে যুক্তি করে এসেছ?

আপনি যা ইচ্ছা ভাবতে পারেন, আমরা কিন্তু নাম রেকর্ড করাবই।

 নূরুদ্দিন মিয়া তানজিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুইও কী তাই চাস?

 তুমি রেগে যাচ্ছ কেন বড় ভাই? রিয়াজুল তো উচিত কথা বলেছে।

ঠিক আছে পারলে লেখাস। তারপর সেখান থেকে চলে গেলেন।

রিয়াজুল ও তানজিলা সামসুদ্দিনের বাড়ি ফিরে এল।

এশার নামাযের পর নূরুদ্দিন মিয়া তিন ছেলেকে ডেকে সব কথা বলে বললেন, পঁচিশ বছর পর সালাউদ্দিনের ছেলে এসে যে ঝামেলা বাধাবে, তা কখনো ভাবিনি। এখন তোমরা কি সিদ্ধান্ত নেবে বল।

বড় ছেলে আলাউদ্দিন বাবার মতো হয়েছে। সে বলল, ঝামেলা বাধাবার আগে রিয়াজুলকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়। আর ফুফুকে কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করে দিলেই হবে।

নূরুদ্দিন মিয়া মেজ ও ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বল?

মেজ কলিম উদ্দিন যেমন চালাক তেমনি কৃপণ। বলল, আমার মতে ফুফুর মতো রিয়াজুলকেও কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করাই ভালো। খুন-খারাবি করার পক্ষে আমি নেই। এসব ব্যাপার চাপা থাকে না। থানা পুলিশ হলে কেলেঙ্কারীর শেষ থাকবে না। তা ছাড়া টাকা পয়সাও কম খরচ হবে না। তারপর রিয়াজউদ্দিনের দিকে চেয়ে বলল, তুই কি বলিস?

আলাউদ্দিন ও কলিমউদ্দিন ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়লেও পরীক্ষা দেয়নি। রিয়াজউদ্দিন বি.এ. পাশ করে হাইস্কুলে মাষ্টারী করে। বড় ভাইদের কথা শুনে সন্তুষ্ট হতে পারল না। বলল, আমার মনে হয়, ছোট চাচার সঙ্গে পরামর্শ করে যার যা অংশ তা দিয়ে দিলে কোনো ঝামেলাই থাকবে না।

নূরুদ্দিন মিয়া তিন ছেলেকে কিছু কিছু সম্পত্তি দিয়ে আলাদা করে দিয়েছেন। বড় ও মেজ গৃহস্থালী করে। আর ছোট স্কুলে শিক্ষকতা করে ও টিউশনী করে মোটা টাকা রোজগার করে। এর মধ্যে বেশ কিছু জমি জায়গাও কিনেছে। বড় ও মেজ তাকে হিংসা করে।

আলাউদ্দিন তার কথা শুনে জ্বলে উঠে বলল, তুই তো এই কথা বলবি। তোর তো কোনো অভাব নেই। অংশ মতো সব কিছু দিলে আমরা আর কতটুকু পাব। এখনই সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। সম্পত্তি দিয়ে দিলে উপোস করে মরতে হবে।

কলিমউদ্দিন বলল, হ্যাঁ বড় ভাই, তুমি ঠিক কথা বলেছ। রিয়াজউদ্দিন আছে নবাবী হালে। আমাদের কষ্ট বুঝবে কি করে?

রিয়াজউদ্দিন রেগে উঠে বলল, তোমরা উল্টো পাল্টা কথা বলছ কেন? আমার মতামত জানতে চেয়েছিলে বললাম। পছন্দ না হলে তোমরা তোমাদের মতলব মতো কাজ করবে তাতে আমার কী? তবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমাকে জড়াবে না। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার কাছে আমার একটাই অনুরোধ, ছোট চাচার সঙ্গে পরামর্শ না করে কিছু সিদ্ধান্ত নেবেন না। কথা শেষ করে সেখান থেকে চলে গেল।

আলাউদ্দিন বলল, দেখলেন আব্বা, রিয়াজউদ্দিনের কত দেমাগ। আমাদেরকে বড় ভাই বলে গ্রাহ্য তো করলই না, এমন কি আপনাকেও করল না।

নূরুদ্দিন মিয়া রিয়াজউদ্দিনকে ছোট বেলা থেকেই স্বাধীনচেতা দেখে এসেছেন। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে অনেক সময় তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেও দেখেছেন। তখন রেগে গেলেও প্রতিবাদ করেননি। আজও তার কথায় রেগে গিয়েও করলেন না। আলাউদ্দিনের কথা শুনে বললেন, রিয়াজউদ্দিনের স্বভাব তো তোমরা জান। তার কথা বাদ দাও। সামসুদ্দিনের সঙ্গে আমি আগে কথা বলে দেখি, তারপর যা করার তোমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে করব। এখন তোমরা যাও।

নূরুদ্দিনের স্ত্রী সায়মা বিবি এতক্ষণ আড়াল থেকে সবকিছু শুনছিলেন। ছেলেরা চলে যাওয়ার পর স্বামীর কাছে এসে বললেন, অনেক রাত হয়েছে খাওয়া দাওয়া করবে না? প্রতিদিন তো এশার নামাযের পর খাও। আজ খিধে পায়নি?

নূরুদ্দিন হাই তুলে বললেন, রিয়াজুল ঝামেলা বাধিয়ে খিধে মেরে দিয়েছে।

তার বাবার অংশ তাকে দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়।

তুমি মেয়ে মানুষ, সংসারের ঝামেলা শুধু বোঝ, সম্পত্তির ঝামেলায় নাক গলিও না। চল খেতে দেবে।

রিয়াজুল ও তানজিলা ফিরে এলে সামসুদ্দিন মিয়া তাদের কাছ থেকে সব কিছু শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ভাবতে লাগলেন।

রিয়াজুল বলল, চাচা কি এত ভাবছেন?

ভাবছি, বড় ভাই ডেকে পাঠালে কী বলব?

এতে ভাববার কি আছে? আপনি আপনার নিজস্ব মতামত বলবেন।

তাতো বলবই। আমি ভাবছি অন্য কথা।

 তানজিলা বলল, অন্য কী কথা ভাবছ বল না।

পরে বলব, এখন আমি একটু বেরোবো।

.

দু’দিন পর নূরুদ্দিন মিয়া চাকরের মারফত ছোট ভাইকে ডেকে পাঠালেন।

সামসুদ্দিন মিয়া গিয়ে সালাম দিল।

সালামের উত্তর দিয়ে নূরুদ্দিন মিয়া বসতে বলে বললেন, কাজটা তুমি ভালো করেনি। যাক, যা করেছ সে ব্যাপারে কিছু বললে তো আর কোনো লাভ হবে না। এখন বল, রিয়াজুল এসে তার বাবার সম্পত্তি চাচ্ছে, তার কি করবে?

ছেলে হিসাবে রিয়াজুল মেজ ভাইয়ের সব সম্পত্তির হকদার। তাকে তার বাবার সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়াই তো উচিত।

সে কিন্তু গত পঁচিশ বছরের তার বাবার সম্পত্তির ফসলের ভাগও চাচ্ছে।

চাইলে দিতে হবে।

এত বছরের ফসলের দাম কত হবে ভেবে দেখেছ? তা ছাড়া সব বছর তো সমান ফসল। হয়নি। কি হিসাবে দেব?

আমি প্রতি বছর মেজ ভাইয়ের জমির ফসল আলাদা হিসাব করে বিক্রি করে ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। রিয়াজুল আসার পর তাকে বুঝিয়ে দিয়েছি।

তোমার ছেলে মেয়ে নেই, ছোট সংসার, তাই পেরেছ। কিন্তু আমার তো বিরাট সংসার। সব খরচ করে ফেলেছি। কিভাবে অত টাকা এখন দেব?

সামসুদ্দিন জানে টাকা না দেওয়ার এটা একটা অসিলা। বললেন, সেটা আপনার ব্যাপার। যা ভালো বুঝবেন করবেন। তবে আমার মনে হয়, আপনি যতটা সম্ভব দিয়ে রিয়াজুলকে মানিয়ে নিতে পারেন। ও এলেমদার ছেলে। বড়দেরকে খুব সম্মান করে।

আমিও তাই ভেবেছি। আর একটা কথা, সে জমির রেকর্ডেও নাম লেখাতে চায়। আমি বলেছি তোমার বাবার সম্পত্তি তুমি পাবে। রেকর্ডে নাম লেখালে ভবিষ্যতে অসুবিধা হবে। কিন্তু সে আমার কথা মানতে রাজি নয়। তুমি ওকে বুঝিয়ে বললে হয়তো শুনবে।

রেকর্ডে ওর নাম লেখানোই তো উচিত। আপনি নিষেধ করছেন কেন? আর ভবিষ্যতে অসুবিধাই বা হবে কেন? বরং সুবিধাই হবে।

নূরুদ্দিন এবার রাগত স্বরে বললেন, তা হলে তুমিই রিয়াজুলকে আনিয়ে এই যুক্তি দিয়েছ? আর তানজিলাকেও আনিয়েছ?

যা কর্তব্য তাই করেছি। আমি চাই যে যা পায়, তাকে তা দিয়ে দিতে।

আমিও দেখে নেব কর্তব্য কতটা করতে পার। আর রিয়াজুল কী করে রেকর্ড করায় দেখব। এখন শোন, তানজিলাও সম্পত্তি চাচ্ছে। সে ব্যাপারে কি করবে?

তারটাও তাকে দিয়ে দিতে হবে।

ফসলি জমি না হয় দেওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তু, পুকুর, ডোবা, আগান-বাগান ও গাছপালার অংশ কিভাবে দেবে?

সে সব ব্যাপারে তানজিলার সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করে যা করার করতে হবে। আর সে যদি সব জায়গা থেকে দাবি করে, তা হলে তাই দিতে হবে।

ঠিক আছে তুমি এখন যাও। আর শোন, ওদেরকে নিয়ে বেশি নাচানাচি করো না।

নাচানাচি বলতে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন জানি না। তবে যার যা অংশ, তা দিয়ে দিতে চাই। কারণ আল্লাহর কাছে একদিন এজন্যে জবাবদিহি করতে হবে। তারপর সালাম বিনিময় করে সামসুদ্দিন সেখান থেকে চলে এলেন।

ঘরে এসে বড় ভাইয়ের সঙ্গে যা কিছু কথাবার্তা হয়েছে সবাইকে বললেন।

রিয়াজুল বলল, কিছুক্ষণ আগে আপনার কাছে মনোয়ার নামে একজন লোক এসেছিলেন। আপনাকে দেখা করতে বলে গেলেন। তারপর জিজ্ঞেস করল, লোকটা কে ছোট চাচা?

মনোয়ার তোমার মোসারেফ চাচার চাচাতো ভাই। গরিব হলে কি হবে, খুব ভালো লোক। তোমার আব্বার সঙ্গে খাতির ছিল। ওকেই সেটেলমেন্ট অফিসের খোঁজ খবর রাখতে বলেছি। হয়তো কিছু খবর দিতে এসেছিল। যাই দেখা করে আসি।

রিয়াজুল বলল, আমি গেলে কোনো অসুবিধা আছে?

অসুবিধা আবার কিসের, চল যাই। বলে রওয়ানা দিলেন।

মনোয়ার হোসেনের ঘরের কাছে গিয়ে সামসুদ্দিন মিয়া তার নাম ধরে ডেকে বললেন, ঘরে আছ নাকি?

মনোয়ার হোসেন ঘরে ছিল। বেরিয়ে এসে সালাম দিয়ে রিয়াজুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, একে তো চিনতে পারছি না?

 সাসমুদ্দিন মিয়া বললেন, ভালো করে দেখো দেখি, চিনতে পার কিনা।

মনোয়ার হোসেন কয়েক সেকেন্ড রিয়াজুলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বললেন, মেজ মিয়া ভাইয়ের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে।

হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছ। ও মেজ ভাইয়ের ছেলে রিয়াজুল। ওর কথাই তো তোমাকে কয়েকদিন আগে বলেছি।

মনোয়ার হোসেন বললেন, আসুন ঘরে এসে বসুন কথা আছে। তারপর তাদের নিয়ে ঘরের বারান্দায় খেজুর পাটি পেতে বসতে দিয়ে নিজেও বসলেন।

সামসুদ্দিন মিয়া বসে বললেন, এবার বল, কি বলবে।

মনোয়ার হোসেন বললেন, আজ সেটেলমেন্ট অফিসে গিয়েছিলাম, কাল আপনাদের জমি রেকর্ড হবে। তারপর কিভাবে কি করতে হবে সামসুদ্দিন মিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করে রিয়াজুলকে বুঝিয়ে দিল।

.

সেটেলমেন্ট অফিস পাশের গ্রাম সোনাপুরে বসেছে। এই গ্রামেই চেয়ারম্যান আলি আসগরের বাড়ি। পরের দিন বেলা দশটার দিকে রিয়াজুল কি করতে হবে রফিককে বুঝিয়ে বলে সেটেলমেন্ট অফিসে গেল।

অফিস রুমটা বেশ বড়। লোক গিজগিজ করছে। রিয়াজুল রফিককে নিয়ে পিছনের দিকে দাঁড়াল। হাকিম সাহেব যখন দাগ ও খতিয়ান নাম্বার বলে অংশীদারের নাম জানতে চাইলেন তখন নূরুদ্দিন মিয়া নিজের নাম ও ছোট ভাই সামসুদ্দিন মিয়ার নাম বললেন।

হাকিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আপনার আর কোনো ভাই বা বোন নেই?

নূরুদ্দিন মিয়া বললেন, না।

ঠিক তখনই রিয়াজুল বলল, জ্বি হুজুর আছে।

রিয়াজুলের কথা শুনে লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন উঠল।

হাকিম সাহেব সবাইকে থামতে বলে রিয়াজুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে আপনি?

রিয়াজুল বলল, আমি নূরুদ্দিন ও সামসুদ্দিন মিয়ার মেজ ভাই মরহুম সালাউদ্দিন মিয়ার ছেলে। আমি আমার মায়ের পেটে থাকতে উনি মারা গেছেন। তারপর রফিককে দেখিয়ে বলল, এ আমার ফুফাতো ভাই। আমার ফুফু বেঁচে আছেন। তিনিও অংশীদার। তার নাম তানজিলা বেগম।

হাকিম সাহেব নাম লিখে নিয়ে নূরুদ্দিন মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী বড় মিয়া, আপনি জ্ঞানী-গুনী, তার উপর মাতবর মানুষ হয়ে এরকম কাজ করতে পারলেন?

রিয়াজুল যে তাকে এতবড় অপমান করবে নূরুদ্দিন মিয়া কল্পনাও করেননি। রাগে ও লজ্জায় মাথা নিচু করে ঘরে ফিরে এসে ছেলেদের ডেকে ঘটনাটা বলে বললেন, ওকে আমি বন্দুক দিয়ে গুলি করে শেষ করে দেব। ও আমার মান ইজ্জত ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ব্যাটা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। ফাঁদে ফেলে ব্যাটাকে কি করি বুঝবে।

রিয়াজুল ছোট চাচার কাছ থেকে সমস্ত সম্পত্তির দাগ ও খতিয়ান নাম্বার নিয়ে সবগুলোতে তার মরহুম বাবার ও ফুফুর নাম রেকর্ড করাবার জন্য একটা দরখাস্ত লিখে এনেছিল। সেটা হাকিম সাহেবের কাছে জমা দিল।

সেখানে চেয়ারম্যান আলি আসগর ছিলেন। রিয়াজুলকে বাইরে ডেকে নিয়ে এসে বললেন, তোমার বড় চাচা তোক ভালো নয়, এটা গ্রামের সবাই জানে। তবু এভাবে অপমান করা তোমার ঠিক হয়নি।

রিয়াজুল বলল, চেয়ারম্যান চাচা, আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমিও এটা করতে চাইনি। তাই ওঁকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই রাজি হননি। একরকম বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হল।

কিন্তু বাবাজি ওঁর সঙ্গে বিবাদ করে তুমি গ্রামে থাকতে পারবে?

থাকতে পারব কিনা সে কথা আল্লাহপাক জানেন। আমি আল্লাহপাককে ছাড়া কাউকে ভয় করি না। হায়াত মউত আল্লাহপাকের হাতে। সত্যের জন্যে যদি প্রাণ দিতে হয়, তাতেও আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার মা-বাবা নেই যে, আমি মারা গেলে দুঃখ পাবেন। আপনি দোয়া করবেন চাচা, আমি যেন সত্যের জন্য সংগ্রাম করতে পারি। তারপর সালাম বিনিময় করে রফিককে নিয়ে সেখান থেকে চলে এল।

নূরুদ্দিন মিয়া লজ্জায় প্রায় এক সপ্তাহ ঘরের বাইরে বের হলেন না। তিন ছেলেকে নিয়ে পরামর্শ করলেন, রিয়াজুলকে এমনভাবে খুন করবেন, যেন কেউ তাদেরকে সন্দেহ করতে না পারে। মেজ ও ছোট কিছু না বলে চুপ করে থাকল। বড় আলাউদ্দিন বলল, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, যা করার আমি করব।

নূরুদ্দিন মিয়া অন্য দুজন ছেলেকে বললেন, তোমরা কিছু বলছ না কেন?

মেজ ছেলে কলিমউদ্দিন বলল, আমার মতে খুন করলে পুলিশরা যেমন করে থোক খুনিকে বার করে ফেলবে। তার চেয়ে সে যাতে এখানে থাকতে না পেরে ঢাকা ফিরে যায় সেই ব্যবস্থা করাই ভালো।

মেজ ভাই থেমে যেতে ছোট রিয়াজ উদ্দিন বলল, আপনি এতদিন অনেক অন্যায় করেছেন। বাবা হিসাবে সম্মান করে কিছু বলিনি। কিন্তু আর না বলে পারছি না। আপনি যা করতে চাচ্ছেন, তা অন্যায় ও পাপ। এসব পথ আপনার পরিত্যাগ করা উচিত।

নূরদ্দিন মিয়া রেগে উঠে বললেন, তুমি আমাকে উপদেশ দিচ্ছ? আমার অন্যায়টা দেখেতে পেলে, আর রিয়াজুল যে আমাকে সাত গ্রামের মানুষের কাছে অপমান করল, সেটা বুঝি কিছু নয়?

আপনি নিজের ভুলের কারণে অপমানিত হয়েছেন। সম্পত্তিতে তার বাবার নাম রেকর্ড করিয়ে আপনি কী ভুল করেননি? সে তো আপনার কাছে পরামর্শ করতে এসেছিল। আপনি তাকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। তাই হাকিমের কাছে প্রতিবাদ করেছে।

চুপ কর বেয়াদব কোথাকার। শত্রুর হয়ে কথা বলতে তোর লজ্জা করছে না। লেখাপড়া করে তুমি জানোয়ার হয়েছ। যে ছেলে বাবার মান সম্মানের চেয়ে শত্রুর পক্ষে কথা বলে, তার মুখ আমি দেখতে চাই না। দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে।

রিয়াজউদ্দিন আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল।

একটু পরে কলিমউদ্দিন ছোট ভাইকে অনুসরণ করল।

 আলাউদ্দিন বলল, দেখলেন আব্বা, ওরা কেমন পাশ কেটে চলে গেল।

নূরুদ্দিন মিয়া বললেন, ওদের কথা বাদ দাও। তুমি তোমার মতো করে কাজ কর।

<

Super User